📄 জান্নাতীদের হাতের আংটিতে যা লেখা থাকবে
عَنِ الْحَسَنِ الْبَصْرِيِّ، قَالَ: يُعْطَى لِكُلِّ مُؤْمِنٍ خَاتَمٌ مِنْ ذَهَبٍ، يُكْتَبُ فِيهِ: ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ (الحجر : ٤٦).
হযরত হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রত্যেক মুমিনকে একটি স্বর্ণের আংটি দেওয়া হবে, তাতে লেখা থাকবে, ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ অর্থ: তোমরা তাতে প্রবেশ কর শান্তিতে, নিরাপদে। ১০৫
টিকাঃ
১০৫. সূরা হিজর: আয়াত-৪৬
জান্নাতীদের হাতের আংটিতে দশটি জিনিস লেখা থাকবে। যথা— প্রথমটিতে লেখা থাকবে— سَلَامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ অর্থ: তোমরা যে ধৈর্যধারণ করেছ তার ফলস্বরূপ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। দ্বিতীয়টিতে লেখা থাকবে— أُدْখُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ. অর্থ: তোমরা তাতে (জান্নাতে) শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে প্রবেশ কর। তৃতীয়টিতে লেখা থাকবে— تِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ অর্থ : ওই হলো সেই জান্নাত, তোমাদের কর্মের ফলস্বরূপ তোমরা তার উত্তরাধিকার লাভ করেছ। চতুর্থ আংটিতে লেখা থাকবে— رُفِعَتْ عَنْكُمُ الْأَحْزَانُ وَالْهُمُومُ অর্থ: তোমাদের সমস্ত দুঃখ ও দুশ্চিন্তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। পঞ্চমটিতে লেখা থাকবে— الْبَسْنَاكُمُ الْحُلِيَّ وَالْحُلَلَ অর্থ: আমি তোমাদেরকে গহনা ও অলংকার পরিধান করিয়েছি। ষষ্ঠটিতে লেখা থাকবে— زَوَّجْنَاكُمُ الْحُورَ الْعِينِ অর্থ: আমি তোমাদেরকে বিয়ে করিয়েছি ডাগরচোখা হুরদের সাথে। সপ্তমটিতে লেখা থাকবে— وَ فِيهَا مَا تَشْتَهِيْهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنِ وَأَنْتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ অর্থ: সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে মন যা কামনা করে, চোখ যাতে আনন্দ পায়; সেখানে তোমরা হবে অমর। অষ্টমটিতে লেখা থাকবে— رَافَقْتُمُ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ অর্থ: তোমরা নবী ও সিদ্দীকগণের সঙ্গী হলে। নবমটিতে লেখা থাকবে— صِرْتُمْ شَبَابًا لَا تُهْرَمُونَ অর্থ: তোমরা চির যুবক, বার্ধক্য তোমাদেরকে কখনো আক্রান্ত করবে না। দশমটিতে লেখা থাকবে— سَكُنْتُمْ فِي جَوَارٍ مَنْ لَا يُؤْذِي অর্থ: যে কাউকে কষ্ট দেয় না, তোমরা এমন একজনের প্রতিবেশী হয়ে বাস করবে।
টিকাঃ
১৩৭. ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত এই দীর্ঘ রেওয়ায়াতটির কোনো কোনো অংশ সহীহ বা হাসান সনদে পাওয়া যায়। যেমন: “জান্নাতীরা চির যুবক থাকবে। তাদের দাড়ি-গোঁফ থাকবে না। মাথার চুল, ভ্রু এবং চোখের ভ্রু ছাড়া তাদের শরীরে আর কোথাও লোম থাকবে না।” (তিরমিযী: হাদীস-২৩৩৫; দারিমী: খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৫৩৯) তবে কারো কারো মতে উপরিউক্ত শব্দে বিস্তারিত যে হাদীসটি বর্ণনা করা হয়, তা জাল। [দ্র. সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা (২৩৮৭)]
📄 জান্নাতের নেয়ামত লাভ করতে হলে পাঁচটি কাজ আবশ্যক
عَنْ وَهْبِ بْنِ مُنَبِّهِ، قَالَ : يُقَالُ: إِنَّ مِفْتَاحَ الْجَنَّةِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَإِنَّ أَسْنَانَهُ خَمْسَةُ أَشْيَاءَ: إِقْرَارُ بِاللِّسَانِ، وَتَصْدِيقٌ بِالْقَلْبِ، وَعَمَلُ بِالْجَوَارِحِ، وَأَكْلُ الْحَلَالِ، وَاجْتِنَابُ الْمَحَارِمِ.
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ জান্নাতের চাবি। তার পাঁচটি দাঁত আছে। যথা-
১. মুখে স্বীকার করা।
২. অন্তরে বিশ্বাস করা।
৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে আমল করা।
৪. হালাল খাওয়া।
৫. হারাম বর্জন করা।
ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি এই সমস্ত নেয়ামত লাভ করতে আগ্রহী তাকে পাঁচটি কাজ অবশ্যই করতে হবে। যথা—
১. أَنْ يَمْنَعَ نَفْسَهُ مِنْ جَمِيعِ الْمَعَاصِي অর্থাৎ, নিজেকে যাবতীয় নাফরমানী থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى অর্থ: আর যে তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে এবং নফসকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত রাখে তার ঠিকানা হবে জান্নাত।
২. أَنْ يَرْضَى بِالْيَسِيرِ مِنَ الدُّنْيَا لِأَنَّهُ অর্থাৎ, পার্থিব বিষয়ে অল্পে তুষ্ট থাকা। কারণ, এক হাদীসে এসেছে; জান্নাতের মূল্য হলো, দুনিয়া বর্জন।
৩. أَنْ يَكُونَ حَرِيصًا عَلَى الطَّاعَاتِ অর্থাৎ, সর্বদা ইবাদতের প্রতি আগ্রহী থাকা। সম্ভাব্য প্রতিটি ইবাদত পালন করা। কারণ, যে কোনো নেক আমলই আল্লাহর মাগফেরাত এবং জান্নাত লাভের কারণ হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন— وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ অর্থ: ওই সে জান্নাত তোমাদের কর্মের ফলস্বরূপ যা তোমাদেরকে দান করা হয়েছে। অন্য এক আয়াতে এসেছে— جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ অর্থ: (এই জান্নাত) তাদের আমলের প্রতিদান স্বরূপ। অর্থাৎ ইবাদতে মগ্নতার মাধ্যমেই জান্নাত ও তার নেয়ামত পাওয়া যায়।
৪. أَنْ يُحِبَّ الصَّالِحِينَ وَأَهْلَ الْخَيْرِ وَيُخَالِطَهُمْ وَيُجَالِسَهُمْ সৎকর্মশীলদের পছন্দ করা এবং তাদের সান্নিধ্য লাভ করা, তাদের সাথে উঠাবসা করা। কারণ, সৎকর্মশীলরা যখন আল্লাহর মাগফেরাত লাভ করবেন তখন তাদেরকে সঙ্গী-সাথী ও স্বজনদের জন্য সুপারিশের সুযোগ দেওয়া হবে। যেমন রাসূল ইরশাদ করেন, তোমরা বেশি (দীনি) ভাই বানাও। কারণ, তারা সবাই কিয়ামতের দিন অন্যের জন্য সুপারিশের সুযোগ পাবে না।
৫. أَنْ يُكْثِرَ الدُّعَاءَ অর্থাৎ, বেশি বেশি দোয়া করা। অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে খাতেমা বিল খায়ের (শুভ অন্তিম) এবং জান্নাত প্রাপ্তির জন্য দোয়া করা。
টিকাঃ
১৩৮. সুরা নাযিআত: আয়াত-৪০-৪১
১৩৯. সূরা যুখরুফ: আয়াত-৭২
১৪০. সূরা আল আহকাফ: আয়াত-১৪
১৪১. হাদীসটির সনদ ও হুবহু এই শব্দে কোনো বর্ণনা আমরা পাইনি।
📄 কে আখেরাতের প্রশান্তি ও সচ্ছলতা পাবে?
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: مَنْ أَصْبَحَ وَهَمُّهُ الْآخِرَةُ جَمَعَ اللَّهُ شَمْلَهُ، وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ، وَمَنْ أَصْبَحَ وَهَمُّهُ الدُّنْيَا، شَتَّتَ اللَّهُ شَمْلَهُ، وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি পরকালকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার সকল কাজকে গুছিয়ে দেন, তার অন্তরে সচ্ছলতা দান করেন এবং দুনিয়া তার কাছে অপদস্ত হয়ে আসে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তার মূল উদ্দেশ্য বানায়, আল্লাহ তা'আলা তার কাজগুলোকে এলোমেলো করে দেন, তার চোখে-মুখে দারিদ্রতা লেপটে দেন, আর সে দুনিয়া থেকে ততটুকুই পায় যতটুকু তার জন্য নির্ধারিত ছিল। ১০৬
টিকাঃ
১০৬. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৬৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪১; হাদীসটি সহীহ।
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, সওয়াবের আশা রেখে দুনিয়ামুখী হওয়া বোকামি। অনুরূপ আমলের সওয়াব জানার পর মেহনত না করাও বোকামি। নিশ্চয় জান্নাতের প্রশান্তি সে পাবে, যে পার্থিব শান্তি বিসর্জন দিবে। আর যে পার্থিব মোহ ত্যাগ করে সে অল্পে তুষ্ট থাকতে পারবে। সুতরাং তুমি দুনিয়ার মোহ ত্যাগ কর।
📄 জনৈক সাধকের ঘটনা
عَنْ أَبِي سُلَيْمَانَ الدَّارَانِيِّ، قَالَ : بِتُّ لَيْلَةً فِي مِحْرَابِي، فَكَانَ قَلْبِي قَاسِيًا فَلَمْ أَجِدْ لِلْعِبَادَةِ لَذَّةً، وَلَا لِلْمُنَاجَاةِ حَلَاوَةً، فَخَرَجْتُ مِنَ الْمِحْرَابِ فَجَلَسْتُ خَلْفَ الْبَابِ، فَإِذَا بِرَجُلٍ فِي الْمِحْرَابِ يَدْعُو، وَهُوَ يَقُولُ: أَيْ رَبِّ كَمْ أَعْصِيكَ فَتُمْهِلُنِي، وَكَمْ أَسْتُرُكَ فَتَعْفُو عَنِّي، وَكَمْ مِنْ عَبْدٍ دَعَاكَ فَلَمْ تُجِبْهُ، وَدَعَوْتُكَ فَأَجَبْتَنِي، فَقُلْتُ لَهُ : مَنْ أَنْتَ رَحِمَكَ اللهُ؟ قَالَ : أَنَا رَجُلٌ أَسِيرٌ، حَبَسَنِي عَدُوٌّ. فَقُلْتُ لَهُ : وَمَنْ عَدُوُّكَ؟ قَالَ: إِبْلِيسُ. قُلْتُ: وَمَا هَذِهِ الْقُيُودُ الَّتِي أَرَاهَا عَلَيْكَ؟ قَالَ : طُولُ الْأَمَلِ، وَحُبُّ الدُّنْيَا. فَقُلْتُ: وَأَيْنَ تُرِيدُ؟ قَالَ: أُرِيدُ الْجَنَّةَ. قُلْتُ : وَالطَّرِيقُ بَعِيدٌ. قَالَ: وَالسَّفَرُ قَرِيبٌ. قُلْتُ: وَمَا زَادُكَ؟ قَالَ: التَّوَكُّلُ عَلَى اللَّهِ تَعَالَى، وَحُسْنُ الظَّنِّ بِاللَّهِ تَعَالَى. قُلْتُ لَهُ: فَبِمَ تَسْتَعِينُ عَلَى ذَلِكَ؟ قَالَ : بِخِدْمَةِ الْفُقَرَاءِ، وَحُبِّ الصَّالِحِينَ.
হযরত আবূ সুলাইমান দারানী রহ. বলেন, এক রাতে আমি আমার ইবাদতখানায় বসে ইবাদত করতে লাগলাম। কিন্তু অন্তর কঠিন হওয়ায় ইবাদতে কোনো স্বাদ পেলাম না। তখন আমি ইবাদতখানা থেকে বেরিয়ে দরজার পেছনে গিয়ে বসলাম। দেখলাম একজন লোক ইবাদতখানায় বসে দোয়া করছে,
أَيْ رَبِّ كَمْ أَعْصِيكَ فَتُمْهِلُنِي، وَكَمْ أَسْتُرُكَ فَتَعْفُو عَنِّي، وَكَمْ مِنْ عَبْدٍ دَعَاكَ فَلَمْ تُجِبْهُ، وَدَعَوْتُكَ فَأَجَبْتَنِي،
অর্থ: হে আমার রব! আমি কতবার আপনার নাফরমানী করেছি, কিন্তু আপনি আমাকে অবকাশ দিয়েছেন। কতবার আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়েছি, আর আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কত বান্দা আপনাকে ডেকেছে, আপনি তাদের ডাকে সাড়া দেননি। আর আমি যখনই আপনাকে ডেকেছি আপনি সাড়া দিয়েছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে আপনি? সে বলল, আমি একজন বন্দী, শত্রু আমাকে বন্দী করে রেখেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার শত্রু কে? সে বলল, ইবলিস। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার পায়ে যে বেড়ি দেখছি এগুলো কিসের? সে বলল, এগুলো লম্বা আশা আর দুনিয়ার ভালোবাসার বেড়ি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোথায় যেতে চান? সে বলল, জান্নাতে। আমি বললাম, পথ তো অনেক দূরের। সে বলল, যাত্রা তো সন্নিকটে। আমি বললাম, আপনার পাথেয় কী? সে বলল, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল এবং তাঁর প্রতি সুধারণা। আমি বললাম, এ ব্যাপারে আপনি কার সাহায্য নিচ্ছেন? সে বলল, দরিদ্রদের সেবা ও সৎকর্মশীলদের ভালোবাসা।
জনৈক যাহেদ থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি শুধু লবণ দিয়ে সবজি খেতেন, রুটি খেতেন না। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি শুধু এই সব খেয়েই বেঁচে আছেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি দুনিয়া যাপন করি জান্নাতের আশায়। আর তুমি দুনিয়া যাপন কর বাথরুমের জন্য। অর্থাৎ, তুমি ভালো ভালো খাবার খাও এবং বাথরুমে গিয়ে তা ত্যাগ করে আস। আর আমি আহার গ্রহণ করি শারীরিক শক্তি লাভ করার জন্য, যাতে আমি জান্নাতে যেতে পারি। বিনামূল্যে, প্রবেশ করা যাবে না।