📄 মৃত্যুর পরও যে আমল অব্যাহত থাকে
মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার জাগতিক সকল কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি ঘটে এবং আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এমন কিছু বিশেষ আমল রয়েছে, যার সওয়াব মৃত্যুর পরেও জারি থাকে। এই ধরনের আমলকে ইসলামী পরিভাষায় 'সদকায়ে জারিয়া' বা প্রবহমান দান বলা হয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"যখন কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি আমল ছাড়া:
১. **সদকায়ে জারিয়া** (এমন দান যার উপকারিতা চলমান থাকে)।
২. **এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়।**
৩. **এমন নেক সন্তান যে তার (পিতা-মাতার) জন্য দোয়া করে।**"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১) [1, 6, 11]
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা মৃত্যুর পরও সওয়াব জারি থাকে এমন কয়েকটি আমলের তালিকা করেছেন:
1. **সদকায়ে জারিয়া:** এর মধ্যে রয়েছে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, রাস্তা বা সেতু তৈরি করা, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, পানির জন্য কূপ বা নলকূপ স্থাপন করা, বৃক্ষরোপণ করা ইত্যাদি। যতদিন পর্যন্ত মানুষ বা সৃষ্টিজীব এসব থেকে উপকৃত হতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি এর সওয়াব পেতে থাকবেন। [1, 4, 7]
2. **উপকারী জ্ঞান প্রচার:** এমন জ্ঞান যা মানুষ শিখিয়ে যায় অথবা বই আকারে রেখে যায়। যেমন—কুরআন-হাদিস শিক্ষা দেওয়া, ধর্মীয় বা কল্যাণকর বই রচনা করা ও বিতরণ করা। যতদিন মানুষ সেই জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হবে, ততদিন ওই ব্যক্তির আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে থাকবে। [5, 9, 11]
3. **সৎ সন্তানের দোয়া:** নেক সন্তান রেখে যাওয়া, যারা পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করতে থাকে। সন্তানের দোয়ার কারণে আল্লাহ মৃত পিতা-মাতার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। [5, 6, 11]
এছাড়াও হাদিসে আরও কিছু আমলের কথা উল্লেখ রয়েছে, যেমন—কুরআন শরিফ বিতরণ করা, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা নির্মাণ করা, নদী বা খাল খনন করা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া। [5, 8, 9] এই আমলগুলো নিশ্চিত করে যে, একজন ব্যক্তি পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পরেও তার ভালো কাজের প্রতিদান পেতে থাকে।
📄 পিতার উপর সন্তানের হক
ইসলামে যেমন সন্তানের ওপর পিতা-মাতার হক রয়েছে, তেমনিভাবে পিতা-মাতার ওপরও সন্তানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ হক বা অধিকার রয়েছে। এই দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা পিতা-মাতার জন্য অপরিহার্য এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
সন্তানের প্রতি পিতার প্রধান দায়িত্বগুলো হলো:
1. **জন্মের পর করণীয়:** সন্তান জন্মের পর তার ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া। এটি সন্তানের কানে পৌঁছানো প্রথম তাওহিদের বাণী। [13]
2. **সুন্দর ইসলামি নাম রাখা:** সন্তানের একটি অর্থবহ ও সুন্দর ইসলামি নাম রাখা পিতার অন্যতম দায়িত্ব। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, "তোমাদের নামসমূহের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম নাম হলো আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।" (সহীহ মুসলিম) [2, 13, 31]
3. **আকিকা করা:** সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে আকিকা করা সুন্নত। ছেলের জন্য দুটি এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল বা ভেড়া জবাই করা মুস্তাহাব। [13, 31]
4. **দ্বীনি শিক্ষা ও উত্তম প্রতিপালন:** সন্তানকে সর্বপ্রথম তাওহিদ ও ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলী শিক্ষা দেওয়া। [21] তাকে আদব-কায়দা, শিষ্টাচার এবং নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া পিতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। রাসূল (ﷺ) বলেন, "পিতা তার সন্তানকে যা কিছু দান করে, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো উত্তম শিক্ষা ও আদব।" (তিরমিজি) [2]
5. **ভরণপোষণ:** সন্তানের জন্য হালাল ও উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করা পিতার ওপর ফরজ। এর মধ্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো অন্তর্ভুক্ত। [2]
6. **সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা:** সব সন্তানের মধ্যে ভালোবাসা, সম্পদ বণ্টন এবং আচরণের ক্ষেত্রে সমতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। কাউকে অন্যের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয়। [13]
7. **উপযুক্ত বয়সে বিবাহ দেওয়া:** সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান হলে তার বিবাহের ব্যবস্থা করা পিতার দায়িত্ব। এটি সন্তানকে গুনাহ থেকে বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। [2]
পিতা যদি এই দায়িত্বগুলো পালনে অবহেলা করেন, তবে তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসিত হতে হবে। [18]
📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ঘটনা-১
ইসলামের ইতিহাসে পিতা-মাতার অবাধ্যতার পরিণতি সম্পর্কে অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জুরাইজ নামক একজন আবিদের ঘটনা, যিনি আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকায় মায়ের ডাকে সাড়া দেননি।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "দোলনায় থাকা অবস্থায় কেবল তিনজন শিশু কথা বলেছে। তাদের একজন হলো জুরাইজের ঘটনা সংশ্লিষ্ট শিশু।"
জুরাইজ বনি ইসরাইলের একজন আবিদ বা ইবাদতকারী ছিলেন। তিনি ইবাদতের জন্য একটি গির্জা বা উপাসনালয় তৈরি করে সেখানে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। একদিন তিনি নামাজরত অবস্থায় ছিলেন, এমন সময় তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকলেন, "হে জুরাইজ!" জুরাইজ মনে মনে বললেন, "হে আমার রব! আমার মা এবং আমার নামাজ, আমি কোনটিকে প্রাধান্য দেব?" তিনি নামাজের প্রতিই মনোযোগ দিলেন এবং মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন না। তাঁর মা ফিরে গেলেন।
পরের দিন তাঁর মা আবার এসে ডাকলেন, "হে জুরাইজ!" জুরাইজ আবারও নামাজের মধ্যে থাকায় দ্বিধায় পড়ে গেলেন এবং নামাজ চালিয়ে গেলেন। তাঁর মা এবারও ফিরে গেলেন।
তৃতীয় দিনে তাঁর মা আবার এসে ডাকলেন। জুরাইজ আবারও নামাজে মগ্ন থাকায় সাড়া দিলেন না। তখন তাঁর মা হতাশ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করে বললেন, "হে আল্লাহ! তুমি তাকে কোনো ব্যভিচারিণী নারীর মুখ না দেখিয়ে মৃত্যু দিয়ো না।"
পরবর্তীতে বনি ইসরাইলের লোকেরা জুরাইজের ইবাদত নিয়ে আলোচনা করত। সেই সময় এক রূপসী ব্যভিচারিণী নারী ঘোষণা দিল যে, সে চাইলে জুরাইজকে ফিতনায় ফেলতে পারে। সে জুরাইজের কাছে গিয়ে তাকে খারাপ কাজের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু জুরাইজ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ব্যর্থ হয়ে সেই নারী এক রাখালের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় এবং গর্ভবতী হয়।
সন্তান প্রসবের পর তাকে যখন সন্তানের পিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন সে মিথ্যা করে বলে যে, এই সন্তান জুরাইজের। এই কথা শুনে এলাকার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে জুরাইজের উপাসনালয় ভেঙে দেয়, তাকে মারধর করে এবং অপমান করে।
জুরাইজ তখন ওযু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং নবজাতক শিশুটির কাছে গিয়ে তার পেটে খোঁচা দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, "হে শিশু, তোমার পিতা কে?" শিশুটি অলৌকিকভাবে কথা বলে ওঠে এবং উত্তর দেয়, "আমার পিতা অমুক রাখাল।"
এই ঘটনা দেখে লোকেরা বিস্মিত হয় এবং তাদের ভুল বুঝতে পারে। তারা জুরাইজের কাছে ক্ষমা চায় এবং তাঁর উপাসনালয়টি সোনা-রূপা দিয়ে নতুন করে তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু জুরাইজ আগের মতোই মাটি দিয়ে তা পুনর্নির্মাণের অনুরোধ জানান।
এই ঘটনাটি মায়ের দোয়ার প্রভাব এবং পিতা-মাতার ডাকে সাড়া দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। নফল ইবাদতেরত অবস্থায়ও মায়ের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় জুরাইজকে এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করেন। (সহীহ বুখারি: ৩৪৩৬, সহীহ মুসলিম: ২৫৫০)
📄 পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়ার ঘটনা-২
হযরত আলকামার ঘটনাটি মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে একটি প্রসিদ্ধ ও মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে আলকামা নামে একজন যুবক সাহাবী ছিলেন, যিনি অত্যন্ত ইবাদতগুজার, দানশীল ও পরহেজগার হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
যখন তাঁর মৃত্যু ঘনিয়ে আসে, তখন তাঁর জিহ্বা কালেমা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তাঁর স্ত্রী চিন্তিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে খবর পাঠান। রাসূল (ﷺ) হযরত আলী, সালমান ফারসী এবং বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে দেখেন যে, আলকামা সত্যিই কালেমা পাঠ করতে পারছেন না।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সংবাদ পেয়ে জানতে চাইলেন যে, আলকামার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি না। জানানো হলো যে, তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু তাঁর মা জীবিত আছেন। রাসূল (ﷺ) আলকামার মাকে ডেকে পাঠালেন।
বৃদ্ধা মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি আলকামার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন। মা বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলে অনেক ভালো, সে বেশি বেশি নফল নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং প্রচুর দান-সদকা করে।" রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞাসা করেন, "তাহলে আপনার সাথে তার সম্পর্ক কেমন?" উত্তরে মা বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।" কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "সে তার স্ত্রীকে আমার ওপর প্রাধান্য দিত এবং আমার অবাধ্যতা করত।" [22, 30]
এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "মায়ের অসন্তুষ্টিই আলকামার জিহ্বাকে কালেমা পাঠ থেকে বিরত রেখেছে।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন, "অনেকগুলো কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাও। আমি আলকামাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলব।" [30]
এ কথা শুনে মায়ের মাতৃত্বের আবেগ জেগে ওঠে। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার চোখের সামনে আমার কলিজার টুকরাকে আগুনে পোড়ানো হবে, এটা আমি সহ্য করতে পারব না।" তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আযাব তো দুনিয়ার আগুনের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। যদি আপনি চান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তবে আপনি তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। আপনার সন্তুষ্টি ছাড়া তার কোনো নামাজ, রোজা বা দান-সদকা কবুল হবে না।"
একথা শোনার পর মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা এবং উপস্থিত সকল মুসলমানকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার পুত্র আলকামার প্রতি সন্তুষ্ট।" [30]
রাসূল (ﷺ) বেলাল (রা.)-কে বললেন, "যাও, দেখো আলকামার অবস্থা কী? সে কি এখন কালেমা পড়তে পারছে?" বেলাল (রা.) গিয়ে দেখেন, ঘরের ভেতর থেকে আলকামা উচ্চস্বরে কালেমা শাহাদাত পাঠ করছেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।
এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে কবুল হয় না এবং তাদের অসন্তুষ্টি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই ধ্বংসের কারণ হতে পারে।