📄 শত ব্যক্তির খুনীর জান্নাত লাভ
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: كَانَ فِي بَنِي إِسْرَائِيلَ رَجُلٌ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ إِنْسَانًا، ثُمَّ خَرَجَ يَسْأَلُ، فَأَتَى رَاهِبًا فَسَأَلَهُ فَقَالَ لَهُ: هَلْ مِنْ تَوْبَةٍ؟ قَالَ: لَا، فَقَتَلَهُ، فَجَعَلَ يَسْأَلُ، فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ: ائْتِ قَرْيَةَ كَذَا وَكَذَا، فَأَدْرَكَهُ الْمَوْتُ، فَنَأَى بِصَدْرِهِ نَحْوَهَا، فَاخْتَصَمَتْ فِيهِ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ وَمَلَائِكَةُ الْعَذَابِ، فَأَوْحَى اللَّهُ إِلَى هَذِهِ أَنْ تَقَرَّبِي، وَأَوْحَى اللَّهُ إِلَى هَذِهِ أَنْ تَبَاعَدِي، وَقَالَ: قِيسُوا مَا بَيْنَهُمَا، فَوُجِدَ إِلَى هَذِهِ أَقْرَبَ بِشِبْرٍ، فَغُفِرَ لَهُ.
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি নিরানব্বই জনকে হত্যা করে। তারপর সে মানুষের নিকট জানতে চায়, তার তওবা কবুল হবে কিনা? সে এক পাদ্রীর নিকট গিয়ে জানতে চাইল। পাদ্রী বলল, তোমার জন্য তওবার কোনো সুযোগ নেই। সে পাদ্রীকেও হত্যা করে ফেলল। এরপর সে অন্য এক লোকের নিকট গিয়ে জানতে চাইল। লোকটি তাকে বলল, তুমি অমুক গ্রামে চলে যাও। সেখানে গেলে তুমি মুক্তি পেতে পার। লোকটি সেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। পথিমধ্যে তার মৃত্যু উপস্থিত হলে, সে বুক দিয়ে ঐ গ্রামের দিকে এগিয়ে গেল। তখন রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতার মাঝে বিতর্ক শুরু হলো। রহমতের ফেরেশতারা বলল, লোকটি তাওবা করার জন্য এসেছে, সুতরাং আমরা তাকে নিয়ে যাবো। আর আযাবের ফেরেশতারা বলল, সে তো এখনো ভালো কোনো আমল করেনি, আমরা তাকে নিয়ে যাবো। তখন আল্লাহ তা'আলা যে গ্রামে যাচ্ছিল সে গ্রামকে কাছে চলে আসতে আর যে গ্রাম থেকে বের হয়েছে তাকে দূরে সরে যেতে বললেন এবং ফেরেশতাদেরকে বললেন, তোমরা উভয় গ্রামের দূরত্ব মেপে দেখ, সে কোন গ্রামের বেশি নিকটবর্তী। তারা মেপে দেখল, লোকটি এক বিঘত পরিমাণ সামনের গ্রামের নিকটবর্তী হয়েছে। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। ১১৬
টিকাঃ
১১৬. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩৪৭০; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৭৬৬।
হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করা আল্লাহর নিকট খুব কঠিন ব্যাপার নয়। তোমাদের পূর্ববর্তী এক ব্যক্তি ছিল। সে নিরানব্বই জন মানুষ হত্যা করে। অতঃপর এক ধর্মগুরুর কাছে এসে বলল, আমি নিরানব্বইটি খুন করেছি, আমার কি তাওবার কোনো রাস্তা আছে? সে বলল, না, তুমি সীমা ছাড়িয়ে গেছ। এ কথা শুনে লোকটি তাকেও হত্যা করে ফেলল। তারপর অন্য আরেক ধর্মগুরুর কাছে গিয়ে বলল, আমি এক শত মানুষ খুন করেছি, আমার কি তাওবার কোনো রাস্তা আছে? তিনি বললেন, তুমি সীমা ছাড়িয়ে গেছ। তোমার সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারছি না। তবে বাছরা ও কাফরা নামে এখানে দুটি গ্রাম আছে। বাছরা অধিবাসীরা সব সৎকর্মশীল, তারা জান্নাতবাসীদের কর্ম করে, তাদের মাঝে গুনাহগারদের স্থান নেই। আর কাফরাবাসীরা জাহান্নামীদের কর্ম করে, তাদের মাঝে অন্য কোনো লোক থাকতে পারে না। তুমি যদি বাছরা গ্রামে গিয়ে তাদের সাথে থেকে তাদের অনুরূপ আমল করতে পার, তাহলে নিঃসন্দেহে তোমার তাওবা কবুল হবে। এই কথা শুনেই লোকটি রওনা হয়ে গেল। সে যখন দুই গ্রামের মাঝামাঝি পৌঁছল তখন তার মৃত্যু হলো। সাথে সাথে রহমত ও আযাবের ফেরেশতা উভয়ে এসে হাজির হলো। তারা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হলে আল্লাহ বললেন, তোমরা মেপে দেখ, দুই গ্রামের মধ্যে কোন গ্রামের দিকে সে তুলনামূলক অধিক নিকটবর্তী। তারা মেপে দেখলেন, সে বাছরার দিকে এক আঙ্গুল পরিমাণ নিকটবর্তী। ফলে তাকে বাছরাবাসীদের মধ্যে গণ্য করা হলো।
টিকাঃ
১৫৫. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩৪৭০ (সামান্য শাব্দিক তারতম্যসহ বর্ণিত); সহীহ মুসলিম হাদীস- ২৭৬৬; মুসনাদে আহমাদ হাদীস-১১১৫। উল্লেখ্য: সহীহ বুখারী-মুসলিমে গ্রামের নামের কথা উল্লেখ নেই।
📄 চারটি ও চারটি আয়াত
عَنْ يَحْيَى بْنِ مُعَاذٍ الرَّازِيِّ رَحِمَهُ اللَّهُ أَنَّهُ قَالَ : لَا أَخَافُ مِمَّا مَضَى، وَلَا أُبَالِي بِمَا بَقِيَ، فَإِنَّ عَفْوَكَ يَا إِلَهِي يَشْمَلُ مَا قَدْ مَضَى، وَلُطْفَكَ يَشْمَلُ مَا قَدْ بَقِيَ، يَا مَنْ أَعْطَانِي الْإِسْلَامَ مِنْ غَيْرِ أَنْ أَسْأَلَكَ فَلَا تَحْرِمْنِي الْجَنَّةَ وَأَنَا أَسْأَلُكَ، يَا مَنْ إِذَا ذَكَرْتُهُ هَشَّ لِذِكْرِهِ فُؤَادِي، وَلَوْلَا سَتْرُهُ عَلَيَّ لَافْتَضَحْتُ عِنْدَ قُعُودِي، كَيْفَ لَا أَرْجُو الْفَوْزَ غَدًا وَقَدْ هَدَيْتَنِي لِلتَّوْحِيدِ وَالْإِفْرَادِ، فَاعْصِمْنِي مِنَ الْمُخَالَفَاتِ، وَسَدِّدْنِي بِالْإِصَابَاتِ، وَارْزُقْنِي مُنَاجَاةَ الْخَائِفِينَ وَصِدْقَ الْمُوقِنِينَ، وَيَقِينَ الْمُتَوَكَّلِينَ، وَتَوَكَّلَ الْعَابِدِينَ.
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআয রাযী রহ. বলেন, আমার অতীত নিয়ে আমি চিন্তিত নই, আর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন নই। কারণ, হে আমার ইলাহ! আপনার ক্ষমা আমার অতীতকে শামিল করে, আর আপনার لطف (অনুগ্রহ) আমার ভবিষ্যৎকে শামিল করে। হে আল্লাহ! না চাইতেই আপনি আমাকে ইসলাম দান করেছেন, এখন আমি আপনার নিকট জান্নাত চাই, আমাকে তা থেকে বঞ্চিত করবেন না। হে আল্লাহ! আমি যখনই আপনাকে স্মরণ করি, আমার অন্তর প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। আপনার পর্দা যদি আমাকে আবৃত না করত, তাহলে বসে থাকা অবস্থাতেই আমি লাঞ্ছিত হতাম। আগামীকাল আমার মুক্তির আশা আমি কেন করব না, যেখানে আপনিই আমাকে তাওহীদের হিদায়াত দিয়েছেন? হে আল্লাহ! আমাকে আপনার নাফরমানী থেকে বাঁচিয়ে রাখুন, সঠিক পথের উপর অবিচল রাখুন, আমাকে আপনার ভয়ে ভীতদের মত আপনার সাথে কথোপকথনের তাওফীক দিন, বিশ্বাসীদের সত্যবাদিতা দান করুন, তাওয়াক্কুলকারীদের একীন ও আবেদগণের তাওয়াক্কুল দান করুন।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, আমি আমার উস্তাদকে বলতে শুনেছি, আমি কুরআনের চারটি আয়াত পেয়েছি, যেখানে চারটি করে জিনিস রয়েছে। যে ব্যক্তি এই আয়াত চারটি পাঠ করবে আল্লাহ তাকে ওই আটটি জিনিস দান করবেন।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন- مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (النحل: ٩٧)
অর্থাৎ, পুরুষ বা নারী যে কেউ ঈমান অবস্থায় নেক আমল করবে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার উত্তম প্রতিদান দিব। ১১৭
এ আয়াতে পবিত্র জীবন ও উত্তম প্রতিদান লাভের জন্য দু'টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। যথা- নেক আমল ও ঈমান। যে ব্যক্তি এ দু'টি শর্ত পূরণ করবে আল্লাহ তাকে পবিত্র জীবন ও উত্তম প্রতিদান দিবেন।
দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ (البقرة: ٤٠)
অর্থ: তোমরা আমার সাথে কৃত অঙ্গিকার পূর্ণ কর, আমিও তোমাদের সাথে কৃত অঙ্গিকার পূর্ণ করব এবং আমাকেই ভয় কর। ১১৮
এ আয়াতে অঙ্গিকার পূর্ণ করা ও ভয় করা এই দুটি কাজের জন্য আল্লাহ তা'আলা অঙ্গিকার পূর্ণ করা ও ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন- فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (البقرة: ٣٨)
অর্থ: যখন তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে হেদায়াত পৌঁছাবে তখন যারা আমার হেদায়াত অনুসরণ করবে তাদের কোনো ভয় ও চিন্তা থাকবে না। ১১৯
এ আয়াতে হেদায়াতের অনুসরণের বিনিময়ে ভয় ও চিন্তা থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ (غافر : ٦٠)
অর্থ: তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। নিশ্চয় যারা আমার ইবাদত থেকে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে। ১২০
টিকাঃ
১১৭. সূরা নাহল: আয়াত-৯৭
১১৮. সূরা বাকারা: আয়াত-৪০
১১৯. সূরা বাকারা: আয়াত-৩৮
১২০. সূরা গাফের: আয়াত-৬০
হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, যে তিনটি বিষয় আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলতে পারি। চতুর্থ বিষয়টিতেও কসম করলে সত্যবাদিই হব। ১. দুনিয়াতে আল্লাহ যার দায়িত্ব নিবেন কিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব তিনি অন্যের হাতে ছেড়ে দিবেন না। ২. ইসলামে যার অংশ আছে তাকে আল্লাহ অংশহীন বানাবেন না। ৩. কিয়ামতের দিন প্রতিটি ব্যক্তির হাশর তাদের সাথেই হবে যাদের কে সে পছন্দ করে। ৪. আল্লাহ দুনিয়াতে যার গুনাহ ঢেকে রাখবেন আখেরাতেও তিনি তার গুনাহ ঢেকে রাখবেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সূরা নিসার চারটি আয়াত মুসলমানদের কাছে দুনিয়ার সমস্ত জিনিসের থেকেও মূল্যবান। ১. আল্লাহ ইরশাদ করেন— إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا. অর্থ: আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করবেন না, তা ছাড়া (অন্যান্য গুনাহ) যাকে খুশি তাকে ক্ষমা করে দেবেন। ২. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُসَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَজَدُوا اللهَ تَوَّابًا رَحِيمًا. অর্থ: তারা যদি নিজেদের উপর জুলুম করে তোমার নিকট আসে এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী এবং দয়ালু পাবে। ৩. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْনَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلُكُمْ مُدْخَلًا كَرِيمًا অর্থ: তোমরা যদি তোমাদেরকে যা থেকে বারণ করা হলো, তার বড় ব্যাপারগুলো এড়িয়ে চল, তাহলে আমি তোমাদের গুনাহ মোচন করে দিব এবং তোমাদেকে সম্মানিত স্থানে (জান্নাতে) প্রবেশ করাব। ৪. আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمُ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَحِيمًا অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো অপকর্ম করে কিংবা নিজের উপর অবিচার করে অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায়, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল এবং দয়ালু পাবে。
টিকাঃ
১৫৬. সূরা নিসা: আয়াত-১১৬
১৫৭. সূরা নিসা: আয়াত-৬৪
১৫৮. সূরা নিসা: আয়াত-৩১
১৫৯. সুরা নিসা: আয়াত-১১
📄 আল্লাহর রহমতে জান্নাত লাভ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ، قَالَ لَهَا: تَكَلَّمِي فَقَالَتْ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. فَقَالَتِ الْمَلَائِكَةُ: طُوبَى لَكَ مَنْزِلَ الْمُلُوكِ. فَقَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا يُجَاوِرُنِي فِيكَ بَخِيلٌ، وَلَا مُرَاءٍ وَلَا عَاقٌ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সৃষ্টি করে তাকে বললেন, কথা বল। জান্নাত বলল, মুমিনরা সফলকাম। ফেরেশতাগণ বললেন, তোমাকে সুসংবাদ, তুমি রাজাদের আবাসস্থল। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমার ইজ্জত ও জালালের কসম! তোমার মধ্যে কৃপণ, রিয়াকারী ও পিতা-মাতার অবাধ্যরা প্রবেশ করতে পারবে না।১২১
টিকাঃ
১২১. হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৬/২৯৬; আল-কামেল, ইবনে আদী: ৪/৪০৯; কানযুল উম্মাল: হাদীস-৪৪১৪৬। ইমাম দাইলামীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি জয়ীফ।
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আল আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত— নবী কারীম বলেন, আমার শাফায়াত (সুপারিশ) থাকবে কবীরা গুনাহে লিপ্তদের জন্য। যে তা অস্বীকার করবে সে তা লাভ করতে পারবে না। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, যে কবীরা গুনাহ করেনি তার তো শাফায়াতের প্রয়োজন হবে না। হযরত মালেক ইবনে আনাস থেকেও বর্ণিত। নবী কারীম বলেন, আমার শাফায়াত (সুপারিশ) থাকবে কবীরা গুনাহে লিপ্তদের জন্য। যে তা অস্বীকার করবে সে তা লাভ করতে পারবে না。
হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত— একবার রাসূল আমাদের নিকট এসে বললেন, এইমাত্র আমার বন্ধু জিবরাঈল আ. এসেছিলেন, তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ! যে আল্লাহ তোমাকে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন সেই সত্ত্বার শপথ! আল্লাহর এক বান্দা পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচ শত বছর আল্লাহর ইবাদত করেছেন। পাহাড়টির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ছিল ত্রিশ বর্গ গজ। সেটার চতুর্দিক থেকে চার হাজার ফারসাখ দূরত্ব পরিমাণ সমুদ্র তাকে বেষ্টন করে রেখে ছিল। পাহাড়ের পাদদেশে আল্লাহ তার জন্য আঙ্গুলের মত সরু একটি মিষ্টি পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন এবং তার জন্য একটি আনার গাছের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যাতে প্রতিদিন একটি আনার ফলত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি পাহাড়ের পাদদেশে নেমে উযূ করতেন এবং আনারটি খেতেন তারপর নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। একদিন এইভাবে নামাযে দাঁড়িয়ে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, আল্লাহ যেন তাকে সেজদারত অবস্থায় মৃত্যু দান করেন। মাটি ও এ জাতীয় জিনিস যেন তার মৃতদেহ নষ্ট না করতে পারে এবং তিনি যেন তাকে এভাবে, সেজদারত অবস্থাতেই পুনরুত্থিত করেন। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করলেন। জিবরাঈল আ. বলেন, আমরা যখন আসমান থেকে জমিনে নামি বা জমিন থেকে আসমানে আরোহণ করি তখন তাকে তেমনই সেজদারত অবস্থায় দেখতে পাই।
তারপর জিবরাঈল আ. বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, কিয়ামতের দিন তাকে পুনরুত্থিত করে তার রবের সামনে হাজির করা হবে। রব তাকে বলবেন, আমার এই বান্দাকে আমার রহমতের দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করাও। সে বলবে, না, বরং আমার আমলের বিনিময়ে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। তখন আল্লাহ তার ফেরেশতাদেরকে আদেশ করে বলবেন, তার আমল এবং আমি তাকে যে সব নেয়ামত দান করেছি তার একটি হিসাব দাঁড় করাও। ফেরেশতারা হিসাব করলে দেখা যাবে যে, শুধু চোখের নেয়ামতের বিনিময় দিতেই তার পাঁচ শত বছরের ইবাদত ফুরিয়ে যায়। তখন আল্লাহ আদেশ করবেন, আমার বান্দাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। ফেরেশতারা তাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকবে। সে বলবে, হে আল্লাহ! আপনার রহমতের মাধ্যমে আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আল্লাহ বলবেন, তাকে ফিরিয়ে আনো। তাকে দরবারে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, হে বান্দা! অনস্তিত্ব থেকে কে তোমাকে অস্তিত্ব দান করেছিলো? সে বলবে, হে রব! আপনি। আল্লাহ বলবেন, সেটা কি ছিল তোমার আমলের কারণে নাকি আমার রহমতের মাধ্যমে? সে বলবে, আপনার রহমতের মাধ্যমে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, কে তোমাকে পাঁচ শত বছর আমার ইবাদত করার শক্তি দান করেছিল? সে বলবে, আপনি হে রব! আল্লাহ বলবেন, কে তোমাকে তরঙ্গায়িত সমুদ্রের মাঝখানে এক পাহাড়ে আশ্রয় দিয়েছিল এবং নোনা পানি থেকে মিঠা পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছিল? কে তোমার জন্য প্রতি রাতে একটি করে আনার উৎপন্ন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, অথচ এই ফল বছরে কেবল এক মৌসুমে ফলে? তুমি আমার কাছে প্রার্থনা করেছিলে, আমি যেন সেজদারত অবস্থায় তোমার রূহ কবজ করি, আমি তাই করেছি। কে করে ছিল তা? সে বলবে, আপনি, হে রব! আল্লাহ বলবেন, তাহলে শুনে রাখ এই সবই আমি করেছি আমার রহমতের মাধ্যমে এবং আমার রহমত দ্বারাই তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাচ্ছি। সুতরাং তোমরা আমার বান্দাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তুমি আমার কতইনা উত্তম বান্দা ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। জিবরাঈল আ. বলেন, সব কিছুই আল্লাহর রহমতের ফল。
টিকাঃ
১৬০. সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৪৭৩৯; সুনানে তিরমিযী হাদীস-২৪৩৬; মুসনাদে আহমদ ২০/৪৩৯। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব।
১৬১. সুনানে আবী দাউদ হাদীস-৪৭৩৯; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৩৬; মুসনাদে আহমদ ২০/৪৩৯। ইমাম তিরমিযি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব। হাদীসের শেষ বাক্যটি "যে তা অস্বীকার করবে..." আমরা হাদিসের কিতাবে পাইনি।
১৬২. মুস্তাদরাকে হাকেম : খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২৭৮; শুআবুল ঈমান : খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৫০।
📄 মৃত্যুর সময় ভয় ও আশা
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَخَلَ عَلَى شَابٍ وَهُوَ فِي الْمَوْتِ، فَقَالَ: كَيْفَ تَجِدُكَ؟ قَالَ: وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَرْجُو اللَّهَ وَإِنِّي أَخَافُ ذُنُوبِي، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدٍ فِي مِثْلِ هَذَا الْمَوْطِنِ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ مَا يَرْجُو وَآمَنَهُ مِمَّا يَخَافُ.
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ এক মুমূর্ষু যুবকের নিকট গেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন লাগছে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহর রহমতের আশা করছি এবং আমার গুনাহের কারণে ভয়ও পাচ্ছি। রাসূল ﷺ ইরশাদ করলেন, এমন মুহূর্তে যে ব্যক্তির অন্তরে এ দুটি জিনিস একত্রিত হবে আল্লাহ তাকে তার আশানুরূপ দান করবেন এবং তার ভয় থেকে তাকে নিরাপত্তা দিবেন।১২২
টিকাঃ
১২২. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৯৮৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৬১; হাদীসটি হাসান।
হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মৃত্যুর সময় কোনো ব্যক্তি যদি ভয় ও আশার সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে আল্লাহ তাকে যে আশা করেছে তাই দান করবেন এবং যার আশঙ্কা করেছে তা দূর করে দিবেন。
টিকাঃ
১৬৩. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-৯৮৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৬১। হাদীসটি হাসান।