📘 তাম্বিহুল গাফিলীন তাহকীক ও তাখরীজসহ 📄 জরুরী কিছু কথা

📄 জরুরী কিছু কথা


তাম্বীহুল গাফিলীন কিতাবের লেখক ইমাম নসর বিন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন ইবরাহীম আবুল লাইস সমরকন্দী রহ. ছিলেন একাধারে একজন বরেণ্য ফকীহ, মুহাদ্দিস ও আবেদ-যাহেদ ব্যক্তিত্ব। তাঁর উপাধী ছিল 'ইমামুল হুদা'। বহু প্রসিদ্ধ ও কালজয়ী গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন তিনি। ইমাম আবু জাফর হিন্দাওয়ানী বলখী (মৃত. ৩৬২ হি.)-এর কাছে তিনি ইলমে ফিকহ হাসিল করেন, যিনি তাঁর অনুপম ফিকহী দক্ষতার কারণে "আবু হানীফা আস-সগীর" নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। হাদীসের ইলম গ্রহণ করেন ইমাম মুহাম্মাদ বিন ফযল বিন আনীফ আল-বুখারী'র কাছে। আল্লামা সমরকন্দী'র শিষ্যত্ব লাভ করেন যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম আবূ বকর মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহীম আত-তিরমিযী (রাহিমাহুমুল্লাহ)।

তিনি জীবনভর অক্লান্ত-অবিশ্রান্তভাবে কুরআনুল কারীম, তাফসীর, ফিকহ ও উসূলে ফিকহ, ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস ও সংশ্লিষ্ট ইলমসমূহ শেখা ও শেখানো, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী সংগ্রহ ইত্যাদি মহৎকর্মে ব্রতী ছিলেন। তাঁর মূল্যবান সেসব রচনাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- তাফসীরুল কুরআনিল কারীম, উমদাতুল আকায়েদ, বুসতানুল আরিফীন, তাম্বীহুল গাফিলীন, উক্‌বাতু আহলিল কাবাইর, মুখতালিফুর রিওয়ায়াহ, শিরআতুল ইসলাম, খাযানাতুল ফিকহ, রিসালাহ ফী উসূলিদ দীন, শারহুল জামিয়িস সগীর, উয়ূনুল মাসাইল, দাকায়িকুল আখবার, মুখতালিফুর রিওয়ায়াহ, আন-নাওয়াযিল ইত্যাদি।

তিনি তাঁর বক্তব্য ও বিশাল রচনাভাণ্ডারের মাধ্যমে মানুষের কাছে দীনের আহ্বান পৌঁছে দিয়েছেন। দীনী নসীহতের কিতাব রচনার ইতিহাসে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ এর ভূমিকায়। এ-ময়দানের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিদের আকাবিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তিনি। যেমন: ইমাম আবু তালিব মাক্কী (৩৮৬ হি.), ইমাম গাজালী (৫০৫ হি.), ইমাম ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি.), ইমাম কুরতুবী (৬৭১ হি.), ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (৭৯৫ হি.) প্রমুখ।

জীবনের প্রায় সবটুকু সময় উম্মতে মুহাম্মাদীর খেদমতে নিঃশেষ করে দিয়ে অবশেষে তিনশত তিহাত্তর হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে তিনি আল্লাহ তা'আলার ডাকে সাড়া দেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন, তাঁর রেখে যাওয়া সহীহ ইলম থেকে উম্মতকে উপকৃত হওয়ার তৌফিক দিন। আমীন।

'তাম্বীহুল গাফিলীন' নামক কালজয়ী এই কিতাবটি যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ের পরিশুদ্ধি ও আত্মার খোরাক হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়ে আসছে। এর পূর্ণ নাম : "তাম্বীহুল গাফিলীন বি আহাদীসি সাইয়্যিদিল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন"। নাম থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, এটি হাদীসভিত্তিক একটি নসীহতের কিতাব। ইমাম সমরকন্দী রহ. এই কিতাবের প্রতিটি অধ্যায়ে এত বিশাল পরিমাণ হাদীস ও আছার সংকলন করেছেন, যা প্রতিটি পাঠকের কাছে হাদীসশাস্ত্রে তাঁর সমুদ্রসম জ্ঞানের পরিচয় করিয়ে দেয়। এর অসাধারণ ইলমী ও জ্ঞানগত মর্যাদার আরো একটি কারণ, এটি কুরআনুল কারীমের বিষয়ভিত্তিক আয়াতের তাফসীরে পরিপূর্ণ। ইলমে তাফসীরেও যে ফকীহ আবুল লাইস রহ. অতুলনীয় প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, এটি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এই কিতাবে তিনি আলোচনা করেছেন—আমলের ইখলাস, মৃত্যু ও মৃত্যুযন্ত্রণা, কবর ও কবর জগতের ভয়াবহ অবস্থাসমূহ, জান্নাত ও এর নেয়ামতসমূহ, জাহান্নাম ও এর শাস্তিসমূহ ইত্যাদি বিষয়ে।

একইভাবে তিনি মানুষকে তাম্বীহ (সতর্ক) করেছেন পবিত্রতা, ভালোভাবে উযূ করা, নামাযের মধ্যে খুশু-খুযু অর্জন, রোযায় ইখলাস বজায় রাখা, যাকাত প্রদানে সচেতনতা, ফরজ হজ্জ আদায়ে সচেষ্ট হওয়া, জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ-এ অংশগ্রহণ করা ইত্যাদি আমলের প্রতি। বহু হৃদয়ের বদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে এই কিতাবটি। বহু পথহারা মানুষের পথের দিশা হয়েছে এই গ্রন্থটি। আমলী যিন্দেগী গঠনের দুর্লভ পাথেয় রয়েছে এই ইতিহাসখ্যাত গ্রন্থটিতে। সাধারণত নেককর্মে উৎসাহিত করা কিংবা হেদায়েতের পথে অগ্রগামী হওয়ার প্রতি উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী গ্রন্থসমূহে সহীহ হাদীসের পাশাপাশি বহুসংখ্যক দুর্বল বা জাল রেওয়ায়াতও স্থান পায়। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে হাদীসশাস্ত্রের আপোষহীন ব্যক্তিত্ব ইমাম বুখারী রহ.-এর কিতাব "আল-আদাবুল মুফরাদ"। সহীহ হাদীসের পাশাপাশি বহু দুর্বল হাদীসও এ-কিতাবে তিনি সংকলন করেছেন। আমাদের আলোচ্য কিতাব "তাম্বীহুল গাফিলীন"ও তেমনই একটি কিতাব, যাতে হাজারো সহীহ হাদীসের পাশাপাশি বহু যঈফ (দুর্বল) ও মউযূ (জাল) হাদীস এবং ইসরাঈলী বর্ণনাও স্থান পেয়েছে।

আহকাম বা হালাল-হারাম সংক্রান্ত দলীলের ক্ষেত্রে 'সহীহ' ও 'হাসান' বর্ণনা গ্রহণ করা হয়। আর আমলের ফযীলত বা নেক আমলের প্রতি উৎসাহপ্রদান ও বদ আমল থেকে সতর্কীকরণের ক্ষেত্রে 'যঈফ' হাদীসও বর্ণনাযোগ্য। তবে যে হাদীস এত বেশি দুর্বল যে, 'মউযূ' (জাল) হওয়ার কাছাকাছি, অথবা মুনকার (অনির্ভরযোগ্য), কিংবা সরাসরি মউযু, তা এই ক্ষেত্রেও গ্রাহ্য নয়। কোনো মউযূ বা বেশি দুর্বল রেওয়ায়াত রাসূলুল্লাহ-এর কথা হিসেবে বর্ণনা করা কোনোভাবেই জায়েয নয়-এই ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনে কেরাম একমত পোষণ করেছেন। তবে যদি বর্ণনা করার সময় বলে দেওয়া হয় যে, এটি জাল বা খুবই দুর্বল হাদীস—যাতে সাধারণ মানুষ একে রাসূলুল্লাহ-এর কথা হিসেবে বিশ্বাস না করে—তাহলে তা বৈধ।

তাম্বীহুল গাফিলীন কিতাবটি নসীহত ও ওয়াযের ময়দানে একটি অনন্য কিতাব হওয়া সত্ত্বেও এতে বহু জাল হাদীস ও ইসরাঈলী বর্ণনা স্থান পাওয়ায় মুহাক্কিক মুহাদ্দিসদের অনেকেই এর সমালোচনা করেছেন। যেমন: শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃত: ৭২৮ হি.) বলেন— "সীরাত, ঘটনাবলী, নবীদের কাহিনী ইত্যাদি বিষয়ে যারা লেখালেখি করেন, তাদের অধিকাংশই সহীহ-যঈফের মাঝে পার্থক্য করেন না। যেমন: সাআ'লিবী, ওয়াহেদী, মাহদাবী, যামাখশারী..., আবুল লাইস সমরকন্দী... প্রমুখ। আর বিভিন্ন আমলের, ব্যক্তির, স্থানের, সময়ের এবং কবরের ঘটনাবলী বর্ণনা করার ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে জালিয়াতি ও মিথ্যা হাদীস রচনার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে।” তিনি আরো বলেছেন— "আদম আ. সম্পর্কে বর্ণিত পূর্বোক্ত এই হাদীসটি আরো কিছু বেশকম করে কতিপয় লেখক কোনো ধরনের সনদ (বা তথ্যসূত্র) ছাড়াই উল্লেখ করেছেন। যেমন কাজী ইয়ায রহ. বলেছেন— 'আবু মুহাম্মাদ মাক্কী ও আবুল লাইস সমরকন্দী প্রমুখ উল্লেখ করেছেন— "পাপ করে ফেলার পর আদম আ. আল্লাহ তা'আলার কাছে এই বলে ক্ষমা চাইলেন— "হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ-এর ওসিলায় আমার পাপ ক্ষমা করে দিন।” তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আরেক রেওয়ায়াতে আছে— "এবং আমার তওবা কবুল করুন।” তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে বললেন— "মুহাম্মাদকে তুমি কীভাবে চিনলে?" তিনি বললেন— "জান্নাতের সব জায়গায়ই লেখা দেখেছি: "لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ ।” বর্ণনাকারী বলেন: আরেক বর্ণনায় আছে, জান্নাতে লেখা ছিল— ” مُحَمَّدٌ عَبْدِي وَ رَسُولِي।” (আদম বলেন) এ কারণে আমি বুঝতে পারলাম, তিনি (মুহাম্মাদ) আপনার কাছে আপনার সমস্ত মাখলুকের চেয়ে বেশি সম্মানিত।” এভাবে তার তওবা কবুল করা হলো এবং গুনাহ ক্ষমা করা হলো।” এই ধরনের হাদীসগুলোর উপরে শরীয়তের কোনো বিধানের ভিত্তি স্থাপিত হতে পারে না এবং দীনের কোনো বিষয়ে এগুলোকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না—এ ব্যাপারে পুরো মুসলিম উম্মাহর উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে। এসব হলো ঐ সমস্ত ইসরাঈলী রেওয়ায়াতের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর সমর্থনে নবী থেকে সহীহ কোনো হাদীস না-পাওয়া গেলে তার সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কিছুই বলা যায় না।”

অনুরূপভাবে হাদীসশাস্ত্রের অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী (মৃত. ৭৪৮হি.) তাঁর ঐতিহাসিক কিতাব “তারীখুল ইসলাম”-এ ইমাম সমরকন্দী'র জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে মন্তব্য করেন— “তাঁর কিতাব তাম্বীহুল গাফিলীন এ প্রচুরসংখ্যক জাল হাদীস রয়েছে।” ইমাম যাহাবী'র বিখ্যাত কিতাব সিয়ারু আ'লামিন নুবালা'য়ও ইমাম সমরকন্দী'র জীবনালোচনায় তিনি বলেছেন— “তাঁর ওপর ভিত্তি করে বহু জাল হাদীস প্রচার লাভ করেছে।” এজন্য আমরা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য হওয়ার পরও সকল হাদীসের তাখরীজ ও হুকুম টীকায় যুক্ত করে দিয়েছি। মুতাকাদ্দিমীন ও মুতাআখখিরীন মুহাদ্দিসীনে কেরামের উদ্ধৃতিতেই আমরা এই কর্মটি সম্পাদন করেছি এবং প্রতিটি তথ্যের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তথ্যসূত্রটিই আমরা যুক্ত করে দিয়েছি।

যেহেতু কিতাবটিতে বেশকিছু অগ্রহণযোগ্য রেওয়ায়াত রয়েছে এবং নসীহত ও উপদেশ গ্রহণ করার জন্য এ-জাতীয় কিতাব থেকে আমাদের ফায়দা হাসিল করতেই হয়, তাই যঈফ ও জাল হাদীস সংক্রান্ত কিছু বিষয় আমাদের জানা থাকা জরুরী। এখানে আমরা এ রকম কিছু উপকারী বিষয় সম্মানিত পাঠক সমীপে পেশ করছি—
• যেসব তথ্য শুধু ইলমে ওহী'র মাধ্যমেই জানা যায়, তা বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে সেই তথ্যের বিশুদ্ধ সূত্র বা সনদ অপরিহার্য। যেমন, মৃত্যু-পরবর্তী কোনো ঘটনা বা কোনো নেক আমলের বিশেষ সওয়াব কিংবা কোনো বিশেষ মন্দ কর্মের বিশেষ শাস্তির বিবরণ—এগুলোর ক্ষেত্রে সনদ বা তথ্যসূত্রহীন কোনো বর্ণনা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন— তাম্বীহুল গাফিলীন-এর 'আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা' শীর্ষক অধ্যায়ে, 'ইবলিসেরও নাজাতের আশা জাগবে' শিরোনামে বর্ণিত হাদীস: ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ মানুষের প্রতি এতো বেশি রহম করবেন যে, রহমতের আধিক্য দেখে এবং সুপারিশকারীদের সুপারিশের প্রবলতা দেখে শয়তান ইবলীসও আশায় মাথা তুলবে।" আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামী (রহ.) বলেছেন, হাদীসটির সনদে একজন যঈফ রাবী রয়েছেন। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস-১৮৫৩৫) সুতরাং এই হাদীসটিতে কিয়ামতের যে ঘটনার বিবরণ রয়েছে, তার সত্যতা সম্বন্ধে আমরা ততক্ষণ নিশ্চিত হতে পারি না, ততক্ষণ নিশ্চিত হতে পারি না, যতক্ষণ এর সমর্থনে কোনো গ্রহণযোগ্য (অর্থাৎ, সহীহ বা হাসান হাদীস) দলীল হিসাবে পাওয়া যায়।
• যেসব বর্ণনার তথ্যসূত্র রয়েছে, কিন্তু সেটি সহীহ না যঈফ সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি, সেগুলোর সত্যতার ব্যাপারেও আমাদের একই চিন্তাধারা পোষণ করতে হবে। যেমন— রাসূল থেকে বর্ণিত— "পাপে লিপ্ত থেকে মুখে তাওবাকারী আপন রবের সাথে উপহাসকারীর ন্যায়।" এর তথ্যসূত্র হিসেবে আমরা পেয়েছি, ইমাম ইবনে আবিদ্দুনইয়া তার কিতাবুত তাওবা-তে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। মুহাদ্দিসীনে কেরামের নিকট স্বীকৃত মত হচ্ছে, সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম ছাড়া অন্য কোনো কিতাবের হাদীসের শুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে, তাতে সবই সহীহ হাদীস। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এর ব্যাপারে আমাদের জানা থাকা দরকার যে, বিরাটসংখ্যক মুহাক্কিক মুহাদ্দিসের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই দুই কিতাবে কোনো যঈফ (দুর্বল) বা মওযু (জাল) হাদীস নেই। বাকী সব হাদীসের কিতাবেই সহীহ, হাসান, যঈফ বা মওযূ ইত্যাদি হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। কাজেই, ইমাম সমরকন্দী কিংবা ইমাম ইবনে আবিদ্দুনইয়া বা ইমাম বাইহাকী (রাহিমাহুমাহুল্লাহ)— কারো কিতাবের হাদীসের ব্যাপারেই এমনভাবে নিশ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই যে, যেহেতু তিনি তার কিতাবে হাদীসটি এনেছেন, তাই হাদীসটি গ্রহণযোগ্য। এর কারণ, তাঁরা কেউই তাদের কিতাবে শুধুই সহীহ হাদীস সংকলন করবেন— এ কথার প্রতিশ্রুতি দেননি। বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদেরকে দুর্বল হাদীসও আনতে হয়েছে। আর যেসব জাল হাদীস তাঁরা তাঁদের কিতাবে স্থান দিয়েছেন, সে ব্যাপারে আমরা ধারণা করতে পারি যে, হয়তো সনদ তাহকীকের সুযোগ না-পাওয়ার কারণে কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য অপারগতাবশতই তাঁরা তা করেছেন।
• যঈফ হাদীস: যঈফ বা দুর্বল হাদীসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসীনে কেরামের মত হলো— (এক.) তাতে বর্ণিত আমল যদি কোরআনের কোনো আয়াত বা কোনো সহীহ হাদীস অথবা ইজমায়ে উম্মত (সাহাবায়ে কেরাম বা পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরাম যে বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছেন)-এর বিরুদ্ধে না যায়, (দুই.) হাদীসের দুর্বলতা এত বেশি পরিমাণে না হয় যে, তা মুনকার বা জাল হওয়ার পর্যায়ে চলে যায় এবং (তিন.) হাদীসটি ইসলামের মৌলিক শিক্ষার (কাওয়ায়েদ ও উসূলে ইসলাম) বিপরীত না-হয়, তাহলে তার উপর আমল করতে কোনো বাধা নেই। তবে সেই যঈফ হাদীসে বর্ণিত নির্দিষ্ট ফযীলতের সত্যতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যাবে না। শুধু আশা করা যেতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা হয়তো এই সওয়াব দিতেও পারেন।
• ইসরাঈলী রেওয়ায়াত: পূর্বেকার নবীদের কথা বা পূর্বের উম্মতের ঘটনা হিসেবে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করা হয়, তা-ই ইসরাঈলী রেওয়ায়াত। এই ধরনের রেওয়ায়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে মুহাদ্দিসীনে কেরামের সিদ্ধান্ত হলো— যেসব ইসরাঈলী রেওয়ায়াতের সঙ্গে কুরআন বা সহীহ হাদীসের বৈপরীত্য রয়েছে, তা বিনাবাক্যে মিথ্যা ও পরিত্যাক্ত বলে গণ্য হবে। বিন্দুমাত্রও বিশ্বাসযোগ্য কিংবা বর্ণনার উপযুক্ত হিসেবে গ্রাহ্য হবে না। আর যেসব ইসরাঈলী রেওয়ায়াতে এমন কোনো কথা নেই, যা কোরআনের আয়াত, সহীহ হাদীস কিংবা ইজমায়ে উম্মাতের বিরুদ্ধে যায়, তা বর্ণনা করতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এই প্রকার রেওয়ায়াতের ক্ষেত্রেও নিশ্চিতভাবে এই বিশ্বাস করা যাবে না যে, তা সত্য; যতক্ষণ না তার সমর্থনে কোরআনের কোনো আয়াত বা সহীহ হাদীস পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে শুধু সনদ সহীহ হলেই কোনো সাহাবী (যেমন: ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম, আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস, তামীম দারী— যারা আহলে কিতাবদের থেকে ইসরাঈলী কথাবার্তা শুনতেন বা নিজেরাই আগে আহলে কিতাব ছিলেন) বা তাবেয়ী (যেমন— কা'ব আহবার, ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ প্রমুখ) থেকে বর্ণিত ইসরাঈলী রেওয়ায়াত সত্য হিসেবে বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, তারা এই রেওয়ায়াতগুলো যে আহলে কিতাবদের কাছ থেকে শুনেছেন, তারা নিজেরাই তো সেসব কিচ্ছা-কাহিনী বিকৃত করে রেখেছে! কাজেই তাদের পরবর্তী লোকেদের সনদ সহীহ হওয়ার কারণে আগের লোকেদের বর্ণিত ভিত্তিহীন কাহিনী সহীহ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এই ধরনের ইসরাঈলী বর্ণনার ব্যাপারেই হাদীসে বলা হয়েছে "حرج ولا إسرائيل عن بني وحدثوا"— "বনী ইসরাঈল থেকে তোমরা রেওয়ায়াত করতে পারো, এতে কোনো সমস্যা নেই।"
• হাসান বসরী'র মুরসাল হাদীস: তাম্বীহুল গাফিলীন কিতাবের বহু জায়গায় হাসান বসরী রহ.-এর মুরসাল হাদীস রয়েছে। তাই এ সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা পাঠকদের জন্য আবশ্যক। মোদ্দাকথা হলো— যে হাদীসে কোনো তাবেয়ী যে সাহাবী রা. থেকে সে হাদীসটি শুনেছেন, তাকে উল্লেখ না-করে সরাসরি 'রাসূল বলেছেন' একথা বলেছেন, এ ধরনের হাদীসকে মুরসাল হাদীস বলে। হাসান বসরী'র মুরসাল হাদীসসমূহ গ্রহণযোগ্য কিনা এ ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের অনেক মত রয়েছে। তবে অধিকাংশই তা গ্রহণ না-করার পক্ষে মত দিয়েছেন। যেমন, ইমাম আহমাদ রহ. বলেছেন: "হাসান বসরী'র মুরসাল হাদীস হচ্ছে সবচে' দুর্বল প্রকৃতির মুরসাল হাদীস। কারণ, তিনি যোগ্য-অযোগ্য সবার থেকেই হাদীস গ্রহণ করেছেন।” ইমাম যাহাবী রহ.-ও একই মত ব্যক্ত করেছেন।
• নবী করীম কিংবা কোনো সাহাবী রাযি.-এর বাণী ছাড়া যদি অন্য কোনো ব্যক্তির কোনো জ্ঞানমূলক বা উপদেশমূলক কথা সূত্র ছাড়াই উল্লেখ করা হয়, তা ইসলামী শরীয়তের বিরুদ্ধে না- গেলে বর্ণনা করতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ, রাসূল বলেছেন, 'আমার নামে মিথ্যা কথা প্রচার করাটা অন্য কারো নামে মিথ্যা প্রচার করার মতো নয়। কারণ, রাসূলের কথা মানে, সেটা শরীয়তের বিধান। অন্য কারো কথা শরীয়তের অকাট্য বিধান হিসেবে ধর্তব্য নয়। যদিও সাহাবা ও তাবেয়ী তথা খাইরুল কুরূনের উলামায়ে কেরামের কথা ও কাজ কিছু শর্তসাপেক্ষে শরীয়তের দলীল হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে মারফু হাদীসের মতোই এখানেও সনদ সহীহ বা হাসান হওয়া জরুরী।

কিতাবটি সম্পাদনায় আমাদের সামনে ছিল এর কয়েকটি কপি: দারুল হাদীস, কায়রো প্রকাশিত ফরীদ আবদুল আজীজ আল- জুন্দী তাহকীককৃত কপি, দারু ইবনি কাসীর, বৈরুত প্রকাশিত ইউসুফ আলী বাদীভী তাহকীককৃত কপি এবং মাকতাবাতুল ঈমান, মিশর প্রকাশিত আস-সাইয়িদ আল-আরাবী তাহকীককৃত কপি। ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো থেকে আমরা প্রচুর উপকৃত হয়েছি। আল্লাহ তা'আলা সকলকে উপযুক্ত পুরস্কার দান করুন, মূল রচয়িতা, অনুবাদক, তাখরীজকারক, সম্পাদক, প্রুফ সমন্বয়ক, প্রকাশক ও সকল পাঠকদেরকে তাঁর রহমত ও মাগফিরাত প্রদান করে আমাদের সকল নেক প্রচেষ্টা কবুল করুন—আমীন।
هذا، وصلى الله على النبي الكريم وعلى آله وصحبه ومن والاه أجمعين. آمين.
মাওলানা নুরুল হাসান ইবনে মুখতার
সম্পাদক, আনোয়ার লাইব্রেরী
বাংলাবাজার, ঢাকা।

টিকাঃ
১. জীবনী: সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: খণ্ড-১৬, পৃষ্ঠা-৩২২; আল-ফাওয়াইদুল বাহিয়্যাহ: পৃষ্ঠা-২২০, আল-আ'লাম লিয যিরিকলী: পৃষ্ঠা-৮, পৃষ্ঠা-২৮; মিফতাহুস সাআ'দাহ: খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৩৯; মু'জামুল মুআল্লিফীন: খণ্ড-১৩, পৃষ্ঠা-৯১।
২. আর-রাদ্দু আলাল বাকরী: খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৭৩
৩. মাজমুউল ফাতাওয়া লি ইবনে তাইমিয়া
৪. তারীখুল ইসলাম: খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা-৪২১
৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: খণ্ড-১৬, পৃষ্ঠা-৩২৩
৬. বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-আজবিবাতুল ফাযিলাহ, আল্লামা আবদুল হাই লাক্ষ্ণৌভি, টীকা শায়েখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ: পৃষ্ঠা-৪০-৪১
৭. সহীহ বুখারী: হাদীস-৩২৭৪, [বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-ইসরাঈলিয়‍্যাত ওয়াল মাওযূআত ফী কুতুবিত তাফসীর, ড. মুহাম্মাদ আবু শাহবাহ: পৃষ্ঠা-৯২-৯৩, ১০৩-১০৫]
৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৫৬৩; শারহু ইলালিত তিরমিযী লি ইবনে রজব হাম্বলী: খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৯১; আল-মুক্তিযা লিয যাহাবী পৃষ্ঠা-৩৯-৪০।
৯. সহীহ বুখারী: হাদীস-১২২৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px