📄 কবর হবে জান্নাতের উদ্যান কিংবা জাহান্নামের গর্ত
فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْقَبْرُ إِمَّا رَوْضَةٌ مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ أَوْ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرِ النِّيرَانِ.
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, কবর হবে জান্নাতের বাগানসমূহের মধ্যে কোনো বাগান কিংবা জাহান্নামের গর্তসমূহের কোনো গর্ত। ২৬
عَنْ هَانِيِّ مَوْلَى عُثْمَانَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ عُثْمَانَ كَانَ إِذَا وَقَفَ عَلَى الْقَبْرِ بَكَى حَتَّى يَبُلَّ لِحْيَتَهُ. فَقِيلَ لَهُ: تُذْكَرُ الْجَنَّةُ وَالنَّارُ فَلَا تَبْكِي، وَتَبْكِي مِنْ هَذَا؟ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الْقَبْرُ أَوَّلُ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ، فَإِنْ نَجَا مِنْهُ، فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ، وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ.
হযরত উসমান রাযি.-এর মুক্তদাস হানি রহ. বলেন, উসমান রাযি. যখন কোনো কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তখন তিনি এত কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাঁকে বলা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনায় তো আপনি কাঁদেন না, কবরের পাশে কেন কাঁদেন? তিনি বললেন, আমি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, কবর হলো, আখেরাতের প্রথম মনযিল। যে ব্যক্তি এখানে মুক্তি পাবে, তার পরবর্তী মনযিলগুলো আরো সহজ হয়ে যাবে। আর যে এখানে মুক্তি পাবে না, তার পরবর্তী মনযিলগুলো এর চেয়েও কঠিন হবে। ২৭
টিকাঃ
২৬. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৬০; আল-মুজামুল কাবীর: ১২/৩৮৩; হাদীসটি হাসান।
২৭. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৩০৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৬৭; ইমাম তিরমিযী ও হাকেম হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।
رَوَى أَبُو سَعِيدٍ الْخُدْرِيُّ. أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّমَ رأَى أُنَاسًا يَضْحَكُوْنَ فَقَالَ : أَمَا إِنَّكُمْ لَوْ أَكْثَرْتُمْ مِنْ ذِكْرِ هَاذِهِ اللَّذَاتِ لَشَغَلَكُمْ عَمَّا أَرَى. ثُمَّ قَالَ : أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ، ثُمَّ قَالَ : إِنَّمَا الْقَبْرُ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الْجَنَّةِ أَوْ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرِ النَّارِ.
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি. বর্ণনা করেন, একবার রাসূল কয়েকজন ব্যক্তিকে হাস্যরত দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, যদি তোমরা যাবতীয় স্বাদ বিস্বাদকারী মৃত্যুর স্মরণ অধিক হারে করতে, তবে আমি তোমাদেরকে যাতে লিপ্ত দেখছি, তোমাদেরকে তা থেকে বিরত রাখত। অতঃপর বললেন, যাবতীয় স্বাদ হরণকারী মৃত্যুর স্মরণ অধিকহারে কর। এরপর বললেন, কবর হবে হয়তো জান্নাতের একটি উদ্যান কিংবা জাহান্নামের গর্ত।
টিকাঃ
৪৭. সুনানে তিরমিযী হাদীস-২৪৬০,২৩০৭; সুনানে নাসায়ী হাদীস-১৮২৪; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৫৮। হাদীসটির সনদ জয়ীফ। তবে হাদীসের প্রথম অংশটি সহীহ যা আবু হুরায়রা থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে।
📄 মৃত্যুর ধরন
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، قَالَ: مَوْتُ الْفَجْأَةِ رَاحَةٌ لِلْمُؤْمِنِ، وَحَسْرَةٌ عَلَى الْكَافِرِ.
হযরত আনাস রাযি. বলেন, আকস্মিক মৃত্যু মুমিনের জন্য আরামদায়ক আর কাফেরের জন্য আফসোসের কারণ। ২৮
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهَا، قَالَتْ: سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ مَوْتِ الْفَجْأَةِ، فَقَالَ: هُوَ رَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِ، وَأَخْذَةٌ أَسَفٌ لِلْفَاجِرِ.
হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আমি রাসূল ﷺ-এর কাছে আকস্মিক মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটা মুমিনের জন্য রহমত এবং গুনাহগার ব্যক্তির জন্য কঠিন শাস্তি। ২৯
টিকাঃ
২৮. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৩৮৭৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৩/২৭৯।
২৯. মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-২৫০৫৮; সুনানে আবী দাউদ: হাদীস-৩১১৫।
قَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ لِكَعْبٍ: يَا كَعْبُ حَدَّثْنَا عَنِ الْمَوْتِ قَالَ : إِنَّ الْمَوْتَ كَشَجَرَةِ شَوْكِ أُدْخِلَتْ فِي جَوْفِ ابْنِ آدَمَ فَأَخَذَتْ كُلُّ شَوْكَةٍ بِعِرْقٍ مِنْهُ، ثُمَّ جَذَبَهَا رَجُلٌ شَدِيدُ الْقُوَى، فَقَطَعَ مِنْهَا مَا قَطَعَ وَأَبْقَى مَا أَبْقَى.
হযরত ওমর রাযি. কা'ব রাযি. কে লক্ষ্য করে বললেন, হে কা'ব মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের কিছু বর্ণনা কর। কা'ব রাযি. বললেন, মৃত্যু হলো, কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের ন্যায়, যা আদম সন্তানের উদরে প্রবেশ করানো হয়। অতঃপর প্রবল শক্তিধর এক ব্যক্তি সে বৃক্ষে টান দেয়, ফলে কিছু অংশ ছিঁড়ে যায়, কিছু অংশ ভিতরে রয়ে যায়।
হযরত হযরত সুফইয়ান সাওরীর প্রসঙ্গে উল্লেখ আছে, তার সামনে মৃত্যুর আলোচনা করা হলে বেশ কয়েকদিন তার কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত না। কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলতেন, জানি না! আমি জানি না!
📄 তিনটি বিষয় মনে রাখা কর্তব্য
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, প্রত্যেক মুসলমানের তিনটি বিষয় সর্বদা মনে রাখা উচিত-
১. সে কোথা থেকে এসেছে? তার অস্তিত্ব কীভাবে হলো?
২. সে কোথায় আছে?
৩. সে কোথায় যাবে?
এ তিনটি বিষয় মনে রাখলে সে কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর নাফরমানি করবে না। সে মনে করবে, আমি মায়ের পেটে একটি নাপাক ফোটা থেকে সৃষ্টি হয়েছি। তারপর দুনিয়াতে দুর্বল অবস্থায় এসেছি। এখন আল্লাহ তা'আলা আমাকে সম্মান ও শক্তি দান করেছেন। আমার রব আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এমন রবের নাফরমানী আমি কীভাবে করব!
সে যখন তার অবস্থান নিয়ে চিন্তা করবে যে, তার চারপাশে আল্লাহর অনেক নিয়ামত রয়েছে এবং সে নিজেও এর মধ্যে অবস্থান করছে, তখন সে এই চিন্তা করে আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে যে, আমি আল্লাহর দেওয়া রিযিক খেয়ে তাঁর জমিনে বাস করে কীভাবে তাঁর নাফরমানী করতে পারি?
আর সে যখন তার শেষ পরিণামের কথা চিন্তা করবে যে, আমাকে কবরে যেতে হবে। যেখানে মুনকার-নাকীরের জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে। তখন সে নাফরমানীর কথা কল্পনাও করতে পারবে না।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ
অর্থ: হে মানুষ! তোমাকে তোমার মহান রবের ব্যাপারে কিসে ধোঁকায় ফেলল? ৩০
বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ যখনই এই আয়াত পড়তেন, তখন বলতেন, মূর্খতা তাকে ধোঁকায় ফেলেছে।
ٹکا:
৩০. সূরা ইনফিতার: আয়াত-৬
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, তিনটি কথা জ্ঞানীদের কখনোই ভোলা উচিত না- ১. দুনিয়া ধ্বংস হওয়া ও তার পরিবর্তন হওয়া। ২. মৃত্যু। ৩. বিপদাপদ, যার থেকে আত্মরক্ষার কোনো উপায় নেই।
📄 চারটি বিষয়ে গুরুত্বপ্রদান কর্তব্য
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআয আর-রাযী রহ. বলেন, عجبْتُ مِمَّنْ يَحْزَنُ عَلَى نُقْصَانِ مَالِهِ كَيْفَ لَا يَحْزَنُ عَلَى نُقْصَانِ عُمُرِهِ وَعَجِبْتُ مِمَّنْ يَطْلُبُ الدُّنْيَا وَالْمَوْتُ يَطْلُبُهُ وَعَجِبْتُ مِمَّنْ يَبْنِي الْقُصُورَ وَالْقَبْرُ مَصِيرُهُ وَعَجِبْتُ مِمَّنْ يَضحَكُ وَخَلْفَهُ النَّارُ
১. যে ব্যক্তি সম্পদের স্বল্পতার জন্য চিন্তিত অথচ জীবন কমে যাওয়ার জন্য চিন্তিত নয়।
২. যে দুনিয়ার পিছনে ছুটে অথচ মৃত্যু তার পিছনে ধাবমান।
৩. যে বড় প্রাসাদ নির্মাণ করে অথচ কবরই তার শেষ ঠিকানা।
৪. যে অনর্থক হাসে অথচ তার সামনে জাহান্নামের আগুন রয়েছে।
ফকীহ সমরকন্দী রহ. বলেন, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক মানুষের হায়াতের প্রতিটি দিন ও রাতের জন্য তার রিযিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কেউ তার নির্ধারিত রিযিকের চেয়ে বেশি পাবে না এবং তার নির্ধারিত সময় আসার পূর্বে মৃত্যুবরণ করবে না। সুতরাং মানুষের উচিত হারাম উপার্জন পরিহার করা এবং পরকালের পাথেয় অর্জন করার জন্য অধিক সময় ব্যয় করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, اَلْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ تَعَالَى
অর্থ: বুদ্ধিমান সে, যে নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরকালের জন্য কাজ করে। আর অক্ষম সে, যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির অনুসারী বানায় এবং আল্লাহর কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। ৩১
টিকাঃ
৩১. সুনানে তিরমিযী: হাদীস-২৪৫৯; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-৪২৬০; মুসনাদে আহমাদ: হাদীস-১৭৬৩২; হাদীসটি হাসান।
হযরত হাতেম আসম রহ. বলেন, চার বিষয়ের মূল্য চারজনের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব। যথা-
১. যৌবনের মূল্য : قَدْرُ الشَّبَابِ لَا يَعْرِفُهُ إِلَّا الشَّيُوخُ অর্থ : যৌবনের মূল্য কেবল বৃদ্ধের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
২. নিরাপত্তার মূল্য : وَقَدْرُ الْعَافِيَةِ لَا يَعْرِفُهُ إِلَّا أَهْلُ الْبَلَاءِ অর্থ : নিরাপত্তার মূল্য কেবল বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
৩. সুস্থতার মূল্য : وَقَدْرُ الصِّحَّةِ لَا يَعْرِفُهُ إِلَّا الْمَرْضَى অর্থ : সুস্থতার মূল্য কেবল অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
৪. জীবনের মূল্য : وَقَدْرُ الْحَيَاةِ لَا يَعْرِفُهُ إِلَّا الْمَوْتَى অর্থ : মৃতের পক্ষেই কেবল জীবনের মূল্য উপলব্ধি করা সম্ভব।
ইমাম সমরকন্দী বলেন, হাদীসে যে পাঁচটি বিষয়ের গুরুত্বের কথা আমরা উল্লেখ করেছি, এ কথাগুলো তার অনুরূপ।