📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আল্লাহর রহমতে জান্নাত লাভ

📄 আল্লাহর রহমতে জান্নাত লাভ


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ، قَالَ لَهَا: تَكَلَّمِي فَقَالَتْ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. فَقَالَتِ الْمَلَائِكَةُ: طُوبَى لَكَ مَنْزِلَ الْمُلُوكِ. فَقَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا يُجَاوِرُنِي فِيكَ بَخِيلٌ، وَلَا مُرَاءٍ وَلَا عَاقٌ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টি করে তাকে বললেন, কথা বল। জান্নাত বলল, মুমিনরা সফলকাম। ফেরেশতাগণ বললেন, তোমাকে সুসংবাদ, তুমি রাজাদের আবাসস্থল। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার ইজ্জত ও জালালের কসম! তোমার মধ্যে কৃপণ, রিয়াকারী ও পিতা-মাতার অবাধ্যরা প্রবেশ করতে পারবে না।১২১

টিকাঃ
১২১. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৬/২৯৬; আল-কামেল, ইবনে আদী: ৪/৪০৯; কানযুল উম্মাল: হাদীস-৪৪১৪৬। ইমাম দাইলামীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি জয়ীফ।

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আল আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত— নবী কারীম বলেন, আমার শাফায়াত (সুপারিশ) থাকবে কবীরা গুনাহে লিপ্তদের জন্য। যে তা অস্বীকার করবে সে তা লাভ করতে পারবে না। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, যে কবীরা গুনাহ করেনি তার তো শাফায়াতের প্রয়োজন হবে না। হযরত মালেক ইবনে আনাস থেকেও বর্ণিত। নবী কারীম বলেন, আমার শাফায়াত (সুপারিশ) থাকবে কবীরা গুনাহে লিপ্তদের জন্য। যে তা অস্বীকার করবে সে তা লাভ করতে পারবে না。

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত— একবার রাসূল আমাদের নিকট এসে বললেন, এইমাত্র আমার বন্ধু জিবরাঈল আ. এসেছিলেন, তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ! যে আল্লাহ তোমাকে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন সেই সত্ত্বার শপথ! আল্লাহর এক বান্দা পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচ শত বছর আল্লাহর ইবাদত করেছেন। পাহাড়টির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ছিল ত্রিশ বর্গ গজ। সেটার চতুর্দিক থেকে চার হাজার ফারসাখ দূরত্ব পরিমাণ সমুদ্র তাকে বেষ্টন করে রেখে ছিল। পাহাড়ের পাদদেশে আল্লাহ তার জন্য আঙ্গুলের মত সরু একটি মিষ্টি পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন এবং তার জন্য একটি আনার গাছের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যাতে প্রতিদিন একটি আনার ফলত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি পাহাড়ের পাদদেশে নেমে উযূ করতেন এবং আনারটি খেতেন তারপর নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। একদিন এইভাবে নামাযে দাঁড়িয়ে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, আল্লাহ যেন তাকে সেজদারত অবস্থায় মৃত্যু দান করেন। মাটি ও এ জাতীয় জিনিস যেন তার মৃতদেহ নষ্ট না করতে পারে এবং তিনি যেন তাকে এভাবে, সেজদারত অবস্থাতেই পুনরুত্থিত করেন। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করলেন। জিবরাঈল আ. বলেন, আমরা যখন আসমান থেকে জমিনে নামি বা জমিন থেকে আসমানে আরোহণ করি তখন তাকে তেমনই সেজদারত অবস্থায় দেখতে পাই।

তারপর জিবরাঈল আ. বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, কিয়ামতের দিন তাকে পুনরুত্থিত করে তার রবের সামনে হাজির করা হবে। রব তাকে বলবেন, আমার এই বান্দাকে আমার রহমতের দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করাও। সে বলবে, না, বরং আমার আমলের বিনিময়ে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। তখন আল্লাহ তার ফেরেশতাদেরকে আদেশ করে বলবেন, তার আমল এবং আমি তাকে যে সব নেয়ামত দান করেছি তার একটি হিসাব দাঁড় করাও। ফেরেশতারা হিসাব করলে দেখা যাবে যে, শুধু চোখের নেয়ামতের বিনিময় দিতেই তার পাঁচ শত বছরের ইবাদত ফুরিয়ে যায়। তখন আল্লাহ আদেশ করবেন, আমার বান্দাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। ফেরেশতারা তাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকবে। সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনার রহমতের মাধ্যমে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আল্লাহ বলবেন, তাকে ফিরিয়ে আনো। তাকে দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, হে বান্দা! অনস্তিত্ব থেকে কে তোমাকে অস্তিত্ব দান করেছিলো? সে বলবে, হে রব! আপনি। আল্লাহ বলবেন, সেটা কি ছিল তোমার আমলের কারণে নাকি আমার রহমতের মাধ্যমে? সে বলবে, আপনার রহমতের মাধ্যমে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, কে তোমাকে পাঁচ শত বছর আমার ইবাদত করার শক্তি দান করেছিল? সে বলবে, আপনি হে রব! আল্লাহ বলবেন, কে তোমাকে তরঙ্গায়িত সমুদ্রের মাঝখানে এক পাহাড়ে আশ্রয় দিয়েছিল এবং নোনা পানি থেকে মিঠা পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছিল? কে তোমার জন্য প্রতি রাতে একটি করে আনার উৎপন্ন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, অথচ এই ফল বছরে কেবল এক মৌসুমে ফলে? তুমি আমার কাছে প্রার্থনা করেছিলে, আমি যেন সেজদারত অবস্থায় তোমার রূহ কবজ করি, আমি তাই করেছি। কে করে ছিল তা? সে বলবে, আপনি, হে রব! আল্লাহ বলবেন, তাহলে শুনে রাখ এই সবই আমি করেছি আমার রহমতের মাধ্যমে এবং আমার রহমত দ্বারাই তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাচ্ছি। সুতরাং তোমরা আমার বান্দাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তুমি আমার কতইনা উত্তম বান্দা ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। জিবরাঈল আ. বলেন, সব কিছুই আল্লাহর রহমতের ফল。

টিকাঃ
১৬০. সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৪৭৩৯; সুনানে তিরমিযী হাদীস-২৪৩৬; মুসনাদে আহমদ ২০/৪৩৯। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব।
১৬১. সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৪৭৩৯; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৩৬; মুসনাদে আহমদ ২০/৪৩৯। ইমাম তিরমিযি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব। হাদীসের শেষ বাক্যটি "যে তা অস্বীকার করবে..." আমরা হাদিসের কিতাবে পাইনি।
১৬২. মুস্তাদরাকে হাকেম : খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৭৮; শুআবুল ঈমান : খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৫০।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 মৃত্যুর সময় ভয় ও আশা

📄 মৃত্যুর সময় ভয় ও আশা


عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ عَلَى شَابٍ وَهُوَ فِي الْمَوْتِ، فَقَالَ: كَيْفَ تَجِدُكَ؟ قَالَ: وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَرْجُو اللَّهَ وَإِنِّي أَخَافُ ذُنُوبِي، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدٍ فِي مِثْلِ هَذَا الْمَوْطِنِ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ مَا يَرْجُو وَآمَنَهُ مِمَّا يَخَافُ.

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ এক মুমূর্ষু যুবকের নিকট গেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন লাগছে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহর রহমতের আশা করছি এবং আমার গুনাহের কারণে ভয়ও পাচ্ছি। রাসূল ﷺ ইরশাদ করলেন, এমন মুহূর্তে যে ব্যক্তির অন্তরে এ দুটি জিনিস একত্রিত হবে আল্লাহ তাকে তার আশানুরূপ দান করবেন এবং তার ভয় থেকে তাকে নিরাপত্তা দিবেন।১২২

টিকাঃ
১২২. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৯৮৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৬১; হাদীসটি হাসান।

হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মৃত্যুর সময় কোনো ব্যক্তি যদি ভয় ও আশার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে আল্লাহ তাকে যে আশা করেছে তাই দান করবেন এবং যার আশঙ্কা করেছে তা দূর করে দিবেন。

টিকাঃ
১৬৩. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৯৮৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৬১। হাদীসটি হাসান।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 আল্লাহর রহমত ব্যতীত শুধু আমলের বিনিময়ে কেউ নাজাত পাবে না

📄 আল্লাহর রহমত ব্যতীত শুধু আমলের বিনিময়ে কেউ নাজাত পাবে না


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : لَا يُدْخِلُ أَحَدًا مِنْكُمُ الْجَنَّةَ عَمَلُهُ. قَالُوا: وَلَا أَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِيَ اللَّهُ بِرَحْمَتِهِ، وَلَكِنْ سَدِّدُوا وَقَارِبُوا.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, তোমাদের কাউকে তার আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেও না? তিনি বললেন, আমাকেও না। তবে আল্লাহ যদি আমাকে তাঁর রহমত দিয়ে আবৃত করে নেন, তাহলে ভিন্ন কথা। তবে তোমরা ঠিকঠাক আমল কর এবং মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। ১২৩

ٹکا:
১২৩. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৪৬৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮১৬।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তিই তার আমলের বিনিময়ে নাজাত পেতে পারবে না। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও না? রাসূল ইরশাদ করলেন, আমিও না, যদি না আল্লাহ আমাকে তার রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত করেন। সুতরাং তোমরা পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে যাও। সকাল সন্ধ্যা এবং অন্ধকার রাতের একাংশে ইবাদতে মগ্ন থাক। তাহলেই তোমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে。

হযরত আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত— রাসূল ইরশাদ করেন, তোমরা সহজতা অবলম্বন কর, কঠিন হয়ো না। সু-সংবাদ দাও, ভীতি প্রদর্শন কর না。

টিকাঃ
১৬৪. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৪৬৩; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮১৬।
১৬৫. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৯; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৭৩৪।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 ইবলিসেরও নাজাতের আশা জাগবে

📄 ইবলিসেরও নাজাতের আশা জাগবে


عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: يَرْحَمُ اللهُ الْخَلَائِقَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يَتَطَاوَلَ إِبْلِيسُ رَجَاءَ رَحْمَتِهِ، وَكَثْرَةِ الشُّفَعَاءِ.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের প্রতি এমন রহমত করবেন যে, ইবলিসও তাঁর রহমতের আশায় এবং শাফাআতকারীদের আধিক্য দেখে মাথা উঁচু করবে। ১২৪

ٹکا:
১২৪. আল-মুজামুল কাবীর লিত্ ত্ববারানী: হাদীস-৯৫৯৩; আল্লামা হাইসামী বলেছেন, সনদে একজন জয়ীফ রাবী রয়েছেন। [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১০/৩৭৫]

ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষের প্রতি এতো বেশি রহম করবেন যে, রহমতের আধিক্য দেখে এবং সুপারিশকারীদের সুপারিশের প্রবলতা দেখে শয়তান ইবলীসও আশায় মাথা তুলবে।"

অপর এক হাদীসে এসেছে, রাসূল ইরশাদ করেন— 'ইউনাদী মুনাদিন মিন তাহ্তিল আরশি ইয়াওমাল কিয়ামাতি ইয়া উম্মাতা মুহাম্মাদিন আম্মা মা কানা লী ক্বিবাল্লাকুম ফাক্বাদ ওয়াহাবতুহু লাকুম, ওয়া বাক্বিয়াতিত তাবিআতু, ফাতাওয়া হাবূহা ওয়াদখুলুল জান্নাতা বিরাহমাতী' অর্থ: কিয়ামতের দিন আরশের নিচ থেকে এক ঘোষক ঘোষণা করে বলবে হে মুহাম্মদের উম্মত! তোমাদেরকে দেওয়া আমার প্রতিশ্রুতি আমি পূর্ণ করেছি। তারপর কিছু অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তা তোমরা নিজেরা পরস্পর বণ্টন করে নাও এবং আমার রহমতের দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ কর।

টিকাঃ
১৬৬. আল-মু'জামুল কাবীর, তাবারানী, হাদীস-১০৫১৩। হাদীসটির সনদ যঈফ। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস-১৮৫৩৫)
১৬৭. দাইলামী, মুসনাদুল ফিরদাউস: হাদীস-৮৮৭১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px