📄 আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এবং নবী করিম (ﷺ) তাঁর হাদিসে এ বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে একটি মারাত্মক গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং এর পরিণতি হিসেবে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। [2, 3]
**কুরআনের আলোকে:**
আল্লাহ তাআলা বলেন:
> "ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির করে দেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহ অন্ধ করে দেন।" (সূরা মুহাম্মদ: ২২-২৩) [9]
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ওপর আল্লাহর লা'নত বা অভিশাপ বর্ষিত হয়। [26]
**হাদিসের আলোকে:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
> "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10, 11, 12, 13, 14, 15, 16, 17, 18, 19, 20, 21, 22, 23, 24, 25, 26, 27, 28, 29, 30, 31, 32]
এই হাদিসটি অত্যন্ত কঠোরভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহতা বর্ণনা করে। জান্নাতে প্রবেশ করতে না পারা মানেই হলো আল্লাহর চিরস্থায়ী রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া।
অন্য একটি হাদিসে রাসূল (ﷺ) বলেন:
> "(আল্লাহর) রহমত ঐ কওমের উপর অবতীর্ণ হয় না, যাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি থাকে।" (শু'আবুল ঈমান, বায়হাকী)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, একজন ব্যক্তির কারণে পুরো সমাজ বা সম্প্রদায় আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
**আত্মীয়তার সম্পর্ক (রেহেম) এর আবেদন:**
একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা যখন 'রেহেম' বা আত্মীয়তার সম্পর্ককে সৃষ্টি করলেন, তখন সে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে আরজ করল, 'এটা কি সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনার স্থান?' আল্লাহ বললেন, 'হ্যাঁ। তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যে তোমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব। আর যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব?' রেহেম বলল, 'হ্যাঁ, হে আমার রব! আমি এতে সন্তুষ্ট।' আল্লাহ বললেন, 'তবে তোমার জন্য তাই হলো।' (বুখারি)
এই হাদিস থেকে পরিষ্কার যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রক্ষার শামিল। যে এই সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ তার সাথে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন এবং তাকে তাঁর রহমত থেকে দূরে ঠেলে দেন। তাই, যেকোনো মূল্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ : كُنَّا جُلُوسًا عَشِيَّةَ عَرَفَةَ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لَا يُجَالِسُنِي مَنْ أَمْسَى قَاطِعَ الرَّحِمِ لِيَقُمْ عَنَّا فَلَمْ يَقُمْ أَحَدٌ إِلَّا رَجُلٌ كَانَ مِنْ أَقْصَى الْخَلْقَةِ، فَمَكَথَ غَيْرَ بَعِيدٍ. ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَا لَكَ لَمْ يَقُمْ أَحَدٌ مِنَ الْخَلْقَةِ غَيْرُكَ؟ قَالَ : يَا نَبِيَّ اللهِ سَمِعْتُ الَّذِي قُلْتَ، فَأَتَيْتُ خَالَةً لِي كَانَتْ تُصَارِمُنِي، أَيْ تُقَاطِعُنِي، فَقَالَتْ : مَا جَاءَ بِكَ؟ مَا هُذَا مِنْ دَأْبِكَ فَأَخْبَرْتُهَا بِالَّذِي قُلْتَ، فَاسْتَغْفَرَتْ لِي وَاسْتَغْفَرْتُ لَهَا. فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَحْسَنْتَ اجْلِسْ إِلَّا إِنَّ الرَّحْمَةَ لَا تَنْزِلُ عَلَى قَوْمٍ فِيهِمْ قَاطِعُ رَحِمٍ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবূ আওফা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আরাফার সন্ধ্যায় আমরা রাসূল ﷺ-এর নিকট বসা ছিলাম। তখন রাসূল ﷺ ইরশাদ করলেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি যেন আমার সাথে না বসে। সে যেন আমাদের মজলিস থেকে উঠে যায়। তখন মজলিসের এক কোণ থেকে একজন ব্যক্তি উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এল। রাসূল ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, তুমি মজলিস থেকে উঠে গেলে আবার ফিরে এলে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এক খালা আছেন, সে আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন না। আমি তার নিকট গেলাম। সে আমাকে বলল, কোন জিনিস তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে, সাধারণত তুমি আমার নিকট আসো না? আমি আপনার কথা তার নিকট গিয়ে বললাম। তিনি শুনে আমার মাগফেরাতের দোয়া করলেন এবং আমি তার মাগফেরাতের দোয়া করলাম। রাসূল ﷺ বললেন, খুব ভালো কাজ করেছ। আমাদের সাথে বসে যাও। মনে রেখো! আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি যে দলের মাঝে থাকে তাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হয় না।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। কেননা, এর ফলে যে এই কাজ করে তার উপর রহমত নাযিল হয় না। এমনকি তার আশেপাশে যারা থাকে তাদের উপরও আল্লাহর রহমত নাযিল হয় না। তাই কেউ যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকে, তাহলে তার উচিত তাওবা করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং পুনরায় আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করা। কারণ, এর আগের একটি হাদীসে আমরা দেখেছি রাসূল ﷺ বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা মানুষকে জান্নাতের নিকটবর্তী করে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: مَا مِنْ حَسَنَةٍ أَعْجَلُ ثَوَابًا مِنْ صِلَةِ الرَّحِمِ وَمَا مِنْ ذَنْبٍ أَجْدَرُ أَنْ يُعَجِّلَ اللهُ لِصَاحِبِهِ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا، مَعَ مَا يُدَّخَرُ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْبَغْيِ وَقَطِيعَةِ الرَّحِمِ.
নবী কারীম ইরশাদ করেন, সেলায়ে রেহমী তথা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার চেয়ে দ্রুত কোনো আমলের সওয়াব পাওয়া যায় না। আর ব্যভিচার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হলো এমন গুনাহ যার শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতেও দেন এবং আখেরাতেও দেন।
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ : جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ: إِنَّ لِي أَرْحَامًا، أَصِلُ وَيَقْطَعُونِي، وَأَعْفُو وَيَظْلِمُونِي، وَأُحْسِنُ وَيُسِيئُونِي، أَفَأُ كَافِتُهُمْ؟ قَالَ: لَا إِذْنَ تَشْتَرِكُونَ جَمِيعًا، وَلَكِنْ خُذْ بِالْفَضْلِ وَصِلْهُمْ، فَإِنَّهُ لَنْ يَزَالَ مَعَكَ ظَهِيرُ مِنَ اللَّهِ مَا كُنْتَ عَلَى ذَلِكَ.
হযরত আমর ইবনে শুয়াইব তার পিতার সূত্রে তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আছে, আমি তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখি, কিন্তু তারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আমি তাদের ক্ষমা করে দেই, কিন্তু তারা আমার উপর জুলুম করে, আমি তাদের সাথে ভালো আচরণ করি, কিন্তু তারা আমার সাথে মন্দ আচরণ করে এখন আমি তাদের বদলায় তাদের অনুরূপ আচরণ করব? রাসূল ﷺ বললেন, না, তাহলে তো তোমরা সকলেই নেক কাজ তরককারী হয়ে গুনাহের ভাগী হবে। বরং তুমি তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ। যতক্ষণ তুমি এই অবস্থায় থাকবে ততক্ষণ আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সাহায্যকারী তোমার সাথে থাকবেন।
টিকাঃ
২৯২. আত-তারগীব লিল-আসবাহানী : হাদীস-২২৯০; আত-তারগীব লিল-মুনযিরী: ৩/২৭২; জয়ীফুল জামে': হাদীস-১৪৬৩।
২৯৩. সুনানে আবী দাউদ : হাদীস-৪৯০২; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৫১১; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২১১। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
২৯৪. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৫৮, মুসনাদে আহমাদ: ১৫/১৯৭।
📄 জান্নাতীদের স্বভাব ও চরিত্র
জান্নাতীরা হবেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাদের অন্তর হবে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও যাবতীয় মন্দ স্বভাব থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে জান্নাতীদের বিভিন্ন গুণাবলী ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
**কুরআনের বর্ণনা:**
আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের সম্পর্কে বলেন:
> "আর তাদের অন্তরে যা কিছু বিদ্বেষ ছিল, আমি তা দূর করে দেব; তারা ভাইয়ের মতো পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে।" (সূরা হিজর: ৪৭) [21, 26]
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, জান্নাতে প্রবেশের পূর্বে আল্লাহ তাআলা জান্নাতীদের অন্তরকে সব ধরনের কলুষতা থেকে পবিত্র করে দেবেন, যাতে তাদের মধ্যে কোনো প্রকারের শত্রুতা বা হিংসা অবশিষ্ট না থাকে। [21, 26]
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
> "তাদের (জান্নাতীদের) মন থেকে আমি বিদ্বেষ দূর করে দেব, তাদের তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে। তারা বলবে, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাদেরকে এর পথ দেখিয়েছেন।'" (সূরা আরাফ: ৪৩) [21]
জান্নাতীরা হবেন কৃতজ্ঞ এবং আল্লাহর প্রশংসায় সর্বদা মগ্ন থাকবেন। তাদের কথাবার্তা হবে সুন্দর, শালীন ও শান্তিदायक। আল্লাহ বলেন:
> "সেখানে তারা কোনো অনর্থক ও পাপপূর্ণ কথা শুনবে না, শুধু শুনবে সালাম আর সালাম।" (সূরা ওয়াকিয়াহ: ২৫-২৬) [21]
**হাদিসের বর্ণনা:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেছেন:
> "জান্নাতে প্রথম যে দলটি প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল। তারপর যারা প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারার মতো। তারা প্রস্রাব-পায়খানা করবে না, তাদের নাকে শ্লেষ্মা আসবে না এবং তারা থুথুও ফেলবে না। তাদের চিরুনি হবে স্বর্ণের, তাদের ঘাম হবে কস্তুরীর মতো সুগন্ধযুক্ত। তাদের ধূপদানি হবে চন্দন কাঠের। তাদের স্ত্রীগণ হবে ডাগরচোখা হুর। তারা সকলেই এক ব্যক্তির আকৃতিতে (আদম আ.-এর মতো ৬০ হাত লম্বা) হবে এবং তাদের অন্তর হবে এক ও অভিন্ন। তাদের মধ্যে কোনো মতভেদ বা পারস্পরিক বিদ্বেষ থাকবে না। তারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করবে।" (সহীহ বুখারি ও মুসলিম) [21]
**অন্যান্য গুণাবলী:**
* **সত্যবাদিতা:** জান্নাতীরা হবেন সত্যবাদী।
* **বিনয়:** তারা হবেন বিনয়ী ও নিরহংকারী।
* **উদারতা:** তাদের অন্তর হবে প্রশস্ত ও উদার।
* **ধৈর্য ও ক্ষমা:** তারা হবেন ধৈর্যশীল এবং ক্ষমাশীল।
সংক্ষেপে, জান্নাতীরা হবেন সেই সকল মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা শারীরিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চারিত্রিক মাধুর্যের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করবেন। তাদের জীবন হবে শান্তি, সম্প্রীতি ও অফুরন্ত আনন্দে পরিপূর্ণ।
বলা হয়, জান্নাতবাসীর তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা কেবল কামেল মানুষের মধ্যেই পাওয়া যায়। যথা- ১. الْإِحْسَانُ إِلَى الْمُسِيءِ অর্থাৎ, মন্দ আচরণকারীর প্রতি সদাচার করা। ২. وَالْعَفْوُ عَمَّنْ ظَلَمَهُ অর্থাৎ, জালিমের জুলুম মার্জনা করা। ৩. وَالْبَذْلُ لِمَنْ حَرَمَهُ অর্থাৎ, যে বঞ্চিত করে তাকে দান করা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- يَمْحُو اللَّهُ مَا يَشَاءُ وَيُثْبِتُ অর্থ: আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দিবেন, যা ইচ্ছা অবশিষ্ট রাখবেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত যাহ্হাক ইবনে মুযাহিম রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তার হায়াতের যদি তিন দিনও বাকী থাকে আল্লাহ তা'আলা তাকে ত্রিশ বছর বানিয়ে দিতে পারেন। আবার যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তার হায়াতের যদি ত্রিশ বছরও বাকী থাকে, আল্লাহ তা কমিয়ে তিন দিনে নিয়ে আসতে পারেন।
টিকাঃ
২৯৫. সুরা রাদ: আয়াত-৩৯
📄 আত্মীয়তা বজায় রাখা দীর্ঘ জীবন লাভের কারণ
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার अनेक পার্থিব ও পারলৌকিক উপকারিতার মধ্যে অন্যতম হলো হায়াত বা জীবনকাল বৃদ্ধি পাওয়া।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে সুসংবাদ দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি:
> "যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার হায়াত বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭) [1, 2, 4, 11, 12, 18, 20]
এই হাদিসটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা দীর্ঘ জীবনের একটি অন্যতম কারণ। 'হায়াত বৃদ্ধি' বলতে আলেমগণ দুটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
1. **আক্ষরিক অর্থ:** আল্লাহ তাআলা আক্ষরিক অর্থেই তার জীবনকাল বাড়িয়ে দেন। এটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন এবং তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।
2. **আলঙ্কারিক অর্থ:** এর দ্বারা জীবনের বরকত বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি তার জীবনে এত বেশি ভালো কাজ করার সুযোগ পাবে এবং তার জীবন এত বেশি ফলপ্রসূ হবে যে, তা একটি দীর্ঘ জীবনের সমান হয়ে যাবে। তার মৃত্যুর পরও তার সুনাম ও কীর্তি টিকে থাকবে, যা তার জীবনকে দীর্ঘায়িত করার শামিল।
উভয় ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য। মূল কথা হলো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে আল্লাহ তাআলা বান্দার জীবনে এমন কল্যাণ ও বরকত দান করেন, যা তার জীবনকে অর্থবহ ও দীর্ঘায়িত করে তোলে।
**কিভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়?**
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। যেমন:
* তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা।
* ফোন বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া।
* সুখে-দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
* উপহার দেওয়া।
* তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা।
* আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে সাহায্য করা।
এই সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং এটিকে একটি কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দীর্ঘ জীবনের বরকত লাভ করা। [4, 6, 20]
عَنْ ثَوْبَانَ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ : لَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ، وَلَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ.
হযরত সাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেন, তাকদীর বদলাতে পারে একমাত্র দোয়া এবং হায়াত বৃদ্ধি করতে পারে একমাত্র নেক আমল। আর মানুষ রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে আপন গুনাহের কারণে।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا قَالَ: مَنِ اتَّقَى رَبَّهُ وَوَصَلَ رَحِمَهُ أُنْسِيَ لَهُ فِي عُمْرِهِ، يَعْنِي يُزَادُ فِي عُمْরِهِ، وَثُرَّى لَهُ مَالُهُ، يَعْنِي كَثُرَ، وَأَحَبَّهُ أَهْلُهُ.
হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে তার হায়াত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তার সম্পদে বরকত দেওয়া হয় এবং তার পরিজনের নিকট তাকে প্রিয় করে দেওয়া হয়।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, হায়াত বৃদ্ধির ব্যাখ্যার ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ বলেন, হাদীসের বাহ্যিক অর্থই উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, আত্মীয়তা রক্ষার ফলে প্রকৃত অর্থেই হায়াত বৃদ্ধি পায়। আবার কেউ বলেন, কোনো মানুষ নির্ধারিত সময়ের বেশি হায়াত পাবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ. অর্থ: যখন তাদের নিধারিত সময় এসে উপস্থিত হবে তখন তারা এক মুহূর্ত পিছিয়েও যাবে না, আগেও বাড়বে না। তবে হায়াত বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো, মৃত্যুর পরও তার আমলের সওয়াব জারী থাকবে। সওয়াব জারী থাকা মানে তো এক ধরনের জীবন বৃদ্ধিই।
عَنْ قَتَادَةَ أَنَّهُ قَالَ: ذُكِرَ لَنَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: اِتَّقُوا اللَّهَ وَصِلُوا الرَّحِمَ فَإِنَّهُ أَبْقَى لَكُمْ فِي الدُّنْيَا وَخَيْرٌ لَكُمْ فِي الْآخِرَةِ.
হযরত কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো। কারণ, এটা তোমার দুনিয়ার জীবনের জন্য স্থায়ীর কারণ এবং আখেরাতের জন্য কল্যাণকর।
প্রবাদ আছে, তোমার যদি কোনো আত্মীয় থাকে এবং পায়ে হেঁটে তার কাছে না যাও এবং তোমার সম্পদ থেকে তাকে কিছু দান না কর, তাহলে তুমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। পূর্বের কোনো আসমানী গ্রন্থে লেখা ছিল- يَا ابْنَ آدَمَ صِلْ رَحِمَكَ بِمَالِكَ، فَإِنْ بَخِلْتَ بِمَالِكَ أَوْ قَلَّ مَالُكَ فَامْشِ إِلَيْهِ بِرِجْلِكَ। হে আদম সন্তান! তোমার সম্পদ দিয়ে হলেও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো। যদি তুমি কৃপণ হও কিংবা তোমার সম্পদ কম থাকে তাহলে অন্তত পায়ে হেঁটে তার নিকট যাও।
নবী ইরশাদ করেন- صِلُوا أَرْحَامَكُمْ وَلَوْ بِالسَّلَامِ সালামের মাধ্যমে হলেও তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো।
হযরত মায়মুন ইবনে মেহরান রহ. বলেন, তিনটি বিষয়ে কাফের ও মুসলমান বরাবর। ১. ওয়াদা। ২. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ৩. আমানত। সুতরাং কারো সাথে ওয়াদা করলে তা পূর্ণ কর যার সাথে ওয়াদা করেছ সে কাফের হোক বা মুসলিম। যার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে তার সাথে আত্মীয়তা রক্ষা করে যাও, চাই সে কাফের হোক বা মুসলিম। তোমার নিকট কেউ আমনত রাখলে তা ফিরিয়ে দাও, সে ব্যক্তি কাফের হোক বা মুসলিম।
হযরত কাব আল আহবার রহ. বলেন, যে সত্তা মূসা আ. ও বনী ইসরাইলের জন্য সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করে দিয়ে ছিলেন তার কসম! তাওরাতে এমন লেখা ছিলো যে, اتَّقِ رَبَّكَ، وَصِلْ رَحِمَكَ، أُمِدَّ لَكَ فِي عُمْرِكَ وَأُيَسِّرْكَ فِي يُسْرِكَ، وَأَصْرِفْ عَنْكَ عُسْرَكَ. অর্থাৎ, তোমার রবকে ভয় কর, পিতা-মাতার বাধ্য থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ। তাহলে আল্লাহ তোমার হায়াত বাড়িয়ে দিবেন, তোমার জন্য সব সহজ করে দিবেন এবং তোমার যাবতীয় কঠিনতা দূর করে দিবেন।
টিকাঃ
২৯৬. মুসনাদে আহমাদ: ৩৭/৬৮; সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-৯০; মুস্তাদ্রাকে হাকেম ১/৪৯৩। হাকেম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; যাহাবী রহ. তা সমর্থন করেছেন।
২৯৭. সূরা আরাফ: আয়াত-৩৪
২৯৮. ইবনে জারির তুবারী তার তাফসীরে ক্বাতাদা থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন [কানযুল উম্মাল : হাদীস-৬৯১১] ।
২৯৯. কাশফুল আস্তার লিল-বায্যার: হাদীস-১৮৭৭; কিতাবুল কাবায়ের লিয-যাহাবী: পৃষ্ঠা-১৮৬। শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 আত্মীয়দের হক
ইসলামে আত্মীয়-স্বজনের হক বা অধিকার আদায় করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একে বলা হয় 'সিলাতুর রাহম'। আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এ বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়েছেন। আত্মীয়দের হক আদায় না করা বা সম্পর্ক ছিন্ন করা একটি বড় ধরনের গুনাহ।
**কুরআনের আলোকে আত্মীয়দের হক:**
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন স্থানে আত্মীয়দের হক আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
> "আর আত্মীয়-স্বজনকে তার হক দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না।" (সূরা বনি ইসরাইল: ২৬) [15, 20]
এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে আত্মীয়দের হক আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ মুত্তাকিদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
> "...এবং আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ ব্যয় করে..." (সূরা বাকারা: ১৭৭)
এখানেও আত্মীয়দের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
**হাদিসের আলোকে আত্মীয়দের হক:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসংখ্য হাদিসে আত্মীয়দের হক সম্পর্কে বলেছেন:
* **রিজিক ও হায়াত বৃদ্ধি:** আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (বুখারি ও মুসলিম) [4]
* **ঈমানের অঙ্গ:** আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (বুখারি ও মুসলিম) [4, 12]
* **সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না:** জুবাইর ইবনু মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (বুখারি ও মুসলিম) [2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9, 10, 11, 12, 13, 14, 15, 16, 17, 18, 19, 20, 21, 22, 23, 24, 25, 26, 27, 28, 29, 30, 31, 32]
**আত্মীয়দের হকসমূহ:**
1. **সদাচরণ ও সম্মান:** তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা, সম্মান দেওয়া এবং তাদের খোঁজ-খবর রাখা।
2. **আর্থিক সহায়তা:** যদি তারা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাদের আর্থিক সাহায্য করা। আত্মীয়কে দান করলে দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যায়—এক. দানের সওয়াব, দুই. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব। [15]
3. **উপহার বিনিময়:** একে অপরকে হাদিয়া বা উপহার দেওয়া, যা ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।
4. **সুখে-দুঃখে পাশে থাকা:** তাদের আনন্দ ও দুঃখে শরিক হওয়া। অসুস্থ হলে সেবা করা এবং বিপদে সাহায্য করা।
5. **ক্ষমা ও উদারতা:** তাদের কোনো ভুল বা কষ্টদায়ক আচরণকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য নিজে থেকে উদ্যোগী হওয়া। রাসূল (ﷺ) বলেন, "সে ব্যক্তি প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়, যে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সম্পর্ক বজায় রাখে না। বরং প্রকৃত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী তো সে-ই, যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে তা পুনরায় স্থাপন করে।" (বুখারি) [10]
6. **হেদায়েতের পথে ডাকা:** তাদেরকে দ্বীনের পথে ডাকা, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা।
আত্মীয়দের মধ্যে মা-বাবা, ভাই-বোন, চাচা-ফুফু, মামা-খালা এবং তাদের সন্তানরা অন্তর্ভুক্ত। রক্তের সম্পর্কের দিক থেকে যে যত নিকটবর্তী, তার হক তত বেশি। [15, 20]
কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তা'আলা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ . অর্থ: যার নামে তোমরা প্রার্থনা কর তাকে ভয় কর এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা কর। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলাকে ভয় কর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে ভয় কর। অন্য এক আয়াতে এসেছে- وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ অর্থ : নিকট আত্মীয়দের হক আদায় কর। অর্থাৎ, নিকটাত্মীয়দেরকে তাদের হক দিয়ে দাও আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার কারণে। আরেক আয়াতে এসেছে- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ অর্থ : আল্লাহ তা'আলা তাওহীদ অবলম্বন এবং (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ করার আদেশ দেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এই সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর লোকদের প্রতি ইহসান তথা ক্ষমা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى. এবং নিকট আত্মীয়দের হক আদায়ের আদেশ করেন। অর্থাৎ, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এই মোট তিনটি নির্দেশ দেওয়া হলো। এরপর তিনটি জিনিস থেকে নিষেধ করা হয়েছে- وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ. এবং গুনাহ শরীয়ত বহির্ভূত কাজ ও জুলুম থেকে নিষেধ করেন।
আয়াতে فحشاء দ্বারা পাপ ও গুনাহ উদ্দেশ্য। আর منكر দ্বারা শরিয়াত বহির্ভূত কাজ উদ্দেশ্য। بغی দ্বারা বাড়াবাড়ি উদ্দেশ্য। يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ তিনি এই সব বিষয়ে তোমাদের উপদেশ দেন, আশা করা যায় তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা তিনটি বিষয়ের আদেশ প্রদান করেছেন, আর তিনটি বিষয়ের নিষেধাজ্ঞারোপ করেছেন, যাতে তোমরা নসীহত কবুল কর।
হযরত উসমান ইবনে মাজউন রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি যখন আমাকে প্রথম ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন, বন্ধুর আহ্বান কিভাবে ফিরিয়ে দেই এই লজ্জায় আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। মূলত ইসলাম গ্রহণ তখনও আমাদের মনে স্থান পায়নি। একদিন আমি তার কাছে গিয়ে বসলাম। তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মনে হল তিনি অন্য কারো সাথে কথা বলছেন। হঠাৎ তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, জিবরাঈল আ. এসেছিলেন এবং আমাকে এই শুনিয়ে দিলেন- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তাওহীদ অবলম্বন (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ এবং নিকট আত্মীয়দের হক আদায় করে দেওয়ার আদেশ করেন।
এতে আমি খুবই আনন্দিত হলাম এবং আমার হৃদয়ে ইসলাম ঢুকে গেল। সেখান থেকে উঠে আমি রাসূলের চাচা আবু তালিবের নিকট গিয়ে বললাম, আমি আপনার ভাতিজার সাথে বসে ছিলাম, তখন এই ওহী নাযিল হলো। আবূ তালিব বললেন, তোমরা মুহাম্মাদের অনুসরণ করে যাও, তাতে তোমরা সফলকাম হবে এবং সঠিক পথের সন্ধান লাভ করবে। আল্লাহর কসম সে সবাইকে উত্তম চরিত্রের প্রতি আহ্বান করে। সে সত্যবাদী হোক কিংবা মিথ্যাবাদী তাতে কী আসে যায়, সে তো তোমাদেরকে কল্যাণের প্রতি আহ্বান করছে। রাসূল এর কানে এই খবর গেলে তিনি চাচার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠেন। তখন তার নিকট গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু আবূ তালিব ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তখন এই আয়াত নাযিল হলো, إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ অর্থ: নিশ্চয় তুমি যাকে পছন্দ কর তাকে হেদায়াত করতে পারবে না। বরং আল্লাহ যাকে খুশী তাকে হেদায়াত দান করেন। তিনি হেদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে বেশি জ্ঞাত।
টিকাঃ
৩০০. সুরা নিসা: আয়াত-১
৩০১. সূরা আল ইসরা: আয়াত-২৬
৩০২. সূরা নাহল: আয়াত-৯০
৩০৩. সূরা নাহল: আয়াত-৯০
৩০৪. সূরা কাসাস: আয়াত-৫৬। মুসনাদে আহমাদ ১/৩১৮; আল-আদাবুল মুফরাদ হাদীস-৮৯৩।