📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি

📄 পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি


পৃথিবীতে মানুষের আগমনের মাধ্যম হলেন পিতা-মাতা। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্‌র পরেই মানুষের উপর সবচেয়ে বেশি অনুগ্রহ থাকে তার বাবা-মায়ের। সন্তানের জন্য তাঁদের त्याग ও ভালোবাসার কোনো সীমা নেই। এই কারণেই ইসলামে পিতা-মাতার সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে স্থাপন করা হয়েছে। [5, 24]

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, "তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং বাবা-মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের 'উফ' বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। তাদের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, 'হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন'।" (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩-২৪)। [1, 5] এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর ইবাদতের সাথে পিতা-মাতার খেদমতকে যুক্ত করে এর গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। [12, 28]

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।" (তিরমিজি)। [1, 3, 6, 8] এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখা অপরিহার্য। [3]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজি (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কী?" নবীজি (সা.) বললেন, "যথা সময়ে নামাজ আদায় করা।" তিনি বললেন, "তারপর কোনটি?" নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, "বাবা-মায়ের সাথে উত্তম আচরণ করা।" (বুখারি)। [5, 12] ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত নামাজের পরেই পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহারকে স্থান দেওয়া হয়েছে। [12]

রাসূল (সা.) আরও সতর্ক করে বলেছেন, "তার নাসিকা ধুলোয় ধূসরিত হোক!" এই কথা তিনবার বলার পর সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কার ব্যাপারে এ কথা বলছেন?" তিনি বললেন, "যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বার্ধক্যে পেল, কিন্তু (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।" (মুসলিম: ২৫৫১)। [1, 6] এটি পিতা-মাতার খেদমতের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এমনকি পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। [1, 6]

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার সেবা জিহাদের তুলনায় উত্তম

📄 পিতা-মাতার সেবা জিহাদের তুলনায় উত্তম


ইসলামে পিতা-মাতার সেবা করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়, যা ক্ষেত্রবিশেষে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার চেয়েও উত্তম। বিভিন্ন হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। [2]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেন, 'ওয়াক্ত মোতাবেক সালাত আদায় করা।' আমি বললাম, 'তারপর কী?' তিনি বললেন, 'পিতা-মাতার সেবা করা।' বললাম, 'তারপর কী?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা'" (বুখারি)। [20] এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, পিতা-মাতার সেবা করার স্থান জিহাদের উপরে। [20]

আরেকটি ঘটনায়, এক ব্যক্তি জিহাদে অংশ নেওয়ার জন্য নবী করিম (সা.)-এর কাছে আসেন। তখন রাসূল (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেন, "তোমার মা-বাবা কি জীবিত?" লোকটি উত্তর দিল, "হ্যাঁ।" রাসূল (সা.) তখন তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, "যাও, তাদের কাছে যাও এবং (সেবাযত্নের মাধ্যমে) জিহাদ করো।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০৪)। [13, 23] এই ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার সেবা করা জিহাদের মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

ইসলামে পিতা-মাতার সেবা করা সন্তানের জন্য 'ফরজে আইন' বা ব্যক্তিগতভাবে আবশ্যকীয় কর্তব্য, অন্যদিকে (কিছু পরিস্থিতি ব্যতীত) জিহাদ করা 'ফরজে কিফায়া' বা সামষ্টিক দায়িত্ব। [20] এর অর্থ হলো, যদি সমাজের কিছু মানুষ জিহাদের দায়িত্ব পালন করে, তবে বাকিরা দায়মুক্ত হতে পারে, কিন্তু পিতা-মাতার সেবা করার দায়িত্ব প্রতিটি সন্তানের উপর ব্যক্তিগতভাবে বর্তায়।

তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, একটি ইবাদত অন্যটির চেয়ে উত্তম হওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্যটির গুরুত্ব কমে যায়। বরং প্রতিটি ফরজ ইবাদতই তার নিজ নিজ স্থানে গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবগুলোই নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে। [27]

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 মাতার হক পিতার তুলনায় তিন গুণ বেশি

📄 মাতার হক পিতার তুলনায় তিন গুণ বেশি


ইসলামে পিতা-মাতা উভয়েরই সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে, তবে মায়ের অধিকারকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সন্তানের জন্য মায়ের ত্যাগ ও কষ্ট несравনীয় হওয়ায় তার হক বা অধিকার পিতার চেয়ে তিন গুণ বেশি বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। [4]

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, "তারপর কে?" নবী (সা.) আবারও বললেন, "তোমার মা।" লোকটি চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "তোমার বাবা।" (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)। [4, 11]

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সন্তানের উত্তম আচরণ ও সেবাযত্ন পাওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের অধিকার পিতার চেয়ে তিন গুণ বেশি। এর কারণ হিসেবে আলেমরা বলেন, মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ, প্রসব এবং শৈশবে লালন-পালনের ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করেন, যা পিতা করেন না।

কুরআন মাজিদেও মায়ের এই কষ্টের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে।" (সূরা লুকমান: ১৪)। [10] অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, "তার মা তাকে অতি কষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে।" (সূরা আহকাফ: ১৫)। [5, 24] এই আয়াতগুলো মায়ের অতুলনীয় ত্যাগ ও কষ্টকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা তার উচ্চ মর্যাদার কারণ।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 পিতা-মাতার শোকর আদায় ব্যতীত আল্লাহর শোকর আদায় হয় না

📄 পিতা-মাতার শোকর আদায় ব্যতীত আল্লাহর শোকর আদায় হয় না


ইসলামে কৃতজ্ঞতা বা শোকর আদায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন এবং এর বিনিময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা নিজের শুকরিয়ার সাথে পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায়ের বিষয়টিকেও যুক্ত করেছেন, যা পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার গুরুত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমরা মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। অতএব তুমি আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রেখ, তোমার) প্রত্যাবর্তন আমার কাছেই।" (সূরা লোকমান: ১৪)। [4, 10, 19]

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতার আদেশের পরেই পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। [28] তাফসিরকারকগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর কৃতজ্ঞতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করাও সন্তানের জন্য জরুরি। [26] আল্লাহ তাআলা যেমন সৃষ্টিকর্তা, তেমনি পিতা-মাতা হলেন পৃথিবীতে আমাদের আসার মাধ্যম। তাই আল্লাহর শোকর আদায় করতে হয় ঈমানের নিয়ামত লাভের জন্য, আর পিতা-মাতার শোকর আদায় করতে হয় তাদের লালন-পালনের জন্য। [12] একারণে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের পর পিতা-মাতার আনুগত্য ও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সন্তানের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যগুলোর একটি। [28]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00