📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ঘটনা-১
ইসলামের ইতিহাসে পিতা-মাতার অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জুরাইজ নামক একজন আবিদের ঘটনা, যিনি আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকায় মায়ের ডাকে সাড়া দেননি।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "দোলনায় থাকা অবস্থায় কেবল তিনজন শিশু কথা বলেছে। তাদের একজন হলো জুরাইজের ঘটনা সংশ্লিষ্ট শিশু।"
জুরাইজ বনি ইসরাইলের একজন আবিদ বা ইবাদতকারী ছিলেন। তিনি ইবাদতের জন্য একটি গির্জা বা উপাসনালয় তৈরি করে সেখানে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন তিনি নামাজরত অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকলেন, "হে জুরাইজ!" জুরাইজ মনে মনে বললেন, "হে আমার রব! আমার মা এবং আমার নামাজ, আমি কোনটিকে প্রাধান্য দেব?" তিনি নামাজের প্রতিই মনোযোগ দিলেন এবং মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন না। তাঁর মা ফিরে গেলেন।
পরের দিন তাঁর মা আবার এসে ডাকলেন, "হে জুরাইজ!" জুরাইজ আবারও নামাজের মধ্যে থাকায় দ্বিধায় পড়ে গেলেন এবং নামাজ চালিয়ে গেলেন। তাঁর মা এবারও ফিরে গেলেন।
তৃতীয় দিনে তাঁর মা আবার এসে ডাকলেন। জুরাইজ আবারও নামাজে মগ্ন থাকায় সাড়া দিলেন না। তখন তাঁর মা হতাশ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করে বললেন, "হে আল্লাহ! তুমি তাকে কোনো ব্যভিচারিণী নারীর মুখ না দেখিয়ে মৃত্যু দিয়ো না।"
পরবর্তীতে বনি ইসরাইলের লোকেরা জুরাইজের ইবাদত নিয়ে আলোচনা করত। সেই সময় এক রূপসী ব্যভিচারিণী নারী ঘোষণা দিল যে, সে চাইলে জুরাইজকে ফিতনায় ফেলতে পারে। সে জুরাইজের কাছে গিয়ে তাকে খারাপ কাজের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু জুরাইজ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্যর্থ হয়ে সেই নারী এক রাখালের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং গর্ভবতী হয়।
সন্তান প্রসবের পর তাকে যখন সন্তানের পিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে মিথ্যা করে বলে যে, এই সন্তান জুরাইজের। এই কথা শুনে এলাকার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে জুরাইজের উপাসনালয় ভেঙে দেয়, তাকে মারধর করে এবং অপমান করে।
জুরাইজ তখন ওযু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং নবজাতক শিশুটির কাছে গিয়ে তার পেটে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, "হে শিশু, তোমার পিতা কে?" শিশুটি অলৌকিকভাবে কথা বলে ওঠে এবং উত্তর দেয়, "আমার পিতা অমুক রাখাল।"
এই ঘটনা দেখে লোকেরা বিস্মিত হয় এবং তাদের ভুল বুঝতে পারে। তারা জুরাইজের কাছে ক্ষমা চায় এবং তাঁর উপাসনালয়টি সোনা-রূপা দিয়ে নতুন করে তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু জুরাইজ আগের মতোই মাটি দিয়ে তা পুনর্নির্মাণের অনুরোধ জানান।
এই ঘটনাটি মায়ের দোয়ার প্রভাব এবং পিতা-মাতার ডাকে সাড়া দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। নফল ইবাদতেরত অবস্থায়ও মায়ের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় জুরাইজকে এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। (সহীহ বুখারি: ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম: ২৫৫০)
📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ঘটনা-২
হযরত আলকামার ঘটনাটি মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ ও মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে আলকামা নামে একজন যুবক সাহাবী ছিলেন, যিনি অত্যন্ত ইবাদতগুজার, দানশীল ও পরহেজগার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে আসে, তখন তাঁর জিহ্বা কালেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তাঁর স্ত্রী চিন্তিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে খবর পাঠান। রাসূল (ﷺ) হযরত আলী, সালমান ফারসী এবং বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে দেখেন যে, আলকামা সত্যিই কালেমা পাঠ করতে পারছেন না।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ পেয়ে জানতে চাইলেন যে, আলকামার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি না। জানানো হলো যে, তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তাঁর মা জীবিত আছেন। রাসূল (ﷺ) আলকামার মাকে ডেকে পাঠালেন।
বৃদ্ধা মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি আলকামার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন। মা বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলে অনেক ভালো, সে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং প্রচুর দান-সদকা করে।" রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞাসা করেন, "তাহলে আপনার সাথে তার সম্পর্ক কেমন?" উত্তরে মা বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।" কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "সে তার স্ত্রীকে আমার ওপর প্রাধান্য দিত এবং আমার অবাধ্যতা করত।" [22, 30]
এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "মায়ের অসন্তুষ্টিই আলকামার জিহ্বাকে কালেমা পাঠ থেকে বিরত রেখেছে।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন, "অনেকগুলো কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাও। আমি আলকামাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলব।" [30]
এ কথা শুনে মায়ের মাতৃত্বের আবেগ জেগে ওঠে। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার চোখের সামনে আমার কলিজার টুকরাকে আগুনে পোড়ানো হবে, এটা আমি সহ্য করতে পারব না।" তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আযাব তো দুনিয়ার আগুনের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। যদি আপনি চান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তবে আপনি তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। আপনার সন্তুষ্টি ছাড়া তার কোনো নামাজ, রোজা বা দান-সদকা কবুল হবে না।"
একথা শোনার পর মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা এবং উপস্থিত সকল মুসলমানকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার পুত্র আলকামার প্রতি সন্তুষ্ট।" [30]
রাসূল (ﷺ) বেলাল (রা.)-কে বললেন, "যাও, দেখো আলকামার অবস্থা কী? সে কি এখন কালেমা পড়তে পারছে?" বেলাল (রা.) গিয়ে দেখেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে কালেমা শাহাদাত পাঠ করছেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।
এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে কবুল হয় না এবং তাদের অসন্তুষ্টি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার একটি ঘটনা-৩
পিতা-মাতার অবাধ্যতার শাস্তি যে কেবল পরকালেই নয়, বরং দুনিয়াতেও হতে পারে, সে বিষয়ে একটি ভয়ংকর ঘটনা বর্ণনা করেছেন সাহাবী হযরত শাহর ইবনে হাওশাব (রা.)।
তিনি বর্ণনা করেন যে, আসরের নামাজের পর তিনি এমন একজন ব্যক্তিকে দেখতে পান যার মাথাটি ছিল গাধার মতো এবং শরীর ছিল মানুষের মতো। ওই অদ্ভুত আকৃতির ব্যক্তিটি কবর থেকে বের হয়ে তিনবার গাধার মতো বিকট স্বরে চিৎকার করে এবং এরপর আবার কবরে অদৃশ্য হয়ে যায়। [32]
এই আশ্চর্যজনক ও ভীতিপ্রদ দৃশ্য দেখে তিনি এর কারণ অনুসন্ধান করতে আগ্রহী হন। তিনি ওই ব্যক্তির মায়ের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে তার মা জানান যে, তার ছেলে জীবিত অবস্থায় মদপান করত। যখন তার মা তাকে মদপান করতে নিষেধ করতেন, তখন সে বলত, "আপনি তো গাধার মতো চিৎকার করেন।" [32]
ছেলের এই অবাধ্য আচরণ এবং মাকে অপমান করার কারণেই মৃত্যুর পর তার আকৃতি এমন বিকৃত হয়ে গেছে এবং সে প্রতিদিন কবর থেকে উঠে গাধার মতো চিৎকার করে।
এই ঘটনাটি অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে যে, পিতা-মাতার সাথে, বিশেষ করে মায়ের সাথে অসম্মানজনক আচরণ এবং তাদের মনে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে। তাদের প্রতি অবাধ্যতা শুধু ইবাদত কবুল না হওয়ার কারণই নয়, বরং তা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর কঠিন শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
📄 সন্তানকে নাফরমানী করার সুযোগ দেবে না
ইসলামে যেমন সন্তানের ওপর পিতা-মাতার হককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি পিতা-মাতারও সন্তানের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। পিতা-মাতার কিছু আচরণ বা ভুলের কারণে সন্তান অবাধ্য বা নাফরমান হয়ে উঠতে পারে। তাই والدینকে সচেতন থাকতে হবে যেন তাদের কোনো কাজ সন্তানের অবাধ্যতার কারণ না হয়।
১. **বৈষম্যমূলক আচরণ না করা:** সন্তানদের মধ্যে কোনো প্রকার বৈষম্য করা, যেমন—একজনকে অন্যজনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, ভালোবাসায় কমবেশি করা বা উপহার প্রদানে তারতম্য করা তাদের মনে হিংসা, বিদ্বেষ ও হতাশার জন্ম দেয়। এটি তাদের অবাধ্যতার অন্যতম কারণ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে এবং ইনসাফ করতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
২. **অতিরিক্ত শাসন ও কঠোরতা পরিহার:** অতিরিক্ত বকাঝকা, শারীরিক শাস্তি বা সব সময় ধমকের সুরে কথা বললে সন্তান একগুঁয়ে ও জেদি হয়ে ওঠে। এতে তারা বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন হতে পারে এবং পিতা-মাতার কথা শুনতে চায় না। শাসনের পরিবর্তে স্নেহ, ভালোবাসা ও যৌক্তিক উপদেশের মাধ্যমে তাদের ভুল ধরিয়ে দেওয়া উচিত। [16]
৩. **অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে না দেওয়া:** অনেক পিতা-মাতা নিজেদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। সন্তানের ইচ্ছা, সামর্থ্য বা পছন্দের কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তাদের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে সন্তান মানসিক চাপে পড়ে এবং একসময় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। [24]
৪. **সন্তানকে সময় ও মনোযোগ দেওয়া:** অনেক সময় পিতা-মাতা ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা, তাদের সমস্যা বা অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া তাদের মধ্যে একাকীত্ব ও অবহেলার বোধ তৈরি করে, যা তাদের অবাধ্য করে তুলতে পারে। [24, 16]
৫. **অন্যায় বা সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ না দেওয়া:** পিতা-মাতার এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া উচিত নয় যা সন্তানের সাধ্যের বাইরে অথবা শরিয়তবিরোধী। এরূপ নির্দেশ সন্তানকে অমান্য করতে বাধ্য করে।
হযরত উমর (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি তার সন্তানের অবাধ্যতার অভিযোগ নিয়ে এলে তিনি সন্তানকে ডেকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। সন্তানটি উত্তরে তার পিতার তিনটি ভুলের কথা উল্লেখ করে: পিতা তার জন্য একজন মন্দ স্বভাবের মা নির্বাচন করেছেন, তার একটি মন্দ নাম রেখেছেন এবং তাকে কুরআন শিক্ষা দেননি। তখন হযরত উমর (রা.) ওই ব্যক্তিকে বলেন, "তুমি তোমার সন্তানের হক নষ্ট করেছ, আর এখন তার অবাধ্যতার অভিযোগ নিয়ে এসেছ?"
এই ঘটনা প্রমাণ করে, সন্তানকে আদর্শবান ও অনুগত হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য।