📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 নেককর্ম গুনাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়

📄 নেককর্ম গুনাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়


عَنْ أَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : إِنَّ صَاحِبَ الشِّمَالِ لَيَرْفَعُ الْقَلَمَ عَنِ الْمُسْلِمِ سِتَّ سَاعَاتٍ، فَإِنْ هُوَ نَدِمَ وَاسْتَغْفَرَ اللَّهَ مِنْهَا أَلْقَاهَا وَإِلَّا كُتِبَتْ وَاحِدَةً.
হযরত আবূ উমামা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, বাম কাঁধের ফেরেশতা মুসলমানের গুনাহ লেখার জন্য ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। যদি সে এর মধ্যে অনুতপ্ত হয়ে ইস্তিগফার করে, তাহলে তা লেখা হয় না। অন্যথায় একটি গুনাহ লেখা হয়।১৬১

عَنْ أَبِي ذَرِّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ.

হযরত আবূ যর রাযি. বলেন, রাসূল ﷺ আমাকে বলেছেন, যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে নেক আমল কর। কারণ, তা গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। আর মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার কর।১৬২

টিকাঃ
১৬১. আল-মুজামুল কাবীর লিত্ ত্ববারানী: হাদীস-৭৬৬৭; শুআবুল ঈমান: হাদীস-৬৬৫০; হাদীসটি হাসান।
১৬২. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৯৮৭; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২১৩৮৭; ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : الْبِرُّ لَا يَبْلَى، وَالْإِثْمُ لَا يُنْسَى، وَالدَّيَّانُ لَا يَفْنَى، وَكُنْ كَمَا شِئْتَ.

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, নেক আমল কখনো পুরোনো হবে না। পাপকাজ কখনো ভুলানো হয় না এবং কর্মের বিনিময় দানকারী কখনো মৃত্যুবরণ করে না। তুমি যেমন চাও তেমন হও। অর্থাৎ, তুমি যেমন করবে তেমনই ফল পাবে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল এবং মন্দ করলে মন্দফল।
যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন-
إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا
অর্থ: যদি তোমরা ভালো কাজ কর তাহলে তা নিজেদের জন্যই করবে, আর যদি মন্দকাজ কর তাহলেও তা নিজেদের জন্যই।
অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা কারো উপর অবিচার করেন না। কেউ নেক কাজ করলে তার একটি নেকিও কমিয়ে দেন না এবং কাউকে বিনা অপরাধে শাস্তি দেন না।
তিনি স্পষ্টভাবে তার পথ বর্ণনা করে দিয়েছেন, তা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিটি জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন। তারা জান্নাত ও জাহান্নামের পথ বাতলে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৯১. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: হাদীস-২০২৬২; হাদীসটি মুরসাল সহীহ [ফাতহুল বারী: ১৩/৪৬৬]
৯২. সূরা ইসরা: আয়াত-৭

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 জনৈকা নারীর তাওবার ঘটনা

📄 জনৈকা নারীর তাওবার ঘটনা


عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ امْرَأَةً بَغِيًّا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مَرَّتْ بِعَابِدٍ لَهُمْ فَأَعْجَبَهَا، فَعَرَضَتْ لَهُ نَفْسَهَا، فَأَبَى، فَدَخَلَتْ عَلَيْهِ الدَّارَ فَدَعَتْهُ فَقَالَ: لَهَا: اخْرُجِي فَأَبَتْ أَنْ تَخْرُجَ، فَنَادَاهَا يَا فُلَانَةُ إِنَّ الْمَلِكَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَسْتَخْرِجَ صَيْدًا، أَرْسَلَ كَلْبًا، ثُمَّ يَتْبَعُهُ بِنَفْسِهِ، فَأَخَافُ أَنْ تَكُونِي أَنْتِ كَلْبَ الْمَلِكِ، وَيَطْلُبُنِي الْمَلِكُ، فَخَرَجَتِ الْمَرْأَةُ، وَقَدْ تَنَبَّهَتْ، فَجَعَلَتْ تَعْبُدُ اللَّهَ تَعَالَى وَصَامَتْ، وَقَامَتْ، ثُمَّ دَعَتْ عَلَيْهِ فَقَالَتِ: اللَّهُمَّ كَمَا أَخَفْتَنِي وَرَوَّعْتَنِي فَأَخِفْهُ وَرَوِّعْهُ. قَالَ فَنَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ عَلَى نَبِيٍّ ذَلِكَ الزَّمَانِ، فَأَخْبَرَهُ بِأَنَّهُ اسْتُجِيبَ لَهَا، وَأَنَّهَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، وَأَنَّ الْعَابِدَ قَدْ أَفْزَعَ قَلْبًا لَجَأَ إِلَيْهِ، فَمَا كَانَ لَهُ أَنْ يُخِيفَهُ بَلْ كَانَ يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَشْغَلَهُ بِالرِّفْقِ وَاللُّطْفِ، وَإِخْبَارِهِ بِسَعَةِ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى، فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَى ذَلِكَ النَّبِيِّ: أَخْبِرْهُ بِأَنِّي قَدْ أَزَلْتُ اسْمَهُ مِنْ دِيوَانِ الْعَابِدِينَ، وَأَنِّي لَا أُعِيدُهُ إِلَيْهِ إِلَّا بِشَفَاعَتِهَا فِيهِ.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। বনী ইসরাঈলের এক ব্যভিচারিণী নারী এক আবেদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। আবেদের প্রতি তার আকর্ষণ জন্মালে সে তাকে নিজের প্রতি আহ্বান করল। আবেদ অস্বীকৃতি জানালে সে তার ঘরে ঢুকে গেল এবং তাকে আবার আহ্বান করল। আবেদ বলল, তুমি বের হয়ে যাও। সে বলল, আমি বের হব না। তখন আবেদ বললেন, শোন, রাজা যখন শিকার করতে চান, তখন তিনি কুকুর প্রেরণ করেন এবং তার পিছু পিছু নিজেও আসেন। আমার ভয় হচ্ছে, তুমি রাজার কুকুর হবে, আর রাজা আমার পিছু নিবেন। এ কথা শুনে মহিলা সচকিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল এবং ইবাদতে মগ্ন হলো। একদিন সে ঐ আবেদের জন্য বদ-দোয়া করে বলল, হে আল্লাহ! সে আমাকে যেমন ভয় দেখিয়েছে, তেমনি আপনিও তাকে ভয় দেখান। তখন জিবরাঈল আ. সে যুগের নবীর নিকট এসে বললেন, ঐ মহিলার দোয়া কবুল করা হয়েছে। সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কারণ, ঐ আবেদ এমন এক অন্তরকে ভয় দেখিয়েছে যে অন্তর তার আশ্রয় চেয়েছিল। তার জন্য উচিত ছিল তাকে ভয় না দেখিয়ে আল্লাহর রহমতের কথা বলে তাকে উৎসাহিত করা। তখন সে যুগের নবীর নিকট ওহী আসল, তাকে জানিয়ে দিন, আমি আবেদদের খাতা থেকে তার নাম কেটে দিয়েছি। আর সে মহিলার সুপারিশ ছাড়া তার নাম আর সে খাতায় উঠবে না।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَثَلِ رَجُلٍ أَوْقَدَ نَارًا، فَجَاءَ الْفِرَاشِ يَتَهَافَتْنَ فِيهَا، فَأَنَا أَمْنَعُكُمْ مِنْ أَنْ تَقَعُوا فِي النَّارِ، يَعْنِي أَنْهَاكُمْ عَنِ الذُّنُوبِ وَالْعِصْيَانِ، فَإِنَّ الذُّنُوبَ تُلْقِي صَاحِبَهَا فِي النَّارِ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, আমার এবং তোমাদের দৃষ্টান্ত হলো, সে ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালায়। ফলে পঙ্গপাল এসে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। আর সে হাত দিয়ে সেগুলো তাড়িয়ে দিতে থাকে। আমি তেমনি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে পড়া থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করি। অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে নাফরমানী ও গুনাহ হতে নিষেধ করি। আর গুনাহই তো মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।

**হযরত আদম আ.-এর তাওবা**

বলা হয়, পাঁচটি কারণে হযরত আদম আ.-এর তাওবা কবুল করা হয়েছে। আর পাঁচ কারণে ইবলিসের তাওবা কবুল করা হয়নি।

আদম আ.-এর তাওবা কবুল করার পাঁচ কারণ হলো-
১. أَقَرَّ عَلَى نَفْسِهِ بِالذَّنْبِ অর্থাৎ, তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
২. وَنَدِمَ عَلَيْهِ অর্থাৎ, তার জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন।
৩. وَلَامَ نَفْسَهُ অর্থাৎ, নিজেই নিজের সমালোচনা করেছেন।
৪. وَأَسْرَعَ بِالتَّوْبَةِ অর্থাৎ, দ্রুত তাওবা করেছেন।
৫. وَلَمْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি।

ইবলিসের তাওবা কবুল না হওয়ার পাঁচ কারণ হলো-
১. لَمْ يُقِرَّ عَلَى نَفْسِهِ অর্থাৎ, ইবলীস নিজের অপরাধ স্বীকার করেনি।
২. وَلَمْ يَنْدَمُ عَلَيْهِ অর্থাৎ, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়নি।
৩. وَلَمْ يَكُمْ نَفْسَهُ অর্থাৎ, নিজেকে তিরস্কার করেনি।
৪. وَلَمْ يُسْرِعُ فِي التَّوْبَةِ অর্থাৎ, তাওবা করেনি।
৫. وَقَنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়েছে।

সুতরাং যার অবস্থা আদম আ.-এর অবস্থার মত হবে তার তাওবা কবুল হবে আর যার অবস্থা ইবলিসের মত হবে, তার তাওবা কবুল হবে না।

টিকাঃ
৯৩ সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৪৮৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২২৮৪।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 আমলনামার প্রকার

📄 আমলনামার প্রকার


عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: الدَّوَاوِينُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى ثَلَاثَةُ: دِيوَانٌ لَا يَغْفِرُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ شَيْئًا، وَدِيوَانٌ لَا يَتْرُكُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ شَيْئًا، وَدِيوَانٌ لَا يَعْبَأُ اللَّهُ بِهِ شَيْئًا. فَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَغْفِرُ اللهُ مِنْهُ شَيْئًا فَالشِّرْكُ بِاللَّهِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ} [النساء: ٤٨] وَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَتْرُكُ اللَّهُ مِنْهُ شَيْئًا فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا، وَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَعْبَأُ اللهُ تَعَالَى بِهِ شَيْئًا، فَظُلْمُ الْعَبْدِ نَفْسَهُ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ رَبِّهِ.

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বলেন, আল্লাহর নিকট আমলনামা তিন প্রকার। যথা-
১. এমন আমলনামা যা থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ক্ষমা করবেন না।
২. এমন আমলনামা যা থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না।
৩. এমন আমলনামা যার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কোনো পরোয়া করবেন না।

যে আমলনামা থেকে আল্লাহ কিছুই ক্ষমা করবেন না তা হলো, শিরক। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না। ১৬৩
আর যে আমলনামা থেকে আল্লাহ কিছুই ছাড় দিবেন না, তা হলো মানুষের একে অপরের প্রতি জুলুম করা।
আর যে আমলনামার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো পরোয়া করবেন না, তা হলো বান্দার নিজের উপর করা জুলুম, যা তার ও তার রবের মধ্যে সীমাবদ্ধ।১৬৪

টিকাঃ
১৬৩. সূরা নিসা: আয়াত-৪৮
১৬৪. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৬০৩২; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-৭৬৬৪; হাকেম ও যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ أَدْهَمَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى أَنَّهُ قَالَ : لَأَنْ أَدْخُلَ النَّارَ، وَقَدْ أَطَعْتُ اللَّهَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَدْخُلَ الْجَنَّةَ، وَقَدْ عَصَيْتُ اللهَ تَعَالَى. হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম রহ. বলেন, আল্লাহর আনুগত্য করে জাহান্নামে যাওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আল্লাহর নাফরমানী করে জান্নাতে যাওয়ার চেয়ে।

**এক গোলামের তাওবা**
عَنْ مَالِكِ بْنِ دِينَارٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ مَرَّ بِعُتْبَةَ الْغُلَامِ فِي بَرْدِ شَدِيدٍ، وَعَلَى عُتْبَةَ قَمِيصُ خَلِقُ، وَهُوَ قَائِمٌ يَتَفَكَّرُ وَهُوَ يَتَرَبَّحُ عَرَقًا، فَقَالَ لَهُ مَالِكَ: مَا الَّذِي أَوْقَفَكَ فِي هُذَا الْمَوْضِعِ قَالَ: يَا مُعَلِّمِي هُذَا مَوْضِعُ عَصَيْتُ اللهَ تَعَالَى فِيهِ، يَعْنِي أَنَّهُ كَانَ يَتَفَكَّرُ فِي ذَنْبِهِ، وَهُوَ يَسِيلُ مِنْهُ الْعَرَقُ حَيَاءٌ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى.

হযরত মালেক বিন দীনার রহ. থেকে বর্ণিত। একদা তিনি প্রচণ্ড শীতের মধ্যে উতবা নামের এক যুবককে দেখতে পেলেন। তার শরীরে ছিল, পুরোনো পোশাক। পথিমধ্যে সে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে। আর শীতের মধ্যেও তার শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছ? সে বলল, উস্তাদ! এই সে স্থান যেখানে আমি আল্লাহর নাফরমানী করেছিলাম। অর্থাৎ, যে স্থানে সে আল্লাহর নাফরমানী করেছে, সে স্থানে দাঁড়িয়েই তাওবা করছে এবং আল্লাহর ভয়ে তার দেহ থেকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও দরদর করে ঘাম ঝরছে।

**হযরত মাকহুল শামী রহ.-এর উক্তি**

হযরত মাকহুল শামী রহ. বলেন, প্রতিরাতে ঘুমানোর পূর্বে বিছানায় শুয়ে সারাদিনের কাজের হিসাব নেওয়া উচিত। যদি ভালো কাজ করে থাকে তাহলে আল্লাহর শুকর আদায় করবে। আর যদি কোনো গুনাহ করে থাকে তাহলে আল্লাহর নিকট তাওবা করবে। আর যে এরূপ করে না, সে ওই ব্যবসায়ীর মতো যে তার ব্যবসার কোনো হিসাব নিকাশ রাখে না। ফলে নিজের অজান্তে এক সময় দেউলিয়া হয়ে যায়।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ > 📄 সবচেয়ে বড় দেউলিয়া

📄 সবচেয়ে বড় দেউলিয়া


عَنِ الْفُضَيْلِ، قَالَ: قَالَ إِبْلِيسُ: إِذَا تَمَكَّنْتُ مِنِ ابْنِ آدَمَ بِثَلَاثٍ لَمْ أُبَالِ مَا عَمِلَ فَإِنِّي غَيْرُ تَارِكِهِ: إِذَا نَسِيَ ذَنْبَهُ، وَاسْتَكْثَرَ عَمَلَهُ، وَأُعْجِبَ بِرَأْيِهِ.

হযরত ফুযাইল রহ. বলেন, ইবলীস বলে, আমি যদি কোনো মানুষের উপর তিনটি বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারি, তবে সে যা-ই করুক আমি তার পরোয়া করি না। কারণ, আমি তাকে ছাড়ব না। বিষয় তিনটি হলো-
১. সে তার গুনাহ ভুলে যায়।
২. সে তার আমলকে অনেক বেশি মনে করে।
৩. সে নিজের মতামতের প্রতি মুগ্ধ থাকে।

**আসমানী কিতাবে আল্লাহর বাণী**
কোনো এক আসামানী কিতাবে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
عَبْدِي إِنِّي مَلِكٌ لَا أَزُولُ، فَأَطِعْنِي فِيمَا أَمَرْتُكَ بِهِ ، وَانْتَهِ عَمَّا نَهَيْتُكَ عَنْهُ حَتَّى أَجْعَلَكَ حَيًّا لَا تَمُوتُ، عَبْدِي أَنَا الَّذِي إِذَا أَقُولُ لِلشَّيْءِ كُنْ فَيَكُونُ.
বান্দা! মনে রেখ আমি চির অধিষ্ঠিত সম্রাট, আমি যা আদেশ করি তা পালন কর। যা বারণ করি তা থেকে বিরত থাক। তাহলে আমি তোমাকে চিরঞ্জীব বানিয়ে দিব। আমি যখন কোনো জিনিসকে বলি হও, সাথে সাথে তা হয়ে যায়।

**নিজেকে কষ্ট না দেওয়া**

হযরত আবূ মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াজিদ রহ. বলেন, তোমরা প্রিয়জনকে কষ্ট দিয়ো না। উপস্থিত লোকেরা বলল, কেউ কি তার প্রিয়জনকে কষ্ট দেয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ, মানুষের সবচেয়ে প্রিয় হলো, তার নিজের আত্মা। আর আল্লাহর নাফরমানী করা মানে হলো, তাকে কষ্ট দেওয়া।

জনৈক আরেফের নিকট কেউ উপদেশ চাইলে তিনি বললেন, তোমার রবের সাথে দুর্ব্যবহার কর না। মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার কর না এবং তোমার নিজের সাথেও দুর্ব্যবহার কর না। রবের সাথে দুর্ব্যবহারের অর্থ হলো, তাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদতে লেগে যাওয়া। মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারের অর্থ হলো, অন্যের কাছে তার বদনাম করা। নিজের সাথে দুর্ব্যবহারের অর্থ হলো, ফরজ বিধান পালনে অবহেলা করা।

**জনৈক ব্যক্তির তাওবা**

হযরত কাহমাস ইবনুল হাসান রহ. বলেন, আমি একটি গুনাহ করে তার জন্য চল্লিশ বছর কেঁদেছি। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, সে গুনাহটি কী? তিনি বললেন, আমার এক ভাই আমার নিকট বেড়াতে এলো। আমি তার জন্য একটি মাছ ক্রয় করি। তিনি খেলেন। অতঃপর আমি আমার প্রতিবেশীর দেয়াল থেকে এক টুকরা মাটি এনে তা দিয়ে হাত পরিস্কার করি।

নবী করীম ইরশাদ করেন-
أَعْظَمُ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى أَصْغَرُهَا عِنْدَ النَّاسِ، وَأَصْغَرُ الذُّنُوبِ عِنْدَ اللَّهِ تَعَالَى، أَعْظَمُهَا عِنْدَ النَّاسِ.

আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহকে মানুষ ছোট গুনাহ মনে করে। আর আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ছোট গুনাহকে মানুষ বড় গুনাহ মনে করে। অর্থাৎ, গুনাহগার যখন কোনো গুনাহকে বড় মনে করে আল্লাহকে ভয় কর, তখন সে গুনাহ যতই বড় হোক আল্লাহর কাছে ছোট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে গুনাহগার যখন কোনো গুনাহকে গুনাহ মনে না করে তখন তা তার চোখে যত ছোটই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তা অনেক বড় হয়ে যায়।

যেমন জনৈক সাহাবী রাযি. বলেন, অবিরাম গুনাহলিপ্ত থাকলে কোনো গুনাহ-ই ছোট থাকে না। পক্ষান্তরে সর্বদা তাওবা করলে কোনো গুনাহ-ই বড় থাকে না।

হযরত আওয়াম ইবনে হাওশাব রহ. বলেন, গুনাহের পর চারটি কাজ গুনাহের চেয়েও মারাত্মক। যথা-
১. الإِسْتِصْغَارُ অর্থাৎ, গুনাহকে তুচ্ছ জ্ঞান করা।
২. وَالإِغْتِرَارُ অর্থাৎ, গুনাহ করে আত্মপ্রবঞ্চনায় ভোগা।
৩. وَالإِسْتِبْشَارُ অর্থাৎ, গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া।
৪. وَالْإِصْرَارُ অর্থাৎ, অবিরাম গুনাহ করতে থাকা।

**গুনাহের ক্ষতিসমূহ**

ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, নিম্নোক্ত আয়াত যেন কাউকে বিভ্রান্ত না করে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزِي إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
অর্থ: যে ব্যক্তি একটি নেক আমল নিয়ে আসবে সে তার দশগুন প্রতিদান পাবে, আর যে ব্যক্তি একটি গুনাহ করবে তাকে তার সমপরিমাণ প্রতিদানই দেওয়া হবে। তাদের সাথে কোনো প্রকার অবিচার করা হবে না।
কারণ, একটি নেকি করলে তার দশগুন প্রতিদান পাওয়া যাবে এমন বলা হয়নি। বরং শর্তযুক্ত করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন একটি নেকি নিয়ে হাজির হতে পারবে সে একটি নেকির সওয়াব দশগুন পাবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন নেকি নিয়ে হাজির হওয়া অনেক কঠিন। আর একটি গুনাহের শাস্তি তার অনুরূপ হবে ঠিক। কিন্তু তাদের আরো দশটি মন্দ দিক আছে। যথা-
১. বান্দার গুনাহ তার রবকে ক্রুদ্ধ করে, অথচ রব যে কারো সাথে যে কোনো ধরনের আচরণ করতে সক্ষম।
২. বান্দার গুনাহ তার রবের সবচেয়ে বড় শত্রু ইবলীসকে খুশি করে।
৩. গুনাহ বান্দাকে সবচেয়ে উত্তম স্থান জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৪. গুনাহ মানুষকে নিকৃষ্টতম স্থান জাহান্নামের নিকটবর্তী করে দেয়।
৫. গুনাহ করে মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয়জন অর্থাৎ, নিজের আত্মার সাথে দুর্ব্যবহার করে।
৬. গুনাহের ফলে মানুষের নফস অপবিত্র হয়ে যায়, অথচ আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে প্রবিত্র করে সৃষ্টি করেছেন।
৭. গুনাহ করে মানুষ তার সাথে থাকা হেফাজতকারী ফেরেশতাদেরকে কষ্ট দেয়।
৮. গুনাহ করে রাসূল -এর পবিত্র আত্মাকে কষ্ট দেয়।
৯. গুনাহ করে মানুষ রাত-দিনকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী বানায় এবং তাদেরকে কষ্ট দেয়।
১০. গুনাহ করে বান্দা সমস্ত মানুষ এবং অন্যান্য সৃষ্টির সাথে বিশ্বাসঘাতক্তা করে।
মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এভাবে হয় যে, গুনাহের কারণে তার সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। এতে অনেকের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। আর বিশেষ করে অন্যান্য সৃষ্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকাতা এভাবে যে, গুনাহ করলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়, দেশে খড়া দেখা দেয়, এতে সকল সৃষ্টিই কষ্ট পায়।
বলা হয়, সবচেয়ে বড় কৃপণ সে ব্যক্তি, যে নিজের সাথে কৃপণতা করে। অথচ তাতে তার সৌভাগ্য নিহিত। আর সবচেয়ে বড় জালেম সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর নাফরমানী করে নিজের উপর জুলুম করে। কারণ, আল্লাহর নাফরমানি করা মানে নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা।
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, সাবধান! গুনাহ থেকে বেঁচে থাক। কারণ, গুনাহ খুবই অমঙ্গলজনক, যা কামানের গোলার মতো ছুটে এসে আনুগত্যের দেয়ালে আঘাত করে। ফলে প্রবৃত্তির চাহিদার বাতাসের ঝাপটা ভেতরে প্রবেশ করে এবং মারেফাতের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়।

টিকাঃ
৯৪ সূরা আন আম ১৬০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00