📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 কখন ভয় উত্তম আর কখন আশা

📄 কখন ভয় উত্তম আর কখন আশা


ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, বান্দার জন্য সুস্থাবস্থায় আল্লাহর ভয় ও রহমতের আশা উভয়ই সমানভাবে রাখা উচিত। আর অসুস্থ অবস্থায় রহমতের আশা বেশি রাখা উচিত। কারণ, সুস্থাবস্থায় যদি সে আল্লাহর ভয় করে তাহলে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারবে। আর অসুস্থ অবস্থায় আল্লাহর রহমতের আশা করলে সে তাঁর প্রতি সুধারণা নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূল ﷺ বলেন- لَا يَمُوتَنَّ أَحَدُكُمْ إِلَّا وَهُوَ يُحْسِنُ بِاللَّهِ الظَّنَّ অর্থাৎ, আল্লাহর প্রতি সুধারণা ছাড়া যেন কেউ মৃত্যুবরণ না করে। ১২৫

عَنْ يَحْيَى بْنِ مُعَاذٍ الرَّازِيِّ رَحِمَهُ اللهُ، أَنَّهُ قَالَ: رَجَاءُ الْمُطِيعِينَ لِفَضْلِهِ أَكْثَرُ مِنْ رَجَائِهِمْ لِعَمَلِهِمْ، وَرَجَاءُ الْمُذْنِبِينَ لِعَفْوِهِ أَكْثَرُ مِنْ خَوْفِهِمْ لِذُنُوبِهِمْ.

হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআয রাযী রহ. বলেন, নেককারগণ তাদের আমলের চেয়ে আল্লাহর রহমতের আশা বেশি করে। আর গুনাহগারগণ গুনাহের ভয়ের চেয়ে আল্লাহর ক্ষমার আশা বেশি করে।

ٹکا:
১২৫. সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮৭৭; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৩১১৩।

হযরত ফুযাইল ইবনে আয়ায রহ. বলতেন, মানুষ যতক্ষণ সুস্থ সবল থাকে ততক্ষণ তার জন্য ভয় উত্তম। যাতে সে বেশি বেশি ইবাদত করতে পারে এবং গুনাহাচার থেকে বেঁচে থাকতে পারে। আর মানুষ যখন অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ে তখন আশা তার জন্য উত্তম হয়ে ওঠে।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 পাপীদের জন্য সুসংবাদ আর নেককারদের জন্য সতর্কবাণী

📄 পাপীদের জন্য সুসংবাদ আর নেককারদের জন্য সতর্কবাণী


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: وَاللَّهِ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ مَا يَسُرُّنِي أَنِّي وَدِدْتُ أَنِّي لَمْ أُخْلَقْ، وَمَا لِيَ كَذَا وَكَذَا؟ قِيلَ: وَلِمَ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ، قَالَ: لِأَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ لِلَّهِ مِائَةَ رَحْمَةً ادَّخَرَ لِأَوْلِيَائِهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ رَحْمَةً، وَأَرْسَلَ إِلَى أَهْلِ الدُّنْيَا رَحْمَةً وَاحِدَةً، فَأَنَا أَرْجُو أَنْ أَنَالَ مِنْ تِلْكَ الرَّحْمَةِ، وَلَكِنْ إِذَا ذَكَرْتُ مَا فِي جَهَنَّمَ مِنَ الْحَمِيمِ وَالصَّدِيدِ وَالزَّقُومِ وَالْغِسْلِينِ، وَالضَّرِيعِ وَالنَّارِ، قُلْتُ: يَا لَيْتَنِي لَمْ أُخْلَقْ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, ওই সত্তার কসম যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আমার যদি এই পরিমাণ সম্পদ থাকত তাহলে আমি সৃষ্টি না হওয়াটাকেই পছন্দ করতাম না। জিজ্ঞেস করা হলো, কেন হে আবূ হুরায়রা? তিনি বললেন, কারণ, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, আল্লাহর একশটি রহমত রয়েছে। যার মধ্য থেকে নিরানব্বইটি তিনি তাঁর ওলীদের জন্য রেখে দিয়েছেন। আর একটি মাত্র রহমত দুনিয়াবাসীর জন্য পাঠিয়েছেন। আমি সে রহমত পাওয়ার আশা রাখি। কিন্তু যখন জাহান্নামের উত্তপ্ত পানি, দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ, যাক্কুম, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ ও আগুনের কথা স্মরণ করি তখন বলি, হায়! যদি আমি সৃষ্টি না হতাম!

قَالَ: وَقَالَ بَعْضُ الْحُكَمَاءِ : يَا ابْنَ آدَمَ إِنْ كُنْتَ لَا تُطِيقُ حَرَّ الشَّمْسِ، فَكَيْفَ تُطِيقُ حَرَّ النَّارِ، وَإِنْ كُنْتَ تَرْجُو رَحْمَةَ اللَّهِ، فَلِمَ لَا تُطِيعُهُ، وَإِنْ كُنْتَ تَخَافُ عَذَابَهُ فَلِمَ لَا تَنْتَهِي عَنْ مَعْصِيَتِهِ؟.

জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন, হে আদম সন্তান! যদি তুমি সূর্যের তাপ সহ্য করতে না পারো তাহলে কীভাবে জাহান্নামের আগুন সহ্য করবে? আর যদি তুমি আল্লাহর রহমত কামনা কর, তাহলে কেন তাঁর আনুগত্য কর না? আর যদি তুমি তাঁর আযাবকে ভয় কর, তাহলে কেন তাঁর নাফরমানী থেকে বিরত থাক না?

ফকীহ সমরকন্দী রহ. ইবনে আবূ রওয়াদ তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা তার নবী দাউদ আ.-এর কাছে এই মর্মে ওহী প্রেরণ করেন— অলি ইয়া দাউদু বাশশিরিল মুযনিবীনা ওয়া আনযিরিস সিদ্দীক্বীনা। ফাক্বালা: কাইফা উবাশশিরুল মুযনিবীনা ওয়া উনযিরুস সিদ্দীক্বীনা? ক্বালা: বাশশিরিল মুযনিবীনা বিআন্নী লা ইয়াতাআযযামুনী যামবুন আন আগফিরা, ওয়া আনযিরিস সিদ্দীক্বীনা আন লা ইউ'জাবূ বিআ'মালিহিম, ফাইন্নী লা আদয়াউ আদলী ওয়া হিসাবী আলা আহাদিন ইল্লা আহলাকতুহু।

অর্থ: হে দাউদ! তুমি গুনাহগারদেরকে সুসংবাদ দাও এবং সিদ্দীকদেরকে সতর্ক কর। আল্লাহর নবী দাউদ আ. আরজ করলেন, হে রব! গুনাহগারদের কী সুসংবাদ দিব আর সিদ্দীকদের কী ব্যাপারে সতর্ক করব? আল্লাহ ইরশাদ করলেন, গুনাহগারদের সুসংবাদ দাও যে, কোনো বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া আমার নিকট কোনো ব্যাপার নয়। আর সিদ্দীকদের সতর্ক কর, তারা যেন স্বীয় আমল নিয়ে অহংকার না করে। কারণ, আমি যদি কারো সাথে ন্যায়বিচার করি এবং তার প্রকৃত হিসাব নিই তাহলে তার ধ্বংস অনিবার্য।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 শাসকরা কখন প্রজাদের উপর অত্যাচারী হয়ে ওঠে

📄 শাসকরা কখন প্রজাদের উপর অত্যাচারী হয়ে ওঠে


عَنْ مَالِكِ بْنِ دِينَارٍ، قَالَ: قَرَأْتُ فِي الزَّبُورِ أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ: مَنْ عَصَانِي وَهُوَ يَعْرِفُنِي سَلَّطْتُ عَلَيْهِ مَنْ لَا يَعْرِفُنِي.

হযরত মালেক ইবনে দীনার রহ. বলেন, আমি যাবুর কিতাবে পড়েছি, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমাকে চেনার পর আমার নাফরমানী করবে আমি তার উপর এমন কাউকে চাপিয়ে দিব যে আমাকে চেনে না। ১২৬

ٹکا:
১২৬. কানযুল উম্মাল: হাদীস-৭৬৪২; জামিউল আহাদীস, সুয়ূতী: ২/১৫৫।

আবু রাওয়াদ জনৈক আহলে কিতাবী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি আল্লাহ রাজন্যবর্গের রাজা। আমার নিয়ন্ত্রণে বাদশাহদের অন্তর। কোনো জাতির প্রতি যখন আমি সন্তুষ্ট হই তখন আমি রাজাদের মন তাদের জন্য রহমত স্বরূপ বানিয়ে দেই। আর কোনো জাতির প্রতি যখন আমি রুষ্ট হই তখন তাদের মন তাদের জন্য গজব বানিয়ে দেই। সুতরাং রাজাদের অভিসম্পাতে মেতে উঠো না। বরং আমার নিকট তওবা কর। আমি তাদের মন তোমাদের জন্য কোমল করে দেব।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, কোন মুমিন যদি তা জানতে পারত যে, আল্লাহর নিকট কি পরিমাণ শাস্তি মজুদ আছে, তাহলে কখনো সে জান্নাতে প্রবেশের আশা পোষণ করতো না। আর কাফের যদি জানতে পারত আল্লাহর নিকট কি পরিমাণ রহমত রয়েছে, তাহলে সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতো না।

টিকাঃ
১৬৮. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৯৬৯; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৭৫৫।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 বৃদ্ধকে শাস্তি দিতে আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন

📄 বৃদ্ধকে শাস্তি দিতে আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন


عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَسْتَحْيِي مِنْ ذِي الشَّيْبَةِ الْمُسْلِمِ أَنْ يُعَذِّبَهُ، ثُمَّ بَكَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقِيلَ لَهُ: مَا يُبْكِيكَ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: أَبْكِي مِمَّنْ يَسْتَحْيِي اللَّهُ مِنْهُمْ، وَهُمْ لَا يَسْتَحْيُونَ مِنْهُ.

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা কোনো মুসলিম বৃদ্ধকে শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করেন। এ কথা বলে রাসূল ﷺ কাঁদলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, তাদের জন্য কাঁদছি, যাদেরকে আল্লাহ শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করেন কিন্তু তারা আল্লাহকে ভয় করে না।১২৭

ٹکا:
১২৭. আল-মুজামুল আওসাত: হাদীস-৫৬৭৬; আল-আহাদিসুল মুখতারা, জিয়াউদ্দীন মাকদিসী: হাদীস-২৭৪৪; আল্লামা হাইসামী বলেন, হাদীসটির সনদ জয়ীফ। [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১০/৩০২]।

হযরত আহমদ ইবনে সেহল থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নযোগে হযরত ইয়াহইয়া ইবনে আকসাম রহ. কে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার রব আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন? তিনি বলেন, তিনি আমাকে ডেকে বললেন, হে অনিষ্টের বুড়া! তুমি তো যা করার করেছ। অর্থাৎ, অনেক কুকর্ম করেছ। আমি বললাম, হে রব! আমাকে তো তোমার ব্যাপারে এমন হাদীস বলা হয়নি। আল্লাহ বললেন, আমার সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? আমি বললাম, আমার নিকট আব্দুর রাজ্জাক মামার থেকে, মামার যুহরী থেকে, যুহরী উরওয়া থেকে, উরওয়া আয়েশা থেকে, আয়েশা রাসূল থেকে, রাসূল জিবরাঈল থেকে, আর জিবরাঈল আপনার থেকে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি মুসলমান অবস্থায় বুড়ো হয় তাহলে আমি তাকে শাস্তি দিতে পারি না। আমি তাকে শাস্তি দিতে লজ্জা বোধ করি। আর আমি তো বুড়ো, আমাকে শাস্তি দিবেন? একথা শুনে আল্লাহ ইরশাদ করলেন, আব্দুর রাজ্জাক সত্য বলেছে, যুহরী সত্য বলেছেন, উরওয়া সত্য বলেছে, আয়েশা সত্য বলেছে, নবীও সত্য বলেছে, জিবরাঈলও সত্য বলেছে, আর আমি তো সত্যবাদীদের বড় সত্যবাদী। হে ইয়াহ্ইয়া! মুসলমান থাকা অবস্থায় কেউ যদি বুড়ো হয়, তাকে আমি শাস্তি দিতে পারি না। তাকে শাস্তি দিতে আমার লজ্জা হয়। হযরত ইয়াহ্ইয়া বলেন, তারপর আমার ডানপাশের ফেরেশতাদেরকে আদেশ করা হলো আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত— একদা তিনি নবী কারীম ﷺ-এর নিকট গিয়ে দেখলেন, তিনি কাঁদছেন। উমর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি ইরশাদ করলেন, জিবরাঈল আমার নিকট এসে বলল, আল্লাহ তা'আলা ইসলাম অবস্থায় বৃদ্ধ হওয়া ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করেন। কিন্তু সে বৃদ্ধই আল্লাহর নাফরমানী করতে লজ্জাবোধ করে না।

ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, সুতরাং বৃদ্ধদের উচিত আল্লাহ এবং কিরামান কাতিবীন (আমলনামা লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতা) কে লজ্জা করা এবং বেশি বেশি ইবাদত করা ও নাফরমানী থেকে বিরত থাকা। অনুরূপ যুবকদেরও উচিত ইবাদতে মগ্ন হওয়া, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। কারণ, কেউ জানে না তার মৃত্যু কখন এসে হানা দেয়। কেননা, যে যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে কাটাবে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে।

টিকাঃ
১৬৯. আল্লামা আজলুনী রহ. বলেন, ইমাম সুয়ূতী তার জামে কাবীরে ইবনে নাজ্জার থেকে জয়ীফ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (কাশফুল খাফা: ৭৪২ নং হাদীসের আলোচনা দ্রষ্টব্য)।
১৭০. সহীহ বর্ণনায় এসেছে, মুসলিম অবস্থায় যারা বৃদ্ধ হয় তারা যেন তাদের সাদা চুল উপড়ে না ফেলে। কেননা সাদা চুল কিয়ামত দিবসে তার জন্য নুর হবে। (সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৪২০২; মুসনাদে আহমাদ ১১/২৫৩)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px