📄 শিক্ষণীয় ঘটনা
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং তাঁদের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অবাধ্যতা বা তাঁদের মনে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেই প্রকাশ পেতে পারে। এই বিষয়ে ইতিহাসে অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে, যার মধ্যে দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
**১. হযরত আলকামা (রা.)-এর ঘটনা:**
হযরত আলকামা (রা.) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একজন ইবাদতগুজার সাহাবী ছিলেন। তিনি নামাজ, রোজা ও দান-সদকায় অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি বেশি মনোযোগ দিতেন এবং মায়ের প্রতি কিছুটা উদাসীন ছিলেন, যা তাঁর মাকে কষ্ট দিত। মৃত্যুর সময় যখন তাঁর জিহ্বা দিয়ে কালেমা বের হচ্ছিল না, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মাকে ডেকে পাঠান। মা তাঁর ছেলের প্রতি অসন্তুষ্টির কথা জানালে রাসূল (ﷺ) বলেন যে, এই অসন্তুষ্টির কারণেই আলকামার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে।
রাসূল (ﷺ) তখন সাহাবিদেরকে কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালাতে বলেন, যাতে আলকামাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। মায়ের মন এতে বিগলিত হয়ে যায় এবং তিনি চিৎকার করে বলেন যে, তিনি তাঁর সন্তানকে পুড়তে দেখতে পারবেন না। তখন রাসূল (ﷺ) বলেন, "আল্লাহর আজাব এর চেয়েও কঠিন। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন, তার কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।" একথা শুনে মা সাথে সাথে ছেলেকে ক্ষমা করে দেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। এরপরই আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে সক্ষম হন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, মায়ের অসন্তুষ্টি সন্তানের পরকালের জন্য কত বড় বাধা হতে পারে। [22, 25, 30, 31]
**২. গাধার মতো মুখবিশিষ্ট যুবকের ঘটনা:**
একজন সাহাবী, শাহর ইবনে হাওশাব (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি আসরের পর কবরস্থান দিয়ে যাওয়ার সময় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখেন। একটি কবর থেকে এমন এক ব্যক্তি বের হলো যার মাথাটি গাধার মতো এবং শরীর মানুষের মতো। সে তিনবার গাধার মতো বিকট স্বরে চিৎকার করে আবার কবরে ফিরে গেল। [32]
এই দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে লোকটির মায়ের কাছে এর কারণ জানতে চান। মা জানান যে, তার ছেলে জীবিত থাকা অবস্থায় মদ্যপ ছিল। তিনি যখন তাকে নিষেধ করতেন, তখন ছেলে বলত, "আপনি তো গাধার মতো চিৎকার করেন।" মায়ের প্রতি এই চরম অবমাননাকর আচরণের কারণেই মৃত্যুর পর তার আকৃতি এমন বিকৃত হয়ে গিয়েছিল এবং সে প্রতিদিন কবর থেকে উঠে এভাবে চিৎকার করত। [32]
এই দুটি ঘটনা পিতা-মাতার প্রতি অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে এক কঠোর সতর্কবার্তা। প্রথম ঘটনাটি পরকালীন মুক্তির পথে বাধার দৃষ্টান্ত, আর দ্বিতীয়টি দুনিয়াতেই (কবরের জীবনে) নেমে আসা শাস্তির এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।
📄 আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সুফল
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, যাকে আরবিতে 'সিলাতুর রাহম' বলা হয়, ইসলামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিই অর্জন হয় না, বরং দুনিয়া ও আখিরাতে বহুবিধ কল্যাণ ও সুফল লাভ করা যায়।
**১. রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থিব সুফল হলো রিজিকের প্রশস্ততা এবং হায়াত বা জীবনকালে বরকত লাভ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
> "যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭) [2, 4, 11, 12]
এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তার জীবনে ও উপার্জনে এমন বরকত দান করেন যা তার জীবনকে প্রাচুর্যময় ও দীর্ঘায়িত করে তোলে।
**২. আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক মজবুত করার একটি মাধ্যম। একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
> "...যে তোমার (আত্মীয়তার) সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব। আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।" (বুখারি)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের একটি নিশ্চিত উপায়।
**৩. পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা:**
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবার ও সমাজে শান্তি, স্থিতি এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। [20]
**৪. বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষার একটি কারণ। একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সহজ হয়।
**৫. জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি:**
এর সবচেয়ে বড় পারলৌকিক সুফল হলো জান্নাত লাভ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
> "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10, 11, 12, 13, 14, 15, 16, 17, 18, 19, 20, 21, 22, 23, 24, 25, 26, 27, 28, 29, 30, 31, 32]
বিপরীতভাবে, যারা এই সম্পর্ক রক্ষা করে চলে, তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
**৬. গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফ করে দেন এবং বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। এটি আল্লাহর রহমত লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম।
সুতরাং, আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাতের অফুরন্ত কল্যাণ লাভের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
📄 আরশের ছায়াতলে যারা
কিয়ামতের দিন সূর্য যখন মাথার অতি নিকটে চলে আসবে এবং মানুষ প্রচণ্ড উত্তাপে ও ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে, সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা সাত শ্রেণির মানুষকে তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। সেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা হলেন:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না:
1. **ন্যায়পরায়ণ শাসক (الإِمَامُ الْعَادِلُ):** যে শাসক বা নেতা তার অধীনস্থদের উপর ন্যায় ও ইনসাফের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করে। [14]
2. **আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন যুবক (شَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ):** যে যুবক তার যৌবনের মূল্যবান সময়কে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে। [14]
3. **মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি (رَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ):** যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে লেগে থাকে; এক নামাজ শেষ করে আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষায় থাকে। [14]
4. **আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসাকারী দুই ব্যক্তি (رَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ):** যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, একত্রিত হয় এবং পৃথক হয়। [14]
5. **আল্লাহর ভয়ে নির্জনে ক্রন্দনকারী (رَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ):** যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয়। [14]
6. **প্রলোভন প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি (وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ):** যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী ব্যভিচারের জন্য আহ্বান করে, কিন্তু সে 'আমি আল্লাহকে ভয় করি' বলে তা প্রত্যাখ্যান করে। [14]
7. **গোপনে দানকারী (رَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ):** যে ব্যক্তি এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করল, তা বাম হাতও জানতে পারে না। [14]
(সহীহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩১) [14]
এই হাদিসটি সেই সাতটি মহান গুণের বর্ণনা দেয়, যা মানুষকে কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষা ও আশ্রয় লাভের যোগ্য করে তোলে।
📄 নেকি ও রিযিকের বৃদ্ধি ঘটে পাঁচটি জিনিস দ্বারা
ইসলামে এমন কিছু আমল রয়েছে যা মানুষের পার্থিব জীবনে বরকত নিয়ে আসে এবং পরকালের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করে। এমন পাঁচটি বিশেষ আমল হলো:
1. **আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (সিলাতুর রাহম):** আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা রিজিক ও হায়াত (জীবনকাল) বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার হায়াত বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 4, 11, 12] আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের বিপদে সাহায্য করা এবং তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা এর অন্তর্ভুক্ত।
2. **দান-সদকা করা:** আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করলে সম্পদ কমে না, বরং আল্লাহ তাআলা তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, "আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৬) [26] হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, "হে আদম সন্তান, তুমি ব্যয় করো, আমিও তোমার জন্য ব্যয় করব।" (বুখারি ও মুসলিম) [12, 26] নিয়মিত সদকা শুধু সম্পদই বৃদ্ধি করে না, বিপদ-আপদ থেকেও রক্ষা করে।
3. **তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা:** যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে জীবনযাপন করে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহ তার জন্য অভাবনীয় উৎস থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য কোনো না কোনো পথ বের করে দেবেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩) [12, 16]
4. **ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা:** বেশি বেশি ইস্তিগফার করা রিজিক ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত লাভের একটি পরীক্ষিত উপায়। হযরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।" (সূরা নূহ: ১০-১২) [12]
5. **শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা আদায় করা:** আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদেরকে আরও বেশি দেব।" (সূরা ইবরাহিম: ৭) [4, 12] নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে নেকি অর্জিত হয় এবং রিজিকের দরজা খুলে যায়।