📄 প্রতিবেশীর প্রকারভেদ
নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেন, প্রতিবেশী তিন প্রকার। যথা-
১. যার হক তিনটি।
২. যার হক দুটি।
৩. যার হক মাত্র একটি।
অর্থাৎ, প্রতিবেশী যদি তার নিকটত্মীয় ও মুসলিম হয়, তাহলে তার হক হবে তিনটি। যথা- ১. মুসলিম ভাই হওয়ার হক। ২. নিকটাত্মীয় হওয়ার হক। ৩. এবং প্রতিবেশী হওয়ার হক। আর প্রতিবেশী যদি শুধু মুসলমান হয় তাহলে তার হক দু'টি। যথা- ১. মুসলিম ভাই হওয়ার হক ২. এবং প্রতিবেশী হওয়ার হক। আর যে শুধুই প্রতিবেশী তার হক একটি। আর তাহলো শুধু প্রতিবেশী হওয়ার হক। সুতরাং সবাইকে মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশী যদি অমুসলিম যিম্মীও হয়, তাহলেও তার হক আদায় করা ওয়াজিব।
টিকাঃ
৩১৯. কাশফুল আসতার লিল-বায্যার : হাদীস-১৮৯৬; হিলইয়াতুল আউলিয়া ৫/২০৭; আল- ফিরদাউস: হাদীস-২৬এ২৮। হাদীসটির সনদ অত্যন্ত জয়ীফ। কেননা বায্যারের সনদে হাদীস জালকারী রাবী রয়েছে [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৮/১৬৪]।
📄 প্রতিবেশীর সাথে সদাচারণ
عَنْ أَبِي ذَرٍّ الْغِفَارِيُّ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ: أَوْصَانِي خَلِيلِي مُحَمَّدٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ بِثَلَاثٍ قَالَ : اسْمَعْ وَأَطِعْ وَلَوْ لِعَبْدِ মাজেদূয়্যাল আনফি (مَجْدُوعِ الْأَنْفِ), فَإِذَا صَنَعْتَ مَرَقَةً فَأَكْثِرُ مَاءَهَا، ثُمَّ انْظُرْ إِلَى أَهْلِ بَيْتِ جِيرَانِكَ فَأَصِبْهُمْ مِنْهَا بِمَرَقَتِكَ، وَصَلَّ الصَّلَاةَ لِوَقْتِهَا.
হযরত আবূ যর গিফারী রাযি. বলেন, আমার বন্ধু মুহাম্মদ ﷺ আমাকে তিনটি উপদেশ দিয়েছেন, তিনি বলেন-
১. শাসকের আনুগত্য করবে যদি সে নাককাটা দাসও হয়।
২. যখন তরকারী রান্না করবে তখন ঝোল একটু বেশী দিবে, যাতে প্রতিবেশীর বাড়িতে কিছু পাঠাতে পার।
৩. এবং সময়মতো নামায আদায় করবে।
প্রচলিত আছে, যার তিনজন প্রতিবেশী থাকবে আর সে তাদের সবাই কে সন্তুষ্ট রেখে মারা যাবে, তার মাগফেরাত নিশ্চিত।
একদা এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-এর নিকট এসে তার প্রতিবেশীর ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি বললেন-
كُفَّ أَذَاكَ عَنْهُ، وَاصْبِرْ عَلَى أَذَاهُ، وَكَفَى بِالْمَوْتِ فَرَّاقًا.
তোমার অনিষ্ট থেকে তাকে মুক্তি দাও। তার অনিষ্টে তুমি ধৈর্যধারণ কর। আর মৃত্যুই তোমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে।
হযরত আমর ইবনে আস রাযি. বলেন, সম্পর্ক রক্ষাকারী সে নয়, যে সম্পর্ক রক্ষাকারীর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে এবং সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। বরং প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সেই যে ব্যক্তি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তার উপর যে অবিচার করে তার সাথে সদয় আচরণ করে। সহনশীল সে নয় মানুষ তার সাথে সহনশীল আচরণ করলে সেও তাদের সাথে সহনশীল আচরণ করে আর তার সাথে রুঢ় আচরণ করলে সেও তাদের সাথে রুঢ় আচরণ করে। বরং সহনশীল হলো সে, যে সহনশীলতার বিপরীত সহনশীল আচরণ করে এবং তার সাথে রূঢ় আচরণ করলে বা ঝগড়া করলেও সহনশীলতা দেখায়।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, মুসলমানের উচিত প্রতিবেশীর কষ্টে ধৈর্যধারণ করা এবং তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা। আর প্রতিবেশীকে তিন জিনিস দ্বারা নিরাপদ রাখা যায়। যথা- ১. মুখ, ২. হাত ও ৩. সতর।
মুখ থেকে নিরাপদ রাখা মানে হলো, তার সম্পর্কে এমন কোনো কথা না বলা যে, কথার মাঝে সে এসে গেলে কথা বন্ধ করে দিতে হয় কিংবা তার কানে যদি এই কথা পৌঁছে তাহলে সে লজ্জা পায়। হাত থেকে তাকে নিরাপদ রাখার অর্থ হলো, যদি প্রতিবেশী বাজারে যাওয়ার পর মনে হয় যে, তার টাকার ব্যাগ তার (প্রতিবেশীর) বাসায় ফেলে এসেছে তাহলে তার মনে কোনো আশঙ্কা জাগবে না। বরং সে মনে মনে বলবে, তার ঘর তো আমার ঘরই। সতর থেকে নিরাপদ রাখার অর্থ হলো, প্রতিবেশী সফরে থাকাকালে শুনতে পায় যে, তার প্রতিবেশী তার ঘরে প্রবেশ করেছে তাহলে তার মনে কোনো ধরনের আশঙ্কা জাগবে না। বরং সে আনন্দিত হবে।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ : ثَلَاثَةُ أَخْلَاقٍ كَانَتْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ مُسْتَحَبَّةٌ وَالْمُسْلِمُونَ أَوْلَى بِهَا، أَوَّلُهَا لَوْ نَزَلَ بِهِمْ ضَيْفٌ لَاجْتَهَدُوا فِي بِرِّهِ. وَالثَّانِي لَوْ كَانَتْ لِوَاحِدٍ مِنْهُمُ امْرَأَةً كَبَرَتْ عِنْدَهُ لَا يُطَلَّقَهَا، وَيُمْسِكُهَا مَخَافَةَ أَنْ تَضِيعَ. وَالثَّالِثُ إِذَا لَحِقَ بِجَارِهِمْ دَيْنٌ، أَوْ أَصَابَهُ شِدَّةً أَوْ جَهْدُ اجْتَهَدُوا حَتَّى يَقْضُوا دَيْنَهُ وَأَخْرَجُوهُ مِنْ تِلْكَ الشَّدَّةِ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, জাহেলী যুগে লোকদের নিকট তিনটি স্বভাব খুবই প্রিয় ছিল, মুসলিম সমাজেও তা অবশ্য জনপ্রিয় হওয়া উচিত।
১. তাদের নিকট কোনো অতিথি এলে তারা তাকে আদর আপ্যায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করত।
২. কারো স্ত্রী বয়স্কা হয়ে গেলে তারা তার অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে কখনো তালাক দিত না।
৩. প্রতিবেশী ঋণগ্রস্ত হলে কিংবা বিপদে পড়লে তারা তার ঋণ শোধ করে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করত।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ أَنَّهُ قَالَ : إِنَّ الْجَارَ يَتَعَلَّقُ بِجَارِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَيَقُولُ يَا رَبِّ وَسَعْتَ عَلَى أَخِي هَذَا، وَقَتَرْتَ عَلَيَّ، أُمْسِي جَائِعًا وَيُمْسِي هَذَا شَبْعَانًا، فَسَلْهُ لِمَ أَغْلَقَ بَابَهُ دُونِي وَحَرَمَنِي مَا قَدْ وَسَعْتَ عَلَيْهِ.
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন তার প্রতিবেশীকে ধরে খোদার নিকট হাজির হয়ে অভিযোগ করবে, হে রব! আপনি আমার এই প্রতিবেশীকে সচ্ছলতা দান করেছিলেন। আমাকে অভাব অনটন দান করে ছিলেন। আমি ক্ষুধার্ত থাকতাম আর সে আহারে তৃপ্ত থাকত। হে রব! তাকে জিজ্ঞেস করুন, কেন সে আমার জন্য তার দরজা বন্ধ করে রাখত? আপনি তাকে যা দান করেছিলেন, সে কেন আমাকে তা থেকে বঞ্চিত রেখেছে।
হযরত সুফইয়ান সাওরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, দশটি বিষয় অবিচারের অন্তর্ভুক্ত।
১. পিতা-মাতা ও মুমিনদের বাদ দিয়ে শুধু নিজের জন্য দোয়া করা।
২. কুরআন পড়তে জানা সত্ত্বেও দিনে এক শত আয়াত তেলাওয়াত না করা।
৩. মসজিদে প্রবেশ করে অন্তত দুই রাকাআত নামায না পড়ে আবার বের হয়ে যাওয়া।
৪. গোরস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীদের সালাম না করা ও তাদের জন্য দোয়া না করা।
৫. জুমআর দিনে শহরে প্রবেশ করে জুমআর নামায আদায় না করা।
৬. দুই ব্যক্তি পরস্পর সঙ্গী হয়ে একে অপরের নাম জিজ্ঞেস না করা।
৭. মহল্লায় কোনো আলেম হাজির হলে তার থেকে কিছু ইলম অর্জন না করা।
৮. কোনো দীনী ভাই দাওয়াত দিলে তার দাওয়াত গ্রহণ না করা।
৯. অবসর ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো ইলম আদব হাসিল না করেই যৌবন পার করা।
১০. নিজে তৃপ্ত থেকে ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীকে আহার দান না করা।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, চারটি কাজ করলে প্রতিবেশীর হক সম্পূর্ণরূপে আদায় হয়। যথা- ১. أَنْ يُوَاسِيهِ بِمَا عِنْدَهُ অর্থাৎ, সাধ্যানুসারে প্রতিবেশীর প্রতি সহমর্মী হওয়া। ২. أَنْ لَا يَطْمَعَ فِيمَا عِنْدَهُ অর্থাৎ, প্রতিবেশীর যা আছে তাতে লোভ না করা। ৩. أَنْ يَمْنَعَ أَذَاهُ عَنْهُ অর্থাৎ, প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করা। ৪. أَنْ يَصْبِرَ عَلَى أَذَاهُ অর্থাৎ, প্রতিবেশী জ্বালাতন করলে ধৈর্যধারণ করা।
টিকাঃ
৩২০. সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস-১৭১৮; মুসনাদে আহমাদ ৫/১৬১। শায়েখ শুয়াইব আরনাউত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
৩২১. ইবনুন নাজ্জার মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন [ফয়জুল ক্বদীর: ৫/৮] ।
৩২২. আত-তারগীব লিল-আসবাহানী: হাদীস-৮৪৮; জয়ীফুল জামে': হাদীস-৪২৬৮।