📄 মৃত্যুর স্মরণ ও তা থেকে গাফেল থাকার পরিণতি
عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: كَفَى بِالْمَوْتِ وَاعِظًا، وَكَفَى بِالدَّهْرِ مُفَرِّقًا، وَكَفَى بِالْيَوْمِ ذَاهِبًا وَغَدًا جَائِيًا.
হযরত আবুদ দারদা রাযি. বলেন, ওয়ায নসীহতের জন্য মৃত্যুই যথেষ্ট, শিক্ষ গ্রহণের জন্য দুনিয়া যথেষ্ট, আজ চলে যাওয়া আর কাল আসা এই তো জীবন।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, মৃত্যু স্মরণের অনেক ফযীলত রয়েছে, যা দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য উপকারী। দুনিয়াতে উপকারী এভাবে যে, দুনিয়া ত্যাগী ও অল্পে তুষ্ট হওয়া যায় এবং ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বাড়ে। আর আখেরাতের উপকার হলো, আল্লাহর সাক্ষাতে আনন্দ পাওয়া যায়, অন্তরে আল্লাহর রহমতের আশা জাগে। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুকে ভুলে থাকে তার জন্য রয়েছে শাস্তিস্বরূপ তিনটি বিষয়- প্রথমত, তওবায় বিলম্ব করা। দ্বিতীয়ত, অল্পে তুষ্ট না থাকা। তৃতীয়ত, ইবাদতে অলসতা।
মৃতদেরকে দেখে মৃত্যুর ব্যাপারে গাফেল থাকার আলামত চারটি-
১. তাদের কবর দেখে অথচ এর দ্বারা কোনো শিক্ষাগ্রহণ করে না।
২. মৃতের সম্পদ ভক্ষণ করে, অথচ এর দ্বারা কোনো শিক্ষাগ্রহণ করে না।
৩. জানাযায় শরীক হয় কিন্তু তার কোনো চিন্তা থাকে না।
৪. মৃত্যুর আলোচনা হয়, কিন্তু কোনো উপকার হয় না।
বর্ণিত আছে, হযরত আবূ হামেদ লিফাফ রহ. বলতেন, যে ব্যক্তি অধিকহারে মৃত্যুকে স্মরণ করবে, তাকে তিন ধরনের সম্মান দান করা হবে। যথা- ১. تَعْجِيلِ التَّوْبَةِ অর্থ : দ্রুত তাওবা। ২. قَنَاعَةِ الْقُوتِ অর্থ : অল্পেতুষ্ট থাকা। ৩. نَشَاطَ الْعِبَادَةِ অর্থ : ইবাদতে উদ্যোমী হওয়া।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মৃত্যুকে ভুলে যাবে, তার উপর তিনটি আযাব আপতিত হবে। যথা- ১. تَسْوِيفِ التَّوْبَةِ অর্থ : তাওবায় বিলম্ব হওয়া। ২. تَرْكَ الرِّضَا بِالْكَفَافِ অর্থ: অল্পে তুষ্ট না হওয়া। ৩. التَّكَاسُلِ فِي الْعِبَادَةِ অর্থ: ইবাদতে অলসতা।
📄 মৃত্যুর বিভীষিকা
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، قَالَ: بَعَثَ اللهُ تَعَالَى مَلَكَ الْمَوْتِ إِلَى إِدْرِيسَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لِيَقْبِضَ رُوحَهُ، فَحَمَلَهُ مَعَهُ إِلَى السَّمَاءِ. قَالَ: فَمَرُّوا بِمَلَكِ يُشْرِفُ عَلَى الْجِنَانِ، فَقَالَ لَهُ إِدْرِيسُ: يَا مَلَكَ الْمَوْتِ سَلْ هَذَا الْمَلَكَ أَنْ يَفْتَحَ لَنَا بَابَ الْجَنَّةِ حَتَّى أَرَاهَا قَبْلَ مَوْتِي، فَإِنَّهُ أَطْيَبُ لِنَفْسِي. فَسَأَلَهُ فَأَبَى، فَقَالَ لَهُ مَلَكُ الْمَوْتِ: قَدْ أَمَرَهُ اللهُ تَعَالَى أَنْ لَا يَفْتَحَ لِأَحَدٍ قَبْلَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِذَا بِإِدْرِيسَ عَلَيْهِ السَّلَامُ تَحْتَ الْعَرْشِ، فَقَالَ لَهُ مَلَكُ الْمَوْتِ: يَا إِدْرِيسُ أَلَمْ أَقُلْ لَكَ إِنَّهُ لَا يَفْتَحُ لِأَحَدٍ قَبْلَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَكَيْفَ دَخَلْتَهَا؟ فَقَالَ إِدْرِيسُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: يَا مَلَكَ الْمَوْتِ أَلَمْ تُذِقْنِي الْمَوْتَ؟ قَالَ: بَلَى، قَالَ: وَكَذَلِكَ كَانَ أَمْرُ رَبِّي لِي فَقَدْ وَفَّيْتَ، قَالَ مَلَكُ الْمَوْتِ: أَوَ لَمْ تَسْأَلْ رَبَّكَ أَنْ تَنْظُرَ إِلَى النَّارِ فَتَرَى أَهْوَالَهَا؟ فَرَأَيْتُهَا وَدَخَلَتْهَا كَمَا أَمَرَكَ رَبُّكَ، قَالَ: بَلَى. قَالَ إِدْرِيسُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: فَقَدْ أَدْخَلَنِي رَبِّي الْجَنَّةَ، وَقَدْ قَالَ رَبِّي: وَمَا هُمْ مِنْهَا بِمُخْرَجِينَ (الحجر : ٤٨) فَدَخَلَهَا، وَقَدْ قَبَضَ اللهُ رُوحَهُ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মওতকে হযরত ইদরীস আ.-এর রূহ কবয করার জন্য প্রেরণ করলেন। তিনি ইদরীস আ.-কে নিয়ে আকাশের দিকে রওয়ানা হলেন। পথে জান্নাতের দায়িত্বশীল ফেরেশতার সাথে সাক্ষাৎ হলো। ইদরীস আ. মালাকুল মওতকে বললেন, এই ফেরেশতাকে বলো, তিনি যেন আমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দেন, আমি মৃত্যুর পূর্বে তা দেখে নিতে চাই, তাহলে আমার মনটা শান্ত হবে। তিনি তাকে বললে সে অস্বীকৃতি জানাল। মালাকুল মওত বললেন, হে ইদরীস, আল্লাহ তাকে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর পূর্বে কারো জন্য জান্নাতের দরজা খুলতে নিষেধ করেছেন। ইদরীস আ. তখন আরশের নীচে গেলেন। মালাকুল মওত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ইদরীস! আমি কি বলিনি মুহাম্মদ ﷺ-এর পূর্বে জান্নাতের দরজা খোলা হবে না। তাহলে তুমি কীভাবে জান্নাতে প্রবেশ করলে? ইদরীস আ. বললেন, তুমি কি আমাকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করাও নি? তিনি বললেন, অবশ্যই। ইদরীস আ. বললেন, আল্লাহ আমাকে এ নির্দেশই দিয়েছিলেন, আমিও তা পালন করেছি। তখন মালাকুল মওত বললেন, আল্লাহ কি তোমাকে জাহান্নাম দেখতে বলেন নি? তুমি কি তা দেখেছ এবং তাতে প্রবেশ করেছ? ইদরীস আ. বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আর আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন এবং বলেছেন, وَمَا هُمْ مِنْهَا بِمُخْرَجِينَ অর্থ: তাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হবে না। তাই আমি এখানেই থাকবো। আল্লাহ তা'আলা তার রুহ কবজ করে নিলেন। ৩৪
টিকাঃ
৩৪. আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন লিল-হাকেম: হাদীস-৪০৪৯; ইবনে আবি হাতিম: ৭/২২৫৫, ২/৭০০; ইবনে কাসীর রহ. বলেছেন, এর সনদ ইবনে আব্বাস পর্যন্ত সহীহ [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৫/২৪২]
বর্ণিত আছে, ঈসা আ. আল্লাহর ইচ্ছায় মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম ছিলেন। একবার কাফেরদের কেউ তাকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি কেবল এমন মৃতকেই জীবিত কর, যে মাত্র মৃত্যুবরণ করেছে। হতে পারে তার মৃত্যুই হয়নি। সুতরাং এমন কাউকে জীবিত কর, যে পৃথিবীর আদিকালে মৃত্যুবরণ করেছে। ঈসা আ. তাদেরকে বললেন, তোমাদের ইচ্ছানুসারে একজনকে নির্ধারণ কর। তারা বলল, সাম বিন নূহকে জীবিত করে দেখাও। তিনি সামের কবরের নিকট এসে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন। আল্লাহ সাম বিন নূহ আ. কে জীবিত করে দিলেন। দেখা গেল, তার দাড়ি চুল সাদা হয়ে গেছে। কেউ বলল, এ কী! তোমার কালে তো বার্ধক্য ছিল না। অর্থাৎ, দাড়ি চুল সাদা হতো না। সাম বলল, আমি ডাক শুনতে পেয়েছি, তাই ভেবেছি যে, কিয়ামত হয়ে গেছে। ভয়ে আমার মাথার চুল ও দাড়ির সাদা হয়ে গেছে। কেউ বলল, কখন তোমার মৃত্যু হয়েছিল? তিনি বললেন, চার হাজার বছর পূর্বে। কিন্তু এখনো আমার থেকে মৃত্যু বিভীষিকা দূর হয়নি। বলা হয়, যখনি কোনো মুমিনের মৃত্যু হয়, তখন তার নিকট জীবন এবং দুনিয়াতে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু শহীদগণ ব্যতীত সকলে মৃত্যুর যন্ত্রণার ভয়ে দুনিয়ায় ফিরে আসতে সম্মত হয় না। শহীদদের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ, তাদের মৃত্যুতে কোনো যন্ত্রণা নেই। তাই তারা দুনিয়াতে ফিরে এসে পুনরায় শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন।
টিকাঃ
৪৯. ইবরাহীম বিন আদহাম- জন্ম: ১০০ হি.। তাঁর উপাধী ছিল "সাইয়্যিদুয যুহহাদ" (যাহেদ-শ্রেষ্ঠ)। তিনি ছিলেন খুরাসানের বলখের অধিবাসী। ১৬২ হি. সনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
📄 চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
عَنِ الْحَسَنِ، قَالَ : بَلَغَنِي أَنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ الْمَوْتُ لَمْ يَجِدْ مِنْ كَرْبِهِ مَا يَشْغَلُهُ عَنِ الرِّضَا بِاللَّهِ، وَالتَّلَذُّذِ بِالنَّظَرِ إِلَيْهِ.
হযরত হাসান রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট এই রেওয়ায়াত পৌঁছেছে যে, মুমিনের যখন মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হয়, তখন সে মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে বেশি আল্লাহ তা'আলার দিদার লাভের আনন্দে বিভোর থাকে।
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: يَا ابْنَ آدَمَ يُصِيبُكَ كُلَّ يَوْمٍ ثَلَاثَةٌ لَا تَعْتَبِرُ بِوَاحِدَةٍ مِنْهَا: يُنْقَصُ مِنْ عُمُرِكَ، وَلَا تَهْتَمُّ بِهِ وَتَأْكُلُ رِزْقَكَ وَلَا تَحْمَدُهُ، وَكُلَّ يَوْمِ تُدْنِي مِنَ الْآخِرَةِ مَرْحَلَةً، وَتَبْعُدُ عَنِ الدُّنْيَا مَرْحَلَةٌ وَلَا تَبَالِي بِهِ، ثُمَّ قَرَأَ: وَيْلُ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ.
যায়িদ ইবনে আসলাম রাযি. বলেন, হে আদম সন্তান! প্রতিদিন তুমি তিনটি অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হও। কিন্তু তার কোনোটি থেকেই তুমি শিক্ষাগ্রহণ কর না। প্রতিদিন তোমার বয়স কমে যায়, কিন্তু তুমি তার পরোয়া কর না, প্রতিদিন তুমি আল্লাহর দেওয়া রিযিক খাও কিন্তু তার জন্য শোকর আদায় কর না। প্রতিদিন তুমি পরকালের নিকটবর্তী হচ্ছ আর দুনিয়া থেকে দূরে যাচ্ছ, কিন্তু তুমি তার পরোয়া কর না। তারপর তিনি এ আয়াত পড়লেন- وَيْلُ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ অর্থ: সে দিন মিথ্যারোপকারীদের জন্য ধ্বংস। ৩৫
عَنِ الْفُضَيْلِ، قَالَ: دَخَلْنَا عَلَى رَجُلٍ وَهُوَ فِي النَّزْعِ، فَجَعَلْنَا نُلَقِّنُهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَهُوَ لَا يَقُولُهَا، فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ: وَاللَّهِ مَا أَسْتَطِيعُ أَنْ أَقُولَهَا، لِأَنَّ بَيْنِي وَبَيْنَهَا جَبَلًا، قُلْتُ لَهُ : صِفْ لِي ذَلِكَ الْجَبَلَ. قَالَ : مِنْ دُيُونِ النَّاسِ عَلَيَّ.
হযরত ফুযাইল রহ. বলেন, আমরা মুমূর্ষু এক ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হলাম। তাকে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ-এর তালকীন করা হলে সে বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর তার জ্ঞান ফিরলে সে বলল, আল্লাহর কসম, আমি তা বলতে পারছি না। কারণ, আমার ও তার মাঝখানে একটি পাহাড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি বললাম, পাহাড়টি সম্পর্কে বলো। সে বলল, মানুষের ঋণ। ৩৬
عَنْ سُلَيْمَانَ التَّيْمِيِّ، قَالَ : أَهْوَنُ مَا يَكُونُ الْمَوْتُ عِنْدَ أَهْلِ الدُّنْيَا أَشَدُّ مِنْ ضَرْبَةِ أَلْفِ سَيْفٍ.
হযরত সুলাইমান তাইমী রহ. বলেন, দুনিয়াদারদের নিকট মৃত্যু যদিও সহজ মনে হয়, কিন্তু তা একহাজার তরবারীর আঘাতের চেয়েও কঠিন।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, বুদ্ধিমানের জন্য চারটি বিষয় অবশ্যই লক্ষণীয়।
১. মৃত্যু যখন সত্য তাহলে দুনিয়ার প্রতি এত আনন্দ কেন?
২. হিসাব-নিকাশ যখন সত্য তাহলে এত সম্পদ জমা করে কী লাভ?
৩. কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা'আলার মুখোমুখি হতে হবে, তাহলে এত গুনাহ করে কী লাভ?
৪. পুলসিরাত যখন পার হতেই হবে, তাহলে আত্ম-অহমিকা দেখিয়ে কী লাভ?
টিকাঃ
৩৫. সূরা মুরসালাত: আয়াত-১৫
৩৬. শুআবুল ঈমান: হাদীস-৫৫৬০; আল-আকিবাহ ফী আহওয়ালিল আখিরাহ: ২৮০।
বর্ণিত আছে, হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম রহ. কে বলা হলো, আপনি যদি আমাদের সাথে কিছুটা সময় অতিবাহিত করতেন এবং আমরা আপনার কাছ থেকে কিছু নসীহত শ্রবণ করতাম। তখন তিনি বললেন, আমি চারটি বিষয় নিয়ে খুব ব্যস্ত আছি। যদি অবসর পাই, তবে তোমাদের সাথে সময় অতিবাহিত করব। তাকে বলা হলো, সে চারটি বিষয় কী? তিনি বললেন-
১. প্রতিজ্ঞা দিন নিয়ে আমি চিন্তিত, যেদিন আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদের থেকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির সমাপ্তির পর هَؤُلَاءِ فِي الْجَنَّةِ وَلَا أُبَالِي وَهَؤُلَاءِ فِي النَّارِ وَلَا أُبَالِي অর্থাৎ, 'এরা জান্নাতী, এতে আমি কোনো পরোওয়া করি না। আর এরা জাহান্নামী, এতেও আমি কোনো পরোয়া করি না।' হায়! আমার জানা নেই আমি কোন শ্রেণীভুক্ত!
২. সে সময় নিয়ে আমি চিন্তিত, যখন মায়ের উদরে অনাগত সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা সিদ্ধান্ত প্রদান করেন এবং তাতে রূহ ফুঁকে দেন, আর এ ব্যাপারে নিয়োজিত ফেরেশতা তখন বলেন, يَا رَبِّ أَشَقِيُّ أَمْ سَعِيدٌ অর্থাৎ, হে রব! এ শিশু কি সৌভাগ্যবান হবে নাকি অভাগা? আমার জানা নেই, আমার ক্ষেত্রে সে সময়ে কী উত্তর হয়েছিল?
৩. মালাকুল মওতের উপস্থিত হওয়ার সময় নিয়ে আমি চিন্তিত। যখন সে আমার রূহ কবজ করার জন্য আসবে। আর বলবে, يَا رَبِّ أَمَعَ الْمُسْلِمِينَ أَمْ مَعَ الْكَافِرِينَ অর্থাৎ, হে রব! এ কি মুসলমানদের সাথে থাকবে নাকি কাফেরদের সাথে? আমার জানা নেই, আমার বেলায় কী জবাব হবে?
৪. আমি আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণী নিয়ে পেরেশান হয়ে আছি, কুরআনে এসেছে وَامْتَارُوا الْيَوْمَ أَيُّهَا الْمُجْرِمُونَ অর্থাৎ, হে গুনাহগাররা! আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও। আমার জানা নেই, আমি কোন শ্রেণী ভুক্ত হবো।
টিকাঃ
৫০. মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৮৬; সহীহ ইবন হিব্বান হাদীস-৩৩৮; হাদীসটি সহীহ।
📄 মৃত্যুর সময় মুমিনের সুসংবাদ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا، فِي تَفْسِيرِ قَوْلِهِ تَعَالَى: {وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ} [ق: ۱۹] قَالَ: جَاءَ مَلَكَانِ يُبَشِّرَانِهِ بِالْجَنَّةِ إِنْ كَانَ مُؤْمِنًا وَإِنْ كَانَ كَافِرًا يُبَشِّرَانِهِ بِالنَّارِ.
হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ অর্থ: আর মৃত্যু যন্ত্রণা সত্যিই আসবে, যা থেকে তুমি পলায়ন করতে। ৩৭
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট দুইজন ফেরেশতা আসেন। মুমিন হলে তারা তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেন, আর কাফের হলে জাহান্নামের দুঃসংবাদ দেন।
টিকাঃ
৩৭. সূরা কাফ: আয়াত-১৯
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. বলেন, সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ অনুধাবনের শক্তি দিয়েছেন এবং যাকে জাগিয়ে তুলেছেন আলস্যের তন্দ্রা থেকে। তাওফীক দিয়েছেন শেষ সময় ও খাতেমা নিয়ে চিন্তা করতে। আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট প্রার্থনা জানাই, যেন তিনি আমাদের খাতেমা বিল খায়ের করেন এবং আমাদের জন্য পরিণামে সুসংবাদের ব্যবস্থা করেন। কারণ, মুমিনের জন্য মৃত্যুকালে রয়েছে সুসংবাদ। কুরআনে এসেছে- إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ. অর্থ: নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ, অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না। তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সুসংবাদ গ্রহণ কর। অর্থাৎ, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি। অতঃপর ঈমানের উপর অবিচল থাকে।
কারো কারো মতে اسْتَقَامُوا (ইস্তেকামাত) অর্থ হলো, তারা ফরজ সমূহ আদায় করে এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে।
ইয়াহইয়া বিন মুআয রাজী উক্ত শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন, اسْتَقَامُوا অর্থাৎ, যারা কথা ও কাজে দৃঢ়তা অবলম্বন করে।
অপর কেউ বলেন, যারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মত ও পথ অবলম্বন করে।
মৃত্যুকালীন এ সকল লোকের নিকট ফেরেশতাগণ সুসংবাদ নিয়ে আগমন করবে, বলবেন, দুনিয়াতে কোনোরূপ ভয় কর না এবং আখেরাতেও কোনো দুশ্চিন্তা কর না। বরং সুসংবাদ গ্রহণ কর ওই জান্নাতর, যার ওয়াদা তোমাদেরকে নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন।
বলা হয়, মৃত্যুকালীন সুসংবাদ পাঁচ ধরনের। যথা-
১. সাধারণ মুমিনদের জন্য সুসংবাদ। তাদের উদ্দেশ্য করে বলা হবে, চিরকালীন আযাবের ভয় কর না। কারণ, নবী ও সালেহীনের শাফায়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদেরকে মুক্তি দিবেন। প্রতিদান হারানোর ভয় কর না। বরং সুসংবাদ গ্রহণ কর জান্নাতের। অর্থাৎ, তোমাদের শেষ গন্তব্য হলো জান্নাত।
২. ইখলাস সম্পন্ন মুমিনদের জন্য সুসংবাদ। তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হবে, তোমাদের আমল পণ্ড করে দেওয়ার ভয় নেই। বরং তা দ্বিগুণ করে দেওয়া হবে। তাওবার পর তোমরা যে আমল করেছ তার জন্য দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
৩. তাওবাকারীদের জন্য সুসংবাদ। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা তোমাদের কৃত গুনাহের কারণে ভীত হয়ো না। তা ক্ষমা করে দেওয়া হবে। তাওবার পরে যে আমল করেছ তার প্রতিদানের ব্যাপারে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
৪. যাহেদদের জন্য সুসংবাদ। তাদেরকে বলা হবে, হাশর হিসাব নিকাশ ইত্যাদি নিয়ে তোমাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। তোমাদের প্রতিদানও দ্বিগুণ করা হবে। কোনোরূপ হিসাব গ্রহণ ও আযাব ব্যতীতই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর।
৫. আলেমদের জন্য সুসংবাদ, যারা মানুষকে কল্যাণের শিক্ষা দিয়েছে এবং ইলম অনুসারে আমল করেছে। তাদেরকে বলা হবে, কিয়ামত দিনের বিভীষিকায় আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই এবং দুশ্চিন্তারও কিছু নেই। তোমরা যে আমল করেছ, তার প্রতিদান অবশ্যই পাবে। তোমরা এবং যারা তোমাদের অনুসরণ করেছে সকলে জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর।
সুসংবাদ তার জন্য, যার পার্থিব জীবনের শেষ প্রাপ্তি সুসংবাদ হয়। কারণ, সুসংবাদ কেবল তাকেই প্রদান করা হবে, যে মুমিন হবে, মুহসিন হবে। ফেরেশতাগণ তাদের নিকট আসলে তারা ফেরেশতাদেরকে বলবে, তোমরা কারা? তোমাদের চেয়ে সুন্দর চেহারার কাউকে দেখিনি এবং সুঘ্রাণময়ও কাউকে দেখিনি। উত্তরে ফেরেশতাগণ বলবে- نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ অর্থ: আমরা পার্থিব জীবন ও আখেরাতে তোমাদের বন্ধু। অর্থাৎ, আমরা সেই ফেরেশতা, যারা দুনিয়াতে তোমাদের আমল লিপিবদ্ধ করতাম। আখেরাতেও আমরা তোমাদের সহচর হবো। সুতরাং জ্ঞানী ব্যক্তির কাজ হলো, আলস্যের নিদ্রা ত্যাগ করা।
টিকাঃ
৫১. সূরা হা-মীম সাজদাহ: আয়াত-৩০
৫২. হা-মীম সাজদাহ: আয়াত-৩১