📄 তিন জায়গায় কেউ কারো খোঁজ নিবে না
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّهَا ذَكَرَتِ النَّارَ فَبَكَتْ، فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : مَا يُبْكِيكِ؟ قَالَتْ : ذَكَرْتُ النَّارَ فَبَكَيْتُ، فَهَلْ تَذْكُرُونَ أَهْلِيكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَّا فِي ثَلَاثَةِ مَوَاطِنَ فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا عِنْدَ الْمِيزَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَيَخِفُ مِيزَانُهُ أَوْ يَثْقُلُ، وَعِنْدَ تَطَايُرِ الْكُتُبِ حَتَّى يَعْلَمَ أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ فِي يَمِينِهِ أَمْ فِي شِمَالِهِ أَمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ، وَعِنْدَ الصِّرَاطِ إِذَا وُضِعَ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ.
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা জাহান্নামের কথা স্মরণ করে তিনি কাঁদছিলেন। রাসূল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা কাঁদছো কেন? তিনি বললেন, জাহান্নামের কথা স্মরণ হলো তাই কাঁদছি। কিয়ামতের দিন আপনি কি আপনার পরিবারের কথা স্মরণ করবেন? তিনি বললেন, তিনটি স্থান এমন যেখানে কেউ কারো খোঁজ নিবে না। যথা- ১. মীযানের নিকট, যতক্ষণ না জানবে তার আমলের পাল্লা ভারী হয়েছে নাকি হালকা হয়েছে। ২. আমলনামা বিতরণের সময়। যতক্ষণ না জানবে আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হয়েছে নাকি বাম হাতে নাকি পিছন দিক দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৩. পুলসিরাতের উপর, যখন তা জাহান্নামের উপরে স্থাপন করা হবে।৬২
টিকা:
৬২. সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৪৭৫৫; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৪৯৯৩। সনদ জয়ীফ [শুয়াইব আরনাউত]।
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, একবার আমি রাসূলকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন কি কোনো বন্ধু তার বন্ধুর খোঁজ নিবে? তিনি বললেন, তিন জায়গায় কেউ কারো খোঁজ নিবে না। যথা—
১. মিযানে আমল পরিমাপ করার সময়, যাবৎ না সে জানতে পারবে তার আমলের পাল্লা হালকা হয়েছে না ভারি।
২. আমলনামা উড্ডয়নের সময়, যাবৎ না সে জানতে পারবে তার আমলনামা ডান হাতে আসবে নাকি বাম হাতে।
৩. আর যখন জাহান্নামের আগুনের একটি গরদান বের হবে এবং সবাইকে বেষ্টন করে নিবে এবং বলবে, আমাকে তিন ধরনের ব্যক্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—
ক. যে আল্লাহর সাথে অন্যকে উপাস্য হিসাবে ডেকেছে।
খ. যে অহংকারী ও আত্মম্ভরী।
গ. ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা হিসাব দিনের বিশ্বাস করত না।
তা তাদেরকে বেষ্টন করে জাহান্নামের গভীর গর্তে নিক্ষেপ করবে। আর জাহান্নামের উপর একটি পুল থাকবে, যা চুল হতেও সূক্ষ্ম এবং তলোয়ার হতেও ধারালো। তাতে কাঁটা ও আগুনের অঙ্গার থাকবে। সেটার উপর দিয়ে কেউ বিদ্যুৎগতিতে পার হয়ে যাবে, কেউ ঝড়ের গতিতে, আবার কেউ স্বাভাবিকভাবে পার হয়ে যাবে। আর কেউ ক্ষত-বিবক্ষত হয়ে জাহান্নামে পড়ে যাবে।
টিকাঃ
৮০. সুনানে আবূ দাউদ হাদীস-৪৭৫৫; মুসনাদে আহমাদ: ৪১/৩০৩ (২৪৭৯৩); হাদীসটির সনদ জয়ীফ। সনদে ইবনে লাহিয়া নামক জয়ীফ রাবী থাকার কারনে। তবে আল্লামা হাইসামী বলেছেন, ইবনে লাহিয়াকে কোনো কোনো ইমাম সিকাও বলেছেন। হাদীসের অন্যান্য রাবীগণ বুখারী- মুসলিমের রাবী [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১০/৬৫০ (১৮৪৪০) উল্লেখ্য: হাদীসের শেষাংশ বিভিন্ন সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত)।
📄 শিঙ্গায় ফুৎকার
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ خَلَقَ الصُّورَ فَأَعْطَاهُ إِسْرَافِيلَ، فَهُوَ وَاضِعُهُ عَلَى فِيهِ شَاخِصُ بِبَصَرِهِ إِلَى الْعَرْشِ يَنْتَظِرُ مَتَى يُؤْمَرُ، قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا الصُّورُ؟ قَالَ: قَرْنٌ مِنْ نُورٍ. قُلْتُ: كَيْفَ هُوَ؟ قَالَ: عَظِيمٌ وَالَّذِي بَعَثَنِي بِالْحَقِّ، إِنَّ دَائِرَةَ فِيهِ لَعَرْضُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَنْفُخُ فِيهِ ثَلَاثَ نَفَخَاتٍ. الْأُولَى نَفْخَةُ الْفَزَعِ، وَالثَّانِيَةُ نَفْخَةُ الصَّعْقِ، وَالثَّالِثَةُ نَفْخَةُ الْقِيَامِ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ، فَيَأْمُرُ اللَّهُ تَعَالَى إِسْرَافِيلَ بِالنَّفْخَةِ الْأُولَى، فَيَقُولُ: انْفُخْ نَفْخَةَ الْفَزَعِ، فَيَنْفُخُ فَيَفْزَعُ أَهْلُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ وَيَأْمُرُهُ اللَّهُ فَيُدِيمُهَا وَيُطَوِّلُهَا، فَلَا يَفْتُرُ وَهِيَ الَّتِي يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ (ص: ١٥).
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। আল্লাহ যখন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি শিংগাও সৃষ্টি করলেন। তা তিনি হযরত ইস্রাফিল আ. কে দিলেন। তখন থেকে তিনি তা মুখে লাগিয়ে রেখে আরশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কখন ফুৎকারের আদেশ হয় সে অপেক্ষায়। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! শিংগা কী? তিনি বললেন, আলোর শিং। আমি বললাম, তা কেমন? তিনি বললেন, বিশাল, ওই সত্তার কসম যিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, এর ভেতরের বৃত্ত আসমান ও জমিনের সমান। এতে তিনবার ফুঁ দেওয়া হবে। ১ম বার ভয় প্রদর্শনের ফুঁ, ২য় বার অজ্ঞান হওয়ার ফুঁ, তৃতীয় বার রাব্বুল আলামীনের জন্য দণ্ডায়মান হওয়ার ফুঁ। আল্লাহ তা'আলা হযরত ইস্রাফিল আ.-কে প্রথম ফুঁ দিতে বলবেন, তিনি ফুঁ দিবেন এবং আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা করেন সে ছাড়া আসমান জমিনের সকলেই ভীত হয়ে পড়বে। আল্লাহ তাকে আদেশ করবেন, এটা যেন দীর্ঘায়িত হয় এবং সে বিরতিহীনভাবে ফুঁ দিতে থাকবে। এ সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, وَمَا يَنْظُرُ هَؤُلَاءِ إِلَّا صَيْحَةً وَاحِدَةً مَا لَهَا مِنْ فَوَاقٍ অর্থ: এরা তো কেবল একটি প্রচন্ড শব্দের অপেক্ষা করছে যাতে কোনো বিরাম থাকবে না।৬৩
টিকাঃ
৬৩. সূরা সোয়াদ: আয়াত-১৫
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেছেন; দুই শিঙ্গার মাঝে চল্লিশ বছরের ব্যবধান হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আসমান থেকে পুরুষের বীর্যের মতো এক প্রকার পানি বর্ষণ করবেন, ফলে মানুষ সবজি উৎপন্নের মতো মাটি থেকে উৎপন্ন হবে।
আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা আসমান জমিন সৃষ্টির পর "সূর” সৃষ্টি করলেন এবং তা ইসরাফীলকে দিলেন। ইসরাফীল তা মুখে রেখে আরশের দিকে তাকিয়ে হুকুমের অপেক্ষা করছেন, কখন তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সূর কী? তিনি বললেন, নূরের শিঙ্গা। আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সেটি কেমন? তিনি বললেন, তা সুবিশাল, সুপ্রশস্ত। সেই সত্তার শপথ, যিনি আমাকে সত্য দিয়ে নবীরূপে প্রেরণ করেছেন, তার প্রশস্ততার বিস্তৃতি আসমান জমিনের সমান। তাতে তিনবার ফুৎকার দেওয়া হবে।
অন্যান্য বর্ণনা মতে, ফুৎকার হবে দু'টি। একটি ধ্বংসের জন্য। আর অপরটি পুনরুত্থানের জন্য। হযরত কা'ব রাযি.-এর বর্ণনায় আছে, ফুৎকার হবে দুটি। আবূ হুরায়রা রাযি.-এর বর্ণনায় আছে, ফুৎকার হবে তিনটি। একটি ফুৎকার ভীতির জন্য, আরেকটি বেহুঁশ করার জন্য এবং সর্বশেষ ফুৎকার হবে পুনরুত্থানের জন্য। আল্লাহ তা'আলা ইসরাফীলকে প্রথম ফুৎকারের নির্দেশ দিবেন। ফুৎকারের ফলে আসমান জমিনের সকল প্রাণী জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। একেই কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে,
وَيَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَفَزِعَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ
অর্থ: আর স্মরণ কর, সে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, ফলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, সে ব্যতীত আসমান-জমিনের ভিতরের সবই প্রকম্পিত হবে। তখন জমিন প্রকম্পিত হবে। আর প্রত্যেক স্তন্যদানকারীনী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ভুলে যাবে এবং গর্ভবতী নারী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখে মনে হবে, যেন তারা নেশাগ্রস্ত অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়, বরং আল্লাহর শাস্তি বড় কঠিন। শিশুরা বৃদ্ধে পরিণত হবে, শয়তান দিশেহারা হয়ে পালাতে থাকবে, যেমন আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, নিশ্চয় কিয়ামতের প্রকম্পন কঠিন জিনিস। সেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদানকারীনী তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বিস্মৃত হবে এবং গর্ভবতী নারী তার গর্ভপাত করে দেবে। মানুষকে মনে হবে, যেন তারা নেশাগ্রস্ত অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বরং আল্লাহর আযাব কঠিন।
টিকাঃ
৮১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৮১৪, ৪৯৩৫; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯৫৫; বুখারী-মুসলিমে শুধুমাত্র চল্লিশের কথা উল্লেখিত হয়েছে। চল্লিশ দিন, মাস নাকি বছর এ ব্যাপারে আবু হুরায়রা রাযি. কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অস্বীকার করে বলেছিলেন- "আমি এভাবেই রাসূল কে বলতে শুনেছি। ইমাম নববী মুসলিমের এই হাদীসের ব্যাখায় চল্লিশ বছরের বর্ণনার রেওয়ায়েত আছে বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ইবনে মারদুইয়া'র চল্লিশ বছরের একটি হাদীস এনে তাকে শায বলে মন্তব্য করেছেন। ইবনে আব্বাসের বক্তব্য হিসেবে চল্লিশ বছরের বর্ণনাকে জয়ীফ বলেছেন। [বিস্তারিত দেখুন: ফাতহুল বারী: ১১/৩৬৭-৩৭১ (৪৮১৪ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)।।
৮২. আল-আহাদীসুত-তিওয়াল লিত ত্ববারানী : হাদীস-৩৬; কিতাবুল বা'সি ওয়ান নুশুর লিল বাইহাকী : হাদীস-৬৬৯; তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা আনয়ামের ৭৩ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য; ফাতহুল বারী: ১১/৩৬৭-৩৭১। হাদীসটি হাদিসে সূর আত-তুওয়াল নামে প্রসিদ্ধ। এখানে সেই দীর্ঘ হাদীসের প্রথম অংশ উল্লেখিত হয়েছে। হাদীসটির সনদ নিতান্তই জয়ীফ। এর সনদে ইসমাঈল ইবনে রাফি' নামক বিতর্কিত রাবী রয়েছে। তবে দীর্ঘ হাদীসের কিছু অংশের শাওয়াহেদ (সমর্থনে গ্রহণযোগ্য হাদীস) বিদ্যমান এবং কিছু অংশ মুনকার বা আপত্তিকর।
📄 পৃথিবী যেভাবে ধ্বংস হবে
ثُمَّ يُسَيِّرُ اللَّهُ الْجِبَالَ فَتَكُونُ سَرَابًا، وَتُرَجُّ الْأَرْضُ بِأَهْلِهَا رَجَّا، فَتَكُونُ كَالسَّفِينَةِ الْمُوبَقَةِ فِي الْبَحْرِ، تَضْرِبُهَا الْأَمْوَاجُ وَتَكْفَأُهَا، وَكَالْقِنْدِيلِ الْمُعَلَّقِ بِالْعَرْشِ تُرَجْرِجُهُ الْأَرْوَاحُ، فَتَمِيدُ النَّاسُ عَلَى ظَهْرِهَا، فَتَذْهَلُ الْمَرَاضِعُ عَمَّا أَرْضَعَتْ، وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا، وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ (الحج : (٢) فَيَشِيبُ الْوِلْدَانُ وَتَطِيرُ الشَّيَاطِينُ هَارِبَةً مِنْ هَذَا الْفَزَعِ، حَتَّى تَأْتِيَ أَقْطَارَ الْأَرْضِ فَتَتَلَقَّاهَا الْمَلَائِكَةُ فَتَضْرِبُ وُجُوهَهَا وَتَرُدُّهَا عَلَى أَدْبَارِهَا، وَيُنَادِي النَّاسُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا وَيَمُوجُ بَعْضُهُمْ فِي بَعْضٍ.
অতঃপর আল্লাহ পাহাড়গুলো চালু করে দিবেন এবং সেগুলো মরীচিকার মতো হয়ে যাবে, জমিন তার অধিবাসীদের নিয়ে কম্পন করতে থাকবে। তার অবস্থা সাগরে ভাসমান নৌকার মতো হবে, যা উপর-নীচ হতে থাকে। অথবা এমন লণ্ঠনের মতো হবে যা বাতাসে দুলতে থাকে। তখন মানুষ দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করবে, স্তন্যদানকারী মাতা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। তুমি মানুষকে দেখবে মাতালের মতো, অথচ তারা মাতাল নয়; বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন। ৬৪ সেদিন বালক বৃদ্ধ হয়ে যাবে। শয়তানও ভয়ে পালাতে থাকবে। এমন সময় ফেরেশতাদের একটি দলের সাথে তার সাক্ষাৎ হবে। তারা তার চেহারা ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করে তাকে ফিরিয়ে দেবে। মানুষ একে অপরকে ডাকতে থাকবে এবং একে অপরের উপর পতিত হতে থাকবে।
টিকাঃ
৬৪. সূরা হজ্জ: আয়াত-২
আল্লাহ তা'আলার যতদিন ইচ্ছা এভাবেই থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইসরাফীলকে নির্দেশ দিবেন, সে বেহুঁশ করার (মৃত্যু বরণের) জন্য ফুৎকার দেবে। আসমান ও জমিনের সকলেই বেহুঁশ হয়ে যাবে অর্থাৎ, মৃত্যুবরণ করবে। তবে আল্লাহ তা'আলা যাকে চান সে ব্যতীত। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে—
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ
অর্থ: আর শিঙ্গায় ফুৎকার প্রদান করা হবে, ফলে আসমানসমূহ ও জমিনের সকলে জ্ঞানহারা হয়ে পড়বে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সে ব্যতীত।
তবে আল্লাহ যাকে চান দ্বারা শহীদদেরকে বুঝানো হয়েছে। কেউ বলেন, এর দ্বারা জিব্রাঈল, মিকাইল, ইসরাফিল ও মালাকুল মওত উদ্দেশ্য।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে বলবেন, আমার সৃষ্টির কে বাকি আছে? সে বলবে, হে রব আপনি চিরঞ্জীব, আপনার মৃত্যু নেই। জিবরাঈল, মিকাঈল, ইসরাফীল এবং আপনার আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ। আর বাকী আছি আমি। এরপর আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে তাদের রূহ কবজেরও নির্দেশ দিবেন। তিনি তাদের রূহ কবজ করবেন। কালবী ও মুকাতিলের বর্ণনায় এমনই আছে।
হযরত মুহাম্মদ বিন কা'ব-এর রেওয়ায়াত অনুসারে, আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত— অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জিবরাঈল, মিকাইল ও ইসরাফীল মৃত্যুবরণ করুক। আরশের বহনকারীরাও মৃত্যুবরণ করুক। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, হে মালাকুল মওত! আমার সৃষ্টির আর কে বাকি আছে? সে উত্তর দেবে, আপনি চিরঞ্জীব, যার কোনো মৃত্যু নেই। বাকি আছে কেবল আপনার দুর্বল বান্দা মালাকুল মওত। আল্লাহ বলবেন, হে মালাকুল মওত! তুমি আমার বাণী শোনোনি—
কُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ প্রতিটি প্রাণীই মরণশীল। তুমিও আমার এক সৃষ্টি। তোমাকে আমি সৃষ্টি করেছি আমার ইচ্ছানুসারে। সুতরাং তুমিও মৃত্যুবরণ কর। সেও মৃত্যুবরণ করবে।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে নিজের রূহ কবজ করতে বলবেন। তখন সে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী এক স্থানে এসে নিজ রূহকে কবজ করবে এবং এমন ভয়ানক চিৎকার করবে যে, যদি সৃষ্টিকুলের সকলে জীবিত থাকত, তবে সকলেই মৃত্যুবরণ করত। এ সময় সে বলবে, আমি যদি জানতাম, রূহ কবজ করার তীব্রতা ও কষ্ট এতো কঠিন, তবে মুমিনগণের রূহ কবজ করার সময় সর্বাধিক সহজতা অবলম্বন করতাম। এভাবে তার মৃত্যু ঘটবে। তখন সৃষ্টিকুলের কেউ জীবিত থাকবে না। আল্লাহ তা'আলা এই নিকৃষ্টতর, নশ্বর দুনিয়াকে লক্ষ্য করে বলবেন, কোথায় রাজা-বাদশাহরা? রাজপুত্ররা আজ কোথায়? কোথায় অহংকারী? তাদের পুত্ররা কোথায়? কোথায় গেল তারা, যারা আমারই দেওয়া কল্যাণ উপভোগ করে অন্যের উপাসনা করত? অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আজ কার হাতে সর্বময় রাজত্ব? জবাব দেওয়ার কেউ থাকবে না। ফলে আল্লাহ তা'আলা নিজেই জবাব দিবেন, আজকের রাজত্ব ক্ষমতাধর এক আল্লাহর।
টিকাঃ
৮৪. সূরা হজ্জ: আয়াত-১-২
৮৫. সূরা যুমার: আয়াত-৬৮
৮৬. সুরা আলে ইমরান: আয়াত-১৮৫
৮৭. সূরা আল মু'মিন/ গাফির: আয়াত-১৬
📄 পুনরায় জীবিতকরণ
فَبَيْنَمَا هُمْ عَلَى ذَلِكَ إِذْ تَصَدَّعَتِ الْأَرْضُ مِنْ قُطْرِ إِلَى قُطْرٍ، وَرَأَوْا أَمْرًا عَظِيمًا لَمْ يَرَوْا مِثْلَهُ، فَأَخَذَهُمُ الْفَزَعُ حَتَّى ذَهِلَتْ عُقُولُهُمْ، ثُمَّ نَظَرُوا إِلَى السَّمَاءِ، فَإِذَا هِيَ كَالْمُهْلِ ثُمَّ خُسِفَتْ شَمْسُهَا وَقَمَرُهَا، وَانْتَثَرَتْ نُجُومُهَا، ثُمَّ كُشِطَتْ عَنْهُمْ، قَالَ: فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى: يَا جِبْرِيلُ أَنْتَ عَلَى مَا وَكَّلْتُكَ، وَيَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَنْتَ عَلَى مَا وَكَّلْتُكَ. ثُمَّ يَأْمُرُ اللهُ تَعَالَى إِسْرَافِيلَ بِنَفْخَةِ الصَّعْقِ فَيَنْفُخُ، فَيُصْعَقُ أَهْلُ السَّمَوَاتِ وَأَهْلُ الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ، فَإِذَا هُمْ قَدْ خَمَدُوا فَيَأْتِي مَلَكُ الْمَوْتِ إِلَى الْجَبَّارِ، فَيَقُولُ: قَدْ مَاتَ أَهْلُ السَّمَوَاتِ، وَأَهْلُ الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ، فَيَقُولُ وَهُوَ أَعْلَمُ: فَمَنْ بَقِيَ؟ فَيَقُولُ: بَقِيتَ أَنْتَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ، وَبَقِيتُ أَنَا، وَبَقِيَ حَمَلَةُ الْعَرْشِ، وَبَقِيَ جِبْرِيلُ وَمِيكَائِيلُ، وَيَقُولُ: فَيَمُوتُ جِبْرِيلُ وَمِيكَائِيلُ، ثُمَّ يَقُولُ لِحَمَلَةِ الْعَرْشِ فَيَمُوتُونَ، ثُمَّ يَأْتِي مَلَكُ الْمَوْتِ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ قَدْ مَاتَ حَمَلَةُ الْعَرْشِ. فَيَقُولُ وَهُوَ أَعْلَمُ: فَمَنْ بَقِيَ؟ فَيَقُولُ: بَقِيتَ أَنْتَ الْحَيُّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وَبَقِيتُ أَنَا فَيَقُولُ: يَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَنْتَ خَلْقٌ مِنْ خَلْقِي، خَلَقْتُكَ لِمَا أَرَدْتُ، فَمُتْ. فَيَمُوتُ ثُمَّ يُنَادِي الْجَبَّارُ: لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ فَلَا يُجِيبُهُ أَحَدٌ، فَيَقُولُ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ. ثُمَّ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ تَعَالَى وَأَوَّلُ مَنْ يُبْعَثُ إِسْرَافِيلُ وَجِبْرِيلُ وَمِيكَائِيلُ وَمَلَكُ الْمَوْتِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ. فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى: كَمْ لَبِثْتُمْ؟ فَيَقُولُونَ: لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ إِلَّا أَنَّكَ لَمْ تُمِتْنَا. فَيَقُولُ اللهُ تَعَالَى لِإِسْرَافِيلَ: قُمْ فَانْفُخْ فِي الصُّورِ نَفْخَةَ الْبَعْثِ، فَيَنْفُخُ، فَيَكُونُ الْعِبَادُ فَرِيقَيْنِ فَرِيقًا فِي الْجَنَّةِ، وَفَرِيقًا فِي السَّعِيرِ.
এমন অবস্থায় যখন জমিন বিদীর্ণ হয়ে যাবে এবং এমন সব বিষয় ঘটবে যা মানুষ কখনো দেখেনি। এতে মানুষ অস্থির হয়ে জ্ঞান হারাতে থাকবে। তারপর তারা আসমানের দিকে তাকিয়ে দেখবে, তা গলিত তামার মতো হয়ে গেছে। সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণ লেগে যাবে। তারাগুলোও একে একে খসে পড়বে এবং আকাশকে গুটিয়ে নেওয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল আ. ও মালাকুল মওতকে বলবেন, তোমরা নিজেদের দায়িত্বে স্থির থাকো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইসরাফিল আ.কে ফুঁক দেওয়ার আদেশ দিলে তিনি ফুঁক দিবেন। ফলে আল্লাহ যাদের চাইবেন, তারা ছাড়া আসমান জমিনের সকলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। তাদের মধ্যে কোনোরূপ প্রাণ থাকবে না। তখন মালাকুল মওত বলবেন, হে পরওয়ারদিগার! আসমান ও জমিনের সকলেই মৃত্যুবরণ করেছে শুধু আপনি, আমি, আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ, জিবরাঈল ও মিকাইল ছাড়া। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, জিবরাঈল ও মিকাইলকেও মৃত্যু দাও। অতঃপর তারা উভয়ে মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তা'আলা আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের মৃত্যু ঘটাবেন। তারপর মালাকুল মওত বলবেন, হে রব! আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণও মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা জিজ্ঞেস করবেন, আর কে বাকি আছে? মালাকুল মওত বলবেন, আপনি চিরঞ্জীব এবং আমি। আল্লাহ বলবেন, তুমি তো আমার সৃষ্টি। আমি তোমাকে যে জন্য সৃষ্টি করেছিলাম তা তুমি করেছ, এবার তুমিও মরে যাও। তখন মালাকুল মওতও মারা যাবেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করবেন- لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ আজ রাজত্ব কার? কেউ কোনো উত্তর দিবে না। তখন তিনিই জবাব দিবেন- لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহ্র। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল, মিকাইল ও ইসরাফিল এবং মালাকুল মওতকে জীবিত করবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলবে, আপনি তো আমাদেরকে মৃত্যু দেননি, আমরা তো একদিন বা তার চেয়ে কম সময় ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ ইসরাফিলকে বলবেন, যাও তুমি শিংগায় ফুঁক দাও। তিনি শিংগায় ফুঁক দিবেন এবং সকল মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হবে। একদল জান্নাতে অপরদল জাহান্নামে যাবে। ৬৪
অতঃপর তিনি আসমানকে বর্ষণের নির্দেশ দিবেন। আসমান ক্রমাগত চল্লিশ দিন পুরুষের বীর্যের মতো বৃষ্টি বর্ষণ করবে। বর্ষণের ফলে সব কিছু ১২ হাত পানিতে ডুবে যাবে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুলের সবাইকে সবুজ শস্যের ন্যায় নতুন করে সৃষ্টি করবেন। ফলে তাদের দেহ পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। এরপর আল্লাহ বলবেন, ইসরাফীল এবং আরশ বহনকারীরা জীবিত হোক। আল্লাহর নির্দেশে তারা জীবিত হবে। অতঃপর ইসরাফীল আল্লাহর নির্দেশে শিঙ্গা মুখে রাখবে। আল্লাহ তা'আলা পুনরায় বললেন, জিবরাঈল ও মিকাঈল জীবিত হোক! তারাও আল্লাহর নির্দেশে জীবিত হবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা রূহসমূহকে আহ্বান করবেন, তাদেরকে এনে শিঙ্গায় স্থাপন করা হবে। ইসরাফীল আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে পুনরুত্থানের জন্য শিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। ফুৎকারের ফলে রূহসমূহ মৌমাছির মত ছড়িয়ে পড়ে আসমান-জমিন ভরে যাবে। এরপর রূহসমূহ মাটির নীচে প্রবেশ করবে। আর তাদের উপর থেকে মাটি সরে যাবে। রাসূল বলেন, সর্বপ্রথম আমার উপর থেকেই মাটি সরে যাবে।
অন্য হাদীসে আছে, আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল, মিকাঈল ও ইসরাফীলকে জীবিত করবেন, তারা বোরাক এবং জান্নাতী পোশাক নিয়ে রাসূল -এর রওজা মুবারকে আসবেন। তার কবরের জমিনকে বিদীর্ণ করা হবে। তখন রাসূল জিবরাঈল আ.-এর দিকে তাকিয়ে বলবেন, হে জিবরাঈল! এ কোন দিন? তিনি বলবেন, এ হলো, কিয়ামত দিন। এ হলো, মহাপ্রলয় ও মহাদুর্যোগ দিন। রাসূল তখন বলবেন, হে জিবরাঈল! আল্লাহ তা'আলা আমার উম্মতের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছেন? তখন জিবরাঈল বলবেন, সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যার থেকে জমিনকে বিদীর্ণ করা হয়েছে।
টিকাঃ
৮৮. আল-আহাদীসুত-তিওয়াল লিত ত্ববারানী : হাদীস-৩৬; কিতাবুল বা'সি ওয়ান নুশুর লিল বাইহাকী : হাদীস-৬৬৯; তাফসীরে ইবনে কাসীর সূরা আনয়ামের ৭০ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য; ফাতহুল বারী: ১১/৩৬৭-৩৭১।