📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ঘটনা-২

📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ঘটনা-২


হযরত আলকামার ঘটনাটি মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ ও মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে আলকামা নামে একজন যুবক সাহাবী ছিলেন, যিনি অত্যন্ত ইবাদতগুজার, দানশীল ও পরহেজগার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে আসে, তখন তাঁর জিহ্বা কালেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তাঁর স্ত্রী চিন্তিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে খবর পাঠান। রাসূল (ﷺ) হযরত আলী, সালমান ফারসী এবং বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে দেখেন যে, আলকামা সত্যিই কালেমা পাঠ করতে পারছেন না।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ পেয়ে জানতে চাইলেন যে, আলকামার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি না। জানানো হলো যে, তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তাঁর মা জীবিত আছেন। রাসূল (ﷺ) আলকামার মাকে ডেকে পাঠালেন।

বৃদ্ধা মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি আলকামার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন। মা বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলে অনেক ভালো, সে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং প্রচুর দান-সদকা করে।" রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞাসা করেন, "তাহলে আপনার সাথে তার সম্পর্ক কেমন?" উত্তরে মা বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।" কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "সে তার স্ত্রীকে আমার ওপর প্রাধান্য দিত এবং আমার অবাধ্যতা করত।" [22, 30]

এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "মায়ের অসন্তুষ্টিই আলকামার জিহ্বাকে কালেমা পাঠ থেকে বিরত রেখেছে।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন, "অনেকগুলো কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাও। আমি আলকামাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলব।" [30]

এ কথা শুনে মায়ের মাতৃত্বের আবেগ জেগে ওঠে। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার চোখের সামনে আমার কলিজার টুকরাকে আগুনে পোড়ানো হবে, এটা আমি সহ্য করতে পারব না।" তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আযাব তো দুনিয়ার আগুনের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। যদি আপনি চান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তবে আপনি তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। আপনার সন্তুষ্টি ছাড়া তার কোনো নামাজ, রোজা বা দান-সদকা কবুল হবে না।"

একথা শোনার পর মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা এবং উপস্থিত সকল মুসলমানকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার পুত্র আলকামার প্রতি সন্তুষ্ট।" [30]

রাসূল (ﷺ) বেলাল (রা.)-কে বললেন, "যাও, দেখো আলকামার অবস্থা কী? সে কি এখন কালেমা পড়তে পারছে?" বেলাল (রা.) গিয়ে দেখেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে কালেমা শাহাদাত পাঠ করছেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।

এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে কবুল হয় না এবং তাদের অসন্তুষ্টি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই ধ্বংসের কারণ হতে পারে।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার একটি ঘটনা-৩

📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার একটি ঘটনা-৩


পিতা-মাতার অবাধ্যতার শাস্তি যে কেবল পরকালেই নয়, বরং দুনিয়াতেও হতে পারে, সে বিষয়ে একটি ভয়ংকর ঘটনা বর্ণনা করেছেন সাহাবী হযরত শাহর ইবনে হাওশাব (রা.)।

তিনি বর্ণনা করেন যে, আসরের নামাজের পর তিনি এমন একজন ব্যক্তিকে দেখতে পান যার মাথাটি ছিল গাধার মতো এবং শরীর ছিল মানুষের মতো। ওই অদ্ভুত আকৃতির ব্যক্তিটি কবর থেকে বের হয়ে তিনবার গাধার মতো বিকট স্বরে চিৎকার করে এবং এরপর আবার কবরে অদৃশ্য হয়ে যায়। [32]

এই আশ্চর্যজনক ও ভীতিপ্রদ দৃশ্য দেখে তিনি এর কারণ অনুসন্ধান করতে আগ্রহী হন। তিনি ওই ব্যক্তির মায়ের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে তার মা জানান যে, তার ছেলে জীবিত অবস্থায় মদপান করত। যখন তার মা তাকে মদপান করতে নিষেধ করতেন, তখন সে বলত, "আপনি তো গাধার মতো চিৎকার করেন।" [32]

ছেলের এই অবাধ্য আচরণ এবং মাকে অপমান করার কারণেই মৃত্যুর পর তার আকৃতি এমন বিকৃত হয়ে গেছে এবং সে প্রতিদিন কবর থেকে উঠে গাধার মতো চিৎকার করে।

এই ঘটনাটি অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে যে, পিতা-মাতার সাথে, বিশেষ করে মায়ের সাথে অসম্মানজনক আচরণ এবং তাদের মনে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। তাদের প্রতি অবাধ্যতা শুধু ইবাদত কবুল না হওয়ার কারণই নয়, বরং তা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর কঠিন শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 সন্তানকে নাফরমানী করার সুযোগ দেবে না

📄 সন্তানকে নাফরমানী করার সুযোগ দেবে না


ইসলামে যেমন সন্তানের ওপর পিতা-মাতার হককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি পিতা-মাতারও সন্তানের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। পিতা-মাতার কিছু আচরণ বা ভুলের কারণে সন্তান অবাধ্য বা নাফরমান হয়ে উঠতে পারে। তাই والدینকে সচেতন থাকতে হবে যেন তাদের কোনো কাজ সন্তানের অবাধ্যতার কারণ না হয়।

১. **বৈষম্যমূলক আচরণ না করা:** সন্তানদের মধ্যে কোনো প্রকার বৈষম্য করা, যেমন—একজনকে অন্যজনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, ভালোবাসায় কমবেশি করা বা উপহার প্রদানে তারতম্য করা তাদের মনে হিংসা, বিদ্বেষ ও হতাশার জন্ম দেয়। এটি তাদের অবাধ্যতার অন্যতম কারণ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে এবং ইনসাফ করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

২. **অতিরিক্ত শাসন ও কঠোরতা পরিহার:** অতিরিক্ত বকাঝকা, শারীরিক শাস্তি বা সব সময় ধমকের সুরে কথা বললে সন্তান একগুঁয়ে ও জেদি হয়ে ওঠে। এতে তারা বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন হতে পারে এবং পিতা-মাতার কথা শুনতে চায় না। শাসনের পরিবর্তে স্নেহ, ভালোবাসা ও যৌক্তিক উপদেশের মাধ্যমে তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া উচিত। [16]

৩. **অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে না দেওয়া:** অনেক পিতা-মাতা নিজেদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। সন্তানের ইচ্ছা, সামর্থ্য বা পছন্দের কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তাদের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে সন্তান মানসিক চাপে পড়ে এবং একসময় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। [24]

৪. **সন্তানকে সময় ও মনোযোগ দেওয়া:** অনেক সময় পিতা-মাতা ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা, তাদের সমস্যা বা অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া তাদের মধ্যে একাকীত্ব ও অবহেলার বোধ তৈরি করে, যা তাদের অবাধ্য করে তুলতে পারে। [24, 16]

৫. **অন্যায় বা সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ না দেওয়া:** পিতা-মাতার এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া উচিত নয় যা সন্তানের সাধ্যের বাইরে অথবা শরিয়তবিরোধী। এরূপ নির্দেশ সন্তানকে অমান্য করতে বাধ্য করে।

হযরত উমর (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি তার সন্তানের অবাধ্যতার অভিযোগ নিয়ে এলে তিনি সন্তানকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। সন্তানটি উত্তরে তার পিতার তিনটি ভুলের কথা উল্লেখ করে: পিতা তার জন্য একজন মন্দ স্বভাবের মা নির্বাচন করেছেন, তার একটি মন্দ নাম রেখেছেন এবং তাকে কুরআন শিক্ষা দেননি। তখন হযরত উমর (রা.) ওই ব্যক্তিকে বলেন, "তুমি তোমার সন্তানের হক নষ্ট করেছ, আর এখন তার অবাধ্যতার অভিযোগ নিয়ে এসেছ?"

এই ঘটনা প্রমাণ করে, সন্তানকে আদর্শবান ও অনুগত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 মানবতাবোধ রক্ষা করুন

📄 মানবতাবোধ রক্ষা করুন


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ : بَيَّنَا رَجُلٌ يَمْشِي فِي الطَّرِيقِ اشْتَدَّ عَلَيْهِ الْعَطَشُ فَوَجَدَ بِئْرًا، فَنَزَلَ بِهَا فَشَرِبَ، ثُمَّ خَرَجَ، فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَثْ وَهُوَ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ. فَقَالَ الرَّجُلُ : لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الْكَلْبُ مِنَ الْعَطَشِ مِثْلَ الَّذِي كَانَ بَلَغَ مِنِّي، فَنَزَلَ الْبِئْرَ فَمَلَا خُفَهُ مَاءً، ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ حَتَّي رَقِي فَسَقَى الْكَلْبَ، فَشَكَرَ اللَّهُ تَعَالَى لَهُ فَغَفَرَ لَهُ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ : إِنَّ لَنَا فِي الْبَهَائِمِ لَأَجْرًا؟ قَالَ: فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ.

আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'একদা এক ব্যক্তি পথ চলছিল। তার খুবই পিপাসা অনুভূত হলো। ইতোমধ্যে সে একটি কূপ দেখতে পেয়ে তাতে নেমে পানি পান করল। বের হয়ে দেখল যে, (ওখানেই) একটি কুকুর পিপাসার যন্ত্রণায় জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে ও কাদা চাটছে। লোকটি (মনে মনে) বলল, 'পিপাসার তাড়নায় আমি যে পর্যায়ে পৌঁছেছিলাম, কুকুরটিও সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে।' সে আবার কূপে নামল। তারপর তার চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করে তা মুখে ধরে উপরে উঠল এবং কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহ তা'আলা তার এই আমলকে কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।' সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! চতুষ্পদ জন্তুর প্রতি দয়া প্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব লাভ হবে?' তিনি বললেন, "প্রত্যেক জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনে নেকি রয়েছে।” [112]

**অনুগ্রহ করা**

عَنِ الْحَسَنِ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلَّا رَحِيمٌ. قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ كُلُّنَا رَحِيمٌ . قَالَ : لَيْسَ رَحْمَةً أَحَدِكُمْ نَفْسَهُ خَاصَّةً، وَلَكِنْ حَتَّى يَرْحَمَ النَّاسَ عَامَّةً، وَلَا يَرْحَمُهُمْ إِلَّا اللَّهُ تَعَالَى.

হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, দয়ালু ব্যক্তি ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সবাই তো দয়ালু। তিনি বললেন, নিজের প্রতি দয়া করে দয়াবান হওয়া উদ্দেশ্য নয়। বরং দয়াবান তো সে, যে সাধারণ মানুষ, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে দয়া করার কেউ নেই তাদেরকে দয়া করে। [113]

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: إِذَا رَأَيْتُمْ أَخَاكُمْ قَدْ أَصَابَهُ جَزَاءً فَلَا تَلْعَنُوهُ، وَلَا تُعِينُوا عَلَيْهِ الشَّيْطَانَ، وَلَكِنْ قُولُوا اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ اللَّهُمَّ تُبْ عَلَيْهِ.

হযরত আব্দুল্লাহ রহ. বলেন, কাউকে স্বীয় অপকর্মের ফল ভোগ করতে দেখলে তাকে ভর্ৎসনা করবে না। কারণ, এতে শয়তান খুশি হয়। রবং তার জন্য দোয়া করবে, হে আল্লাহ! তার প্রতি রহম করুন, তাকে ক্ষমা করে দিন। [114]

عَنِ الشَّعْبِيِّ، قَالَ : صَعِدَ النُّعْمَانُ بْنُ بَشِيرِ الْمِنْبَرَ، فَحَمِدَ اللَّهَ، وَأَثْنَى عَلَيْهِ ثُمَّ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: يَنْبَغِي لِلْمُسْلِمِينَ أَنْ يَكُونُوا بَيْنَهُمْ بِنَصِيحَةِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا، وَتَرَاحُمِهِمْ بَيْنَهُمْ كَمَثَلِ الْعُضْوِ مِنَ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى بَعْضُهُ تَدَاعَى الْجَسَدُ كُلُّهُ بِالسَّهَرِ حَتَّى يَذْهَبَ الْأَلَمُ مِنْ ذَلِكَ الْعُضْوِ.

হযরত শা'বী রহ. থেকে বর্ণিত। হযরত নুমান ইবনে বশীর রাযি. মিম্বরে উঠে হাম্দ ও সানা পাঠ করে বললেন, আমি রাসূলকে বলতে শুনেছি, মুসলমান যেন পরস্পর মঙ্গল কামনা করে এবং সহমর্মিতা দেখায়। কারণ, সকল মুসলমান একটি দেহের ন্যায়। একটি অঙ্গ কষ্ট পেলে, সর্বাঙ্গ কষ্ট পায়। [115]

**হযরত উমর রাযি.-এর ঘটনা**

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : بَيْنَمَا عُمَرُ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، يَعُسُّ ذَاتَ لَيْلَةٍ إِذْ مَرَّ بِرِفْقَةٍ قَدْ نَزَلَتْ، فَخَشِيَ عَلَيْهِمُ السَّرِقَةَ، فَأَتَى عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، فَقَالَ مَا الَّذِي جَاءَ بِكَ فِي هَذِهِ السَّاعَةِ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ؟ قَالَ: مَرَرْتُ بِرِفْقَةٍ قَدْ نَزَلَتْ، فَحَدَّثَتْنِي نَفْسِي أَنَّهُمْ إِذَا بَاتُوا نَامُوا، فَخَشِيتُ عَلَيْهِمُ السَّرِقَةَ، فَانْطَلِقْ بِنَا نَحْرُسْهُمْ قَالَ :. فَانْطَلَقْنَا، فَقَعَدَا قَرِيبًا مِنَ الرَّفْقَةِ يَحْرُسَانِ حَتَّى إِذَا رَأَيَا الصُّبْحَ نَادَى عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ يَا أَهْلَ الرِّفْقَةِ الصَّلاةَ الصَّلَاةَ مِرَارًا، حَتَّى إِذَا رَآهُمْ تَحَرَّكُوا قَامَا فَرَجَعًا.

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. বলেন, হযরত উমর রাযি. খলীফা থাকাকালে রাতে ঘুরে ঘুরে দেখতেন কোথাও কোনো সমস্যা আছে কি-না। একরাতে তিনি বের হয়ে দেখতে পেলেন শহরে একটি নতুন ব্যবসায়ী কাফেলা এসেছে। তার আশঙ্কা হলো কাফেলাটির কিছু চুরি হতে পারে। তাই তিনি হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযি.-এর নিকট গেলেন। খলিফা অসময়ে আসার কারণ জিজ্ঞেস করে তিনি বললেন, খলীফা, এত রাতে আপনি! তিনি বললেন, শহরে একটি নতুন কাফেলা এসেছে। আমার আশঙ্কা হয় যে, তারা রাতে ঘুমিয়ে পড়লে তাদের মাল চুরি হয়ে যাবে। চল আমার সাথে, আমরা তাদের পাহারা দেই। তারা বের হয়ে কাফেলার অনতিদূরে এক স্থানে বসে সারারাত পাহারা দিলেন। ভোর হলে তিনি তাদেরকে ডেকে বললেন, নামাযের জন্য উঠুন! নামাযের জন্য উঠুন! তারা ঘুম থেকে উঠলে দু'জন ফিরে গেলেন।

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, সুতরাং আমাদের উচিত পূর্বসূরীদের আদর্শ অনুসরণ করে পরস্পর সহমর্মী হওয়া। কারণ, আল্লাহ তা'আলা নবী -এর সাহাবীদের এই গুণের প্রশংসা করে বলেছেন, رُحَمَاء بَيْنَهُمْ অর্থ: তারা পরস্পর সহমর্মী। [116] তাঁরা ছিলেন পরস্পর সহমর্মী, সকল সৃষ্টির প্রতি দয়াপ্রবণ। যিম্মিদের প্রতিও তারা দয়াবান ছিলেন।

عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ رَأَى رَجُلًا مِنْ أَهْلِ الذِّمَّةِ، يَسْأَلُ عَلَى أَبْوَابِ النَّاسِ، وَهُوَ شَيْخٌ كَبِيرٌ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ : مَا أَنْصَفْنَاكَ أَخَذْنَا مِنْكَ الْجِزْيَةَ مَا دُمْتَ شَابًّا، ثُمَّ ضَيَّعْنَاكَ الْيَوْمَ، وَأَمَرَ بِأَنْ يَجْرِي عَلَيْهِ قُوتُهُ مِنْ بَيْتِ مَالِ الْمُسْلِمِينَ.

হযরত উমর রাযি.-এর ঘটনা বর্ণিত আছে। তিনি এক যিম্মী বৃদ্ধকে ভিক্ষা করতে দেখে বললেন, আমরা তার প্রতি ইনসাফ করিনি। কারণ, যুবক থাকা অবস্থায় আমরা তার কাছে জিযিয়া নিয়েছি। আর আজ কোনো খোঁজ-খবর রাখি না। অতঃপর তিনি তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা দেওয়ার আদেশ করেন।

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، أَنَّهُ قَالَ : رَأَيْتُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ عَلَى قِتْبٍ وَهُوَ يَعْدُو بِالْأَبْطَحِ فَقُلْتُ لَهُ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ : أَيْنَ تَصِيرُ؟ فَقَالَ : بَعِيرُ نَدَّ مِنَ الصَّدَقَةِ فَأَنَا أَطْلُبُهُ ، فَقُلْتُ لَهُ : لَقَدْ أَذْلَلْتَ الْخُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِكَ ، فَقَالَ : لَا تَلُمْنِي يَا أَبَا الْحَسَنِ، فَوَالَّذِي بَعَثَ مُحَمَّدًا ﷺ بِالنُّبُوَّةِ لَوْ أَنَّ عَنَاقًا ذَهَبَ بِشَاطِئِ الْفُرَاتِ، لَأُوخِذَ بِهَا عُمَرُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِأَنَّهُ لَا حُرْمَةَ لِوَالٍ ضَيَّعَ الْمُسْلِمِينَ وَلَا لِفَاسِقِ رَوْعَ الْمُؤْمِنِينَ.

হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা আমি হযরত উমর রাযি. কে দেখতে পেলাম, তিনি হাওদায় বসে পাথুরে জমিনের উপর দিয়ে দ্রুত কোথাও যাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, খলীফা! কোথায় যাচ্ছেন? তিনি উত্তর দিলেন, সদকার একটি উট হারিয়ে গেছে, তার খোঁজে বেরিয়েছি। আমি বললাম, আপনি তো আপনার পরবর্তী খলীফাদের ভালো ঝামেলায় ফেলে যাচ্ছেন। তিনি বললেন, হাসানের বাপ! আমাকে মন্দ বল না। সে সত্তার শপথ! যিনি মুহাম্মদকে নবুয়্যাত দিয়েছেন। ফুরাত নদীর তীরে একটি কুকুর যদি না খেয়ে মারা যায় তাহলে উমরকে কিয়ামতের দিন তার জন্য পাকড়াও করা হবে। কারণ, যে মুসলিম শাসক প্রজাদের খোঁজখবর রাখে না, সে শাসকের কোনো রক্ষা নেই। আর সে গুনাহগারের রক্ষা নেই, যে মুসলমানদের মাঝে আতঙ্ক ছড়ায়।

عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : بُدَلَاءُ أُمَّتِي لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِكَثْرَةِ صَلَاةٍ وَلَا صِيَامٍ، وَلَكِنْ يَرْحَمُهُمُ اللهُ تَعَالَى بِسَلَامَةِ الصُّدُورِ، وَسَخَاوَةِ النَّفْسِ، وَالرَّحْمَةِ لِجَمِيعِ الْمُسْلِمِينَ.

হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের নেককাররা অধিক নামায-রোজার কারণে জান্নাতে যাবে না। তারা বরং জান্নাতে যাবে অন্তরের নিষ্কলুষতা, মনের উদারতা এবং মানুষের প্রতি দয়া করার কারণে। [117]

**এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের হক**

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَرْبَعُ مِنْ حَقَّ الْمُسْلِمِينَ عَلَيْكَ أَنْ تُعِينَ مُحْسِنَهُمْ، وَأَنْ تَسْتَغْفِرَ لِمُذْنِبِهِمْ، وَأَنْ تَدْعُوَ لِمُدَبَّرِهِمْ، وَأَنْ تُحِبَّ تَائِبَهُمْ.

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তোমার উপর মুসলমানদের চারটি হক রয়েছে। যথা-

১. নেককারদের সহযোগিতা করা।
২. গুনাহগারদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩. জেহাদ থেকে পলায়নকারীদের জন্য দোয়া করা।
৪. তওবাকারীকে ভালোবাসা। [118]

عَنْ أَبِي أَيُّوبَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ : لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ سِتُّ خِصَالٍ وَاجِبَةٍ، إِنْ تَرَكَ مِنْهَا وَاحِدَةً، فَقَدْ تَرَكَ حَقًّا وَاجِبًا، إِذَا دَعَاهُ أَنْ يُجِيبَهُ، وَإِذَا مَرِضَ أَنْ يَعُودَهُ، وَإِذَا مَاتَ أَنْ يَحْضُرَهُ، وَإِذَا لَقِيَهُ أَنْ يُسَلَّمَ عَلَيْهِ، وَإِذَا اسْتَنْصَحَهُ أَنْ يَنْصَحَهُ، وَإِذَا عَطَسَ أَنْ يُشَمِّتَهُ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। যদি সে তার একটিও বাদ দেয় তাহলে তার একটি ওয়াজিব ছাড়ার গুনাহ হবে। যথা-

১. আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া।
২. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া।
৩. মৃত্যুবরণ করলে দাফনে শরীক হওয়া।
৪. পথে দেখা হলে সালাম দেওয়া।
৫. পরামর্শ চাইলে ভালো পরামর্শ দেওয়া।
৬. হাঁচি দিয়ে (الحمد لله) আলহামদুল্লিাহ বললে তার উত্তরে يرحمك الله বলা। [119]

**মাখলুকের প্রতি দয়া**

عَن أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا بَعَثَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا رَعَى الْغَنَمَ فَقَالَ أَصْحَابُهُ وَأَنْتَ فَقَالَ نَعَمْ كُنْتُ أَرْعَاهَا عَلَى قَرَارِيطَ لِأَهْلِ مَكَّةَ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা যে নবী পাঠিয়েছেন, তিনি মেষ চরিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও মেষ চড়িয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমিও কয়েক কিরাত (মুদ্রা) এর বিনিময়ে মক্কাবাসীর মেষ চরিয়েছি। [120]
ফক্বিহ সমরকন্দী রহ. বলেন, নবীদের মেষ চরানোর রহস্য হলো, পশু চরাতে দিয়ে দেখেছেন, সৃষ্টির প্রতি তাঁদের কতটুকু দয়া আছে। যখন দেখা গেছে যে, তারা পশুর প্রতিও দয়াবান, তখন মানুষকে দীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাদেরকে নবী বানিয়ে দিয়েছেন।
এক বর্ণনায় আছে, হযরত মূসা আ. আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন, হে রব! কোন গুণের কারণে আপনি আমাকে মনোনীত করেছেন? তিনি বললেন, আমার সৃষ্টির প্রতি তোমার দয়া দেখে। তুমি শুআইবের মেষপাল চরাতে। একদিন একটি মেষ পাল থেকে হারিয়ে গেলে তুমি তাকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলে। অবশেষে তা পেয়ে তুমি কোলে তুলে নিলে আর বললে, আরে তুই নিজেও ক্লান্ত হলি, আমাকেও ক্লান্ত করলি!! আমার সৃষ্টির প্রতি তোমার এই দয়া দেখেই আমি তোমাকে নবুওয়াত দান করেছি।

**মুসলমানের সহযোগিতা করা**

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ أَنَّهُ قَالَ : مَنْ سَتَرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ فِي الدُّنْيَا سَتَرَهُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَمَنْ نَفَّسَ عَنْ مُسْلِمٍ كَرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا، نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَ اللهُ تَعَالَى فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا دَامَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ.

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দূর করবে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদ দূর করবেন। বান্দা যতক্ষণ তার মুসলিম ভাইয়ের সহযোগিতা করে, আল্লাহ তা'আলাও ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। [121]

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ مِنَ الْخَيْرِ.

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার মুসলিম ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে। [122]
عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ : إِنَّ اللهَ تَعَالَى لَا يَرْحَمُ مَنْ لَا يَرْحَمُ، وَلَا يَغْفِرُ لِمَنْ لَا يَغْفِرُ وَلَا يَتُوبُ عَلَى مَنْ لَا يَتُوبُ.

হযরত উমর রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি দয়া করে না আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না। যে ব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে না আল্লাহও তাকে ক্ষমা করবেন না। যে ব্যক্তি অন্যের ওযর কবুল করে না আল্লাহও তার তওবা কবুল করেন না।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو يَبْلُغُ بِهِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا أَهْلَ الْأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, দয়াবানদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করে থাকেন। জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া কর, আসমানে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। [123]

عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ لَا يَرْحَمُ النَّاسَ لَا يَرْحَمُهُ اللَّهُ.

জারির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ তা'আলাও তার প্রতি দয়া করবেন না। [124]

عَنْ قَتَادَةَ، أَنَّهُ قَالَ : ذُكِرَ لَنَا أَنَّ فِي الْإِنْجِيلِ مَكْتُوبًا يَا ابْنَ آدَمَ كَمَا تَرْحَمُ فَكَذَلِكَ تُرْحَمُ وَكَيْفَ تَرْجُو أَنْ يَرْحَمَكَ اللَّهُ وَأَنْتَ لَا تَرْحَمُ عِبَادَهُ؟

কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইঞ্জিল শরীফে আছে, হে আদমের সন্তান! তুমি যেমন দয়া করবে তোমার প্রতিও তেমনি দয়া করা হবে। তুমি যদি আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়া না- করতে পার তাহলে কীভাবে আশা কর, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন?

عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ كَانَ يَتَبَّعُ الصَّبْيَانَ، فَيَشْتَرِيَ مِنْهُمُ الْعَصَافِيرَ، فَيُرْسِلَهَا وَيَقُولُ اذْهَبِي فَعِيشِي وَقَالَ شَقِيقُ الزَّاهِدُ رَحِمَهُ اللَّهُ تَعَالَى : إِذَا ذَكَرْتَ الرَّجُلَ بِالسُّوءِ، فَلَمْ تَهْتَمَّ لَهُ تَرَحُمًا، فَأَنْتَ أَسْوَأُ حَالًا مِنْهُ، وَإِذَا ذَكَرْتَ الرَّجُلَ الصَّالِحَ، فَلَمْ تَجِدْ فِي قَلْبِكَ حَلَاوَةَ طَاعَةِ رَبِّكَ، فَأَنْتَ رَجُلُ سُوءٍ.

হযরত আবুদ দারদা রাযি.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে। তিনি শিশুদের থেকে পাখি ক্রয় করে নিয়ে সেগুলো ছেড়ে দিয়ে বলতেন, যাও মুক্তভাবে জীবন যাপন কর।

হযরত শাকীক বলখী রহ. বলেন, কারো সমালোচনা করার সময় যদি তুমি তার প্রতি সহমর্মিতা বোধ না কর, তাহলে বুঝবে যে, তুমি নিজে তার চেয়ে খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হবে। আর কোনো নেক আলোচনার সময় যদি তুমি মনে আল্লাহর আনুগত্যের স্বাদ অনুভব না কর, তাহলে বুঝবে যে, তুমি গুনাহগার।

**হযরত ঈসা আ.-এর উক্তি**

عَنْ مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ قَالَ : بَلَغَنِي أَنَّ عِيسَى صَلَوَاتُ اللَّهِ وَسَلَامُهُ عَلَيْهِ قَالَ: لَا تُكْثِرُوا الْكَلَامَ فِي غَيْرِ ذِكْرِ اللهِ، فَتَقْسُوَ قُلُوبُكُمْ، وَالْقَلْبُ الْقَاسِي بَعِيدُ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى وَلَكِنْ لَا تَعْلَمُونَ، وَلَا تَنْظُرُوا فِي عُيُوبِ النَّاسِ، كَأَنَّكُمْ أَرْبَابُ وَانْظُرُوا إِلَيْهَا كَأَنَّكُمْ عَبِيدٌ، وَإِنَّمَا النَّاسُ رَجُلَانِ مُبْتَلًى وَمُعَافًى، فَارْحَمُوا صَاحِبَ الْبَلَاءِ وَاحْمَدُوا الله على العافية

হযরত মালেক ইবনে আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। হযরত ঈসা আ. বলেন-

১. আল্লাহর যিকির বেশি বেশি কর। অনর্থক আলোচনা কর না। কারণ, এতে তোমাদের অন্তর কঠোর হয়ে যাবে। আর কঠোর অন্তর আল্লাহ তা'আলা থেকে অনেক দূরে থাকে। কিন্তু তোমরা তা বুঝতে পার না।
২. তোমরা মনিবের মত ভাব নিয়ে অন্যের দোষের দিকে তাকিয়ো না। বরং কৃতদাস মনিবের দোষ দেখার মতো মানুষের দোষ দেখবে।
৩. মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত: বিপদগ্রস্ত এবং বিপদমুক্ত। বিপদগ্রস্তের প্রতি দয়া করবে এবং বিপদমুক্তের জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করবে।

**হযরত তাউস রহ.-এর উক্তি**

عَنْ أَبِي عُبَيْدِ اللهِ الشَّامِيِّ، قَالَ: اسْتَأْذَنْتُ عَلَى طَاوُوسَ، فَخَرَجَ شَيْخٌ كَبِيرٌ فَقَالَ لِي: أَنَا هُوَ. فَقُلْتُ لَهُ: لَئِنْ كُنْتَ أَنْتَ هُوَ، فَإِنَّكَ إِذًا لَخَرِفٌ. فَقَالَ: إِنَّ الْعَالِمَ لَا يَخْرَفُ، فَدَخَلْتُ عَلَيْهِ. فَقَالَ لِي: سَلْ وَأَوْجِزْ. فَقُلْتُ لَهُ: إِنْ لِي أَوْجَزْتُ لَكَ. فَقَالَ: إِنْ شِئْتَ جَمَعْتُ لَكَ التَّوْرَاةِ، وَالْإِنْجِيلَ، وَالْفُرْقَانَ فِي ثَلَاثِ كَلِمَاتٍ فَعَلْتُ. فَقُلْتُ: وَدِدْتُ ذَلِكَ فَقَالَ: خَفِ اللَّهَ خَوْفًا لَا يَكُونُ أَحَدٌ أَخْوَفَ عِنْدَكَ مِنْهُ، وَرَجُهُ رَجَاءً هُوَ أَشَدُّ مِنْ خَوْفِكَ إِيَّاهُ، وَأَحِبَّ لِغَيْرِكَ مَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ.

হযরত আবূ আব্দুল্লাহ শামী রহ. বলেন, আমি হযরত তাউস রহ.-এর বাড়িতে গেলাম। তাউসের নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলে এক বয়োবৃদ্ধ লোক বেরিয়ে এসে বলল, আমিই তাউস। আমি কিছুটা হতাশ হয়ে বললাম, আপনি যদি তাউস হয়ে থাকেন তাহলে তো বার্ধক্যের কারণে আপনার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বললেন, আলেমদের স্মৃতিশক্তি কখনো দুর্বল হয় না। তারপর তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। তিনি বললেন, যা বলবে সংক্ষেপে বলবে। আমি বললাম, আপনি যদি সংক্ষেপে উত্তর দেন আমিও সংক্ষেপে প্রশ্ন করব। তিনি বললেন, আমি কুরআন, তাওরাত, ইঞ্জিলের যাবতীয় বাণীর সারনির্যাস তিন বাক্যে তোমাকে বলে দিতে পারি। আমি বললাম, আমি সেটাই জানতে চাই। তিনি বললেন-
১. আল্লাহকে এত ভয় কর যে, তার চেয়ে বেশি আর কাউকে ভয় কর না।
২. আল্লাহর প্রতি তোমার ভয়ের চেয়ে আশা বেশি রাখ।
৩. নিজের জন্য যা পছন্দ কর, অন্যের জন্য তাই পছন্দ কর।

**তিনটি পছন্দনীয় বিষয়**

عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ : ثَلَاثُ مَنْ جَمَعَهُنَّ جَمَعَ الْإِيمَانَ كُلَّهُ، الْإِنْفَاقُ فِي الْإِقْتَارِ، وَالْإِنْصَافُ مِنْ نَفْسِهِ، وَإِفْشَاءُ السَّلَامِ عَلَى الْخَلَائِقِ.

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যার মাঝে তিনটি গুণ থাকবে তার ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করবে। যথা-
১. অভাবের সময় দান করা।
২. নিজের উপর ইনসাফ করা।
৩. মানুষকে বেশি বেশি সালাম করা।

عَنْ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، أَنَّهُ قَالَ: أَحَبُّ الْأُمُورِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى ثَلَاثَةٌ: الْعَفْوُ عِنْدَ الْمَقْدِرَة، وَالْقَصْدُ فِي الْجِدَةِ، وَالرِّفْقُ بِعِبَادِ اللَّهِ تَعَالَى، وَمَا رَفَقَ أَحَدٌ بِعِبَادِ اللَّهِ إِلَّا رَفَقَ اللَّهُ بِهِ.

হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. বলেন, তিনটি আমল আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়। যথা-
১. ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করা।
২. মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা।
৩. আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়া করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদের প্রতি দয়া করবে আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দয়া করবেন।

**যাবতীয় কল্যাণের উৎস**

عَنِ الْحَسَنِ، قَالَ: أَوْحَى اللَّهُ إِلَى آدَمَ، يَا آدَمُ أَرْبَعُ هُنَّ جِمَاعٌ لَكَ وَلِوَلَدِكَ يَعْنِي جِمَاعُ الْخَيْرِ، وَاحِدَةٌ لِي، وَوَاحِدَةٌ لَكَ، وَوَاحِدَةً بَيْنِي وَبَيْنَكَ، وَوَاحِدَةً بَيْنَكَ وَبَيْنَ النَّاسِ، فَأَمَّا الَّتِي لِي فَأَنْ تَعْبُدَنِي وَلَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا، وَأَمَّا الَّتِي لَكَ فَعَمَلُكَ أَجْزِيكَ بِهِ حِينَ أَفْقَرَ مَا تَكُونَ إِلَيْهِ، وَأَمَّا الَّتِي بَيْنِي وَبَيْنَكَ فَمِنْكَ الدُّعَاءُ وَعَلَيَّ الْإِجَابَةُ، وَأَمَّا الَّتِي بَيْنَكَ وَبَيْنَ النَّاسِ، فَاصْحَبْهُمْ بِالَّذِي تُحِبُّ أَنْ يَصْحَبُوكَ بِهِ.

হযরত হাসান রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আ.-এর নিকট ওহী পাঠালেন, হে আদম! চারটি বিষয় এমন, যা তোমার এবং তোমার বংশের জন্য কল্যাণকর। তার একটি আমার সাথে সম্পৃক্ত, দ্বিতীয়টি তোমার সাথে সম্পৃক্ত, তৃতীয়টি আমার ও তোমার উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত এবং চতুর্থটি তোমার ও অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পৃক্ত।
১. আমার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়টি হলো, আমার ইবাদত কর, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক কর না।
২. যে বিষয়টি তোমার সাথে সম্পৃক্ত তা হলো, আমল করা। তুমি আমল করবে, আর আমি তোমার সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে তার প্রতিদান দিব।
৩. আর যে বিষয়টি আমার ও তোমার সাথে যুক্ত তা হলো, দোয়া করা। দোয়া করা তোমার কাজ আর তাতে সাড়া দেওয়া আমার কাজ।
৪. যে বিষয়টি তোমার ও অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পৃক্ত তা হলো, তুমি মানুষের সাথে এমন আচরণ কর, যেমন আচরণ তুমি মানুষের থেকে কামনা কর।

টিকাঃ
১১২. সহীহ বুখারী: হাদীস-২৩৬৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২২৪৪।
১১৩. হাদীসটি ইয়াম তুবারানী সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৮/১৮৭]।
১১৪. হাদীসটি ইমাম ত্ববারানী বর্ণনা করেছেন। সনদের রাবীগণ সবাই বিশ্বস্ত; তবে আবু উবাইদা তার পিতা ইবনে মাসউদ থেকে শ্রবণ করেননি [মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৬/২৪৭]
১১৫. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬০১১; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৮৬।
১১৬. সূরা ফাত্হ: আয়াত-২৯
১১৭. আল-কামেল লি-ইবনে আদী : ৬/২৮৯; শুআবুল ঈমান হাদীস-৩৪৯৩; হাফেজ যাহাবী, ইবনে আদী ও ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ হাদীসটিকে মুনকার বলেছেন [লিসানুল মিযান: ৭/৩০৭; তারিখুল ইসলাম লিয-যাহাবী: ২১/২৭৩]।
১১৮. আল-ফিরদাউস: হাদীস-১৪৯৯।
১১৯. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৭৩৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-১৪৩৩।
১২০. সহীহ বুখারী: হাদীস-২২৬২; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-২১৮৯।
১২১. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৬৯৯; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-১৪৫৫; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৪২৫।
১২২. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-৪৫।
১২৩. সুনানে তিরমিযী : হাদীস-১৯২৪; সুনানে আবী দাউদ : হাদীস-৪৯৪১। ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন。
১২৪. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬০১৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৩১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00