📄 তিনটি বিষয় মনে রাখা কর্তব্য
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের তিনটি বিষয় সর্বদা মনে রাখা উচিত-
১. সে কোথা থেকে এসেছে? তার অস্তিত্ব কীভাবে হলো?
২. সে কোথায় আছে?
৩. সে কোথায় যাবে?
এ তিনটি বিষয় মনে রাখলে সে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর নাফরমানি করবে না। সে মনে করবে, আমি মায়ের পেটে একটি নাপাক ফোটা থেকে সৃষ্টি হয়েছি। তারপর দুনিয়াতে দুর্বল অবস্থায় এসেছি। এখন আল্লাহ তা'আলা আমাকে সম্মান ও শক্তি দান করেছেন। আমার রব আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এমন রবের নাফরমানী আমি কীভাবে করব!
সে যখন তার অবস্থান নিয়ে চিন্তা করবে যে, তার চারপাশে আল্লাহর অনেক নিয়ামত রয়েছে এবং সে নিজেও এর মধ্যে অবস্থান করছে, তখন সে এই চিন্তা করে আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে যে, আমি আল্লাহর দেওয়া রিযিক খেয়ে তাঁর জমিনে বাস করে কীভাবে তাঁর নাফরমানী করতে পারি?
আর সে যখন তার শেষ পরিণামের কথা চিন্তা করবে যে, আমাকে কবরে যেতে হবে। যেখানে মুনকার-নাকীরের জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে। তখন সে নাফরমানীর কথা কল্পনাও করতে পারবে না।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ
অর্থ: হে মানুষ! তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে কিসে ধোঁকায় ফেলল? ৩০
বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ যখনই এই আয়াত পড়তেন, তখন বলতেন, মূর্খতা তাকে ধোঁকায় ফেলেছে।
ٹکا:
৩০. সূরা ইনফিতার: আয়াত-৬
📄 চারটি বিষয়ে গুরুত্বপ্রদান কর্তব্য
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআয আর-রাযী রহ. বলেন, عجبْتُ مِمَّنْ يَحْزَنُ عَلَى نُقْصَانِ مَالِهِ كَيْفَ لَا يَحْزَنُ عَلَى نُقْصَانِ عُمُرِهِ وَعَجِبْتُ مِمَّنْ يَطْلُبُ الدُّنْيَا وَالْمَوْتُ يَطْلُبُهُ وَعَجِبْتُ مِمَّنْ يَبْنِي الْقُصُورَ وَالْقَبْرُ مَصِيرُهُ وَعَجِبْتُ مِمَّنْ يَضحَكُ وَخَلْفَهُ النَّارُ
১. যে ব্যক্তি সম্পদের স্বল্পতার জন্য চিন্তিত অথচ জীবন কমে যাওয়ার জন্য চিন্তিত নয়।
২. যে দুনিয়ার পিছনে ছুটে অথচ মৃত্যু তার পিছনে ধাবমান।
৩. যে বড় প্রাসাদ নির্মাণ করে অথচ কবরই তার শেষ ঠিকানা।
৪. যে অনর্থক হাসে অথচ তার সামনে জাহান্নামের আগুন রয়েছে।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মানুষের হায়াতের প্রতিটি দিন ও রাতের জন্য তার রিযিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কেউ তার নির্ধারিত রিযিকের চেয়ে বেশি পাবে না এবং তার নির্ধারিত সময় আসার পূর্বে মৃত্যুবরণ করবে না। সুতরাং মানুষের উচিত হারাম উপার্জন পরিহার করা এবং পরকালের পাথেয় অর্জন করার জন্য অধিক সময় ব্যয় করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, اَلْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ تَعَالَى
অর্থ: বুদ্ধিমান সে, যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরকালের জন্য কাজ করে। আর অক্ষম সে, যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির অনুসারী বানায় এবং আল্লাহর কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। ৩১
টিকাঃ
৩১. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৫৯; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৬০; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১৭৬৩২; হাদীসটি হাসান।
📄 মৃত্যুর স্বরূপ
عَنْ أَبِي الْخَلِيلِ أَنَّ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ لَمَّا قَبَضَ اللهُ رُوحَهُ، قَالَ: كَيْفَ وَجَدْتَ الْمَوْتَ يَا خَلِيلَ الرَّحْمَنِ؟ فَقَالَ: كَصُفُودٍ أُدْخِلَ فِي صُوفٍ رَطْبٍ، ثُمَّ نُزِعَ فَتَعَلَّقَ الصُّوفُ بِالشَّوْكِ. فَقَالَ لَهُ: إِنَّا قَدْ هَوَّنَّا عَلَيْكَ
আবূল খলীল রহ. থেকে বর্ণিত। মৃত্যুর পর আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম আ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, মৃত্যুর স্বাদ কেমন পেয়েছেন? তিনি উত্তর দিলেন, ভেজা পশমে গরম লোহার শিক ঢুকিয়ে তা টেনে বের করলে পশমগুলো যেভাবে শিকের কাঁটায় আটকে যায়, আমি মৃত্যুর সময় তেমন কষ্ট পেয়েছি। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমি তো আপনার উপর তা সহজ করে দিয়েছিলাম। ৩২
টিকাঃ
৩২. মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: হাদীস-৩৪৫৬৩; আয-যুহদ, আহমাদ: হাদীস-৪৪২; তারিখে দামেশক: ৬/৪০০।
📄 স্মরণীয় ও উপদেশমূলক উক্তি
আবুদ দারদা রাযি. বলেন, তিনটি বিষয়ের জন্য আমি দুনিয়া ভালোবাসি- গরমের দিনে রোযা রাখা, রাতের বেলা ইবাদত করা, আর এমন লোকদের সাথে উঠাবসা করা যারা উত্তম কথা বলে, যেমন উত্তম ফল বাছাই করা হয়।
ক্বাতাদা রহ. বলেন, এই ইলমের মজলিসগুলো হলো গনীমতের মাল। এতে হেকমত থেকে কিছু নাও। কারণ, নেককাররা হেকমতের কথা বলে থাকেন। তুমি সেই বৈঠকে বস। হতে পারে তুমিও এর বরকত পেয়ে যাবে এবং তাদের কাতারে শামিল হয়ে যাবে।
আলী রাযি. বলেন, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করতে থাক। এটা সর্বোত্তম যিকির। আর সে বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা কর, যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে দিয়েছেন। কারণ, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর রাসূল ﷺ এর হেদায়েতকে অনুসরণ কর, কারণ তা সর্বোত্তম হেদায়েত। নবীজির সুন্নতকে ধারণ কর, কারণ তা সর্বোত্তম আদর্শ। কুরআন পাঠ শিক্ষা কর, কারণ তা সর্বোত্তম কালাম। দীনের জ্ঞান অর্জন কর, কারণ তা অন্তরের বসন্ত।
عَنْ قَتَادَةَ، قَالَ: مَنْ خَافَ الْمَوْتَ هَانَتْ عَلَيْهِ مَصَائِبُ الدُّنْيَا.
কাতাদা রহ. বলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুকে ভয় করে তার জন্য দুনিয়ার যাবতীয় বিপদ সহজ হয়ে যায়।
قَالَ رَجُلٌ لِعُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ رَحِمَهُ اللهُ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ إِنِّي أَحْبَبْتُكَ حُبًّا شَدِيدًا فَقَالَ: وَلِمَ؟ قَالَ: رَأَيْتُكَ وَأَنْتَ بِالْمَدِينَةِ وَأَبُوكَ وَالِيَهَا، وَأَنْتَ لَمْ تَزَلْ أَخَشَنَ النَّاسِ لِبَاسًا، وَأَجْفَاهُمْ عَيْشًا، وَأَكْثَرَهُمْ صِيَامًا قَالَ عُمَرُ: مَنْ تَذَكَّرَ الْمَوْتَ أَكْثَرَ مِنْهُ، ارْتَضَى مِنَ الدُّنْيَا بِالْيَسِيرِ
এক ব্যক্তি উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ.কে বলল, আমি আপনাকে খুবই ভালোবাসি। তিনি বললেন, কেন? সে বলল, যখন আপনার বাবা মদীনার গভর্নর ছিলেন আর আপনি তাঁর ছেলে ছিলেন, তখনো আপনি খুব সাধারণ পোশাকে থাকতেন, সাধারণ জীবন যাপন করতেন এবং বেশি বেশি রোযা রাখতেন। এ জন্য আমি আপনাকে ভালোবাসি। উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. বললেন, যে ব্যক্তি বেশি বেশি মৃত্যুর স্মরণ করে সে তো দুনিয়ার খুব অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে।
وَقَالَ أَيْضًا: لَوْ فَارَقَنِي ذِكْرُ الْمَوْتِ سَاعَةً لَفَسَدَ قَلْبِي.
তিনি আরো বলেন, এক মুহূর্তের জন্য যদি আমি মৃত্যুর কথা ভুলে যাই, আমার অন্তর নষ্ট হয়ে যাবে।
وَقَالَ يَزِيدُ بْنُ تَمِيمٍ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى: مَنْ لَمْ يَكُنِ الْمَوْتُ لَهُ مَوْعِظَةٌ، فَلَا مَوْعِظَةَ لَهُ.
ইয়াযিদ ইবনে তামীম রহ. বলেন, যার জন্য মৃত্যু কোনো উপদেশ হতে পারল না, তার জন্য আর কোনো উপদেশ নেই।
وَقَالَ دَاوُدُ الطَّائِي رَحِمَهُ اللَّهُ تَعَالَى: الدُّنْيَا سُوقٌ رَبِحَ مِنْهَا قَوْمٌ وَخَسِرَ فِيهَا آخَرُونَ.
দাউদ তায়ী রহ. বলেন, দুনিয়া একটি বাজার, এখানে কেউ লাভবান হয় আর কেউ লোকসানের শিকার হয়।
وَقَالَ بَعْضُ الْحُكَمَاءِ: مَنْ أَكْثَرَ ذِكْرَ الْمَوْتِ أُكْرِمَ بِثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: تَعْجِيلُ التَّوْبَةِ، وَقَنَاعَةُ الْقَلْبِ، وَنَشَاطُ الْعِبَادَةِ، وَمَنْ نَسِيَ ذِكْرَ الْمَوْتِ عُوقِبَ بِثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ: تَسْوِيفُ التَّوْبَةِ وَتَرْكُ الرِّضَا بِالْكَفَافِ وَالتَّكَاسُلُ فِي الْعِبَادَةِ.
জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন, যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে মৃত্যুর স্মরণ করে, তাকে তিনটি মর্যাদা দান করা হয়। যথা- ১. দ্রুত তাওবার তাওফীক দেওয়া হয়, ২. অল্পে তুষ্টির গুণ দান করা হয়, ৩. ইবাদতের উদ্যম দান করা হয়।
পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মৃত্যুকে ভুলে থাকে, তাকে তিন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়। যথা-
১. তাওবায় বিলম্ব করা।
২. অল্পে তুষ্ট না থাকা।
৩. ইবাদতে অলসতা।
فَكِّرْ يَا ابْنَ آدَمَ فِي فَنَاءِ عُمُرِكَ، وَذَهَابِ قُوَّتِكَ وَانْحِنَاءِ قَامَتِكَ، وَشَيْبِ شَعْرِكَ، وَقُرْبِ أَجَلِكَ، وَمَا يَكُونُ حَالُكَ عِنْدَ مُعَالَجَةِ سَكَرَاتِ الْمَوْتِ وَمَا تُجِيبُ بِهِ مُنْكَرًا وَنَكِيرًا، وَبَيْنَ يَدَيْ مَنْ تَقِفُ غَدًا، وَإِلَى أَيِّ دَارٍ تُحْمَلُ؟ فَتَدَارَكَ مَا بَقِيَ مِنْ عُمُرِكَ، فَعَسَى أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكَ مَا مَضَى.
হে আদম সন্তান! একটু ভাবুন তো, আপনার জীবন কীভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে! আপনার শক্তি কোথায় চলে যাচ্ছে! আপনার কোমড় কীভাবে বেকে যাচ্ছে! আপনার চুলগুলো কীভাবে সাদা হয়ে যাচ্ছে! আর আপনার মৃত্যুর সময়ও ঘনিয়ে আসছে! যখন মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হবে তখন আপনার কী অবস্থা হবে! মুনকার নাকীরের প্রশ্নের উত্তরে আপনি কী বলবেন! কিয়ামতের দিন আপনি কার সামনে দাঁড়াবেন! আপনাকে কোন ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে! সুতরাং আপনার জীবনের অবশিষ্ট অংশের সদ্ব্যবহার করুন। হয়তো আল্লাহ আপনার অতীত জীবনের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।