📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 শিঙ্গায় ফুৎকার

📄 শিঙ্গায় ফুৎকার


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ خَلَقَ الصُّورَ فَأَعْطَاهُ إِسْرَافِيلَ، فَهُوَ وَاضِعُهُ عَلَى فِيهِ شَاخِصُ بِبَصَرِهِ إِلَى الْعَرْشِ يَنْتَظِرُ مَتَى يُؤْمَرُ، قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا الصُّورُ؟ قَالَ: قَرْنٌ مِنْ نُورٍ. قُلْتُ: كَيْفَ هُوَ؟ قَالَ: عَظِيمٌ وَالَّذِي بَعَثَنِي بِالْحَقِّ، إِنَّ دَائِرَةَ فِيهِ لَعَرْضُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَنْفُخُ فِيهِ ثَلَاثَ نَفَخَاتٍ. الْأُولَى نَفْخَةُ الْفَزَعِ، وَالثَّانِيَةُ نَفْخَةُ الصَّعْقِ، وَالثَّالِثَةُ نَفْخَةُ الْقِيَامِ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ، فَيَأْمُرُ اللَّهُ تَعَالَى إِسْرَافِيلَ بِالنَّفْخَةِ الْأُولَى، فَيَقُولُ: انْفُخْ نَفْخَةَ الْفَزَعِ، فَيَنْفُخُ فَيَفْزَعُ أَهْلُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ وَيَأْمُرُهُ اللَّهُ فَيُدِيمُهَا وَيُطَوِّلُهَا، فَلَا يَفْتُرُ وَهِيَ الَّتِي يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ (ص: ١٥).

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। আল্লাহ যখন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি শিংগাও সৃষ্টি করলেন। তা তিনি হযরত ইস্রাফিল আ. কে দিলেন। তখন থেকে তিনি তা মুখে লাগিয়ে রেখে আরশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কখন ফুৎকারের আদেশ হয় সে অপেক্ষায়। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! শিংগা কী? তিনি বললেন, আলোর শিং। আমি বললাম, তা কেমন? তিনি বললেন, বিশাল, ওই সত্তার কসম যিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, এর ভেতরের বৃত্ত আসমান ও জমিনের সমান। এতে তিনবার ফুঁ দেওয়া হবে। ১ম বার ভয় প্রদর্শনের ফুঁ, ২য় বার অজ্ঞান হওয়ার ফুঁ, তৃতীয় বার রাব্বুল আলামীনের জন্য দণ্ডায়মান হওয়ার ফুঁ। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল আ.-কে প্রথম ফুঁ দিতে বলবেন, তিনি ফুঁ দিবেন এবং আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা করেন সে ছাড়া আসমান জমিনের সকলেই ভীত হয়ে পড়বে। আল্লাহ তাকে আদেশ করবেন, এটা যেন দীর্ঘায়িত হয় এবং সে বিরতিহীনভাবে ফুঁ দিতে থাকবে। এ সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ অর্থ: এরা তো কেবল একটি প্রচন্ড শব্দের অপেক্ষা করছে যাতে কোনো বিরাম থাকবে না।৬৩

টিকাঃ
৬৩. সূরা সোয়াদ: আয়াত-১৫

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেছেন; দুই শিঙ্গার মাঝে চল্লিশ বছরের ব্যবধান হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আসমান থেকে পুরুষের বীর্যের মতো এক প্রকার পানি বর্ষণ করবেন, ফলে মানুষ সবজি উৎপন্নের মতো মাটি থেকে উৎপন্ন হবে।

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা আসমান জমিন সৃষ্টির পর "সূর” সৃষ্টি করলেন এবং তা ইসরাফীলকে দিলেন। ইসরাফীল তা মুখে রেখে আরশের দিকে তাকিয়ে হুকুমের অপেক্ষা করছেন, কখন তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সূর কী? তিনি বললেন, নূরের শিঙ্গা। আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সেটি কেমন? তিনি বললেন, তা সুবিশাল, সুপ্রশস্ত। সেই সত্তার শপথ, যিনি আমাকে সত্য দিয়ে নবীরূপে প্রেরণ করেছেন, তার প্রশস্ততার বিস্তৃতি আসমান জমিনের সমান। তাতে তিনবার ফুৎকার দেওয়া হবে।

অন্যান্য বর্ণনা মতে, ফুৎকার হবে দু'টি। একটি ধ্বংসের জন্য। আর অপরটি পুনরুত্থানের জন্য। হযরত কা'ব রাযি.-এর বর্ণনায় আছে, ফুৎকার হবে দুটি। আবূ হুরায়রা রাযি.-এর বর্ণনায় আছে, ফুৎকার হবে তিনটি। একটি ফুৎকার ভীতির জন্য, আরেকটি বেহুঁশ করার জন্য এবং সর্বশেষ ফুৎকার হবে পুনরুত্থানের জন্য। আল্লাহ তা'আলা ইসরাফীলকে প্রথম ফুৎকারের নির্দেশ দিবেন। ফুৎকারের ফলে আসমান জমিনের সকল প্রাণী জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। একেই কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে,
وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ
অর্থ: আর স্মরণ কর, সে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, ফলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত আসমান-জমিনের ভিতরের সবই প্রকম্পিত হবে। তখন জমিন প্রকম্পিত হবে। আর প্রত্যেক স্তন্যদানকারীনী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং গর্ভবতী নারী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখে মনে হবে, যেন তারা নেশাগ্রস্ত অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়, বরং আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। শিশুরা বৃদ্ধে পরিণত হবে, শয়তান দিশেহারা হয়ে পালাতে থাকবে, যেমন আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন কঠিন জিনিস। সেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদানকারীনী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং গর্ভবতী নারী তার গর্ভপাত করে দেবে। মানুষকে মনে হবে, যেন তারা নেশাগ্রস্ত অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বরং আল্লাহর আযাব কঠিন।

টিকাঃ
৮১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৮১৪, ৪৯৩৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯৫৫; বুখারী-মুসলিমে শুধুমাত্র চল্লিশের কথা উল্লেখিত হয়েছে। চল্লিশ দিন, মাস নাকি বছর এ ব্যাপারে আবু হুরায়রা রাযি. কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অস্বীকার করে বলেছিলেন- "আমি এভাবেই রাসূল কে বলতে শুনেছি। ইমাম নববী মুসলিমের এই হাদীসের ব্যাখায় চল্লিশ বছরের বর্ণনার রেওয়ায়েত আছে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইবনে মারদুইয়া'র চল্লিশ বছরের একটি হাদীস এনে তাকে শায বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনে আব্বাসের বক্তব্য হিসেবে চল্লিশ বছরের বর্ণনাকে জয়ীফ বলেছেন। [বিস্তারিত দেখুন: ফাতহুল বারী: ১১/৩৬৭-৩৭১ (৪৮১৪ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)।।
৮২. আল-আহাদীসুত-তিওয়াল লিত ত্ববারানী : হাদীস-৩৬; কিতাবুল বা'সি ওয়ান নুশুর লিল বাইহাকী : হাদীস-৬৬৯; তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা আনয়ামের ৭৩ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য; ফাতহুল বারী: ১১/৩৬৭-৩৭১। হাদীসটি হাদিসে সূর আত-তুওয়াল নামে প্রসিদ্ধ। এখানে সেই দীর্ঘ হাদীসের প্রথম অংশ উল্লেখিত হয়েছে। হাদীসটির সনদ নিতান্তই জয়ীফ। এর সনদে ইসমাঈল ইবনে রাফি' নামক বিতর্কিত রাবী রয়েছে। তবে দীর্ঘ হাদীসের কিছু অংশের শাওয়াহেদ (সমর্থনে গ্রহণযোগ্য হাদীস) বিদ্যমান এবং কিছু অংশ মুনকার বা আপত্তিকর।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 পৃথিবী যেভাবে ধ্বংস হবে

📄 পৃথিবী যেভাবে ধ্বংস হবে


ثُمَّ يُسَيِّرُ اللَّهُ الْجِبَالَ فَتَكُونُ سَرَابًا، وَتُرَجُّ الْأَرْضُ بِأَهْلِهَا رَجَّا، فَتَكُونُ كَالسَّفِينَةِ الْمُوبَقَةِ فِي الْبَحْرِ، تَضْرِبُهَا الْأَمْوَاجُ وَتَكْفَأُهَا، وَكَالْقِنْدِيلِ الْمُعَلَّقِ بِالْعَرْشِ تُرَجْرِجُهُ الْأَرْوَاحُ، فَتَمِيدُ النَّاسُ عَلَى ظَهْرِهَا، فَتَذْهَلُ الْمَرَاضِعُ عَمَّا أَرْضَعَتْ، وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا، وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ (الحج : (٢) فَيَشِيبُ الْوِلْدَانُ وَتَطِيرُ الشَّيَاطِينُ هَارِبَةً مِنْ هَذَا الْفَزَعِ، حَتَّى تَأْتِيَ أَقْطَارَ الْأَرْضِ فَتَتَلَقَّاهَا الْمَلَائِكَةُ فَتَضْرِبُ وُجُوهَهَا وَتَرُدُّهَا عَلَى أَدْبَارِهَا، وَيُنَادِي النَّاسُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا وَيَمُوجُ بَعْضُهُمْ فِي بَعْضٍ.

অতঃপর আল্লাহ পাহাড়গুলো চালু করে দিবেন এবং সেগুলো মরীচিকার মতো হয়ে যাবে, জমিন তার অধিবাসীদের নিয়ে কম্পন করতে থাকবে। তার অবস্থা সাগরে ভাসমান নৌকার মতো হবে, যা উপর-নীচ হতে থাকে। অথবা এমন লণ্ঠনের মতো হবে যা বাতাসে দুলতে থাকে। তখন মানুষ দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করবে, স্তন্যদানকারী মাতা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। তুমি মানুষকে দেখবে মাতালের মতো, অথচ তারা মাতাল নয়; বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন। ৬৪ সেদিন বালক বৃদ্ধ হয়ে যাবে। শয়তানও ভয়ে পালাতে থাকবে। এমন সময় ফেরেশতাদের একটি দলের সাথে তার সাক্ষাৎ হবে। তারা তার চেহারা ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে তাকে ফিরিয়ে দেবে। মানুষ একে অপরকে ডাকতে থাকবে এবং একে অপরের উপর পতিত হতে থাকবে।

টিকাঃ
৬৪. সূরা হজ্জ: আয়াত-২

আল্লাহ তা'আলার যতদিন ইচ্ছা এভাবেই থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইসরাফীলকে নির্দেশ দিবেন, সে বেহুঁশ করার (মৃত্যু বরণের) জন্য ফুৎকার দেবে। আসমান ও জমিনের সকলেই বেহুঁশ হয়ে যাবে অর্থাৎ, মৃত্যুবরণ করবে। তবে আল্লাহ তা'আলা যাকে চান সে ব্যতীত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ
অর্থ: আর শিঙ্গায় ফুৎকার প্রদান করা হবে, ফলে আসমানসমূহ ও জমিনের সকলে জ্ঞানহারা হয়ে পড়বে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সে ব্যতীত।
তবে আল্লাহ যাকে চান দ্বারা শহীদদেরকে বুঝানো হয়েছে। কেউ বলেন, এর দ্বারা জিব্রাঈল, মিকাইল, ইসরাফিল ও মালাকুল মওত উদ্দেশ্য।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে বলবেন, আমার সৃষ্টির কে বাকি আছে? সে বলবে, হে রব আপনি চিরঞ্জীব, আপনার মৃত্যু নেই। জিবরাঈল, মিকাঈল, ইসরাফীল এবং আপনার আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ। আর বাকী আছি আমি। এরপর আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে তাদের রূহ কবজেরও নির্দেশ দিবেন। তিনি তাদের রূহ কবজ করবেন। কালবী ও মুকাতিলের বর্ণনায় এমনই আছে।
হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব-এর রেওয়ায়াত অনুসারে, আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত— অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জিবরাঈল, মিকাইল ও ইসরাফীল মৃত্যুবরণ করুক। আরশের বহনকারীরাও মৃত্যুবরণ করুক। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, হে মালাকুল মওত! আমার সৃষ্টির আর কে বাকি আছে? সে উত্তর দেবে, আপনি চিরঞ্জীব, যার কোনো মৃত্যু নেই। বাকি আছে কেবল আপনার দুর্বল বান্দা মালাকুল মওত। আল্লাহ বলবেন, হে মালাকুল মওত! তুমি আমার বাণী শোনোনি—
কُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ প্রতিটি প্রাণীই মরণশীল। তুমিও আমার এক সৃষ্টি। তোমাকে আমি সৃষ্টি করেছি আমার ইচ্ছানুসারে। সুতরাং তুমিও মৃত্যুবরণ কর। সেও মৃত্যুবরণ করবে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে নিজের রূহ কবজ করতে বলবেন। তখন সে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী এক স্থানে এসে নিজ রূহকে কবজ করবে এবং এমন ভয়ানক চিৎকার করবে যে, যদি সৃষ্টিকুলের সকলে জীবিত থাকত, তবে সকলেই মৃত্যুবরণ করত। এ সময় সে বলবে, আমি যদি জানতাম, রূহ কবজ করার তীব্রতা ও কষ্ট এতো কঠিন, তবে মুমিনগণের রূহ কবজ করার সময় সর্বাধিক সহজতা অবলম্বন করতাম। এভাবে তার মৃত্যু ঘটবে। তখন সৃষ্টিকুলের কেউ জীবিত থাকবে না। আল্লাহ তা'আলা এই নিকৃষ্টতর, নশ্বর দুনিয়াকে লক্ষ্য করে বলবেন, কোথায় রাজা-বাদশাহরা? রাজপুত্ররা আজ কোথায়? কোথায় অহংকারী? তাদের পুত্ররা কোথায়? কোথায় গেল তারা, যারা আমারই দেওয়া কল্যাণ উপভোগ করে অন্যের উপাসনা করত? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আজ কার হাতে সর্বময় রাজত্ব? জবাব দেওয়ার কেউ থাকবে না। ফলে আল্লাহ তা'আলা নিজেই জবাব দিবেন, আজকের রাজত্ব ক্ষমতাধর এক আল্লাহর।

টিকাঃ
৮৪. সূরা হজ্জ: আয়াত-১-২
৮৫. সূরা যুমার: আয়াত-৬৮
৮৬. সুরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৫
৮৭. সূরা আল মু'মিন/ গাফির: আয়াত-১৬

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 পুনরায় জীবিতকরণ

📄 পুনরায় জীবিতকরণ


فَبَيْنَمَا هُمْ عَلَى ذَلِكَ إِذْ تَصَدَّعَتِ الْأَرْضُ مِنْ قُطْرِ إِلَى قُطْرٍ، وَرَأَوْا أَمْرًا عَظِيمًا لَمْ يَرَوْا مِثْلَهُ، فَأَخَذَهُمُ الْفَزَعُ حَتَّى ذَهِلَتْ عُقُولُهُمْ، ثُمَّ نَظَرُوا إِلَى السَّمَاءِ، فَإِذَا هِيَ كَالْمُهْلِ ثُمَّ خُسِفَتْ شَمْسُهَا وَقَمَرُهَا، وَانْتَثَرَتْ نُجُومُهَا، ثُمَّ كُشِطَتْ عَنْهُمْ، قَالَ: فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى: يَا جِبْرِيلُ أَنْتَ عَلَى مَا وَكَّلْتُكَ، وَيَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَنْتَ عَلَى مَا وَكَّلْتُكَ. ثُمَّ يَأْمُرُ اللهُ تَعَالَى إِسْرَافِيلَ بِنَفْخَةِ الصَّعْقِ فَيَنْفُخُ، فَيُصْعَقُ أَهْلُ السَّمَوَاتِ وَأَهْلُ الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ، فَإِذَا هُمْ قَدْ خَمَدُوا فَيَأْتِي مَلَكُ الْمَوْتِ إِلَى الْجَبَّارِ، فَيَقُولُ: قَدْ مَاتَ أَهْلُ السَّمَوَاتِ، وَأَهْلُ الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ، فَيَقُولُ وَهُوَ أَعْلَمُ: فَمَنْ بَقِيَ؟ فَيَقُولُ: بَقِيتَ أَنْتَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ، وَبَقِيتُ أَنَا، وَبَقِيَ حَمَلَةُ الْعَرْشِ، وَبَقِيَ جِبْرِيلُ وَمِيكَائِيلُ، وَيَقُولُ: فَيَمُوتُ جِبْرِيلُ وَمِيكَائِيلُ، ثُمَّ يَقُولُ لِحَمَلَةِ الْعَرْشِ فَيَمُوتُونَ، ثُمَّ يَأْتِي مَلَكُ الْمَوْتِ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ قَدْ مَاتَ حَمَلَةُ الْعَرْشِ. فَيَقُولُ وَهُوَ أَعْلَمُ: فَمَنْ بَقِيَ؟ فَيَقُولُ: بَقِيتَ أَنْتَ الْحَيُّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وَبَقِيتُ أَنَا فَيَقُولُ: يَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَنْتَ خَلْقٌ مِنْ خَلْقِي، خَلَقْتُكَ لِمَا أَرَدْتُ، فَمُتْ. فَيَمُوتُ ثُمَّ يُنَادِي الْجَبَّارُ: لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ فَلَا يُجِيبُهُ أَحَدٌ، فَيَقُولُ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ. ثُمَّ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ تَعَالَى وَأَوَّلُ مَنْ يُبْعَثُ إِسْرَافِيلُ وَجِبْرِيلُ وَمِيكَائِيلُ وَمَلَكُ الْمَوْتِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ. فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى: كَمْ لَبِثْتُمْ؟ فَيَقُولُونَ: لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ إِلَّا أَنَّكَ لَمْ تُمِتْنَا. فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى لِإِسْرَافِيلَ: قُمْ فَانْفُخْ فِي الصُّورِ نَفْخَةَ الْبَعْثِ، فَيَنْفُخُ، فَيَكُونُ الْعِبَادُ فَرِيقَيْنِ فَرِيقًا فِي الْجَنَّةِ، وَفَرِيقًا فِي السَّعِيرِ.

এমন অবস্থায় যখন জমিন বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং এমন সব বিষয় ঘটবে যা মানুষ কখনো দেখেনি। এতে মানুষ অস্থির হয়ে জ্ঞান হারাতে থাকবে। তারপর তারা আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখবে, তা গলিত তামার মতো হয়ে গেছে। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ লেগে যাবে। তারাগুলোও একে একে খসে পড়বে এবং আকাশকে গুটিয়ে নেওয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল আ. ও মালাকুল মওতকে বলবেন, তোমরা নিজেদের দায়িত্বে স্থির থাকো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইসরাফিল আ.কে ফুঁক দেওয়ার আদেশ দিলে তিনি ফুঁক দিবেন। ফলে আল্লাহ যাদের চাইবেন, তারা ছাড়া আসমান জমিনের সকলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। তাদের মধ্যে কোনোরূপ প্রাণ থাকবে না। তখন মালাকুল মওত বলবেন, হে পরওয়ারদিগার! আসমান ও জমিনের সকলেই মৃত্যুবরণ করেছে শুধু আপনি, আমি, আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ, জিবরাঈল ও মিকাইল ছাড়া। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জিবরাঈল ও মিকাইলকেও মৃত্যু দাও। অতঃপর তারা উভয়ে মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তা'আলা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মৃত্যু ঘটাবেন। তারপর মালাকুল মওত বলবেন, হে রব! আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণও মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেন, আর কে বাকি আছে? মালাকুল মওত বলবেন, আপনি চিরঞ্জীব এবং আমি। আল্লাহ বলবেন, তুমি তো আমার সৃষ্টি। আমি তোমাকে যে জন্য সৃষ্টি করেছিলাম তা তুমি করেছ, এবার তুমিও মরে যাও। তখন মালাকুল মওতও মারা যাবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করবেন- لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ আজ রাজত্ব কার? কেউ কোনো উত্তর দিবে না। তখন তিনিই জবাব দিবেন- لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহ্র। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল, মিকাইল ও ইসরাফিল এবং মালাকুল মওতকে জীবিত করবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলবে, আপনি তো আমাদেরকে মৃত্যু দেননি, আমরা তো একদিন বা তার চেয়ে কম সময় ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ ইসরাফিলকে বলবেন, যাও তুমি শিংগায় ফুঁক দাও। তিনি শিংগায় ফুঁক দিবেন এবং সকল মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হবে। একদল জান্নাতে অপরদল জাহান্নামে যাবে। ৬৪

অতঃপর তিনি আসমানকে বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। আসমান ক্রমাগত চল্লিশ দিন পুরুষের বীর্যের মতো বৃষ্টি বর্ষণ করবে। বর্ষণের ফলে সব কিছু ১২ হাত পানিতে ডুবে যাবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুলের সবাইকে সবুজ শস্যের ন্যায় নতুন করে সৃষ্টি করবেন। ফলে তাদের দেহ পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। এরপর আল্লাহ বলবেন, ইসরাফীল এবং আরশ বহনকারীরা জীবিত হোক। আল্লাহর নির্দেশে তারা জীবিত হবে। অতঃপর ইসরাফীল আল্লাহর নির্দেশে শিঙ্গা মুখে রাখবে। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় বললেন, জিবরাঈল ও মিকাঈল জীবিত হোক! তারাও আল্লাহর নির্দেশে জীবিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা রূহসমূহকে আহ্বান করবেন, তাদেরকে এনে শিঙ্গায় স্থাপন করা হবে। ইসরাফীল আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে পুনরুত্থানের জন্য শিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। ফুৎকারের ফলে রূহসমূহ মৌমাছির মত ছড়িয়ে পড়ে আসমান-জমিন ভরে যাবে। এরপর রূহসমূহ মাটির নীচে প্রবেশ করবে। আর তাদের উপর থেকে মাটি সরে যাবে। রাসূল বলেন, সর্বপ্রথম আমার উপর থেকেই মাটি সরে যাবে।
অন্য হাদীসে আছে, আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল, মিকাঈল ও ইসরাফীলকে জীবিত করবেন, তারা বোরাক এবং জান্নাতী পোশাক নিয়ে রাসূল -এর রওজা মুবারকে আসবেন। তার কবরের জমিনকে বিদীর্ণ করা হবে। তখন রাসূল জিবরাঈল আ.-এর দিকে তাকিয়ে বলবেন, হে জিবরাঈল! এ কোন দিন? তিনি বলবেন, এ হলো, কিয়ামত দিন। এ হলো, মহাপ্রলয় ও মহাদুর্যোগ দিন। রাসূল তখন বলবেন, হে জিবরাঈল! আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন? তখন জিবরাঈল বলবেন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যার থেকে জমিনকে বিদীর্ণ করা হয়েছে।

টিকাঃ
৮৮. আল-আহাদীসুত-তিওয়াল লিত ত্ববারানী : হাদীস-৩৬; কিতাবুল বা'সি ওয়ান নুশুর লিল বাইহাকী : হাদীস-৬৬৯; তাফসীরে ইবনে কাসীর সূরা আনয়ামের ৭০ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য; ফাতহুল বারী: ১১/৩৬৭-৩৭১।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 কিয়ামতের ভয়াবহতা

📄 কিয়ামতের ভয়াবহতা


عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَيْفَ أَنْعَمُ، وَصَاحِبُ الْقَرْنِ قَدِ الْتَقَمَ الْقَرْنَ، وَحَنَى جَبْهَتَهُ، وَأَصْغَى السَّمْعَ مَتَى يُؤْمَرُ بِالنَّفْخِ فَيَنْفُخُ. قَالَ الْمُسْلِمُونَ: فَمَا نَقُولُ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: قُولُوا: حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا.
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আমি কীভাবে আরাম-আয়েশে থাকব, অথচ শিংগায় ফুৎকারকারী শিংগা মুখে নিয়ে কপাল নত করে কান পেতে রেখেছেন কখন ফুঁক দেওয়ার আদেশ হয়। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কী করব? রাসূল ﷺ বললেন, তোমরা বলবে, حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا অর্থ: আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক, আল্লাহর উপরই আমাদের ভরসা।৬৫

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ، قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ : يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ كَقُرْصَةِ النَّقِيِّ، لَيْسَ فِيهَا مَعْلَمٌ لِأَحَدٍ.

হযরত সাহল ইবনে সাদ রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে এমন এক সাদা জমিনের উপর উঠানো হবে, যেখানে কোনো পাহাড় পর্বত বা এমন কোনো বস্তু থাকবে না, যা দিয়ে কোনো কিছুকে চেনা যায়। ৬৬

ٹکا:
৬৫. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৩১; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১১০০৯; হাদীসটি সহীহ। ৬৬. সহীহ বুখারী: হাদীস-৬৫২১; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৭৯০।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইসরাফীলকে নির্দেশ প্রদান করবেন, তিনি শিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন, ফলে সকলে দাঁড়িয়ে যাবে এবং চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখবে।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত— অতঃপর লোকেরা কবর থেকে বের হয়ে উলঙ্গ দেহে ও নগ্নপদে দ্রুত তাদের রবের দিকে ছুটতে থাকবে। এরপর একই স্থানে সত্তর বছর দাঁড়িয়ে থাকবে। এ সময় আল্লাহ তাদের দিকে তাওয়াজ্জুহ দিবেন না এবং তাদের মাঝে ফায়সালাও করবেন না। তারা কাঁদতে থাকবে। ক্রমাগত কান্নার ফলে তাদের অশ্রু শুকিয়ে চোখ দিয়ে রক্ত পড়তে থাকবে। তাদের ঘাম এ পরিমাণ হবে যে, তা কারো নাক পর্যন্ত, কারো চিবুক পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। অতঃপর তাদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। এ প্রসঙ্গটিই কুরআনে এভাবে এসেছে— مُهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ অর্থ: আহ্বানকারীর দিকে তারা দৌড়ে যাবে। অর্থাৎ, হাশরের উদ্দেশ্যে দ্রুত চলতে থাকবে।

যখন সকল সৃষ্টি জিন-ইনসান একত্রিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, তখন হঠাৎ আসমান থেকে বিকট এক শব্দ শুনতে পাবে। এর ভয়ে সকলে প্রকম্পিত হয়ে পড়বে। আসমান বিদীর্ণ হবে এবং দুনিয়াবাসীর মতোই, আসমান থেকে ফেরেশতাগণ নেমে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবেন। লোকেরা তাদেরকে বলতে থাকবে, তোমাদের সাথে কি আমাদের রবের হিসাব সংক্রান্ত নির্দেশ রয়েছে? তারা বলবে, না, তা আসছে। অতঃপর দ্বিতীয় আসমানের ফেরেশতারা নেমে আসবে এবং দুনিয়ার আসমানের ফেরেশতাদের পরই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। এভাবে সাত আসমানের অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসবেন এবং সারিবদ্ধ হয়ে দুনিয়াবাসীর পাশে দাঁড়াবেন।

হযরত যাহ্হাক রহ. থেকে বর্ণিত— আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার আসমানকে নির্দেশ দিবেন। তা সকল ফেরেশতাকে নিয়ে বিদীর্ণ হবে। ফলে তারা অবতরণ করবেন এবং জমিন ও তার অধিবাসীদের পাশে দাঁড়াবেন। এভাবে সাত আসমানের ফেরেশতাগণ নেমে আসবেন এবং সাতটি কাতারে সারিবদ্ধ হবেন। তাদের একটি কাতার অপর কাতারের উপর থাকবে। দুনিয়াবাসী যেদিকেই তাকাবে, সাতটি কাতার তাদের পাশে দেখতে পাবে। একেই আল্লাহ তা'আলা কুরআনে এভাবে ইরশাদ করেছেন— হে জিন ও মানুষ সম্প্রদায়, তোমরা যদি আসমানসমূহ ও জমিনের সীমা অতিক্রম করতে পার, তবে কর। কিন্তু তোমরা অনুমতি ব্যতীত অতিক্রম করতে পারবে না। অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে— আর সে দিন আসমান মেঘমালাসহ বিদীর্ণ হবে এবং ফেরেশতাদেরকে নামিয়ে দেওয়া হবে।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূল বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বলবেন, হে জিন ও ইনসান! আমি তোমাদের জন্য পূর্ণ কল্যাণ কামনা করেছি। তোমাদের আমলসমূহ তোমাদের আমলনামায় রক্ষিত রয়েছে। যে তাকে উত্তম পাবে, সে যেন আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করে। আর যে ভিন্ন রকম পাবে সে যেন নিজেকেই তিরষ্কার করে।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামকে নির্দেশ দিবেন। ফলে তার ভিতর থেকে দীর্ঘ প্রশস্ত একটি কাঁধ বের হয়ে আসবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন— হে আদমের সন্তানেরা, আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দিইনি যে তোমরা শয়তানের দাসত্ব কর না। কারণ, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। বরং তোমরা আমারই ইবাদত কর। এটিই সরল পথ? শয়তান তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছে। তোমরা কি বুঝতে না? এটিই সে জাহান্নাম, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। আজ তোমরা তাতে প্রবেশ কর। কারণ, তোমরা একে অস্বীকার করতে।

অতঃপর প্রত্যেকে নতজানু হয়ে বসে পড়বে। কুরআনে বলা হয়েছে— এবং প্রত্যেক উম্মতকে দেখবে ভয়ে নতজানু। প্রত্যেক উম্মতকে তার আমলনামার প্রতি আহ্বান করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তার সৃষ্টির মাঝে বিচার আরম্ভ করবেন এবং অন্যান্য জানোয়ার ও চতুষ্পদ প্রাণীসমূহেরও বিচার করবেন। এমনকি শিং বিহীন প্রাণীকে শিংবিশিষ্ট প্রাণী থেকে বদলা নেবার সুযোগ করে দিবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা প্রাণীসমূহকে বলবেন, তোমরা মাটিতে পরিণত হও। কাফেররা তখন বলতে থাকবে— হায়, যদি আমি মাটিতে পরিণত হতাম! অতঃপর বান্দাদের মাঝে বিচার করা হবে।

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত— রাসূল ইরশাদ করেন, মানুষ যেভাবে মায়ের পেট থেকে আবরণহীন দেহ, নগ্ন পায়ে জন্মগ্রহণ করে, সেভাবে তাকে হাশর মাঠে সমবেত করা হবে। তখন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, পুরুষ ও নারীরা এক সাথে? রাসূল বললেন হ্যাঁ। আয়েশা রাযি. বললেন আশ্চর্য তো! তারা একে অপরের দিকে তাকাবে না? তখন রাসূল তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, হে আবু কুহাফার নাতনী! সেদিন মানুষের তাকানোর সুযোগ হবে না। তারা অপলক দৃষ্টিতে দীর্ঘ চল্লিশ বছর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কেউ পানাহার করবে না। তাদের কারো ঘাম পায়ের পাতা পর্যন্ত পৌঁছবে, কারো টাখনু পর্যন্ত, কারো উদর পর্যন্ত আবার কারো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাবে ফলে নাসিকা পর্যন্ত পৌঁছবে।

অতঃপর ফেরেশতাগণ আরশ ঘিরে দাঁড়াবে। আল্লাহ তা'আলার ঘোষক ঘোষণা দিবেন, অমুক নারীর পুত্র অমুক কোথায়? এ আওয়াজ শুনে সকলে মাথা উঁচু করে ঘোষণার প্রতি মনোযোগ দেবে। যাকে ডাকা হবে, সে সকলের ভিতর থেকে বের হয়ে আসবে। আহ্বানকৃত ব্যক্তি রবের সামনে দাঁড়াবে। বলা হবে, এ ব্যক্তির হাতে জুলুমের শিকার সকলে হাজির হও। এক এক করে সকলকে ডাকা হবে এবং উক্ত ব্যক্তির ভালো কাজগুলো মজলুমদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হবে। সেদিন কোনো টাকা পয়সা থাকবে না, বরং বিনিময়ের মাধ্যম হবে ভালো ও মন্দকর্ম। এভাবে মজলুম ব্যক্তিরা জালেমদের সব ভালোকর্ম নিয়ে নিবে। যখন আর একটি ভালো কাজও অবশিষ্ট থাকবে না, তখন তাদের মন্দকর্মগুলো তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে তখন তাকে বলা হবে, তুমি তোমার ঠিকান। হাবিয়া জাহান্নামে প্রবেশ কর। কারণ, আজ কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। সে দিন নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা, রাসূল কিংবা শহীদ সকলেই কঠোর ভয়াবহতার ফলে ভাববে যে, কেউ বাঁচতে পারবে না। তবে আল্লাহ নিজ করুণায় যাকে রক্ষা করবেন।

মুআয বিন জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, চারটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত কারো পা স্বীয় স্থান থেকে নড়বে না। ১. তার জীবন সম্পর্কে, কী কাজে তা ব্যয় করেছে? ২. তার দেহ সম্পর্কে, কোথায় তাকে ক্ষয় করেছে? ৩. তার ইলম সম্পর্কে, কী কাজে তা ব্যয় করেছে? ৪. তার সম্পদ সম্পর্কে, কোথেকে তা উপাজর্ন করেছে এবং কোথায় তা খরচ করেছে?

টিকাঃ
৮৯. সুরা আল কুমার: আয়াত-৮
৯০. সূরা আর রাহমান: আয়াত-৩৩
৯১. সুরা ফুরকান: আয়াত-২৫
৯২. সূরা ইয়াসিন: আয়াত-৬০-৬৪
৯৩. সূরা জাছিয়া: আয়াত-২৮
৯৪. সুরা নাবা: আয়াত-৪০
৯৫. আল আযামাহ লি আবিশ শায়েখ: ৩/৮৩১; মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ: ১/৯০।
৯৬. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৪৭৫; মুসনাদে আবি ইয়া'লা : ১০/৭৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৮/৩৬৫ (ঘামের অংশটুকু উল্লিখিত); সহীহ মুসলিম হাদীস-২৮৫৯ (হাদীসের প্রথম অংশ উল্লেখিত); আল মাতালিবুল আলিয়া লি ইবনে হাজার আসকালানী: ১৩/৬৭ (মুসনাদে আবি ইয়া'লার সনদে সম্পূর্ণ হাদীসটি উল্লেখিত হয়েছে)। হাদীসটির সনদ সহীহ।
৯৭. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪১৭; সুনানে দারেমী হাদীস-৫৫৪; ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px