📄 হিংসার ক্ষতি
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ قَالَ: لَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَشُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ কর না, হিংসা কর না, এবং দালালী কর না অর্থাৎ, নিছক দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে নিলামে দাম হাঁকবে না। বরং হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা সবাই পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও।
বর্ণিত আছে, হযরত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান তার ছেলেকে বলতেন-
يَا بُنَيَّ إِيَّاكَ وَالْحَسَدَ، فَإِنَّهُ يَتَبَيَّنُ فِيكَ قَبْلَ أَنْ يَتَبَيَّنُ فِي عَدُوِّكَ.
হে বৎস! হিংসা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, হিংসা তোমার শত্রুর ক্ষতি করার পূর্বে তোমারই ক্ষতি করবে।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, হিংসার মত অনিষ্টকর আর কিছু নেই। কারণ, হিংসার ফলে যাকে হিংসা করা হলো, তার কোনো ক্ষতি হওয়ার পূর্বেই হিংসাকারী নিজেই পাঁচটি ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
১. অনবরত দুশ্চিন্তা বা মনোজ্বালা।
২. এমন এক মুসীবতে আক্রান্ত হয়ে থাকা, যার বিনিময়ে কোনো সওয়াব হয় না।
৩. এমন নিন্দনীয় অবস্থায় পড়া, যা কখনো নন্দিত হয় না।
৪. এর ফলে আল্লাহ তা'আলা তার উপর ক্রুদ্ধ হন।
৫. তার জন্য রহমতের সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করেন-
أَلَا إِنَّ لِنِعَمِ اللَّهِ أَعْدَاءُ قِيلَ: مَنْ أَعْدَاءُ نِعَمِ اللهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ? قَالَ : الَّذِينَ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْ فَضْلِهِ.
শোন! আল্লাহর নেয়ামতসমূহেরও দুশমন আছে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আল্লাহর নেয়ামতের দুশমন কে? রাসূল ﷺ ইরশাদ করলেন, আল্লাহ তা'আলা মানুষকে যে নেয়ামত দান করেছেন এদের সাথে যারা হিংসা করে তারা।
হযরত মালেক ইবনে দিনার রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি অন্যদের ব্যাপারে ক্বারীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করি কিন্তু কোনো ক্বারীর ব্যাপারে অপর কোনো ক্বারীর সাক্ষ গ্রহণ করি না। কারণ, অধিকাংশ ক্বারী খুব হিংসুটে হয়ে থাকে।
টিকাঃ
৩৯১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬০৬৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৫৯; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৯৩৫।
৩৯২. তাফসীরে তবারী: খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-২৫১; তাফসীরে রাযী ২/২৭৬।
📄 হিসাব নিকাশের পূর্বেই জাহান্নামে গমন
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ: سِتَّةٌ بِسِتَّةِ يَدْخُلُونَ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَبْلَ الْحِسَابِ يَعْنِي سِتَّةُ أَصْنَافٍ، بِسَبَبٍ سِتَّةِ أَشْيَاءَ يَدْخُلُونَ النَّارَ قَبْلَ الْحِسَابِ، قِيلَ : يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ هُمْ? قَالَ : لَأُمَرَاءُ مِنْ بَعْدِي بِالْجَوْرِ، وَالْعَرَبُ بِالْعَصَبِيَّةِ، وَالدَّهَّاقِينَ بِالْكِبْرِ، وَالتَّجَّارُ بِالْخِيَانَةِ، وَأَهْلُ الرُّسْتَاقِ بِالْجَهَالَةِ، وَأَهْلُ الْعِلْمِ بِالْحَسَدِ، يَعْنِي الْعُلَمَاءَ الَّذِينَ يَطْلُبُونَ الدُّنْيَا، يَحْسُدُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, ছয় শ্রেণীর মানুষ ছয় কারণে কিয়ামতের হিসাব নিকাশের পূর্বেই জাহান্নামে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? তিনি বললেন-
১. আমার পরে আগত শাসকরা, তারা জাহান্নামে যাবে জুলুমের কারণে।
২. আরবরা সাম্প্রদায়িকতার কারণে।
৩. নেতারা, অহংকারের কারণে।
৪. ব্যবসায়ীরা খেয়ানতের কারণে।
৫. মূর্খরা অজ্ঞতার কারণে।
৬. আলেমরা হিংসার কারণে।
অর্থাৎ, দুনিয়াদার আলেমরা যারা দুনিয়ার কারণে পরস্পর হিংসা করে থাকে। সুতরাং আলেমের উচিত আখেরাতের উদ্দেশ্যে ইলম শিক্ষা করা। আলেম যখন ইলম অর্জন করে আল্লাহর সন্তুটি ও তার দীনের সেবা করার জন্য, তখন তার মনে কোনো হিংসা থাকে না। ফলে সে জাহান্নামী আলেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। আর যে আলেম দুনিয়ার জন্য ইলম অর্জন করে তার মনে হিংসা আসে। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইহুদী আলেমদের সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন,
أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ
অর্থ: নাকি আল্লাহ অন্যদেরকে (অর্থাৎ, মুহাম্মদ ﷺ) যে শ্রেষ্ঠত্ব (অর্থাৎ, নবুওয়াত) দান করেছেন তার জন্য তারা তাদেরকে হিংসা করছে?
টিকাঃ
৩৯৩. আল-ফিরদাউস লি-দাইলামী : হাদীস-৩৪১১।
৩৯৪. সূরা নিসা: আয়াত-৫৪
📄 আসমান ও জমিনের প্রথম গুনাহ
জনৈক দরবেশ বলেন, হিংসা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, হিংসা হলো আসমান ও জমিনের প্রথম গুনাহ। আসমানে সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, শয়তানের ঘটনা। ইবলীস শয়তান সর্বপ্রথম আল্লাহর নাফরমানী করে আসমানে যখন সে হিংসা করে বলেছিল
خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ
অর্থ: আমাকে আপনি তৈরি করেছেন আগুন দিয়ে আর তাকে তৈরি করেছেন মাটি দিয়ে।
আর জমিনের সর্বপ্রথম নাফরমানি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাবিল ও কাবিলের ঘটনা। আদমের পুত্র কাবিল, সে হিংসার বশে তার ভাই হাবিলকে খুন করে। আর এটাই ছিল দুনিয়াতে সংঘটিত প্রথম অপরাধ ও নাফরমানী। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ.
অর্থ: আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না। সে বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন।
টিকাঃ
৩৯৫. সূরা আল আরাফ: আয়াত-১২
৩৯৬. সূরা মায়েদা: আয়াত-২৭
📄 হিংসার ক্ষতিসমূহ
আহনাফ ইবনে কায়েস রহ. বলেন, হিংসুকের কোনো প্রশান্তি নেই, কৃপণের কোনো বিশ্বাস নেই, বিরক্তিকর মানুষের কোনো বন্ধু নেই, মিথ্যাবাদীর কোনো মানবিকতা নেই, বিশ্বাসঘাতকের কোনো মত নেই অর্থাৎ, তার গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং চরিত্রহীনের কোনো নেতৃত্ব নেই। অর্থাৎ, তা গ্রহণীয় না।
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, হিংসুক জালেম, তবে তার পরিণতি মজলুমের চেয়েও করুণ।
হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, আমি কাউকে কখনো পার্থিব কোনো কারণে হিংসা করিনি। কারণ, যাকে হিংসা করব সে হয়তো জান্নাতী, নয়ত জাহান্নামী। যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি কীভাবে তাকে হিংসা করব, অথচ সে জান্নাতী! আর যদি সে জাহান্নামী হয় তাহলে একজন জাহান্নামীকে কীভাবে আমি হিংসা করব, সে তো জাহান্নামে যাচ্ছে!
হযরত হাসান বসরী রহ বলেন- যাপ্ না আদমা লিমা তাহাসুদু আখাকা, ফাইনাল্লাজি আত্হুলাহু লিকারামাতিহি আলাইহি ফালিমা তাহাসুদু মান আকরামাহুল্লাহু তা’আলা, ওয়া ইন ইয়াকুন গাইরা যালিকা ফালা ইয়ানবাগি লাকা আন তাহসুদা মান মাসিরুহু ইলান্নার (يَا ابْنَ آدَمَ لِمَ تَحْسُدُ أَخَاكَ، فَإِنَّ الَّذِي أَعْطَاهُ اللهُ لِكَرَامَتِهِ عَلَيْهِ فَلِمَ تَحْسُدُ مَنْ أَكْرَمَهُ اللهُ تَعَالَى، وَإِنْ يَكُنْ غَيْرَ ذَلِكَ فَلَا يَنْبَغِي لَكَ أَنْ تَحْسُدَ مَنْ مَصِيرُهُ إِلَى النَّارِ)।
হে আদম সন্তান! তুমি তোমার ভাইকে হিংসা করছ কেন? কারণ, আল্লাহ যদি তাকে ভালো কিছু দান করে থাকেন, তাহলে এর অর্থ আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। তাহলে আল্লাহ যাকে সম্মানিত করেছেন তুমি তাকে কীভাবে হিংসা করতে পার? আর যদি ভিন্ন রকম হয়ে থাকে, তাহলে কেন এমন ব্যক্তিকে হিংসা করছ যে নাকি জাহান্নামে যাবে?
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন- ثَلَاثَةٌ لَا تُسْتَجَابُ دَعْوَتُهُمْ آكِلُ الْحَرَامِ، وَمِكْتَارُ الْغِيبَةِ، وَمَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ غِلَّ أَوْ حَسَدٌ لِلْمُسْلِمِينَ। তিন ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না। ১. সুদখোর। ২. অতিরিক্ত গীবতকারী। ৩. হিংসা বিদ্বেষ পোষণকারী।