📄 মৃত ব্যক্তির চিৎকার
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: إِنَّ الْمَيِّتَ يَعْرِفُ مَنْ يُغَسِّلُهُ، وَمَنْ يَحْمِلُهُ، وَمَنْ يُكَفِّنُهُ، وَمَنْ يُدْلِيهِ فِي قَبْرِهِ، وَإِنَّ الصَّالِحَ إِذَا حُمِلَ عَلَى الْأَعْنَاقِ قَالَ: قَدِّمُونِي، وَإِنْ كَانَ غَيْرَ ذَلِكَ قَالَ: يَا وَيْلَكُمْ أَيْنَ تَذْهَبُونَ بِي؟ يَسْمَعُ صَوْتَهُ كُلُّ شَيْءٍ إِلَّا الْإِنْسَانَ وَلَوْ سَمِعَ لَصُعِقَ.
হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মৃত ব্যক্তি তাকে যারা গোসল দেয়, যারা তাকে বহন করে, যারা কাফন পরায় এবং যারা তাকে কবরে নামায়- তাদের সবাইকে চিনতে পারে। নেককার হলে তাকে যখন কাঁধে তুলে নেওয়া হয় তখন সে বলতে থাকে, আমাকে দ্রুত নিয়ে চল, দ্রুত নিয়ে চল। আর যদি সে নেককার না হয় তাহলে সে বলে, হায় আফসোস! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো! তার এই আওয়াজ মানুষ ছাড়া সকল সৃষ্টি শুনতে পায়। মানুষ যদি শুনতে পেত তাহলে সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত।৬০
টিকাঃ
৬০. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১১১৩৮; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: হাদীস-৬৫২১; হাদীসটি সহীহ।
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত- রাসূল ইরশাদ করেছেন, যে কেউ মৃত্যুবরণকালে এমন চিৎকার করে, যা মানুষ ব্যতীত সকল প্রাণীই শুনতে পায়। মানুষ যদি তা শুনতে পেত, তাহলে অজ্ঞান হয়ে যেত। অতঃপর যখন তাকে কবরে নিয়ে যাওয়া হয়, সে যদি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে থাকে, তাহলে বলতে থাকে, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও, তোমরা যদি জানতে আমার জন্য কী কল্যাণ অপেক্ষা করছে, তবে অনেক আগেই নিয়ে যেতে। আর যদি অসৎকর্মপরায়ণ হয়, তাহলে বলতে থাকে, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ো না। তোমরা যদি জানতে আমার জন্য কী কী অকল্যাণ অপেক্ষা করছে, তাহলে তাড়াতাড়ি করতে না।
অতঃপর যখন তাকে কবরে রাখা হয়, তখন দু'জন কৃষ্ণাকায়, নীলচোখ বিশিষ্ট ফেরেশতা আগমন করেন। তারা তার মাথার দিক থেকে আগমন করতে চাইলে, তার সালাত বলে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। আজকের ভয়ে অনেক রাত সে নির্ঘুম কাটিয়েছে। ফলে পায়ের দিক থেকে আসতে চাইবে, কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ বাধা দিয়ে বলবে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। কারণ, সে এই পরিস্থিতির ভয়ে পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করেছে এবং অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছে। এরপর ডান দিক থেকে আসতে চাইলে, তার সদকা বলে উঠবে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। কারণ, সে এই দিনের ভয়ে সদকা করেছে। বাম দিক থেকে আসতে চাইলে, তার রোযা বলবে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। কারণ, সে এই সময়ের ভয়ে ক্ষুধা ও পিপাসাকে সহ্য করেছে।
অতঃপর তাকে ডেকে তোলা হবে, যেভাবে নিদ্রিত ব্যক্তিকে ডেকে তোলা হয়। এরপর বলা হবে, এই ব্যক্তি এবং এই ব্যক্তি যা বলতো তার ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? সে বলবে, কে সে? বলা হবে, মুহাম্মদ। সে বলে উঠবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলবেন, তুমি মুমিন হিসাবে জীবন যাপন করেছ এবং মুমিন হিসাবেই তোমার মৃত্যু হয়েছে। এরপর তার কবরকে প্রশস্ত করে দেয়া হবে এবং আল্লাহ পাকের ইচ্ছানুসারে তার যাবতীয় নিয়ামতের ব্যবস্থা করা হবে।
অতএব, আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদেরকে হেফাজত করেন। আরো প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে বিভ্রান্ত ও দুষ্ট প্রবৃত্তি এবং ঔদ্ধত্য থেকে হেফাজত করেন। হেফাজত করেন, কবরের ভয়াবহ আযাব ও শাস্তি থেকে। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।
টিকাঃ
৭৭. আয যুহদ হান্নাদ: ৩৩৩৮, মুসান্নাফে আবী শাইবা: ১৩/৩৪৮ (হাদীসের প্রথম অংশ আবু হুরাইরার বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত); মাজমাউয যাওয়ায়েদ: হাদীস-৪২৬৯; আল্লামা হাইসামী বলেন, হাদীসটির সনদ হাসান।
৭৮. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩৭৬, ১৩৭৭; সহীহ মুসলিম: হাদীস-৫৮৮।
📄 সৎকর্ম কবরের আযাব থেকে মুক্তির কারণ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الْمَيِّتَ يَسْمَعُ خَفْقَ نِعَالِهِمْ حِينَ يُوَلُّونَ عَنْهُ مُدْبِرِينَ، فَإِنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَانَتِ الصَّلَاةُ عِنْدَ رَأْسِهِ، وَالصِّيَامُ عَنْ يَمِينِهِ وَالزَّكَاةُ عَنْ شِمَالِهِ، وَكَانَ فِعْلُ الْخَيْرَاتِ مِنَ الصَّدَقَةِ، وَالصِّلَةِ، وَالْمَعْرُوفِ وَالْإِحْسَانِ إِلَى النَّاسِ عِنْدَ رِجْلَيْهِ، فَيُؤْتَى مِنْ قِبَلِ رَأْسِهِ، فَتَقُولُ الصَّلَاةُ: مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ، ثُمَّ يُؤْتَى عَنْ يَمِينِهِ فَيَقُولُ الصِّيَامُ: مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ. ثُمَّ يُؤْتَى عَنْ شِمَالِهِ فَتَقُولُ الزَّكَاةُ: مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ، ثُمَّ يُؤْتَى مِنْ قِبَلِ رِجْلَيْهِ فَيَقُولُ فِعْلُ الْخَيْرَاتِ مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে লোকজন যখন ফিরে যায়, তখন মৃতব্যক্তি তাদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। মৃত ব্যক্তি যদি মুমিন হয় তাহলে নামায তার মাথার পাশে, রোযা ডানপাশে, যাকাত বামপাশে এবং অন্যান্য সৎকর্ম যেমন, সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, ভালো কাজ করা এবং মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা তার পায়ের দিকে থাকে। ফেরেশতাগণ মাথার দিক দিয়ে আসতে চাইলে নামায বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। অতঃপর ডানদিক থেকে আসতে চাইলে রোযা বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। অতঃপর বাম দিক থেকে আসতে চাইলে যাকাত বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। তারপর পায়ের দিক দিয়ে আসতে চাইলে অন্যান্য নেক আমল বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।৬১
ٹکا:
৬১. সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস-৩১১৭; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-১০৭; হাকেম ও যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কবরের আযাব সম্পর্কে আমি জানতাম না। একবার এক ইহুদী নারী আমার নিকট এসে কিছু চাইলে আমি তাকে কিছু দিলাম। তখন সে বলল, আল্লাহ তোমাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন। তখন আমার ধারণা ছিল যে, তার কথা হয়তো ইহুদীদের কল্পকাহিনী প্রসূত। এমন সময় রাসূল গৃহে আগমন করলেন, আমি তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি আমাকে জানালেন যে, কবরের আযাব সত্য।
সুতরাং মুসলমান মাত্রই কর্তব্য হলো, কবরের আযাব থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং উত্তম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে কবরে যাওয়ার আগেই কবরের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কারণ, যতদিন দুনিয়ায় আছে, ততদিন নেক কাজ করা সহজ। আর কবরের প্রবেশ করার পর প্রবলভাবে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তাকে যেন একটি মাত্র ভালো কাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেওয়া হবে না। ফলে সে নিদারুণ হতাশ অবস্থায় থাকবে।
জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের কাজ হলো মৃতদের ব্যাপারে চিন্তা করা। কারণ, মৃতরা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে যে, তাদের যেন দু রাকাআত সালাত আদায়ের তাওফীক দেওয়া হয় কিংবা একবার মাত্র লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পাঠের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া হবে না। মৃতরা জীবিতদের ব্যাপারে অবাক হয় যে, তারা কীভাবে সময়গুলো বেকার ও অনর্থক কর্মে অতিবাহিত করে।
হে ভাই! তাই তুমি তোমার সময়কে নষ্ট কর না। কারণ, এটিই হলো, তোমার মূলধন। যতক্ষণ তোমার কাছে মূলধন আছে, লাভের আশাও রয়েছে। তোমার আখেরাতের পাথেয় তো বর্তমানে লুকিয়ে আছে। সুতরাং সঠিক সময়ে যেন আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করতে পার, সর্বতোভাবে সে চেষ্টাই কর। একদিন আসবে, যখন এ ক্ষুদ্র পাথেয়ই তোমার জন্য বৃহৎরূপ ধারণ করবে। সুতরাং যতটা সম্ভব, সস্তার দিনে তা অধিকহারে কুক্ষিগত কর। কারণ, মৃত্যুর পর শত চেষ্টা করেও তা সংগ্রহ করতে পারবে না।
আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফীক দান করেন এবং আমাদেরকে যেন সেদিন তাদের অন্তর্ভুক্ত না করেন, যারা সেদিন লজ্জিত হয়ে দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার আবেদন জানাবে, কিন্তু তাদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের এবং সমস্ত মুসলিমদের মৃত্যুর বিভীষিকা সহজ করে দেন।
টিকাঃ
৭৯. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩৭২; সুনানে নাসায়ী: হাদীস-১৩০৮; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৫৪১৯