📄 মানুষের সৌভাগ্য
**মুত্তাকীর পরিচয়**
عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، أَنَّ عُمَرَ، وَأُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ، وَأَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمْ، دَخَلُوا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَعْلَمُ النَّاسِ؟ قَالَ : الْعَاقِلُ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ : مَنْ أَعْبَدُ النَّاسِ ؟ قَالَ : الْعَاقِلُ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ : مَنْ أَفْضَلُ النَّاسِ؟ قَالَ : الْعَاقِلُ . قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ : أَلَيْسَ الْعَاقِلُ مَنْ تَمَّتْ مُرُوءَتُهُ، وَظَهَرَتْ فَصَاحَتُهُ، وَجَادَتْ كَفُهُ، وَعَظُمَتْ مَنْزِلَتُهُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : وَإِنْ كُلُّ ذَلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُتَّقِينَ، الْعَاقِلُ الْمُتَّقِي وَإِنْ كَانَ فِي الدُّنْيَا خَسِيسًا دَنِيئًا. يَعْنِي بِالْمُتَّقِي الَّذِي يَتَّقِي اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ، وَيَتَّقِي مَعَاصِيهِ
হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ. থেকে বর্ণিত। একদা হযরত উমর, উবাই ইবনে কা'ব এবং আবু হুরায়রা রাযি. এ তিনজন রাসূল কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী? তিনি বললেন, বুদ্ধিমান। তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বড় আবেদ? তিনি বললেন, বুদ্ধিমান। তাঁরা আবার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষ? রাসূল ইরশাদ করলেন, বুদ্ধিদমান। তাঁরা বললেন, যে সুশীল, উদার, দানশীল এবং সমাজে সম্মানিত, সে ব্যক্তি কি বুদ্ধিমান নয়? উত্তরে রাসূল বললেন-
و إن كل ذلك اما متاع الحياة الدنيا والآخرة عند ربك للمتقين
অর্থ: এগুলো তো দুনিয়ার জীবনের পণ্য, আপনার রবের নিকট আখেরাত শুধু আল্লাহভীরুদের জন্য। [125]
অর্থাৎ, প্রকৃত বুদ্ধিমান হলো, সে ব্যক্তি যে আল্লাহকে ভয় করে এবং তার নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকে। [126]
**ভয় ও আশার নিদর্শন**
عَنْ مَالِكِ بْنِ دِينَارٍ رَحِمَهُ اللهُ، أَنَّهُ قَالَ : إِذَا عَرَفَ الرَّجُلُ مِنْ نَفْسِهِ عَلَامَةَ الْخَوْفِ وَعَلَامَةَ الرَّجَاءِ فَقَدْ تَمَسَّكَ بِالْأَمْرِ الْوَثِيقِ، أَمَّا عَلَامَةُ الْخَوْفِ، فَاجْتِنَابُ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ، وَأَمَّا عَلَامَةُ الرَّجَاءِ، فَالْعَمَلُ بِمَا أَمَرَ اللهُ بِهِ. وَقِيلَ : لِلرَّجَاءِ وَالْخَوْفِ عَلَامَتَانِ : فَعَلَامَةُ الرَّجَاءِ عَمَلُكَ للهِ بِمَا يَرْضَى، وَعَلَامَةُ الْخَوْفِ اجْتِنَابُكَ مَا نَهَى اللَّهُ عَنْهُ.
হযরত মালেক ইবনে দীনার রহ. বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের মাঝে আল্লাহর ভয় এবং তাঁর রহমতের আশার আলামাত দেখতে পায় তাহলে বুঝতে হবে যে, সে মুক্তির পথ পেয়ে গেছে। ভয়ের আলামত হলো, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকা। আর আশার আলামত হলো, আল্লাহ যা আদেশ করছেন তা মেনে চলা।
**কিয়ামতের ভয়**
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، أَنَّهُ قَالَ لِعُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ حِينَ طُعِنَ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ أَسْلَمْتَ حِينَ كَفَرَ النَّاسُ، وَجَاهَدْتَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ خَذَلَهُ النَّاسُ، وَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ عَنْكَ رَاضٍ، وَلَمْ يَخْتَلِفُ عَلَيْكَ اثْنَانِ، وَقُتِلْتَ شَهِيدًا. فَقَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ : الْمَغْرُورُ مَنْ غَرَّرْتُمُوهُ وَاللَّهِ لَوْ أَنَّ لِي مَا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ لَا فَتَدَيْتُ بِهِ مِنْ هَوْلِ الْمَطْلَعِ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। হযরত উমর রাযি. যখন আহত অবস্থায় মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তিনি তাঁর নিকট গিয়ে বললেন, আমিরুল মুমিনীন! মানুষ যখন কুফুরী করেছে তখন আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন, মানুষ যখন রাসূল ﷺ-এর বিরোধিতা করেছে তখন আপনি তাঁর সাথে জিহাদ করেছেন এবং ওফাতের সময় রাসূল ﷺ আপনার উপর সন্তুষ্ট ছিলেন, আপনার ব্যাপারে কারো কোনো বিতর্কও নেই। অবশেষে আপনি শহীদ হয়ে মারা যাচ্ছেন। হযরত উমর রাযি. বললেন, এ সবকিছুতে তোমরা ধোঁকায় পড়ছো কেন? আল্লাহর কসম! আমি যদি গোটা দুনিয়ার মালিক হতাম, তাহলে কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে বাঁচার জন্য সব দান করে দিতাম। [127]
**দু'টি ভয় ও দু'টি নিরাপত্তা**
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ : الْمُؤْمِنُ بَيْنَ مَخَافَتَيْنِ بَيْنَ أَجَلٍ قَدْ مَضَى لَا يَدْرِي مَا اللَّهُ صَانِعُ بِهِ، وَبَيْنَ أَجَلٍ قَدْ بَقِيَ لَا يَدْرِي مَا اللَّهُ قَاضٍ فِيهِ، فَلْيَتَزَوَّدِ الْعَبْدُ مِنْ نَفْسِهِ لِنَفْسِهِ، وَمِنْ دُنْيَاهُ لِآخِرَتِهِ، وَمِنْ حَيَاتِهِ لِمَوْتِهِ، فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ مَا بَعْدَ الْمَوْتِ مِنْ مُسْتَعْتَبٍ، وَمَا بَعْدَ الدُّنْيَا دَارُ إِلَّا الْجَنَّةَ أَوِ النَّارَ.
হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মুমিনের দু'টি ভয় রয়েছে-
১. অতীত জীবনের ভয়। কারণ, তার জানা নেই তার অতীত সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা কী ফয়সালা করবেন।
২. ভবিষ্যতের ভয়। কারণ, তার জানা নেই আল্লাহ তার ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে কী ফয়সালা করবেন।
সুতরাং বান্দা নিজেই নিজের জন্য, দুনিয়ায় থেকে আখেরাতের জন্য এবং হায়াত থেকে মৃত্যুর জন্য পাথেয় সংগ্রহ করে রাখে। ওই সত্ত্বার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! মৃত্যুর পর আর কোনো ওযর পেশ করার কোনো সুযোগ নেই এবং দুনিয়ার পর জান্নাত ও জাহান্নাম ছাড়া আর কোনো স্থান নেই। [128]
عَنِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ، وَعِزَّتِي وَجَلَالِي إِنِّي لَا أَجْمَعُ عَلَى عَبْدِي خَوْفَيْنِ، وَلَا أَمْنَيْنِ، مَنْ خَافَنِي فِي الدُّنْيَا أَمَّنْتُهُ فِي الْآخِرَةِ، وَمَنْ أَمِنَنِي فِي الدُّنْيَا أَخَفْتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
রাসূল ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার ইজ্জতের ও জালালের শপথ! আমার কোনো বান্দাকে আমি দু'টি ভয় ও দু'টি নিরাপত্তা একই সাথে দিব না। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে আমাকে ভয় করবে পরকালে আমি তাকে নিরাপত্তা দিব, আর যে ব্যক্তি দুনিয়াতে নির্ভীক থাকবে পরকালে আমি তাকে ভীতিতে রাখবো। [129]
টিকাঃ
১২৫. যাওয়ায়েদু মুসনাদিল হারীস : হাদীস-৮৩৩। সনদে দাউদ ইবনে মুহাব্বার নামক পরিত্যক্ত রাবী রয়েছে। যে হাদীস জালকারী হিসেবেও পরিচিত।
১২৬. মাজমাউয যাওয়ায়েদ লি-হাইসামী : হাদীস-৮৩৩।
১২৭. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩৬৯২; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-৩২২।
১২৮. শুআবুল ঈমান: হাদীস-১০৫৮১; হিলইয়াতুল আউলিয়া: ২/৫৮।
১২৯. সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস-৬৪০; মুসনাদে বাযযার: হাদীস-৮০২৯; শোয়াবুল ঈমান: হাদীস- ৭৭৭; হাদীসটি হাসান [মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/৩১১; শুয়াইব আরনাউত]
📄 মৃত্যুর পরও অব্যাহত আমল
মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ইসলামে এমন কিছু বিশেষ আমলের বিধান রয়েছে যার पुण्यফল বা সওয়াব মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে। এই আমলগুলোকে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবহমান পুণ্য বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ বিষয়ে தெளிவாக বলেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
"মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ব্যতীত:
1. **সদকায়ে জারিয়া (প্রবহমান দান):** যেমন মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, পানির ব্যবস্থা করা, রাস্তা তৈরি বা বৃক্ষরোপণ করা, যা থেকে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী উপকৃত হতে থাকে। [1, 6]
2. **উপকারী জ্ঞান:** এমন জ্ঞান যা সে শিক্ষা দিয়েছে বা প্রচার করেছে। যতদিন মানুষ সেই জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হবে, ততদিন তার আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বীনি বই লেখা, কুরআন শিক্ষা দেওয়া ইত্যাদি। [5, 6]
3. **নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে:** এমন সৎ ও ধর্মপ্রাণ সন্তান রেখে যাওয়া, যে তার মৃত পিতা-মাতার জন্য নিয়মিত দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। সন্তানের এই দোয়া সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছায়। [1, 5]
অন্য একটি হাদিসে রাসূল (ﷺ) আরও কিছু আমলের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর সওয়াব মৃত্যুর পর অব্যাহত থাকে। তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই মুমিনের মৃত্যুর পর যে আমল ও নেকি তার কাছে পৌঁছায় তা হলো:
* এমন ইলম যা সে শিখিয়ে গেছে বা প্রচার করেছে।
* কোনো নেক সন্তান রেখে গেছে।
* কোনো মুসহাফ (কুরআন) রেখে গেছে।
* কোনো মসজিদ বানিয়ে গেছে।
* মুসাফিরের জন্য কোনো ঘর বানিয়ে গেছে।
* কোনো নদী বা খাল খনন করে গেছে।
* তার সুস্থতা ও জীবদ্দশায় নিজের সম্পদ থেকে করা কোনো সদকা, যা তার মৃত্যুর পরেও তার কাছে পৌঁছায়।" (সুনানে ইবনে মাজাহ) [3]
এসব আমল একজন মুমিনের জন্য পরকালে নাজাত ও মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম।