📄 পিতা-মাতার শোকর আদায় ব্যতীত আল্লাহর শোকর আদায় হয় না
ইসলামে কৃতজ্ঞতা বা শোকর আদায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন এবং এর বিনিময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা নিজের শুকরিয়ার সাথে পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায়ের বিষয়টিকেও যুক্ত করেছেন, যা পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার গুরুত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখ, তোমার) প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই।" (সূরা লোকমান: ১৪)। [4, 10, 19]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতার আদেশের পরেই পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। [28] তাফসিরকারকগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করাও সন্তানের জন্য জরুরি। [26] আল্লাহ তাআলা যেমন সৃষ্টিকর্তা, তেমনি পিতা-মাতা হলেন পৃথিবীতে আমাদের আসার মাধ্যম। তাই আল্লাহর শোকর আদায় করতে হয় ঈমানের নিয়ামত লাভের জন্য, আর পিতা-মাতার শোকর আদায় করতে হয় তাদের লালন-পালনের জন্য। [12] একারণে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সন্তানের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যগুলোর একটি। [28]
বলা হয়ে থাকে, কুরআনের তিনটি বিষয় অপর তিনটি বিষয়ের সাথে যুক্ত হয়ে নাযিল হয়েছে । আল্লাহ তা'আলা তার কোনোটিই অপরটি ছাড়া কবুল করবেন না ।
১. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ওয়া আক্বিমুস সালা-তা ওয়া আ-তুয যাকা-তা’ অর্থ: তোমরা নামায কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর । সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি নামায পড়ে কিন্তু যাকাত আদায় না করে তাহলে তার নামায কবুল হবে না ।
২. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ওয়া আতিউল্লা-হা ওয়া আতিউর রসূলা’ অর্থ: তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর । সুতরাং রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত আল্লাহর আনুগত্য হবে না ।
৩. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘আনিশ কুর লী ওয়ালি ওয়া-লিদাইকা’ অর্থ: আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকর আদায় কর । সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে আর পিতা-মাতার না শুকরিয়া করে, তাহলে তার সে আমল কবুল হবে না ।
এর প্রমান রাসূল -এর হাদীস । তিনি ইরশাদ করেন— ‘ইন্না লা'নাতাল ওয়া-লিদাইনি তুবিররু’ অর্থাৎ পিতা-মাতার অবাধ্যতার কারণে যদি সন্তানকে অভিশাপ দেন, তাহলে তা সন্তানের মূল কেটে দিবে । যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট করবে তার স্রষ্টা তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন । আর যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অসন্তুষ্ট করবে তার স্রষ্টা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন । যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা কোনো একজনকে জীবিত পেল আর তাদের সাথে সদাচার করল না, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল ।
রাসূল কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— ‘আইয়্যুাল আমালি আফদ্বালু?’ তিনি ইরশাদ করলেন, সময়মত নামায আদায় করা, অতঃপর পিতা-মাতার আনুগত্য করা, অতঃপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ।
টিকাঃ
২৭১. সূরা বাকারা: আয়াত-৪৩
২৭২. সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৩২
২৭৪. হাদীসটির মূলভাব সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত । (সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৮৯৯) ।
২৭৫. সহীহুল বুখারী: হাদীস-৫৯৭০; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৩৮; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৭৩ ।
📄 পিতা-মাতার হকের গুরুত্ব
ইসলামে পিতা-মাতার হক বা অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা তাদের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেছে। [4, 24]
**কুরআনের আলোকে পিতা-মাতার হক:**
* **আল্লাহর ইবাদতের পর সর্বোচ্চ স্থান:** আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [3, 20] মেরাজের রাতে যে চৌদ্দটি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে প্রথমটি ছিল আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা এবং দ্বিতীয়টিই ছিল পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। [4]
* **কৃতজ্ঞতা প্রকাশ:** আল্লাহ বলেন, "আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লোকমান: ১৪)। [4, 19] এখানে আল্লাহ তাঁর নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতার সাথে পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন।
* **বার্ধক্যে সেবা:** বার্ধক্যে উপনীত পিতা-মাতার প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, "তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তুমি তাদের প্রতি 'উফ' শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তুমি তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলো।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [1, 9, 11]
**হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার হক:**
* **আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম:** রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।" (তিরমিজি)। [1, 4]
* **জান্নাত ও জাহান্নামের চাবিকাঠি:** নবীজি (সা.) বলেছেন, "পিতা-মাতা হলো তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম।" অর্থাৎ, তাদের সেবা করে জান্নাত অর্জন করা যায়, আবার তাদের অবাধ্য হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হতে পারে। (ইবনে মাজাহ)। [4]
* **জিহাদের চেয়েও উত্তম:** আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো সময়মতো নামাজ আদায় করা, এরপরই পিতা-মাতার সেবা করা এবং তারপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। [20]
* **মায়ের হক তিনগুণ বেশি:** এক সাহাবির প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার মায়ের হকের কথা উল্লেখ করেন এবং চতুর্থবারে বাবার কথা বলেন। এর দ্বারা মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ ও কষ্টের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। (বুখারি ও মুসলিম)। [4]
পিতা-মাতার জীবদ্দশায় যেমন তাঁদের প্রতি সদাচরণ, সম্মান, সেবা ও আনুগত্য করা সন্তানের কর্তব্য, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের ঋণ পরিশোধ করা, তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তাঁদের হক আদায় করা যায়। [4, 15]
হযরত ফারকাদ সাবখী রহ. বলেন, আমি কোনো এক কিতাবে এমন পড়েছি, অনুমতি ছাড়া পিতা-মাতার সামনে সন্তানের কথা বলা উচিত নয় । সন্তান পিতা-মাতার সামনে দিয়ে বা ডানে বায়ে হাঁটবে না । তারা যদি আদেশ করেন তাহলেই হাঁটবে । বরং দাস যেমন মনিবের পিছনে হাঁটে তেমনি তাদের পিছনে পিছনে হাঁটবে ।
বর্ণিত আছে, একদা এক ব্যক্তি রাসূল-এর নিকট এসে বললেন— হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাতা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, তিনি আমার নিকট থাকেন, আমি নিজ হাতে তাকে পানাহার করাই, তাকে উযূ করাই এবং নিজ কাঁধে করে বয়ে বেড়াই । আমি কি তার প্রতিদান দিতে পেরেছি? রাসূল ইরশাদ করলেন, না, তার এক শতভাগের একভাগও না । তবে তুমি উত্তম কর্ম করেছ, আল্লাহ এই অল্প আমলের অনেক প্রতিদান দিবেন ।
হিশাম বিন উরাওয়া রহ. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন । প্রজ্ঞাময় কথার মধ্যে এটা যে, অভিশপ্ত সে, যে তার পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় । পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেওয়ার অর্থ হলো, সে এমন আমল করে যদ্দ্বারা তার পিতা-মাতা লানতের উপযুক্ত হয়ে যায় । অভিশপ্ত সে, যে সঠিক পথ হতে লোকদেরকে বাধা দেয় বা কোনো অন্ধকে সঠিক পথ হতে সরিয়ে দেয় । অভিশপ্ত সে যে গাইরুল্লাহর নামে পশু জবাই করে । অভিশপ্ত সে, যে জমিনের আইল পরিবর্তন করে । অর্থাৎ, তার জমিন ও অন্যের জমিনের মধ্যকার চিহ্ন সরিয়ে দেয় । কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, হেরেমের চিহ্ন ।
রাসূল থেকে বর্ণিত । সবচেয়ে বড় পাপ হলো, কোনো ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া । রাসূল-কে জিজ্ঞেস করা হলো, পিতা-মাতাকে কীভাবে গালি দেওয়া হয়? রাসূল বললেন, কেউ অন্য কারো বাবাকে গালি দেয়, ফলে সেও তার বাবাকে গালি দেয় । কেউ অন্য কারো মাকে গালি দেয়, ফলে সেও তার মাকে গালি দেয় ।
টিকাঃ
২৭৬. মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৮/২৫৪ আল্লামা হাইসামি বলেন, সনদে জয়ীফ ও মুদাল্লিস রাবি রয়েছে ।
২৭৭. সহীহুল বুখারী: হাদীস-৫৯৭৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-৯০ ।
📄 মায়ের অসন্তুষ্টির প্রতিফল : আলকামা রাযি.-এর ঘটনা
হযরত আলকামা (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একজন সাহাবী, যিনি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-সদকায় অত্যন্ত অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, যা মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়।
মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে হযরত আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে পারছিলেন না। তাঁর স্ত্রী এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সংবাদ পাঠান। রাসূল (সা.) তখন হযরত আলী, হযরত সালমান ফারসী ও হযরত বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে আলকামাকে কালেমার তালকিন দিলেও তিনি তা উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আলকামার মা-বাবা বেঁচে আছেন কিনা জানতে চাইলেন। সাহাবিরা জানান, তাঁর বাবা নেই, তবে বৃদ্ধা মা জীবিত আছেন। রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে আলকামার মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হন।
রাসূল (সা.) তাঁকে আলকামার আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন যে, আলকামা ইবাদতকারী, রোজাদার এবং দানশীল ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং মায়ের প্রতি তাঁর আচরণ সন্তোষজনক ছিল না। এ কারণে তিনি ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট।
এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "এ কারণেই তার মুখে কালেমা আসছে না।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেন কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাতে, যাতে আলকামাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। এই কথা শুনে মায়ের মন কেঁদে ওঠে এবং তিনি বলেন যে, নিজের সন্তানকে আগুনে পুড়তে দেখা তাঁর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
তখন রাসূল (সা.) তাঁকে বোঝান, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আগুন এর চেয়েও ভয়াবহ হবে। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তার কোনো ফরজ বা নফল ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।"
এই কথা শুনে মায়ের হৃদয় গলে যায়। তিনি তখন রাসূল (সা.)-কে সাক্ষী রেখে বলেন যে, তিনি তাঁর ছেলেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। রাসূল (সা.) সাথে সাথে বেলাল (রা.)-কে আলকামার অবস্থা দেখতে পাঠান। বেলাল (রা.) আলকামার ঘরের কাছে পৌঁছেই শুনতে পান যে তিনি উচ্চস্বরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" পাঠ করছেন। সেদিনই হযরত আলকামা (রা.) ইন্তেকাল করেন।
তাঁর দাফন শেষে রাসূল (সা.) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "হে আনসার ও মুহাজির! যে ব্যক্তি স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে, তার ওপর আল্লাহর লা'নত। তার ফরজ ও নফল ইবাদত কিছুই কবুল হয় না।" [25, 30, 31]
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রাসূল-এর সময় আলকামা নামে এক যুবক ছিল । সে খুবই এবাদতগুজার এবং দানশীল ছিল । হঠাৎ সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল । তার স্ত্রী রাসূল-এর নিকট খবর পাঠালেন যে, আমার স্বামী ভীষণ অসুস্থ । বিষয়টি আপনাকে জানানো প্রয়োজন মনে করছি । রাসূল সাথে সাথে হযরত বেলাল, আলী, আম্মার এবং সালমান রাযি. কে বললেন, আলকামার কাছে গিয়ে দেখ, তার কী অবস্থা । তারা গিয়ে তাকে কালেমা পড়াতে চাইলেন । কিন্তু তার মুখে কোনো শব্দ উচ্চারিত হলো না । তখন তারা বুঝতে পারলেন যে, ধ্বংস তার জন্য অনিবার্য । তাই তারা তার অবস্থা জানিয়ে হযরত বেলালকে রাসূল-এর নিকট পাঠালেন । রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, তার পিতা-মাতা জীবিত আছেন? উপস্থিত লোকেরা বললেন, তার পিতা মারা গেছেন । তবে বৃদ্ধা মাতা বেঁচে আছেন । রাসূল বললেন, বেলাল! তার মাতার কাছে গিয়ে বলো, রাসূল আপনার নিকট সালাম পাঠিয়েছেন এবং বলেছেন, আপনার অসুবিধা না হলে রাসূল আপনাকে তার দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ করেছেন । অন্যথায়, রাসূল নিজে আপনার নিকট আসবেন । একথা শুনে বৃদ্ধা বললেন, আমার প্রাণ তার জন্য উৎসর্গিত হোক । আমি নিজেই তার দরবারে যাব । এই বলে বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূলের দরবারে হাজির হলেন । সালাম করে রাসূলের সামনে বসলেন । রাসূল বললেন, সত্য উত্তর দিবেন, মিথ্যে বললে কিন্তু আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে আমাকে জানিয়ে দেবেন । আলকামা কেমন ছিল? বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সে অনেক নামায-রোজা করত এবং বেহিসাব সদকা করত । রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সাথে তার সম্পর্ক কেমন? বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মনে তার প্রতি কষ্ট আছে । রাসূল বললেন, কেন? বৃদ্ধা বলল, সে তার বউকে আমার উপর প্রাধান্য দিত, যাবতীয় বিষয়ে আমার কথা না শুনে তার কথা শুনত । একথা শুনে রাসূল ইরশাদ করলেন, মায়ের অসন্তুষ্টির ফলেই সে কালেমায়ে শাহাদাৎ উচ্চারণ করতে পারছে না । তারপর হযরত বেলাল রাযি.-কে বললেন, বেলাল! তুমি গিয়ে কিছু লাকড়ি জমা কর, আমি আলকামাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেব । তখন বৃদ্ধা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার সন্তান, আমার কলিজার টুকরা, তাকে আমার সামনে জ্বালিয়ে দেবে আমার মন তা বরদাশত করতে পারবে? রাসূল ইরশাদ করলেন, আলকামার মা! আল্লাহর আযাব এর চেয়ে কঠিন ও স্থায়ী, আপনি যদি চান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন তাহলে তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান । যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার কসম! আপনি যদি তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন তাহলে নামায-রোজা-সদকা তার কোনো কাজে আসবে না । তখন বললেন, আমি আসমানের আল্লাহকে, আপনাকে এবং উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আলকামার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম । রাসূল বললেন, বেলাল! তার বাড়ি যাও । দেখ আলকামা কালেমা শাহাদৎ পাঠ করতে পারছে কিনা । হতে পারে তার মা তার প্রতি এখনো অসন্তুষ্ট, কিন্তু রাসূলের সামনে লজ্জা পেয়ে মুখে অন্য কথা বলছে । বেলাল আলকামার বাড়ি গেলেন । তার ঘরের দরজায় পৌঁছতেই তিনি শুনতে পেলেন, আলকামা কালেমা পাঠ করছে । তিনি উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, মায়ের অসন্তুষ্টির ফলেই আলকামা কালেমা পাঠ করতে পারছিল না । আর মায়ের সন্তুষ্টির কারণেই এখন সে কালেমা পড়তে পারছে । সে দিনই আলকামা মারা গেলেন । রাসূল নিজে উপস্থিত হয়ে তার গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করলেন । অতঃপর তার জানাযার নামায পড়ালেন । দাফন শেষে তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মুহাজির ও আনসারগণ! যে ব্যক্তি স্ত্রীকে মায়ের উপর প্রাধান্য দেবে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে এবং তার ফরজ ও নফল কোনো এবাদতই কবুল করা হবে না ।
টিকাঃ
২৭৮. আহমাদ, হাইসামী, যাহাবী, ইবনে আররাক, ইবনুল জাওযী ও শাওকানীসহ অধিকাংশ হাদীসবেত্তাদের ভাষ্যমতে, হাদীসের কাহিনীটি সহীহ নয় বরং জাল । সুতরাং এটা নবিজীর সা. নামে বর্ণনা করা উচিত হবে না ।
📄 মাতা পিতার সাথে সদাচারণ
ইসলামে মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করা অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং ফরজ দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বহুবার নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা এর গুরুত্বকে তুলে ধরে। [4]
**কুরআনের নির্দেশনা:**
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [12, 17] এই আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের সাথে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশকে যুক্ত করা হয়েছে, যা এর অপরিহার্যতা বোঝায়।
আল্লাহ আরও বলেন, "আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি যে তুমি আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লুকমান: ১৪)। [4] এখানেও আল্লাহর কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিতা-মাতার বার্ধক্যে তাদের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [1, 9, 11] এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার প্রতি সামান্যতম বিরক্তি প্রকাশও নিষিদ্ধ।
**হাদিসের নির্দেশনা:**
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করেন, "আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম আমল কোনটি?" তিনি বললেন, "সময় মতো নামায আদায় করা।" এরপর জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, "পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।" (বুখারি)। [12]
অন্য একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।" (তিরমিজি)। [3, 4] এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়।
এমনকি পিতা-মাতা যদি অমুসলিমও হন, তবুও তাদের সাথে দুনিয়াবী বিষয়ে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [1, 11] সন্তানের জন্য উচিত পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকা, তাদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের দেখাশোনা করা। [11]
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ওয়া ক্বদা রব্বুকা আল্লা তা'বুদূ ইল্লা ইয়্যাহু ওয়াবিল ওয়া-লিদাইনি ইহ্ সা-নান...’ অর্থ: তোমার রব ফায়সালা দিয়েছেন যে, তাকে ব্যতীত কারো ইবাদত করবে না । অর্থাৎ, তাকেই একক আল্লাহ জানো । কেউ পাপের আদেশ দিলে তার অনুসরণ কর না । আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচারণ করবে । ‘ইম্মাই ইয়াব্লুগান্না ইনদাকাল কিবারা আহাদুহুমা- আও কিলা-হুমা- ফালা তাক্বুল্লাহুমা- উফফিন...’ যদি তাদের একজন কিংবা উভয় তোমাদের নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ পর্যন্ত বলবে না । অর্থাৎ, বাবা-মার সাথে অনুচিৎ কথা বলো না । কেউ কেউ বলেন, এর অর্থ হলো, বার্ধক্যে বিছানায় পেশাব পায়খানা করলে তাদের পেশাব-পায়খানা উঠানোর সময় নাক ছিটকাবে না বা মুখ বিকৃত করবে না । কারণ, শিশুকালে তারাও এমনটি করেছেন, কিন্তু নাক ছিটকায় নি । ‘ওয়ালা তান্হারহুমা- ওয়া ক্বুল্লাহুমা- ক্বাওলান কারীমান ওয়াক্বফিদ্ব লাহূমা- জানাহায যুল্লি মিনার রহ্মাতি...’ তাদেরকে ধমক দেবে না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানের সাথে কথা বলবে । অর্থাৎ, তাদের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলবে না । আর তাদের জন্য তোমার দয়ার দু ডানা কে বিছিয়ে দেবে । অর্থাৎ, তাদের জন্য বিনয়ী ও রহমকারী হয়ে যাও । ‘ওয়া ক্বুর রব্বির হাম্হুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগীরা-’ এবং বলবে, হে রব! তাদের প্রতি রহম করুন, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছেন ।
অর্থাৎ, জীবিত অবস্থায় পিতা-মাতার সেবা করা যেমন সন্তানের কর্তব্য তেমনি মৃত্যুর পর প্রতি নামাযের পর তাদের মাগফেরাতের দোয়া করাও সন্তানের দায়িত্ব । আবার কেউ কেউ বলেন, জীবিত অবস্থাতেও প্রতি নামাযের পর পিতা-মাতার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা সন্তানের জন্য কর্তব্য ।
জনৈক তাবেঈ বলেন, পিতা-মাতার জন্য দিনে পাঁচ বার দোয়া করলে তাদের হক আদায় হয় । কারণ, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘আনিশ কুর লী ওয়া লিওয়া-লিদাইকা ইলাইয়্যাল মাসীরু’ অর্থ: আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকর আদায় কর, আমার নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল । আল্লাহ তা'আলার শুকর আদায় করার অর্থ হলো, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া । সুতরাং পিতা-মাতার শুকর আদায়ের অর্থও হবে দিনে তাদের জন্য পাঁচ বার দোয়া করা ।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘রব্বুকুম আ'লামু বিমা ফী নুফুসিকুম...’ অর্থ: যদি তোমরা সৎ হও তাহলেও তোমাদের রব তোমাদের মনে যা আছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা অধিক জ্ঞাত । অর্থাৎ, পিতা-মাতার প্রতি কোমলভাব ও তাদের আনুগত্যের সংকল্প সে সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত । আর যদি তোমরা পিতা-মাতার অবাধ্য হও এবং তাওবা কর তাহলে নিশ্চয় তিনি তাওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল ।
টিকাঃ
২৭৯. সূরা আল ইসরা: আয়াত-২৪
২৮০. লুকমান: আয়াত-১৪
২৮১. সূরা ইসরা: আয়াত-২৫