📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 জনৈকা নারীর তাওবার ঘটনা

📄 জনৈকা নারীর তাওবার ঘটনা


عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ امْرَأَةً بَغِيًّا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مَرَّتْ بِعَابِدٍ لَهُمْ فَأَعْجَبَهَا، فَعَرَضَتْ لَهُ نَفْسَهَا، فَأَبَى، فَدَخَلَتْ عَلَيْهِ الدَّارَ فَدَعَتْهُ فَقَالَ: لَهَا: اخْرُجِي فَأَبَتْ أَنْ تَخْرُجَ، فَنَادَاهَا يَا فُلَانَةُ إِنَّ الْمَلِكَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَسْتَخْرِجَ صَيْدًا، أَرْسَلَ كَلْبًا، ثُمَّ يَتْبَعُهُ بِنَفْسِهِ، فَأَخَافُ أَنْ تَكُونِي أَنْتِ كَلْبَ الْمَلِكِ، وَيَطْلُبُنِي الْمَلِكُ، فَخَرَجَتِ الْمَرْأَةُ، وَقَدْ تَنَبَّهَتْ، فَجَعَلَتْ تَعْبُدُ اللَّهَ تَعَالَى وَصَامَتْ، وَقَامَتْ، ثُمَّ دَعَتْ عَلَيْهِ فَقَالَتِ: اللَّهُمَّ كَمَا أَخَفْتَنِي وَرَوَّعْتَنِي فَأَخِفْهُ وَرَوِّعْهُ. قَالَ فَنَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ عَلَى نَبِيٍّ ذَلِكَ الزَّمَانِ، فَأَخْبَرَهُ بِأَنَّهُ اسْتُجِيبَ لَهَا، وَأَنَّهَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، وَأَنَّ الْعَابِدَ قَدْ أَفْزَعَ قَلْبًا لَجَأَ إِلَيْهِ، فَمَا كَانَ لَهُ أَنْ يُخِيفَهُ بَلْ كَانَ يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَشْغَلَهُ بِالرِّفْقِ وَاللُّطْفِ، وَإِخْبَارِهِ بِسَعَةِ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى، فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَى ذَلِكَ النَّبِيِّ: أَخْبِرْهُ بِأَنِّي قَدْ أَزَلْتُ اسْمَهُ مِنْ دِيوَانِ الْعَابِدِينَ، وَأَنِّي لَا أُعِيدُهُ إِلَيْهِ إِلَّا بِشَفَاعَتِهَا فِيهِ.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। বনী ইসরাঈলের এক ব্যভিচারিণী নারী এক আবেদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। আবেদের প্রতি তার আকর্ষণ জন্মালে সে তাকে নিজের প্রতি আহ্বান করল। আবেদ অস্বীকৃতি জানালে সে তার ঘরে ঢুকে গেল এবং তাকে আবার আহ্বান করল। আবেদ বলল, তুমি বের হয়ে যাও। সে বলল, আমি বের হব না। তখন আবেদ বললেন, শোন, রাজা যখন শিকার করতে চান, তখন তিনি কুকুর প্রেরণ করেন এবং তার পিছু পিছু নিজেও আসেন। আমার ভয় হচ্ছে, তুমি রাজার কুকুর হবে, আর রাজা আমার পিছু নিবেন। এ কথা শুনে মহিলা সচকিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল এবং ইবাদতে মগ্ন হলো। একদিন সে ঐ আবেদের জন্য বদ-দোয়া করে বলল, হে আল্লাহ! সে আমাকে যেমন ভয় দেখিয়েছে, তেমনি আপনিও তাকে ভয় দেখান। তখন জিবরাঈল আ. সে যুগের নবীর নিকট এসে বললেন, ঐ মহিলার দোয়া কবুল করা হয়েছে। সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কারণ, ঐ আবেদ এমন এক অন্তরকে ভয় দেখিয়েছে যে অন্তর তার আশ্রয় চেয়েছিল। তার জন্য উচিত ছিল তাকে ভয় না দেখিয়ে আল্লাহর রহমতের কথা বলে তাকে উৎসাহিত করা। তখন সে যুগের নবীর নিকট ওহী আসল, তাকে জানিয়ে দিন, আমি আবেদদের খাতা থেকে তার নাম কেটে দিয়েছি। আর সে মহিলার সুপারিশ ছাড়া তার নাম আর সে খাতায় উঠবে না।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَثَلِ رَجُلٍ أَوْقَدَ نَارًا، فَجَاءَ الْفِرَاشِ يَتَهَافَتْنَ فِيهَا، فَأَنَا أَمْنَعُكُمْ مِنْ أَنْ تَقَعُوا فِي النَّارِ، يَعْنِي أَنْهَاكُمْ عَنِ الذُّنُوبِ وَالْعِصْيَانِ، فَإِنَّ الذُّنُوبَ تُلْقِي صَاحِبَهَا فِي النَّارِ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, আমার এবং তোমাদের দৃষ্টান্ত হলো, সে ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালায়। ফলে পঙ্গপাল এসে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। আর সে হাত দিয়ে সেগুলো তাড়িয়ে দিতে থাকে। আমি তেমনি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে পড়া থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করি। অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে নাফরমানী ও গুনাহ হতে নিষেধ করি। আর গুনাহই তো মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।

**হযরত আদম আ.-এর তাওবা**

বলা হয়, পাঁচটি কারণে হযরত আদম আ.-এর তাওবা কবুল করা হয়েছে। আর পাঁচ কারণে ইবলিসের তাওবা কবুল করা হয়নি।

আদম আ.-এর তাওবা কবুল করার পাঁচ কারণ হলো-
১. أَقَرَّ عَلَى نَفْسِهِ بِالذَّنْبِ অর্থাৎ, তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
২. وَنَدِمَ عَلَيْهِ অর্থাৎ, তার জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন।
৩. وَلَامَ نَفْسَهُ অর্থাৎ, নিজেই নিজের সমালোচনা করেছেন।
৪. وَأَسْرَعَ بِالتَّوْبَةِ অর্থাৎ, দ্রুত তাওবা করেছেন।
৫. وَلَمْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি।

ইবলিসের তাওবা কবুল না হওয়ার পাঁচ কারণ হলো-
১. لَمْ يُقِرَّ عَلَى نَفْسِهِ অর্থাৎ, ইবলীস নিজের অপরাধ স্বীকার করেনি।
২. وَلَمْ يَنْدَمُ عَلَيْهِ অর্থাৎ, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়নি।
৩. وَلَمْ يَكُمْ نَفْسَهُ অর্থাৎ, নিজেকে তিরস্কার করেনি।
৪. وَلَمْ يُسْرِعُ فِي التَّوْبَةِ অর্থাৎ, তাওবা করেনি।
৫. وَقَنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়েছে।

সুতরাং যার অবস্থা আদম আ.-এর অবস্থার মত হবে তার তাওবা কবুল হবে আর যার অবস্থা ইবলিসের মত হবে, তার তাওবা কবুল হবে না।

টিকাঃ
৯৩ সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৪৮৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২২৮৪।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে রাসূল-এর সাথে এশার নামায আদায় করে বের হলাম। পথিমধ্যে নেকাব পরিহিতা এক মহিলাকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। মহিলাটি বলল, আবূ হুরায়রা! আমার থেকে বিরাট গুনাহ হয়ে গেছে। আমি বললাম, তুমি কী গুনাহ করেছ? সে বলল, আমি যিনা করেছি। অতঃপর আমার জারজ সন্তান হলে তাকে হত্যা করেছি। আমি তাকে বললাম, তুমি ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যকেও ধ্বংস করেছ। তোমার তাওবার কোনো সুযোগ নেই। একথা শুনে সে চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আমি সেখান থেকে চলে এলাম। পরে আমি চিন্তা করলাম, রাসূল জীবিত থাকতে আমি ফতওয়া দেবার কে? তাই সকাল হলে রাসূল-এর দরবারে গিয়ে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। রাসূল বললেন, ইন্নাল্লিাহ! আবূ হুরায়রা, বরং তুমি নিজে ধ্বংস হয়েছ এবং অপরকে ধ্বংস করেছ। তোমার কি এই আয়াতটি মনে ছিল না— ‘ওয়াল্লাযীনা লা ইয়াদঊনা মা’আল্লা-হি ইলা-হান আ-খরা ওয়ালা ইয়াক্বতুলূনান নাফ্সাল্লাতী হাররামাল্লা-হু ইল্লা বিলহাক্কি ওয়ালা ইয়াযনূনা...’ অর্থ: এবং তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়। তারা নয়, যারা তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের গুনাহ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, তখন আমি রাসূল-এর দরবার থেকে বের হয়ে গেলাম। মদীনার অলিতে-গলিতে চিৎকার করে ঘোষণা করতে লাগলাম, গতরাতে যে মহিলা আমার কাছে অমুক বিষয়ে জানতে চেয়েছিল কে আমাকে সে নারীর কাছে নিয়ে যাবে? তাই দেখে শিশুরা বলতে লাগল, আবূ হুরায়রা পাগল হয়ে গেছে। এভাবে রাত হলে আমি উক্ত মহিলাকে আগের রাতের স্থানে পেয়ে গেলাম। তাকে রাসূল-এর সুসংবাদ বাণী শুনালাম যে, তার তাওবার সুযোগ আছে। এতে সে আনন্দিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল যে, আমার একটি বাগান রয়েছে, আমি সেটি আমার গুনাহের কাফফারা হিসাবে মিসকীনদের জন্য সদকা করে দিলাম। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ইল্লা মান তা-বা ওয়া আ-মানা ওয়া আমিলা আমালান স-লিহান ফাউলা-ইকা ইউবাদ্দিলুল্লা-হু সাইয়্যিআ-তিহিম হাসানা-তিন...’ অর্থ: তবে যারা তাওবা করবে এবং ঈমান আনবে এবং নেক আমল করবে আল্লাহ তাদের মন্দ আমলকে নেক আমলে বদলে দিবেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো তাফসীর বিশারদ বলেন, বান্দা যখন গুনাহের জন্য তাওবা করে, তখন তার বিগত দিনের গুনাহ নেক আমলে পরিণত হয়ে যায়।

হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকেও এরূপ বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষ তার আমলনামায় তাকালে শুরুর দিকে শুধু গুনাহ দেখতে পাবে। আর শেষের দিকে শুধু নেক আমল দেখতে পাবে। এরপর সে যখন পুনরায় শুরুর থেকে আমলনামা দেখবে, তখন দেখতে পাবে সব গুনাহ নেক আমলে পরিবর্তন হয়ে গেছে। হযরত আবু যর গিফারী রাযি. ও রাসূল-এর থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাদের গুনাহকে নেক আমল বানিয়ে দিবেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা এটাই। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এর অর্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা তার মনকে পরিবর্তন করে দিবেন। ফলে সে গুনাহ কাজের পরিবর্তে নেক আমল করতে থাকবে।

হে ভাই! জেনে রাখো! কুফরীর চেয়ে বড় কোনো গুনাহ নেই। কুফুরী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন— ‘ক্বুল লিল্লাযীনা কাফারূ ইঁ ইয়ানতাহূ ইউগফার লাহুম মা ক্বাফ সালাফ’ অর্থ: যারা কুফুরী করেছে তাদের বলুন, তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে তাদের বিগত সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত রাসূল বলেন, কেউ যদি গুনাহ করে আসমান-জমিন ভরেও ফেলে, অতঃপর আল্লাহর নিকট তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।

হযরত ইয়াযীদ রুকাশী রহ. থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, একদিন রাসূল-এর মিম্বারে চড়ে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. খুৎবা দিলেন। খুৎবায় তিনি বললেন, আমি রাসূল-কে বলতে শুনেছি, আদম আ. আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তিনটি বিষয়ে তার নিকট কৈফিয়ত দিবেন। যথা—
১. হে আদম! যদি আমি মিথ্যাবাদীদেরকে অভিশাপ না দিতাম, মিথ্যাকে ঘৃণা না করতাম এবং এই ফায়সালা না হয়ে যেত যে, জাহান্নাম মানুষ ও জিন দ্বারা ভরে যাবে, তাহলে আজ তোমার বংশের সকলের প্রতিই আমি রহম করতাম।
২. যার সম্পর্কে আমি জানি যে, তাকে যদি পুনরায় দুনিয়াতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সে আবার গুনাহ করবে এবং তাওবা করবে না, এমন হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া তোমার বংশের কাউকেই আমি জাহান্নামে প্রবেশ করাব না।
৩. হে আদম! আজ তোমাকে আমি আমার এবং তোমার সন্তানদের মাঝে বিচারক নির্ধারণ করলাম। যাও, পাল্লার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। তাদের আমলের পরিমাপ প্রক্রিয়া দেখ। যার নেকের পাল্লা বিন্দু পরিমাণ ভারী হয় সে জান্নাত পাবে, যাতে তুমি বুঝতে পার আমি জালেম ছাড়া কাউকে জাহান্নামে প্রবেশ করাই না。

টিকাঃ
২৫৭. সূরা ফুরকান: আয়াত-৬৮-৭০
২৫৮. হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আমরা অবগত হইনি।
২৫৯. সূরা ফুরকান: আয়াত-৭০
২৬০. সূরা আনফাল: আয়াত-৩৮
২৬১. সহীহুল জামে হাদীস-৫২৩৫; কাশফুল খফা: ২/১৯৯। আল্লামা আজলুনী ও শায়েখ নাসীর উদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
২৬২. হাদীসের সনদে ইয়াযীদ বুকাশী নামক জয়ীফ রাবি থাকায় হাদীসটি জয়ীফ।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আমলনামার প্রকার

📄 আমলনামার প্রকার


عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: الدَّوَاوِينُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى ثَلَاثَةُ: دِيوَانٌ لَا يَغْفِرُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ شَيْئًا، وَدِيوَانٌ لَا يَتْرُكُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ شَيْئًا، وَدِيوَانٌ لَا يَعْبَأُ اللَّهُ بِهِ شَيْئًا. فَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَغْفِرُ اللهُ مِنْهُ شَيْئًا فَالشِّرْكُ بِاللَّهِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ} [النساء: ٤٨] وَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَتْرُكُ اللَّهُ مِنْهُ شَيْئًا فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا، وَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَعْبَأُ اللهُ تَعَالَى بِهِ شَيْئًا، فَظُلْمُ الْعَبْدِ نَفْسَهُ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ رَبِّهِ.

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বলেন, আল্লাহর নিকট আমলনামা তিন প্রকার। যথা-
১. এমন আমলনামা যা থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ক্ষমা করবেন না।
২. এমন আমলনামা যা থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না।
৩. এমন আমলনামা যার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কোনো পরোয়া করবেন না।

যে আমলনামা থেকে আল্লাহ কিছুই ক্ষমা করবেন না তা হলো, শিরক। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না। ১৬৩
আর যে আমলনামা থেকে আল্লাহ কিছুই ছাড় দিবেন না, তা হলো মানুষের একে অপরের প্রতি জুলুম করা।
আর যে আমলনামার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো পরোয়া করবেন না, তা হলো বান্দার নিজের উপর করা জুলুম, যা তার ও তার রবের মধ্যে সীমাবদ্ধ।১৬৪

টিকাঃ
১৬৩. সূরা নিসা: আয়াত-৪৮
১৬৪. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৬০৩২; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-৭৬৬৪; হাকেম ও যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ أَدْهَمَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى أَنَّهُ قَالَ : لَأَنْ أَدْخُلَ النَّارَ، وَقَدْ أَطَعْتُ اللَّهَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَدْخُلَ الْجَنَّةَ، وَقَدْ عَصَيْتُ اللهَ تَعَالَى. হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম রহ. বলেন, আল্লাহর আনুগত্য করে জাহান্নামে যাওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আল্লাহর নাফরমানী করে জান্নাতে যাওয়ার চেয়ে।

**এক গোলামের তাওবা**
عَنْ مَالِكِ بْنِ دِينَارٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ مَرَّ بِعُتْبَةَ الْغُلَامِ فِي بَرْدِ شَدِيدٍ، وَعَلَى عُتْبَةَ قَمِيصُ خَلِقُ، وَهُوَ قَائِمٌ يَتَفَكَّرُ وَهُوَ يَتَرَبَّحُ عَرَقًا، فَقَالَ لَهُ مَالِكَ: مَا الَّذِي أَوْقَفَكَ فِي هُذَا الْمَوْضِعِ قَالَ: يَا مُعَلِّمِي هُذَا مَوْضِعُ عَصَيْتُ اللهَ تَعَالَى فِيهِ، يَعْنِي أَنَّهُ كَانَ يَتَفَكَّرُ فِي ذَنْبِهِ، وَهُوَ يَسِيلُ مِنْهُ الْعَرَقُ حَيَاءٌ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى.

হযরত মালেক বিন দীনার রহ. থেকে বর্ণিত। একদা তিনি প্রচণ্ড শীতের মধ্যে উতবা নামের এক যুবককে দেখতে পেলেন। তার শরীরে ছিল, পুরোনো পোশাক। পথিমধ্যে সে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে। আর শীতের মধ্যেও তার শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছ? সে বলল, উস্তাদ! এই সে স্থান যেখানে আমি আল্লাহর নাফরমানী করেছিলাম। অর্থাৎ, যে স্থানে সে আল্লাহর নাফরমানী করেছে, সে স্থানে দাঁড়িয়েই তাওবা করছে এবং আল্লাহর ভয়ে তার দেহ থেকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও দরদর করে ঘাম ঝরছে।

**হযরত মাকহুল শামী রহ.-এর উক্তি**

হযরত মাকহুল শামী রহ. বলেন, প্রতিরাতে ঘুমানোর পূর্বে বিছানায় শুয়ে সারাদিনের কাজের হিসাব নেওয়া উচিত। যদি ভালো কাজ করে থাকে তাহলে আল্লাহর শুকর আদায় করবে। আর যদি কোনো গুনাহ করে থাকে তাহলে আল্লাহর নিকট তাওবা করবে। আর যে এরূপ করে না, সে ওই ব্যবসায়ীর মতো যে তার ব্যবসার কোনো হিসাব নিকাশ রাখে না। ফলে নিজের অজান্তে এক সময় দেউলিয়া হয়ে যায়।

হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত— রাসূল ইরশাদ করেন, মানুষের আমলনামা তিন প্রকার। যথা—
১. যা আল্লাহ তা'আলা সম্পূর্ণ মাফ করে দিবেন।
২. যা আল্লাহ সামান্যও মাফ করবেন না।
৩. যার থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না।
যেটা আল্লাহ তা'আলা মাফ করবেন না, সেটা হলো, শিরকের গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ইন্নাহূ মাইঁ ইউশ্রিক বিল্লা-হি ফাক্বাদ হাররামাল্লা-হু আলাইহিল জান্নাতা ওয়া মা’ওয়া-হুন্নারু’ অর্থ: নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সাথে শিরক করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যেটা আল্লাহ তা'আলা মাফ করে দিবেন, সেটা হলো, বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার গুনাহ। যে গুনাহ আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না, সেটা হলো, বান্দাদের পরস্পর জুলুমের গুনাহ।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে অবশ্যই যার যার হক আদায় করে দিতে হবে। এমন কি শিংওয়ালা ছাগল যদি শিংবিহীন ছাগলের উপর অবিচার করে থাকে, তাহলে তাকেও শিং ওয়ালা ছাগলের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। তাই বান্দার উচিত প্রতিপক্ষ কে খুশি করা, যাতে কোনো মানুষ কিয়ামতের দিন তার বাদী না হয়। কারণ, যার সম্পর্কে আল্লাহ ও বান্দার সাথে তাওবা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন। কারণ, আল্লাহ অনেক মেহেরবান ও ক্ষমাশীল। কিন্তু যে গুনাহের সম্পর্ক বান্দার সাথে হয় সে ক্ষেত্রে তাওবা কোনো কাজে আসবে না। বান্দা নিজে তা ক্ষমা না করলে আল্লাহ কোনোভাবেই তা ক্ষমা করবেন না। দুনিয়াতে তাকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার নেক আমল নিয়ে তাকে দিয়ে দিবেন।

টিকাঃ
২৬৩. মুসনাদে আহমাদ হাদীস-২৬০৭০; মুসতাদরাকে হাকেম হাদীস-৮৭১৭; শায়েখ আহমাদ শাকির ও জালালুদ্দীন সুযুতী প্রমুখ সনদটিকে সহীহ বলেছেন। তবে অনেক ইমাম সনদটিকে জয়ীফ বলেছেন।
২৬৪. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৮২。

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 সবচেয়ে বড় দেউলিয়া

📄 সবচেয়ে বড় দেউলিয়া


عَنِ الْفُضَيْلِ، قَالَ: قَالَ إِبْلِيسُ: إِذَا تَمَكَّنْتُ مِنِ ابْنِ آدَمَ بِثَلَاثٍ لَمْ أُبَالِ مَا عَمِلَ فَإِنِّي غَيْرُ تَارِكِهِ: إِذَا نَسِيَ ذَنْبَهُ، وَاسْتَكْثَرَ عَمَلَهُ، وَأُعْجِبَ بِرَأْيِهِ.

হযরত ফুযাইল রহ. বলেন, ইবলীস বলে, আমি যদি কোনো মানুষের উপর তিনটি বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারি, তবে সে যা-ই করুক আমি তার পরোয়া করি না। কারণ, আমি তাকে ছাড়ব না। বিষয় তিনটি হলো-
১. সে তার গুনাহ ভুলে যায়।
২. সে তার আমলকে অনেক বেশি মনে করে।
৩. সে নিজের মতামতের প্রতি মুগ্ধ থাকে।

**আসমানী কিতাবে আল্লাহর বাণী**
কোনো এক আসামানী কিতাবে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
عَبْدِي إِنِّي مَلِكٌ لَا أَزُولُ، فَأَطِعْنِي فِيمَا أَمَرْتُكَ بِهِ ، وَانْتَهِ عَمَّا نَهَيْتُكَ عَنْهُ حَتَّى أَجْعَلَكَ حَيًّا لَا تَمُوتُ، عَبْدِي أَنَا الَّذِي إِذَا أَقُولُ لِلشَّيْءِ كُنْ فَيَكُونُ.
বান্দা! মনে রেখ আমি চির অধিষ্ঠিত সম্রাট, আমি যা আদেশ করি তা পালন কর। যা বারণ করি তা থেকে বিরত থাক। তাহলে আমি তোমাকে চিরঞ্জীব বানিয়ে দিব। আমি যখন কোনো জিনিসকে বলি হও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়।

**নিজেকে কষ্ট না দেওয়া**

হযরত আবূ মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াজিদ রহ. বলেন, তোমরা প্রিয়জনকে কষ্ট দিয়ো না। উপস্থিত লোকেরা বলল, কেউ কি তার প্রিয়জনকে কষ্ট দেয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ, মানুষের সবচেয়ে প্রিয় হলো, তার নিজের আত্মা। আর আল্লাহর নাফরমানী করা মানে হলো, তাকে কষ্ট দেওয়া।

জনৈক আরেফের নিকট কেউ উপদেশ চাইলে তিনি বললেন, তোমার রবের সাথে দুর্ব্যবহার কর না। মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার কর না এবং তোমার নিজের সাথেও দুর্ব্যবহার কর না। রবের সাথে দুর্ব্যবহারের অর্থ হলো, তাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদতে লেগে যাওয়া। মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের অর্থ হলো, অন্যের কাছে তার বদনাম করা। নিজের সাথে দুর্ব্যবহারের অর্থ হলো, ফরজ বিধান পালনে অবহেলা করা।

**জনৈক ব্যক্তির তাওবা**

হযরত কাহমাস ইবনুল হাসান রহ. বলেন, আমি একটি গুনাহ করে তার জন্য চল্লিশ বছর কেঁদেছি। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, সে গুনাহটি কী? তিনি বললেন, আমার এক ভাই আমার নিকট বেড়াতে এলো। আমি তার জন্য একটি মাছ ক্রয় করি। তিনি খেলেন। অতঃপর আমি আমার প্রতিবেশীর দেয়াল থেকে এক টুকরা মাটি এনে তা দিয়ে হাত পরিস্কার করি।

নবী করীম ইরশাদ করেন-
أَعْظَمُ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى أَصْغَرُهَا عِنْدَ النَّاسِ، وَأَصْغَرُ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى، أَعْظَمُهَا عِنْدَ النَّاسِ.

আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহকে মানুষ ছোট গুনাহ মনে করে। আর আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ছোট গুনাহকে মানুষ বড় গুনাহ মনে করে। অর্থাৎ, গুনাহগার যখন কোনো গুনাহকে বড় মনে করে আল্লাহকে ভয় কর, তখন সে গুনাহ যতই বড় হোক আল্লাহর কাছে ছোট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে গুনাহগার যখন কোনো গুনাহকে গুনাহ মনে না করে তখন তা তার চোখে যত ছোটই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা অনেক বড় হয়ে যায়।

যেমন জনৈক সাহাবী রাযি. বলেন, অবিরাম গুনাহলিপ্ত থাকলে কোনো গুনাহ-ই ছোট থাকে না। পক্ষান্তরে সর্বদা তাওবা করলে কোনো গুনাহ-ই বড় থাকে না।

হযরত আওয়াম ইবনে হাওশাব রহ. বলেন, গুনাহের পর চারটি কাজ গুনাহের চেয়েও মারাত্মক। যথা-
১. الإِسْتِصْغَارُ অর্থাৎ, গুনাহকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।
২. وَالإِغْتِرَارُ অর্থাৎ, গুনাহ করে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগা।
৩. وَالإِسْتِبْشَارُ অর্থাৎ, গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া।
৪. وَالْإِصْرَارُ অর্থাৎ, অবিরাম গুনাহ করতে থাকা।

**গুনাহের ক্ষতিসমূহ**

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, নিম্নোক্ত আয়াত যেন কাউকে বিভ্রান্ত না করে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزِي إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
অর্থ: যে ব্যক্তি একটি নেক আমল নিয়ে আসবে সে তার দশগুন প্রতিদান পাবে, আর যে ব্যক্তি একটি গুনাহ করবে তাকে তার সমপরিমাণ প্রতিদানই দেওয়া হবে। তাদের সাথে কোনো প্রকার অবিচার করা হবে না।
কারণ, একটি নেকি করলে তার দশগুন প্রতিদান পাওয়া যাবে এমন বলা হয়নি। বরং শর্তযুক্ত করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন একটি নেকি নিয়ে হাজির হতে পারবে সে একটি নেকির সওয়াব দশগুন পাবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন নেকি নিয়ে হাজির হওয়া অনেক কঠিন। আর একটি গুনাহের শাস্তি তার অনুরূপ হবে ঠিক। কিন্তু তাদের আরো দশটি মন্দ দিক আছে। যথা-
১. বান্দার গুনাহ তার রবকে ক্রুদ্ধ করে, অথচ রব যে কারো সাথে যে কোনো ধরনের আচরণ করতে সক্ষম।
২. বান্দার গুনাহ তার রবের সবচেয়ে বড় শত্রু ইবলীসকে খুশি করে।
৩. গুনাহ বান্দাকে সবচেয়ে উত্তম স্থান জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৪. গুনাহ মানুষকে নিকৃষ্টতম স্থান জাহান্নামের নিকটবর্তী করে দেয়।
৫. গুনাহ করে মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয়জন অর্থাৎ, নিজের আত্মার সাথে দুর্ব্যবহার করে।
৬. গুনাহের ফলে মানুষের নফস অপবিত্র হয়ে যায়, অথচ আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে প্রবিত্র করে সৃষ্টি করেছেন।
৭. গুনাহ করে মানুষ তার সাথে থাকা হেফাজতকারী ফেরেশতাদেরকে কষ্ট দেয়।
৮. গুনাহ করে রাসূল -এর পবিত্র আত্মাকে কষ্ট দেয়।
৯. গুনাহ করে মানুষ রাত-দিনকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী বানায় এবং তাদেরকে কষ্ট দেয়।
১০. গুনাহ করে বান্দা সমস্ত মানুষ এবং অন্যান্য সৃষ্টির সাথে বিশ্বাসঘাতক্তা করে।
মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এভাবে হয় যে, গুনাহের কারণে তার সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। এতে অনেকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। আর বিশেষ করে অন্যান্য সৃষ্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকাতা এভাবে যে, গুনাহ করলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, দেশে খড়া দেখা দেয়, এতে সকল সৃষ্টিই কষ্ট পায়।
বলা হয়, সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি, যে নিজের সাথে কৃপণতা করে। অথচ তাতে তার সৌভাগ্য নিহিত। আর সবচেয়ে বড় জালেম সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নাফরমানী করে নিজের উপর জুলুম করে। কারণ, আল্লাহর নাফরমানি করা মানে নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা।
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, সাবধান! গুনাহ থেকে বেঁচে থাক। কারণ, গুনাহ খুবই অমঙ্গলজনক, যা কামানের গোলার মতো ছুটে এসে আনুগত্যের দেয়ালে আঘাত করে। ফলে প্রবৃত্তির চাহিদার বাতাসের ঝাপটা ভেতরে প্রবেশ করে এবং মারেফাতের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়।

টিকাঃ
৯৪ সূরা আন আম ১৬০

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেছেন, তোমরা জানো আমার উম্মতের দেউলিয়া কে? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, যার কোনো দিনার দিরহাম, সহায়-সম্বল নাই, সেই তো দেউলিয়া। রাসূল বললেন, না, বরং আমার উম্মতের দেউলিয়া সে ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন তার সমস্ত নামায রোযা নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও মাল খেয়েছে, কাউকে হত্যা করেছে, কাউকে মেরেছে তাই তার নেক আমলগুলো নিয়ে এদেরকে দেওয়া হবে। এভাবে একসময় তার নেক আমল শেষ হয়ে যাবে এবং তাদের আরো পাওনা রয়ে যাবে। তখন তাদের গুনাহ থেকে গুনাহ নিয়ে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

সুতরাং আমরা আল্লাহর নিকট দোয়া করি, তিনি যেন আমাদের তাওবা করার এবং তাওবার উপর অটল থাকার তওফীক দান করেন। কারণ, তাওবার উপর অটল থাকা তাওবার চেয়ে কঠিন। হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, সাবধান! কোনো নেক আমল করার পর কখনো তা পরিত্যাগ করবে না। কারণ, কোনো ব্যক্তি তাওবা করার পর যদি আবার আগের জীবনে ফিরে যায়, সে কখনো সফল হতে পারে না।

সুতরাং তাওবাকারীর উচিত সর্বক্ষণ মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। যাতে সে তাওবার উপর অটল থাকতে পারে, গুনাহের কথা স্মরণ করে অধিক পরিমাণে ইসতেগফার করা, আল্লাহর বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করা তাওবার সুযোগ দেওয়ার কারণে, আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ রাখা। কারণ, যে আখেরাতের সওয়াবের কথা স্মরণ রাখে তার জন্য সওয়াবের কাজ করা সহজ হয়ে যায় এবং নেক কাজ করার আগ্রহ বেড়ে যায়। আর যে আযাবের ব্যাপারে চিন্তা করে, সে মন্দ থেকে বেঁচে থাকে।

টিকাঃ
২৬৫. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৮১; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪১৮; মুসনাদে আহমাদ ২/৩০৩।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 মূসা আ.-এর সহীফার ছয় বাক্য

📄 মূসা আ.-এর সহীফার ছয় বাক্য


رُوِيَ فِي أَخْبَارِ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ أَنَّهُ قَالَ: يَا رَبِّ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ إِذَا أَنَا عَمِلْتُهُ نِلْتُ بِهِ رِضَاكَ، فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَيْهِ يَا ابْنَ عِمْرَانَ إِنَّ رِضَايَ فِي كَرَاهِيَتِكَ، وَأَنْتَ لَا تَصْبِرُ عَلَى مَا تَكْرَهُ. قَالَ: يَا رَبِّ دُلَّنِي عَلَيْهِ. قَالَ: فَإِنَّ رِضَايَ فِي أَنْ تَرْضَى بِقَضَائِي، وَتَتَوَاضَعَ لِفُقَرَاءِ عِبَادِي، وَتَحْفَظَ حُرْمَةَ أَوْلِيَائِي، وَتُحِبَّ الْخُمُولَ، وَتَدَعَ الْحَسَدَ، وَتَكُونَ كَثِيرَ الْبُكَاءِ مِنْ خَشْيَتِي.

হযরত মূসা আ.-এর ঘটনায় বর্ণিত আছে, তিনি আল্লাহকে বলেছিলেন, হে রব! আমাকে এমন আমল বাতলে দিন, যা করলে আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভ করতে পারব। আল্লাহ তাঁর নিকট ওহী পাঠালেন, হে ইমরানের পুত্র! আমার সন্তুষ্টি তোমার অপছন্দনীয় বিষয়ের মধ্যে নিহিত। আর তুমি তো অপছন্দনীয় বিষয়ে ধৈর্যধারণ করতে পারবে না। মূসা আ. বললেন, রব! আমাকে বলুন। আল্লাহ তা'আলা বললেন,
১. আমার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা।
২. আমার দরিদ্র বান্দাদের সামনে বিনয়ী হওয়া।
৩. আমার ওলীদের সম্মান করা।
৪. অপরিচিতি ও অখ্যাতি পছন্দ করা।
৫. হিংসা পরিহার করা।
৬. আমার ভয়ে বেশি বেশি কাঁদা।

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: كَانَ فِيمَا أَعْطَى اللَّهُ لِمُوسَى بْنِ عِمْرَانَ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ فِي الْأَلْوَاحِ عَشْرَةُ أَبْوَابٍ فَأَوَّلُ مَا كُتِبَ فِي اللَّوْحِ الْأَوَّلِ : يَا مُوسَى لَا تُشْرِكَنَّ بِي شَيْئًا، فَقَدْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي لَتَلْفَحَنَّ وُجُوهَ الْمُشْرِكِينَ النَّارِ، وَاشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ أَقِيكَ الْمَتَالِفَ، أَعْنِي أَحْفَظُكَ مِنَ الْمَهَالِكِ، وَأَنْسَأُ لَكَ فِي عُمْرِكَ، وَأُحْيِيكَ حَيَاةً طَيِّبَةً، وَأَنْقُلُكَ، وَأَقْلِبُكَ إِلَى خَيْرٍ مِنْهَا، وَلَا تَقْتُلِ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمْتُهَا، فَتَضِيقَ عَلَيْكَ الْأَرْضُ بِرَحْبِهَا، وَالسَّمَاءُ بِأَقْطَارِهَا، وَتَبُوءَ بِسَخَطِي فِي النَّارِ، لَا تَحْلِفْ بِاسْمِي كَاذِبًا، وَلَا آئِمًا، فَإِنِّي لَا أُطَهَّرُ، وَلَا أُزَيِّنُ مَنْ لَمْ يُنَزِّهْنِي، وَمَنْ لَمْ يُعَظَّمْ أَسْمَائِي، وَلَا تَحْسُدِ النَّاسَ عَلَى مَا آتَيْتُهُمْ مِنْ فَضْلِي فَإِنَّ الْحَاسِدَ عَدُوٌّ لِنِعْمَتِي رَادُّ لِقَضَائِي سَاخِطٌ لِقِسْمَتِي الَّتِي قَسَمْتُ بَيْنَ عِبَادِي، وَمَنْ لَمْ يَكُنْ كَذَلِكَ، فَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ مِنِّي، لَا تَشْهَدْ بِمَا لَا يَعِي سَمْعُكَ، وَيَحْفَظُهُ عَقْلُكَ، وَيَعْقِدُ عَلَيْكَ قَلْبُكَ، فَإِنِّي وَاقِفُ أَهْلَ الشَّهَادَاتِ عَلَى شَهَادَاتِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، أَسْأَلُهُمْ عَنْهَا سُوَّااً. حَثِيثًا، وَلَا تَسْرِقُ وَلَا تَزْنِ بِحَلِيلَةِ جَارِكَ، فَأَحْجُبُ عَنْكَ وَجْهِي، وَأُغْلِقُ عَنْكَ أَبْوَابَ السَّمَاءِ، وَأَحِبَّ لِلنَّاسِ كَمَا تُحِبُّ لِنَفْسِكَ، وَلَا تَذْبَحَنَّ لِغَيْرِي فَإِنِّي مَا أُحِبُّ مِنَ الْقُرْبَانِ إِلَّا مَا ذُكِرَ عَلَيْهِ اسْمِي، وَكَانَ خَالِصًا لِوَجْهِي وَتَفَرَّغْ لِي يَوْمَ السَّبْتِ، وَفَرَّغْ جَمِيعَ أَهْلِ بَيْتِكَ.

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, হযরত মূসা আ.-এর উপর যে গ্রন্থ নাযিল হয়েছিল তাতে দশটি অধ্যায় ছিল। যথা-

১. হে মূসা! আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক কর না। কারণ, আমার নিকট এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে যে, আগুন মুশরিকদের চেহারা ঝলসে দিবে।
২. আমার এবং তোমার পিতা-মাতার শুকর আদায় কর। তাহলে আমি তোমাকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করবো, তোমার হায়াত বাড়িয়ে দিব এবং তোমাকে উত্তম জীবন দান করবো, তারপর এরচেয়ে ভালো জীবনের দিকে নিয়ে যাব।
৩. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা কর না। তাহলে প্রশস্ত আসমান ও জমিন তোমার জন্য খুবই সংকীর্ণ হয়ে যাবে। আর আমার ক্রোধের কারণে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
৪. আমার নামে মিথ্যা শপথ কর না। গুনাহের ক্ষেত্রে আমার নাম ব্যবহার কর না। কারণ, যে ব্যক্তি আমাকে পবিত্র রাখে না এবং আমার নামের মর্যদা রক্ষা করে না, আমিও তাকে পবিত্র করি ন।
৫. আমি মানুষকে অনুগ্রহ করে যা দান করেছি তাতে হিংসা কর না। কারণ, হিংসুক আমার নেয়ামতের শত্রু আমার ফায়সালাকে অমান্যকারী এবং আমার বণ্টনে অসন্তুষ্ট। যে ব্যক্তি এরূপ করবে তার সাথে আমার এবং আমার সাথে তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না।
৬. যে বিষয়টি তোমার কান স্পষ্টভাবে শুনেনি, তোমার বিবেক ভালোভাবে উপলব্ধি করেনি এবং তোমার মন ভালোভাবে সংরক্ষণ করেনি তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়ো না। কারণ, কিয়ামতের দিন আমি সাক্ষীদের উপস্থিত করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করব।
৭. চুরি কর না।
৮. পড়শীর স্ত্রীর সাথে যিনা কর না। তাহলে আমি তোমাদের দিকে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিব এবং তোমার উপর আসমানের দরজা বন্ধ করে দিব। নিজের বেলায় যা পছন্দ কর, অন্যের বেলায় তাই পছন্দ কর।
৯. আমার নাম ব্যতীত অন্য কারো নামে পশু জবাই কর না। কারণ, যা আমার নাম নিয়ে জবাই করা হয়েছে, শুধু তাই কবূল করি ও পছন্দ করি।
১০. শনিবার দিনটিকে তুমি একান্তভাবে আমার জন্য রাখো এবং তোমার পরিবারের লোকদের এ ব্যাপারে সজাগ কর।
রাসূল ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى جَعَلَ السَّبْتَ لِمُوسَى عِيدًا ، وَاخْتَارَ الْجُمْعَةَ فَجَعَلَهَا لَنَا عِيدًا.
আল্লাহ তা'আলা শনিবারকে হযরত মূসা আ.-এর জন্য উৎসবের দিন বানিয়েছিলেন, আর জুমআর দিন কে আমাদের উৎসবের দিন বানিয়েছেন।

টিকাঃ
৮৮. দুররে মানসুর: ৩/৫৫১।

হযরত আবূ যর রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হযরত মূসা আ.-এর উপর অবতীর্ণ গ্রন্থে কী লেখা ছিল সে সম্পর্কে আমাদেরকে বলুন। রাসূল বললেন, তাতে অনেক শিক্ষণীয় ও উপদেশমূলক কথা ছিল। কয়েকটি নিম্নরূপ—
১. আশ্চর্য! যে ব্যক্তি জাহান্নামে বিশ্বাস করে সে কিভাবে হাসি-তামাশা করে?
২. আশ্চর্য! যে ব্যক্তি মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত সে কিভাবে আনন্দ-ফুর্তি করে?
৩. আশ্চর্য! যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশে বিশ্বাস করে সে কিভাবে মন্দ কাজ করে?
৪. আশ্চর্য! যে ব্যক্তি ভাগ্যকে বিশ্বাস করে সে কিভাবে দুঃখ পায়?
৫. আশ্চর্য! জান্নাতে বিশ্বাস করার পরও মানুষ নেক আমল না করে থাকতে পারে?
৬. আশ্চর্য! দুনিয়া ও তার নানা বিবর্তন ও পটপরিবর্তন দেখার পরও মানুষ কীভাবে তার প্রতি আশ্বস্ত থাকে। আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।

টিকাঃ
২৬৬. সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস-৩৬১, আল হিলইয়া লি-আবি নুআইম ১/১৬৮; শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px