📄 শুদ্ধ আমলের জন্য চারটি বিষয় অনিবার্য
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআয রাযি. বলেন, চারটি বিষয় ছাড়া কোনো আমল শুদ্ধ হয় না। যথা-
১. আল্লাহর মারেফত বা পরিচয় লাভ করা।
২. আল্লাহর আনুগত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে জানা।
৩. শয়তানের শত্রুতা সম্পর্কে জানা।
৪. ইখলাসের সাথে আমল করা।
জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেন, কোন আমল নিখুঁত হওয়ার জন্য চারটি বিষয় অনিবার্য। যথা-
প্রথমত : أَوَّلُهَا الْعِلْمُ قَبْلَ بَدْيْهِ অর্থাৎ, আমল শুরু করার পূর্বে সে সম্পর্কে ইলম বা জ্ঞান থাকা। কারণ, ইলম ছাড়া আমল শুদ্ধ হতে পারে না। তাই ইলম ছাড়া আমল ভালো ফলের তুলনায় অধিক মন্দ ফল বয়ে আনে।
দ্বিতীয়ত : النّيَّةُ فِي مَبْدَيْهِ অর্থ: আমলের সূচনায় নিয়ত করা। কারণ, নিয়ত ব্যতীত আমল শুদ্ধ হতে পারে না। إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَلِكُلِّ امْرِي مَانَوى - নবী ইরশাদ করেছেন - সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকের জন্য তাই যা সে নিয়ত করে। সুতরাং রোযা, নামায, হজ্ব এবং অন্যান্য নেককর্ম নিয়ত ব্যতীত শুদ্ধ হবে না। অতএব, আমল বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শুরুতেই নিয়ত করা চাই।
তৃতীয়ত : الصَّبْرُ فِي وَسَطِهِ অর্থ: আমলে ধৈর্য ধারণ করা। অর্থাৎ আমলের মধ্যে ধৈর্য ধরা যাতে শান্তভাবে আমলটি সম্পাদন হয়।
চতুর্থ : الْإِخْلَاصُ عَنْدَ فَرَاغِهِ। অর্থ: আমল সমাপ্তির সময় ইখলাস অবলম্বন করা। কারণ, ইখলাস ব্যতীত আমল গ্রহণযোগ্য নয়। যখন তুমি ইখলাসের সাথে আমল শেষ করবে, আল্লাহ তা'আলা তা গ্রহণ করবেন এবং মানুষের অন্তরকে তোমার প্রতি ধাবিত করে দিবেন।
টিকাঃ
৩০. সহীহ বুখারী: হাদীস-১; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৯০৭।
📄 ইখলাসের বিষয়ে সতর্ক থাকা
হযরত ইয়াকুব মুকাফফাফ রহ. বলেন, মুখলিস সে ব্যক্তি, যে নিজের নেক আমল এমনভাবে গোপন রাখে যেমনভাবে সে তার বদ আমল গোপন রাখে।
হযরত আইউব সাখতিয়ানী রহ. বলেন, নিয়তকে ইখলাসপূর্ণ করা আমল করার চেয়েও কঠিন।
হযরত সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. বলেন, নফসের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, আমলে ইখলাস আনা। কারণ, নফসের এখানে কোনো প্রাপ্তি নেই।
হযরত ফুযাইল ইবনে ইয়ায রহ. বলেন, মানুষের কারণে আমল ছেড়ে দেওয়া রিয়া। আর মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা শিরক। এ দু'টো থেকে বেঁচে থাকাই ইখলাস।
عَنْ هَرَمِ بْنِ حَيَّانَ، أَنَّهُ قَالَ : مَا أَقْبَلَ عَبْدُ بِقَلْبِهِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى إِلَّا أَقْبَلَ اللَّهُ تَعَالَى بِقُلُوبِ الْإِيمَانِ إِلَيْهِ، حَتَّى يَرْزُقَهُ مَوَدَّتَهُمْ وَرَحْمَتَهُمْ.
হারাম বিন হাইয়ান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার অন্তর কে আল্লাহর প্রতি ধাবিত করে, আল্লাহ ঈমানদারদের অন্তরকে তার প্রতি ধাবিত করে দেন। ফলে সে লাভ করে ভালোবাসা, প্রীতি ও করুণাময় সাহচর্য।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ ، أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ اللهَ تَعَالَى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا قَالَ لِجِبْرِيلَ: إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا، فَأَحِبَّهُ، فَيَقُولُ جِبْرِيلُ لِأَهْلِ السَّمَاءِ : إِنَّ رَبَّكُمْ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ فَيُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ، وَإِذَا أَبْغَضَ اللَّهُ عَبْدًا فَمِثْلُ ذُلِكَ .
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেছেন, যখন আল্লাহ তা'আলা কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, জিবরাঈল আ.কে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরাঈল আ. আসমানের বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, তোমাদের রব অমুককে ভালোবাসে। সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের বাসিন্দারাও তাকে ভালোবাসে এবং জমিনেও তার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা যখন কাউকে ঘৃণা করেন, তখনও এরূপ হয়।
টিকাঃ
৩১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩২০৯; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৬৩৭।
📄 সালেহ (পুণ্যবান) ব্যক্তির পরিচয়
عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ سُئِلَ عَنِ الرَّجُلِ الصَّالِحِ، فَقَالَ : الرَّجُلُ الصَّالِحُ الَّذِي يُعْطِيَ اللهُ مِنْ نَفْسِهِ بِالْإِنْصَافِ، وَيَأْخُذُ مِنْهَا بِالْحَقِّ
হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. কে صالح (পুণ্যবান) ব্যক্তির পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সালেহ বা সৎকর্মশীল ব্যক্তি হলো, যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ইনসাফ করে এবং হক অনুসারে তা গ্রহণ করে।
শাকীক বিন ইবরাহীম বলখী রহ. থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করল, লোকেরা আমাকে 'সালেহ' উপাধিতে ভূষিত করেছে। কিন্তু আমি 'সালেহ' নাকি 'সালেহ' নই, তা বুঝবো কিভাবে? শাকীক রহ. বললেন-
প্রথমত: أَظْهِرْ سِرَّكَ عِنْدَ الصَّالِحِينَ فَإِنْ رَضُوا بِهِ فَاعْلَمْ أَنَّكَ صَالِحٌ، وَإِلاَّ فَلَا. 'সালেহীনের' নিকট তুমি নিজের গোপন বিষয়গুলোকে তুলে ধর। যদি তারা তোমার গোপন বিষয়গুলো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে, তবে তুমি প্রকৃতই 'সালেহ' অন্যথায় নয়।
দ্বিতীয়ত: اعْرِضِ الدُّنْيَا عَلَى قَلْبِكَ فَإِنْ رَدَّهَا فَاعْلَمْ أَنَّكَ صَالِحٌ. তোমার অন্তরের সম্মুখে দুনিয়াকে তুলে ধর। অন্তর যদি ঘৃণাভরে দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে তুমি 'সালেহ'।
তৃতীয়ত: اعْرِضِ الْمَوْتَ عَلَى نَفْسِكَ فَإِنْ تَمَنَّتْهُ فَاعْلَمْ أَنَّكَ صَالِحٌ، وَإِلاَّ فَلَا. মৃত্যুকে নফসের সামনে পেশ কর। যদি তোমার নফস তাকে কামনা করে, তবে তুমি 'সালেহ', অন্যথায় নয়। এ তিন ধরনের গুণ-বৈশিষ্ট্য যদি তোমার মাঝে পাওয়া যায়, তাহলে তুমি অধিকহারে নিজেকে আল্লাহমুখী কর। যাতে তোমার আমলে রিয়া প্রবেশ না ঘটে। কারণ, সামান্যতম রিয়া তোমার যাবতীয় আমলকে বিনষ্ট করে দেবে।
📄 মুমিন ও পাপাচারীর পরিচয়
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ: قُلُوبُ الْفُجَّارِ فِي حناجِرِهِمْ، وَقُلُوبُ الْمُؤْمِنِينَ مِنْ دُونِ صُدُورِهِمْ يَعْنِي أَنَّ الْمُؤْمِنَ يَتَدَبَّرُ فِي قَلْبِهِ قَبْلَ أَنْ يَعْمَلَ بِهِ، فَيَكُونُ هَمُّهُ لِآخِرَتِهِ، وَأَمَّا الْفَاجِرُ فَهَمُّهُ كُلُّهُ لِلدُّنْيَا لَا يَتَدَبَّرُ الْأُمُورَ.
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বলেন, গুনাহগারদের কলব তাদের কণ্ঠনালিতে থাকে আর মুমিনদের কলব থাকে তাদের বক্ষের নীচে। অর্থাৎ মুমিন যা করার ইচ্ছা করে তা করার পূর্বে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং তার সকল কাজের উদ্দেশ্য হয় আখেরাত। পক্ষান্তরে গুনাহগারদের কোনো কাজের উদ্দেশ্যই আখেরাত হয় না, তাদের সকল কাজের উদ্দেশ্য দুনিয়া। তারা কাজের পরিণাম নিয়ে চিন্তা করে না।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُؤْمِنُ? قَالُوا: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: الَّذِي لَا يَمُوتُ حَتَّى يَمْلَأَ اللَّهُ مَسَامِعَهُ مِمَّا يُحِبُّ، وَلَوْ أَنَّ رَجُلًا عَمِلَ لِطَاعَةِ اللَّهِ تَعَالَى فِي بَيْتٍ فِي جَوْفِ بَيْتٍ إِلَى سَبْعِينَ بَيْتًا، عَلَى كُلِّ بَيْتٍ بَابٌ مِنْ حَدِيدٍ لَأَلْبَسَهُ اللهُ تَعَالَى رِدَاءَ عَمَلِهِ حَتَّى يَتَحَدَّثَ النَّاسُ بِذَلِكَ وَيَزِيدُوا قِيلَ : يَا রাসুলুল্লাহি, ওয়া কাইফা ইয়াযীদূন? قَالَ : إِنَّ الْمُؤْمِنَ يُحِبُّ مَا زَادَ فِي عَمَلِهِ ، ثُمَّ قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْفَاجِرُ قَالُوا : اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ : الَّذِي لَا يَمُوتُ حَتَّى يَمْلَأُ اللَّهُ مَسَامِعَهُ مِمَّا يَكْرَهُ وَلَوْ أَنَّ عَبْدًا عَمِلَ بِمَعْصِيَةِ اللهِ تَعَالَى فِي بَيْتٍ فِي جَوْفِ بَيْتٍ إِلَى سَبْعِينَ بَيْتًا عَلَى كُلِّ بَيْتٍ بَابٌ مِنْ حَدِيدٍ لَأَلْبَسَهُ اللهُ تَعَالَى رِدَاءَ عَمَلِهِ حَتَّى يَتَحَدَّثَ النَّاسُ بِذلِكَ وَيَزِيدُوا قِيلَ وَكَيْفَ يَزِيدُونَ يَا রাসুলুল্লাহ? قَالَ : إِنَّ الْفَاجِرَ يُحِبُّ مَا زَادَ فِي فُجُورِهِ.
হযরত আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেছেন, তোমরা কি জানো মুমিন কে? উপস্থিত সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত। তিনি বললেন ঐ ব্যক্তি মুমিন, যার কর্ণকুহরকে আল্লাহ তার পছন্দনীয় বিষয় দিয়ে ভরে দেয়া অবধি মৃত্যুবরণ করে না। যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের জন্য এমন গৃহে বসে, যে গৃহ আরেকটি বৃহৎ গৃহের মাঝে অবস্থিত, যাকে ঘিরে আছে আরো সত্তরটি গৃহ, প্রতিটি গৃহে আছে একটি করে লৌহকপাট, তথাপি আল্লাহ তা'আলা তাকে তার আমলের চাদরে ঢেকে নিবেন। এমনকি লোকেরা পঞ্চমুখে তার আমলের আলোচনা করতে থাকে এবং তার আমলকে বাড়িয়ে দেয়। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল কীভাবে তারা আমলকে বাড়িয়ে দেয়? তিনি ইরশাদ করলেন, মুমিন তাই পছন্দ করে, যা তার আমলকে বৃদ্ধি করে। অতঃপর রাসূল বলেন, তোমরা কি জানো, পাপাচারী কে? উপস্থিত সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত। তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি, যার কর্ণকুহরকে আল্লাহ তার অপছন্দনীয় বিষয় দিয়ে ভরে দেয়া অবধি মৃত্যুবরণ করে না। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় এমন গৃহে বসে গুনাহ করে, যে গৃহ একটি বৃহৎ গৃহের মাঝে অবস্থিত, যাকে ঘিরে আছে আরো সত্তরটি গৃহ, প্রতিটি গৃহে রয়েছে একটি লৌহ কপাট, তথাপি আল্লাহ তা'আলা তাকে তার গুনাহের চাদরে মুড়ে দেন, এমনকি লোকেরা তার গুনাহের সমালোচনা করতে থাকে এবং তার গুনাহকে বাড়িয়ে দেয়? বলা হলো, কিভাবে তারা গুনাহকে বাড়িয়ে দেয়? তিনি ইরশাদ করলেন, পাপাচারী তাই পছন্দ করে, যা তার পাপকে বৃদ্ধি করে।
عَنْ عَوْفِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّهُ قَالَ: كَانَ أَهْلُ الْخَيْرِ يَكْتُبُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ بِثَلَاثِ كَلِمَاتٍ، مَنْ عَمِلَ لِآخِرَتِهِ كَفَاهُ اللهُ أَمْرَ دُنْيَاهُ، وَمَنْ أَصْلَحَ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ أَصْلَحَ اللَّهُ تَعَالَى فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّاسِ، وَمَنْ أَصْلَحَ سَرِيرَتَهُ أَصْلَحَ اللَّهُ عَلَانِيَتَه
আউফ বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন মহৎ লোকেরা একে অপরের নিকট তিন ধরনের বাক্য দিয়ে পত্র প্রেরণ করতেন। ১. যে ব্যক্তি তার পরকালের জন্য আমল করে, আল্লাহই তার দুনিয়ার বিষয়াদির জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। ২. যে ব্যক্তি তার ও আল্লাহর মাঝের বিষয়গুলো সংশোধন করে নেয়, আল্লাহ তার ও মানুষের মাঝের বিষয়গুলো সংশোধন করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি তার গোপনকে বিশুদ্ধ রাখে, আল্লাহ তার প্রকাশ্যকে বিশুদ্ধ করে রাখেন।
টিকাঃ
৩২. আল-ফিরদাউস, দাইলামী: ২/৫৯ (২৩৩৩); কানযুল উম্মাল ৩/৬৭৪ (৮৪২৬)