📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 শিক্ষণীয় ঘটনা

📄 শিক্ষণীয় ঘটনা


ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং তাঁদের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অবাধ্যতা বা তাঁদের মনে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেই প্রকাশ পেতে পারে। এই বিষয়ে ইতিহাসে অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে, যার মধ্যে দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

**১. হযরত আলকামা (রা.)-এর ঘটনা:**

হযরত আলকামা (রা.) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একজন ইবাদতগুজার সাহাবী ছিলেন। তিনি নামাজ, রোজা ও দান-সদকায় অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি বেশি মনোযোগ দিতেন এবং মায়ের প্রতি কিছুটা উদাসীন ছিলেন, যা তাঁর মাকে কষ্ট দিত। মৃত্যুর সময় যখন তাঁর জিহ্বা দিয়ে কালেমা বের হচ্ছিল না, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মাকে ডেকে পাঠান। মা তাঁর ছেলের প্রতি অসন্তুষ্টির কথা জানালে রাসূল (ﷺ) বলেন যে, এই অসন্তুষ্টির কারণেই আলকামার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে।

রাসূল (ﷺ) তখন সাহাবিদেরকে কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালাতে বলেন, যাতে আলকামাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। মায়ের মন এতে বিগলিত হয়ে যায় এবং তিনি চিৎকার করে বলেন যে, তিনি তাঁর সন্তানকে পুড়তে দেখতে পারবেন না। তখন রাসূল (ﷺ) বলেন, "আল্লাহর আজাব এর চেয়েও কঠিন। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন, তার কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।" একথা শুনে মা সাথে সাথে ছেলেকে ক্ষমা করে দেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। এরপরই আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে সক্ষম হন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, মায়ের অসন্তুষ্টি সন্তানের পরকালের জন্য কত বড় বাধা হতে পারে। [22, 25, 30, 31]

**২. গাধার মতো মুখবিশিষ্ট যুবকের ঘটনা:**

একজন সাহাবী, শাহর ইবনে হাওশাব (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি আসরের পর কবরস্থান দিয়ে যাওয়ার সময় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখেন। একটি কবর থেকে এমন এক ব্যক্তি বের হলো যার মাথাটি গাধার মতো এবং শরীর মানুষের মতো। সে তিনবার গাধার মতো বিকট স্বরে চিৎকার করে আবার কবরে ফিরে গেল। [32]

এই দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে লোকটির মায়ের কাছে এর কারণ জানতে চান। মা জানান যে, তার ছেলে জীবিত থাকা অবস্থায় মদ্যপ ছিল। তিনি যখন তাকে নিষেধ করতেন, তখন ছেলে বলত, "আপনি তো গাধার মতো চিৎকার করেন।" মায়ের প্রতি এই চরম অবমাননাকর আচরণের কারণেই মৃত্যুর পর তার আকৃতি এমন বিকৃত হয়ে গিয়েছিল এবং সে প্রতিদিন কবর থেকে উঠে এভাবে চিৎকার করত। [32]

এই দুটি ঘটনা পিতা-মাতার প্রতি অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে এক কঠোর সতর্কবার্তা। প্রথম ঘটনাটি পরকালীন মুক্তির পথে বাধার দৃষ্টান্ত, আর দ্বিতীয়টি দুনিয়াতেই (কবরের জীবনে) নেমে আসা শাস্তির এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সালিম রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, মক্কায় আমাদের সাথে খোরাসানের এক ব্যক্তি থাকত। লোকটি খুবই সৎ ছিল। মানুষ তার নিকট আমানত রাখত। এক ব্যক্তি তার নিকট দশ হাজার দীনার আমানত রেখে কোনো কাজে বাহিরে চলে যায়। ফিরে এসে সে জানতে পারে যে লোকটি মারা গেছে। সে তার ছেলে সন্তান ও আত্মীয় স্বজনদের সম্পদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু কোনো হদিস পেল না। তখন সে মক্কায় ফিরে এসে ফকীহদের নিকট বিষয়টি জানালেন। তারা বললেন, আমরা আশা করি লোকটি জান্নাতবাসী হয়েছেন। কাজেই তুমি রাতের এক তৃতীয়াংশ বা মধ্যরাতে যমযম কূপের নিকট গিয়ে ডেকে বলবে, হে অমুকের ছেলে অমুক! আমি অমুকের ছেলে অমুক, তোমার নিকট আমানত রেখেছিলাম। তাদের কথা অনুসারে সে পরপর তিন রাত এই রূপ করল। কিন্তু কেউ তার কথার কোনো জবাব দিল না। সে ফকীহদেরকে ব্যাপারটা জানালে, তারা বললেন, ইন্নালিল্লাহ! আমাদের আশঙ্কা হয় যে, খোরাসানী ব্যক্তি জাহান্নামবাসী হয়নি তো। তুমি ইয়েমেনে চলে যাও, সেখানে দেখবে 'বারহুত' নামে এক কূপ আছে। মাঝ রাতে সেখানে গিয়ে আগের মত ডেকে বলবে, হে অমুকের পুত্র অমুক! আমি অমুককে তোমার নিকট আমানত রেখেছিলাম। তাদের আদেশ অনুসারে সে উক্ত কূপের নিকট গিয়ে ডাক দিতেই খোরাসানী সাড়া দিল। সে বলল, হায়রে কপাল! তুমি জাহান্নামে কেন, তুমি তো খুব ভালো লোক ছিল? সে বলল, খোরাসানে আমার কিছু আত্মীয় ছিল, আমি তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতাম না। সে অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হয়। ফলে আল্লাহ এই অপরাধের কারণে আমাকে পাকড়াও করলেন এবং আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করলেন। যাই হোক! তোমার আমানত রক্ষিত আছে। সে সম্পদের ব্যাপারে আমি আমার ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারিনি। তাই অমুক ঘরের মাটির নিচে তা পুতে রেখেছি। তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে আমার ছেলেকে বলবে, সে তোমাকে সে ঘরের সন্ধ্যান দিবে। সে তার কথা মত উক্ত ঘরে গিয়ে মাটি খুঁড়ে দেখল, সেখানে ঠিক তার দেওয়া দশ হাজার দীনার পুঁতে রাখা আছে।

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, যদি ব্যক্তি নিকটাত্মীয়দের কাছে থাকে, তাহলে তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা ও হাদিয়া পাঠানোর মাধ্যমে আত্মীয়তার রক্ষা করা। আর যদি সম্পদ দিয়ে সম্পর্ক রক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত তাদের নিকট আসা-যাওয়া করা। প্রয়োজনে তাদের কাজে সহযোগিতা করা। আর যদি তারা দূরে থাকেন তাহলে খোঁজ-খবরের মাধ্যমে তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে যদি যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া উত্তম।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সুফল

📄 আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সুফল


আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, যাকে আরবিতে 'সিলাতুর রাহম' বলা হয়, ইসলামে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিই অর্জন হয় না, বরং দুনিয়া ও আখিরাতে বহুবিধ কল্যাণ ও সুফল লাভ করা যায়।

**১. রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থিব সুফল হলো রিজিকের প্রশস্ততা এবং হায়াত বা জীবনকালে বরকত লাভ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

> "যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭) [2, 4, 11, 12]

এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তার জীবনে ও উপার্জনে এমন বরকত দান করেন যা তার জীবনকে প্রাচুর্যময় ও দীর্ঘায়িত করে তোলে।

**২. আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক মজবুত করার একটি মাধ্যম। একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

> "...যে তোমার (আত্মীয়তার) সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব। আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।" (বুখারি)

এই হাদিস প্রমাণ করে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আল্লাহর ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভের একটি নিশ্চিত উপায়।

**৩. পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা:**
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবার ও সমাজে শান্তি, স্থিতি এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। [20]

**৪. বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষার একটি কারণ। একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসার মাধ্যমে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সহজ হয়।

**৫. জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি:**
এর সবচেয়ে বড় পারলৌকিক সুফল হলো জান্নাত লাভ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

> "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10, 11, 12, 13, 14, 15, 16, 17, 18, 19, 20, 21, 22, 23, 24, 25, 26, 27, 28, 29, 30, 31, 32]

বিপরীতভাবে, যারা এই সম্পর্ক রক্ষা করে চলে, তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

**৬. গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি:**
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে আল্লাহ তাআলা গুনাহ মাফ করে দেন এবং বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। এটি আল্লাহর রহমত লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম।

সুতরাং, আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাতের অফুরন্ত কল্যাণ লাভের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সুফল দশটি। যথা-
১. أَنَّ فِيهَا رِضًا اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। কারণ, তিনি নিজেই আত্মীয়তা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।
২. إِدْخَالُ السُّرُورِ عَلَيْهِمْ অর্থাৎ, এতে আত্মীয়দেরকে আনন্দ দেওয়া হয়। এক হাদীসে এসেছে, সর্বোত্তম আমল হলো, মুমিনকে আনন্দ দেওয়া।
৩. أَنَّ فِيهَا فَرَحَ الْمَلَائِكَةِ অর্থাৎ, এতে ফেরেশতাদেরকে খুশি করা হয়। কারণ, আত্মীয়তা রক্ষা করা হলে ফেরেশতারা খুশী হন।
৪. أَنَّ فِيهَا حُسْنَ الثَّنَاءِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ عَلَيْهِ অর্থাৎ, এর ফলে সে সমাজের অন্যান্য মুসলমানদের প্রশংসা লাভ করে।
৫. أَنَّ فِيهَا إِدْخَالَ الْغَمِّ عَلَى إِبْلِيسَ عَلَيْهِ اللَّعْنَةُ অর্থাৎ, এতে ইবলীসকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করা হয়। তার প্রতি আল্লাহর লানত।
৬. زِيَادَةٌ فِي الْعُمْرِ অর্থাৎ, এতে হায়াত বাড়ে।
৭. بَرَكَةً فِي الرِّزْقِ অর্থাৎ, এতে রিযিকে বরকত হয়।
৮. سُرُورُ الْأَمْوَاتِ অর্থাৎ, এতে মৃত ব্যক্তিরা আনন্দিত হন। কারণ, আত্মীয়দের কারো যখন কোনো কষ্ট বা দুঃখের ঘটনা ঘটে তখন সবাই সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে একত্রিত হন। তাই তাদের মাঝে পরস্পর হৃদ্যতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
৯. زِيَادَةٌ فِي الْمَوَدَّةِ অর্থাৎ, পরস্পর ভালোবাসা বৃদ্ধি হয়। কারণ, একে অপররের দুঃখে শরীক হলে এবং সাহায্য সহযোগিতা করলে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
১০. زِيَادَةُ الْأَجْرِ بَعْدَ مَوْتِهِ অর্থাৎ, মৃত্যুর পরও সওয়াব লাভের সুযোগ তৈরি হয়। কারণ, আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলে তার মৃত্যুর পর যখন তাদের তার কোনো ভালো কর্ম বা অনুগ্রহের কথা স্মরণ হবে তখনই তারা তার জন্য দোয়া করবে।

টিকাঃ
৩০৮. কাযাউল হাওয়ায়েজ লি-ইবনে আবিদ দুনিয়া : হাদীস-১১২; সহীহুল জামে': হাদীস-৫৮৯৭; আল্লামা মুনাবী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আরশের ছায়াতলে যারা

📄 আরশের ছায়াতলে যারা


কিয়ামতের দিন সূর্য যখন মাথার অতি নিকটে চলে আসবে এবং মানুষ প্রচণ্ড উত্তাপে ও ঘামে হাবুডুবু খেতে থাকবে, সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা সাত শ্রেণির মানুষকে তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। সেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা হলেন:

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না:

1. **ন্যায়পরায়ণ শাসক (الإِمَامُ الْعَادِلُ):** যে শাসক বা নেতা তার অধীনস্থদের উপর ন্যায় ও ইনসাফের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করে। [14]

2. **আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন যুবক (شَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ):** যে যুবক তার যৌবনের মূল্যবান সময়কে আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে। [14]

3. **মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি (رَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ):** যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে লেগে থাকে; এক নামাজ শেষ করে আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষায় থাকে। [14]

4. **আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসাকারী দুই ব্যক্তি (رَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ):** যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, একত্রিত হয় এবং পৃথক হয়। [14]

5. **আল্লাহর ভয়ে নির্জনে ক্রন্দনকারী (رَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ):** যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয়। [14]

6. **প্রলোভন প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি (وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ):** যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত ও সুন্দরী নারী ব্যভিচারের জন্য আহ্বান করে, কিন্তু সে 'আমি আল্লাহকে ভয় করি' বলে তা প্রত্যাখ্যান করে। [14]

7. **গোপনে দানকারী (رَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ):** যে ব্যক্তি এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কী দান করল, তা বাম হাতও জানতে পারে না। [14]

(সহীহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩১) [14]

এই হাদিসটি সেই সাতটি মহান গুণের বর্ণনা দেয়, যা মানুষকে কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষা ও আশ্রয় লাভের যোগ্য করে তোলে।

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. বলেন, তিন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। যথা-

وَاصِلُ الرَّحِمِ يُمَدُّ لَهُ فِي عُمْرِهِ وَيُوَسَّعُ لَهُ فِي قَبْرِهِ وَرِزْقِهِ অর্থাৎ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। তার হায়াত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হয় এবং রিযিকে বরকত দান করা হয়।

وَامْرَأَةٌ مَّاتَ زَوْجُهَا وَتَرَكَ يَتَامَى فَتَقُومُ هِيَ عَلَى الْأَيْتَامِ حَتَّى يُغْنِيَهُمُ اللهُ أَوْ يَمُوتُوا অর্থাৎ, সে নারী, যার স্বামী মারা যায় এবং কয়েকজন এতিম রেখে যায়। আর সে বড় হওয়া পর্যন্ত বা নিজের মৃত্যু পর্যন্ত ইয়াতীম সন্তানের দায়িত্ব পালন করে।

وَالرَّجُلُ اتَّخَذَ طَعَامًا فَدَعَا إِلَيْهِ الْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি খাবারের ব্যবস্থা করে ইয়াতীম ও মিসকীনদের দাওয়াত খাওয়ায়।

عَنِ الْحَسَنِ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ : مَا خَطَا عَبْدُ خُطْوَتَيْنِ أَحَبَّ إِلَى اللهِ تَعَالَى مِنَ الْخُطْوَةِ إِلَى صَلَاةِ الْفَرِيضَةِ، وَخُطْوَةٍ إِلَى ذِي الرِحِمِ الْمَحْرَمِ. হযরত হাসান রহ. রাসূল থেকে বর্ণনা করেন, বান্দার দু'টি কদম আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় পদক্ষেপ। ১. ফরজ নামায আদায়ের জন্য তোলা কদম। ২. আত্মীয়ের প্রতি চলার কদম।

টিকাঃ
৩০৯. মুসনাদুল ফিরদাউস: হাদীস-৬২৮৩; মাকারিমুল আখলাক লি-ইবনে আবিদ দুনিয়া: হাদীস-২৪৫।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 নেকি ও রিযিকের বৃদ্ধি ঘটে পাঁচটি জিনিস দ্বারা

📄 নেকি ও রিযিকের বৃদ্ধি ঘটে পাঁচটি জিনিস দ্বারা


ইসলামে এমন কিছু আমল রয়েছে যা মানুষের পার্থিব জীবনে বরকত নিয়ে আসে এবং পরকালের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করে। এমন পাঁচটি বিশেষ আমল হলো:

1. **আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা (সিলাতুর রাহম):** আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা রিজিক ও হায়াত (জীবনকাল) বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার হায়াত বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 4, 11, 12] আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের বিপদে সাহায্য করা এবং তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা এর অন্তর্ভুক্ত।

2. **দান-সদকা করা:** আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করলে সম্পদ কমে না, বরং আল্লাহ তাআলা তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, "আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭৬) [26] হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, "হে আদম সন্তান, তুমি ব্যয় করো, আমিও তোমার জন্য ব্যয় করব।" (বুখারি ও মুসলিম) [12, 26] নিয়মিত সদকা শুধু সম্পদই বৃদ্ধি করে না, বিপদ-আপদ থেকেও রক্ষা করে।

3. **তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করা:** যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে জীবনযাপন করে এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহ তার জন্য অভাবনীয় উৎস থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য কোনো না কোনো পথ বের করে দেবেন। এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩) [12, 16]

4. **ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা:** বেশি বেশি ইস্তিগফার করা রিজিক ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত লাভের একটি পরীক্ষিত উপায়। হযরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।" (সূরা নূহ: ১০-১২) [12]

5. **শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা আদায় করা:** আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদেরকে আরও বেশি দেব।" (সূরা ইবরাহিম: ৭) [4, 12] নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে নেকি অর্জিত হয় এবং রিজিকের দরজা খুলে যায়।

বলা হয়ে থাকে, পাঁচটি আমল এমন আছে, যে সর্বদা তা করে, তার নেকির পাহাড় জমা হয় এবং রিযিক বৃদ্ধি পায়।
১. مَنْ دَاوَمَ عَلَى الصَّدَقَةِ، قَلَّتْ أَوْ كَثُرَتْ অর্থাৎ, যে কম-বেশি সর্বদা সদকা করে。
২. وَمَنْ وَصَلَ رَحِمَهُ، قَلَّ أَوْ كَثُرَ অর্থাৎ, যে কম-বেশি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।
৩. وَمَنْ دَاوَمَ عَلَى الْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ অর্থাৎ, যে সর্বদা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে。
৪. وَمَنْ دَاوَمَ عَلَى الْوُضُوءِ وَلَمْ يُسْرِفْ فِي صَبَّ الْمَاءِ অর্থাৎ, যে সর্বদা উযুর প্রতি যত্নবান হয়। তবে পানি অপচয় করে না।
৫. وَمَنْ أَطَاعَ وَالِدَيْهِ وَدَاوَمَ عَلَى طَاعَتِهِمَا অর্থাৎ, যে সর্বদা পিতা-মাতার আনুগত্য করে এবং তাতে অটল থাকে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px