📄 নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের সমালোচনা গীবত
বলা হয়, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দলের সমালোচনা করলেই কেবল গীবত হয়। সুতরাং অনির্দিষ্ট কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সমালোচনা করলে সেটা গীবত হবে না। যেমন কেউ বলল, অমুক শহরের লোকেরা কৃপণ অথবা তারা মন্দ। একথা বলার দ্বারা গীবত হবে না। তবে এই ধরনের সমালোচনা থেকেও বিরত থাকা উত্তম।
বর্ণিত আছে, এক দরবেশ তার স্ত্রীর জন্য কিছু তুলা কিনে আনলে, তার স্ত্রী বলল, তুলা বিক্রেতারা সব বাটপার, তারা আপনার সাথে খেয়ানত করেছে। সাথে সাথে তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি এমন করলেন কেন? তিনি বললেন, আমার আত্মমর্যাদা রয়েছে। আমার ভয় হয় যে, কিয়ামতের দিন সব তুলা ব্যবসায়ীরা আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করবে। ফলে লোকে বলাবলি করবে যে, অমুকের স্ত্রীর বিরুদ্ধে তুলা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছে। একারণে তাকে আমি তালাক দিয়েছি।
📄 যাদের সমালোচনা গীবত হবে না
তিন ব্যক্তির সমালোচনা গীবত বলে বিবেচিত হবে না। ১. سُلْطَانُ جَائِرٌ অর্থাৎ, অত্যাচারী শাসক। ২. وَفَاسِقٌ مُعْلِنٌ অর্থাৎ, প্রকাশ্য গুনাহকারী। ৩. وَصَاحِبُ بِدْعَةٍ অর্থাৎ, বিদআতী।
অর্থাৎ, যদি তাদের কর্মের এবং ধর্মের সমালোচনা করা হয় তাহলে তা গীবত হবে না। কারণ, মানুষকে সতর্ক করার জন্য তাদের সমালোচনা করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি তাদের শারীরিক বা ব্যক্তিগত কোনো ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করা হয়, তাহলে তা আবার গীবত হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
اذْكُرُوا الْفَاجِرَ بِمَا فِيهِ لِكَيْ يَحْذَرَهُ النَّاسُ
গুনাহচারীর গুনাহের সমালোচনা কর, যাতে মানুষ তার সম্পর্কে সাবধান হয়ে যায়。
টিকাঃ
৩৭৩. আল-কামেল: ২/১৭৩; সুনানে বাইহাকী : ১০/২১০; আল-মাজরুহীন লিইবনে হিব্বান: ১/২২০। সুযুতি, আলবানী ও ইবনুল জাওযীপ্রমুখ হাদীসটিকে জয়ীফ বলেছেন।
📄 গীবতের প্রকারভেদ
গীবত চার প্রকার। যথা- ১. এক প্রকার গীবত, যার ফলে মানুষ কাফের হয়ে যায়। ২. আরেক প্রকার গীবত, যার ফলে মানুষ মুনাফিক হয়ে যায়। ৩. আরেক প্রকার গীবত, যা না ফরমানী। ৪. আরেক প্রকার গীবত, যা মুবাহ ও সওয়াবের কাজ।
যে গীবতের ফলে মানুষ কাফের হয়ে যায় তা হলো, কোনো মুসলমানের গীবত করা হলে কেউ তাকে বারণ করল আর সে বলল, গীবত নয়, আমি যা বলছি সত্যিই বলেছি। কারণ, এর ফলে আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল গণ্য করা হয়। আর আল্লাহ যা হারাম করেছেন তাকে হালাল গণ্য করা কুফুরী।
যে গীবতের ফলে মানুষ মুনাফিক হয়ে যায়, তাহলো নাম উল্লেখ না করে এমন ব্যক্তির নিকট সমালোচনা করা যে, বুঝতে পারে কার সমালোচনা করা হলো। গীবতকারী মনে করে, সে গীবত করছে না, অথচ সে গীবত করছে। এটা এক ধরনের মুনাফিকী।
আর যে গীবত নাফরমানী বা গুনাহের কাজ বলে গণ্য তা হলো, নাম ধরে কারো সমালোচনা করা। এটা স্পষ্ট গুনাহ। যে এ কাজ করবে তার অবশ্যই তাওবা করা উচিত।
আর মুবাহ ও বৈধ গীবত হলো, প্রকাশ্যে গুনাহকারীর গুনাহের সামালেচনা করা বা বেদআতির ধর্ম-কর্মের সামালচনা করা। এই সমালোচনা বৈধ। বরং এই সমালোচনা করে মানুষকে তাদের সম্পর্কে সাবধান করা সওয়াবের কাজ। যেমন রাসূল ইরশাদ করেন, গুনাহগারের গুনাহের সমালোচনা কর, যাতে মানুষ তার সম্পর্কে সাবধান হতে পারে।
📄 এক নবীর ঘটনা
ফকীহ রহ. বলেন, আমার পিতার মুখে শুনেছি, সব নবীই রাসূল হতেন না। অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফেরেশতা তাদের নিকট ওহী নিয়ে আসত না। বরং স্বপ্নযোগে বা গায়েবী আওয়াজ দিয়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাদেরকে জানানো হতো। তেমন এক নবীর ঘটনা। এক রাতে স্বপ্নে তাকে বলা হলো, সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে জিনিসটি দেখতে পেলো তা খেয়ে ফেলবে, দ্বিতীয় যে জিনিসটি দেখতে পাবে তাকে লুকিয়ে রাখবে, তৃতীয় যে জিনিসটি দেখতে পাবে তা গ্রহণ করবে, চতুর্থ যে জিনিসটি দেখতে পাবে তাকে হতাশ করবে না এবং পঞ্চম যে জিনিসটি দেখতে পাবে তার কাছ থেকে ছুটে পালিয়ে আসবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তিনি যে জিনিসটি দেখতে পেলেন তা ছিলো একটি বিশাল কালো পাহাড়। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। আমার রব আমাকে তা খাওয়ার নির্দেশ করেছেন। তারপর মনে মনে ভাবলেন, আমার রব আমাকে অসম্ভব কাজের নির্দেশ দেননি। যখন খাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি পাহাড়টির দিকে এগিয়ে গেলেন, পাহাড়টি ছোট হতে লাগল। তার নিকট পৌঁছতে-পৌঁছতে তা এক মুঠো খাবারের মত হয়ে গেল। তিনি খেয়ে ফেললেন। তা ছিলো, মধুর চেয়ে বেশি মিষ্টি। খেয়ে তিনি আল্লাহর শুকর আদায় করলেন এবং সামনে চললেন। সামনে তিনি একটি স্বর্ণের পাত্র পেলেন। তিনি মনে মনে বললেন, দ্বিতীয়টি গোপন করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। তাই তিনি মাটি খুঁড়ে সোনার পাত্রটি পুঁতে রাখলেন। কিন্তু সাথে সাথে তা আবার মাটির উপর উঠে গেল। তিনি দুই কি তিনবার এভাবে করার পর এই বলে সামনে অগ্রসর হলেন, আমাকে যা আদেশ করা হয়েছিল তা আমি পালন করেছি। এভাবে সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি দেখতে পেলেন একটি পাখি এবং তার পিছনে একটি বাজ পাখি শিকার করার জন্য ছুটছে। পাখিটি তাকে দেখেই বলল, হে আল্লাহর নবী, আমাকে সাহায্য করুন। তিনি পাখিটিকে নিয়ে তার আস্তিনের ভেতর রাখলেন। তখন বাজটি তার নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর নবী, আমি ক্ষুধার্ত, সকাল থেকে আমি এই পাখিটির পিছনে ছুটছি। আমাকে আমার রিযিক থেকে বঞ্চিত করবেন না। তিনি মনে মনে ভাবলেন, আমাকে তৃতীয় বস্তুটি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমি করেছি। আর চতুর্থটিকে নিরাশ না করার কথা ছিল। এই বাজই হলো, চতুর্থ। এখন আমার কী করণীয়? তখন তিনি ছুরি নিয়ে নিজের শরীর থেকে এক টুকরো মাংস কেটে বাজের দিকে ছুড়ে মারলেন। বাজ সে মাংসের টুকরো নিয়ে উড়ে গেল এবং তিনি পাখিটিকে ছেড়ে দিলেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হলে পঞ্চম জিনিসটির দেখা পেলেন। তিনি দেখতে পেলেন একটি পচা লাশ পড়ে আছে। তার মনে পড়ল, পঞ্চমটি থেকে ছুটে পালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই তিনি ছুটে পালালেন।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে তিনি প্রার্থনা করলেন, হে রব! আপনি আমাকে যা আদেশ করেছেন আমি তা পালন করেছি। এখন আমাকে এই রহস্য বর্ণনা করুন। রাতের বেলায় তিনি স্বপ্নে দেখলেন তাকে বলা হলো-
প্রথমত যে জিনিসটি তুমি খেয়েছ তা হলো ক্রোধ যা, শুরুতে পাহাড়ের মত বড় হয়। কিন্তু যদি ক্রোধ দমন করা যায় এবং তার উপর ধৈর্যধারণ করা হয়, তাহলে তার ফল মধুর চেয়েও মিষ্টি হয়।
দ্বিতীয় স্বর্ণের পাত্রটি হলো, নেক আমল। তাকে যতই লুকিয়ে রাখা হোক তা প্রকাশ পাবেই。
তৃতীয়টি হলো, আমানত। কেউ যদি তোমার নিকট কোনো আমানত রাখে তাহলে কোনো অবস্থাতেই তার খেয়ানত করবে না。
চতুর্থ বিষয় হলো, অভাবীর প্রার্থনা। কোনো মানুষ যদি তোমার নিকট কিছু চায় তাহলে যথাসাধ্য তা দেওয়ার চেষ্টা করবে。
পঞ্চমটি হলো, গীবত। অতএব, যারা গীবত করে তাদের থেকে দ্রুত দূরে সরে যাবে। আল্লাহই ভালো জানেন।