📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 অন্যের সংশোধনের ফিকির করা

📄 অন্যের সংশোধনের ফিকির করা


আমরা তালিবে ইলম। আমরা নবীদের ইলম অর্জন করছি। আমাদের দায়িত্ব সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। যাদের কুরআন ও সুন্নাহর ইলম নেই, তারা মানুষকে পরিচালনা করার যোগ্য নয়। কেননা, মানুষকে পথ দেখানো ও পরিচালনা করা কুরআন ও সুন্নাতের সাথে সম্পৃক্ত।
এই জন্য সাধারণ লোকের জন্য আলেমদের দেখানো পথে চলা এবং আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া ফরয। আর পথ দেখানো দায়িত্ব কেবল একজন আলেমে রব্বানী-ই আদায় করতে পারেন, যারা খুলুসিয়্যাত ও নিষ্ঠার সাথে কুরআন ও হাদীসে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।

ফারুকে আযমের উপদেশ
হাফিয ইবনে কাসীর রহ. ইবনে আবী হাতিম রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, শাম দেশে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলো। লোকটি ফারূকে আযমের কাছে প্রায়ই আসতেন। হঠাৎ কিছুদিন লোকটি আসছিলো না। তাই উমর রা. লোকদের কাছে তার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। লোকেরা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! তার কথা আর জিজ্ঞেস করবেন না। সে তো মদ পান করে সারাদিন মাতাল হয়ে থাকে।
উমর ফারুক রা. রাজলেখককে ডেকে বললেন, একটি চিঠি লেখো-
من عمر بن الخطاب إلى فلان بن فلان ، سلام عليك فإني أحمد إليك الله الذي لا إله إلا هو ، غافر الذنب وقابل التوب شديد العقاب ذي الطول لا اله إلا هو ، إليه المصير.
উমর ইবনে খাত্তাবের পক্ষ থেকে অমুকের ছেলে অমুকের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। পর সংবাদ, আমি আপনার কাছে আল্লাহ পাকের প্রশংসা পাঠ করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি গুনাহসমূহ ক্ষমাকারী। তাওবা কবুলকারী। কঠিন শাস্তি দানকারী। বড় কুদরতের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তার দিকেই সকলে প্রত্যাবর্তিত হবে।
অতঃপর তিনি মজলিসের সকলকে বললেন, তোমরা সকলে দুআ করো, আল্লাহ তাআলা যেনো তার অন্তরকে ফিরিয়ে দেন এবং তার তাওবা কবুল করেন।
ফারুকে আযম রা. যেই বার্তাবাহকের হাতে এই চিঠিটি পাঠিয়ে ছিলেন, তাকে বলে দিলেন, এই চিঠিটি তার হাতে ততক্ষণ দেবেন না, যতক্ষণ না সে তার নেশা থেকে হুঁশে ফিরে না আসে এবং অন্য কারো মাধ্যমে নয়; বরং আপনি সরাসরি তাঁর হাতে দেবেন।
যখন লোকটির হাতে ফারূকে আযমের চিঠি পৌঁছলো, সে বার বার চিঠির শব্দগুলো পাঠ করছিলো আর চিন্তা করছিলো, এই চিঠিতে আমাকে শাস্তির ব্যাপারে ভয়ও দেখানো হয়েছে আবার আমাকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। চিঠিটি পড়ে দীর্ঘ সময় তিনি কান্না করলেন এবং মদ পান করা থেকে ফিরে আসলেন এবং এমনভাবে তাওবা করলো যে, জীবনে আর কখনো মদের কাছেও যাননি।
হযরত উমর ফারূক রা. এর কাছে যখন তার পরিবর্তনের সংবাদ আসলো, তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি বিভ্রান্ত হয়ে গুনাহের সাগরে হাবুডুবু খাবে তখন তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ফিকির তোমাদের করা উচিত। এ ক্ষেত্রে তোমরা তাকে আল্লাহ পাকের রহমত ও দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দাও এবং তার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতো থাকো, যেনো সে তাওবা করে সুপথে ফিরে আসে।
এ ব্যাপারে তোমরা শয়তানের সাহায্যকারী হবে না; তাকে উল্টাপাল্টা বলে রাগান্বিত করে ইসলাম থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেবে না। ১৬২

উপদেশ
যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে গুনাহে লিপ্ত দেখো, তখন তোমার ফরয হচ্ছে, তাকে বাধা প্রদান করা। তবে তোমার যদি নিশ্চিত জানা থাকে যে, তাকে বাধা দিলে সে গুনাহ থেকে তো ফিরে আসবেই না, বরং উল্টো শরীআত নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা শুরু করবে এবং দীন ও ধর্মকে অপদস্ত করবে। এমনকি সে কুফুরীতে পতিত হতে পারে। কারণ, শরীআতের ও ধর্মের কোনো হুকুমকে অপদস্ত করা কেবল গুনাহই নয়, বরং তা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে কাফির বানিয়ে দেয়।
এ কারণেই যদি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, যদি ওই ব্যক্তিকে এই মুহূর্তে গুনাহ থেকে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে সে শরীআতের হুকুমকে অপদস্ত করবে, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে النهي عن المنكر এর ফরযিয়্যাত বাতিল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তাকে বাধা না দিয়ে নিজেকে উক্ত গুনাহ থেকে সরিয়ে রাখতে হবে এবং তার জন্য এই দুআ করতে হবে, হে আল্লাহ! আপনার এই বান্দা অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে আছে। আপনি নিজ অনুগ্রহ ও দয়ায় তাকে এই অসুস্থতা থেকে বের করে সুস্থতার জীবন দান করুন।' ১৬৩

জ্ঞানী সুলভ পন্থা
হযরত হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানবী রহ.-কে আল্লাহ তাআলা চরিত্র সংশোধনের বিশেষ এক যোগ্যতা দান করেছিলেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেকমতপূর্ণ পদ্ধতি দান করেছিলেন। উর্দু ভাষার প্রসিদ্ধ কবি, প্রিয় ব্যক্তিত্ব মুহতারাম মুরাদাবাদী রহ. এর একটি ঘটনা আছে। ঘটনাটি হলো-
এক মজলিসে হযরত খাজা আযীযুল হাসান রহ. বলেন, আমি হযরত থানবী রহ.-কে বললাম, একবার আমার সাথে কবি মুরাদাবাদী এর সাক্ষাত হয়েছিলো। সে বলছিলো, থানাভবন দেখার আমার খুব শখ। কিন্তু আমি এক বিপদে আছি। আমি মদ পান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি না। ফলে আমি সেখানে যেতে পারছি না। কোন মুখ নিয়ে আমি সেখানে উপস্থিত হবো।
থানবী রহ. খাজা সাহেবকে বললেন, আপনি কী উত্তর দিয়েছেন?
খাজা সাহেব বললেন, আমি তাকে বলেছি, হ্যাঁ, এটা তো ঠিকই, এ অবস্থায় বুযুর্গদের কাছে যাওয়া ঠিক হবে না।
থানবী রহ. বললেন, তাই নাকি খাজা সাহেব! আমি তো মনে করেছিলাম, আপনি আমার পথ ও পন্থা বুঝে ফেলেছেন। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
খাজা সাহেবকে আশ্চর্য হতে দেখে থানবী রহ. বললেন, আপনি এটা বলে দিতেন, যে অবস্থায় আছেন সে অবস্থাতেই থানাভবন চলে আসুন। এমনও তো হতে পারে যে, এই সাক্ষাতই আপনার জন্য এই বিপদ থেকে মুক্তির উপায় হয়ে যাবে।
খাজা সাহেব মজলিস থেকে উঠে গেলেন। হঠাৎ একদিন কবি সাহেবের সাথে তার দেখা হলো, তখন তিনি পুরো ঘটনা কবি সাহেবকে শোনালেন। তিনি এই ঘটনা শুনে প্রচুর কাঁদলেন এবং প্রতিশ্রুতি করলেন, যদি আমি মরেও যাই, তবুও এই খারাপ জিনিসের দিকে অগ্রসর হবো না।
এমনটিই হলো। মদ ছাড়ার কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক হয়ে গেলো, তখন লোকেরা বললো, এই অবস্থায় শরীআত আপনাকে প্রয়োজন পরিমাণ মদ পান করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু কবি সাহেবের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিলো, মরে গেলেও নিকৃষ্ট জিনিসের দিকে আর হাত বাড়াবেন না।
আল্লাহ তাআলা হিম্মত ও সদিচ্ছাকারীর প্রতি সাহায্য করেন। এখানেও আল্লাহ তাআলার সাহায্য হলো। কিছুদিনের মধ্যে তিনি পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। অতঃপর তিনি থানাভবন এসেছেন। হযরত থানবী রহ. তাকে খুব সম্মানের সাথে গ্রহণ করলেন। ১৬৪

উপদেশ
শরীআতের কথা বলার সময় সর্বদা নিয়্যাত সহীহ রাখতে হবে। এমনটি মনে করা যাবে না যে, আমি সংশোধনকারী, বড় ব্যক্তি, তার চেয়ে বড় দীনদার ও মুত্তাকী। আর সেই ব্যক্তি পাপী ও অপরাধী। আমি তার সংশোধনের জন্য এসেছি।
যদি উপরোক্ত নিয়্যাতে কেউ দাওয়াত দেয়, তাহলে এতে শ্রবণকারীর অন্তরে তোমার কথার কোনো প্রভাব পড়বে না। এতে না শ্রবণকারীর ফায়দা হবে, না তার নিজের কোনো ফায়দা হবে। কারণ, বদনিয়্যাতের কারণে তার হৃদয়ে অহংকার সৃষ্টি হবে। ফলে তার আমল আল্লাহ তাআলার কাছে কবুল হবে না। বরং সব চেষ্টা বৃথা যাবে। এ জন্য যেকোনো কাজ করার আগে নিয়্যাতকে ঠিক করে নেওয়া খুবই জরুরী। ১৬৫

আল্লামা নানুতুবী রহ. এর দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি
মরহুম আমীর শাহ খান বলেন, মুনশী মুমতায আলীর ছাপাখানা যখন মিরাঠ শহরে ছিলো, মাওলানা নানুতুবী রহ. তখন সেই ছাপাখানায় কাজ করতেন। সেখানে একজন কর্মচারী ছিলো হাফেযে কুরআন। সে ছিলো বেপরোয়া। চুড়িদার পায়জামা পরতো। দাড়ি খাটো করে রাখতো। নামায পড়তো না কখনো।
হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. এর সাথে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। এমনকি হযরত তাকে গোসল করিয়ে দিতেন। শরীর মেজে দিতেন। হাফেয সাহেবও হযরতকে গোসল করিয়ে দিতেন। তাঁরা একে অপরকে চুল আঁচড়িয়ে দিতেন।
কখনো যদি হযরতের কাছে মিষ্টি জাতীয় কিছু আসতো, তাহলে তার জন্য একটা অংশ রেখে দিতেন। এককথায় তাদের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। এই বেপরোয়া হাফেয সাহেবের সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে হযরতের অন্যান্য বন্ধুরা অসন্তুষ্ট ছিলো। হযরত এই দিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না।
এক জুমআর দিনে অভ্যাস অনুযায়ী হযরত নানুতুবী হাফেয সাহেবকে গোসল করালেন। হাফেয সাহেবও হযরতকে গোসল করালেন। সেদিন হযরত তাকে বললেন, হাফেয সাহেব! তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব রয়েছে। অতএব আমাদের উভয়ের চালচলন এক রকম হওয়া উচিত। এটা ঠিক নয় যে, তোমার চালচলন এক রকম হবে আর আমার চালচলন আরেক রকম হবে। এ কারণে আমি তোমার মতো চলতে ইচ্ছা করেছি। তুমি তোমার কাপড় দাও। আমি তোমার কাপড় পরিধান করবো। আর এই যে লম্বা দাড়ি দেখছো, এগুলো তুমি খাটো করে দাও। আমি তোমার সাথে ওয়াদা করছি, আমি এই কাপড় পরা ছাড়বো না। দাড়িও আর বড় করবো না।
হাফেয সাহেব একথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে বললো, এটা কীভাবে সম্ভব! বরং আপনি আমাকে আপনার একটি জামা দিন, আমি তা পরিধান করবো। আর কোনো দিন দাড়িতে হাত দেবো না।
অতঃপর হযরত তাকে নিজের কাপড় পরিয়ে দিলেন এবং সে দাড়ি রেখে দিলো। ওই দিনের পর থেকে সে পরিপূর্ণ নামাযী ও সৎ হয়ে গেলো। ১৬৬

উপদেশ
মুফতী তাকী উসমানী [দা.বা.] বলেন, যখন কাউকে শরীআতের কথা বলবে, তখন সঠিক পদ্ধতিতে বলবে। মহব্বত, ভালোবাসা ও তার কল্যাণকামী হয়ে বলবে। লোকদের সামনে এমনভাবে বলবে না, যাতে সে অপমান বোধ করে।
হযরত মাওলানা শিব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. প্রায় সময় একটি কথা বলতেন, যা আমার পিতার মুখে একাধিকবার শুনেছি, তা হলো, হক কথা যখন সঠিক পদ্ধতিতে এবং ইখলাসের সাথে বলা হবে, তখন তা কখনোই বিফলে যাবে না। ১৬৭

একেই বলে সাহসিকতা
একদিন হযরত মাওলানা মুযাফ্ফর হুসাইন কান্ধলবী রহ. দেখলেন, এক পাহলোয়ান মসজিদে এসে গোসল করতে চাইলো। মুআযযিন তাকে ধমক দিয়ে বললো, কত বড় সাহস! নামায নেই, রোযা নেই, আবার গোসল করতে মসজিদে চলে এসেছে।
মাওলানা কান্ধলবী রহ. মুআযযিন সাহেবকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই তার গোসলের জন্য পানি ভরতে লাগলেন আর তাকে বললেন, মাশাআল্লাহ, তোমাকে দেখে তো বড় পাহলোয়ান মনে হচ্ছে, এমনিতেই তুমি অনেক মেহনত করো। এখন নিজের নফসের ক্ষেত্রে একটু মেহনত করো। নফসের উপর চাপ প্রয়োগ করো, সাহস করে নামায শুরু করে দাও, আসল পাহলোয়ানগিরী তো এটাই।
হযরতের কথা শুনে সে লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেলো এবং এমন প্রভাবান্বিত হলো যে, সেদিন থেকে সে নামাযের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করলো। ১৬৮

উপদেশ
কিছু লোকের প্রতি নরম ব্যবহারের প্রভাব বেশি কার্যকর হয়। আর কঠিন আচরণের কারণে তার ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এ জন্য মানুষের স্বভাবের প্রতি লক্ষ রেখে কথা বলতে হবে।

এক রাখালের আশ্চর্য ঘটনা
খাইবারের যুদ্ধে এক রাখাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে উপস্থিত হলো। সে ইয়াহুদীদের ছাগল চরাতো। ছাগল চরানোর সময় সে দেখলো, খাইবারের বাইরে মুসলমানদের ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। সে চিন্তা করলো, আমি গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাত করে দেখে আসি, মুসলমানরা আসলে কী করে, কী বলে? প্ল্যান অনুযায়ী সে ছাগল চরাতে চরাতে মুসলিম বাহিনীর কাছে পৌঁছে তাদের জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের সরদার কোথায়? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, আমাদের নেতা তাঁবুর ভেতর আছেন। কথাটা প্রথমে রাখালের বিশ্বাস হচ্ছিলো না। সে মনে করলো, এতো বড় সৈন্যদলের সরদার এই সাধারণ তাঁবুতে কীভাবে থাকতে পারে। তার চিন্তায় ছিলো, যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক বড় বাদশাহ, তাই তিনি অনেক সাজ-সজ্জা ও আড়ম্বরপূর্ণ তাঁবুতে থাকবেন। কিন্তু এটা তো খেজুরের পাতায় নির্মিত তাঁবু। যাক, পরিশেষে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাক্ষাত করতে তাঁবুতে প্রবেশ করলো। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাক্ষাত করে সে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কী পয়গাম নিয়ে এসেছেন এবং কিসের দাওয়াত দিচ্ছেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং তাকে ইসলামের অমীয় বার্তা শুনালেন।
রাখাল বললো, যদি আমি ইসলামের দাওয়াত কবুল করি, তাহলে আমার পরিণাম ও মর্যাদা কী হবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইসলাম গ্রহণের পর তুমি আমাদের ভাই হয়ে যাবে। আমরা তোমাকে আমাদের বুকে টেনে নেবো।
রাখাল বললো, আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন- আমি কোথায় আর আপনি কোথায়? আমি হলাম এক নগণ্য রাখাল, কৃষ্ণাঙ্গ, আমার শরীর থেকে দূর্গন্ধ বের হচ্ছে। এই অবস্থায় কীভাবে আমাকে আপনি বুকে টেনে নেবেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্যই আমরা তোমাকে বুকে টেনে নেবো। তোমার শরীরের কালো বর্ণকে আল্লাহ তাআলা নূর দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। তোমার শরীরের দূর্গন্ধকে আল্লাহ তাআলা খুশবু দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।
একথা শুনে সে তৎক্ষণাৎ কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলমান হয়ে গেলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এখন আমার কাজ কী?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমন সময় ইসলাম গ্রহণ করেছো, যখন নামাযেরও সময় নয় যে, তোমাকে নামায পড়তে বলবো। রোযার সময় নয় যে, তোমাকে রোযা রাখতে বলবো। তোমার উপর যাকাতও ফরয নয় যে, তোমাকে যাকাত দিতে বলবো। তবে একটি ইবাদত আছে, যা তলোয়ারের ছায়ায় সম্পাদন হয়, তা হলো, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ।
রাখাল বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এই জিহাদে অংশ গ্রহণ করবো। আপনি অবশ্যই জানুন, যে ব্যক্তি যুদ্ধে যায় তার দুটি অবস্থার একটি অবশ্যই হবে। ১. হয়তো সে শহীদ হবে। ২. নয়তো সে গাজী হবে। যদি আমি জিহাদে শহীদ হই, তাহলে আপনি আমার জান্নাতের দায়িত্ব নেবেন কিনা?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি এ কথার দায়িত্ব নিচ্ছি যে, যদি তুমি এই জিহাদে শরীক হও, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবেন। তোমার শরীরের দুর্গন্ধ সুঘ্রাণে পরিণত করবেন। তোমার চেহারার কৃষ্ণবর্ণ শুভ্র বর্ণে পরিবর্তন করে দেবেন।
যেহেতু সেই রাখাল ইয়াহুদীদের বকরী চরাতে চরাতে এদিকে এসেছিলো তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ইয়াহুদীদের যে ছাগল চরানোর জন্য নিয়ে এসেছো, সেগুলো ফেরত দিয়ে এসো। কেননা, এগুলো তোমার কাছে আমানত। ১৬৯

উপদেশ
আলোচ্য জিহাদটি কোনো দেশ দখল করার জন্য হয়নি, কোনো ক্ষমতা লাভ করার জন্যও হয়নি। বরং তা হয়েছিলো সত্যকে সমুন্নত করার জন্য। সত্যকে পদদলিত করে কখনো জিহাদ হয় না। গুনাহ ও অবৈধ পথে আল্লাহর দীনের দাওয়াত হয় না। ১৭০

ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধ
হযরত থানবী রহ. একবার কালপি শহরে গেলেন। সেখানে এক ব্যক্তি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে কাপড় পরে জামে মসজিদে নামায পড়তে আসলো। গ্রামের লোকদের থেকে জানা গেলো, সে পূর্বে নিম্নশ্রেণীর মেথর ছিলো। এখন মুসলমান হয়েছে। তাই সেখানকার চৌধুরী ব্যক্তিরা তার সাথে খানা-পিনা খাওয়া তো দূরের কথা, তার থেকে প্লেটও নিতো না।
একবার সেখানে একটি মাহফিল হচ্ছিলো, সেখানে সবাই উপস্থিত ছিলো। কিছু লোক হযরত থানবী রহ. এর কাছে আবেদন করলো, তিনি যেনো চৌধুরী ব্যক্তিদের বুঝিয়ে দেন যে, এভাবে এই মেথর লোকটি থেকে দূরে সরে থাকা ঠিক নয়। এতে সে অনেক কষ্ট পায়।
অবস্থা দেখে হযরত বুঝতে পারলেন, শুধু বুঝিয়ে দিলে হবে না। বুঝানোর কারণে তো তারা হযরতের সামনে হ্যাঁ, হ্যাঁ বলবে। পরে কেউ এর পরওয়া করবে না।
হযরত থানবী রহ. একটি পাত্রে পানি আনতে বললেন, যখন পানি আনা হলো তখন থানবী রহ. সেই নও মুসলিমকে বললেন, পাত্রে মুখ লাগিয়ে পানি পান করো। অতঃপর উচ্ছিষ্ট পানির পাত্রটি হযরত থানবী রহ. তার থেকে নিয়ে ওই জায়গায় মুখ লাগিয়ে পান করলেন, যেই জায়গায় মুখ লাগিয়ে ওই নও মুসলিম পানি পান করেছিলো। অতঃপর সবাইকে লক্ষ করে বললেন, সবাই এই পাত্র থেকে পানি পান করো, তখন তিনি কাউকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। তাই সবাই যেভাবেই হোক পানি পান করে নিলো।
অতঃপর থানবী রহ. বললেন, ভাইয়েরা আমরা! এখন থেকে তোমরা কেউ তার থেকে দূরে সরে থাকবে না।
একজন বললো, তার থেকে বেঁচে থাকার এখন আর কীইবা আছে? শিক্ষা দেওয়ার উক্ত পদ্ধতির ফলে আমাদের প্রথা নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমরা তাকে আমাদের সাথে খাওয়াবো, পান করাবো। যখন আপনি তার ঝুটা পানি পান করিয়ে দিলেন, তখন তার থেকে দূরে থাকার আর কিছু বাকি নেই। ১৭১

উপদেশ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, المسلم أخو المسلم অর্থাৎ এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। ১৭২ অতএব মানুষ নিজ ভাইয়ের সাথে যে আচরণ করে, প্রত্যেক মুসলমানের সাথে তার তাই করা উচিত। চাই সে পরিচিত হোক বা অপরিচিত। তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাক বা না থাক। তার সাথে বন্ধুত্ব থাক বা না থাক। তবুও তুমি তাকে আপন ভাই মনে করবে। এই একটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধনী গরীব, উঁচু নীচুর পার্থক্য বিলীন করে দিয়েছেন।
সুতরাং এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। চাই সে যে ভাষাভাষীর-ই হোক। যে দেশেরই হোক। যে পেশারই হোক। যে বংশেরই হোক। সর্বাবস্থায় সে তোমার ভাই। ১৭৩

দাওয়াত ও তাবলীগের হিকমতপূর্ণ পথ ও পদ্ধতি
হযরত মাওলানা মুযাফ্ফর হুসাইন কান্ধলবী রহ. একবার জালালাবাদ বা শামলি শহরে অবস্থান করছিলেন। সেখানে একটি মসজিদ বিরাণ অবস্থায় পড়েছিলো।
তিনি কুয়া থেকে পানি তুলে উযু করলেন। অতঃপর মসজিদটি ঝাড়ু দিলেন। এরপর এক লোককে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কোনো নামাযী লোক নেই?
লোকটি বললো, না, নেই। সামনে খান সাহেবের বাড়ী, যে মদ্যপ ও যিনাকারী। যদি সে নামায পড়া শুরু করে, তাহলে তার সাথে আরো দুচারজন নামাযী হয়ে যাবে।
মাওলানা একথা শুনে খান সাহেবের কাছে গেলেন। তিনি নেশায়মত্ত ছিলেন। তার পাশে এক তরুণী বসা ছিলো।
মাওলানা তাকে বললেন, ভাই খান সাহেব! যদি তুমি নামায পড়া শুরু করো, তাহলে তোমার দেখাদেখি আরো কিছু লোক নামায পড়বে। এতে করে জুমআর নামায এই মসজিদে চালু হবে। ফলে মসজিদটি আবাদ হয়ে যাবে।
খান সাহেব বললেন, আমি উযু জানি না আর এই খারাপ দুই অভ্যাসও ছাড়তে পারি না।
মাওলানা বললেন, তুমি উযু ছাড়াই নামায পড়া শুরু করো আর যদি মদ ছাড়তে না পারো, তাহলে মদও পান করতে থাকো।
সে প্রতিজ্ঞা করলো, আমি উযু ছাড়াই নামায পড়বো। মাওলানা সেখান থেকে ফিরে এসে নামাযে দাঁড়ালেন। সিজদায় গিয়ে অজোরে কান্না করলেন।
এক ব্যক্তি বললো, হযরত! আপনার দ্বারা আজ এমন দুটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ইতিপূর্বে হয়নি। একটি হলো, আপনি মদ পান করার অনুমতি দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি হলো, আপনি সিজদায় অনেক কান্না করেছেন।
তিনি বললেন, সিজদায় আমি মহান রবের কাছে প্রার্থনা করেছি, হে রাব্বুল ইয্যত! আমি তো জায়নামাযে দঁড় করিয়ে দিয়েছি, এখন আপনার কাজ। দিল তো আপনার হাতে।
আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে খান সাহেবের এমন অবস্থা হয়েছে যে, যখন তরুণী উঠে গেলো তখন যোহরের সময় ছিলো। নিজের প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে গেলো। মনে মনে ভাবলো, আজ প্রথম দিন তাই গোসল করে নিই। কাল থেকে উযু ছাড়াই নামায পড়ে নেবো। লোকটি গোসল করলো। পাক সাফ কাপড় পরিধান করলো। অতঃপর নামায আদায় করলো। নামায শেষ করে বাগানে চলে গেলো। আসর ও মাগরিবের নামায বাগানে সেই উযু দিয়ে পড়লো। মাগরিবের পর যখন ঘরে পৌঁলো তখন ঘরে একজন তরুণী অবস্থান করছিলো। প্রথমে খানা খেতে ঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে স্বীয় স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি পড়লে তার প্রতি আসক্ত হয়ে যায় সে। ফলে বাইরের ঘরে গিয়ে তরুণীকে বললো, ভবিষ্যতে কখনো আর এই বাড়ীতে আসবে না। ১৭৪

উপদেশ
যখন আল্লাহ তাআলার কোনো বান্দা নিজের অহংকার দূর করে নিজেকে ছোট করে আল্লাহর জন্য কথা বলে, তখন দুনিয়ার লোকরো বুঝতে পারে যে, এতে তার দুনিয়াবী কোনো লাভ নেই। সে যা কিছু বলছে, সব আল্লাহর জন্য বলছে তখন তার কথায় প্রভাব পড়ে।
যেমন হযরত শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ. এর এক ওয়াজে হাজার হাজার লোক তার হাতে তাওবা করতো। সুবহানাল্লাহ।
আমরা প্রথমত দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ ছেড়ে দিয়েছি। যারা করে তারাও এমন পন্থায় করে, যে পন্থা লোকদের ক্রোধান্বিত করে তোলে। যার কারণে পরিপূর্ণ ফায়দা হয় না। এজন্য তিনটি কথা মনে রাখতে হবে।
১. কথা হক হতে হবে। ২. নিয়্যাত সঠিক হতে হবে। ৩. পদ্ধতি সঠিক হতে হবে। ১৭৫

ব্যথিত হৃদয়
আমীন গিলানী লিখেছেন, মাওলানা নূরুল হাসান বুখারী রহ. বর্ণনা করেছেন, একবার 'খাইরুল মাদারিস জানান্দার' এর মাহফিলে হযরত মাওলানা আতাউল্লাহ সাহেব উপস্থিত ছিলেন। তিনি খাবারের দস্তরখানে বসে সামনে একজন যুবক মেথরকে দেখতে পেলেন। শাহ সাহেব বললেন, আসো ভাই! খানা খাও। সে বললো, হযরত! আমি তো মেথর। আপনার সাথে খাওয়ার যোগ্য নই আমি।
শাহ সাহেব ব্যথিত স্বরে বললেন, আরে ভাই, তুমিও তো মানুষ, নাকি? তোমারও তো ক্ষুধা অনুভব হয়, নাকি? এ কথা বলে তিনি নিজে উঠে তাকে হাত ধরে সাথে বসালেন। বেচারা থর থর করে কাঁপছিলো আর বলছিলো, আমি তো একজন মেথর।
শাহ সাহেব রহ. নিজ হাতে রুটি টুকরা করলেন। তরকারীর ঝুলে চুবিয়ে তার মুখে পুরে দিলেন। অতঃপর যখন তার ইতস্ততবোধ কিছুটা দূর হলো, তখন শাহ সাহেব তার মুখে এক টুকরো আলু দিলেন। সে যখন আলুর অর্ধেক তার দাঁত দ্বারা কেটে মুখে নিলো, তখন বাকি অর্ধেক আলু হযরত নিজেই খেলেন।
এমনিভাবে মেথর লোকটি যখন পানি পান করে কিছু পানি রেখে দিলো, হযরত তার অবশিষ্ট পানি পান করলেন। সে খাবার খেয়ে গায়েব হয়ে গেলো।
উক্ত ঘটনা তার উপর বিশাল প্রভাব ফেললো। সে খুব কান্না করলো। সে তার অবস্থা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলো। আসরের সময় সে তার যুবতী স্ত্রী এবং তার কোলের সন্তান নিয়ে এসে বললো, শাহ সাহেব! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদেরকে কালিমা পড়িয়ে মুসলমান বানিয়ে নিন। এভাবে স্বামী স্ত্রী উভয়ে মুসলমান হয়ে গেলো।
কবি চমৎকার বলেছেন,
তার ভঙ্গিমা হৃদয় কাড়া
তার সুর অন্তর কাড়া
যে হৃদয় জয় করতে পারে
সে জয় করতে পারে যামানা। ১৭৬

উপদেশ : যে ব্যক্তি কাফির, তুমি তার কুফুরীকে ঘৃণা করো। সেই ব্যক্তিকে নয়। বরং তার ব্যাপারে দুআ করো, আল্লাহ তাআলা যেনো তাকে হিদায়াত দান করেন। ১৭৭

অন্তর থেকে যে কথা বের হয় তা অন্তরে গিয়ে প্রবেশ করে
পাটিয়ালা শহরে একটি জলসা হচ্ছিলো। আমীরে শরীআত সাইয়িদ আতাউল্লাহ শাহ বুখারী রহ. সেই জলসায় বক্তৃতা করার জন্য গেলেন। জলসাটি একটি বড় বিল্ডিং এর ছাদের উপর হচ্ছিলো। বিল্ডিংটির অনেকগুলো সিঁড়ি ছিলো। শাহ সাহেব জলসায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি অতিক্রম করছিলেন। তিনি দেখলেন, এক যুবক ঝাড়ু হাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। শাহ সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ছেলে! তুমি কে? যুবক উত্তর দিলো, জনাব! আমি ক্লিনার, সিঁড়ি পরিষ্কার করি।
শাহ সাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অতঃপর তার বুকে হাত রেখে বললেন, এটাও একটু পরিষ্কার করো। হাত দিয়ে তার অন্তরের দিকে ইশারা করলেন।
শাহ বুখারী রহ. এ কথা বলে জলসায় চলে গেলেন। সম্ভবত আধা ঘণ্টা পর মাওলানা আবদুল জাব্বার শাহ বুখারী সাহেবের কাছে এসে বললেন, শাহ সাহেব! আপনি তাকে কী বলে এসেছেন? শাহ সাহেব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে? তিনি বললেন, ক্লিনারকে। শাহ সাহেব বললেন, কিছুই তো বলিনি।
মাওলানা আবদুল জাব্বার রহ. বললেন, হযরত! সে তো রাস্তায় ছটফট করছে। তাকে অস্থির ও উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সে বলছে, শাহ সাহেবকে বলুন, তিনি যেনো আমাকে এক্ষুনি মুসলমান বানিয়ে তিনি নিজেই আমার অন্তরকে পরিষ্কার করে দেন।
শাহ সাহেবের নির্দেশে তাকে জলসায় আনা হলো। অতঃপর সকলের সামনে সে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলো।
লোকটি শাহ সাহেবকে দুআ দিতে দিতে বলতে লাগলো, হযরত! আপনি যখনই আমাকে আপনার বুকের সাথে লাগালেন, আমার অন্তর আলোকিত হয়ে গেলো। আমি ইসলাম গ্রহণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলাম। ১৭৮

উপদেশ
হযরত মুফতী তাকী উসমানী [হাফিযাহুল্লাহ] তার পিতা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ও ডাক্তার আবদুল হাই রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন-
হযরত থানবী রহ. বলতেন, আমি প্রত্যেক মুসলমানকে বর্তমান অবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে আর প্রত্যেক কাফিরকে ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার চেয়ে উত্তম মনে করি।
ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, যদিও সে এখন কুফরের মধ্যে ডুবে আছে, কিন্তু কে জানে, যদি আল্লাহ তাআলা তাকে তাওবা করার তাওফীক দান করেন এবং সে কুফরীর অন্ধকার থেকে বের হয়ে যায় আর আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন, তাহলে সে কাফির আমার থেকেও আগে চলে যাবে।
আর যে ব্যক্তি মুসলমান, ঈমান ওয়ালা, আল্লাহ তাআলা তাকে ঈমানের সম্পদ দান করেছেন, কে জানে, আল্লাহ তাআলার সাথে তার সম্পর্ক কেমন। কেননা, প্রত্যেক মানুষের আল্লাহর সাথে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে, কারো ব্যাপারে নির্দিষ্ট উক্তি করা উচিত নয়। এই জন্য আমি প্রত্যেক মুসলমানকে আমার চেয়ে উত্তম মনে করি। ১৭৯
এমন গুণ অর্জন করার জন্য আমাদের নিচের দুআর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا هَادِينَ مُهْتَدِينَ غَيْرَ ضَالِّينَ وَلَا مُضِلِّينَ سِلْمًا لِأَوْلِيَائِكَ وَحَرْبًا لِأَعْدَائِكَ يُحِبُّ بِحُبِّكَ مَنْ حَبَّكَ وَنُعَادِي بِعَدَاوَتِكَ مَنْ خَالَفَكَ مِنْ خَلْقِكَ.
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে অন্যের হিদায়াতের কারণ বানান এবং আমাদের হিদায়াত দান করুন। আমাদের নিজেদেরকেও পথভ্রষ্ট করবেন না এবং অন্যের পথভ্রষ্টের কারণও আমাদের বানাবেন না। আপনার বন্ধুদের জন্য সন্ধি, আপনার শত্রুদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ। যে ব্যক্তি আপনাকে ভালোবাসে আপনার সন্তুষ্টির জন্য, আমরাও তার সাথে ভালোবাসা রাখি। আর আপনার মাখলুকের মধ্যে যে আপনার বিরোধিতা করে, আপনার বিরোধিতার কারণে আমরাও তার সাথে শত্রুতা পোষণ করি। ১৮০
سبحان ربك رب العزة عما يصفون ، وسلام على المرسلين والحمد لله رب العالمين।

টিকাঃ
১৬২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১১৬৪, সূরাতুল মুমিন: ০৩।
১৬৩. ইসলাহী খুতুবাত : ৮/৩৪।
১৬৪. আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে: ১১০।
১৬৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/৩৬।
১৬৬. আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে: ১১১।
১৬৭. ইসলাহী খুতুবাত : ৮/৩৬।
১৬۸. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ : ৯৬।
১৬৯. ইসলাহী খুতুবাত: ৯/১১০।
১৭০. ইসলাহী খুতুবাত : ৩/১৬৩।
১৭১. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ : ৫৬।
১৭২. আবূ দাউদ: ২/৩১৪, কিতাবুল আদব।
১৭৩. ইসলাহী খুতুবাত : ৮/২০০।
১৭৪. আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে: ১০৯।
১৭৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/৪১।
১৭৬. কিতাবু কি দরস গাহ মে: ১১৩।
১৭৭. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/৭৫।
১৭৮. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ: ২০৭।
১৭৯. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/৭৬।
১৮০. কানযুল উম্মাল: ২/৭৫, কিতাবুল আযকার ফী জাওয়ামিইদ দুআ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px