📄 চোগলখোরী ও নামাযে অবহেলা কবরের আযাবের কারণ
فَقِيهٌ آخَرُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَمَّا رَأَيْتُ فِي الْمَنَامِ مَا يُعْرَضُ عَلَيَّ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي، رَأَيْتُ رَجُلًا قَدْ وَكَّلَ بِهِ مَلَكٌ مِنْ مَلَائِكَةِ الْعَذَابِ، فَجَاءَتْهُ الصَّلَاةُ فَاسْتَنْقَذَتْهُ مِنْ يَدِهِ، وَرَأَيْتُ رَجُلًا تَجْتَمِعُ عَلَيْهِ ظُلْمَةُ الْقَبْرِ فَجَاءَهُ الْوُضُوءُ فَأَنْجَاهُ مِنْ ذَلِكَ، وَرَأَيْتُ رَجُلًا تَنَاوَشُهُ زَبَانِيَةُ الْعَذَابِ فَجَاءَتْهُ صَدَقَتُهُ فَخَلَّصَتْهُ مِنْ أَيْدِيهِمْ، وَرَأَيْتُ رَجُلًا يَلْهَثُ عَطَشًا فَجَاءَهُ صِيَامُهُ فَسَقَاهُ، وَرَأَيْتُ رَجُلًا وَبَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّبِيِّينَ حِجَابٌ، فَجَاءَهُ غُسْلُهُ مِنَ الْجَنَابَةِ فَأَخَذَ بِيَدِهِ فَأَجْلَسَهُ إِلَى جَنْبِي.
জনৈক ফকীহ থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আমি আমার উম্মতের আমলগুলো স্বপ্নে দেখলাম। দেখলাম, এক ব্যক্তিকে আযাবের ফেরেশতা ধরে নিয়ে যাচ্ছে, ইত্যবসরে তার নামায এসে তাকে তার হাত থেকে মুক্ত করে নিয়ে গেল। এক ব্যক্তিকে দেখলাম কবরের অন্ধকারে সে নিপতিত, তার উযু এসে তাকে উদ্ধার করল। আরেক ব্যক্তিকে দেখলাম আযাবের ফেরেশতারা তাকে মারার জন্য ঘিরে ধরেছে, এমন সময় তার সদকা এসে তাকে মুক্ত করল। এক ব্যক্তিকে পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁপাতে দেখলাম, তার রোযা এসে তাকে পানি পান করাল। আরেক ব্যক্তিকে দেখলাম নবীগণের এবং তার মাঝে একটি পর্দা রয়েছে, এমন সময় তার গোসল এসে তাকে আমার পাশে বসিয়ে দিল। ৫৩
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: مَرَّ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِقَبْرَيْنِ فَقَالَ: إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ، وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ، أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ، وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ لَا يَسْتَبْرِئُ مِنْ بَوْلِهِ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূল ﷺ একদা দু'টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি বললেন, এ কবরবাসীকে আযাব দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে এমন কোনো বড় গুনাহের কারণে আযাব দেওয়া হচ্ছে না, যা থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাদের একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না, অপরজন চোগলখোরী করত। ৫৪
টিকাঃ
৫৩. জামেউল বায়ান আন তা'বীলি আয়িল কুরআন, তাবারী: ৮/১৪৮; তারীখে দামেশক: ৫৯/৩৯২; মুজামুল আওসাত: ৪/৩৫; হাদীসটি মুরসাল সহীহ।
৫৪. সহীহ বুখারী: হাদীস-২১৬; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৯২।
হযরত আমর বিন দীনার রহ. বলেন, মদীনার জনৈক ব্যক্তির বোন পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাস করত। সে অসুস্থ হলে বোনের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য তার নিকট যেত। ইতোমধ্যে তার মৃত্যু হয়ে যায়। তার কাফনের ব্যবস্থা করে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কাফন দাফন শেষে তার মনে পড়ল যে, কবরে সে একটি থলে ফেলে এসেছে। অতঃপর একজন সঙ্গী নিয়ে কবরে যায় এবং কবর খুঁড়ে থলে তুলে নেয়। সে সঙ্গীকে বলল, তুমি একটু সরে দাঁড়াও। দেখি আমার বোনের কী অবস্থা। সে কবরের ঢাকনা খুললে দেখতে পেল কবর জুড়ে আগুন ছড়িয়ে আছে। তৎক্ষণাৎ সে তা ঢেকে দেয়। অতঃপর তার মায়ের নিকট এসে বলে, বোনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমাকে অবহিত কর। মা বললেন, তোমার বোন সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস কর না। সে তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তোমার বোন বিলম্বে নামায পড়তো এবং পূর্ণাঙ্গ পবিত্রতা ছাড়াই নামায আদায় করত। আর প্রতিবেশীরা ঘুমিয়ে পড়লে তাদের দরজায় কান লাগিয়ে গোপন কথা শুনত এবং তা অন্যখানে লাগাত। অর্থাৎ, সে চোগলখোরী করে বেড়াত। এটি কবরের আযাবের কারণ। সুতরাং কবরের আযাব, মুনকার নাকীরের প্রশ্ন এবং আল্লাহর যাবতীয় শাস্তি থেকে মুক্তির জন্য অবশ্যই চোগলখোরী ও পাপাচার পরিহার করতে হবে।
📄 দুনিয়া ও আখেরাতে অবিচলতার স্বরূপ
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ فِي قَوْلِهِ تَعَالَى: يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ (إبراهيم: (۲۷) قَالَ: إِذَا سُئِلَ الْمُؤْمِنُ فِي قَبْرِهِ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، فَذَلِكَ قَوْلُهُ تَعَالَى: يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ.
হযরত বারা ইবনে আযিব রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ আল্লাহ তা'আলার বাণী
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
অর্থ: আল্লাহ মুমিনদেরকে অবিচল রাখবেন দুনিয়া ও আখেরাতে। ৫৫
এ আয়াতের তাফসীরে তিনি বলেন, মুমিনকে যখন তার কবরে প্রশ্ন করা হবে তখন সে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ এই সাক্ষ্য দিবে। এটাই হলো, আয়াতে উল্লিখিত কথা। ৫৬
টিকাঃ
৫৫. সূরা ইবরাহিম: আয়াত-২৭
৫৬. সহীহ বুখারী: হাদীস-৪৭৫০; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮৭১।
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন— يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ অর্থ: যারা মুমিন আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার জীবন ও আখেরাতে দৃঢ় কথার মাধ্যমে মজবুত রাখবেন।
হযরত বারা বিন আযেব রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মুসলমানকে যখন কবরে প্রশ্ন করা হয় আর সে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নাই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসূল, এটিই হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী— يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الآخِرَةِ অর্থ: বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ ইহকাল ও পরকালে শাশ্বত বাণী দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
যে ব্যক্তি মুমিন, ইখলাস সম্পন্ন এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ অনুগত, তাকে তিন অবস্থায় দৃঢ় রাখা হবে। যথা—
• মুমিন বান্দার অবিচলতার তিনটি ক্ষেত্র রয়েছে। যথা— ১. মালাকুল মওতের উপস্থিতির সময়ে। ২. মুনকার নকীরের প্রশ্নের সময়। ৩. কিয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশের সময়।
• মালাকুল মওতের উপস্থিতির সময় দৃঢ়তা তিনভাবে হয়— ১. কুফর থেকে বাঁচিয়ে তাওহীদের উপর অটল রাখার মাধ্যমে, যেন ইসলামে থাকাকালীন তার আত্মা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। ২. ফেরেশতাগণ কর্তৃক তাকে রহমতের সুসংবাদের মাধ্যমে। ৩. তার পরবর্তী আবাস জান্নাতে দেখানোর মাধ্যমে।
• কবরে দৃঢ়তাও তিনভাবে হয়— ১. প্রশ্নোত্তরকালে আল্লাহ তার অন্তরে সঠিক উত্তর ঢেলে দিবেন, ফলে সে তার রবের পছন্দসই জবাব দিবে। ২. ভয়-ভীতি ও বিভ্রম দূর করা হবে। ৩. জান্নাতে তার ঠিকানা দেখতে পাবে। ফলে তার কবর জান্নাতেরই একটি উদ্যানে পরিণত হবে।
• হিসাব নিকাশের সময় দৃঢ় রাখাও তিনভাবে হবে— ১. তাকে যে প্রশ্ন করা হবে সে প্রশ্নের উত্তর তার অন্তরে ঢেলে দেওয়া হবে। ২. হিসাবকে তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। ৩. তার গুনাহ ও ভুলসমূহ মুছে দেওয়া হবে।
• আরেক বর্ণনা মতে দৃঢ় রাখা চার সময়ে হবে— ১. মৃত্যুকালে। ২. কবরে, যাতে সে নির্ভয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। ৩. হিসাবকালে। ৪. পুলসিরাতে, যাতে সে বিদ্যুৎ চমকের মতো তা পার হতে পারে।
টিকাঃ
৭১. সূরা ইবরাহীম: আয়াত-২৬
📄 কবরে প্রশ্নোত্তরের স্বরূপ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسلَّمَ، قَالَ: أَتَدْرُونَ فِيمَا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ: {فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى} [طه: ١٢٤] قَالُوا: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: عَذَابُ الْكَافِرِ فِي الْقَبْرِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، إِنَّهُ لَيُسَلَّطُ عَلَيْهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ تِنِّينًا كُلُّ تِنِّينٍ سَبْعَةُ رُؤُوسٍ، يَنْفُخُونَ فِي جِسْمِهِ، وَيَلْسَعُونَهُ وَيَخْدِشُونَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, তোমরা কি জান فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ অর্থ: তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। ৫৭-এ আয়াতটি কার ব্যাপারে নাযিল হয়েছে? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, কাফেরের কবরের আযাব সম্পর্কে। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তার কবরে নিরানব্বইটি এমন সাপ নিযুক্ত করা হবে, যার প্রত্যেকটির সাতটি করে মাথা থাকবে। সাপগুলো তাকে কিয়ামত পর্যন্ত দংশন করতে থাকবে। ৫৮
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: يُعَذِّبُ الْكَافِرَ تِسْعَةً وَتِسْعُونَ تِنِّينًا، لِأَنَّهُ لَمْ يُؤْمِنْ بِأَسْمَاءِ اللَّهِ تَعَالَى الْحُسْنَى، وَهِيَ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ.
হযরত আনাস রাযি. বলেন, কাফেরকে নিরানব্বইটি সাপ দিয়ে আযাব দেওয়া হবে। কারণ, সে আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণবাচক নামের প্রতি ঈমান আনেনি।
টিকাঃ
৫৭. সূরা ত্বহা: আয়াত-১২৪
৫৮. সুনানে দারেমী: হাদীস-২৮৪২; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১১৭৪৭; হাদীসটি সহীহ [শুয়াইব আরনাউত]।
কবরে প্রশ্নের স্বরূপ কেমন হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের মতপার্থক্য রয়েছে এবং এ ব্যাপারে বর্ণনাগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। যথা—
কেউ বলেন, শরীরে রূহ ফুঁকে দেওয়া হবে, যেমন দুনিয়াতে ছিল। আবার কেউ বলেন, প্রশ্ন করা হবে দেহকে, রূহকে নয়। রূহকে তখন দেহের ভিতর বুকের মাঝে স্থাপন করা হবে। আবার কেউ বলেন, রূহকে দেহ ও কাফনের মধ্যবর্তী স্থানে রাখা হবে। এ উভয় মতের ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। তবে আহলে ইলমের নিকট উত্তম পন্থা হলো, কবরের প্রশ্নোত্তরের বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া, এর ধরন নিয়ে চিন্তা ভাবনা না করা। বরং বলা যে, এর ধরন সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভালো জানেন। যখন আমরা সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হব, তখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করব।
কেউ যদি মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের বিষয়টি অস্বীকার করে, তবে তার দু'টি সূরত হতে পারে। একটি হলো, এটাকে যুক্তির পরিপন্থী মনে করে অস্বীকার করা। অপরটি হলো, এর স্বপক্ষে দলীল না থাকায় অস্বীকার করা। যদি এটাকে যুক্তি পরিপন্থী হওয়ার কারণে অস্বীকার করে, তাহলে তার অর্থ হলো, সে নবীদের নবুওয়াত ও মুজেযাও অস্বীকার করছে। কারণ, মুজেযাও তো বিবেকঊর্ধ্ব বিষয়। কারণ, রাসূলগণ তো সাধারণ মানুষের মতোই মানুষ ছিলেন। সকলের মতো তারা মনুষ্য স্বভাবেরই ধারক ছিলেন। অথচ তাদের কাছে ফেরেশতাগণ আগমন করতেন, তাদের সাথে কথোপকথন করতেন, তাদের নিকট ওহী আসত। হযরত মূসা আ.-এর জন্য এমনকি সমুদ্রও দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, তার লাঠি সাপে পরিণত হয়েছিল। এ সব কিছুই যুক্তিপরিপন্থী। যে এ বিষয়গুলোকে অস্বীকার করবে, তার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্কই থাকবে না।
আর যদি একারণে অস্বীকার করা হয় যে, এটা যুক্তিসঙ্গত হলেও এর স্বপক্ষে কোনো দলিল নেই। তাহলে আমরা বলব, ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে বিভিন্ন রেওয়ায়াত উল্লেখ করেছি, যা বিশ্বাস সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কুরআনেও এ ব্যাপারে প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন— وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْমَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى অর্থ: যে আমার স্মরণে বিমুখ থাকবে, তার জন্য রয়েছে শঙ্কুচিত জীবন-যাপন এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ করে উত্থিত কবর।
মুফাসসিরদের একটি জামাত বলেন, مَعِيشَةً ضَنْكًا তথা সঙ্কুচিত জীবন-যাপন দ্বারা কবরের সওয়াল-জওয়াব উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
৭৩. সূরা ত্বহা: আয়াত-১২৪
📄 কবরের প্রশ্নোত্তর
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ رُوحَ الْعَبْدِ إِذَا قُبِضَ وَأُدْخِلَ قَبْرَهُ تَصَوَّرَتْ لَهُ أَعْمَالُهُ الصَّالِحَةُ، وَأَحَاطَتْ بِهِ، فَتَجِيءُهُ الْمَلَائِكَةُ مِنْ قِبَلِ رِجْلَيْهِ، فَتَقُولُ الصَّلَاةُ: لَيْسَ لَكُمْ عَلَيْهِ سَبِيلٌ، فَقَدْ أَطَالَ الْقِيَامَ عَلَيْهِمَا يَبْتَغِي رِضْوَانَ اللَّهِ، ثُمَّ يَأْتُونَ مِنْ قِبَلِ رَأْسِهِ فَيَقُولُ الصِّيَامُ: لَيْسَ لَكُمْ عَلَيْهِ سَبِيلٌ، فَقَدْ أَظْمَأَ نَفْسَهُ فِي حَرِّ الدُّنْيَا يَبْتَغِي رِضْوَانَ اللَّهِ، ثُمَّ يَأْتُونَ مِنْ قِبَلِ يَمِينِهِ فَتَقُولُ الصَّدَقَةُ لَيْسَ لَكُمْ عَلَيْهِ سَبِيلٌ، فَقَدْ وَصَلَ بِي رَحِمًا، وَأَدَّى بِي أَمَانَةً، وَبَرَّ بِي يَتِيمًا، فَيَقُولَانِ: اجْلِسْ فَيَجْلِسُ فَتُمَثَّلُ لَهُ الشَّمْسُ وَقَدْ دَنَتْ لِلْغُرُوبِ فَيَقُولَانِ لَهُ: مَا تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ الَّذِي كَانَ فِيكُمْ؟ فَيَقُولُ: دَعُونِي حَتَّى أُصَلِّيَ. فَيَقُولَانِ: إِنَّكَ سَتُصَلِّي، وَلَكِنْ أَخْبِرْنَا عَمَّا نَسْأَلُكَ. فَيَقُولُ: عَمَّنْ تَسْأَلَانِ؟ فَيَقُولَانِ عَنْ هَذَا الرَّجُلِ الَّذِي كَانَ فِيكُمْ. فَيَقُولُ: أَشْهَدُ أَنَّهُ رَسُولُ اللهِ، وَأَنَّهُ جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ مِنْ عِنْدِ رَبَّنَا فَصَدَّقْنَاهُ، وَآمَنَّا بِهِ وَاتَّبَعْنَاهُ فَيُقَالُ لَهُ: عَلَى ذَلِكَ عِشْتَ، وَعَلَيْهِ مُتَّ، وَعَلَيْهِ تُبْعَثُ، ثُمَّ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ مَدَّ بَصَرِهِ وَيُفْتَحُ لَهُ بَابٌ إِلَى الْجَنَّةِ، قَالَ : وَأَمَّا الْكَافِرُ فَلَا يُحَامِي عَنْهُ أَحَدٌ، فَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ يُجْلِسَانِهِ، فَيَقُولَانِ لَهُ: مَنْ رَبُّكَ؟ فَيَقُولُ: هاه هاه، فَيُقَالُ لَهُ مَا تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ الَّذِي كَانَ فِيكُمْ؟ فَيَقُولُ أَيُّ رَجُلٍ؟ فَيَقُولُونَ: مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ. فَيَقُولُ: هاه هاه فَيَضْرِبَانِهِ بِمِرْزَبَّةٍ مِنْ حَدِيدٍ، فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا الْخَلْقُ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ.
হযরত আনাস রাযি. বলেন, আমার নিকট এই রেওয়ায়াত পৌঁছেছে যে, যখন কোনো মুমিন বান্দাকে কবরে রেখে আসা হয় তখন তার নেক আমলগুলো তাকে ঘিরে রাখে। ফেরেশতারা তার পায়ের দিক থেকে আসতে চাইলে নামায বলবে, তোমাদের এদিক দিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। কারণ, সে এই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অনেক লম্বা কিয়াম করেছে। ফেরেশতারা তখন মাথার দিক দিয়ে আসতে চাইলে রোযা বলবে, তোমাদের এদিক দিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, সে দুনিয়াতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রচÐ গরমে পিপাসার্ত থেকেছে। অতঃপর তারা ডান দিক থেকে আসতে চাইলে যাকাত বলবে, তোমাদের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, সে আমার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেছে, আমানত আদায় করেছে এবং ইয়াতীমের প্রতি সদয় হয়েছে। তখন তারা বলবে, বস। সে বসবে। তার সামনে সূর্যকে অস্তমিত প্রায় অবস্থায় উপস্থাপন করা হবে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করবে, এ ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, যিনি তোমাদের মাঝে ছিলেন? সে বলবে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি নামায পড়ব। তারা বলবে, তুমি নামায পড়বে, কিন্তু প্রথমে বলো, আমরা যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর কী? সে বলবে, তোমরা কার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছো? তারা বলবে, এ ব্যক্তির ব্যাপারে যিনি তোমাদের মাঝে ছিলেন। সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহর রাসূল। তিনি আমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বিধান নিয়ে এসেছিলেন, আমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করেছি, তার উপর ঈমান এনেছি এবং তাকে অনুসরণ করেছি। তখন তাকে বলা হবে, এর উপরই তুমি ছিলে, এর উপরই তুমি মৃত্যুবরণ করেছ এবং এর উপরই তোমাকে উঠানো হবে। অতঃপর তার কবর দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেওয়া হবে এবং জান্নাতের দিকে তার জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে।
আর কাফের ব্যক্তিকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। তার নিকট মুনকার ও নাকীর এসে তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, তোমার রব কে? সে বলবে, হায়! হায়! আমি তো জানি না। তারা বলবেন, ইনি কে, যিনি তোমাদের কাছে এসেছিলেন? সে বলবে, কে? তারা বলবেন, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। সে বলবে, হায়! হায়! তখন তারা তাকে এমন এক লোহার হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করবে যে, সে এমন জোরে চিৎকার করবে, যা মানুষ ও জিন ছাড়া সকল সৃষ্টি শুনতে পাবে।৫৯
টিকাঃ
৫৯. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১৩০৩৫; তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/৪২৯; আত-তারগীব, মুনযিরী: ৪/২৬৮। হাদীসটির সনদ হাসান।
হযরত ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, মুমিনকে যখন তার কবরে রাখা হয়, তখন দু'জন ফেরেশতা তার নিকট এসে উপস্থিত হয় এবং কবরে তাকে বসিয়ে প্রশ্ন করেন। এ সময় সে তাকে দাফন করতে আসা লোকজনের পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। ফেরেশতাগণ প্রশ্ন করেন, তোমার রব কে? তোমার দীন কী? তোমার নবী কে? সে উত্তরে বলে, আমার রব আল্লাহ, আমার দীন-ইসলাম এবং মুহাম্মদ আমার নবী। তখন ফেরেশতা দু'জন বলেন, আল্লাহ তোমাকে দৃঢ় রেখেছেন। তুমি শীতল নয়নে ঘুমাও। এটিই হলো, কুরআনের নিম্নোক্ত বাণীর ব্যাখ্যা— يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْলِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ অর্থ: আল্লাহ মুমিনগণকে দৃঢ় কথা দ্বারা দুনিয়ার জীবন ও আখেরাত মজবুত রাখেন আর পথভ্রষ্ট করেন জালেমদেরকে। অর্থাৎ, মুমিনদেরকে সত্য কথায় দৃঢ় রাখেন এবং কাফেরদেরকে বিভ্রান্ত করে দেন। তাদের সত্য কথা বলবার তাওফীক হয় না।
আর যখন কাফের কিংবা মুনাফিককে কবরে রাখা হয়, তখন ফেরেশতাদ্বয় তাকে বলেন, তোমার রব কে? তোমার দীন কী? এবং তোমার নবী কে? সে উত্তরে বলে, হায়! আমি জানি না। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলে, তুমি কখনো জানার চেষ্টা করনি। এই বলে তারা হাতুড়ি দিয়ে তাকে এমন আঘাত করবে যে, জিন-ইনসান ছাড়া আসমান জমিনের সকলেই সে আওয়াজ শুনতে পাবে।
হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল হযরত উমর রাযি. কে লক্ষ্য করে বললেন, হে উমর! যখন কবরে নিয়োজিত দুই ফেরেশতা মুনকার নকীর পরীক্ষা নিতে আসবে, তখন তোমার কী অবস্থা হবে? তারা হবে নীল চক্ষু বিশিষ্ট, কৃষ্ণকায়, ধারালো দাঁত বিশিষ্ট, চুল ঝুলে থাকবে মাটি অবধি, তাদের আওয়াজ বজ্রনিনাদের মতো হবে, চোখ হবে বিদ্যুৎ চমকের মতো। উমর রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমার বোধশক্তি থাকবে এবং আমি যে অবস্থায় রয়েছি সে অবস্থাতেই থাকব? রাসূল বললেন, হ্যাঁ। উমর রাযি. বললেন, তাহলে আমি আল্লাহ তা'আলার তওফীক ও অনুমতিতে তাদেরকে সামলে নিব। রাসূল বললেন, নিশ্চয় উমরকে তাওফীক দেওয়া হবে।
টিকাঃ
৭৪. সূরা ইবরাহীম: আয়াত-২৬
৭৫. সহীহ বুখারী: হাদীস-১৩৩৮, ১৩৭৪; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৮৭১; সুনানে আবু দাউদ: হাদীস-৪৭৫৩।
৭৬. ইসবাতু আযাবিল কবর লিল-বাইহাকী হাদীস-১০৩-১০৫।