📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 মায়ের অসন্তুষ্টির প্রতিফল : আলকামা রাযি.-এর ঘটনা

📄 মায়ের অসন্তুষ্টির প্রতিফল : আলকামা রাযি.-এর ঘটনা


হযরত আলকামা (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একজন সাহাবী, যিনি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-সদকায় অত্যন্ত অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, যা মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়।

মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে হযরত আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে পারছিলেন না। তাঁর স্ত্রী এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সংবাদ পাঠান। রাসূল (সা.) তখন হযরত আলী, হযরত সালমান ফারসী ও হযরত বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে আলকামাকে কালেমার তালকিন দিলেও তিনি তা উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হন।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আলকামার মা-বাবা বেঁচে আছেন কিনা জানতে চাইলেন। সাহাবিরা জানান, তাঁর বাবা নেই, তবে বৃদ্ধা মা জীবিত আছেন। রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে আলকামার মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হন।

রাসূল (সা.) তাঁকে আলকামার আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন যে, আলকামা ইবাদতকারী, রোজাদার এবং দানশীল ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং মায়ের প্রতি তাঁর আচরণ সন্তোষজনক ছিল না। এ কারণে তিনি ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট।

এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "এ কারণেই তার মুখে কালেমা আসছে না।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেন কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাতে, যাতে আলকামাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। এই কথা শুনে মায়ের মন কেঁদে ওঠে এবং তিনি বলেন যে, নিজের সন্তানকে আগুনে পুড়তে দেখা তাঁর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।

তখন রাসূল (সা.) তাঁকে বোঝান, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আগুন এর চেয়েও ভয়াবহ হবে। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তার কোনো ফরজ বা নফল ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।"

এই কথা শুনে মায়ের হৃদয় গলে যায়। তিনি তখন রাসূল (সা.)-কে সাক্ষী রেখে বলেন যে, তিনি তাঁর ছেলেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। রাসূল (সা.) সাথে সাথে বেলাল (রা.)-কে আলকামার অবস্থা দেখতে পাঠান। বেলাল (রা.) আলকামার ঘরের কাছে পৌঁছেই শুনতে পান যে তিনি উচ্চস্বরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" পাঠ করছেন। সেদিনই হযরত আলকামা (রা.) ইন্তেকাল করেন।

তাঁর দাফন শেষে রাসূল (সা.) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "হে আনসার ও মুহাজির! যে ব্যক্তি স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে, তার ওপর আল্লাহর লা'নত। তার ফরজ ও নফল ইবাদত কিছুই কবুল হয় না।" [25, 30, 31]

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 মাতা পিতার সাথে সদাচারণ

📄 মাতা পিতার সাথে সদাচারণ


ইসলামে মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করা অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং ফরজ দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বহুবার নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা এর গুরুত্বকে তুলে ধরে। [4]

**কুরআনের নির্দেশনা:**
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [12, 17] এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের সাথে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশকে যুক্ত করা হয়েছে, যা এর অপরিহার্যতা বোঝায়।

আল্লাহ আরও বলেন, "আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে তুমি আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লুকমান: ১৪)। [4] এখানেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিতা-মাতার বার্ধক্যে তাদের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [1, 9, 11] এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার প্রতি সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশও নিষিদ্ধ।

**হাদিসের নির্দেশনা:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম আমল কোনটি?" তিনি বললেন, "সময় মতো নামায আদায় করা।" এরপর জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, "পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।" (বুখারি)। [12]

অন্য একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (তিরমিজি)। [3, 4] এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়।

এমনকি পিতা-মাতা যদি অমুসলিমও হন, তবুও তাদের সাথে দুনিয়াবী বিষয়ে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [1, 11] সন্তানের জন্য উচিত পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকা, তাদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের দেখাশোনা করা। [11]

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার প্রাপ্য দশটি হক

📄 পিতা-মাতার প্রাপ্য দশটি হক


ইসলামে সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অসংখ্য অধিকার রয়েছে। আলেমগণ কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই হক বা অধিকারগুলোকে বিভিন্নভাবে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে কিছু হক তাদের জীবদ্দশায় এবং কিছু হক তাদের মৃত্যুর পর পালনীয়। এখানে পিতা-মাতার ১৪টি হকের একটি তালিকা উল্লেখ করা হলো, যা দুটি ভাগে বিভক্ত: [4, 7, 18]

**জীবিত অবস্থায় পালনীয় ৭টি হক:**

1. **শ্রদ্ধা ও সম্মান করা:** সর্বদা তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করা। [7, 18]
2. **মনে-প্রাণে ভালোবাসা:** তাদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা পোষণ করা। [7, 18]
3. **আনুগত্য করা:** আল্লাহর নাফরমানি হয় না, এমন সকল বিষয়ে তাদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। [7, 16, 18]
4. **সেবা-যত্ন করা:** তাদের সেবা করা এবং প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকা। [4, 7]
5. **প্রয়োজন পূরণ করা:** তাদের আর্থিক বা অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা। [7, 18]
6. **সুখ ও শান্তিতে রাখার চেষ্টা করা:** তাদের আরাম-আয়েশের প্রতি খেয়াল রাখা এবং তাদের সুখী করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করা। [7, 18]
7. **সাক্ষাৎ ও দেখাশোনা করা:** নিয়মিত তাদের সাথে দেখা করা এবং তাদের খোঁজ-খবর রাখা। [7, 18]

**মৃত্যুর পর পালনীয় ৭টি হক:**

1. **মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা:** তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। [4, 7]
2. **সওয়াব পৌঁছানো (ঈসালে সওয়াব):** তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে তাদের কাছে সওয়াব পৌঁছানো। [7]
3. **তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা:** পিতা-মাতার বন্ধুদের সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। [4, 7]
4. **তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাহায্য করা:** পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করা। [4, 7]
5. **ঋণ ও আমানত পরিশোধ করা:** তাদের কোনো ঋণ বা আমানত থাকলে তা পরিশোধ করা। [7]
6. **শরিয়তসম্মত ওসিয়ত পূর্ণ করা:** তারা কোনো বৈধ ওসিয়ত করে গেলে তা পূরণ করা। [4, 7]
7. **কবর জিয়ারত করা:** সাধ্যমতো তাদের কবর জিয়ারত করতে যাওয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা। [7, 18]

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা

📄 পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা


পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং তা নতুন আঙ্গিকে শুরু হয়। মৃত পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা সন্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

**দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা:**
সন্তানের উচিত পিতা-মাতার জন্য সর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। সন্তানের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন এবং এর মাধ্যমে মৃত মা-বাবার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শিখিয়ে দিয়েছেন:

**رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا**

**উচ্চারণ:** *রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।*
**অর্থ:** হে আমার রব! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন। (সূরা বনি ইসরাইল: ২৪) [17, 34]

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা জান্নাতে নেক বান্দার মর্যাদা উন্নত করেন। তখন সে বলে, হে রব! আমার এই মর্যাদা কীভাবে হলো? আল্লাহ বলেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে।' (মুসনাদে আহমাদ: ১০৬১৮) [17]

**সদকা করা:**
সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য সদকা করা একটি অত্যন্ত উত্তম আমল। এই সদকার সওয়াব সরাসরি মৃত মা-বাবার আমলনামায় পৌঁছে যায়।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী করিম (ﷺ)-কে বললেন, 'আমার মায়ের আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তিনি মৃত্যুর আগে কথা বলতে সক্ষম হলে কিছু সদকা করে যেতেন। এখন আমি তার পক্ষ থেকে সদকা করলে তিনি কি এর সওয়াব পাবেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' (বুখারি: ১৩৮৮) [17]

এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মৃত পিতা-মাতার পক্ষ থেকে দান-সদকা করলে তা তাদের কাছে পৌঁছায় এবং তাদের গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। এই দানকে 'সদকায়ে জারিয়া' বা প্রবহমান দান বলা হয়, যা তাদের জন্য পরকালে নাজাতের ওসিলা হতে পারে। [15, 28]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00