📄 আত্মীয়তা বজায় রাখা দীর্ঘ জীবন লাভের কারণ
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার अनेक পার্থিব ও পারলৌকিক উপকারিতার মধ্যে অন্যতম হলো হায়াত বা জীবনকাল বৃদ্ধি পাওয়া।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি:
> "যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার হায়াত বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭) [1, 2, 4, 11, 12, 18, 20]
এই হাদিসটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা দীর্ঘ জীবনের একটি অন্যতম কারণ। 'হায়াত বৃদ্ধি' বলতে আলেমগণ দুটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
1. **আক্ষরিক অর্থ:** আল্লাহ তাআলা আক্ষরিক অর্থেই তার জীবনকাল বাড়িয়ে দেন। এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন এবং তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।
2. **আলঙ্কারিক অর্থ:** এর দ্বারা জীবনের বরকত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি তার জীবনে এত বেশি ভালো কাজ করার সুযোগ পাবে এবং তার জীবন এত বেশি ফলপ্রসূ হবে যে, তা একটি দীর্ঘ জীবনের সমান হয়ে যাবে। তার মৃত্যুর পরও তার সুনাম ও কীর্তি টিকে থাকবে, যা তার জীবনকে দীর্ঘায়িত করার শামিল।
উভয় ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য। মূল কথা হলো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে আল্লাহ তাআলা বান্দার জীবনে এমন কল্যাণ ও বরকত দান করেন, যা তার জীবনকে অর্থবহ ও দীর্ঘায়িত করে তোলে।
**কিভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়?**
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। যেমন:
* তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা।
* ফোন বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া।
* সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
* উপহার দেওয়া।
* তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা।
* আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে সাহায্য করা।
এই সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং এটিকে একটি কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দীর্ঘ জীবনের বরকত লাভ করা। [4, 6, 20]
عَنْ ثَوْبَانَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ : لَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ.
হযরত সাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেন, তাকদীর বদলাতে পারে একমাত্র দোয়া এবং হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে একমাত্র নেক আমল। আর মানুষ রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে আপন গুনাহের কারণে।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا قَالَ: مَنِ اتَّقَى رَبَّهُ وَوَصَلَ رَحِمَهُ أُنْسِيَ لَهُ فِي عُمْرِهِ، يَعْنِي يُزَادُ فِي عُمْরِهِ، وَثُرَّى لَهُ مَالُهُ، يَعْنِي كَثُرَ، وَأَحَبَّهُ أَهْلُهُ.
হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে তার হায়াত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তার সম্পদে বরকত দেওয়া হয় এবং তার পরিজনের নিকট তাকে প্রিয় করে দেওয়া হয়।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, হায়াত বৃদ্ধির ব্যাখ্যার ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ বলেন, হাদীসের বাহ্যিক অর্থই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, আত্মীয়তা রক্ষার ফলে প্রকৃত অর্থেই হায়াত বৃদ্ধি পায়। আবার কেউ বলেন, কোনো মানুষ নির্ধারিত সময়ের বেশি হায়াত পাবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ. অর্থ: যখন তাদের নিধারিত সময় এসে উপস্থিত হবে তখন তারা এক মুহূর্ত পিছিয়েও যাবে না, আগেও বাড়বে না। তবে হায়াত বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো, মৃত্যুর পরও তার আমলের সওয়াব জারী থাকবে। সওয়াব জারী থাকা মানে তো এক ধরনের জীবন বৃদ্ধিই।
عَنْ قَتَادَةَ أَنَّهُ قَالَ: ذُكِرَ لَنَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: اِتَّقُوا اللَّهَ وَصِلُوا الرَّحِمَ فَإِنَّهُ أَبْقَى لَكُمْ فِي الدُّنْيَا وَخَيْرٌ لَكُمْ فِي الْآخِرَةِ.
হযরত কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো। কারণ, এটা তোমার দুনিয়ার জীবনের জন্য স্থায়ীর কারণ এবং আখেরাতের জন্য কল্যাণকর।
প্রবাদ আছে, তোমার যদি কোনো আত্মীয় থাকে এবং পায়ে হেঁটে তার কাছে না যাও এবং তোমার সম্পদ থেকে তাকে কিছু দান না কর, তাহলে তুমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। পূর্বের কোনো আসমানী গ্রন্থে লেখা ছিল- يَا ابْنَ آدَمَ صِلْ رَحِمَكَ بِمَالِكَ، فَإِنْ بَخِلْتَ بِمَالِكَ أَوْ قَلَّ مَالُكَ فَامْشِ إِلَيْهِ بِرِجْلِكَ। হে আদম সন্তান! তোমার সম্পদ দিয়ে হলেও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো। যদি তুমি কৃপণ হও কিংবা তোমার সম্পদ কম থাকে তাহলে অন্তত পায়ে হেঁটে তার নিকট যাও।
নবী ইরশাদ করেন- صِلُوا أَرْحَامَكُمْ وَلَوْ بِالسَّلَامِ সালামের মাধ্যমে হলেও তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো।
হযরত মায়মুন ইবনে মেহরান রহ. বলেন, তিনটি বিষয়ে কাফের ও মুসলমান বরাবর। ১. ওয়াদা। ২. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ৩. আমানত। সুতরাং কারো সাথে ওয়াদা করলে তা পূর্ণ কর যার সাথে ওয়াদা করেছ সে কাফের হোক বা মুসলিম। যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে তার সাথে আত্মীয়তা রক্ষা করে যাও, চাই সে কাফের হোক বা মুসলিম। তোমার নিকট কেউ আমনত রাখলে তা ফিরিয়ে দাও, সে ব্যক্তি কাফের হোক বা মুসলিম।
হযরত কাব আল আহবার রহ. বলেন, যে সত্তা মূসা আ. ও বনী ইসরাইলের জন্য সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করে দিয়ে ছিলেন তার কসম! তাওরাতে এমন লেখা ছিলো যে, اتَّقِ رَبَّكَ، وَصِلْ رَحِمَكَ، أُمِدَّ لَكَ فِي عُمْرِكَ وَأُيَسِّرْكَ فِي يُسْرِكَ، وَأَصْرِفْ عَنْكَ عُسْرَكَ. অর্থাৎ, তোমার রবকে ভয় কর, পিতা-মাতার বাধ্য থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ। তাহলে আল্লাহ তোমার হায়াত বাড়িয়ে দিবেন, তোমার জন্য সব সহজ করে দিবেন এবং তোমার যাবতীয় কঠিনতা দূর করে দিবেন।
টিকাঃ
২৯৬. মুসনাদে আহমাদ: ৩৭/৬৮; সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-৯০; মুস্তাদ্রাকে হাকেম ১/৪৯৩। হাকেম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; যাহাবী রহ. তা সমর্থন করেছেন।
২৯৭. সূরা আরাফ: আয়াত-৩৪
২৯৮. ইবনে জারির তুবারী তার তাফসীরে ক্বাতাদা থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন [কানযুল উম্মাল : হাদীস-৬৯১১] ।
২৯৯. কাশফুল আস্তার লিল-বায্যার: হাদীস-১৮৭৭; কিতাবুল কাবায়ের লিয-যাহাবী: পৃষ্ঠা-১৮৬। শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 আত্মীয়দের হক
ইসলামে আত্মীয়-স্বজনের হক বা অধিকার আদায় করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একে বলা হয় 'সিলাতুর রাহম'। আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এ বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। আত্মীয়দের হক আদায় না করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা একটি বড় ধরনের গুনাহ।
**কুরআনের আলোকে আত্মীয়দের হক:**
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন স্থানে আত্মীয়দের হক আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
> "আর আত্মীয়-স্বজনকে তার হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।" (সূরা বনি ইসরাইল: ২৬) [15, 20]
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে আত্মীয়দের হক আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ মুত্তাকিদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
> "...এবং আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ ব্যয় করে..." (সূরা বাকারা: ১৭৭)
এখানেও আত্মীয়দের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
**হাদিসের আলোকে আত্মীয়দের হক:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসংখ্য হাদিসে আত্মীয়দের হক সম্পর্কে বলেছেন:
* **রিজিক ও হায়াত বৃদ্ধি:** আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (বুখারি ও মুসলিম) [4]
* **ঈমানের অঙ্গ:** আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (বুখারি ও মুসলিম) [4, 12]
* **সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না:** জুবাইর ইবনু মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10, 11, 12, 13, 14, 15, 16, 17, 18, 19, 20, 21, 22, 23, 24, 25, 26, 27, 28, 29, 30, 31, 32]
**আত্মীয়দের হকসমূহ:**
1. **সদাচরণ ও সম্মান:** তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা, সম্মান দেওয়া এবং তাদের খোঁজ-খবর রাখা।
2. **আর্থিক সহায়তা:** যদি তারা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাদের আর্থিক সাহায্য করা। আত্মীয়কে দান করলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়—এক. দানের সওয়াব, দুই. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব। [15]
3. **উপহার বিনিময়:** একে অপরকে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া, যা ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।
4. **সুখে-দুঃখে পাশে থাকা:** তাদের আনন্দ ও দুঃখে শরিক হওয়া। অসুস্থ হলে সেবা করা এবং বিপদে সাহায্য করা।
5. **ক্ষমা ও উদারতা:** তাদের কোনো ভুল বা কষ্টদায়ক আচরণকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজে থেকে উদ্যোগী হওয়া। রাসূল (ﷺ) বলেন, "সে ব্যক্তি প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়, যে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সম্পর্ক বজায় রাখে না। বরং প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী তো সে-ই, যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে তা পুনরায় স্থাপন করে।" (বুখারি) [10]
6. **হেদায়েতের পথে ডাকা:** তাদেরকে দ্বীনের পথে ডাকা, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।
আত্মীয়দের মধ্যে মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং তাদের সন্তানরা অন্তর্ভুক্ত। রক্তের সম্পর্কের দিক থেকে যে যত নিকটবর্তী, তার হক তত বেশি। [15, 20]
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তা'আলা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ . অর্থ: যার নামে তোমরা প্রার্থনা কর তাকে ভয় কর এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা কর। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর। অন্য এক আয়াতে এসেছে- وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ অর্থ : নিকট আত্মীয়দের হক আদায় কর। অর্থাৎ, নিকটাত্মীয়দেরকে তাদের হক দিয়ে দাও আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার কারণে। আরেক আয়াতে এসেছে- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ অর্থ : আল্লাহ তা'আলা তাওহীদ অবলম্বন এবং (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ করার আদেশ দেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এই সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর লোকদের প্রতি ইহসান তথা ক্ষমা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى. এবং নিকট আত্মীয়দের হক আদায়ের আদেশ করেন। অর্থাৎ, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এই মোট তিনটি নির্দেশ দেওয়া হলো। এরপর তিনটি জিনিস থেকে নিষেধ করা হয়েছে- وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ. এবং গুনাহ শরীয়ত বহির্ভূত কাজ ও জুলুম থেকে নিষেধ করেন।
আয়াতে فحشاء দ্বারা পাপ ও গুনাহ উদ্দেশ্য। আর منكر দ্বারা শরিয়াত বহির্ভূত কাজ উদ্দেশ্য। بغی দ্বারা বাড়াবাড়ি উদ্দেশ্য। يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ তিনি এই সব বিষয়ে তোমাদের উপদেশ দেন, আশা করা যায় তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা তিনটি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন, আর তিনটি বিষয়ের নিষেধাজ্ঞারোপ করেছেন, যাতে তোমরা নসীহত কবুল কর।
হযরত উসমান ইবনে মাজউন রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি যখন আমাকে প্রথম ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন, বন্ধুর আহ্বান কিভাবে ফিরিয়ে দেই এই লজ্জায় আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। মূলত ইসলাম গ্রহণ তখনও আমাদের মনে স্থান পায়নি। একদিন আমি তার কাছে গিয়ে বসলাম। তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মনে হল তিনি অন্য কারো সাথে কথা বলছেন। হঠাৎ তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, জিবরাঈল আ. এসেছিলেন এবং আমাকে এই শুনিয়ে দিলেন- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তাওহীদ অবলম্বন (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ এবং নিকট আত্মীয়দের হক আদায় করে দেওয়ার আদেশ করেন।
এতে আমি খুবই আনন্দিত হলাম এবং আমার হৃদয়ে ইসলাম ঢুকে গেল। সেখান থেকে উঠে আমি রাসূলের চাচা আবু তালিবের নিকট গিয়ে বললাম, আমি আপনার ভাতিজার সাথে বসে ছিলাম, তখন এই ওহী নাযিল হলো। আবূ তালিব বললেন, তোমরা মুহাম্মাদের অনুসরণ করে যাও, তাতে তোমরা সফলকাম হবে এবং সঠিক পথের সন্ধান লাভ করবে। আল্লাহর কসম সে সবাইকে উত্তম চরিত্রের প্রতি আহ্বান করে। সে সত্যবাদী হোক কিংবা মিথ্যাবাদী তাতে কী আসে যায়, সে তো তোমাদেরকে কল্যাণের প্রতি আহ্বান করছে। রাসূল এর কানে এই খবর গেলে তিনি চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। তখন তার নিকট গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু আবূ তালিব ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তখন এই আয়াত নাযিল হলো, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ অর্থ: নিশ্চয় তুমি যাকে পছন্দ কর তাকে হেদায়াত করতে পারবে না। বরং আল্লাহ যাকে খুশী তাকে হেদায়াত দান করেন। তিনি হেদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে বেশি জ্ঞাত।
টিকাঃ
৩০০. সুরা নিসা: আয়াত-১
৩০১. সূরা আল ইসরা: আয়াত-২৬
৩০২. সূরা নাহল: আয়াত-৯০
৩০৩. সূরা নাহল: আয়াত-৯০
৩০৪. সূরা কাসাস: আয়াত-৫৬। মুসনাদে আহমাদ ১/৩১৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হাদীস-৮৯৩।
📄 আত্মীয়তা ছিন্নকারীর উপর আল্লাহর লা'নত
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা একটি ফরজ ইবাদত এবং এটি ছিন্ন করা একটি কবিরা গুনাহ, যার জন্য কুরআন ও হাদিসে কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর উপর আল্লাহ তা'আলা অভিশাপ বা লা'নত বর্ষণ করেন। [9, 11]
**কুরআনের হুঁশিয়ারি:**
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদের পরিণতি সম্পর্কে বলেন:
> "ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত (লা'নত) করেন, অতঃপর তাদের বধির করে দেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহ অন্ধ করে দেন।" (সূরা মুহাম্মদ: ২২-২৩) [9]
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, যারা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, তারা আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত হয়। এর ফলে তাদের অন্তর থেকে সত্য গ্রহণের যোগ্যতা এবং সঠিক পথ দেখার ক্ষমতা লোপ পায়। [26]
আল্লাহ আরও বলেন:
> "যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্য রয়েছে লা'নত এবং তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।" (সূরা রাদ: ২৫) [9]
এখানেও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে আল্লাহ তা'আলার আদেশ লঙ্ঘনের সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং এর পরিণামে লা'নত ও নিকৃষ্ট আবাসের (জাহান্নাম) হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
**হাদিসের কঠোর বাণী:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। জুবাইর ইবনু মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
> "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10, 11, 12, 13, 14, 15, 16, 17, 18, 19, 20, 21, 22, 23, 24, 25, 26, 27, 28, 29, 30, 31, 32]
জান্নাতে প্রবেশ করতে না পারা আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে চিরতরে বঞ্চিত হওয়ার নামান্তর, যা আল্লাহর লা'নতেরই বহিঃপ্রকাশ।
আবু বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
> "অত্যাচার (যুলুম) ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা—এই দুটি গুনাহের শাস্তি আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতেই দেওয়া শুরু করেন এবং আখিরাতের শাস্তি তো রয়েছেই।" (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ) [14]
সুতরাং, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এমন একটি ভয়াবহ পাপ যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই আল্লাহর গজব ও লা'নত ডেকে আনে। এই পাপ থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
আত্মীয়তা ছিন্নকারীর উপর আল্লাহ লা'নত করেন। কুরআনে হাকীমে এসেছে- فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطَّعُوا أَرْحَامَكُمْ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ. অর্থ: তবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।
বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা'আলা আত্মীয়তা সৃষ্টি করার পর বললেন- أَنَا الرَّحْمَنُ وَأَنْتِ الرَّحِمُ، أَقْطَعُ مَنْ قَطَعَكِ، وَأَصِلُ مَنْ وَصَلَكِ. আমার নাম রহমান আর তোমার নাম রহিম (আত্মীয়তা)। তোমার সাথে যে সম্পর্ক বজায় রাখবে আমিও তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবো। আর তোমার সাথে যে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন করব।
বর্ণিত আছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক আরশের সাথে ঝুলে থাকে। রাত দিন এই আহ্বান করতে থাকে- يَا رَبِّ صِلْ مَنْ وَصَلَنِي فِيكَ، وَاقْطَعْ مَنْ قَطَعَنِي فِيكَ হে আল্লাহ! যে আমার সাথে সম্পর্ক রাখে আপনিও তার সাথে সম্পর্ক রাখুন। আর যে ব্যাক্তি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করুন।
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন- إِذَا أَظْهَرَ النَّاسُ الْعِلْمَ، وَضَيَّعُوا الْعَمَلَ، وَتَحَابُّوا بِالْأَلْسُنِ، وَتَبَاغَضُوا بِالْقُلُوبِ، وَتَقَاطَعُوا بِالْأَرْحَامِ، لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ. মানুষ যখন আমল পরিত্যাগ করে ইলম নিয়ে বড়াই শুরু করে, মুখে ভালোবাসার কথা বলে, আর অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখন আল্লাহ তাদের উপর লানত করেন এবং তাদের বধির ও অন্ধ বানিয়ে দেন।
টিকাঃ
৩০৫. সূরা মুহাম্মাদ: আয়াত-২২-২৩
৩০৬. সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-১৬৯৪; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৯০৭। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
৩০৭. সহীহ বুখারী: হাদীস-৫৯৮৯; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৫৫।
📄 শিক্ষণীয় ঘটনা
ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এবং তাঁদের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অবাধ্যতা বা তাঁদের মনে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেই প্রকাশ পেতে পারে। এই বিষয়ে ইতিহাসে অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে, যার মধ্যে দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
**১. হযরত আলকামা (রা.)-এর ঘটনা:**
হযরত আলকামা (রা.) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একজন ইবাদতগুজার সাহাবী ছিলেন। তিনি নামাজ, রোজা ও দান-সদকায় অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি বেশি মনোযোগ দিতেন এবং মায়ের প্রতি কিছুটা উদাসীন ছিলেন, যা তাঁর মাকে কষ্ট দিত। মৃত্যুর সময় যখন তাঁর জিহ্বা দিয়ে কালেমা বের হচ্ছিল না, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মাকে ডেকে পাঠান। মা তাঁর ছেলের প্রতি অসন্তুষ্টির কথা জানালে রাসূল (ﷺ) বলেন যে, এই অসন্তুষ্টির কারণেই আলকামার মুখ বন্ধ হয়ে গেছে।
রাসূল (ﷺ) তখন সাহাবিদেরকে কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালাতে বলেন, যাতে আলকামাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। মায়ের মন এতে বিগলিত হয়ে যায় এবং তিনি চিৎকার করে বলেন যে, তিনি তাঁর সন্তানকে পুড়তে দেখতে পারবেন না। তখন রাসূল (ﷺ) বলেন, "আল্লাহর আজাব এর চেয়েও কঠিন। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন, তার কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।" একথা শুনে মা সাথে সাথে ছেলেকে ক্ষমা করে দেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। এরপরই আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে সক্ষম হন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, মায়ের অসন্তুষ্টি সন্তানের পরকালের জন্য কত বড় বাধা হতে পারে। [22, 25, 30, 31]
**২. গাধার মতো মুখবিশিষ্ট যুবকের ঘটনা:**
একজন সাহাবী, শাহর ইবনে হাওশাব (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি আসরের পর কবরস্থান দিয়ে যাওয়ার সময় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখেন। একটি কবর থেকে এমন এক ব্যক্তি বের হলো যার মাথাটি গাধার মতো এবং শরীর মানুষের মতো। সে তিনবার গাধার মতো বিকট স্বরে চিৎকার করে আবার কবরে ফিরে গেল। [32]
এই দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে লোকটির মায়ের কাছে এর কারণ জানতে চান। মা জানান যে, তার ছেলে জীবিত থাকা অবস্থায় মদ্যপ ছিল। তিনি যখন তাকে নিষেধ করতেন, তখন ছেলে বলত, "আপনি তো গাধার মতো চিৎকার করেন।" মায়ের প্রতি এই চরম অবমাননাকর আচরণের কারণেই মৃত্যুর পর তার আকৃতি এমন বিকৃত হয়ে গিয়েছিল এবং সে প্রতিদিন কবর থেকে উঠে এভাবে চিৎকার করত। [32]
এই দুটি ঘটনা পিতা-মাতার প্রতি অবাধ্যতার ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে এক কঠোর সতর্কবার্তা। প্রথম ঘটনাটি পরকালীন মুক্তির পথে বাধার দৃষ্টান্ত, আর দ্বিতীয়টি দুনিয়াতেই (কবরের জীবনে) নেমে আসা শাস্তির এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সালিম রহ. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, মক্কায় আমাদের সাথে খোরাসানের এক ব্যক্তি থাকত। লোকটি খুবই সৎ ছিল। মানুষ তার নিকট আমানত রাখত। এক ব্যক্তি তার নিকট দশ হাজার দীনার আমানত রেখে কোনো কাজে বাহিরে চলে যায়। ফিরে এসে সে জানতে পারে যে লোকটি মারা গেছে। সে তার ছেলে সন্তান ও আত্মীয় স্বজনদের সম্পদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু কোনো হদিস পেল না। তখন সে মক্কায় ফিরে এসে ফকীহদের নিকট বিষয়টি জানালেন। তারা বললেন, আমরা আশা করি লোকটি জান্নাতবাসী হয়েছেন। কাজেই তুমি রাতের এক তৃতীয়াংশ বা মধ্যরাতে যমযম কূপের নিকট গিয়ে ডেকে বলবে, হে অমুকের ছেলে অমুক! আমি অমুকের ছেলে অমুক, তোমার নিকট আমানত রেখেছিলাম। তাদের কথা অনুসারে সে পরপর তিন রাত এই রূপ করল। কিন্তু কেউ তার কথার কোনো জবাব দিল না। সে ফকীহদেরকে ব্যাপারটা জানালে, তারা বললেন, ইন্নালিল্লাহ! আমাদের আশঙ্কা হয় যে, খোরাসানী ব্যক্তি জাহান্নামবাসী হয়নি তো। তুমি ইয়েমেনে চলে যাও, সেখানে দেখবে 'বারহুত' নামে এক কূপ আছে। মাঝ রাতে সেখানে গিয়ে আগের মত ডেকে বলবে, হে অমুকের পুত্র অমুক! আমি অমুককে তোমার নিকট আমানত রেখেছিলাম। তাদের আদেশ অনুসারে সে উক্ত কূপের নিকট গিয়ে ডাক দিতেই খোরাসানী সাড়া দিল। সে বলল, হায়রে কপাল! তুমি জাহান্নামে কেন, তুমি তো খুব ভালো লোক ছিল? সে বলল, খোরাসানে আমার কিছু আত্মীয় ছিল, আমি তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতাম না। সে অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হয়। ফলে আল্লাহ এই অপরাধের কারণে আমাকে পাকড়াও করলেন এবং আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করলেন। যাই হোক! তোমার আমানত রক্ষিত আছে। সে সম্পদের ব্যাপারে আমি আমার ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারিনি। তাই অমুক ঘরের মাটির নিচে তা পুতে রেখেছি। তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে আমার ছেলেকে বলবে, সে তোমাকে সে ঘরের সন্ধ্যান দিবে। সে তার কথা মত উক্ত ঘরে গিয়ে মাটি খুঁড়ে দেখল, সেখানে ঠিক তার দেওয়া দশ হাজার দীনার পুঁতে রাখা আছে।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, যদি ব্যক্তি নিকটাত্মীয়দের কাছে থাকে, তাহলে তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করা ও হাদিয়া পাঠানোর মাধ্যমে আত্মীয়তার রক্ষা করা। আর যদি সম্পদ দিয়ে সম্পর্ক রক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত তাদের নিকট আসা-যাওয়া করা। প্রয়োজনে তাদের কাজে সহযোগিতা করা। আর যদি তারা দূরে থাকেন তাহলে খোঁজ-খবরের মাধ্যমে তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে যদি যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া উত্তম।