📄 রিয়াকারীর আলামত
عَنْ عَلِيَّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ : لِلْمُرَائِي ثَلَاثُ عَلَامَاتٍ: يَنْشَطُ إِذَا رَأَى النَّاسَ، وَيَكْسَلُ إِذَا كَانَ وَحْدَهُ، وَيُحِبُّ أَنْ يُحْمَدَ فِي جَمِيعِ أُمُورِهِ.
হযরত আলী রাযি. বলেন, রিয়াকারীর তিনটি আলামত- ১. মানুষ দেখলে সে খুব উদ্দীপনার সাথে আমল করে। ২. নির্জনে থাকলে অলসতা করে। ৩. সকল কাজে প্রশংসা কামনা করে।
হযরত ফযল ইবনে যিয়াদ রহ. বলেন, আমি আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. কে জিজ্ঞেস করেছি, রিয়াকারীকে কীভাবে চেনা যায়? তিনি বললেন, কোনো ব্যক্তি আমল করার সময় যদি দেখে যে, মানুষ তার দিকে তাকাচ্ছে আর এতে সে খুশি হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, সে রিয়াকারী।
হযরত লুকমান হাকীম রহ. তাঁর পুত্রকে বলেন, বৎস! রিয়াকারীর তিনটি আলামত-
১. প্রশংসা ও নিন্দার মাঝে কোনো পার্থক্য করতে পারে না।
২. প্রকাশ্যে খুব সুন্দরভাবে আমল করে।
৩. আর একাকী থাকলে অলসতা করা।
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّهُ قَالَ : لِلْمُرَائِي أَرْبَعُ عَلَامَاتٍ : يَكْسَلُ إِذَا كَانَ وَحْدَه، وَيَنْشَطُ إِذَا كَانَ مَعَ النَّاسِ، وَيَزِيدُ فِي الْعَمَلِ إِذَا أُثْنِي عَلَيْهِ، وَيَنْقُصُ إِذَا ذُمَّ بِهِ.
হযরত আলী রাযি. বলেন- রিয়াকারীর চারটি আলামত রয়েছে। যথা-
১. একাকী থাকলে অলসতা করে। ২. লোকালয়ে থাকলে সতর্ক ও কর্মতৎপর থাকে। ৩. প্রশংসা করা হলে আমল বাড়িয়ে দেয়। ৪. নিন্দা করা হলে, আমল কমিয়ে দেয়।
📄 তিনটি জিনিস আমলের হেফাজতকারী
হযরত সুফইয়ান সাওরী রহ. বলেন, তিনটি জিনিস ব্যতীত কোনো আমল বিশুদ্ধ হয় না। যথা-
১. আমল করার সময় নিজের প্রতি আল্লাহর দৃষ্টির কথা স্মরণ করা।
২. আমলে আল্লাহর কিতাব ও সুন্নতের অনুসরণ করা।
৩. এই ভয় করা যে, হয়তো আমার আমল কবুল হবে না।
عَنْ شَقِيقِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ الزَّاهِدِ، أَنَّهُ قَالَ : حُسْنُ الْعَمَلِ ثَلَاثَةُ أَشْيَاءَ : أَوَّلُهَا أَنْ يرى أَنَّ الْعَمَلَ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى لِيَكْسِرَ بِهِ الْعُجْبَ، وَالثَّانِي أَنْ يُرِيدَ بِهِ رِضَا اللَّهِ لِيَكْسِرَ بِهِ الْهَوَى وَالثَّالِثُ أَنْ يَبْتَغِي ثَوَابَ الْعَمَلِ مِنَ اللهِ تَعَالَى لِيَكْسِرَ بِهِ الطَّمَعَ وَالرِّيَاءَ، وَبِهَذِهِ الْأَشْيَاءِ تَخْلُصُ الْأَعْمَالُ
শায়েখ শাকীক বিন ইব্রাহীম বলখী রহ. বলেছেন, তিন বস্তুর মাধ্যমে আমলের সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটে। যথা-
১. আমল করার তৌফিক আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় মনে করা। এর মাধ্যমে আত্মগৌরব ধ্বংস হয়।
২. আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। এর মাধ্যমে দুষ্ট প্রবৃত্তির দমন ঘটবে।
৩. আল্লাহর পক্ষ থেকেই আমলের সওয়াব প্রত্যাশা করা। এর মাধ্যমে লোভ ও রিয়া দূর হয়।
এই তিন গুণের দ্বারা মানুষের মাঝে এখলাসের বিস্তার ঘটে। একমাত্র আল্লাহর জন্য তার আমল বিশুদ্ধ হয়। আমল আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় মনে করার অর্থ হলো, সে একথা ভাববে যে, আল্লাহ তাকে এই আমলের তাওফীক দিয়েছেন বলেই তার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়েছে। কেননা, সে যদি এ ভাবনা করতে পারে, তাহলে তার মনে আত্মমুগ্ধতা বা অহংকার জাগবে না; বরং সর্বদা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে। আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করার অর্থ হলো, সে আমলটির প্রতি লক্ষ্য রাখবে। যদি আমলটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়ে থাকে তাহলে তা করবে। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়, তাহলে করবে না। কেননা, আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ অর্থ : নিশ্চয়ই নফস মন্দের আদেশ দিয়ে থাকে। আল্লাহর কাছে আমলের সওয়াব লাভের অর্থ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই আমল করবে। লোকে কী বলল, তার কোন পরওয়া করবে না। যেমন জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছিলেন, রাখাল থেকে আমলের আদব শেখা চাই। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তা কিভাবে? তিনি বললেন, রাখাল যখন তার মেষের পাশে নামায পড়ে তখন সে মেষের প্রশংসার আশা করে না। অনুরূপ আমলকারীরও উচিত মানুষ তার দিকে তাকালো কি তাকালো না, তার দিক ভ্রুক্ষেপ না করা। জনতার মাঝে এবং নির্জনে সর্বাবস্থায় সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করবে। এতে মানুষের স্তুতি প্রশংসার আশা করবে না।
টিকাঃ
১৭. শায়েখ শাকীক ইবনে ইবরাহীম ইবনে আলী আল-আযদী আল-বলখী। তিনি ছিলেন খুরাসানের প্রসিদ্ধ যাহেদ ও সূফী ব্যক্তিত্ব এবং শীর্ষস্থানীয় আলেমদের একজন। খুরাসানের বিখ্যাত বীর মুজাহিদদেরও অন্যতম ছিলেন। ইলম, তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি) ও জিহাদের মতো আযীমুশ শান আমলের এক অনুপম দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। [সংক্ষেপিত]
২৯. সূরা ইউসুফ: আয়াত-৫৩
📄 শুদ্ধ আমলের জন্য চারটি বিষয় অনিবার্য
হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মুআয রাযি. বলেন, চারটি বিষয় ছাড়া কোনো আমল শুদ্ধ হয় না। যথা-
১. আল্লাহর মারেফত বা পরিচয় লাভ করা।
২. আল্লাহর আনুগত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে জানা।
৩. শয়তানের শত্রুতা সম্পর্কে জানা।
৪. ইখলাসের সাথে আমল করা।
জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেন, কোন আমল নিখুঁত হওয়ার জন্য চারটি বিষয় অনিবার্য। যথা-
প্রথমত : أَوَّلُهَا الْعِلْمُ قَبْلَ بَدْيْهِ অর্থাৎ, আমল শুরু করার পূর্বে সে সম্পর্কে ইলম বা জ্ঞান থাকা। কারণ, ইলম ছাড়া আমল শুদ্ধ হতে পারে না। তাই ইলম ছাড়া আমল ভালো ফলের তুলনায় অধিক মন্দ ফল বয়ে আনে।
দ্বিতীয়ত : النّيَّةُ فِي مَبْدَيْهِ অর্থ: আমলের সূচনায় নিয়ত করা। কারণ, নিয়ত ব্যতীত আমল শুদ্ধ হতে পারে না। إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَلِكُلِّ امْرِي مَانَوى - নবী ইরশাদ করেছেন - সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকের জন্য তাই যা সে নিয়ত করে। সুতরাং রোযা, নামায, হজ্ব এবং অন্যান্য নেককর্ম নিয়ত ব্যতীত শুদ্ধ হবে না। অতএব, আমল বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শুরুতেই নিয়ত করা চাই।
তৃতীয়ত : الصَّبْرُ فِي وَسَطِهِ অর্থ: আমলে ধৈর্য ধারণ করা। অর্থাৎ আমলের মধ্যে ধৈর্য ধরা যাতে শান্তভাবে আমলটি সম্পাদন হয়।
চতুর্থ : الْإِخْلَاصُ عَنْدَ فَرَاغِهِ। অর্থ: আমল সমাপ্তির সময় ইখলাস অবলম্বন করা। কারণ, ইখলাস ব্যতীত আমল গ্রহণযোগ্য নয়। যখন তুমি ইখলাসের সাথে আমল শেষ করবে, আল্লাহ তা'আলা তা গ্রহণ করবেন এবং মানুষের অন্তরকে তোমার প্রতি ধাবিত করে দিবেন।
টিকাঃ
৩০. সহীহ বুখারী: হাদীস-১; সহীহ মুসলিম: হাদীস-১৯০৭।
📄 ইখলাসের বিষয়ে সতর্ক থাকা
হযরত ইয়াকুব মুকাফফাফ রহ. বলেন, মুখলিস সে ব্যক্তি, যে নিজের নেক আমল এমনভাবে গোপন রাখে যেমনভাবে সে তার বদ আমল গোপন রাখে।
হযরত আইউব সাখতিয়ানী রহ. বলেন, নিয়তকে ইখলাসপূর্ণ করা আমল করার চেয়েও কঠিন।
হযরত সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ রহ. বলেন, নফসের সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, আমলে ইখলাস আনা। কারণ, নফসের এখানে কোনো প্রাপ্তি নেই।
হযরত ফুযাইল ইবনে ইয়ায রহ. বলেন, মানুষের কারণে আমল ছেড়ে দেওয়া রিয়া। আর মানুষকে দেখানোর জন্য আমল করা শিরক। এ দু'টো থেকে বেঁচে থাকাই ইখলাস।
عَنْ هَرَمِ بْنِ حَيَّانَ، أَنَّهُ قَالَ : مَا أَقْبَلَ عَبْدُ بِقَلْبِهِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى إِلَّا أَقْبَلَ اللَّهُ تَعَالَى بِقُلُوبِ الْإِيمَانِ إِلَيْهِ، حَتَّى يَرْزُقَهُ مَوَدَّتَهُمْ وَرَحْمَتَهُمْ.
হারাম বিন হাইয়ান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার অন্তর কে আল্লাহর প্রতি ধাবিত করে, আল্লাহ ঈমানদারদের অন্তরকে তার প্রতি ধাবিত করে দেন। ফলে সে লাভ করে ভালোবাসা, প্রীতি ও করুণাময় সাহচর্য।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ ، أَنَّهُ قَالَ: إِنَّ اللهَ تَعَالَى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا قَالَ لِجِبْرِيلَ: إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا، فَأَحِبَّهُ، فَيَقُولُ جِبْرِيلُ لِأَهْلِ السَّمَاءِ : إِنَّ رَبَّكُمْ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ فَيُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ، وَإِذَا أَبْغَضَ اللَّهُ عَبْدًا فَمِثْلُ ذُلِكَ .
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেছেন, যখন আল্লাহ তা'আলা কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, জিবরাঈল আ.কে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন জিবরাঈল আ. আসমানের বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, তোমাদের রব অমুককে ভালোবাসে। সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। ফলে আসমানের বাসিন্দারাও তাকে ভালোবাসে এবং জমিনেও তার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা যখন কাউকে ঘৃণা করেন, তখনও এরূপ হয়।
টিকাঃ
৩১. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩২০৯; সহীহ মুসলিম: হাদীস-২৬৩৭।