📄 মায়ের অসন্তুষ্টির প্রতিফল : আলকামা রাযি.-এর ঘটনা
হযরত আলকামা (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একজন সাহাবী, যিনি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-সদকায় অত্যন্ত অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, যা মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়।
মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে হযরত আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে পারছিলেন না। তাঁর স্ত্রী এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সংবাদ পাঠান। রাসূল (সা.) তখন হযরত আলী, হযরত সালমান ফারসী ও হযরত বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে আলকামাকে কালেমার তালকিন দিলেও তিনি তা উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আলকামার মা-বাবা বেঁচে আছেন কিনা জানতে চাইলেন। সাহাবিরা জানান, তাঁর বাবা নেই, তবে বৃদ্ধা মা জীবিত আছেন। রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে আলকামার মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হন।
রাসূল (সা.) তাঁকে আলকামার আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন যে, আলকামা ইবাদতকারী, রোজাদার এবং দানশীল ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং মায়ের প্রতি তাঁর আচরণ সন্তোষজনক ছিল না। এ কারণে তিনি ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট।
এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "এ কারণেই তার মুখে কালেমা আসছে না।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেন কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাতে, যাতে আলকামাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। এই কথা শুনে মায়ের মন কেঁদে ওঠে এবং তিনি বলেন যে, নিজের সন্তানকে আগুনে পুড়তে দেখা তাঁর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
তখন রাসূল (সা.) তাঁকে বোঝান, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আগুন এর চেয়েও ভয়াবহ হবে। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তার কোনো ফরজ বা নফল ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।"
এই কথা শুনে মায়ের হৃদয় গলে যায়। তিনি তখন রাসূল (সা.)-কে সাক্ষী রেখে বলেন যে, তিনি তাঁর ছেলেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। রাসূল (সা.) সাথে সাথে বেলাল (রা.)-কে আলকামার অবস্থা দেখতে পাঠান। বেলাল (রা.) আলকামার ঘরের কাছে পৌঁছেই শুনতে পান যে তিনি উচ্চস্বরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" পাঠ করছেন। সেদিনই হযরত আলকামা (রা.) ইন্তেকাল করেন।
তাঁর দাফন শেষে রাসূল (সা.) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "হে আনসার ও মুহাজির! যে ব্যক্তি স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে, তার ওপর আল্লাহর লা'নত। তার ফরজ ও নফল ইবাদত কিছুই কবুল হয় না।" [25, 30, 31]
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রাসূল-এর সময় আলকামা নামে এক যুবক ছিল । সে খুবই এবাদতগুজার এবং দানশীল ছিল । হঠাৎ সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল । তার স্ত্রী রাসূল-এর নিকট খবর পাঠালেন যে, আমার স্বামী ভীষণ অসুস্থ । বিষয়টি আপনাকে জানানো প্রয়োজন মনে করছি । রাসূল সাথে সাথে হযরত বেলাল, আলী, আম্মার এবং সালমান রাযি. কে বললেন, আলকামার কাছে গিয়ে দেখ, তার কী অবস্থা । তারা গিয়ে তাকে কালেমা পড়াতে চাইলেন । কিন্তু তার মুখে কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না । তখন তারা বুঝতে পারলেন যে, ধ্বংস তার জন্য অনিবার্য । তাই তারা তার অবস্থা জানিয়ে হযরত বেলালকে রাসূল-এর নিকট পাঠালেন । রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, তার পিতা-মাতা জীবিত আছেন? উপস্থিত লোকেরা বললেন, তার পিতা মারা গেছেন । তবে বৃদ্ধা মাতা বেঁচে আছেন । রাসূল বললেন, বেলাল! তার মাতার কাছে গিয়ে বলো, রাসূল আপনার নিকট সালাম পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন, আপনার অসুবিধা না হলে রাসূল আপনাকে তার দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ করেছেন । অন্যথায়, রাসূল নিজে আপনার নিকট আসবেন । একথা শুনে বৃদ্ধা বললেন, আমার প্রাণ তার জন্য উৎসর্গিত হোক । আমি নিজেই তার দরবারে যাব । এই বলে বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূলের দরবারে হাজির হলেন । সালাম করে রাসূলের সামনে বসলেন । রাসূল বললেন, সত্য উত্তর দিবেন, মিথ্যে বললে কিন্তু আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে আমাকে জানিয়ে দেবেন । আলকামা কেমন ছিল? বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সে অনেক নামায-রোজা করত এবং বেহিসাব সদকা করত । রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সাথে তার সম্পর্ক কেমন? বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মনে তার প্রতি কষ্ট আছে । রাসূল বললেন, কেন? বৃদ্ধা বলল, সে তার বউকে আমার উপর প্রাধান্য দিত, যাবতীয় বিষয়ে আমার কথা না শুনে তার কথা শুনত । একথা শুনে রাসূল ইরশাদ করলেন, মায়ের অসন্তুষ্টির ফলেই সে কালেমায়ে শাহাদাৎ উচ্চারণ করতে পারছে না । তারপর হযরত বেলাল রাযি.-কে বললেন, বেলাল! তুমি গিয়ে কিছু লাকড়ি জমা কর, আমি আলকামাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেব । তখন বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সন্তান, আমার কলিজার টুকরা, তাকে আমার সামনে জ্বালিয়ে দেবে আমার মন তা বরদাশত করতে পারবে? রাসূল ইরশাদ করলেন, আলকামার মা! আল্লাহর আযাব এর চেয়ে কঠিন ও স্থায়ী, আপনি যদি চান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন তাহলে তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান । যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার কসম! আপনি যদি তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন তাহলে নামায-রোজা-সদকা তার কোনো কাজে আসবে না । তখন বললেন, আমি আসমানের আল্লাহকে, আপনাকে এবং উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আলকামার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম । রাসূল বললেন, বেলাল! তার বাড়ি যাও । দেখ আলকামা কালেমা শাহাদৎ পাঠ করতে পারছে কিনা । হতে পারে তার মা তার প্রতি এখনো অসন্তুষ্ট, কিন্তু রাসূলের সামনে লজ্জা পেয়ে মুখে অন্য কথা বলছে । বেলাল আলকামার বাড়ি গেলেন । তার ঘরের দরজায় পৌঁছতেই তিনি শুনতে পেলেন, আলকামা কালেমা পাঠ করছে । তিনি উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, মায়ের অসন্তুষ্টির ফলেই আলকামা কালেমা পাঠ করতে পারছিল না । আর মায়ের সন্তুষ্টির কারণেই এখন সে কালেমা পড়তে পারছে । সে দিনই আলকামা মারা গেলেন । রাসূল নিজে উপস্থিত হয়ে তার গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করলেন । অতঃপর তার জানাযার নামায পড়ালেন । দাফন শেষে তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মুহাজির ও আনসারগণ! যে ব্যক্তি স্ত্রীকে মায়ের উপর প্রাধান্য দেবে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে এবং তার ফরজ ও নফল কোনো এবাদতই কবুল করা হবে না ।
টিকাঃ
২৭৮. আহমাদ, হাইসামী, যাহাবী, ইবনে আররাক, ইবনুল জাওযী ও শাওকানীসহ অধিকাংশ হাদীসবেত্তাদের ভাষ্যমতে, হাদীসের কাহিনীটি সহীহ নয় বরং জাল । সুতরাং এটা নবিজীর সা. নামে বর্ণনা করা উচিত হবে না ।
📄 মাতা পিতার সাথে সদাচারণ
ইসলামে মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করা অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং ফরজ দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বহুবার নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা এর গুরুত্বকে তুলে ধরে। [4]
**কুরআনের নির্দেশনা:**
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [12, 17] এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের সাথে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশকে যুক্ত করা হয়েছে, যা এর অপরিহার্যতা বোঝায়।
আল্লাহ আরও বলেন, "আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে তুমি আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লুকমান: ১৪)। [4] এখানেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিতা-মাতার বার্ধক্যে তাদের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [1, 9, 11] এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার প্রতি সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশও নিষিদ্ধ।
**হাদিসের নির্দেশনা:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম আমল কোনটি?" তিনি বললেন, "সময় মতো নামায আদায় করা।" এরপর জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, "পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।" (বুখারি)। [12]
অন্য একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (তিরমিজি)। [3, 4] এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়।
এমনকি পিতা-মাতা যদি অমুসলিমও হন, তবুও তাদের সাথে দুনিয়াবী বিষয়ে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [1, 11] সন্তানের জন্য উচিত পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকা, তাদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের দেখাশোনা করা। [11]
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ওয়া ক্বদা রব্বুকা আল্লা তা'বুদূ ইল্লা ইয়্যাহু ওয়াবিল ওয়া-লিদাইনি ইহ্ সা-নান...’ অর্থ: তোমার রব ফায়সালা দিয়েছেন যে, তাকে ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না । অর্থাৎ, তাকেই একক আল্লাহ জানো । কেউ পাপের আদেশ দিলে তার অনুসরণ কর না । আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচারণ করবে । ‘ইম্মাই ইয়াব্লুগান্না ইনদাকাল কিবারা আহাদুহুমা- আও কিলা-হুমা- ফালা তাক্বুল্লাহুমা- উফফিন...’ যদি তাদের একজন কিংবা উভয় তোমাদের নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ পর্যন্ত বলবে না । অর্থাৎ, বাবা-মার সাথে অনুচিৎ কথা বলো না । কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ হলো, বার্ধক্যে বিছানায় পেশাব পায়খানা করলে তাদের পেশাব-পায়খানা উঠানোর সময় নাক ছিটকাবে না বা মুখ বিকৃত করবে না । কারণ, শিশুকালে তারাও এমনটি করেছেন, কিন্তু নাক ছিটকায় নি । ‘ওয়ালা তান্হারহুমা- ওয়া ক্বুল্লাহুমা- ক্বাওলান কারীমান ওয়াক্বফিদ্ব লাহূমা- জানাহায যুল্লি মিনার রহ্মাতি...’ তাদেরকে ধমক দেবে না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানের সাথে কথা বলবে । অর্থাৎ, তাদের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলবে না । আর তাদের জন্য তোমার দয়ার দু ডানা কে বিছিয়ে দেবে । অর্থাৎ, তাদের জন্য বিনয়ী ও রহমকারী হয়ে যাও । ‘ওয়া ক্বুর রব্বির হাম্হুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগীরা-’ এবং বলবে, হে রব! তাদের প্রতি রহম করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছেন ।
অর্থাৎ, জীবিত অবস্থায় পিতা-মাতার সেবা করা যেমন সন্তানের কর্তব্য তেমনি মৃত্যুর পর প্রতি নামাযের পর তাদের মাগফেরাতের দোয়া করাও সন্তানের দায়িত্ব । আবার কেউ কেউ বলেন, জীবিত অবস্থাতেও প্রতি নামাযের পর পিতা-মাতার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা সন্তানের জন্য কর্তব্য ।
জনৈক তাবেঈ বলেন, পিতা-মাতার জন্য দিনে পাঁচ বার দোয়া করলে তাদের হক আদায় হয় । কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘আনিশ কুর লী ওয়া লিওয়া-লিদাইকা ইলাইয়্যাল মাসীরু’ অর্থ: আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকর আদায় কর, আমার নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল । আল্লাহ তা'আলার শুকর আদায় করার অর্থ হলো, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া । সুতরাং পিতা-মাতার শুকর আদায়ের অর্থও হবে দিনে তাদের জন্য পাঁচ বার দোয়া করা ।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘রব্বুকুম আ'লামু বিমা ফী নুফুসিকুম...’ অর্থ: যদি তোমরা সৎ হও তাহলেও তোমাদের রব তোমাদের মনে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা অধিক জ্ঞাত । অর্থাৎ, পিতা-মাতার প্রতি কোমলভাব ও তাদের আনুগত্যের সংকল্প সে সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত । আর যদি তোমরা পিতা-মাতার অবাধ্য হও এবং তাওবা কর তাহলে নিশ্চয় তিনি তাওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল ।
টিকাঃ
২৭৯. সূরা আল ইসরা: আয়াত-২৪
২৮০. লুকমান: আয়াত-১৪
২৮১. সূরা ইসরা: আয়াত-২৫
📄 পিতা-মাতার প্রাপ্য দশটি হক
ইসলামে সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অসংখ্য অধিকার রয়েছে। আলেমগণ কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই হক বা অধিকারগুলোকে বিভিন্নভাবে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে কিছু হক তাদের জীবদ্দশায় এবং কিছু হক তাদের মৃত্যুর পর পালনীয়। এখানে পিতা-মাতার ১৪টি হকের একটি তালিকা উল্লেখ করা হলো, যা দুটি ভাগে বিভক্ত: [4, 7, 18]
**জীবিত অবস্থায় পালনীয় ৭টি হক:**
1. **শ্রদ্ধা ও সম্মান করা:** সর্বদা তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করা। [7, 18]
2. **মনে-প্রাণে ভালোবাসা:** তাদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা পোষণ করা। [7, 18]
3. **আনুগত্য করা:** আল্লাহর নাফরমানি হয় না, এমন সকল বিষয়ে তাদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। [7, 16, 18]
4. **সেবা-যত্ন করা:** তাদের সেবা করা এবং প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকা। [4, 7]
5. **প্রয়োজন পূরণ করা:** তাদের আর্থিক বা অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা। [7, 18]
6. **সুখ ও শান্তিতে রাখার চেষ্টা করা:** তাদের আরাম-আয়েশের প্রতি খেয়াল রাখা এবং তাদের সুখী করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করা। [7, 18]
7. **সাক্ষাৎ ও দেখাশোনা করা:** নিয়মিত তাদের সাথে দেখা করা এবং তাদের খোঁজ-খবর রাখা। [7, 18]
**মৃত্যুর পর পালনীয় ৭টি হক:**
1. **মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা:** তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। [4, 7]
2. **সওয়াব পৌঁছানো (ঈসালে সওয়াব):** তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে তাদের কাছে সওয়াব পৌঁছানো। [7]
3. **তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা:** পিতা-মাতার বন্ধুদের সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। [4, 7]
4. **তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাহায্য করা:** পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করা। [4, 7]
5. **ঋণ ও আমানত পরিশোধ করা:** তাদের কোনো ঋণ বা আমানত থাকলে তা পরিশোধ করা। [7]
6. **শরিয়তসম্মত ওসিয়ত পূর্ণ করা:** তারা কোনো বৈধ ওসিয়ত করে গেলে তা পূরণ করা। [4, 7]
7. **কবর জিয়ারত করা:** সাধ্যমতো তাদের কবর জিয়ারত করতে যাওয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা। [7, 18]
বলা হয়, সন্তানের উপর পিতা-মাতার দশটি হক রয়েছে । যথা—
১. ‘ইযা ইতাজ্জা ইলাত ত্বয়া-মি আত্য়ামাহু’ অর্থাৎ, তাদের কারো খাবারের প্রয়োজন হলে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা ।
২. ‘ইযা ইতাজ্জা ইলাল কুসওয়াতি কাসাহু’ অর্থাৎ, বস্ত্রের প্রয়োজন হলে তাদের বস্ত্রের ব্যবস্থা করা । দুনিয়াতে তাদের সাথে ভালো আচরণ কর, আল্লাহ তা'আলার এই বাণীটি রাসূল ﷺ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তাদের সাথে ভালো আচরণ অর্থ হলো, তারা ক্ষুধার্ত হলে আহার দান করা, বস্ত্রহীন হলে বস্ত্র দান করা ।
৩. ‘ইযা ইতাজ্জা আহাদুহুমা ইলা খিদমাতিহি খাদামাহু’ অর্থাৎ, তাদের কারো সেবার দরকার হলে সেবা করা ।
৪. ‘ইযা দাআ-হু আজা-বাহু ওয়া হাজ্বারাহু’ অর্থাৎ, তারা ডাকলে তৎক্ষণাৎ ডাকে সাড়া দেওয়া এবং উপস্থিত হওয়া ।
৫. ‘ইযা আমারা-হু বিআজরিন আত্বয়া-আহু...’ অর্থাৎ, আল্লাহ নাফরমানী বা গীবত ছাড়া অন্য কিছুর আদেশ করলে তা পালন করা ।
৬. ‘আইঁ ইয়াতাকাল্লামা মাআহু বিল্লাইয়্যিনি...’ অর্থাৎ, তাদের সাথে কোমল ভাষায় কথা বলা, কঠিন কোনো শব্দ উচ্চারণ না করা ।
৭. ‘আল্লা ইয়াদউয়াহু বিইসমিহি’ অর্থাৎ, তাদের নাম ধরে না ডাকা ।
৮. ‘আইঁ ইয়াম্শী খালফাহু’ অর্থাৎ, তাদের পিছনে হাঁটা, সামনে না হাঁটা ।
৯. ‘আইঁ ইয়ারদ্বা লাহূ মা ইয়ারদ্বা লিনাফ্সিহি...’ অর্থাৎ, নিজের জন্য যা কামনা কর তাদের জন্যও তা কামনা করা । নিজের জন্য যা অপছন্দ কর তাদের জন্যও তাই অপছন্দ করা ।
১০. ‘আইঁ ইয়াদউয়া লাহূ বিল মাগফিরাতি...’ অর্থাৎ, যখনই নিজের জন্য দোয়া করবে তখন তাদের মাগফেরাতের দোয়া করা । কুরআনে হযরত নূহ আ.-এর দোয়া এভাবে বর্ণিত হয়েছে— ‘রব্বিগ্ ফিরলী ওয়ালি ওয়া-লিদাইয়্যা’ অর্থ: হে আল্লাহ আমাকে এবং আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করুন । ইব্রাহীম আ.-এর দোয়া সম্পর্কে এসেছে— ‘রব্বানাগ ফিরলী ওয়ালি ওয়া-লিদাইয়্যা ওয়ালিল মু'মিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসা-ব’ অর্থ: হে রব! হিসাবের দিনে আমাকে আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিনদেরকে ক্ষমা করুন ।
টিকাঃ
২৮২. সূরা নুহ: আয়াত-২৮
২৮৩. সূরা ইবরাহীম: আয়াত-৪১-৪১
📄 পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা
পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং তা নতুন আঙ্গিকে শুরু হয়। মৃত পিতা-মাতার জন্য দোয়া ও সদকা করা সন্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
**দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা:**
সন্তানের উচিত পিতা-মাতার জন্য সর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। সন্তানের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন এবং এর মাধ্যমে মৃত মা-বাবার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শিখিয়ে দিয়েছেন:
**رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا**
**উচ্চারণ:** *রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।*
**অর্থ:** হে আমার রব! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে দয়াবশে প্রতিপালন করেছিলেন। (সূরা বনি ইসরাইল: ২৪) [17, 34]
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা জান্নাতে নেক বান্দার মর্যাদা উন্নত করেন। তখন সে বলে, হে রব! আমার এই মর্যাদা কীভাবে হলো? আল্লাহ বলেন, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে।' (মুসনাদে আহমাদ: ১০৬১৮) [17]
**সদকা করা:**
সন্তানের পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য সদকা করা একটি অত্যন্ত উত্তম আমল। এই সদকার সওয়াব সরাসরি মৃত মা-বাবার আমলনামায় পৌঁছে যায়।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী করিম (ﷺ)-কে বললেন, 'আমার মায়ের আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তিনি মৃত্যুর আগে কথা বলতে সক্ষম হলে কিছু সদকা করে যেতেন। এখন আমি তার পক্ষ থেকে সদকা করলে তিনি কি এর সওয়াব পাবেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' (বুখারি: ১৩৮৮) [17]
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মৃত পিতা-মাতার পক্ষ থেকে দান-সদকা করলে তা তাদের কাছে পৌঁছায় এবং তাদের গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। এই দানকে 'সদকায়ে জারিয়া' বা প্রবহমান দান বলা হয়, যা তাদের জন্য পরকালে নাজাতের ওসিলা হতে পারে। [15, 28]
জনৈক সাহাবী রাযি. থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন— ‘তারকুদ্দুআ-ই লিল ওয়া-লিদাইনি ইউদ্বয়্যিকুল আইশা আলাল ওয়ালাদি’ অর্থাৎ, পিতা-মাতার জন্য দোয়া না করলে সন্তানের জীবিকাকে সংকীর্ণ করে দেওয়া হয় ।
ফকীহ রহ. বলেন, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, পিতা-মাতার কেউ যদি অসন্তুষ্ট হয়ে ইন্তেকাল করে, তাহলে মৃত্যুর পরও কি তাদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব? তিনি বললেন, অবশ্যই । মৃত্যুর পর তিন উপায়ে তাদের সন্তুষ্ট করা সম্ভব । যথা— ১. ‘আইঁ ইয়াকূনাল ওয়ালাদু স-লিহান ফী নাফসিহি’ অর্থাৎ, সন্তান নিজে সৎ হয়ে যাওয়া । কারণ, সন্তান নেককার ও সৎ হওয়া পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় নিআমত । ২. ‘আইঁ ইয়াস্বিলা ক্বরা-বাতা হুমা ওয়া আসদ্বিকা-আহুমা’ অর্থাৎ, পিতা-মাতার স্বজন ও বন্ধুদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা । ৩. ‘আইঁ ইয়াস্তাগফিরা লাহূমা ওয়া ইয়াদউয়া লাহূমা ওয়া ইয়াতাসাদ্দাক্বা আন্হুমা’ অর্থাৎ, তাদের মাগফিরাতের দোয়া করা এবং তাদের নামে সদকা করা ।