📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 তাওবার তারগিব এবং প্রাপ্তি

📄 তাওবার তারগিব এবং প্রাপ্তি


عَنِ الْفُضَيْلِ، قَالَ: يَقُولُ اللهُ تَعَالَى لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: أَطَعْتَنِي؟ فَيَقُولُ: لَا. فَيَقُولُ: فَإِذَا لَمْ تُطِعْنِي فَلِمَ لَمْ تَسْأَلْنِي كَمَا سَأَلَكَ الْعَاصُونَ أَنْ أَغْفِرَ لَكَ؟.

হযরত ফুযাইল রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বান্দাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি আমার আনুগত্য করেছিলে? সে বলবে, না। তিনি বলবেন, তাহলে তুমি গুনাহগারদের মতো আমার নিকট ক্ষমা চাওনি কেন? ১৫৯

عَنِ الضَّحَّاكِ، قَالَ: مَا مِنْ أَحَدٍ يَدْخُلُ الْقَبْرَ إِلَّا أُتِيَ بِعَمَلِهِ، فَإِنْ كَانَ عَمَلُهُ صَالِحًا، قِيلَ: أَنَا عَمَلُكَ الصَّالِحُ، كُنْتُ وَاللَّهِ سَرِيعًا فِي طَاعَةِ اللهِ، بَطِيئًا عَنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ، فَجَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا. ثُمَّ يُفْتَحُ لَهُ بَابٌ مِنَ الْجَنَّةِ فَيَدْخُلُ إِلَيْهِ مِنْ رَوْحِهَا، وَنَعِيمِهَا، وَيُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ مَدَّ بَصَرِهِ، وَإِنْ كَانَ عَمَلَهُ غَيْرَ صَالِحٍ، قَالَ: أَنَا عَمَلُكَ السَّيِّئُ، كُنْتَ وَاللَّهِ بَطِيئًا عَنْ طَاعَةِ اللَّهِ سَرِيعًا فِي مَعْصِيَةِ اللهِ فَجَزَاكَ اللهُ شَرًّا، ثُمَّ يُفْتَحُ لَهُ بَابٌ إِلَى النَّارِ، فَيَدْخُلُ عَلَيْهِ مِنْ حَرِّهَا، وَسَمُومِهَا، وَيَضِيقُ عَلَيْهِ قَبْرُهُ حَتَّى تَخْتَلِفَ فِيهِ أَضْلَاعُهُ.

যাহ্হাক রহ. বলেন, কবরে প্রত্যেকের আমলকে উপস্থিত করা হবে। আমল যদি নেক হয়, তাহলে তা বলবে, আমি তোমার নেক আমল। আল্লাহর কসম! তুমি আল্লাহর আনুগত্যে খুবই অগ্রগামী ছিলে আর নাফরমানিতে খুবই পিছিয়ে ছিলে। আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। অতঃপর তার জন্য জান্নাতের একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে, সেখান থেকে তার নিকট জান্নাতের সুবাতাস ও নিয়ামত আসতে থাকবে। তার কবর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হবে। আর যদি তার আমল ভালো না হয়, তাহলে তার বদ আমল এসে বলবে, আমি তোমার বদ আমল। আল্লাহর কসম! তুমি আল্লাহর আনুগত্যে খুবই অলস ছিলে এবং নাফরমানিতে খুবই অগ্রগামী ছিলে। আল্লাহ তোমাকে নিকৃষ্ট প্রতিদান দিন। অতঃপর তার জন্য জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। সেখান থেকে জাহান্নামের উত্তাপ ও দুর্গন্ধ তার কবরে আসতে থাকবে। আর তার কবরকে এমনভাবে সংকুচিত করা হবে যে, তার এক পাশের পাঁজর অন্য পাশে ঢুকে যাবে।১৬০

ٹکا:
১৫৯. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৮/৯৩।
১৬০. কানযুল উম্মাল: হাদীস-৪২৩৭২।

হযরত সাঈদ ইবনে আবূ বুরদা তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল ইরশাদ করেন, আমি দিনে একশত বার আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই এবং তাওবা করি।

অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেন— ‘ইয়া আইয়্যুহান নাসু তূবূ ইলাল্লা-হি ফাইন্নী আতূবু ইলাইহি ফিল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাতি মিআতা মাররাতিন’ অর্থ: হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর। আমি দিনে একশত বার আল্লাহর নিকট তাওবা করে থাকি।

স্বয়ং রাসূল যার আদ্যপান্ত সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, তিনিই যখন দৈনিক একশত বার আল্লাহর নিকট তাওবা করতেন, তাহলে যাদের মাফ হওয়ার কথা জানা নেই তাদের তো সর্বক্ষণ আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত। কুরআনে এসেছে— ‘বাল ইউরীদুল ইনসা-নু লিয়াফজুরা আমা-মাহু’ অর্থ: বরং মানুষ তার সামনেও গুনাহ করতে চায়। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, মানুষ অবিরাম পাপে লিপ্ত থাকে এবং তাওবায় বিলম্ব করে। আর মনে মনে বলে, আমি তাওবা করে নিব। এভাবে এক সময় তার মৃত্যু এসে যায়। কিন্তু গুনাহ নিয়েই মৃত্যু বরণ করে।

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত— রাসূল ইরশাদ করেন, মুছাওয়িফদের ধ্বংস অনিবার্য। মুসাওয়িফ হলো তারা যারা সর্বদা বলে, আজ নয়, কাল তাওবা করবো। এভাবে করতে করতে তার মৃত্যু হয়ে যায় কিন্তু তাওবার সুযোগ হয় না।

তাই সবার উচিত প্রতিমুহূর্তে আল্লাহর নিকট তাওবা করা, যাতে তাওবার অবস্থায় মৃত্যু হয়। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাওবা কবুল করে থাকেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়াহুওয়াল্লাযী ইয়াক্ববালুত তাওবাতা আন ইবা-দিহী ওয়া ইয়া’ফূ আনিস সাইয়িআ-তি ওয়া ইয়া’লামু মা তাফআলূন’ অর্থ: তিনি সে সত্তা যিনি তার বান্দাদের কাছ থেকে তাওবা কবুল করে থাকেন এবং ক্ষমা করে দেন এবং তোমরা যা কর জানেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি তিন বার নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করবে সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ তার গুনাহ হলেও আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করে দিবেন। দুআটি হলো— ‘আসতাগফিরুল্লা-হাল আযীমাল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়্যূমু ওয়া আতূবু ইলাইহি’ অর্থ: আমি মহান আল্লাহর নিকট, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং যিনি চিরঞ্জীব ও চিরপ্রতিষ্ঠিত, ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তার নিকট তাওবা করছি।

হযরত আবূ কিলাবা রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা ইবলীসকে অভিশাপ দিয়ে বের করে দেওয়ার সময় সে অবকাশ চাইল। আল্লাহ তাকে অবকাশ দিলে বলল, আপনার ইজ্জতের কসম! আমি আপনার বান্দার বুক থেকে বের হব না যতক্ষণ না তার প্রাণ বের হবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করলেন, আমিও তার রূহ বের হওয়ার আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা বন্ধ করব না।

বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের দিকে লক্ষ্য করুন! আল্লাহ তার বান্দার প্রতি কী পরিমাণ দয়ালু, গুনাহ করার পরও তিনি তাদের মুমিন বলে ডেকেছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে— ‘ওয়াতূবূ ইলাল্লা-হি জামীআন আইয়্যুহাল মু’মিনূনা লাআল্লাকুম তুফলিহুন’ অর্থ: হে মুমিনগণ তোমরা সকলে আল্লাহর নিকট তাওবা কর, হতে পারে তোমরা সফল কাম হবে। অনুরূপ তাওবা করার পর তিনি তাদেরকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন। যেমন কুরআনে এসেছে— ‘ইন্নাল্লা-হা ইউহিব্বুত তাউওয়া-বীনা ওয়া ইউহিব্বুল মুতাত্বোহহিরীন’ অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রদেরকে পছন্দ করেন।

টিকাঃ
২৪০. সহীহ মুসলিম: হাদীস- ২৭০২; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-১৫১৫।
২৪১. প্রাগুক্ত।
২৪২. সূরা কিয়ামা: আয়াত-৫
২৪৩. হাদীসের সনদে জুয়াইবির নামক একজন পরিত্যক্ত রাবি থাকায় হাদীসটি অত্যন্ত জয়ীফ বলে প্রতীয়মান হয়।
২৪৪. সূরা শুরা: আয়াত-২৫
২৪৫. সহীহ হাদীসে এসেছে, যে এই দুয়াটি পড়বে তাকে ক্ষমা করা হবে যদিও সে জিহাদের ময়দান থেকে পলায়নকারী হয়। সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৩৫৭৭; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-১৫১৭।
২৪৬. সূরা আন নুর: আয়াত-৩১
২৪৭. সূরা বাকারা: আয়াত-২২২

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 নেককর্ম গুনাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়

📄 নেককর্ম গুনাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়


عَنْ أَبِي أُمَامَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : إِنَّ صَاحِبَ الشِّمَالِ لَيَرْفَعُ الْقَلَمَ عَنِ الْمُسْلِمِ سِتَّ سَاعَاتٍ، فَإِنْ هُوَ نَدِمَ وَاسْتَغْفَرَ اللَّهَ مِنْهَا أَلْقَاهَا وَإِلَّا كُتِبَتْ وَاحِدَةً.
হযরত আবূ উমামা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, বাম কাঁধের ফেরেশতা মুসলমানের গুনাহ লেখার জন্য ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। যদি সে এর মধ্যে অনুতপ্ত হয়ে ইস্তিগফার করে, তাহলে তা লেখা হয় না। অন্যথায় একটি গুনাহ লেখা হয়।১৬১

عَنْ أَبِي ذَرِّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ.

হযরত আবূ যর রাযি. বলেন, রাসূল ﷺ আমাকে বলেছেন, যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে নেক আমল কর। কারণ, তা গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। আর মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার কর।১৬২

টিকাঃ
১৬১. আল-মুজামুল কাবীর লিত্ ত্ববারানী: হাদীস-৭৬৬৭; শুআবুল ঈমান: হাদীস-৬৬৫০; হাদীসটি হাসান।
১৬২. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-১৯৮৭; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২১৩৮৭; ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ : الْبِرُّ لَا يَبْلَى، وَالْإِثْمُ لَا يُنْسَى، وَالدَّيَّانُ لَا يَفْنَى، وَكُنْ كَمَا شِئْتَ.

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, নেক আমল কখনো পুরোনো হবে না। পাপকাজ কখনো ভুলানো হয় না এবং কর্মের বিনিময় দানকারী কখনো মৃত্যুবরণ করে না। তুমি যেমন চাও তেমন হও। অর্থাৎ, তুমি যেমন করবে তেমনই ফল পাবে। ভালো কাজ করলে ভালো ফল এবং মন্দ করলে মন্দফল।
যেমন আল্লাহ ইরশাদ করেন-
إِنْ أَحْسَنْتُمْ أَحْسَنْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ وَإِنْ أَسَأْتُمْ فَلَهَا
অর্থ: যদি তোমরা ভালো কাজ কর তাহলে তা নিজেদের জন্যই করবে, আর যদি মন্দকাজ কর তাহলেও তা নিজেদের জন্যই।
অর্থাৎ, আল্লাহ তা'আলা কারো উপর অবিচার করেন না। কেউ নেক কাজ করলে তার একটি নেকিও কমিয়ে দেন না এবং কাউকে বিনা অপরাধে শাস্তি দেন না।
তিনি স্পষ্টভাবে তার পথ বর্ণনা করে দিয়েছেন, তা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিটি জাতির কাছে নবী পাঠিয়েছেন। তারা জান্নাত ও জাহান্নামের পথ বাতলে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৯১. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: হাদীস-২০২৬২; হাদীসটি মুরসাল সহীহ [ফাতহুল বারী: ১৩/৪৬৬]
৯২. সূরা ইসরা: আয়াত-৭

রাসূল থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন— ‘আত্তাইবু মিনায যাম্বি কামান লা যাম্বা লাহূ’ গুনাহ থেকে তাওবাকারী এমন যার কোনো গুনাহ নেই।

হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত— একদা এক ব্যক্তি এসে তাকে বলল, আমি গুনাহ করেছি। তিনি বললেন, আল্লাহর নিকট তাওবা কর এবং পুনরায় তা করবে না বলে প্রতিজ্ঞা কর। সে বলল, আমি তাওবা করেছি, কিন্তু পুনরায় তা করেছি। তিনি বললেন, আবার তাওবা কর এবং পুনরায় আর সে কাজ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা কর। সে বলল, আমি তাওবা করেছি এবং পুনরায় তা করেছি। তিনি বললেন, আবার তাওবা কর এবং আর কখনো তা করবে না বলে প্রতিজ্ঞা কর। সে বলল, এভাবে কতক্ষণ চলতে থাকবে? তিনি বললেন, শয়তান যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়ে যায়।

‘ইন্নামাত তাওবাতু আলাল্লা-হি লিল্লাযীনা ইয়া’মালূনাস সূআ বিজাহা-লাতিন’ অর্থ: তাওবা তাদের জন্য, যারা অজ্ঞাতসারে মন্দ কাজ করে। আয়াতে অজ্ঞতা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ইচ্ছাকৃত গুনাহ করা। ‘ছুম্ম ইউতূবূনা মিন ক্বারীবিন ফাউলা-ইকা ইয়াতূবুল্লা-হু আলাইহিম ওকায়ানাল্লা-হু আলীমান হাকীমা’ অতঃপর নিকটবর্তী সময়ে তাওবা করে, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, নিকটবর্তী সময় মানে মৃত্যু। অর্থাৎ, মৃত্যুর পূর্বেই তাওবা করে।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তি যদি গুনাহ করে অতঃপর বলে, হে আল্লাহ আমি গুনাহ করেছি! তখন আল্লাহ বলেন, আমার এক বান্দা গুনাহ করেছে এবং তার বিশ্বাস তার এমন এক রব রয়েছে, যিনি গুনাহ ক্ষমা করে দেন এবং গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন। সুতরাং আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম।

এটা নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর কারামত ও মোজেযা। কারণ, বিগত উম্মতদের ক্ষেত্রে এমন বিধান ছিল যে, যখন তারা কোনো গুনাহ করত তখন তাদের উপর একটি হালাল বস্তু হারাম হয়ে যেত এবং তাদের কেউ গুনাহ করলে তার দেহের কোথাও বা তার ঘরের দরজায় লেখা উঠতো, অমুকের ছেলে অমুক গুনাহ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এই উম্মতের জন্য তাওবার বিধান দিয়ে এসব সহজ করে দিয়েছেন।

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ওয়ামাইঁ ইয়া’মাল সূআন আও ইয়াযলিম নাফসাহূ ছুম্মা ইয়াস্তাগফিরিল্লা-হা ইয়াজিদিলা-হা গাফূরার রহীমা’ অর্থ: যে ব্যক্তি গুনাহ করবে কিংবা নিজের উপর অবিচার করবে অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে, সে আল্লাহ কে ক্ষমাশীল এবং দয়ালু পাবে।

তাই প্রত্যেক মুসলমানের কতর্ব্য হলো, সকাল সন্ধ্যায় আল্লাহর কাছে তাওবা করা। হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন, যে ব্যক্তি সকাল সন্ধ্যা তাওবা ছাড়া পার করবে, সে জালিমের অন্তর্ভুক্ত হবে। মূলতঃ প্রতিটি ব্যক্তির উচিত সর্বক্ষণ আল্লাহর নিকট তাওবা করা এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামায যথাযথভাবে আদায় করা। কারণ, পাঁচ ওয়াক্ত নামায মানুষকে কবীরা গুনাহ ছাড়া যাবতীয় গুনাহ থেকে পবিত্র করে দেয়।

হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত— একদা এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বাগানে এক নারীকে একাকী পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরি, চুমো খাই। মোটকথা সহবাস ছাড়া বাকি সব কিছুই করি। রাসূল ঘটনা শুনে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। অতঃপর এই আয়াতটি নাযিল হলো— ‘ওয়া আক্বিমিস সালা-তা ত্বরাফায়িন নাহা-রি ওয়া যুলাফাম মিনাল লাইলি’ অর্থ: তুমি সালাত কায়েম কর দিনের দুই প্রান্তে। অর্থাৎ, ফজর, যোহর ও আসর। আর রাতের এক প্রান্তে। অর্থাৎ, মাগরিব ও এশা। ‘ইন্নাল হাসানা-তি ইউযহিবনাস সাইয়িআ-তি যা-লিকা যিক্রা-লিয্যা-কিরীন’ অর্থ: সৎকর্ম অবশ্যই অসৎকর্ম মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, এটি তাদের জন্য উপদেশ। অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াক্ত নামায মধ্যবর্তী পাপসমূহ মিটিয়ে দেয়। তবে এর দ্বারা কবিরা গুনাহ মাফ হয় না।

তখন রাসূল তাকে ডেকে এই আয়াত টি পাঠ করে শুনালেন। হযরত উমর রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। এই বিধান কি তার জন্য খাস? নাকি সকলের জন্য? রাসূল ইরশাদ করলেন, বরং সকলের জন্য।

হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, প্রতিটি বান্দার জন্য দুই জন করে ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে, যারা তার আমলসমূহ লিখতে থাকে। ডান কাঁধের ফেরেশতা বাম কাঁধের ফেরেশতার উপর খবরদারী করে থাকেন। বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে তখন বাম কাঁধের ফেরেশতা জিজ্ঞেস করে, আমি কি এটা লিখব? ডান কাঁধের ফেরেশতা বলে, না, পাঁচটি গুনাহ করা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। এরপর পাঁচটি গুনাহ করে ফেললে, বাম কাঁধের ফেরেশতা বলে, এখন লিখব কি? ডান কাঁধের ফেরেশতা বলে, না, দেখ সে কোনো ভালো কাজ করে কি না। এর মধ্যে একটি নেক আমল করে ফেললে ডান কাঁধের ফেরেশতা বলে, আমাদের বলা হয়েছে যে, একাট নেক আমলের বিনিময় দশ গুণ পর্যন্ত। সুতরাং এসো, আমরা পাঁচটি নেকীর পরিবর্তে পাঁচটি গুনাহ মাফ করে দেই। এরপরো তার পাঁচটি নেকী রয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে শয়তান হতাশ হয়ে বলবে, আমি আদম সন্তানকে কখনো পাকড়াও করতে পারলাম না।

টিকাঃ
২৪৮. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৫০; সনাদ সহীহ ও হাসান।
২৪৯. সূরা নিসা: আয়াত-১৭
২৫০. সূরা নিসা: আয়াত-১৭
২৫১. সহীহুল বুখারী: হাদীস-৭৫০৭; সহীহ মুসিলম: হাদীস- ২৭৫৮।
২৫২. সূরা নিসা: আয়াত-১১০
২৫৩. সূরা হুদ: আয়াত-১১৪
২৫৪. সূরা হুদ: আয়াত-১১৪
২৫৫. সহীহুল বুখারী: হাদীস-৪৬৮৭; সহীহ মুসলিম হাদীস-২৭৬৩; সুনানে আবূ দাউদ হাদীস- ৪৪৬৮; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৩১১২।
২৫৬. হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আমরা জানতে পারিনি। তবে এটি হাসান বসরীর মুরসাল হওয়াই অত্যন্ত জয়ীফ বলেই প্রতীয়মান হয়।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 জনৈকা নারীর তাওবার ঘটনা

📄 জনৈকা নারীর তাওবার ঘটনা


عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ امْرَأَةً بَغِيًّا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مَرَّتْ بِعَابِدٍ لَهُمْ فَأَعْجَبَهَا، فَعَرَضَتْ لَهُ نَفْسَهَا، فَأَبَى، فَدَخَلَتْ عَلَيْهِ الدَّارَ فَدَعَتْهُ فَقَالَ: لَهَا: اخْرُجِي فَأَبَتْ أَنْ تَخْرُجَ، فَنَادَاهَا يَا فُلَانَةُ إِنَّ الْمَلِكَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَسْتَخْرِجَ صَيْدًا، أَرْسَلَ كَلْبًا، ثُمَّ يَتْبَعُهُ بِنَفْسِهِ، فَأَخَافُ أَنْ تَكُونِي أَنْتِ كَلْبَ الْمَلِكِ، وَيَطْلُبُنِي الْمَلِكُ، فَخَرَجَتِ الْمَرْأَةُ، وَقَدْ تَنَبَّهَتْ، فَجَعَلَتْ تَعْبُدُ اللَّهَ تَعَالَى وَصَامَتْ، وَقَامَتْ، ثُمَّ دَعَتْ عَلَيْهِ فَقَالَتِ: اللَّهُمَّ كَمَا أَخَفْتَنِي وَرَوَّعْتَنِي فَأَخِفْهُ وَرَوِّعْهُ. قَالَ فَنَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ عَلَى نَبِيٍّ ذَلِكَ الزَّمَانِ، فَأَخْبَرَهُ بِأَنَّهُ اسْتُجِيبَ لَهَا، وَأَنَّهَا مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، وَأَنَّ الْعَابِدَ قَدْ أَفْزَعَ قَلْبًا لَجَأَ إِلَيْهِ، فَمَا كَانَ لَهُ أَنْ يُخِيفَهُ بَلْ كَانَ يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَشْغَلَهُ بِالرِّفْقِ وَاللُّطْفِ، وَإِخْبَارِهِ بِسَعَةِ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى، فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَى ذَلِكَ النَّبِيِّ: أَخْبِرْهُ بِأَنِّي قَدْ أَزَلْتُ اسْمَهُ مِنْ دِيوَانِ الْعَابِدِينَ، وَأَنِّي لَا أُعِيدُهُ إِلَيْهِ إِلَّا بِشَفَاعَتِهَا فِيهِ.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। বনী ইসরাঈলের এক ব্যভিচারিণী নারী এক আবেদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। আবেদের প্রতি তার আকর্ষণ জন্মালে সে তাকে নিজের প্রতি আহ্বান করল। আবেদ অস্বীকৃতি জানালে সে তার ঘরে ঢুকে গেল এবং তাকে আবার আহ্বান করল। আবেদ বলল, তুমি বের হয়ে যাও। সে বলল, আমি বের হব না। তখন আবেদ বললেন, শোন, রাজা যখন শিকার করতে চান, তখন তিনি কুকুর প্রেরণ করেন এবং তার পিছু পিছু নিজেও আসেন। আমার ভয় হচ্ছে, তুমি রাজার কুকুর হবে, আর রাজা আমার পিছু নিবেন। এ কথা শুনে মহিলা সচকিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল এবং ইবাদতে মগ্ন হলো। একদিন সে ঐ আবেদের জন্য বদ-দোয়া করে বলল, হে আল্লাহ! সে আমাকে যেমন ভয় দেখিয়েছে, তেমনি আপনিও তাকে ভয় দেখান। তখন জিবরাঈল আ. সে যুগের নবীর নিকট এসে বললেন, ঐ মহিলার দোয়া কবুল করা হয়েছে। সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কারণ, ঐ আবেদ এমন এক অন্তরকে ভয় দেখিয়েছে যে অন্তর তার আশ্রয় চেয়েছিল। তার জন্য উচিত ছিল তাকে ভয় না দেখিয়ে আল্লাহর রহমতের কথা বলে তাকে উৎসাহিত করা। তখন সে যুগের নবীর নিকট ওহী আসল, তাকে জানিয়ে দিন, আমি আবেদদের খাতা থেকে তার নাম কেটে দিয়েছি। আর সে মহিলার সুপারিশ ছাড়া তার নাম আর সে খাতায় উঠবে না।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ كَمَثَلِ رَجُلٍ أَوْقَدَ نَارًا، فَجَاءَ الْفِرَاشِ يَتَهَافَتْنَ فِيهَا، فَأَنَا أَمْنَعُكُمْ مِنْ أَنْ تَقَعُوا فِي النَّارِ، يَعْنِي أَنْهَاكُمْ عَنِ الذُّنُوبِ وَالْعِصْيَانِ، فَإِنَّ الذُّنُوبَ تُلْقِي صَاحِبَهَا فِي النَّارِ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন, আমার এবং তোমাদের দৃষ্টান্ত হলো, সে ব্যক্তির ন্যায়, যে আগুন জ্বালায়। ফলে পঙ্গপাল এসে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। আর সে হাত দিয়ে সেগুলো তাড়িয়ে দিতে থাকে। আমি তেমনি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে পড়া থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করি। অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে নাফরমানী ও গুনাহ হতে নিষেধ করি। আর গুনাহই তো মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে।

**হযরত আদম আ.-এর তাওবা**

বলা হয়, পাঁচটি কারণে হযরত আদম আ.-এর তাওবা কবুল করা হয়েছে। আর পাঁচ কারণে ইবলিসের তাওবা কবুল করা হয়নি।

আদম আ.-এর তাওবা কবুল করার পাঁচ কারণ হলো-
১. أَقَرَّ عَلَى نَفْسِهِ بِالذَّنْبِ অর্থাৎ, তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
২. وَنَدِمَ عَلَيْهِ অর্থাৎ, তার জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন।
৩. وَلَامَ نَفْسَهُ অর্থাৎ, নিজেই নিজের সমালোচনা করেছেন।
৪. وَأَسْرَعَ بِالتَّوْبَةِ অর্থাৎ, দ্রুত তাওবা করেছেন।
৫. وَلَمْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি।

ইবলিসের তাওবা কবুল না হওয়ার পাঁচ কারণ হলো-
১. لَمْ يُقِرَّ عَلَى نَفْسِهِ অর্থাৎ, ইবলীস নিজের অপরাধ স্বীকার করেনি।
২. وَلَمْ يَنْدَمُ عَلَيْهِ অর্থাৎ, গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়নি।
৩. وَلَمْ يَكُمْ نَفْسَهُ অর্থাৎ, নিজেকে তিরস্কার করেনি।
৪. وَلَمْ يُسْرِعُ فِي التَّوْبَةِ অর্থাৎ, তাওবা করেনি।
৫. وَقَنَطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى অর্থাৎ, সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়েছে।

সুতরাং যার অবস্থা আদম আ.-এর অবস্থার মত হবে তার তাওবা কবুল হবে আর যার অবস্থা ইবলিসের মত হবে, তার তাওবা কবুল হবে না।

টিকাঃ
৯৩ সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৪৮৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২২৮৪।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে রাসূল-এর সাথে এশার নামায আদায় করে বের হলাম। পথিমধ্যে নেকাব পরিহিতা এক মহিলাকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। মহিলাটি বলল, আবূ হুরায়রা! আমার থেকে বিরাট গুনাহ হয়ে গেছে। আমি বললাম, তুমি কী গুনাহ করেছ? সে বলল, আমি যিনা করেছি। অতঃপর আমার জারজ সন্তান হলে তাকে হত্যা করেছি। আমি তাকে বললাম, তুমি ধ্বংস হয়েছ এবং অন্যকেও ধ্বংস করেছ। তোমার তাওবার কোনো সুযোগ নেই। একথা শুনে সে চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আমি সেখান থেকে চলে এলাম। পরে আমি চিন্তা করলাম, রাসূল জীবিত থাকতে আমি ফতওয়া দেবার কে? তাই সকাল হলে রাসূল-এর দরবারে গিয়ে পুরো ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। রাসূল বললেন, ইন্নাল্লিাহ! আবূ হুরায়রা, বরং তুমি নিজে ধ্বংস হয়েছ এবং অপরকে ধ্বংস করেছ। তোমার কি এই আয়াতটি মনে ছিল না— ‘ওয়াল্লাযীনা লা ইয়াদঊনা মা’আল্লা-হি ইলা-হান আ-খরা ওয়ালা ইয়াক্বতুলূনান নাফ্সাল্লাতী হাররামাল্লা-হু ইল্লা বিলহাক্কি ওয়ালা ইয়াযনূনা...’ অর্থ: এবং তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে স্থায়ী হবে হীন অবস্থায়। তারা নয়, যারা তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ তাদের গুনাহ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্যের দ্বারা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, তখন আমি রাসূল-এর দরবার থেকে বের হয়ে গেলাম। মদীনার অলিতে-গলিতে চিৎকার করে ঘোষণা করতে লাগলাম, গতরাতে যে মহিলা আমার কাছে অমুক বিষয়ে জানতে চেয়েছিল কে আমাকে সে নারীর কাছে নিয়ে যাবে? তাই দেখে শিশুরা বলতে লাগল, আবূ হুরায়রা পাগল হয়ে গেছে। এভাবে রাত হলে আমি উক্ত মহিলাকে আগের রাতের স্থানে পেয়ে গেলাম। তাকে রাসূল-এর সুসংবাদ বাণী শুনালাম যে, তার তাওবার সুযোগ আছে। এতে সে আনন্দিত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠল যে, আমার একটি বাগান রয়েছে, আমি সেটি আমার গুনাহের কাফফারা হিসাবে মিসকীনদের জন্য সদকা করে দিলাম। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ইল্লা মান তা-বা ওয়া আ-মানা ওয়া আমিলা আমালান স-লিহান ফাউলা-ইকা ইউবাদ্দিলুল্লা-হু সাইয়্যিআ-তিহিম হাসানা-তিন...’ অর্থ: তবে যারা তাওবা করবে এবং ঈমান আনবে এবং নেক আমল করবে আল্লাহ তাদের মন্দ আমলকে নেক আমলে বদলে দিবেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো তাফসীর বিশারদ বলেন, বান্দা যখন গুনাহের জন্য তাওবা করে, তখন তার বিগত দিনের গুনাহ নেক আমলে পরিণত হয়ে যায়।

হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকেও এরূপ বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষ তার আমলনামায় তাকালে শুরুর দিকে শুধু গুনাহ দেখতে পাবে। আর শেষের দিকে শুধু নেক আমল দেখতে পাবে। এরপর সে যখন পুনরায় শুরুর থেকে আমলনামা দেখবে, তখন দেখতে পাবে সব গুনাহ নেক আমলে পরিবর্তন হয়ে গেছে। হযরত আবু যর গিফারী রাযি. ও রাসূল-এর থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাদের গুনাহকে নেক আমল বানিয়ে দিবেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা এটাই। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এর অর্থ হলো, আল্লাহ তা'আলা তার মনকে পরিবর্তন করে দিবেন। ফলে সে গুনাহ কাজের পরিবর্তে নেক আমল করতে থাকবে।

হে ভাই! জেনে রাখো! কুফরীর চেয়ে বড় কোনো গুনাহ নেই। কুফুরী সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন— ‘ক্বুল লিল্লাযীনা কাফারূ ইঁ ইয়ানতাহূ ইউগফার লাহুম মা ক্বাফ সালাফ’ অর্থ: যারা কুফুরী করেছে তাদের বলুন, তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে তাদের বিগত সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত রাসূল বলেন, কেউ যদি গুনাহ করে আসমান-জমিন ভরেও ফেলে, অতঃপর আল্লাহর নিকট তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন।

হযরত ইয়াযীদ রুকাশী রহ. থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, একদিন রাসূল-এর মিম্বারে চড়ে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. খুৎবা দিলেন। খুৎবায় তিনি বললেন, আমি রাসূল-কে বলতে শুনেছি, আদম আ. আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তিনটি বিষয়ে তার নিকট কৈফিয়ত দিবেন। যথা—
১. হে আদম! যদি আমি মিথ্যাবাদীদেরকে অভিশাপ না দিতাম, মিথ্যাকে ঘৃণা না করতাম এবং এই ফায়সালা না হয়ে যেত যে, জাহান্নাম মানুষ ও জিন দ্বারা ভরে যাবে, তাহলে আজ তোমার বংশের সকলের প্রতিই আমি রহম করতাম।
২. যার সম্পর্কে আমি জানি যে, তাকে যদি পুনরায় দুনিয়াতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সে আবার গুনাহ করবে এবং তাওবা করবে না, এমন হতভাগা ব্যক্তি ছাড়া তোমার বংশের কাউকেই আমি জাহান্নামে প্রবেশ করাব না।
৩. হে আদম! আজ তোমাকে আমি আমার এবং তোমার সন্তানদের মাঝে বিচারক নির্ধারণ করলাম। যাও, পাল্লার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। তাদের আমলের পরিমাপ প্রক্রিয়া দেখ। যার নেকের পাল্লা বিন্দু পরিমাণ ভারী হয় সে জান্নাত পাবে, যাতে তুমি বুঝতে পার আমি জালেম ছাড়া কাউকে জাহান্নামে প্রবেশ করাই না。

টিকাঃ
২৫৭. সূরা ফুরকান: আয়াত-৬৮-৭০
২৫৮. হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আমরা অবগত হইনি।
২৫৯. সূরা ফুরকান: আয়াত-৭০
২৬০. সূরা আনফাল: আয়াত-৩৮
২৬১. সহীহুল জামে হাদীস-৫২৩৫; কাশফুল খফা: ২/১৯৯। আল্লামা আজলুনী ও শায়েখ নাসীর উদ্দীন আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
২৬২. হাদীসের সনদে ইয়াযীদ বুকাশী নামক জয়ীফ রাবি থাকায় হাদীসটি জয়ীফ।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আমলনামার প্রকার

📄 আমলনামার প্রকার


عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: الدَّوَاوِينُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى ثَلَاثَةُ: دِيوَانٌ لَا يَغْفِرُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ شَيْئًا، وَدِيوَانٌ لَا يَتْرُكُ اللَّهُ تَعَالَى مِنْهُ شَيْئًا، وَدِيوَانٌ لَا يَعْبَأُ اللَّهُ بِهِ شَيْئًا. فَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَغْفِرُ اللهُ مِنْهُ شَيْئًا فَالشِّرْكُ بِاللَّهِ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ} [النساء: ٤٨] وَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَتْرُكُ اللَّهُ مِنْهُ شَيْئًا فَظُلْمُ الْعِبَادِ بَعْضِهِمْ بَعْضًا، وَأَمَّا الدِّيوَانُ الَّذِي لَا يَعْبَأُ اللهُ تَعَالَى بِهِ شَيْئًا، فَظُلْمُ الْعَبْدِ نَفْسَهُ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ رَبِّهِ.

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাযি. বলেন, আল্লাহর নিকট আমলনামা তিন প্রকার। যথা-
১. এমন আমলনামা যা থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ক্ষমা করবেন না।
২. এমন আমলনামা যা থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না।
৩. এমন আমলনামা যার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কোনো পরোয়া করবেন না।

যে আমলনামা থেকে আল্লাহ কিছুই ক্ষমা করবেন না তা হলো, শিরক। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ
অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না। ১৬৩
আর যে আমলনামা থেকে আল্লাহ কিছুই ছাড় দিবেন না, তা হলো মানুষের একে অপরের প্রতি জুলুম করা।
আর যে আমলনামার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো পরোয়া করবেন না, তা হলো বান্দার নিজের উপর করা জুলুম, যা তার ও তার রবের মধ্যে সীমাবদ্ধ।১৬৪

টিকাঃ
১৬৩. সূরা নিসা: আয়াত-৪৮
১৬৪. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৬০৩২; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-৭৬৬৪; হাকেম ও যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ أَدْهَمَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى أَنَّهُ قَالَ : لَأَنْ أَدْخُلَ النَّارَ، وَقَدْ أَطَعْتُ اللَّهَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَدْخُلَ الْجَنَّةَ، وَقَدْ عَصَيْتُ اللهَ تَعَالَى. হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম রহ. বলেন, আল্লাহর আনুগত্য করে জাহান্নামে যাওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আল্লাহর নাফরমানী করে জান্নাতে যাওয়ার চেয়ে।

**এক গোলামের তাওবা**
عَنْ مَالِكِ بْنِ دِينَارٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ مَرَّ بِعُتْبَةَ الْغُلَامِ فِي بَرْدِ شَدِيدٍ، وَعَلَى عُتْبَةَ قَمِيصُ خَلِقُ، وَهُوَ قَائِمٌ يَتَفَكَّرُ وَهُوَ يَتَرَبَّحُ عَرَقًا، فَقَالَ لَهُ مَالِكَ: مَا الَّذِي أَوْقَفَكَ فِي هُذَا الْمَوْضِعِ قَالَ: يَا مُعَلِّمِي هُذَا مَوْضِعُ عَصَيْتُ اللهَ تَعَالَى فِيهِ، يَعْنِي أَنَّهُ كَانَ يَتَفَكَّرُ فِي ذَنْبِهِ، وَهُوَ يَسِيلُ مِنْهُ الْعَرَقُ حَيَاءٌ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى.

হযরত মালেক বিন দীনার রহ. থেকে বর্ণিত। একদা তিনি প্রচণ্ড শীতের মধ্যে উতবা নামের এক যুবককে দেখতে পেলেন। তার শরীরে ছিল, পুরোনো পোশাক। পথিমধ্যে সে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে। আর শীতের মধ্যেও তার শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছ? সে বলল, উস্তাদ! এই সে স্থান যেখানে আমি আল্লাহর নাফরমানী করেছিলাম। অর্থাৎ, যে স্থানে সে আল্লাহর নাফরমানী করেছে, সে স্থানে দাঁড়িয়েই তাওবা করছে এবং আল্লাহর ভয়ে তার দেহ থেকে প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও দরদর করে ঘাম ঝরছে।

**হযরত মাকহুল শামী রহ.-এর উক্তি**

হযরত মাকহুল শামী রহ. বলেন, প্রতিরাতে ঘুমানোর পূর্বে বিছানায় শুয়ে সারাদিনের কাজের হিসাব নেওয়া উচিত। যদি ভালো কাজ করে থাকে তাহলে আল্লাহর শুকর আদায় করবে। আর যদি কোনো গুনাহ করে থাকে তাহলে আল্লাহর নিকট তাওবা করবে। আর যে এরূপ করে না, সে ওই ব্যবসায়ীর মতো যে তার ব্যবসার কোনো হিসাব নিকাশ রাখে না। ফলে নিজের অজান্তে এক সময় দেউলিয়া হয়ে যায়।

হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত— রাসূল ইরশাদ করেন, মানুষের আমলনামা তিন প্রকার। যথা—
১. যা আল্লাহ তা'আলা সম্পূর্ণ মাফ করে দিবেন।
২. যা আল্লাহ সামান্যও মাফ করবেন না।
৩. যার থেকে আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না।
যেটা আল্লাহ তা'আলা মাফ করবেন না, সেটা হলো, শিরকের গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— ‘ইন্নাহূ মাইঁ ইউশ্রিক বিল্লা-হি ফাক্বাদ হাররামাল্লা-হু আলাইহিল জান্নাতা ওয়া মা’ওয়া-হুন্নারু’ অর্থ: নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সাথে শিরক করবে, আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। যেটা আল্লাহ তা'আলা মাফ করে দিবেন, সেটা হলো, বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার গুনাহ। যে গুনাহ আল্লাহ তা'আলা কিছুই ছাড় দিবেন না, সেটা হলো, বান্দাদের পরস্পর জুলুমের গুনাহ।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে অবশ্যই যার যার হক আদায় করে দিতে হবে। এমন কি শিংওয়ালা ছাগল যদি শিংবিহীন ছাগলের উপর অবিচার করে থাকে, তাহলে তাকেও শিং ওয়ালা ছাগলের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। তাই বান্দার উচিত প্রতিপক্ষ কে খুশি করা, যাতে কোনো মানুষ কিয়ামতের দিন তার বাদী না হয়। কারণ, যার সম্পর্কে আল্লাহ ও বান্দার সাথে তাওবা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেবেন। কারণ, আল্লাহ অনেক মেহেরবান ও ক্ষমাশীল। কিন্তু যে গুনাহের সম্পর্ক বান্দার সাথে হয় সে ক্ষেত্রে তাওবা কোনো কাজে আসবে না। বান্দা নিজে তা ক্ষমা না করলে আল্লাহ কোনোভাবেই তা ক্ষমা করবেন না। দুনিয়াতে তাকে সন্তুষ্ট না করতে পারলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার নেক আমল নিয়ে তাকে দিয়ে দিবেন।

টিকাঃ
২৬৩. মুসনাদে আহমাদ হাদীস-২৬০৭০; মুসতাদরাকে হাকেম হাদীস-৮৭১৭; শায়েখ আহমাদ শাকির ও জালালুদ্দীন সুযুতী প্রমুখ সনদটিকে সহীহ বলেছেন। তবে অনেক ইমাম সনদটিকে জয়ীফ বলেছেন।
২৬৪. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৫৮২。

ফন্ট সাইজ
15px
17px