📄 তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: ثَلَاثَةُ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ : الْإِمَامُ الْعَادِلُ، وَالصَّائِمُ حِينَ يُفْطِرُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهَا تُرْفَعُ فَوْقَ الْغَمَامِ، وَتُفْتَحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ: وَعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। যথা-
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক।
২. ইফতারের সময় রোযাদার।
৩. মজলুমের বদ দোয়া।
মজলুমের দোয়া মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেন, আমার ইজ্জতের কসম! কিছু সময় বিলম্ব হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব। ৯১
টিকাঃ
৯১. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৫২৬; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-১৭৫২; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-৮০৪৩; হাদীসটি সহীহ [শুয়াইব আরনাউত]।
অতঃপর রাসূল বললেন, তিন ব্যক্তির দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। যথা—
১. الْإِمَامُ الْعَادِلُ অর্থ : ন্যায়পরায়ণ শাসকের দুআ।
২. وَالصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ অর্থ: ইফতারকালে রোযাদারের দোয়া
৩. وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ অর্থ : মজলুমের দুআ।
তাদের দোয়া সরাসরি মেঘের উপর উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং তার দিকে তাকিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার ইজ্জতের ও জালালাতের কসম! আমি তোমাকে কিছু বিলম্বে হলেও অবশ্যই অবশ্যই সাহায্য করব।
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, জান্নাতে এমন একটি বৃক্ষ আছে, যার ছায়ায় অশ্বারোহী এক শত বছর চললেও শেষ হবে না। তোমরা চাইলে এ ক্ষেত্রে কুরআনের এই আয়াতটিও স্মরণ করতে পার— وَظِلٍّ مَمْدُودٍ অর্থ: প্রসারিত ছায়া। জান্নাতে এমন অনেক কিছু রয়েছে যা চোখ কোনো দিন দেখেনি, কান কোনো দিন শ্রবণ করেনি এবং যা কখনো কোনো মানুষের অন্তরেও উদয় হয়নি। এ ক্ষেত্রে কুরআনের এই আয়াতটি স্মরণ পড়ে— فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ অর্থ: কোনো মানুষ জানে না তার চক্ষু শীতল করার জন্য কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে। জান্নাতের কিঞ্চিত পরিমাণ জায়গা গোটা দুনিয়া ও তার যাবতীয় বস্তু থেকে উত্তম। এ ক্ষেত্রে কুরআনের এই আয়াতটি পড়ো— فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْখِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ অর্থ: যাকে জাহান্নাম থেকে রেহাই দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো সে সফলতা অর্জন করল।
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। জান্নাতে এক হুর আছে, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, মিশক, আম্বর, কাফুর এবং জাফরান এই চার উপাদান দ্বারা। আর এ গুলোর মিশ্রণ করা হয়েছে হায়াত নামক নহরের পানি দিয়ে। আল্লাহ তা'আলা কুন তথা অস্তিত্ব লাভ কর বললে, সবকিছু অস্তিত্ব লাভ করে। জান্নাতের হুররা তার প্রতি আসক্ত থাকবে। সে যদি কোনো সমুদ্রে একবার থুতু ফেলে তাহলে তার তিক্ততা দূর হয়ে সমস্ত পানি মিষ্টি হয়ে যাবে। তার গলায় এ বাক্যটি লেখা আছে, যে আমার মত কোনো সঙ্গিনী কামনা করে, সে যেন আমার রবের আনুগত্য করে।
টিকাঃ
১২৫. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৫২৬; মুসনাদে আহমাদ: ১৩/৪১০ (৮০৪০); সুনানে দারেমী: হাদীস-২৮৬৩; হাদীসটি সহীহ তবে "জান্নাত কী দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে?" এই বাক্যটি সহীহ নয় (শুয়াইব আরনাউত)।
১২৬. সূরা ওয়াকিয়া: আয়াত-৩০
১২৭. সুরা আস-সাজদা: আয়াত-১৭
১২৮. সুরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৫। সুনানে তিরমিযী-৩২৯২; সহীহ বুখারী: হাদীস-২৮৯২, ৩২৫২, ৪৮৮১; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮২৬; সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস-৪৩০৫। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।
📄 জান্নাতের যমীন
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ أَرْضِ الْجَنَّةِ قَالَ: أَرْضُهَا مَرْمَرَةٌ بَيْضَاءُ دُرْمُكَةٌ، وَفِي رِوَايَةٍ أُخْرَى: مِسْكٌ أَذْفَرُ.
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ কে জান্নাতের যমীন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, জান্নাতের যমীন হবে দুধের মতো সাদা ও উজ্জ্বল। অপর এক বর্ণনায় আছে, মেশকের মতো সুগন্ধিযুক্ত। ৯২
টিকাঃ
৯২. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১২৭২৮; মুসনাদে আবী ইয়ালা: হাদীস-৩৬০৬; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-৩৬৪৭।
হযরত মুজাহিদ রহ. বলেন— 'আরদ্বুল জান্নাতি মিন ফিদ্দাতিন ওয়া তুরাবুহা মিসকুন, ওয়া উসুলু শাজারিহা ফিদ্দাতুন, ওয়া আগছানুহা লু'লুউ ওয়া জাবারজাদুন ওয়াল ওরাকু ওয়াছ ছামারু তাহতা যালিকা, ফামান আকালা ক্বা-ইমান লাম ইউ'যিহি, ওয়া মান আকালা জালিসান লাম ইউ'যিহি ওয়া মান আকালা মুদত্বাজিয়ান লাম ইউ'যিহি।'
জান্নাতের ভূমি হবে রুপার, তার মাটি হবে মেশকের এবং জান্নাতের গাছের কাণ্ড হবে রুপার, তার শাখা প্রশাখা হবে মুক্তা ও যাবারযাদ পাথরের। তার নিচে থাকবে গাছের পাতা ও ফল। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে যে কোনো অবস্থাতেই তার ফল খেতে কষ্ট হবে না। তারপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন— قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ অর্থ: তার ফলগুলো নিম্নমুখী করে ঝুলিয়ে রাখা হবে। অর্থাৎ, জান্নাতের বৃক্ষের ফল অবনমিত রাখা হবে যাতে দাঁড়ানো বা বসে থাকা ব্যক্তি সবাই সহজে তার নাগাল পায়।
টিকাঃ
১২৯. সুরা আল হাক্কাহ: আয়াত-১৪
📄 জান্নাতবাসীদের রূপ ও সৌন্দর্য
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَوَّلُ زُمْرَةٍ تَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، وَالَّذِينَ يَلُونَهُمْ عَلَى أَشَدِّ كَوْكَبٍ دُرِّيَّ فِي السَّمَاءِ إِضَاءَةً، قُلُوبُهُمْ عَلَى قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ، لَا اخْتِلَافَ بَيْنَهُمْ، وَلَا تَبَاغُضَ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, সর্বপ্রথম যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল। তারপর যারা প্রবেশ করবে তারা হবে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার ন্যায়। তাদের সবার অন্তর হবে এক ব্যক্তির অন্তরের ন্যায়। তাদের মাঝে কোনো মতভেদ থাকবে না এবং কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।৯৩
টিকাঃ
৯৩. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩২৪৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮৩৪।
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত— তিনি বলেন, যে মহান সত্তা মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর কিতাব নাযিল করেছেন, তার শপথ! দুনিয়াতে যেমন মানুষের বার্ধক্য বৃদ্ধি হয়ে থাকে, জান্নাতে তেমনি তাদের রূপ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি হতে থাকবে।
📄 আল্লাহ তা'আলার দর্শন লাভ
عَنْ جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ : خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةَ الْبَدْرِ وَهُوَ يَنْظُرُ إِلَى الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، فَقَالَ: إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ عَزَّ وَجَلَّ، كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ لَا تَضَامُونَ فِي رُؤْيَتِهِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لَا تُغْلَبُوا عَلَى صَلَاةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ، وَصَلَاةٍ قَبْلَ غُرُوبِهَا، فَافْعَلُوا ثُمَّ قَرَأَ: وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا (طه : ۱۳۰)
হযরত জারির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূল ﷺ পূর্ণিমার রাতে আমাদের নিকট এসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা অতিশীঘ্রই তোমাদের রবকে এমন স্পষ্ট করে দেখবে যেমনটি স্পষ্ট করে এই চাঁদ দেখছো। তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো ভিড় করতে হবে না। সুতরাং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে নামায আদায়ে সচেষ্ট থেকো। তারপর তিনি কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন-
وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا
অর্থ: আর আপনি আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করুন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে। ৯৪ ৯৫
টিকাঃ
৯৪. সূরা ত্বাহা : আয়াত-১৩০
৯৫. সহীহ বুখারী: হাদীস-৫৫৪; সহীহ মুসলিম: হাদীস-৬৩৩।
হযরত সুহাইব রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূল ইরশাদ করেন, সমস্ত জান্নাতবাসীর জান্নাতে এবং জাহান্নামবাসীদের জাহান্নামে যাওয়ার পর একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতবাসীগণ! তোমাদেরকে দেওয়া আল্লাহর একটি প্রতিশ্রুতি রয়ে গেছে, যা তিনি পূরণ করতে চান। তারা বলবে, আর কী প্রতিশ্রুতি? তিনি কি আমাদের আমলের পাল্লা ভারি করে দেননি এবং আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রেহাই দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাননি? রাসূল বলেন, তখন পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে এবং জান্নাতবাসীগণ তার দিদার লাভ করবে। যার হাতে আমার জীবন, সে মহান সত্তার শপথ! যিনি তাদেরকে যা কিছু দান করেছেন তার সব কিছু থেকে আল্লাহর দিদারই হবে সবচেয়ে প্রিয়।
টিকাঃ
১৩০. সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৮১; সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৫৫২।