📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 মাতা পিতার সাথে সদাচারণ

📄 মাতা পিতার সাথে সদাচারণ


ইসলামে মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করা অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং ফরজ দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বহুবার নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা এর গুরুত্বকে তুলে ধরে। [4]

**কুরআনের নির্দেশনা:**
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [12, 17] এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের সাথে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশকে যুক্ত করা হয়েছে, যা এর অপরিহার্যতা বোঝায়।

আল্লাহ আরও বলেন, "আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে তুমি আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লুকমান: ১৪)। [4] এখানেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিতা-মাতার বার্ধক্যে তাদের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [1, 9, 11] এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার প্রতি সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশও নিষিদ্ধ।

**হাদিসের নির্দেশনা:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম আমল কোনটি?" তিনি বললেন, "সময় মতো নামায আদায় করা।" এরপর জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, "পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।" (বুখারি)। [12]

অন্য একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (তিরমিজি)। [3, 4] এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়।

এমনকি পিতা-মাতা যদি অমুসলিমও হন, তবুও তাদের সাথে দুনিয়াবী বিষয়ে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [1, 11] সন্তানের জন্য উচিত পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকা, তাদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের দেখাশোনা করা। [11]

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ওয়া ক্বদা রব্বুকা আল্লা তা'বুদূ ইল্লা ইয়্যাহু ওয়াবিল ওয়া-লিদাইনি ইহ্ সা-নান...’ অর্থ: তোমার রব ফায়সালা দিয়েছেন যে, তাকে ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না । অর্থাৎ, তাকেই একক আল্লাহ জানো । কেউ পাপের আদেশ দিলে তার অনুসরণ কর না । আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচারণ করবে । ‘ইম্মাই ইয়াব্লুগান্না ইনদাকাল কিবারা আহাদুহুমা- আও কিলা-হুমা- ফালা তাক্বুল্লাহুমা- উফফিন...’ যদি তাদের একজন কিংবা উভয় তোমাদের নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ পর্যন্ত বলবে না । অর্থাৎ, বাবা-মার সাথে অনুচিৎ কথা বলো না । কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ হলো, বার্ধক্যে বিছানায় পেশাব পায়খানা করলে তাদের পেশাব-পায়খানা উঠানোর সময় নাক ছিটকাবে না বা মুখ বিকৃত করবে না । কারণ, শিশুকালে তারাও এমনটি করেছেন, কিন্তু নাক ছিটকায় নি । ‘ওয়ালা তান্হারহুমা- ওয়া ক্বুল্লাহুমা- ক্বাওলান কারীমান ওয়াক্বফিদ্ব লাহূমা- জানাহায যুল্লি মিনার রহ্মাতি...’ তাদেরকে ধমক দেবে না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানের সাথে কথা বলবে । অর্থাৎ, তাদের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলবে না । আর তাদের জন্য তোমার দয়ার দু ডানা কে বিছিয়ে দেবে । অর্থাৎ, তাদের জন্য বিনয়ী ও রহমকারী হয়ে যাও । ‘ওয়া ক্বুর রব্বির হাম্হুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগীরা-’ এবং বলবে, হে রব! তাদের প্রতি রহম করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছেন ।

অর্থাৎ, জীবিত অবস্থায় পিতা-মাতার সেবা করা যেমন সন্তানের কর্তব্য তেমনি মৃত্যুর পর প্রতি নামাযের পর তাদের মাগফেরাতের দোয়া করাও সন্তানের দায়িত্ব । আবার কেউ কেউ বলেন, জীবিত অবস্থাতেও প্রতি নামাযের পর পিতা-মাতার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা সন্তানের জন্য কর্তব্য ।

জনৈক তাবেঈ বলেন, পিতা-মাতার জন্য দিনে পাঁচ বার দোয়া করলে তাদের হক আদায় হয় । কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘আনিশ কুর লী ওয়া লিওয়া-লিদাইকা ইলাইয়্যাল মাসীরু’ অর্থ: আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকর আদায় কর, আমার নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল । আল্লাহ তা'আলার শুকর আদায় করার অর্থ হলো, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া । সুতরাং পিতা-মাতার শুকর আদায়ের অর্থও হবে দিনে তাদের জন্য পাঁচ বার দোয়া করা ।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘রব্বুকুম আ'লামু বিমা ফী নুফুসিকুম...’ অর্থ: যদি তোমরা সৎ হও তাহলেও তোমাদের রব তোমাদের মনে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা অধিক জ্ঞাত । অর্থাৎ, পিতা-মাতার প্রতি কোমলভাব ও তাদের আনুগত্যের সংকল্প সে সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত । আর যদি তোমরা পিতা-মাতার অবাধ্য হও এবং তাওবা কর তাহলে নিশ্চয় তিনি তাওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল ।

টিকাঃ
২৭৯. সূরা আল ইসরা: আয়াত-২৪
২৮০. লুকমান: আয়াত-১৪
২৮১. সূরা ইসরা: আয়াত-২৫

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 পিতা-মাতার প্রাপ্য দশটি হক

📄 পিতা-মাতার প্রাপ্য দশটি হক


ইসলামে সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অসংখ্য অধিকার রয়েছে। আলেমগণ কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই হক বা অধিকারগুলোকে বিভিন্নভাবে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে কিছু হক তাদের জীবদ্দশায় এবং কিছু হক তাদের মৃত্যুর পর পালনীয়। এখানে পিতা-মাতার ১৪টি হকের একটি তালিকা উল্লেখ করা হলো, যা দুটি ভাগে বিভক্ত: [4, 7, 18]

**জীবিত অবস্থায় পালনীয় ৭টি হক:**

1. **শ্রদ্ধা ও সম্মান করা:** সর্বদা তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করা। [7, 18]
2. **মনে-প্রাণে ভালোবাসা:** তাদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা পোষণ করা। [7, 18]
3. **আনুগত্য করা:** আল্লাহর নাফরমানি হয় না, এমন সকল বিষয়ে তাদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। [7, 16, 18]
4. **সেবা-যত্ন করা:** তাদের সেবা করা এবং প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকা। [4, 7]
5. **প্রয়োজন পূরণ করা:** তাদের আর্থিক বা অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা। [7, 18]
6. **সুখ ও শান্তিতে রাখার চেষ্টা করা:** তাদের আরাম-আয়েশের প্রতি খেয়াল রাখা এবং তাদের সুখী করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করা। [7, 18]
7. **সাক্ষাৎ ও দেখাশোনা করা:** নিয়মিত তাদের সাথে দেখা করা এবং তাদের খোঁজ-খবর রাখা। [7, 18]

**মৃত্যুর পর পালনীয় ৭টি হক:**

1. **মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা:** তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। [4, 7]
2. **সওয়াব পৌঁছানো (ঈসালে সওয়াব):** তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে তাদের কাছে সওয়াব পৌঁছানো। [7]
3. **তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা:** পিতা-মাতার বন্ধুদের সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। [4, 7]
4. **তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাহায্য করা:** পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করা। [4, 7]
5. **ঋণ ও আমানত পরিশোধ করা:** তাদের কোনো ঋণ বা আমানত থাকলে তা পরিশোধ করা। [7]
6. **শরিয়তসম্মত ওসিয়ত পূর্ণ করা:** তারা কোনো বৈধ ওসিয়ত করে গেলে তা পূরণ করা। [4, 7]
7. **কবর জিয়ারত করা:** সাধ্যমতো তাদের কবর জিয়ারত করতে যাওয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা। [7, 18]

বলা হয়, সন্তানের উপর পিতা-মাতার দশটি হক রয়েছে । যথা—
১. ‘ইযা ইতাজ্জা ইলাত ত্বয়া-মি আত্য়ামাহু’ অর্থাৎ, তাদের কারো খাবারের প্রয়োজন হলে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা ।
২. ‘ইযা ইতাজ্জা ইলাল কুসওয়াতি কাসাহু’ অর্থাৎ, বস্ত্রের প্রয়োজন হলে তাদের বস্ত্রের ব্যবস্থা করা । দুনিয়াতে তাদের সাথে ভালো আচরণ কর, আল্লাহ তা'আলার এই বাণীটি রাসূল ﷺ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তাদের সাথে ভালো আচরণ অর্থ হলো, তারা ক্ষুধার্ত হলে আহার দান করা, বস্ত্রহীন হলে বস্ত্র দান করা ।
৩. ‘ইযা ইতাজ্জা আহাদুহুমা ইলা খিদমাতিহি খাদামাহু’ অর্থাৎ, তাদের কারো সেবার দরকার হলে সেবা করা ।
৪. ‘ইযা দাআ-হু আজা-বাহু ওয়া হাজ্বারাহু’ অর্থাৎ, তারা ডাকলে তৎক্ষণাৎ ডাকে সাড়া দেওয়া এবং উপস্থিত হওয়া ।
৫. ‘ইযা আমারা-হু বিআজরিন আত্বয়া-আহু...’ অর্থাৎ, আল্লাহ নাফরমানী বা গীবত ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ করলে তা পালন করা ।
৬. ‘আইঁ ইয়াতাকাল্লামা মাআহু বিল্লাইয়্যিনি...’ অর্থাৎ, তাদের সাথে কোমল ভাষায় কথা বলা, কঠিন কোনো শব্দ উচ্চারণ না করা ।
৭. ‘আল্লা ইয়াদউয়াহু বিইসমিহি’ অর্থাৎ, তাদের নাম ধরে না ডাকা ।
৮. ‘আইঁ ইয়াম্শী খালফাহু’ অর্থাৎ, তাদের পিছনে হাঁটা, সামনে না হাঁটা ।
৯. ‘আইঁ ইয়ারদ্বা লাহূ মা ইয়ারদ্বা লিনাফ্সিহি...’ অর্থাৎ, নিজের জন্য যা কামনা কর তাদের জন্যও তা কামনা করা । নিজের জন্য যা অপছন্দ কর তাদের জন্যও তাই অপছন্দ করা ।
১০. ‘আইঁ ইয়াদউয়া লাহূ বিল মাগফিরাতি...’ অর্থাৎ, যখনই নিজের জন্য দোয়া করবে তখন তাদের মাগফেরাতের দোয়া করা । কুরআনে হযরত নূহ আ.-এর দোয়া এভাবে বর্ণিত হয়েছে— ‘রব্বিগ্ ফিরলী ওয়ালি ওয়া-লিদাইয়্যা’ অর্থ: হে আল্লাহ আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করুন । ইব্রাহীম আ.-এর দোয়া সম্পর্কে এসেছে— ‘রব্বানাগ ফিরলী ওয়ালি ওয়া-লিদাইয়্যা ওয়ালিল মু'মিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসা-ব’ অর্থ: হে রব! হিসাবের দিনে আমাকে আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিনদেরকে ক্ষমা করুন ।

টিকাঃ
২৮২. সূরা নুহ: আয়াত-২৮
২৮৩. সূরা ইবরাহীম: আয়াত-৪১-৪১

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা

📄 পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা


পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং তা নতুন আঙ্গিকে শুরু হয়। মৃত পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা সন্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

**দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা:**
সন্তানের উচিত পিতা-মাতার জন্য সর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। সন্তানের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন এবং এর মাধ্যমে মৃত মা-বাবার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শিখিয়ে দিয়েছেন:

**رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا**

**উচ্চারণ:** *রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।*
**অর্থ:** হে আমার রব! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন। (সূরা বনি ইসরাইল: ২৪) [17, 34]

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা জান্নাতে নেক বান্দার মর্যাদা উন্নত করেন। তখন সে বলে, হে রব! আমার এই মর্যাদা কীভাবে হলো? আল্লাহ বলেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে।' (মুসনাদে আহমাদ: ১০৬১৮) [17]

**সদকা করা:**
সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য সদকা করা একটি অত্যন্ত উত্তম আমল। এই সদকার সওয়াব সরাসরি মৃত মা-বাবার আমলনামায় পৌঁছে যায়।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী করিম (ﷺ)-কে বললেন, 'আমার মায়ের আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তিনি মৃত্যুর আগে কথা বলতে সক্ষম হলে কিছু সদকা করে যেতেন। এখন আমি তার পক্ষ থেকে সদকা করলে তিনি কি এর সওয়াব পাবেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' (বুখারি: ১৩৮৮) [17]

এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মৃত পিতা-মাতার পক্ষ থেকে দান-সদকা করলে তা তাদের কাছে পৌঁছায় এবং তাদের গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। এই দানকে 'সদকায়ে জারিয়া' বা প্রবহমান দান বলা হয়, যা তাদের জন্য পরকালে নাজাতের ওসিলা হতে পারে। [15, 28]

জনৈক সাহাবী রাযি. থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন— ‘তারকুদ্দুআ-ই লিল ওয়া-লিদাইনি ইউদ্বয়্যিকুল আইশা আলাল ওয়ালাদি’ অর্থাৎ, পিতা-মাতার জন্য দোয়া না করলে সন্তানের জীবিকাকে সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় ।

ফকীহ রহ. বলেন, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, পিতা-মাতার কেউ যদি অসন্তুষ্ট হয়ে ইন্তেকাল করে, তাহলে মৃত্যুর পরও কি তাদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব? তিনি বললেন, অবশ্যই । মৃত্যুর পর তিন উপায়ে তাদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব । যথা— ১. ‘আইঁ ইয়াকূনাল ওয়ালাদু স-লিহান ফী নাফসিহি’ অর্থাৎ, সন্তান নিজে সৎ হয়ে যাওয়া । কারণ, সন্তান নেককার ও সৎ হওয়া পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় নিআমত । ২. ‘আইঁ ইয়াস্বিলা ক্বরা-বাতা হুমা ওয়া আসদ্বিকা-আহুমা’ অর্থাৎ, পিতা-মাতার স্বজন ও বন্ধুদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা । ৩. ‘আইঁ ইয়াস্তাগফিরা লাহূমা ওয়া ইয়াদউয়া লাহূমা ওয়া ইয়াতাসাদ্দাক্বা আন্হুমা’ অর্থাৎ, তাদের মাগফিরাতের দোয়া করা এবং তাদের নামে সদকা করা ।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 মৃত্যুর পরও যে আমল অব্যাহত থাকে

📄 মৃত্যুর পরও যে আমল অব্যাহত থাকে


মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার জাগতিক সকল কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি ঘটে এবং আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এমন কিছু বিশেষ আমল রয়েছে, যার সওয়াব মৃত্যুর পরেও জারি থাকে। এই ধরনের আমলকে ইসলামী পরিভাষায় 'সদকায়ে জারিয়া' বা প্রবহমান দান বলা হয়।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"যখন কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করে, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি আমল ছাড়া:
১. **সদকায়ে জারিয়া** (এমন দান যার উপকারিতা চলমান থাকে)।
২. **এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়।**
৩. **এমন নেক সন্তান যে তার (পিতা-মাতার) জন্য দোয়া করে।**"
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১) [1, 6, 11]

এই হাদিসের আলোকে আলেমরা মৃত্যুর পরও সওয়াব জারি থাকে এমন কয়েকটি আমলের তালিকা করেছেন:

1. **সদকায়ে জারিয়া:** এর মধ্যে রয়েছে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, রাস্তা বা সেতু তৈরি করা, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, পানির জন্য কূপ বা নলকূপ স্থাপন করা, বৃক্ষরোপণ করা ইত্যাদি। যতদিন পর্যন্ত মানুষ বা সৃষ্টিজীব এসব থেকে উপকৃত হতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি এর সওয়াব পেতে থাকবেন। [1, 4, 7]

2. **উপকারী জ্ঞান প্রচার:** এমন জ্ঞান যা মানুষ শিখিয়ে যায় অথবা বই আকারে রেখে যায়। যেমন—কুরআন-হাদিস শিক্ষা দেওয়া, ধর্মীয় বা কল্যাণকর বই রচনা করা ও বিতরণ করা। যতদিন মানুষ সেই জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হবে, ততদিন ওই ব্যক্তির আমলনামায় সওয়াব যুক্ত হতে থাকবে। [5, 9, 11]

3. **সৎ সন্তানের দোয়া:** নেক সন্তান রেখে যাওয়া, যারা পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করতে থাকে। সন্তানের দোয়ার কারণে আল্লাহ মৃত পিতা-মাতার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। [5, 6, 11]

এছাড়াও হাদিসে আরও কিছু আমলের কথা উল্লেখ রয়েছে, যেমন—কুরআন শরিফ বিতরণ করা, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা নির্মাণ করা, নদী বা খাল খনন করা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দেওয়া। [5, 8, 9] এই আমলগুলো নিশ্চিত করে যে, একজন ব্যক্তি পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পরেও তার ভালো কাজের প্রতিদান পেতে থাকে।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত— রাসূল ইরশাদ করেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তিনটি আমল ছাড়া তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় । ১. সদকায়ে জারিয়া । ২. তার রেখে যাওয়া ইলম, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় । ৩. নেক সন্তান, যে তার মাগফেরাতের দোয়া করে ।

নবী করীম ইরশাদ করেন— ‘লা তাক্বত্বয়া' মান কানা ইয়াস্বিলু আবা-কা...’ যে তোমার পিতার সাথে যারা ভালো সম্পর্ক রাখে, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন কর না । কারণ, তোমার ভালোবাসা তোমার পিতার ভালোবাসার অনুরূপই ।

বনী সালামার জনৈক ব্যক্তি রাসূল-এর নিকট এসে বলল— ‘ইন্না আবাইয়্যা ক্বাদ মা-তা- ফাহাল বাক্বিয়া মিন বিররিহিমা আলাইয়্যা শাইয়্যুন?’ হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা মারা গেছেন, তাদের সাথে সদাচারণ করার কোনো পথ আছে? রাসূল বললেন— ‘নাআম, আল ইস্তিগফারু লাহূমা ওয়া ইন্ফাযু আহদিহিমা ওয়া ইকরা-মু সাদ্বীক্বিহিমা ওয়া স্বিলাতুর রহিমি’ হ্যাঁ, আছে । তাদের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করা, তাদের করে যাওয়া ওয়াদাগুলো পূর্ণ করা, তাদের বন্ধু বান্ধবদের সম্মান করা, তাদের সাথে সম্পর্কিত আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ।

টিকাঃ
২৮৪. সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৬৩১; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-২৮৮; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৩৭৬ ।
২৮৫. আল আদাবুল মুফরাদ হাদীস-৪০, শুআবুল ঈমান লি-বাইহাকী ৬/২০০ ।
২৮৬. সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৫১৪২; সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-৩৬৬৪; মুসনাদে আহমাদ: ২৫/৪৫৭ । শায়েখ শুয়াইব আরনাউত বলেছেন, হাদীসটির সনদ জয়ীফ ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px