📄 গীবত শুকরের গোশত ভক্ষণ থেকেও নিকৃষ্টতর
হযরত খালেদ রবঈ রহ. বলেন, একদা আমি মসজিদে বসা ছিলাম। তখন শুনতে পেলাম একদল লোক এক ব্যক্তির নিন্দা করছে। আমি তাদেরকে বারণ করলে তারা তাকে বাদ দিয়ে অন্য আরেক লোকের নিন্দা করতে শুরু করল। তারা আবার পুনরায় প্রথম জনের নিন্দা শুরু করলে এই বার আমি তাদের সাথে যোগ দিয়ে তার কিছু দোষের কথা উল্লেখ করলাম। সে রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, কালো লম্বা এক লোক একটি থালায় কিছু শুকরের মাংস নিয়ে আমার সামনে এসে উপস্থিত হয়ে আমাকে সে মাংস খাওয়ার আদেশ করছে। আমি বললাম, শুকরের মাংস খাব? আল্লাহর কসম আমি তা খাব না। তখন সে আমাকে কঠিন ধমক দিলে আমি আতঙ্কিত হয়ে তা খেতে শুরু করলাম আর সে জোর করে আমার মুখে সে মাংস ঠেলে দিতে লাগল। এরপর ত্রিশ কিংবা চল্লিশ দিন পর্যন্ত কোনো খাবার খেতে গেলেই সে মাংসের বিস্বাদ ও দুর্গন্ধ পেতাম।
📄 জবানের হেফাজত
হযরত সুফইয়ান ইবনুল হুসাইন রহ. বলেন, একদা আমি হযরত ইয়াস ইবনে মুআবিয়া রহ.-এর সাথে বসা ছিলাম। তখন পথ দিয়ে একটি লোক অতিক্রমকালে আমি তার কিছু দোষ চর্চা করলাম। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, চুপ কর। তারপর তিনি বললেন, রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ? আমি বললাম- না। তিনি বললেন, রোমান ও তুর্কীরা তোমার হাত থেকে রক্ষা পেল। কিন্তু তোমার এই মুসলিম ভাইটি তোমার হাত থেকে রক্ষা পেল না। তিনি বলেন, এরপর আর কখনো কারো গীবত করিনি আমি।
হযরত হাতিম যাহিদ রহ. বলেন, কোনো মজলিসে যদি এই তিনটি বিষয় থাকে তাহলে সে মজলিস আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। ১. দুনিয়ার আলোচনা। ২. হাসি-তামাশা ৩. গীবত।
হযরত ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুআয রহ. বলেন, মুমিন হতে হলে কমপক্ষে তিনটি গুণ থাকতে হবে। ১. اَنَّكَ إِنْ لَمْ تَنْفَعْهُ فَلَا تَضُرُّه অর্থাৎ, মানুষের উপকার করতে না পারলেও তার কোনো ক্ষতি না করা। ২. إِنْ لَمْ تَسُرُّهُ فَلَا تَغْمُّهُ অর্থাৎ, মানুষকে খুশী করতে না পারলেও তাকে কষ্ট না দেওয়া। ৩. إِنْ لَمْ تَمْدَحْهُ فَلَا تَذْمَّهِ অর্থাৎ, অন্যের প্রশংসা না করতে পারলেও, নিন্দা না করা।
হযরত মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, প্রতিটি মজলিসে একদল ফেরেশতা থাকেন। যখন কেউ কারো ভালো কিছু আলোচনা করে তখন সে ফেরেশতারা বলতে থাকেন, তাকে এবং তোমাকে আল্লাহ এর সওয়াব দান করুন। আর যখন কেউ কারো দোষ চর্চা করে, তখন ফেরেশতাগণ বলেন, আল্লাহ যার দোষ ঢেকে রেখেছেন তুমি তার দোষের চর্চা করছ? নিজের কথা চিন্তা কর এবং আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় কর। তিনি তো তোমার দোষ ঢেকে রেখেছেন।
বর্ণিত আছে, একবার হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম রহ.-কে এক অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হলো। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। ইত্যবসরে শুনতে পেলেন, এক ব্যক্তি বলছে অমুকে তো আসেনি। তখন অপর আরেকজন বলল, লোকটি বেশ অলস। তখন ইবরাহীম বিন আদহাম বললেন, এ হলো, আমার পেটের কারসাজি। পেটই আমাকে এমন মজলিসে নিয়ে এসেছে যেখানে গীবত চর্চা হয়। এই বলে তিনি উঠে গেলেন। এরপর পেটকে শায়েস্তা করার জন্য তিনি অনবরত তিন দিন রোযা রাখলেন।
জনৈক আরেফ বলেন, যদি তোমার তিনটি কাজ করার সাধ্য না থাকে তাহলে অন্তত অপর তিনটি কাজ কর।
১. إِ نْ ضَعُفْتَ عَنِ الْخَيْرِ فَامْسِكْ عَنِ الشَّرِّ অর্থাৎ, যদি ভালো কাজ করতে না পার তাহলে অন্তত মন্দ কাজ থেকে বিরত থাক।
২. وَإِنْ كُنْتَ لَا تَسْتَطِيعُ أَنْ تَصُومَ فَلَا تَأْكُلْ لُحُومَ النَّاسِ অর্থাৎ, যদি রোযা রাখতে না পার তাহলে অন্তত মানুষের মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকো।
৩. وَإِنْ كُنْتَ لَا تَسْتَطিيعُ أَنْ تَنْفَعَ النَّاسَ فَامْسِكْ عَنْهُمْ ضُرَّكَ অর্থাৎ, যদি মানুষের উপকার করতে না পার অন্তত মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাক।
হযরত ওয়াহাব মাক্কী রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, গীবত থেকে বেঁচে থাকা দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ দান করার চেয়েও উত্তম। অনুরূপ দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ দান করার চেয়ে আমার নিকট উত্তম হলো, আল্লাহ যার দিকে দৃষ্টি দিতে বারণ করেছেন তার প্রতি দৃষ্টি পাত না করা। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত দুটি পাঠ করলেন-
وَلَا يَغْتَب بَعْضُكُم بَعْضًا অর্থ: তোমরা পরস্পর গীবত কর না।
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ অর্থ: আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে।
📄 গীবত থেকে তাওবা
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, গীবত কারীর তাওবা সম্পর্কে ফকীহদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, যার গীবত করা হয়েছে তার থেকে মাফ না নেওয়া পর্যন্ত তার তাওবা কবুল হবে না। আবার কেউ বলেন, ব্যক্তির নিকট ক্ষমা না নিলেও তার তাওবা হবে। এর দুইটি সূরত রয়েছে। যথা-
১. যার গীবত করা হয়েছে গীবতের ব্যাপারটি যদি তার কানে পৌঁছে, তাহলে তার নিকট থেকে মাফ নিয়ে নিতে হবে। আর এটাই এই অপরাধের তাওবা।
২. আর যদি ব্যাপারটি তার কানে না পৌঁছে থাকে, তাহলে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চেয়ে নেওয়া এবং মনে মনে এই কর্ম পুনরায় না করার প্রতিজ্ঞা করা。
বর্ণিত আছে, ইবনে সীরীন রহ.-এর নিকট এসে এক ব্যক্তি বলল, আমি আপনার গীবত করেছি, আপনি আমাকে হালাল করে দিন অর্থাৎ, মাফ করে দিন। তিনি বললেন, চমৎকার তো! আল্লাহ যা হারাম করেছেন, আমি তা হালাল করব কীভাবে? এ কথা বলে তিনি মাফ করার পাশাপাশি আল্লাহর দরবারে তাওবা ও ইস্তেগফারের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আর যদি গীবতের কথা তার নিকট না পৌঁছে তাহলে তাকে জানিয়ে মাফ নিতে হবে না, বরং আল্লাহর নিকট তাওবা করলেই হবে। কারণ, এতে তার মনে কষ্ট আসতে পারে।
📄 অপবাদ চর্চা থেকে তাওবা
কেউ যদি কারো নামে মিথ্যে অপবাদ তথা বুহতান চর্চা করে তাহলে তার তাওবার তিনটি সুরত। যথা-
১. যাদের নিকট মিথ্যা অপবাদ বলা হয়েছে, তাদের নিকট গিয়ে বলা যে, আমি অমুকের নামে অমুক কথা বলেছি তা মিথ্যা ছিল। তার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই。
২. যার নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে তার নিকট গিয়ে দোষ স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া。
৩. আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া এবং তাওবা করা। কারণ, বুহতান বা অপরের নামে মিথ্যা অপবাদ হলো, অন্যতম কঠিন গুনাহ। অন্যান্য গুনাহের তাওবা হলো, একবার আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু বুহতান-এর তাওবার জন্য তিনজনের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা বুহতান কে কুফরীর সাথে যুক্ত করে বলেছেন-
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ অর্থ: তোমরা নাপাকী অর্থাৎ, মুর্তিপূজা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা বলা বর্জন কর।
টিকাঃ
৩৭২. সূরা হজ্ব: আয়াত-৩০