📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 কবরে প্রশ্নোত্তরের স্বরূপ

📄 কবরে প্রশ্নোত্তরের স্বরূপ


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسلَّمَ، قَالَ: أَتَدْرُونَ فِيمَا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: {فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى} [طه: ١٢٤] قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: عَذَابُ الْكَافِرِ فِي الْقَبْرِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّهُ لَيُسَلَّطُ عَلَيْهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ تِنِّينًا كُلُّ تِنِّينٍ سَبْعَةُ رُؤُوسٍ، يَنْفُخُونَ فِي جِسْمِهِ، وَيَلْسَعُونَهُ وَيَخْدِشُونَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, তোমরা কি জান فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ অর্থ: তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। ৫৭-এ আয়াতটি কার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, কাফেরের কবরের আযাব সম্পর্কে। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তার কবরে নিরানব্বইটি এমন সাপ নিযুক্ত করা হবে, যার প্রত্যেকটির সাতটি করে মাথা থাকবে। সাপগুলো তাকে কিয়ামত পর্যন্ত দংশন করতে থাকবে। ৫৮

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: يُعَذِّبُ الْكَافِرَ تِسْعَةً وَتِسْعُونَ تِنِّينًا، لِأَنَّهُ لَمْ يُؤْمِنْ بِأَسْمَاءِ اللَّهِ تَعَالَى الْحُسْنَى، وَهِيَ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ.

হযরত আনাস রাযি. বলেন, কাফেরকে নিরানব্বইটি সাপ দিয়ে আযাব দেওয়া হবে। কারণ, সে আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণবাচক নামের প্রতি ঈমান আনেনি।

টিকাঃ
৫৭. সূরা ত্বহা: আয়াত-১২৪
৫৮. সুনানে দারেমী: হাদীস-২৮৪২; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১১৭৪৭; হাদীসটি সহীহ [শুয়াইব আরনাউত]।

কবরে প্রশ্নের স্বরূপ কেমন হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের মতপার্থক্য রয়েছে এবং এ ব্যাপারে বর্ণনাগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। যথা—
কেউ বলেন, শরীরে রূহ ফুঁকে দেওয়া হবে, যেমন দুনিয়াতে ছিল। আবার কেউ বলেন, প্রশ্ন করা হবে দেহকে, রূহকে নয়। রূহকে তখন দেহের ভিতর বুকের মাঝে স্থাপন করা হবে। আবার কেউ বলেন, রূহকে দেহ ও কাফনের মধ্যবর্তী স্থানে রাখা হবে। এ উভয় মতের ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। তবে আহলে ইলমের নিকট উত্তম পন্থা হলো, কবরের প্রশ্নোত্তরের বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া, এর ধরন নিয়ে চিন্তা ভাবনা না করা। বরং বলা যে, এর ধরন সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। যখন আমরা সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হব, তখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করব।

কেউ যদি মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের বিষয়টি অস্বীকার করে, তবে তার দু'টি সূরত হতে পারে। একটি হলো, এটাকে যুক্তির পরিপন্থী মনে করে অস্বীকার করা। অপরটি হলো, এর স্বপক্ষে দলীল না থাকায় অস্বীকার করা। যদি এটাকে যুক্তি পরিপন্থী হওয়ার কারণে অস্বীকার করে, তাহলে তার অর্থ হলো, সে নবীদের নবুওয়াত ও মুজেযাও অস্বীকার করছে। কারণ, মুজেযাও তো বিবেকঊর্ধ্ব বিষয়। কারণ, রাসূলগণ তো সাধারণ মানুষের মতোই মানুষ ছিলেন। সকলের মতো তারা মনুষ্য স্বভাবেরই ধারক ছিলেন। অথচ তাদের কাছে ফেরেশতাগণ আগমন করতেন, তাদের সাথে কথোপকথন করতেন, তাদের নিকট ওহী আসত। হযরত মূসা আ.-এর জন্য এমনকি সমুদ্রও দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, তার লাঠি সাপে পরিণত হয়েছিল। এ সব কিছুই যুক্তিপরিপন্থী। যে এ বিষয়গুলোকে অস্বীকার করবে, তার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্কই থাকবে না।

আর যদি একারণে অস্বীকার করা হয় যে, এটা যুক্তিসঙ্গত হলেও এর স্বপক্ষে কোনো দলিল নেই। তাহলে আমরা বলব, ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে বিভিন্ন রেওয়ায়াত উল্লেখ করেছি, যা বিশ্বাস সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কুরআনেও এ ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন— وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْমَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى অর্থ: যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, তার জন্য রয়েছে শঙ্কুচিত জীবন-যাপন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ করে উত্থিত কবর।

মুফাসসিরদের একটি জামাত বলেন, مَعِيشَةً ضَنْكًا তথা সঙ্কুচিত জীবন-যাপন দ্বারা কবরের সওয়াল-জওয়াব উদ্দেশ্য।

টিকাঃ
৭৩. সূরা ত্বহা: আয়াত-১২৪

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 কবরের প্রশ্নোত্তর

📄 কবরের প্রশ্নোত্তর


عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ رُوحَ الْعَبْدِ إِذَا قُبِضَ وَأُدْخِلَ قَبْرَهُ تَصَوَّرَتْ لَهُ أَعْمَالُهُ الصَّالِحَةُ، وَأَحَاطَتْ بِهِ، فَتَجِيءُهُ الْمَلَائِكَةُ مِنْ قِبَلِ رِجْلَيْهِ، فَتَقُولُ الصَّلَاةُ: لَيْسَ لَكُمْ عَلَيْهِ سَبِيلٌ، فَقَدْ أَطَالَ الْقِيَامَ عَلَيْهِمَا يَبْتَغِي رِضْوَانَ اللَّهِ، ثُمَّ يَأْتُونَ مِنْ قِبَلِ رَأْسِهِ فَيَقُولُ الصِّيَامُ: لَيْسَ لَكُمْ عَلَيْهِ سَبِيلٌ، فَقَدْ أَظْمَأَ نَفْسَهُ فِي حَرِّ الدُّنْيَا يَبْتَغِي رِضْوَانَ اللَّهِ، ثُمَّ يَأْتُونَ مِنْ قِبَلِ يَمِينِهِ فَتَقُولُ الصَّدَقَةُ لَيْسَ لَكُمْ عَلَيْهِ سَبِيلٌ، فَقَدْ وَصَلَ بِي رَحِمًا، وَأَدَّى بِي أَمَانَةً، وَبَرَّ بِي يَتِيمًا، فَيَقُولَانِ: اجْلِسْ فَيَجْلِسُ فَتُمَثَّلُ لَهُ الشَّمْسُ وَقَدْ دَنَتْ لِلْغُرُوبِ فَيَقُولَانِ لَهُ: مَا تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ الَّذِي كَانَ فِيكُمْ؟ فَيَقُولُ: دَعُونِي حَتَّى أُصَلِّيَ. فَيَقُولَانِ: إِنَّكَ سَتُصَلِّي، وَلَكِنْ أَخْبِرْنَا عَمَّا نَسْأَلُكَ. فَيَقُولُ: عَمَّنْ تَسْأَلَانِ؟ فَيَقُولَانِ عَنْ هَذَا الرَّجُلِ الَّذِي كَانَ فِيكُمْ. فَيَقُولُ: أَشْهَدُ أَنَّهُ رَسُولُ اللهِ، وَأَنَّهُ جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ عِنْدِ رَبَّنَا فَصَدَّقْنَاهُ، وَآمَنَّا بِهِ وَاتَّبَعْنَاهُ فَيُقَالُ لَهُ: عَلَى ذَلِكَ عِشْتَ، وَعَلَيْهِ مُتَّ، وَعَلَيْهِ تُبْعَثُ، ثُمَّ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ مَدَّ بَصَرِهِ وَيُفْتَحُ لَهُ بَابٌ إِلَى الْجَنَّةِ، قَالَ : وَأَمَّا الْكَافِرُ فَلَا يُحَامِي عَنْهُ أَحَدٌ، فَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ يُجْلِسَانِهِ، فَيَقُولَانِ لَهُ: مَنْ رَبُّكَ؟ فَيَقُولُ: هاه هاه، فَيُقَالُ لَهُ مَا تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ الَّذِي كَانَ فِيكُمْ؟ فَيَقُولُ أَيُّ رَجُلٍ؟ فَيَقُولُونَ: مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ. فَيَقُولُ: هاه هاه فَيَضْرِبَانِهِ بِمِرْزَبَّةٍ مِنْ حَدِيدٍ، فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا الْخَلْقُ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ.

হযরত আনাস রাযি. বলেন, আমার নিকট এই রেওয়ায়াত পৌঁছেছে যে, যখন কোনো মুমিন বান্দাকে কবরে রেখে আসা হয় তখন তার নেক আমলগুলো তাকে ঘিরে রাখে। ফেরেশতারা তার পায়ের দিক থেকে আসতে চাইলে নামায বলবে, তোমাদের এদিক দিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। কারণ, সে এই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অনেক লম্বা কিয়াম করেছে। ফেরেশতারা তখন মাথার দিক দিয়ে আসতে চাইলে রোযা বলবে, তোমাদের এদিক দিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, সে দুনিয়াতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রচÐ গরমে পিপাসার্ত থেকেছে। অতঃপর তারা ডান দিক থেকে আসতে চাইলে যাকাত বলবে, তোমাদের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, সে আমার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেছে, আমানত আদায় করেছে এবং ইয়াতীমের প্রতি সদয় হয়েছে। তখন তারা বলবে, বস। সে বসবে। তার সামনে সূর্যকে অস্তমিত প্রায় অবস্থায় উপস্থাপন করা হবে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করবে, এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, যিনি তোমাদের মাঝে ছিলেন? সে বলবে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি নামায পড়ব। তারা বলবে, তুমি নামায পড়বে, কিন্তু প্রথমে বলো, আমরা যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর কী? সে বলবে, তোমরা কার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছো? তারা বলবে, এ ব্যক্তির ব্যাপারে যিনি তোমাদের মাঝে ছিলেন। সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহর রাসূল। তিনি আমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বিধান নিয়ে এসেছিলেন, আমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করেছি, তার উপর ঈমান এনেছি এবং তাকে অনুসরণ করেছি। তখন তাকে বলা হবে, এর উপরই তুমি ছিলে, এর উপরই তুমি মৃত্যুবরণ করেছ এবং এর উপরই তোমাকে উঠানো হবে। অতঃপর তার কবর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের দিকে তার জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে।
আর কাফের ব্যক্তিকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তার নিকট মুনকার ও নাকীর এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, তোমার রব কে? সে বলবে, হায়! হায়! আমি তো জানি না। তারা বলবেন, ইনি কে, যিনি তোমাদের কাছে এসেছিলেন? সে বলবে, কে? তারা বলবেন, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। সে বলবে, হায়! হায়! তখন তারা তাকে এমন এক লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করবে যে, সে এমন জোরে চিৎকার করবে, যা মানুষ ও জিন ছাড়া সকল সৃষ্টি শুনতে পাবে।৫৯

টিকাঃ
৫৯. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১৩০৩৫; তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/৪২৯; আত-তারগীব, মুনযিরী: ৪/২৬৮। হাদীসটির সনদ হাসান।

হযরত ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মুমিনকে যখন তার কবরে রাখা হয়, তখন দু'জন ফেরেশতা তার নিকট এসে উপস্থিত হয় এবং কবরে তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন। এ সময় সে তাকে দাফন করতে আসা লোকজনের পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করেন, তোমার রব কে? তোমার দীন কী? তোমার নবী কে? সে উত্তরে বলে, আমার রব আল্লাহ, আমার দীন-ইসলাম এবং মুহাম্মদ আমার নবী। তখন ফেরেশতা দু'জন বলেন, আল্লাহ তোমাকে দৃঢ় রেখেছেন। তুমি শীতল নয়নে ঘুমাও। এটিই হলো, কুরআনের নিম্নোক্ত বাণীর ব্যাখ্যা— يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْলِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ অর্থ: আল্লাহ মুমিনগণকে দৃঢ় কথা দ্বারা দুনিয়ার জীবন ও আখেরাত মজবুত রাখেন আর পথভ্রষ্ট করেন জালেমদেরকে। অর্থাৎ, মুমিনদেরকে সত্য কথায় দৃঢ় রাখেন এবং কাফেরদেরকে বিভ্রান্ত করে দেন। তাদের সত্য কথা বলবার তাওফীক হয় না।

আর যখন কাফের কিংবা মুনাফিককে কবরে রাখা হয়, তখন ফেরেশতাদ্বয় তাকে বলেন, তোমার রব কে? তোমার দীন কী? এবং তোমার নবী কে? সে উত্তরে বলে, হায়! আমি জানি না। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলে, তুমি কখনো জানার চেষ্টা করনি। এই বলে তারা হাতুড়ি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করবে যে, জিন-ইনসান ছাড়া আসমান জমিনের সকলেই সে আওয়াজ শুনতে পাবে।

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল হযরত উমর রাযি. কে লক্ষ্য করে বললেন, হে উমর! যখন কবরে নিয়োজিত দুই ফেরেশতা মুনকার নকীর পরীক্ষা নিতে আসবে, তখন তোমার কী অবস্থা হবে? তারা হবে নীল চক্ষু বিশিষ্ট, কৃষ্ণকায়, ধারালো দাঁত বিশিষ্ট, চুল ঝুলে থাকবে মাটি অবধি, তাদের আওয়াজ বজ্রনিনাদের মতো হবে, চোখ হবে বিদ্যুৎ চমকের মতো। উমর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমার বোধশক্তি থাকবে এবং আমি যে অবস্থায় রয়েছি সে অবস্থাতেই থাকব? রাসূল বললেন, হ্যাঁ। উমর রাযি. বললেন, তাহলে আমি আল্লাহ তা'আলার তওফীক ও অনুমতিতে তাদেরকে সামলে নিব। রাসূল বললেন, নিশ্চয় উমরকে তাওফীক দেওয়া হবে।

টিকাঃ
৭৪. সূরা ইবরাহীম: আয়াত-২৬
৭৫. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩৩৮, ১৩৭৪; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮৭১; সুনানে আবু দাউদ: হাদীস-৪৭৫৩।
৭৬. ইসবাতু আযাবিল কবর লিল-বাইহাকী হাদীস-১০৩-১০৫।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 মৃত ব্যক্তির চিৎকার

📄 মৃত ব্যক্তির চিৎকার


عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: إِنَّ الْمَيِّتَ يَعْرِفُ مَنْ يُغَسِّلُهُ، وَمَنْ يَحْمِلُهُ، وَمَنْ يُكَفِّنُهُ، وَمَنْ يُدْلِيهِ فِي قَبْرِهِ، وَإِنَّ الصَّالِحَ إِذَا حُمِلَ عَلَى الْأَعْنَاقِ قَالَ: قَدِّمُونِي، وَإِنْ كَانَ غَيْرَ ذَلِكَ قَالَ: يَا وَيْلَكُمْ أَيْنَ تَذْهَبُونَ بِي؟ يَسْمَعُ صَوْتَهُ كُلُّ شَيْءٍ إِلَّا الْإِنْسَانَ وَلَوْ سَمِعَ لَصُعِقَ.

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মৃত ব্যক্তি তাকে যারা গোসল দেয়, যারা তাকে বহন করে, যারা কাফন পরায় এবং যারা তাকে কবরে নামায়- তাদের সবাইকে চিনতে পারে। নেককার হলে তাকে যখন কাঁধে তুলে নেওয়া হয় তখন সে বলতে থাকে, আমাকে দ্রুত নিয়ে চল, দ্রুত নিয়ে চল। আর যদি সে নেককার না হয় তাহলে সে বলে, হায় আফসোস! তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো! তার এই আওয়াজ মানুষ ছাড়া সকল সৃষ্টি শুনতে পায়। মানুষ যদি শুনতে পেত তাহলে সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত।৬০

টিকাঃ
৬০. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১১১৩৮; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: হাদীস-৬৫২১; হাদীসটি সহীহ।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত- রাসূল ইরশাদ করেছেন, যে কেউ মৃত্যুবরণকালে এমন চিৎকার করে, যা মানুষ ব্যতীত সকল প্রাণীই শুনতে পায়। মানুষ যদি তা শুনতে পেত, তাহলে অজ্ঞান হয়ে যেত। অতঃপর যখন তাকে কবরে নিয়ে যাওয়া হয়, সে যদি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে থাকে, তাহলে বলতে থাকে, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও, তোমরা যদি জানতে আমার জন্য কী কল্যাণ অপেক্ষা করছে, তবে অনেক আগেই নিয়ে যেতে। আর যদি অসৎকর্মপরায়ণ হয়, তাহলে বলতে থাকে, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ো না। তোমরা যদি জানতে আমার জন্য কী কী অকল্যাণ অপেক্ষা করছে, তাহলে তাড়াতাড়ি করতে না।

অতঃপর যখন তাকে কবরে রাখা হয়, তখন দু'জন কৃষ্ণাকায়, নীলচোখ বিশিষ্ট ফেরেশতা আগমন করেন। তারা তার মাথার দিক থেকে আগমন করতে চাইলে, তার সালাত বলে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। আজকের ভয়ে অনেক রাত সে নির্ঘুম কাটিয়েছে। ফলে পায়ের দিক থেকে আসতে চাইবে, কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ বাধা দিয়ে বলবে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। কারণ, সে এই পরিস্থিতির ভয়ে পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করেছে এবং অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছে। এরপর ডান দিক থেকে আসতে চাইলে, তার সদকা বলে উঠবে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। কারণ, সে এই দিনের ভয়ে সদকা করেছে। বাম দিক থেকে আসতে চাইলে, তার রোযা বলবে, আমার দিক থেকে আসা যাবে না। কারণ, সে এই সময়ের ভয়ে ক্ষুধা ও পিপাসাকে সহ্য করেছে।

অতঃপর তাকে ডেকে তোলা হবে, যেভাবে নিদ্রিত ব্যক্তিকে ডেকে তোলা হয়। এরপর বলা হবে, এই ব্যক্তি এবং এই ব্যক্তি যা বলতো তার ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? সে বলবে, কে সে? বলা হবে, মুহাম্মদ। সে বলে উঠবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলবেন, তুমি মুমিন হিসাবে জীবন যাপন করেছ এবং মুমিন হিসাবেই তোমার মৃত্যু হয়েছে। এরপর তার কবরকে প্রশস্ত করে দেয়া হবে এবং আল্লাহ পাকের ইচ্ছানুসারে তার যাবতীয় নিয়ামতের ব্যবস্থা করা হবে।

অতএব, আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদেরকে হেফাজত করেন। আরো প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে বিভ্রান্ত ও দুষ্ট প্রবৃত্তি এবং ঔদ্ধত্য থেকে হেফাজত করেন। হেফাজত করেন, কবরের ভয়াবহ আযাব ও শাস্তি থেকে। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

টিকাঃ
৭৭. আয যুহদ হান্নাদ: ৩৩৩৮, মুসান্নাফে আবী শাইবা: ১৩/৩৪৮ (হাদীসের প্রথম অংশ আবু হুরাইরার বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত); মাজমাউয যাওয়ায়েদ: হাদীস-৪২৬৯; আল্লামা হাইসামী বলেন, হাদীসটির সনদ হাসান।
৭৮. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩৭৬, ১৩৭৭; সহীহ মুসলিম: হাদীস-৫৮৮।

📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 সৎকর্ম কবরের আযাব থেকে মুক্তির কারণ

📄 সৎকর্ম কবরের আযাব থেকে মুক্তির কারণ


عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الْمَيِّتَ يَسْمَعُ خَفْقَ نِعَالِهِمْ حِينَ يُوَلُّونَ عَنْهُ مُدْبِرِينَ، فَإِنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَانَتِ الصَّلَاةُ عِنْدَ رَأْسِهِ، وَالصِّيَامُ عَنْ يَمِينِهِ وَالزَّكَاةُ عَنْ شِمَالِهِ، وَكَانَ فِعْلُ الْخَيْرَاتِ مِنَ الصَّدَقَةِ، وَالصِّلَةِ، وَالْمَعْرُوفِ وَالْإِحْسَانِ إِلَى النَّاسِ عِنْدَ رِجْلَيْهِ، فَيُؤْتَى مِنْ قِبَلِ رَأْسِهِ، فَتَقُولُ الصَّلَاةُ: مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ، ثُمَّ يُؤْتَى عَنْ يَمِينِهِ فَيَقُولُ الصِّيَامُ: مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ. ثُمَّ يُؤْتَى عَنْ شِمَالِهِ فَتَقُولُ الزَّكَاةُ: مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ، ثُمَّ يُؤْتَى مِنْ قِبَلِ رِجْلَيْهِ فَيَقُولُ فِعْلُ الْخَيْرَاتِ مَا قِبَلِي مَدْخَلٌ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে লোকজন যখন ফিরে যায়, তখন মৃতব্যক্তি তাদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। মৃত ব্যক্তি যদি মুমিন হয় তাহলে নামায তার মাথার পাশে, রোযা ডানপাশে, যাকাত বামপাশে এবং অন্যান্য সৎকর্ম যেমন, সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, ভালো কাজ করা এবং মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা তার পায়ের দিকে থাকে। ফেরেশতাগণ মাথার দিক দিয়ে আসতে চাইলে নামায বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। অতঃপর ডানদিক থেকে আসতে চাইলে রোযা বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। অতঃপর বাম দিক থেকে আসতে চাইলে যাকাত বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। তারপর পায়ের দিক দিয়ে আসতে চাইলে অন্যান্য নেক আমল বলে, এদিক দিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।৬১

ٹکا:
৬১. সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস-৩১১৭; মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদীস-১০৭; হাকেম ও যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কবরের আযাব সম্পর্কে আমি জানতাম না। একবার এক ইহুদী নারী আমার নিকট এসে কিছু চাইলে আমি তাকে কিছু দিলাম। তখন সে বলল, আল্লাহ তোমাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন। তখন আমার ধারণা ছিল যে, তার কথা হয়তো ইহুদীদের কল্পকাহিনী প্রসূত। এমন সময় রাসূল গৃহে আগমন করলেন, আমি তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি আমাকে জানালেন যে, কবরের আযাব সত্য।

সুতরাং মুসলমান মাত্রই কর্তব্য হলো, কবরের আযাব থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং উত্তম কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে কবরে যাওয়ার আগেই কবরের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কারণ, যতদিন দুনিয়ায় আছে, ততদিন নেক কাজ করা সহজ। আর কবরের প্রবেশ করার পর প্রবলভাবে আকাঙ্ক্ষা করবে যে, তাকে যেন একটি মাত্র ভালো কাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেওয়া হবে না। ফলে সে নিদারুণ হতাশ অবস্থায় থাকবে।

জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের কাজ হলো মৃতদের ব্যাপারে চিন্তা করা। কারণ, মৃতরা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে যে, তাদের যেন দু রাকাআত সালাত আদায়ের তাওফীক দেওয়া হয় কিংবা একবার মাত্র লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পাঠের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তাদেরকে সে সুযোগ দেওয়া হবে না। মৃতরা জীবিতদের ব্যাপারে অবাক হয় যে, তারা কীভাবে সময়গুলো বেকার ও অনর্থক কর্মে অতিবাহিত করে।

হে ভাই! তাই তুমি তোমার সময়কে নষ্ট কর না। কারণ, এটিই হলো, তোমার মূলধন। যতক্ষণ তোমার কাছে মূলধন আছে, লাভের আশাও রয়েছে। তোমার আখেরাতের পাথেয় তো বর্তমানে লুকিয়ে আছে। সুতরাং সঠিক সময়ে যেন আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করতে পার, সর্বতোভাবে সে চেষ্টাই কর। একদিন আসবে, যখন এ ক্ষুদ্র পাথেয়ই তোমার জন্য বৃহৎরূপ ধারণ করবে। সুতরাং যতটা সম্ভব, সস্তার দিনে তা অধিকহারে কুক্ষিগত কর। কারণ, মৃত্যুর পর শত চেষ্টা করেও তা সংগ্রহ করতে পারবে না।

আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফীক দান করেন এবং আমাদেরকে যেন সেদিন তাদের অন্তর্ভুক্ত না করেন, যারা সেদিন লজ্জিত হয়ে দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার আবেদন জানাবে, কিন্তু তাদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তা'আলা যেন আমাদের এবং সমস্ত মুসলিমদের মৃত্যুর বিভীষিকা সহজ করে দেন।

টিকাঃ
৭৯. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩৭২; সুনানে নাসায়ী: হাদীস-১৩০৮; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৫৪১৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px