📄 সালেহ (পুণ্যবান) ব্যক্তির পরিচয়
عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ سُئِلَ عَنِ الرَّجُلِ الصَّالِحِ، فَقَالَ : الرَّجُلُ الصَّالِحُ الَّذِي يُعْطِيَ اللهُ مِنْ نَفْسِهِ بِالْإِنْصَافِ، وَيَأْخُذُ مِنْهَا بِالْحَقِّ
হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. কে صالح (পুণ্যবান) ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সালেহ বা সৎকর্মশীল ব্যক্তি হলো, যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ইনসাফ করে এবং হক অনুসারে তা গ্রহণ করে।
শাকীক বিন ইবরাহীম বলখী রহ. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করল, লোকেরা আমাকে 'সালেহ' উপাধিতে ভূষিত করেছে। কিন্তু আমি 'সালেহ' নাকি 'সালেহ' নই, তা বুঝবো কিভাবে? শাকীক রহ. বললেন-
প্রথমত: أَظْهِرْ سِرَّكَ عِنْدَ الصَّالِحِينَ فَإِنْ رَضُوا بِهِ فَاعْلَمْ أَنَّكَ صَالِحٌ، وَإِلاَّ فَلَا. 'সালেহীনের' নিকট তুমি নিজের গোপন বিষয়গুলোকে তুলে ধর। যদি তারা তোমার গোপন বিষয়গুলো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে, তবে তুমি প্রকৃতই 'সালেহ' অন্যথায় নয়।
দ্বিতীয়ত: اعْرِضِ الدُّنْيَا عَلَى قَلْبِكَ فَإِنْ رَدَّهَا فَاعْلَمْ أَنَّكَ صَالِحٌ. তোমার অন্তরের সম্মুখে দুনিয়াকে তুলে ধর। অন্তর যদি ঘৃণাভরে দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে তুমি 'সালেহ'।
তৃতীয়ত: اعْرِضِ الْمَوْتَ عَلَى نَفْسِكَ فَإِنْ تَمَنَّتْهُ فَاعْلَمْ أَنَّكَ صَالِحٌ، وَإِلاَّ فَلَا. মৃত্যুকে নফসের সামনে পেশ কর। যদি তোমার নফস তাকে কামনা করে, তবে তুমি 'সালেহ', অন্যথায় নয়। এ তিন ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্য যদি তোমার মাঝে পাওয়া যায়, তাহলে তুমি অধিকহারে নিজেকে আল্লাহমুখী কর। যাতে তোমার আমলে রিয়া প্রবেশ না ঘটে। কারণ, সামান্যতম রিয়া তোমার যাবতীয় আমলকে বিনষ্ট করে দেবে।
📄 মুমিন ও পাপাচারীর পরিচয়
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: قُلُوبُ الْفُجَّارِ فِي حناجِرِهِمْ، وَقُلُوبُ الْمُؤْمِنِينَ مِنْ دُونِ صُدُورِهِمْ يَعْنِي أَنَّ الْمُؤْمِنَ يَتَدَبَّرُ فِي قَلْبِهِ قَبْلَ أَنْ يَعْمَلَ بِهِ، فَيَكُونُ هَمُّهُ لِآخِرَتِهِ، وَأَمَّا الْفَاجِرُ فَهَمُّهُ كُلُّهُ لِلدُّنْيَا لَا يَتَدَبَّرُ الْأُمُورَ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, গুনাহগারদের কলব তাদের কণ্ঠনালিতে থাকে আর মুমিনদের কলব থাকে তাদের বক্ষের নীচে। অর্থাৎ মুমিন যা করার ইচ্ছা করে তা করার পূর্বে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং তার সকল কাজের উদ্দেশ্য হয় আখেরাত। পক্ষান্তরে গুনাহগারদের কোনো কাজের উদ্দেশ্যই আখেরাত হয় না, তাদের সকল কাজের উদ্দেশ্য দুনিয়া। তারা কাজের পরিণাম নিয়ে চিন্তা করে না।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُؤْمِنُ? قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: الَّذِي لَا يَمُوتُ حَتَّى يَمْلَأَ اللَّهُ مَسَامِعَهُ مِمَّا يُحِبُّ، وَلَوْ أَنَّ رَجُلًا عَمِلَ لِطَاعَةِ اللَّهِ تَعَالَى فِي بَيْتٍ فِي جَوْفِ بَيْتٍ إِلَى سَبْعِينَ بَيْتًا، عَلَى كُلِّ بَيْتٍ بَابٌ مِنْ حَدِيدٍ لَأَلْبَسَهُ اللهُ تَعَالَى رِدَاءَ عَمَلِهِ حَتَّى يَتَحَدَّثَ النَّاسُ بِذَلِكَ وَيَزِيدُوا قِيلَ : يَا রাসুলুল্লাহি, ওয়া কাইফা ইয়াযীদূন? قَالَ : إِنَّ الْمُؤْمِنَ يُحِبُّ مَا زَادَ فِي عَمَلِهِ ، ثُمَّ قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْفَاجِرُ قَالُوا : اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ : الَّذِي لَا يَمُوتُ حَتَّى يَمْلَأُ اللَّهُ مَسَامِعَهُ مِمَّا يَكْرَهُ وَلَوْ أَنَّ عَبْدًا عَمِلَ بِمَعْصِيَةِ اللهِ تَعَالَى فِي بَيْتٍ فِي جَوْفِ بَيْتٍ إِلَى سَبْعِينَ بَيْتًا عَلَى كُلِّ بَيْتٍ بَابٌ مِنْ حَدِيدٍ لَأَلْبَسَهُ اللهُ تَعَالَى رِدَاءَ عَمَلِهِ حَتَّى يَتَحَدَّثَ النَّاسُ بِذلِكَ وَيَزِيدُوا قِيلَ وَكَيْفَ يَزِيدُونَ يَا রাসুলুল্লাহ? قَالَ : إِنَّ الْفَاجِرَ يُحِبُّ مَا زَادَ فِي فُجُورِهِ.
হযরত আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেছেন, তোমরা কি জানো মুমিন কে? উপস্থিত সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত। তিনি বললেন ঐ ব্যক্তি মুমিন, যার কর্ণকুহরকে আল্লাহ তার পছন্দনীয় বিষয় দিয়ে ভরে দেয়া অবধি মৃত্যুবরণ করে না। যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের জন্য এমন গৃহে বসে, যে গৃহ আরেকটি বৃহৎ গৃহের মাঝে অবস্থিত, যাকে ঘিরে আছে আরো সত্তরটি গৃহ, প্রতিটি গৃহে আছে একটি করে লৌহকপাট, তথাপি আল্লাহ তা'আলা তাকে তার আমলের চাদরে ঢেকে নিবেন। এমনকি লোকেরা পঞ্চমুখে তার আমলের আলোচনা করতে থাকে এবং তার আমলকে বাড়িয়ে দেয়। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল কীভাবে তারা আমলকে বাড়িয়ে দেয়? তিনি ইরশাদ করলেন, মুমিন তাই পছন্দ করে, যা তার আমলকে বৃদ্ধি করে। অতঃপর রাসূল বলেন, তোমরা কি জানো, পাপাচারী কে? উপস্থিত সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত। তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি, যার কর্ণকুহরকে আল্লাহ তার অপছন্দনীয় বিষয় দিয়ে ভরে দেয়া অবধি মৃত্যুবরণ করে না। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় এমন গৃহে বসে গুনাহ করে, যে গৃহ একটি বৃহৎ গৃহের মাঝে অবস্থিত, যাকে ঘিরে আছে আরো সত্তরটি গৃহ, প্রতিটি গৃহে রয়েছে একটি লৌহ কপাট, তথাপি আল্লাহ তা'আলা তাকে তার গুনাহের চাদরে মুড়ে দেন, এমনকি লোকেরা তার গুনাহের সমালোচনা করতে থাকে এবং তার গুনাহকে বাড়িয়ে দেয়? বলা হলো, কিভাবে তারা গুনাহকে বাড়িয়ে দেয়? তিনি ইরশাদ করলেন, পাপাচারী তাই পছন্দ করে, যা তার পাপকে বৃদ্ধি করে।
عَنْ عَوْفِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّهُ قَالَ: كَانَ أَهْلُ الْخَيْرِ يَكْتُبُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ بِثَلَاثِ كَلِمَاتٍ، مَنْ عَمِلَ لِآخِرَتِهِ كَفَاهُ اللهُ أَمْرَ دُنْيَاهُ، وَمَنْ أَصْلَحَ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ أَصْلَحَ اللَّهُ تَعَالَى فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّاسِ، وَمَنْ أَصْلَحَ سَرِيرَتَهُ أَصْلَحَ اللَّهُ عَلَانِيَتَه
আউফ বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন মহৎ লোকেরা একে অপরের নিকট তিন ধরনের বাক্য দিয়ে পত্র প্রেরণ করতেন। ১. যে ব্যক্তি তার পরকালের জন্য আমল করে, আল্লাহই তার দুনিয়ার বিষয়াদির জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। ২. যে ব্যক্তি তার ও আল্লাহর মাঝের বিষয়গুলো সংশোধন করে নেয়, আল্লাহ তার ও মানুষের মাঝের বিষয়গুলো সংশোধন করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি তার গোপনকে বিশুদ্ধ রাখে, আল্লাহ তার প্রকাশ্যকে বিশুদ্ধ করে রাখেন।
টিকাঃ
৩২. আল-ফিরদাউস, দাইলামী: ২/৫৯ (২৩৩৩); কানযুল উম্মাল ৩/৬৭৪ (৮৪২৬)
📄 অসৎ নিয়ত ও অন্তরের দুরাচারের প্রতিফল
عَنِ الْأَحْنَفِ بْنِ قَيْسٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : يُؤْخَذُ الْعَبْدُ بِعَمَلِ قَلْبِهِ وَيَدِهِ، يَعْنِي إِذَا نَوَى شَيْئًا وَعَمِلَ بِهِ يُؤْخَذُ بِهِ وَسَيُحَاسَبُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانَتْ نِيَّتُهُ فِي الدُّنْيَا، فَإِنْ كَانَتْ نِيَّتُهُ لِلَّهِ فَلَا تَبِعَةَ عَلَيْهِ وَإِنْ كَانَتْ لِغَيْرِ اللهِ يُؤْخَذُ بِهَا، ثُمَّ قَرَأَ قَوْلَهُ تَعَالَى: يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ (الطارق : ۹) أَيْ تُظْهَرُ مَا كَانَتْ نِيَّتُهُ فِيمَا كَانَ يَعْمَلُ مِنَ الْخَيْرِ وَالشَّرِّ.
হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস রহ. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, বান্দার অন্তরের ইচ্ছা ও হাতের কর্মের কারণে তাকে পাকড়াও করা হবে। অর্থাৎ, কোনো কাজ করার জন্য সে যে নিয়ত করে তার ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। যদি তার নিয়ত আল্লাহর জন্য হয় তাহলে কোনো সমস্যা নেই, আর যদি অন্য কারো জন্য হয় তাহলে তাকে পাকড়াও করা হবে। অতঃপর রাসূল কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন,
يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ
অর্থ: যেদিন সবকিছু প্রকাশিত হয়ে পড়বে। ১৭
অর্থাৎ, তার নেক আমলের উদ্দেশ্য সেদিন প্রকাশ করে দেওয়া হবে।
টিকাঃ
১৭. সূরা তারিক : আয়াত-৯
হামেদ ফাফ বলেন, যখন আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ধ্বংসের কামনা করেন, তখন তার উপর তিনটি বিষয় চাপিয়ে দেন-
১. يَرْزُقُهُ اللهُ الْعِلْمَ وَيَمْنَعُهُ عَنْ عَمَلِ الْعُلَمَاءِ অর্থাৎ, তাকে ইলম দান করেন কিন্তু আমল থেকে বঞ্চিত করেন।
২. يَرْزُقُهُ صُحْبَةَ الصَّالِحِينَ وَيَمْنَعُهُ عَنْ مَعْرِفَةِ حُقُوقِهِمْ অর্থাৎ, তাকে সালেহ ও সৎলোকদের সাহচর্যের সৌভাগ্য দান করেন। কিন্তু তাদের হক সম্পর্কে বে-খবর রাখেন।
৩. يَفْتَحُ عَلَيْهِ بَابَ الطَّاعَاتِ وَيَمْنَعُهُ مِنْ إِخْلَاصِ الْعَمَلِ অর্থাৎ, তার জন্য ভালো কর্মের দুয়ার খুলে দেন, কিন্তু আমলের ইখলাস থেকে বঞ্চিত করেন।
ফকীহ আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. বলেন, এরূপ ঘটে তার নিয়তের অশুদ্ধতা ও অভ্যন্তরীন দুষ্ট প্রবৃত্তির কারণে। কারণ, যদি তার নিয়ত শুদ্ধ হতো, তবে অবশ্যই আল্লহ তা'আলা তাকে ইলমের কল্যাণ, আমলের জন্য ইখলাস এবং সালেহীনের মর্যাদা দানের বোধ দান করতেন।
📄 আল্লাহর সঙ্গে প্রতারণা পরিত্যাগ কর
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَا تَعَلَّمُوا الْعِلْمَ لِتُبَاهُوا بِهِ الْعُلَمَاءَ، وَلَا لِتُمَارُوا بِهِ السُّفَهَاءَ وَلَا لِتُصَرِّفُوا بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْكُمْ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَهُوَ فِي النَّارِ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেন, তোমরা ইলম অর্জন কর, কিন্তু আলেমদের উপর বড়াই করার জন্য নয়। মূর্খদের সাথে তর্ক করার জন্য নয়, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নয়। যে ব্যক্তি এর কোনো একটির জন্য ইলম অর্জন করে সে জাহান্নামী।১৮
عَنِ الضَّحَّاكِ بْنِ قَيْسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: أَنَا خَيْرُ شَرِيكٍ، فَمَنْ أَشْرَكَ مَعِي شَرِيكًا، فَهُوَ لِشَرِيكِهِ يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَخْلِصُوا الْأَعْمَالَ لِلَّهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا خَلُصَ لَهُ، وَلَا تَقُولُوا هُذَا لِلَّهِ وَلِلرَّحِمِ، فَإِنَّهَا لِلرَّحِمِ، وَلَيْسَ لِلَّهِ فِيهِ شَيْءٌ، وَلَا تَقُولُوا: هَذَا لِلَّهِ وَلِوُجُوهِكُمْ، فَإِنَّهَا لِوُجُوهِكُمْ، وَلَيْسَ لِلَّهِ مِنْهَا شَيْءٌ.
হযরত যাহহাক ইবনে কায়েস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, আমি উত্তম শরীক। যে ব্যক্তি আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, সে তার জন্যই কাজ করে, আমার জন্য নয়। হে মানব সকল! তোমরা শুধু আল্লাহর জন্যই ইখলাসের সাথে আমল কর। কারণ, আল্লাহ তা'আলা শুধু ঐ আমলই গ্রহণ করেন যা ইখলাসের সাথে করা হয়। তোমরা কখনো এ কথা বলবে না যে, এই কাজ আল্লাহ ও আত্মীয়ের জন্য। এমন বললে তা আত্মীয়ের জন্যই হবে, আল্লাহর জন্য কিছুই হবে না। এমনও বলবে না যে, এই কাজ আল্লাহ ও তোমাদের সন্তুষ্টির জন্য। এমন বললে তা তোমাদের জন্যই হবে, আল্লাহর জন্য কিছুই হবে না।১৯
عَنْ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ رَحِمَهُ اللهُ قَالَ: يُؤْتَى بِالْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَقَدْ عَمِلَ الْعَمَلَ الصَّالِحَ، فَيَجِيءُ يَتَصَاعَدُ فِي مِيزَانِهِ، فَيَجْعَلُ لَهُ نُورًا، وَتَكْتُبُ لَهُ الْحَفَظَةُ فِي أَحْسَنِ صُحُفِهِمْ، فَتَقُولُ الْمَلَائِكَةُ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ: رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنْ عَبْدِكَ كَذَا وَكَذَا مِنْ عَمَلِهِ فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لِلْمَلَائِكَةِ : إِنَّكُمْ حَفَظَةً عَلَى عَمَلِ عَبْدِي، وَأَنَا رَقِيبٌ عَلَى مَا فِي نَفْسِهِ، إِنَّهُ لَمْ يَعْمَلُ هَذَا الْعَمَلَ لِي أَلْقُوهُ فِي سِجِّينِ.
সুফইয়ান সাওরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে, যে অনেক নেক আমল করেছে। আমলগুলো আসমানে চড়তে থাকবে। সেগুলো থেকে নূর বিচ্ছুরিত হবে। ফেরেশতারা তার জন্য সর্বোত্তম আকারে সেগুলো লিপিবদ্ধ করবেন। ফেরেশতাগণ আল্লাহর দরবারে তার আমল পেশ করে বলবেন, হে আমাদের রব! আপনার এই বান্দার আমলগুলো কবুল করুন। আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, তোমরা ছিলে তার আমলের তত্ত্বাবধায়ক। আর আমি তার অন্তরের খবর রাখি। সে আমার জন্য এই আমলগুলো করেনি। এগুলো সিজ্জীনে নিক্ষেপ কর।
وَقَالَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ: يُجَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصُحُفٍ مَخْتُومَةٍ، فَيُنْصَبُ بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ تَعَالَى، فَيَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : أَلْقُوا هَذَا، وَاقْبَلُوا هَذَا فَتَقُولُ الْمَلَائِكَةُ : يَا رَبَّنَا مَا رَأَيْنَا إِلَّا خَيْرًا. فَيَقُولُ: إِنَّ هَذَا كَانَ لِغَيْرِي، وَإِنِّي لَا أَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا ابْتُغِيَ بِهِ وَجْهِي.
হযরত আনাস রাযি. বলেন, কিয়ামতের দিন সীলমোহর করা আমলনামা আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, এটি নিক্ষেপ কর, ওটি গ্রহণ কর। তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, রব! আমরা তো তার ভালো ছাড়া কিছু দেখিনি। আল্লাহ বলবেন, এগুলো আমার জন্য ছিল না। আর আমি একমাত্র আমার সন্তুষ্টির জন্য করা আমলই গ্রহণ করি। ২০
وَقَالَ بَعْضُ الْحُكَمَاءِ: الْمُخْلِصُ الَّذِي يَعْمَلُ الطَّاعَةَ، وَيُحِبُّ أَنْ يَعْمَلَ لِيُكْرِمَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَالْمُرَائِيُّ الَّذِي يَعْمَلُ الطَّاعَةَ وَيُحِبُّ أَنْ يُكْرِمَهُ النَّاسُ فِي الدُّنْيَا.
জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন, মুখলিস সে, যে এই উদ্দেশ্যে আমল করে যে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে সম্মানিত করবেন। আর রিয়াকারী সে, যে এই উদ্দেশ্যে আমল করে যে, মানুষ তাকে দুনিয়াতে সম্মান করবে।
টিকাঃ
১৮. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস-২৫২; মুস্তাদরাকে হাকেম: ১/১৬৫; হাকেম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ও যাহাবী তাঁর সমর্থন করেছেন।
১৯. সুনানে দারাকুতনী: হাদীস-৫০; সুনানে কুবরা লিল-বাইহাকী: হাদীস-১৯৪৫১; হাদীসটি হাসান [শায়েখ শুয়াইব আরনাউত]।
২০. মুসনাদে বায্যার: হাদীস-৭৪৪১; মুজামুল আওসাত: হাদীস-৬৪০২; আল্লামা হাইসামী বলেন, হাদীসটির রাবীগণ বিশ্বস্ত তবে আনাস রাযি. থেকে বর্ণনাকারী ব্যক্তি অজ্ঞাত পরিচয় [মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১০/২২৫]
عَنْ جَبَلَةَ الْيَحْصُبِيُّ، قَالَ : كُنَّا فِي غَزْوَةٍ مَعَ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ مَرْوَانَ فَصَحِبَنَا رَجُلٌ مِسْهَارُ لَا يَنَامُ مِنَ اللَّيْلِ إِلَّا أَقَلَّهُ، فَمَكَثْنَا أَيَّامًا لَا نَعْرِفُهُ ثُمَّ عَرَفْنَاهُ، فَإِذَا هُৱ رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ ، وَكَانَ فِيمَا حَدَّثَنَا أَنَّ قَائِلًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، فِيمَ النَّجَاةُ غَدًا? قَالَ : أَنْ لَا تُخَادِعُ اللهَ، قَالَ : وَكَيْفَ نُخَادِعُ اللهَ? قَالَ: أَنْ تَعْمَلَ بِمَا أَمَرَكَ اللَّهُ وَتُرِيدُ بِهِ غَيْرَ وَجْهِ اللهِ، وَاتَّقُوا الرِّيَاءَ فَإِنَّهُ الشَّرْكُ بِاللَّهِ، وَإِنَّ الْمُرَائِي يُنَادَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ بِأَرْبَعَةِ أَشْيَاء : يَا كَافِرُ ، يَا فَاجِرُ، يَا غَادِرُ، يَا خَاسِرُ، ضَلَّ عَمَلُكَ وَبَطَلَ أَجْرُكَ، فَلَا خَلَاقَ لَكَ الْيَوْمَ، فَالْتَمِسُ أَجْرَكَ مِمَّنْ كُنْتَ تَعْمَلُ لَهُ يَا مُخَادِعُ
হযরত জাবালাহ ইয়াহসুবী রহ. বলেন, একবার আমরা আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের সঙ্গে যুদ্ধে ছিলাম। আমাদের সাথে রাত জাগরণে অভ্যস্ত এক ব্যক্তিকেও নিলাম। সে রাতে খুব কমই ঘুমাতেন। কিছুদিন পর্যন্ত আমরা তার বিস্তারিত পরিচয় জানতে পারিনি। কয়েকদিন পর জানতে পারলাম, তিনি রাসূল ﷺ-এর একজন সাহাবী। তিনি আমাদেরকে যে সমস্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন, তার একটি হলো, একদা মুসলমানদের একজন বলে উঠল, হে আল্লাহর রাসূল! ভবিষ্যতে আমাদের মুক্তির পথ কী? রাসূল ﷺ বললেন, আল্লাহর সাথে প্রতারণা কর না। উক্ত ব্যক্তি বলল, কীভাবে আমরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করি? তিনি ইরশাদ করলেন, আল্লাহর সাথে প্রতারণা হলো, আল্লাহ তোমাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, সে অনুসারে আমল করবে, অথচ তোমার উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছু। তোমরা 'লৌকিকতা পরিহার কর। কারণ, তা আল্লাহর সাথে এক ধরনের শিরক। লৌকিকতাদুষ্ট ব্যক্তিকে কিয়ামতোর দিন সকল সৃষ্টির সম্মুখে চার নামে ডাকা হবে। যথা- হে কাফের! হে ফাজের! হে বিশ্বাসঘাতক! হে ধ্বংসপ্রাপ্ত! তোমার আমল বিনাশ হয়েছে, তোমার প্রতিদান নষ্ট হয়েছে। সুতরাং আজ তোমার কোনো অংশ নেই। তুমি তার কাছেই প্রতিদান তালাশ কর, যার জন্য তুমি আমল করেছিলে, হে ধোঁকাবাজ! জাবালাহ ইয়াহসুবী রহ. বলেন, আমি তাকে বললাম, ঐ সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আপনি স্বয়ং রাসূল থেকে এ হাদীস শ্রবণ করেছেন? তিনি বললেন, ঐ সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই! আমি স্বয়ং রাসূল থেকে এ হাদীস শ্রবণ করেছি। তবে যদি আমি কোনো ভুল করে থাকি, তা আমার ইচ্ছাকৃত নয়। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন- إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ অর্থ: "নিশ্চয় মুনাফিকগণ আল্লাহর সাথে প্রতারণা করে। তাই (কিয়ামতের দিন) তিনিও তাদের সাথে প্রতারণামূলক আচরণ করবেন।" এর অর্থ হলো তিনি তাদেরকে তাদের প্রতারণার উপযুক্ত শাস্তি দিবেন। ইমাম সমরকন্দী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি আখেরাতে তার কৃত আমলের সওয়াবের আশা রাখে, তার উচিত আমলকে রিয়ামুক্ত রেখে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য করা। অতঃপর সে আমলের কথা ভুলে যাওয়া, যাতে আত্ম-অহমিকা ও দম্ভ তা বিনষ্ট না করতে পারে। কারণ, কাজ হেফাজত করা, কাজ করার চেয়ে অধিক কষ্টসাধ্য। হযরত আবূ বকর ওয়াসিতী রহ. বলেন, আমল করার তুলনায় তা সংরক্ষণ করা অধিকতর কঠিন। কারণ, আমলের তুলনা হলো, কাচের মতো, যা দ্রুত ভেঙ্গে যায় এবং ভার সহ্য করতে পারে না। আমলও অনুরূপ। যদি রিয়া ও আত্মাহমিকার সংমিশ্রণ ঘটে, তবে তা নষ্ট হয়ে যায়। যখন কোনো ব্যক্তি আমলের ইচ্ছা করে এবং তাতে রিয়ার আশঙ্কা করে, তবে সম্ভব হলে অন্তর থেকে রিয়া দূর করার চেষ্টা করবে। যদি সম্ভব না হয় এর পরেও আমল করা চাই। রিয়ার কারণে আমল পরিত্যাগ করবে না। অতঃপর লৌকিকতা থেকে আল্লাহর কাছে মাফ চাইবে। হয়তো আল্লাহ তাকে অন্য আমলে ইখলাস দান করবেন।
টিকাঃ
৩৩. তাফসীরে কুরতুবী [তাফসীরে তাবারীর সূত্রে] : খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৯; দুররে মানসুর: ১/৭৪।
৩৪. সূরা নিসা: আয়াত-১৪২।