📄 কামেল মুসলমান সে যে মিথ্যা বলে না
হযরত মালেক রহ. বলেন, একদা লোকমান হাকীমকে জিজ্ঞেস করা হলো, কীভাবে আপনি এই স্তর অর্জন করলেন? তিনি বললেন, صِدْقُ الْحَدِيثِ، وَأَدَاءُ الْأَمَانَةِ، وَتَرْكُ مَا لَا يَعْنِينِي অর্থাৎ, সত্যকথন, আমানত রক্ষা এবং অনর্থক বিষয়াদি বর্জনের মাধ্যমে।
عَنْ صَفْوَانَ بْنِ سُلَيْمٍ أَنَّهُ قَالَ : قِيلَ يَا رَسُولَ اللهِ، أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ جَبَانًا؟ قَالَ : نَعَمْ. فَقِيلَ لَهُ: أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ بَخِيلًا ؟ قَالَ : نَعَمْ قِيلَ لَهُ أَيَكُونُ الْمُؤْمِنُ كَذَّابًا؟ قَالَ : لَا.
হযরত সাফওয়ান ইবনে সালিম রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হলো, মুমিন কি ভীরু হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। মুমিন কি কৃপণ হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। মুমিন কি কায্যাব (মিথ্যুক) হতে পারে? তিনি বললেন, না।
টিকাঃ
৩৪৯. শরহুস সুন্নাহ, যুরকানী ৪/৩১৭; জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১/১১৬।
৩৫০. মুয়াত্তা মালেক: হাদীস-২৮৩২;, মাকারিমুল আখলাক: হাদীস-১৪৭। হাদীসটি মুরসালে হাসান। শায়েখ আরনাউত সনদটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 জান্নাতের দায়িত্ব
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: اضْمَنُوا سِتًّا مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَضْمَنُ لَكُمُ الْجَنَّةَ: اصْدُقُوا إِذَا حَدَّثْتُمْ، وَأَوْفُوا إِذَا وَعَدْتُمْ، وَأَدُّوا إِذَا ائْتُمِنْتُمْ، وَاحْفَظُوا فُرُوجَكُمْ وَغُضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ.
হযরত উবাদা ইবনে সামেত রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, তোমরা নিজেদের ছয়টি বিষয়ের দায়িত্ব নাও, আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নিব। যথা-
১. যখন কথা বলবে তখন সত্য বলবে।
২. ওয়াদা করলে তা পূরণ করবে।
৩. তোমাদের নিকট কোনো আমানত রাখা হলে তা আদায় করবে।
৪. তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে।
৫. দৃষ্টি অবনত রাখবে।
৬. হাতকে সংযত রাখবে।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, এই ছয় বিষয়ের উল্লেখ করে রাসূল ﷺ মূলত সমস্ত নেক আমলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। প্রথমে তিনি ইরশাদ করেছেন, যখন কথা বলবে তখন সত্য বলবে। এতে কালেমায়ে শাহাদাতের ব্যাপারে সত্য বলা এবং মানুষের সাথে সাধারণ কথা বলায় সত্য বলা দুটিই অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যখন তুমি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু (আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই) এই কথা বলবে তখন তা মন থেকে বলবে, সত্য করে বলবে। অনুরূপ মানুষের সাথে যখন কথা বলবে, তখনও সত্য বলবে। অতঃপর তিনি ইরশাদ করেছেন, ওয়াদা করলে তা পূরণ করবে। এখানে দুটি ওয়াদার কথা বলা হয়েছে। ১. আল্লাহর সাথে ওয়াদা। ২. মানুষের সাথে ওয়াদা। আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করার অর্থ হলো, মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের উপর অবিচল থাকা। মানুষের সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করার অর্থ হলো, যে কোনো মানুষের সাথে করা যাবতীয় ওয়াদা পূরণ করা।
এরপর তিনি ইরশাদ করেন, তোমরা আমানত রক্ষা কর। এটাও দু'প্রকার। যথা- ১. একটা হলো আল্লাহ ও বান্দার মাঝে। ২ অপরটি হলো, বান্দা ও বান্দার মাঝে। প্রথমটি সেসব দায়িত্ব যেগুলো বান্দার করা আবশ্যক। এটা তার নিকট আল্লাহর আমানত। সুতরাং এগুলো যথাসময়ে পালন করা বান্দার উপর ফরয। দ্বিতীয়টি হলো, সে সব আমানত যেগুলো একজন অপর জনের নিকট রাখে। যেমন- টাকা-পয়সা, গোপন কথা ইত্যাদি। এগুলোও যথাসময়ে রক্ষা করা বান্দার কর্তব্য।
এরপর তিনি ইরশাদ করেন, তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত কর। হেফাজত দুই ধরনের। ১. লজ্জাস্থানকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে হেফাজত করা। ২. লজ্জাস্থানকে অন্যের নজর থেকে হেফাজত করা। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, 'দৃষ্টিদানকারী এবং যার প্রতি দৃষ্টি পড়ল-তাদের উভয়ের উপর আল্লাহর লানত' (لَعَنَ اللَّهُ النَّاظِرَ وَالْمَنْظُورَ إِلَيْهِ)। সুতরাং এস্তেঞ্জা করার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যার জন্য তার লজ্জাস্থান দর্শন জায়েয নয় এমন কারো নজর যেন সে স্থানে না পড়ে।
এরপর রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমাদের দৃষ্টি অবনত রাখবে। অর্থাৎ, যে সব অঙ্গের দিকে তাকানো হারাম সে সব অঙ্গের দিকে তাকানো এবং নারীর সৌন্দর্যের দিকেও তাকাবে না ও দুনিয়ার দিকে লোভের দৃষ্টি দেবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ
অর্থ: তুমি তোমার চক্ষুদ্বয় কখনো প্রসারিত কর না তার প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসাবে দিয়েছি। তা দ্বারা তাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য। অবশেষে রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, তোমাদের হাত সামলে রাখবে। অর্থাৎ, হারাম কোনো বস্তুর দিকে হাত বাড়াবে না।
টিকাঃ
৩৫১. মুসনাদে আহমাদ ৩৭/৪১৭; মুসতাদরাকে হাকেম ৪/৩৫৮; সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস-২৭১। শায়েখ শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
৩৫২. সুনানে বায়হাকী ৭/৯৯; মারাসিলে আবূ দাউদ হাদীস-৪৯৮; আল কামেল লি ইবনে আদী: ১/৫৩৮। ইবনে আদী, মুল্লা আলী কারী, আজলুনী, শায়েখ বিন বায ও আলবানীসহ অনেকের মতে হাদীসটি জাল/বাতিল। (কাশফুল খফা: ২/৫৫২)।
৩৫৩. সূরা ত্বহা: আয়াত-১৩১
📄 নেফাকের আলামত থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য
হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ-এর যুগে কেউ মিথ্যে বললে তাকে মুনাফিক গণ্য করা হতো। অথচ আমি তোমাদের মুখে অহরহ তা শুনতে পাচ্ছি। মিথ্যা বলা মুনাফিকীর আলামত। সুতরাং মুমিনের উচিত মিথ্যা না বলা এবং নিজেকে মুনাফিক হওয়া থেকে হেফাজত করা।
📄 কয়েকটি বড় গুনাহের সাজা
عَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا صَلَّى الْغَدَاةَ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ، فَقَالَ لِأَصْحَابِهِ : هَلْ رَأَى أَحَدٌ مِنْكُمُ اللَّيْلَةَ رُؤْيَا؟ فَيَقُصُّ عَلَيْهِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَقُصَّ رُؤْيَاهُ عَلَيْهِ، وَإِنَّهُ قَالَ لَنَا ذَاتَ غَدَاةٍ : هَلْ رَأَى أَحَدٌ مِنْكُمُ اللَّيْلَةَ رُؤْيَا، فَقُلْنَا: لَا. قَالَ: لَكِنِّي أَنَا رَأَيْتُ اللَّيْلَةَ أَنَّهُ أَتَانِي اثْنَانِ وَأَنَّهُمَا أَخَذَا بِيَدِي فَقَالَا لِي: انْطَلِقُ فَانْطَلَقْتُ مَعَهُمَا، فَأَخْرَجَانِي إِلَى أَرْضٍ مُسْتَوِيَةٌ، فَأَتَيْنَا عَلَى رَجُلٍ مُضْطَجِعِ وَآخَرَ قَائِمٍ عَلَيْهِ بِصَخْرَةٍ، فَإِذَا هُৱ يَهْوِي بِالصَّخْرَةِ عَلَى رَأْسِهِ فَيَبْلَغُ بِهَا رَأْسَهُ، فَيَتَدَهْدَهُ الْحَجَرُ فَيَتْبَعُهُ وَيَأْخُذُهُ فَلَا يَرْجِعُ إِلَيْهِ حَتَّى يَصِحَ رَأْسَهُ كَمَا كَانَ، فَيَعُودُ عَلَيْهِ رَجُلٌ مُسْتَلْقٍ عَلَى قَفَاهُ، وَإِذَا آخَرُ قَائِمٌ عَلَيْهِ بِكَلُوبٍ مِنْ حَدِيدٍ، فَإِذَا هُৱ يَأْتِي أَحَدَ شِقَيْ وَجْهِهِ فَيَشُقُّ شِدْقَهُ حَتَّى يَبْلُغَ إِلَى قَفَاهُ وَمِنْخَرِهِ، ثُمَّ يَتَحَوَّلُ إِلَى الْجَانিবِ الْآخَرِ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ ذَلِكَ فَلَا يَفْرُغُ مِنْهُ حَتَّى يَصِحٌ الْجَانِبُ الْأوَّلُ كَمَا كَانَ، فَيَعُودُ إِلَيْهِ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ ذَلِكَ قَالَ : قُلْتُ : سُبْحَانَ اللَّهِ مَا هُذَا؟ قَالَا لِي : انْطَلِقُ فَانْطَلَقْتُ حَتَّى انْتَهَيْنَا عَلَى بِنَاءِ رَأْسِهِ مِثْلَ التَّنُّورِ، وَأَسْفَلُهُ وَاسِعٌ. قَالَ : فَاطَّلَعْتُ فَإِذَا فِيهِ رِجَالٌ وَنِسَاءٌ عُرَاةٌ، فَإِذَا هُمْ يَأْتِيهِمْ لَهَبُ مِنْ أَسْفَلِ مِنْهُمْ، فَإِذَا أُوقِدَ ارْتَفَعُوا حَتَّى يَكَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا، فَإِذَا خَمَدَتَ رَجَعُوا فِيهَا، فَلَمَّا جَاءَهُمْ ذَلِكَ اللَّهَ بُصَوَّتُوا. يَعْنِي صَاحُوا فَقُلْتُ: سُبْحَانَ اللهِ مَا هَؤُلَاءِ؛ قَالَا لِي: انْطَلِقُ فَانْطَلَقْنَا حَتَّى أَتَيْنَا عَلَى نَهْرٍ مُعْتَرِضٍ، فِيهِ مَاءً أَحْمَرَ لا مِثْلَ الدَّمِ، فَإِذَا فِيهِ، رَجُلٌ يَسْبَحُ وَإِذَا عَلَى شَاطِئِ النَّهْرِ رَجُلٌ قَدْ جَمَعَ حِجَارَةً كَثِيرَةٌ، قَالَ: فَيَأْتِيهِ السَّابِحُ فَيَفْغُرُ أَيْ يَفْتَحُ لَهُ فَاهُ فَيُلْقِمُهُ حَجَرًا، قَالَ : قُلْتُ: سُبْحَانَ اللهِ مَا هُذَا؟ قَالَا لِي : انْطَلِقُ فَأَتَيْنَا عَلَى رَজُلٍ، فَإِذَا هُৱ حَوْلَهُ نَارُ عَظِيمَةٌ يَهُشُهَا، وَيَسْعَى حَوْلَهَا، فَقُلْتُ: سُبْحَانَ اللهِ مَا هُذَا؟ فَقَالَا لِي: انْطَلِقُ فَانْطَلَقْنَا فَأَتَيْنَا عَلَى رَوْضَةٍ فِيهَا مِنْ كُلِّ نُورِ الرَّبِيعِ، فَإِذَا بَيْنَ ظَهْرَانِي الرَّوْضَةِ رَجُلٌ طَوِيلٌ، وَإِذَا حَوْلَ ذَلِكَ الرَّجُلِ وِلْدَانٌ كَثِيرٌ، مِنْ أَكْثَرِ مَا رَأَيْتُمْ قَطُّ، فَقُلْتُ : سُبْحَانَ اللَّهِ مَا هُذَا؟ قَالَا لِي : انْطَلِقُ، فَانْطَلَقْنَا حَتَّى انْتَهَيْنَا إِلَى دَوْحَةٍ عَظِيمَةٍ لَمْ أَرَ دَوْحَةً أَعْظَمَ وَلَا أَحْسَنَ مِنْهَا، فَارْتَقَيْنَا فِيهَا فَانْتَهَيْنَا إِلَى مَدِينَةٍ مَبْنِيَّةٍ بِلَبَنٍ مِنْ ذَهَبٍ، وَلَبَنِ مِنْ فِضَّةٍ فَاسْتَفْتَحْنَا بَابَ الْمَدِينَةِ فَفُتِحَ لَنَا، فَدَخَلْنَا فِيهَا فَأَخْرَجَانِي مِنْهَا فَأَدْخَلَانِي دَارًا هِيَ أَحْسَنُ مِنْهَا وَأَفْضَلُ، فَبَيْنَمَا أُصَعِّدُ بَصَرِي فَإِذَا قَصْرُ أَبْيَضُ كَأَنَّهُ رَبَابَةٌ بَيْضَاءُ، قَالَا : ذلِكَ مَنْزِلُكَ، قُلْتُ : أَلَا أَدْخُلُهُ؟ قَالَا : أَمَّا الْآنَ فَلَا، وَأَنْتَ دَاخِلُهُ، ثُمَّ قُلْتُ : إِنِّي رَأَيْتُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ عَجَبًا، فَمَا الَّذِي رَأَيْتُهُ؟ قَالَا : أَمَّا الْأَوَّلُ الَّذِي رَأَيْتَهُ يُشْلِعُ رَأْسَهُ بِالْحَجَرِ، فَإِنَّهُ رَجُلٌ يَأْخُذُ الْقُرْآنَ ثُمَّ يَرْفُضُهُ، وَيَنَامُ عَنِ الصَّلَاةِ الْمَكْتُوبَةِ. وَأَمَّا الَّذِي يَشُقُّ شِدْقَهُ إِلَى قَفَاهُ فَإِنَّهُ رَجُلٌ يَخْرُجُ مِنْ بَيْتِهِ فَيَكْذِبُ الْكِذْبَةَ فَتَبْلُغُ الْآفَاقَ، وَأَمَّا الَّذِي رَأَيْتَهُ مِثْلَ التَّنُّورِ فَإِنَّهُمُ الزُّنَاةُ وَالزَّوَانِي. وَأَمَّا الَّذِي يَسْعَى فِي الْبَحْرِ فَهُৱ آكِلُ الرِّبَا. وَأَمَّا الَّذِي يَسْعَى حَوْلَ النَّارِ فَإِنَّهُ مَالِكَ خَازِنُ النَّارِ أَيْ جَهَنَّمَ. وَأَمَّا الرَّجُلُ الطَّوِيلُ الَّذِي رَأَيْتَهُ فِي الرَّوْضَةِ فَإِنَّهُ إِبْرَاهِيمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ. وَأَمَّا الْوِلْدَانِ الَّذِينَ حَوْلَهُ فَكُلُّ مَوْلُودِ وُلِدَ عَلَى الْفِطْرَةِ. وَأَمَّا الدَّارُ الَّتِي دَخَلْتَ أَوَّلًا فَدَارُ عَامَّةِ الْمُؤْمِنِينَ، وَأَمَّا الدَّارُ الْأُخْرَى فَدَارُ الشُّهَدَاءِ، وَأَنَا جِبْرِيلُ وَ هُذَا مِيكَائِيلُ. ফَقَالَ رَجُلٌ : وَأَوْلَادُ الْمُشْرِكِينَ. قَالَ : وَأَوْلَادُ الْمُشْرِكِينَ أَيْضًا يَكُونُونَ عِنْدَ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ.
সামুরাহ ইবনে জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবী ﷺ প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, 'তোমাদের কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছো কি?' রাবী বলেন, যার ব্যাপারে আল্লাহর ইচ্ছা সে তাঁর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত। তিনি একদিন সকালে বললেন- গতরাত্রে আমার কাছে দুজন আগন্তুক এলো। তারা আমাকে উঠাল, আর বলল, 'চলুন।' আমি তাদের সাথে চলতে লাগলাম। অতঃপর আমরা কাত হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছলাম।
দেখলাম, অপর এক ব্যক্তি তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফাটিয়ে ফেলছে। আর পাথর গড়িয়ে সরে পড়ছে। তারপর আবার সে পাথরটির অনুসরণ করে তা পুনরায় নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত পুনরায় ভালো হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এসে আবার একই আচরণ করছে; যা প্রথমবার করেছিল। (তিনি বলেন,) আমি সাথী-দ্বয়কে বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! এটা কী?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম, তারপর চিত হয়ে শোয়া এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক ব্যক্তি লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এর দ্বারা তার কেশ থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং একইভাবে নাকের ছিদ্র থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে চোখ থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। তারপর ঐ লোকটি শোয়া ব্যক্তির অপরদিকে যাচ্ছে এবং প্রথম দিকের সাথে যেরূপ আচরণ করেছে অনুরূপ আচরণই অপর দিকের সাথেও করছে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মত ভালো হয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার প্রথম বারের মত আচরণ করছে। (তিনি বলেন,) আমি বললাম, 'সুবহানাল্লাহ! এরা কারা?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং [তন্দুর] চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম। [বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, যেন তিনি বললেন,] আর সেখানে শোরগোল ও নানা শব্দ ছিল। আমরা তাতে উঁকি মেরে দেখলাম, তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী-পুরুষ রয়েছে। আর নীচ থেকে নির্গত আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে, তখনই তারা উচ্চরবে চিৎকার করে উঠছে। আমি বললাম, 'এরা কারা?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটি নদীর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। (বর্ণনাকারী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে, তিনি বললেন,) নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, সেই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অপর এক ব্যক্তি রয়েছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতার-রত ব্যক্তি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সেই ব্যক্তির কাছে ফিরে আসছে, যে তার নিকট পাথর একত্রিত করে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার সামনে মুখ খুলে দিচ্ছে এবং ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর সে চলে গিয়ে আবার সাঁতার কাটছে এবং আবার তার কাছে ফিরে আসছে। আর যখনই ফিরে আসছে তখনই ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এরা কারা?' তারা বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং এমন একজন কুৎসিত ব্যক্তির কাছে এসে পৌঁছলাম, যা তোমার দৃষ্টিতে সর্বাধিক কুৎসিত বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, 'ঐ লোকটি কে?' তারা বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটা সবুজ-শ্যামল বাগানে এসে উপস্থিত হলাম। সেখানে বসন্তের সব রকমের ফুল রয়েছে আর বাগানের মাঝে এত বেশি দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে, আকাশে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম না। আবার দেখলাম, তার চারদিকে এত বেশি পরিমাণ বালক-বালিকা রয়েছে, যত বেশি পরিমাণ আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, 'উনি কে? এরা কারা?' তারা আমাকে বলল, 'চলুন, চলুন।'
সুতরাং আমরা চলতে লাগলাম এবং একটা বিশাল (বাগান বা) গাছের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলাম। এমন বড় এবং সুন্দর (বাগান বা) গাছ, যা আমি আর কখনো দেখিনি। তারা আমাকে বলল, 'এর উপরে চড়ুন।' আমরা উপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রুপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা উপস্থিত হলাম। আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হলো। আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে কতক লোক আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করল, যাদের অর্ধেক শরীর এত সুন্দর ছিল, যত সুন্দর তুমি দেখেছ, তার থেকেও অধিক। আর অর্ধেক শরীর এত কুৎসিত ছিল যত কুৎসিত তুমি দেখেছ, তার থেকেও অধিক।
সাথী-দ্বয় ওদেরকে বলল, 'যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়।' আর সেটা ছিল সুপ্রশস্ত প্রবহমান নদী। তার পানি ধবধবে সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর ওরা আমাদের কাছে ফিরে এলো। দেখা গেল, তাদের ঐ কুশ্রী রূপ দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। (তিনি বলেন,) তারা আমাকে বলল, 'এটা জান্নাতে আসুন এবং ওটা আপনার বাসস্থান।' (তিনি বলেন,) উপরের দিকে আমার দৃষ্টি গেলে, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মত একটি প্রাসাদ রয়েছে। তারা আমাকে বলল, 'ঐটা আপনার বাসগৃহ।' তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, 'আল্লাহ তোমাদের মাঝে বরকত দিন, আমাকে ছেড়ে দাও; আমি এতে প্রবেশ করি।' তারা বলল, 'আপনি অবশ্যই এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়।'
আমি বললাম, 'আমি রাতে অনেক বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী?' তারা আমাকে বলল, 'আচ্ছা আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হলো ঐ ব্যক্তি যে কুরআন গ্রহণ করে তা বর্জন করে। আর ফরয নামায ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে।
আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তার কেশ থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং একইভাবে নাকের ছিদ্র থেকে মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে চোখ থেকে মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল। সে হলো ঐ ব্যক্তি যে সকালে আপন ঘর থেকে বের হয়ে এমন মিথ্যা বলে, যা চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ে।
আর যে সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা (তন্দুর) চুলা সদৃশ গর্তের অভ্যন্তরে রয়েছে, তারা হলো ব্যভিচারী-ব্যভিচারিণীর দল।
আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে পৌঁছে দেখলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, সে হলো সুদখোর।
আর ঐ কুৎসিত ব্যক্তি যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর তার চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছিল। সে হলো মালেক [ফিরিস্তা]; জাহান্নামের দারোগা।
আর ঐ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন। তিনি হলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম। আর তাঁর চারপাশে যে বালক-বালিকারা ছিল, ওরা হলো তারা, যারা [ইসলামী] স্বভাব-প্রকৃতি নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।'
প্রথম যে বাড়িটিতে প্রবেশ করেছিলেন, সেটি হলো, সাধারণ মুমিনদের বাড়ি, দ্বিতীয়টি শহীদদের। আমি জিবরীল আর ইনি মিকাইল আ.। তখন একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, মুশরিকদের শিশুরা? তিনি বললেন, মুশরিকদের শিশুরাও হযরত ইবরাহীম আ.-এর সাথে থাকবে।
টিকাঃ
৩৫৪. সহীহ বুখারী: হাদীস-৭০৪৭; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২২৯৪; মুসনাদে আহমাদ: ৩৩/২৮৪।