📄 জারজ সন্তানের বৈশিষ্ট্য
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, 'জারজ সন্তান কখনো অন্যের কথা হজম করতে পারে না। আর ভদ্র লোক কখনো তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না' (وَلَدُ الزِّنَى لَا يَكْتُمُ الْحَدِيثَ ، وَذُو الْحَسَبِ فِي قَوْمِهِ لَا يُؤْذِي جَارَهُ)। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোনো কথা গোপন রাখতে পারে না, বরং লোকদের নিকট সব বলে দেয়, সে জারজ সন্তান। কেননা, যদি সে জারজ সন্তান না হতো, তাহলে কথা গোপন রাখতে পারতো। যেমন নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে-
هَمَّازٍ مَشَاءٍ بِنَمِيمٍ مَنَّاعٍ لِلْخَيْرِ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ عُتُلٍ بَعْدَ ذَلِكَ زَنِيمٍ
অর্থ: পিছনে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়, যে কল্যাণকর্মে বাধা দান করে, যে সীমালঙ্ঘনকারী, গুনাহগার, রূঢ় স্বভাবের এবং তদুপরি কুখ্যাত।
এই আয়াতে মূলত ওলীদ ইবনে মুগীরার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সে নিন্দা করত, চোগলখোরী করত এবং ভালোকাজে বাঁধা দিতো। সে যেহেতু জারজ সন্তান ছিল তাই আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক চোগলখোরীকে জারজ সন্তানের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন।
জনৈক দরবেশের নিকট তার এক সাথী সাক্ষাৎ করতে এলো এবং তার নিকট অপর এক সাথীর দোষচর্চা করল। তিনি বললেন, তুমি অনেক দিন পর আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে তিনটি খারাপ কাজ করেছ। যথা- ১. আমার মনে আমার বন্ধু সম্পর্কে মন্দ ধারণা সৃষ্টি করেছ। ২. আমার মুক্ত হৃদয় কে ব্যস্ত করে দিয়েছ। ৩. নিজেকে মিথ্যার সাথে জড়িয়ে নিয়েছ।
টিকাঃ
৩৮১. সূরা কলাম: আয়াত-১১
৩৮২. সূরা কলাম: আয়াত-১১-১৩
📄 চোগলখোরী অনাবৃষ্টির কারণ
হযরত কা'ব আল-আহবার রহ. থেকে বর্ণিত। বনী ইসরাঈলের মাঝে একবার দুর্ভিক্ষ ও খরা দেখা দিল। মূসা আ. সবাইকে নিয়ে পর পর তিনবার ইস্তেসকার নামায আদায় করলেন। কিন্তু তারপরও বৃষ্টি হলো না। মূসা আ. আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে আল্লাহ! আপনার বান্দারা আপনার নিকট তিনবার বৃষ্টি চেয়ে দোয়া করল। আপনি তো সাড়া দিলেন না। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন, আমি তোমার এবং তোমার সাথীদের দোয়া কবুল করতে পারব না। কারণ, তোমাদের মাঝে একজন চোগলখোর আছে, যে সর্বদা চোগলখরী করে যাচ্ছে। মূসা আ. আরজ করলেন, কে সে ব্যক্তি? আমাকে জানিয়ে দিন, যাতে আমরা তাকে আমাদের মাঝ থেকে বের করে দিতে পারি। আল্লাহ বললেন, মূসা! আমি তোমাদেরকে চোগলখোরী হতে বারণ করে নিজে চোগলখোর হব? তোমরা সবাই তাওবা কর। তখন সবাই তাওবা করলে বৃষ্টি নেমে এলো।
📄 চোগলখোর কখনো সত্যবাদী হয় না
বর্ণিত আছে, একবার আমীরুল মুমিনীন সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেক দরবারে বসা ছিলেন। সেদিন তার দরবারে ইমাম যুহরীও উপস্থিত ছিলেন। তখন এক ব্যক্তি দরবারে প্রবেশ করলে বাদশাহ তাকে বললেন, শুনেছি তুমি আমার নামে নানান কথা বলো? সে বলল, না, আমি আপনার ব্যাপারে কিছু বলিনি। বাদশাহ সুলাইমান বললেন, যে আমাকে এই তথ্য দিয়েছে, সে সত্যবাদী লোক। একথা শুনে ইমাম যুহরী সাথে সাথে বললেন, না, চোগলখোর কখনো সত্যবাদী হতে পারে না। শুনে বাদশাহ বলল, আপনি সত্য বলেছেন। যাও, তোমার কোনো ভয় নেই। জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, যে তোমাকে সংবাদ দেয় যে, তোমার ভাই তোমার গীবত করছে, তাহলে বুঝবে মূলত সেই তোমার গীবত করছে। হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. বলেন, তোমার মাঝে যেই গুণ নেই কেউ যদি তোমাকে সে গুণের জন্য প্রশংসা করে, তাহলে তার ব্যাপারে নিশ্চিত থেকো না। কেননা, তোমার যে দোষ নেই, সে তোমাকে সে দোষে দোষী করতে পারে।
📄 চোগলখোরের মুখোমুখি হলে করণীয়
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তোমার নিকট এসে বলে, আপনার সাথে অমুকে এই এই আচরণ করেছে বা বলে, আপনার সম্পর্কে সে নানান খারাপ মন্তব্য করেছে, তাহলে তোমার কর্তব্য হলো ছয়টি কাজ করা। যথা-
১. তাকে বিশ্বাস না করা। কারণ, চোগলখোরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصِبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমাদের নিকট যদি কোনো ফাসেক কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই কর। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো জাতিকে আক্রান্ত না করে ফেল। ফলে তার জন্য পরে তোমাদের অনুতাপ করতে হবে।
২. তাকে সে কাজ থেকে নিষেধ করা। কারণ, অসৎ কাজের নিষেধ করা মুমিনের কর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ অর্থ: তোমরা হলে শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাকে ঘৃণা করবে। কারণ, সে নাফরমান। আর নাফরমানকে ঘৃণা করা ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন।
৪. তুমি তোমার অনুপস্থিত কোনো ভাই সম্পর্কে মন্দ ধারণা করবে না। কারণ, কোনো মুসলিম সম্পর্কে মন্দ ধারণা হারাম। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ অর্থ: কোনো কোনো ধারণা গুনাহ।
৫. এই বিষয়ে আর ঘাঁটি-ঘাঁটি করবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তা করতে নিষেধ করেছেন। (লা তাজাস্সাসু)
৬. চোগলখোরের যে বিষয় তুমি অপছন্দ করছ, তা থেকে নিজেও বিরত থাকবে। অর্থাৎ, এ চোগলখোর তোমার কাছে যে সংবাদ নিয়ে এসেছে তুমি অন্যের কাছে তা নিয়ে যাবে না।
টিকাঃ
৩৮৩. সূরা হুজুরাত; আয়াত-৬
৩৮৪. সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১১০
৩৮৫. সূরা হুজুরাত: আয়াত-১২