📄 মদপান বর্জনের ফযীলত
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفُدًا وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا (অর্থ: যেদিন আমি মুত্তাকীদেরকে দলে দলে রহমানের দরবারে সমবেত করব এবং গুনাহগারদেরকে পিপাসিত অবস্থায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাব জাহান্নামে)।
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত মুকাতিল ইবনে সুলায়মান রহ. বলেন, মুত্তাকিদের জান্নাতের দিকে আহ্বান করা হবে। জান্নাতের মূল ফটকের নিকটে পৌঁছে তারা একটি বৃক্ষ দেখতে পাবেন, যার নিচ দিয়ে দুটি ঝর্ণা প্রবাহিত হলো। তার একটি থেকে তারা পান করবেন। এর ফলে তাদের ভিতরের কলুষতা দূর হয়ে যাবে। অপর ঝর্ণাটিতে তারা সকলে স্নান করবেন। ফলে তাদের শরীরের যাবতীয় ময়লা ও অপবিত্রতা ধুয়ে যাবে। সে দিকে ইশারা করেই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন- سَلَامٌ عَلَيْكُمُ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ (অর্থ: তোমাদের উপর সালাম, তোমরা পবিত্র হয়েছ। এখন তোমরা চিরদিনের জন্য জান্নাতে প্রবেশ কর)।
অতঃপর তাদের জন্য লাল ইয়াকুত পাথরের উত্তম উট নিয়ে আসা হবে। উটগুলোর পা হবে মণি ও ইয়াকুত পাথর খচিত স্বর্ণের। তারপর তাদের সবাইকে দু'টি করে চাদর পরানো হবে। তার একটি চাদর যদি দুনিয়াতে আনা হয়, তাহলে সমগ্র দুনিয়া আলোকিত হয়ে যাবে। তাদের প্রত্যেকের সাথে থাকবে পাহারাদার ফেরেশতা, যারা তাদেরকে জান্নাতে তাদের বাড়ি-ঘর চিনিয়ে দিবেন। জান্নাতে প্রবেশ করার পর তাদেরকে রুপার তৈরি এক প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হবে। যার বারান্দা হবে স্বর্ণের। সেখানে তাদেরকে বিক্ষিপ্ত মুক্তার মত বিভিন্ন প্রকার গহনা সজ্জিত একদল সেবক স্বর্ণের জগ এবং রুপার গ্লাস হাতে এসে অভ্যর্থনা জানাবে। ফেরেশতা তাদের সালাম করতে থাকবেন। তারাও তাদের সালামের উত্তর দিতে থাকবেন। অভ্যর্থনা পর্ব শেষ হলে তারা প্রাসাদে প্রবেশ করে আল্লাহ তাদের যে নেয়ামত দান করেছেন, তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবেন এবং সেখানে অবস্থানের জন্য উদ্যত হলেই ফেরেশতাগণ আরজ করবেন, কী করছেন? তারা উত্তর দিবেন, আমাদের রবের দান করা নেয়ামতরাজির মাঝে অবস্থান করতে চাচ্ছি। ফেরেশতাগণ বলবেন, এগিয়ে চলুন আপনার জন্য আরো নেয়ামত আছে। কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে তারা একটি স্বর্ণের প্রাসাদ দেখতে পাবেন, যার বারান্দা হবে মুক্তার। সেখানেও রুপার পেয়ালা এবং স্বর্ণের গ্লাস হাতে বিক্ষিপ্ত মুক্তার মতো একদল সেবিকা তাদের অভ্যর্থনা জানাবেন। তারা তাদেরকে সালাম করতে থাকবে, তারা তাদের সালামের উত্তর দিবেন। তখন তারা সেখানে অবস্থানের জন্য উদ্যত হলে ফেরেশতাগণ আরজ করবেন। এগিয়ে চলুন, আপনাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম নেয়ামত রয়েছে। আরো কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে তারা লাল ইয়াকুত পাথরের একটি প্রাসাদ দেখতে পাবেন। তা এত স্বচ্ছ হবে যে বাহির থেকেই তার ভিতরের অংশ দেখা যাবে। সেখানেও সেবিকারা তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এগিয়ে আসবে। তারা তাদেরকে সালাম করতে থাকবে এবং তারা তাদের সালামের উত্তর দিবেন। সে প্রাসাদে প্রবেশ করে তারা ডাগর এক হুরের সাক্ষাৎ পাবেন, যে ভিন্ন ভিন্ন নকশার সত্তর টি পোশাক পরে থাকবে। তার দেহের প্রতিটি গ্রন্থিতে থাকবে নানা ধরনের গহনা। তার দেহের সুঘ্রাণ এক শত বছরের পথের দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। তার চেহারা এত স্বচ্ছ হবে যে, জান্নাতী তার চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখতে পাবে। তার পায়ের গোছার হাড় ভেদ করে মগজ দেখা যাবে। সে এক বর্গ ফারছাখ ছড়িয়ে থাকা এক গৃহে থাকবে, যার থাকবে চার হাজার স্বর্ণনির্মিত কপাট। সারা বাড়ি মোড়া থাকবে মণিমুক্তা খচিত স্বর্ণের চাদর। তাতে রয়েছে একটি সজ্জিত শয্যা, যার উপর দুনিয়ার বাড়ির হিসাবে সাত তলা উচু বিছানা বিছানো থাকবে। সেখানে বসে জান্নাতীরা যখন ফল ফলাদি খাবার ইচ্ছা করবে, তখন সব সেবিকারা তার নিকট ছুটে আসবে, কিংবা তার খাট ছুটে যাবে ফলের বাগানে। তিনি বসে বসে যা খুশি খাবেন। এই সবই হলো, সে সব মুত্তাকীদের প্রতিদান যারা দুনিয়াতে অশ্লীলতা ও মদপান থেকে বেঁচে ছিল। তিনি বলেন, অনুরূপ জাহান্নামীদের হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের দিকে। তারা জাহান্নামের দোড়গোড়ায় পৌঁছলে জাহান্নামের দরজা খুলে যাবে এবং ফেরেশতারা লোহার হাতুড়ি হাতে তাদের স্বাগতম জানাবে। জাহান্নামে প্রবেশ করলেই দেখবে প্রতিটি অঙ্গ আযাব আক্রান্ত হয়েছে। হয় সাপে কেটেছে, কিংবা আগুনে ঝলসে গেছে কিংবা তাদের হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে। তারপর এক ফেরেশতা এসে তাদের এমন এক আঘাত করবে যার ধাক্কায় তারা চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব পরিমাণ গভীর এক গর্তে গিয়ে পড়বে। তবে তার কোনো তল নেই, আগুনের লেলিহান শিখা তাদের আবার উপরে তুলে আনবে। যখন তাদের মাথা জেগে উঠবে, তখনই সে মাথায় ফেরেশতারা আঘাত করতে থাকবে। আল্লাহ তা'আলা এর প্রতি ইশারা করেই বলেছেন-
كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا.
অর্থ: যখনই তাদের চামড়া পেকে যাবে তখনই আমি তাদেরকে নতুন চামড়া দিয়ে বদলে দিব। যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে পারে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী এবং প্রজ্ঞাবান।
তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন জাহান্নামীদের চামড়া সত্তরবার বদলে দেওয়া হবে। তারা পিপাসার্ত হয়ে পানি চাইলে তাদের তপ্ত পানি দেওয়া হবে। সে পানি মুখের সামনে নিতেই মুখের মাংস খসে পড়বে। সে পানি মুখে যাওয়ার সাথে সাথে মুখের সমস্ত দাঁত পড়ে যাবে, পেটে ঢুকার সাথে পেটের সমস্ত নাড়ি-ভুঁড়ি ও চামড়া গলে যাবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُ وَلَهُمْ مَقَامِعُ مِنْ حَدِيدٍ (অর্থ: তা দ্বারা তাদের পেটে যা রয়েছে সব ঝলসে দেওয়া হবে, তাদের জন্য রয়েছে লোহার হাতুড়ি)। আযাব ভোগ করতে করতে এক সময় অসহ্য হয়ে জাহান্নামবাসী জাহান্নামের ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলবে- ادْعُوا رَبَّكُمْ يُخَفِّفُ عَنَّا يَوْمًا مِنَ الْعَدَابِ (অর্থ: তোমাদের রবকে বল, তিনি একদিনের জন্য যেন আমাদের আযাব লাঘব করে দেন)। কিন্তু তারা তাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। এরপরও তারা চল্লিশ বছর জাহান্নামের সরদার মালেককে ডাকতে থাকবে। তিনি তাদের কোনো উত্তর দিবেন না। তখন তারা বলবে, চল আমরা ধৈর্য ধরে পড়ে থাকি। তাদের ডেকে তো কোনো লাভ হলো, না। তখন তারা ধৈর্য ধরে থাকবে। কিন্তু তাতেও তাদের কোনো লাভ হবে না, তখন তারা বলবে- سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَجَزِعْنَا أَمْ صَبَرْنَا مَا لَنَا مِنْ مَحِيصٍ (অর্থ: আমরা অস্থির হই আর ধৈর্য ধরে থাকি, দুটিই আমাদের জন্য বরাবর। আমাদের কোনো রেহাই নেই)।
এই সব হলো, কাফেরদের আযাবের বিবরণ। তবে মুসলমান যদি মদপান করে, তাহলে মৃত্যুর সময় তারা কাফের হয়ে মরার আশঙ্কা রয়েছে। তখন তাকেই এই শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের উচিত মদপান থেকে বেঁচে থাকা এবং মদ্যপদের সাথে উঠা বসা না করা। কারণ, মদ্যপায়ীর সাথে উঠাবসা করলে তার গায়ে এর নাপাকীর ছিটা লাগতে পারে।
টিকাঃ
৩৩০. সূরা মারইয়াম: আয়াত-৮৫-৮৬
৩৩১. সূরা যুমার: আয়াত-৭৩
৩৩২. সূরা নিসা: আয়াত-৫৬
৩৩৩. সূরা হজ্ব: আয়াত-২০-২১
৩৩৪. সূরা আল-মুমিন: আয়াত-৪৯
৩৩৫. সূরা ইবরাহীম: আয়াত-২১
📄 মদপানের ক্ষতি
হযরত হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বান্দা যখন প্রথমবার মদপান করে তখন তার অন্তর কালো হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার যখন মদ পান করে, তখন তার হেফাজতের দায়িত্বে থাকা ফেরেশতাগণ তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে যায়। তৃতীয়বার যখন পান করে, তখন মালাকুল মওত তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে যায়। চতুর্থবার যখন পান করে, তখন নবী ﷺ তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে যান। পঞ্চমবার যখন পান করে, তখন সাহাবায়ে কেরাম তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যান। ষষ্ঠবার যখন পান করে, তখন তার ব্যাপারে আজরাঈল আ. দায়মুক্ত হয়ে যান। সপ্তমবার যখন পান করে, তখন ইসরাফীল আ. তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যান। অষ্টমবার যখন পান করে, তখন মিকাঈল আ. তার দায়মুক্তহয়ে যান। নবমবার যখন পান করে, তখন আসমানের সকল ফেরেশতারা দায়মুক্ত হয়ে যায়। দশমবার যখন পান করে, তখন জমিনের সকল ফেরেশতারা দায়মুক্ত হয়ে যান। একাদশবার যখন পান করে, তখন সমুদ্রের মাছগুলোও তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যান। দ্বাদশবার যখন পান করে, তখন তার ব্যাপারে চাঁদ, সূর্য দায়মুক্ত হয়ে যায়। ক্রয়োদশবার যখন পান করে, তখন আসমানের নক্ষত্ররা তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যায়। চতুর্থদশবার যখন পান করে, তখন সৃষ্টিকুল তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যায়। পঞ্চদশবার যখন পান করে, তখন তার জন্য জান্নাতের সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ষষ্ঠদশবার যখন পান করে, তখন তার জন্য জাহান্নামের সমস্ত দরজা খুলে দেওয়া হয়। সপ্তদশবার যখন পান করে, তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যায়। অষ্ঠদশবার যখন পান করে, তখন আল্লাহর কুরসী তার ব্যাপারে দায়মুক্ত হয়ে যায়। উনবিংশবার যখন পান করে, তখন তার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা দায়মুক্ত হয়ে যান।
📄 মদ্যপের নামায কবূল হয় না
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ يَزِيدَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهَا قَالَتْ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فَجَعَلَهَا فِي بَطْنِهِ، لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ صَلَاتُهُ سَبْعًا، فَإِنْ هِيَ أَذْهَبَتْ عَقْلَهُ لَمْ تُقْبَلْ صَلَاتُهُ أَرْبَعِينَ يَوْمًا، وَإِنْ مَاتَ مَاتَ كَافِرًا وَإِنْ تَابَ تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ، وَإِنْ عَادَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يَسْقِيَهُ مِنْ طِينَةِ الْخَبَالِ يَعْنِي مِنْ صَدِيدِ أَهْلِ النَّارِ.
হযরত আছমা বিনতে ইয়াযীদ রাযি. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মদপান করে সাতদিন পর্যন্ত তার নামায কবূল করা হয় না। আর যদি এর ফলে সে মাতাল হয়ে যায়, তাহলে চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবুল করা হয় না। এই অবস্থায় যদি সে মারা যায়, তাহলে সে কাফের হয়ে মারা গেল। তবে যদি সে তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু যদি সে পুনরায় পান করে, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে জাহান্নামবাসীর পুঁজ পান করাবেন।
টিকাঃ
৩৩৬. সহীহ মুসলিম : হাদীস-২০০২; সুনানে আবী দাউদ : হাদীস-৩৬৮০; মুসনাদে আহমাদ ৩৫/৩৯৬; হাদীসটি সহীহ।
📄 মদ্যপের নামায রোযা কবূল হয় না
অপর এক হাদীসে আছে। কেউ যদি একবার মদ পান করে তাহলে চল্লিশ দিন তার নামায রোযা কবুল করা হয় না এবং অন্য কোনো আমলও না। যদি সে দ্বিতীয়বার পান করে তাহলে আশি দিন তার নামায রোযা কিছুই কবুল করা হয় না। তৃতীয়বার পান করলে একশত বিশদিন তার নামায রোযা কিছুই কবুল করা হয় না। আর যদি সে চতুর্থবার পান করে তাহলে তাকে ক্ষমা করা হবে না। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে জাহান্নামবাসীর পুঁজ পান করাবেন।
অপর এক হাদীসে আছে- إِنَّ الذُّنُوبَ وَالْخَطَايَا جُعِلَتْ كُلُّهَا فِي بَيْتٍ وَاحِدٍ وَجُعِلَ مِفْتَاحُهُ شُرْبَ الْخَمْرِ (সমস্ত গুনাহ ও পাপ কোনো এক ঘরে বন্ধি করে রাখা হয়েছে। সে ঘরের চাবি হলো, মদ পান)। অর্থাৎ, মদপান করা মানে নিজের জন্য যাবতীয় গুনাহ ও অপরাধের দরজা খুলে দেওয়া।
টিকাঃ
৩৩৭. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৮৬২; সুনানে নাসায়ী হাদীস-৫৬৬৮; মুসনাদে আহমাদ: ৮/৫১৪। হাদীসটি সহীহ।