📄 বনী ইসরাইলের জনৈকা নারীর তাওবা
عَنِ الْحَسَنِ، قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ امْرَأَةً مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ قَالَتْ لِعَابِدِهِمْ : أَخْبِرْنِي هَلْ يُغْفَرُ مِثْلِي، فَقَدِ ابْتُلِيتُ بِثَلَاثَةٍ مِنَ الْأَوْلَادِ مِنَ الزِّنَى، ثُمَّ قَتَلْتُهُمْ. فَقَالَ لَهَا الْعَابِدُ: قَدْ هَلَكْتِ، وَأَهْلَكْتِ، وَلَا يُغْفَرُ لَكِ. فَانْصَرَفَتْ وَهِيَ تَحْثُو التُّرَابَ عَلَى رَأْسِهَا، وَتَقُولُ: وَا خَيْبَتَاهُ خُلِقْتُ لِجَهَنَّمَ، فَقَالَ اللَّهُ تَعَالَى لِنَبِيِّ ذَلِكَ الزَّمَانِ: إِنِّي قَدْ غَفَرْتُ لِهَذِهِ الْمَرْأَةِ، وَقَدْ أَحْبَطْتُ عَمَلَ ذَلِكَ الْعَابِدِ، لِأَنَّهُ قَنَّطَ عِبَادِي مِنْ رَحْمَتِي.
হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। বনী ইসরাঈলের এক মহিলা এক আবেদের নিকট এসে বলল, বলুন তো, আমার মতো পাপীর কি ক্ষমা আছে? আমি যিনার মাধ্যমে তিনটি সন্তান জন্ম দিয়েছি এবং তাদের হত্যা করেছি। আবেদ বললেন, তুমি ধ্বংস হয়ে গেছ, অন্যদেরও ধ্বংস করেছ। তোমার কোনো ক্ষমা নেই। মহিলাটি মাথায় মাটি ঢালতে ঢালতে ফিরে গেল এবং বলতে লাগল, হায়! আমার কপাল! আমাকে তো জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। তখন আল্লাহ তা'আলা সে যুগের নবীর নিকট ওহী পাঠালেন, আমি ঐ মহিলাকে ক্ষমা করে দিয়েছি এবং ঐ আবেদের আমল নষ্ট করে দিয়েছি। কারণ সে আমার বান্দাদেরকে আমার রহমত থেকে নিরাশ করেছে।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهَا ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ لَهَا: يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقِّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّ لَهَا مِنَ اللَّهِ تَعَالَى طَالِبًا.
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল তাকে বললেন, হে আয়েশা! ছোট গুনাহ থেকেও বেঁচে থাক। কারণ, এর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাব দিতে হবে।
বলা হয়, ছোট ছোট গুনাহগুলো, ছোট ছোট লাকড়ির ন্যায়। অনেকগুলো ছোট লাকড়ি একত্র করে লাগিয়ে দিলে বিশাল হয়ে যায়।
বলা হয়, তাওরাতে লেখা ছিল, যে ব্যক্তি পুণ্যের চাষ করবে সে নিরাপত্তায় ফসল কাটবে।
ইঞ্জিলে ছিল, যে ব্যক্তি গুনাহের চাষ করবে, অনুতাপ তার ফসল হবে।
কুরআনেও অনুরূপ এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ
অর্থ: যে ব্যক্তি গুনাহ করবে তাকে তার বিনিময় দেওয়া হবে।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ رَجُلٍ كَثِيرِ الذُّنُوبِ كَثِيرِ الْعَمَلِ أَعْجَبُ إِلَيْكَ أَمْ رَجُلٍ قَلِيلِ الذُّنُوبِ قَلِيلِ الْعَمَلِ قَالَ: مَا أُعْدِلُ بِالسَّلَامَةِ شَيْئًا، يَعْنِي قَلِيلَ الذُّنُوبِ أَعْجَبُ إِلَيَّ. হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. কে জিজ্ঞেস করা হলো কে উত্তম ব্যক্তি? যার গুনাহও অনেক এবং নেকিও অনেক সে ব্যক্তি? নাকি যার গুনাহও কম নেকিও কম সে ব্যক্তি? তিনি বললেন, যার গুনাহ কম নেকিও কম সে ব্যক্তি উত্তম।
জনৈক ব্যক্তি বলেন, নেক আমল সাধারণ মানুষও করতে পারে। কিন্তু অসাধারণ সে, যে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারে।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, কুরআন পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, গুনাহ বর্জন নেকি অর্জন থেকে উত্তম। নেকির ক্ষেত্রে কিয়ামাতের দিন তা নিয়ে হাজির হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে গুনাহের ক্ষেত্রে শুধু বর্জনের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا.
অর্থ: যে ব্যক্তি নেক আমল নিয়ে আসবে তাকে তার দশগুন প্রতিদান দেওয়া হবে।
গুনাহ বর্জন সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
অর্থ: যে ব্যক্তি নিজেকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত রাখবে নিশ্চয় জান্নাত হবে তার ঠিকানা।
হাদীসে রাসূল বলেন, আল্লাহ তা'আলার নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করা, জিন ও ইনসানের ইবাদত থেকেও উত্তম।
টিকাঃ
৯৬. সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-৪২৪৩; মুসনাদে আহমাদ হাদীস-২৪৪১৫; সুনানে দারেমী: হাদীস-২৭২৯। হাদীসটি সহীহ [শুয়াইব আরনাউত]।
৯৭. সূরা নিসা ১২৩
৯৮. সূরা আনআম: আয়াত-১৬০
৯৯. সূরা নাযিআত: আয়াত-৪০-৪১
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, আমার পিতাকে একটি ঘটনা বলতে শুনেছি। বনী ইসরাঈলের এক বেশ্যা নারী ছিল, যে তার রূপ সৌন্দর্য দ্বারা লোকদেরকে আকৃষ্ট করত। সবসময় তার ঘরের দরজা খোলা থাকত। খোলা দরজার সামনে এক খাটে সে সেজে-গুজে বসে থাকত। যে কোনো পথিক এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে দেখত, আসক্ত হয়ে পড়ত। দশ দীনার বা তার চেয়ে কম বেশি দিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করতে হতো। দিতে পারলে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যেত।
একদিন জনৈক আবেদ সে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সে রূপসীর রূপ দেখে মোহিত হয়ে পড়লেন। সাথে সাথে তিনি তাওবা করতে লাগলেন এবং এই গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য নিজের নফসের সাথে লড়তে লাগলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পরাস্ত হলেন এবং তার মালপত্র বিক্রি করে দশ দীনার সংগ্রহ করে আনলেন। উক্ত নারীর গৃহে প্রবেশ করলেন— খাদেম তার থেকে টাকা নিয়ে নির্দিষ্ট এক তারিখে আসতে বললেন। নির্দিষ্ট তারিখে তিনি উপস্থিত হলেন। তার সাথে খাটে বসলেন। যখন তিনি তাকে স্পর্শ করার জন্য হাত বাড়ালেন, তখনই আল্লাহর রহমত নেমে এল। তার মনে আল্লাহর ভয় জেগে উঠল। তিনি ভাবলেন, আরশে বসে আমার রব দেখছেন আমি এই জঘন্য কাজ করছি। ভয়ে তার শরীর কাঁপতে লাগল, চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তা দেখে মহিলাটি জিজ্ঞেস করল, তোমার কী হয়েছে? আবেদ বললেন, আমি আমার রবকে ভয় করছি। তুমি আমাকে ছেড়ে দাও, আমি চলে যাই। সে বলল, ধুর বোকা! তুমি যা পেয়েছ কত মানুষ তা পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে। আর তুমি পেয়েও কিনা নিবে না? তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেন, আমি আমার রবকে ভয় করছি। তুমি আমাকে ছেড়ে দাও, আমার পয়সা তোমার জন্য হালাল। মহিলা জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী? তোমার গ্রাম কোথায়? তিনি তার নাম-ঠিকানা বললেন। সে তাকে ছেড়ে দিল। আবেদ সেখান থেকে বেরিয়ে এসে হা-গুতাশ করতে লাগলেন এবং হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।
এ দৃশ্য দেখে সে বেশ্যার মনেও আল্লাহর ভয়ের সৃষ্টি হলো। সে মনে মনে ভাবল, এই ব্যক্তি জীবনে প্রথম গুনাহ করার সংকল্প করেছে মাত্র। তাতেই তার মনে এই পরিমাণ ভয় জেগেছে। অথচ আমি বছরের পর বছর ধরে এই গুনাহ করে যাচ্ছি! তার রব যাকে সে ভয় করছে, তিনি তো আমারও রব। সুতরাং সে যে পরিমাণ রবকে ভয় করছে আমার তার চেয়ে বেশি ভয় করা উচিত। এই ভাবনা মনে এলে সে তাওবা করল এবং বেশ্যাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে পুরোনো কাপড় পরে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করল। আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী এভাবে সে অনেক দিন ইবাদতে কাটালো। একদিন সে ভাবল, আমার কাছে তো সে আবেদের ঠিকানা আছে, আমি তো তার কাছে যেতে পারি। হতে পারে তিনি আমাকে বিয়ে করবেন এবং তার নিকট আমি ইবাদত শিখে আরও ভালোভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে পারব। এই ভেবে সে তার কিছু ধন-সম্পদ এবং কয়েকজন খাদেম নিয়ে সে গ্রামে গিয়ে হাজির হয়ে সে আবেদের খোঁজ নিল। আবেদ জানতে পারলেন এক নারী তাকে খুঁজছে। তিনি বের হয়ে আসলে সে মুখের পর্দা সরিয়ে দিল। আবেদ সে নারীকে চিনতে পারলেন এবং তার সাথে যে তিনি একদিন অপকর্ম করতে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন তা তার মনে পড়ল। সাথে সাথে তিনি বিকট চিৎকার করে উঠলেন ফলে মৃত্যু হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে সে নারী খুব দুঃখিত হলো। সে লোকজনকে বলল, আমি এই আবেদকে বিয়ে করতে এসেছিলাম। কিন্তু তিনি তো মারা গেলেন। তার কি কোনো ভাই আছে যার সাথে আমার বিয়ে হতে পারে? তারা বলল, তার এক আবেদ ভাই আছে, কিন্তু তার কোনো সহায়-সম্পদ নেই। সে বলল, আল্লাহ আমাকে যথেষ্ট সম্পদ দিয়েছেন, আমার আর সম্পদের দরকার নেই। সে তার ভাইয়ের কাছে আসল। তাকে বিয়ে করল, তাদের ঔরসে সাত ছেলে জন্ম নিল, যাদের সবাই বনী ইসরাইলের নবী হয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন।