📄 শাফায়াত
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنِّي لَأَشْفَعُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَقُولُ: يَا رَبِّ عِبَادُكَ عَبَدُوكَ فِي أَطْرَافِ الْأَرْضِ. قَالَ: فَيُنْجِي اللَّهُ مَنْ شَاءَ مِنْهُمْ، وَتَبْقَى بَقِيَّةٌ فِي النَّارِ يَقُولُونَ: مَا أَغْنَى عَنَّا إِيمَانُنَا، فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: هَؤُلَاءِ عُتَقَائِي، فَيَخْرُجُونَ مِنَ النَّارِ، وَيُدْخَلُونَ الْجَنَّةَ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন আমি শাফাআত করব। আমি বলব, হে আমার রব! আপনার বান্দারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে আপনার ইবাদত করেছে। আল্লাহ তা'আলা যাদের চাইবেন তাদেরকে নাজাত দিবেন। আর কিছু লোক জাহান্নামে রয়ে যাবে। তারা বলবে, আমাদের ঈমান কোনো কাজে আসল না। আল্লাহ তা'আলা তখন বলবেন, তোমরা আমার নাজাতপ্রাপ্ত বান্দা। অতঃপর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।৬৮
ٹکا:
৬৮. মুসনাদে আবী ইয়ালা: হাদীস-২৫০৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪৩১৩; হাদীসটি হাসান [আলবানী]।
ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল বলেন, প্রত্যেক নবীর জন্যই একটি বিশেষ দোয়া থাকে, যা অবশ্যই কবুল করা হয়। সকল নবীই তা দুনিয়াতে করে নিয়েছেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন আমি আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য তা রেখে দিয়েছি। মনে রেখ! আমি আদম সন্তানদের নেতা, এও আমার কোনো অহংকার নয়। কিয়ামতের দিন প্রশংসার ঝাণ্ডা আমার হাতে হবে, তার নীচে আদম ও তার বংশধর থাকবে। এতেও অহংকারের কিছু নেই।
অতঃপর রাসূল বললেন, কিয়াতের দিন মানুষের মাঝে যন্ত্রণা ও পেরেশানী প্রবল আকার ধারণ করবে। তাই তারা আদম আ.-এর নিকট এসে বলবে, হে মানব জাতির পিতা! আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন যাতে তিনি আমাদের বিচার শুরু করেন। আদম বলবেন, আমার সে যোগ্যতা নেই। কারণ, আমাকে নিজ গুনাহের ফলে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আজ আমি কেবল আমাকে নিয়েই ব্যস্ত আছি। তোমরা বরং নুহ আ.-এর কছে যাও। কারণ, তিনি প্রথম রাসূল।
অতঃপর লোকেরা নূহ আ.-এর নিকট এসে বলবে আমাদের জন্য রবের নিকট সুপারিশ করুন, যেন তিনি দ্রুত ফায়সালা শুনিয়ে দেন। নূহ আ. বলবেন আমার সে যোগ্যতা নেই। কারণ, আমার দুআয় পৃথিবীর লোকজন পানিতে ডুবে মারা গেছে। আজ কেবল আমাকে নিয়েই আমি ব্যস্ত আছি। তোমরা বরং ইব্রাহীম আ.-এর কাছে যাও, যাকে আল্লাহ তা'আলা বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর সকলে ইব্রাহীম আ.-এর কাছে আসবে। বলবে, আপনি আমাদের জন্য রবের নিকট সুপারিশ করুন, যাতে তিনি দ্রুত আমাদের বিচার সম্পন্ন করেন। তিনি বলবেন, আমার সে যোগ্যতা নেই, কারণ, ইসলামের ব্যাপারে তিনটি মিথ্যা বলেছি। রাসূল বলেছেন ইব্রাহীম আ. দীনের জন্য তিনটি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন।
১. فَنَظَرَ نَظْرَةً فِي النُّجُومِ ، فَقَالَ إِنِّي سَقِيمٌ অর্থ: অতঃপর তিনি তারকামণ্ডলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। বললেন, আমি অসুস্থবোধ করছি।
২. بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هُذَا অর্থ: বরং এ কাজ করেছে তাদের এই বড়টি।
৩. তিনি একবার তার স্ত্রীকে দেখিয়ে বলেছিলেন, সে আমার বোন। অতঃপর ইব্রাহীম আ. বলবেন, আমি আজ আমাকে নিয়েই ব্যস্ত আছি।
তোমরা বরং মুসার নিকট যাও, যার সাথে আল্লাহ স্বয়ং কথা বলেছেন। লোকেরা মূসা আ.-এর নিকট এসে বলবেন, আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। যেন তিনি আমাদের বিচার দ্রুত করেন। তিনি বলবেন, আমার সে যোগ্যতা নেই। কারণ, আমি অন্যায়ভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। আজ আমি আমাকে নিয়েই ব্যস্ত আছি। তোমরা বরং রুহুল্লাহ ও আল্লাহর কালেমা হযরত ঈসা আ. নিকট যাও। লোকেরা তার নিকট এসে বলবে, আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন, যেন আল্লাহ আমাদের বিচার তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করে দেন। তিনি বললেন আমার সে যোগ্যতা নেই। কারণ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে এবং আমার মাকে ইলাহরূপে গ্রহণ করা হয়েছে। আজ আমি আমাকে নিয়েই চিন্তিত আছি। তবে একটি কথা! তোমরা বলো, যদি তোমাদের কারো কাছে কিছু সম্পদ থাকে, যা সে থলিতে রেখে সীলমোহর মেরে দেয়। সে সীলমোহর তোলা ব্যতীত উক্ত সম্পদ কি নেওয়া সম্ভব? সকলে বলবে না। তখন তিনি বলবেন, নিশ্চয় মুহাম্মদ -এর মাধ্যমে নবীদের আগমনের সমাপ্তি হয়েছে। তিনি আজ এখানেই আছেন। আল্লাহ তা'আলা তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। বরং তোমরা তার নিকট চলে যাও।
রাসূল বলেন, অতঃপর লোকেরা আমার নিকট আসবে। আমি বলব হ্যাঁ, আমি তা করব। এটি আমার কাজ। ফলে আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি দিবেন। অতঃপর তিনি আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছানুসারে কিছু সময় অতিবাহিত করবেন। এরপর আল্লাহ যখন বান্দাদের মাঝে বিচার সম্পাদনের ইচ্ছা করবেন, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা করে বলবে, মুহাম্মাদ ও তার উম্মত কোথায়? আমরাই হচ্ছি সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ। অর্থাৎ, দুনিয়াতে আমরা সর্বশেষ জাতি এবং কিয়ামতের দিন আমরা বিচারের আহ্বানপ্রাপ্ত সর্বপ্রথম জাতি। অতঃপর আমি ও আমার উম্মত দাঁড়াবো। অন্যান্য সকল জাতি আমাদের জন্য পথ ছেড়ে দেবে। আমাদের উযূর অঙ্গগুলো পবিত্রতার কারণে ঝলমল করতে থাকবে। অন্যান্য সকলে আমাদের লক্ষ্য করে বলতে থাকবে, দেখ এ উম্মতের সকলেই মনে হয় নবী!
অতঃপর আমি জান্নাতের দরজার দিকে অগ্রসর হয়ে তা খুলে দেওয়ার আবেদন জানাব। বলা হবে কে তুমি? বলব, আমি মুহাম্মদ, আল্লাহর প্রেমিক রাসূল! তখন দরজা খুলে দেওয়া হবে। আমি প্রবেশ করে আমার রবের দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়ব এবং এমন সব প্রশংসা করব, যা ইতঃপূর্বে কেউ করেনি এবং পরবর্তীতেও কেউ করবে না। বলা হবে তুমি তোমার মাথা উত্তোলন কর। বলো, তোমার দাবী শোনা হবে, চাও তোমার চাওয়া পূরণ করা হবে এবং সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে। আমি মাথা তুলব। যার অন্তরে অণুপরিমাণও ঈমান আছে, তার জন্য সুপারিশ করব। অর্থাৎ, একীনের সাথে যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
টিকাঃ
১০০. সূরা সাফ্ফাত: আয়াত- ৮৮-৮৯
১০১. সূরা আম্বিয়া: আয়াত-৬৩
১০২. সহীহ বুখারী: হাদীস-৭৫১০; সহীহ মুসলিম হাদীস-১৯৩; (সামান্য শাব্দিক পরিবর্তনসহ); সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪৩১২; মুসনাদে আহমাদ : ৪/৪২৭ (সম্পূর্ণ হাদীসটি মুসনাদের সনদে বর্ণিত); শায়েখ শুয়াইব আরনাউত বলেন, হাদীসটি হাসান লিগইরিহী তবে ঈসা আলাইহিস সালাম এর মাবুদরুপে গ্রহণ করার বক্তব্যটুকু বাদে কেননা সহীহ বর্ণনায় এই অংশটুকু আসেনি।
📄 হাশরের ভয়াবহতা লক্ষ্য করে প্রত্যেকেই ভাববে আজ আমার মুক্তির নেই
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ، وَهُوَ يَقْرَأُ: وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ (الزمر: ٦٧) فَيَقُولُ: يَأْخُذُ الْجَبَّارُ سَمَوَاتِهِ وَأَرَاضِيهِ بِيَدَيْهِ جَمِيعًا، ثُمَّ يَقْبِضُ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى، فَيَقُولُ: أَنَا الْجَبَّارُ، أَنَا الْمَلِكُ، أَنَا الْقُدُّوسُ، أَنَا السَّلَامُ أَنَا الْمُؤْمِنُ، أَنَا الْمُهَيْمِنُ، أَنَا الْعَزِيزُ أَنَا الْكَبِيرُ، أَنَا الْمُتَكَبِّرُ، أَنَا الَّذِي ابْتَدَأْتُ الْأَشْيَاءَ وَلَمْ يَكُنْ شَيْءٌ، أَنَا الَّذِي أُعِيدُهَا، فَأَيْنَ الْمُلُوكُ، وَأَيْنَ الْجَبَابِرَةُ؟ وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحَرِّكُ يَدَهُ يَقْبِضُهَا وَيَبْسُطُهَا وَهُوَ عَلَى الْمِنْبَرِ، فَيُرْجَفُ بِهِ حَتَّى نَقُولَ لِيَخِرَّنَّ بِهِ، ثُمَّ قَرَأَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَوْمَ يَأْتِي لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ (هود : ١٠٥) وَكُلُّ نَبِيٌّ يَوْمَئِذٍ يَقُولُ: اللَّهُمَّ سَلَّمْ، اللَّهُمَّ سَلِّمْ.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। আমি রাসূল ﷺ কে মিম্বরে দাঁড়িয়ে এই আয়াত পাঠ করতে শুনেছি- وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ অর্থ: আসমান ও জমিন তাঁর ডান হাতের মুঠোয় থাকবে।৬৯ তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলা আসমান ও জমিনকে তাঁর দুই হাতে নিবেন। অতঃপর এক হাতে অন্য হাতের উপর রেখে বলবেন, আমিই শক্তিশালী, আমিই রাজা, আমিই পবিত্র, আমিই নিরাপত্তা দানকারী, আমিই রক্ষক, আমিই পরাক্রমশালী, আমিই বড়, আমিই অহংকারী, আমিই সবকিছু সৃষ্টি করেছি, আমিই আবার সবকিছু ফিরিয়ে আনব। কোথায় আজ রাজা-বাদশাহরা? কোথায় আজ পরাক্রমশালীরা? রাসূল ﷺ একথা বলার সময় তাঁর হাত মুষ্টিবদ্ধ করছিলেন আর খুলছিলেন, এতে মিম্বর কাঁপতে শুরু করল, আমাদের মনে হলো তিনি পড়ে যাবেন। এরপর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন-
يَوْمَ يَأْتِي لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ
অর্থ: সেদিন যখন আসবে, তখন আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না। তাদের মধ্যে কেউ হবে হতভাগা আর কেউ হবে সৌভাগ্যবান। ৭০
প্রত্যেক নবীও সেদিন বলবেন, اللَّهُمَّ سَلِّمْ، اللَّهُمَّ سَلِّمْ হে আল্লাহ আমাকে রক্ষা করুন, হে আল্লাহ আমাকে রক্ষা করুন।
ٹکا:
৬৯. সূরা যুমার: আয়াত-৬৭
৭০. সূরা হুদ: আয়াত-১০৫
হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত— একবার তিনি মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন কা'ব আল-আহ্বার রহ. মানুষদের হাদীস শোনাচ্ছে। তিনি তাকে বললেন, হে কা'ব আমাদেরকে কিছু ভয়ের কথা শোনাও। কা'ব বললেন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তা'আলা কিছু ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন, যারা সৃষ্টির পর থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কখনো তারা সামান্যতমও ঝুঁকেননি। অপর কিছু ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন, যারা সেজদারত আছে। কখনো মাথা তোলেননি। শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া পর্যন্ত তারা এভাবেই থাকবেন। শিঙ্গা ফুৎকার দেওয়ার পর তারা সমস্বরে বলবেন, হে আল্লাহ! আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। আমরা আপনার যথাযথ ইবাদত করতে পারিনি, যেভাবে আপনার ইবাদত করা উচিত ছিল। ওই সত্ত্বার শপথ। যার হাতে আমার প্রাণ। নিশ্চয় জাহান্নাম কিয়ামতের দিন অতি নিকটে চলে আসবে এবং তার থাকবে কর্কশ আর্তনাদ। যখন সে নিকটে আসবে, তখন এমন এক ভয়ানক চিৎকার করে উঠবে যে, নবী ও শহীদসহ সকল মানুষ নতজানু হয়ে লুটিয়ে পড়বে। প্রত্যেক নবী সিদ্দীক ও শহীদগণ বলবেন, হে রব। আমি আপনার কাছে নিজের জন্যই প্রার্থনা করছি। ইব্রাহীম আ. পুত্র ইসমাঈল আ. ও ইসহাক আ.-এর কথা বিস্মৃত হবেন। বলবেন, হে রব! আমি আপনার বন্ধু ইব্রাহীম আ.। হে ইবনে খাত্তাব, তোমার সঞ্চয়ে যদি সত্তর জন নবীর আমলও থাকে, তবুই তুমি ভাববে যে, আজ রক্ষা নেই। তখন উপস্থিত লোকেরা সশব্দে কেঁদে উঠলেন।
📄 কালেমা জান্নাতে যাওয়ার কারণ
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : يُخْرَجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَكَانَ فِي قَلْبِهِ مِنَ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ شَعِيرَةً، ثُمَّ يُخْرَجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَكَانَ فِي قَلْبِهِ مِنَ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ بُرَّةً، ثُمَّ يُخْرَجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَكَانَ فِي قَلْبِهِ مِنَ الْخَيْرِ مَا يَزِنُ ذَرَّةً.
হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, যাদের অন্তরে একটি যব পরিমাণও ঈমান থাকবে, আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। এরপর যাদের অন্তরে একটি গম পরিমাণও ঈমান থাকবে, আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। এরপর যাদের অন্তরে একটি অণু পরিমাণও ঈমান থাকবে, আল্লাহ তাদেরকেও জাহান্নাম থেকে বের করবেন।৭১
টিকাঃ
৭১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৪; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৯৩।
হযরত উমর রাযি. এই পরিস্থিতি দেখে বললেন, হে কা'ব আমাদেরকে আনন্দিত কর। কা'ব রাযি. বললেন, তোমরা আনন্দিত হও। আল্লাহ তা'আলার তিন শত তেরটি শরীয়ত রয়েছে। কিয়ামতের দিন কেউ যদি তার একটি নিয়ে ইখলাসের কালেমাসহ উপস্থিত হয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দিবেন। আল্লাহর শপথ! তোমরা যদি আল্লাহ তা'আলার করুণার রহস্য সম্পর্কে জেনে যাও, তবে আমলে তোমাদেরকে অলসতা পেয়ে বসবে।
তাই উত্তম কর্ম সম্পাদন এবং মন্দকর্ম পরিহারের মাধ্যমে সে দিনের জন্য তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ কর। অচিরেই তোমাকে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার মুখোমুখি হতে হবে। জীবনের যে সোনালি দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে গেছে, তার জন্য তোমার আফসোসের শেষ থাকবে না। মনে কর তোমার মৃত্যু থেকেই তোমার কিয়ামতের সূচনা। যেমন হযরত মুগীরা বিন শুবা রাযি. বলেছেন, তোমরা বলো কিয়ামত, কিয়ামত। অথচ মৃত্যুই তো তোমাদের কিয়ামত।
আলকামা বিন কায়েস একবার জনৈক ব্যক্তির জানাযায় ছিলেন। তাকে দাফন করা হলে তিনি বললেন, এ ব্যক্তির কিয়ামত তো কায়েম হয়ে গেছে। তিনি এরূপ বলেছেন। কারণ, যার মৃত্যু হয়েছে কিয়ামতের দিনের ঘটনা পরম্পরা তার দৃষ্টির সামনে চলে এসেছে। সে চোখের সামনেই জান্নাত, জাহান্নাম ও ফেরেশতাগণকে দেখতে পাচ্ছে এবং তার আমলের দরজা ইতোমধ্যে রুদ্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং সে যেন প্রকারন্তর কিয়ামতের দিন উপনীত হয়েছে। মৃত্যুর মাধ্যমে তার আমলের সীলমোহর হয়ে গেছে, কিয়ামতের দিন তার আমলনামায় নতুন কিছু যোগ হবে না। ধন্য সে জন, যার সমাপ্তি হয়েছে কল্যাণের মাধ্যমে。
হযরত আবূ বকর ওয়াসিতী রহ. বলেন, ঐশ্বর্য তিন ধরনের। জীবনের ঐশ্বর্য, মৃত্যুকালীন ঐশ্বর্য এবং কিয়ামত দিনের ঐশ্বর্য। জীবনের ঐশ্বর্য হলো, আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যে জীবন অতিবাহিত করা। মৃত্যুকালীন ঐশ্বর্য হলো, তার আত্মা কালিমা পাঠ করতে করতে বের হওয়া। আর চুড়ান্ত ঐশ্বর্য হলো, যখন কিয়ামত দিবসে কবর থেকে উত্থিত হয়, তখন সুসংবাদদাতা তাকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করে।
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মায়ায রহ. থেকে বর্ণিত— একবার তার মজলিসে নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করা হলো— يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفُدًا وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَى جَهَنَّمَ وِرْدًا. অর্থ: যেদিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীগণকে সম্মানিত মেহমানরূপে সমবেত করব এবং অপরাধীদেরকে তৃষ্ণাতুররূপে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। অর্থাৎ, মুত্তাকীগণকে বাহনে চড়িয়ে আনা হবে আর অপরাধীদেরকে আনা হবে হাঁটিয়ে তৃষ্ণার্তরূপে।
তখন তিনি বললেন, হে লোক সকল! ধৈর্য ধারণ কর। অচিরেই তোমাদেরকে হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে। এক একজন করে তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দাঁড় করানো হবে। তোমরা যা করেছ, সে সম্পর্কে শব্দে শব্দে জিজ্ঞাসা করা হবে। অলীদেরকে রহমানের দরবারে মেহমানরূপে বরণ করে নেওয়া হবে। গুনাহগারদেরকে হাঁকিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারা দলে দলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। এসব তখন ঘটবে যখন দুনিয়াকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে, ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে, আর জাহান্নামকে টেনে আনা হবে ধ্বংসের রূপ নিয়ে।
📄 কিয়ামত দিনের দীর্ঘতা
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قِيلَ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَوْمًا كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، مَا أَطْوَلَ هَذَا الْيَوْمَ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّهُ لَيُخَفَّفُ عَلَى الْمُؤْمِنِ حَتَّى يَكُونَ عَلَيْهِ أَخَفَّ مِنْ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ يُصَلِّيهَا فِي الدُّنْيَا.
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, يَوْمًا كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ অর্থ: সে দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর।৭২ সেদিনটি তো অনেক দীর্ঘ! রাসূল ﷺ ইরশাদ করলেন, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, মুমিনের জন্য সে দিনটি অনেক হালকা করে দেওয়া হবে, দুনিয়ার এক ওয়াক্ত ফরজ নামায পড়ার চেয়েও হালকা মনে হবে। ৭৩
ٹکا:
৭২. সূরা মাআরিজ: আয়াত-৪
৭৩. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১১৭৫১; সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস-৭৩৩৪; হাদীসটি সহীহ।
হে ভায়েরা! তোমাদের জন্য রয়েছে সেই দিনের দুর্ভোগ যার পরিমাণ হলো, পঞ্চাশ হাজার বছর। সেদিন হবে প্রকম্পনের, ধ্বংসযজ্ঞ, হতাশা ও নৈরাশ্যের। সে এক কঠিন দিন। সেদিন সমস্ত মানুষ রাব্বুল আলামিনের সামনে হাজির হবে। সে দিন হবে তুলনা, হিসাব, ওজন, জিজ্ঞাসাবাদ কম্পন, অর্তনাদ, অবশ্যম্ভী মহাপ্রলয় ও পুনরুত্থান দিন। সেদিন ইতঃপূর্বে কী আমল করেছ, তা সম্মুখে উপস্থিত দেখতে পাবে। সেদিন হবে জয়-পরাজয়ের দিন। সে দিন মানুষ তাদের আমল দেখার জন্য দলে দলে বের হয়ে আসবে। সেদিন কারো মুখমণ্ডল হবে শুভ্র, আলোকোজ্জ্বল, আবার কারো হবে কালো। সেদিন দুনিয়ার কোনো অভিভাবক কাজে আসবে না, কোনো কৌশলই কাজে খাটবে না। পুত্র পিতার, কিংবা পিতা পুত্রের কোনো কাজে আসবে না। সে দিন সকল ফন্দি ব্যর্থ হবে। জালেমদের ওযর আপত্তি কাজে আসবে না। সেদিন প্রত্যেকেই অপরের সাথে বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হবে। প্রত্যেক স্তন্যদানকারীনী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী গর্ভপাত করে ফেলবে। আর তোমরা সেদিন সকলকে দেখবে, যেন নেশায় মত্ত, আসলে তারা নেশায় মত্ত না। বরং আল্লাহর আযাব বড় কঠিন।
হযরত মুকাতিল বিন সুলাইমান রহ. বলেন, কিয়ামতের দিন সকল সৃষ্টি একশত বছর ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। একশত বছর অন্ধকারে কাটাবে, দিশেহারা হয়ে। আর একশত বছর তাদের রবের নির্দেশের সম্মুখে পরস্পর বিবাদ করে কাটাবে। বলা হয়, কিয়ামত দিনের সময়কাল এক হাজার বছর। তবে মুমিন মুখলিস ব্যক্তির জন্য তা মনে হবে একটি ঘণ্টা কেবল।
সুতরাং হে জ্ঞানী ব্যক্তি! দুনিয়ার যন্ত্রণা ও তীব্রতায় আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ধৈর্য-ধারণ কর, যাতে কিয়ামতের বিভীষিকা তোমার জন্য সহজ হয়ে যায়।