📄 মাতার হক পিতার তুলনায় তিন গুণ বেশি
ইসলামে পিতা-মাতা উভয়েরই সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে, তবে মায়ের অধিকারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্তানের জন্য মায়ের ত্যাগ ও কষ্ট несравনীয় হওয়ায় তার হক বা অধিকার পিতার চেয়ে তিন গুণ বেশি বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। [4]
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" নবী (সা.) আবারও বললেন, "তোমার মা।" লোকটি চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "তোমার বাবা।" (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)। [4, 11]
এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সন্তানের উত্তম আচরণ ও সেবাযত্ন পাওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার পিতার চেয়ে তিন গুণ বেশি। এর কারণ হিসেবে আলেমরা বলেন, মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ, প্রসব এবং শৈশবে লালন-পালনের ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করেন, যা পিতা করেন না।
কুরআন মাজিদেও মায়ের এই কষ্টের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।" (সূরা লুকমান: ১৪)। [10] অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, "তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে।" (সূরা আহকাফ: ১৫)। [5, 24] এই আয়াতগুলো মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ ও কষ্টকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা তার উচ্চ মর্যাদার কারণ।
📄 পিতা-মাতার শোকর আদায় ব্যতীত আল্লাহর শোকর আদায় হয় না
ইসলামে কৃতজ্ঞতা বা শোকর আদায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন এবং এর বিনিময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা নিজের শুকরিয়ার সাথে পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায়ের বিষয়টিকেও যুক্ত করেছেন, যা পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার গুরুত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখ, তোমার) প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই।" (সূরা লোকমান: ১৪)। [4, 10, 19]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতার আদেশের পরেই পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। [28] তাফসিরকারকগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করাও সন্তানের জন্য জরুরি। [26] আল্লাহ তাআলা যেমন সৃষ্টিকর্তা, তেমনি পিতা-মাতা হলেন পৃথিবীতে আমাদের আসার মাধ্যম। তাই আল্লাহর শোকর আদায় করতে হয় ঈমানের নিয়ামত লাভের জন্য, আর পিতা-মাতার শোকর আদায় করতে হয় তাদের লালন-পালনের জন্য। [12] একারণে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সন্তানের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যগুলোর একটি। [28]
📄 পিতা-মাতার হকের গুরুত্ব
ইসলামে পিতা-মাতার হক বা অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা তাদের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেছে। [4, 24]
**কুরআনের আলোকে পিতা-মাতার হক:**
* **আল্লাহর ইবাদতের পর সর্বোচ্চ স্থান:** আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [3, 20] মেরাজের রাতে যে চৌদ্দটি সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে প্রথমটি ছিল আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করা এবং দ্বিতীয়টিই ছিল পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। [4]
* **কৃতজ্ঞতা প্রকাশ:** আল্লাহ বলেন, "আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।" (সূরা লোকমান: ১৪)। [4, 19] এখানে আল্লাহ তাঁর নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতার সাথে পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন।
* **বার্ধক্যে সেবা:** বার্ধক্যে উপনীত পিতা-মাতার প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, "তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তুমি তাদের প্রতি 'উফ' শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তুমি তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলো।" (সূরা বনি ইসরাঈল: ২৩)। [1, 9, 11]
**হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার হক:**
* **আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম:** রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।" (তিরমিজি)। [1, 4]
* **জান্নাত ও জাহান্নামের চাবিকাঠি:** নবীজি (সা.) বলেছেন, "পিতা-মাতা হলো তোমার জান্নাত এবং জাহান্নাম।" অর্থাৎ, তাদের সেবা করে জান্নাত অর্জন করা যায়, আবার তাদের অবাধ্য হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হতে পারে। (ইবনে মাজাহ)। [4]
* **জিহাদের চেয়েও উত্তম:** আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো সময়মতো নামাজ আদায় করা, এরপরই পিতা-মাতার সেবা করা এবং তারপর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। [20]
* **মায়ের হক তিনগুণ বেশি:** এক সাহাবির প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) তিনবার মায়ের হকের কথা উল্লেখ করেন এবং চতুর্থবারে বাবার কথা বলেন। এর দ্বারা মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ ও কষ্টের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। (বুখারি ও মুসলিম)। [4]
পিতা-মাতার জীবদ্দশায় যেমন তাঁদের প্রতি সদাচরণ, সম্মান, সেবা ও আনুগত্য করা সন্তানের কর্তব্য, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পরও তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের ঋণ পরিশোধ করা, তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তাঁদের হক আদায় করা যায়। [4, 15]
📄 মায়ের অসন্তুষ্টির প্রতিফল : আলকামা রাযি.-এর ঘটনা
হযরত আলকামা (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একজন সাহাবী, যিনি ইবাদত-বন্দেগি ও দান-সদকায় অত্যন্ত অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন, যা মায়ের অসন্তুষ্টির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়।
মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে হযরত আলকামা (রা.) কালেমা পাঠ করতে পারছিলেন না। তাঁর স্ত্রী এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সংবাদ পাঠান। রাসূল (সা.) তখন হযরত আলী, হযরত সালমান ফারসী ও হযরত বেলাল (রা.)-কে তাঁর অবস্থা দেখতে পাঠান। তাঁরা গিয়ে আলকামাকে কালেমার তালকিন দিলেও তিনি তা উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হন।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে রাসূলুল্লাহ (সা.) আলকামার মা-বাবা বেঁচে আছেন কিনা জানতে চাইলেন। সাহাবিরা জানান, তাঁর বাবা নেই, তবে বৃদ্ধা মা জীবিত আছেন। রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে আলকামার মা লাঠিতে ভর দিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে হাজির হন।
রাসূল (সা.) তাঁকে আলকামার আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন যে, আলকামা ইবাদতকারী, রোজাদার এবং দানশীল ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং মায়ের প্রতি তাঁর আচরণ সন্তোষজনক ছিল না। এ কারণে তিনি ছেলের প্রতি অসন্তুষ্ট।
এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "এ কারণেই তার মুখে কালেমা আসছে না।" এরপর তিনি বেলাল (রা.)-কে নির্দেশ দেন কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাতে, যাতে আলকামাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। এই কথা শুনে মায়ের মন কেঁদে ওঠে এবং তিনি বলেন যে, নিজের সন্তানকে আগুনে পুড়তে দেখা তাঁর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
তখন রাসূল (সা.) তাঁকে বোঝান, "হে আলকামার মা! আল্লাহর আগুন এর চেয়েও ভয়াবহ হবে। আপনি যদি তাকে ক্ষমা না করেন এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তার কোনো ফরজ বা নফল ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।"
এই কথা শুনে মায়ের হৃদয় গলে যায়। তিনি তখন রাসূল (সা.)-কে সাক্ষী রেখে বলেন যে, তিনি তাঁর ছেলেকে ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। রাসূল (সা.) সাথে সাথে বেলাল (রা.)-কে আলকামার অবস্থা দেখতে পাঠান। বেলাল (রা.) আলকামার ঘরের কাছে পৌঁছেই শুনতে পান যে তিনি উচ্চস্বরে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ" পাঠ করছেন। সেদিনই হযরত আলকামা (রা.) ইন্তেকাল করেন।
তাঁর দাফন শেষে রাসূল (সা.) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "হে আনসার ও মুহাজির! যে ব্যক্তি স্ত্রীকে মায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে, তার ওপর আল্লাহর লা'নত। তার ফরজ ও নফল ইবাদত কিছুই কবুল হয় না।" [25, 30, 31]