📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 ছাত্র যামানায় মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার

📄 ছাত্র যামানায় মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার


প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের এক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ- এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর ব্যবহার যদি শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে এই নিয়ে লেখার কোনো জরুরত ছিলো না। কিন্তু ব্যবহারকারীদের অনেকেই বিশেষ প্রয়োজনে এর ব্যবহার শুরু করলেও তারা তাদের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অপ্রয়োজনীয় লিংকে ঢুকে লম্বা সময়ের জন্য তারা হারিয়ে যাচ্ছেন। ৫-১০ মিনিটের জন্য একটি ওয়েবসাইটে ঢুকার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের।
আমার সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা হয় মুসলমানদের সেই শ্রেণীটাকে নিয়ে, যারা গুনাহ থেকে সবসময় বেঁচে থাকতে চান, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তারা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারছেন না। আমার সবচেয়ে বেশি আফসোস হয় মাদরাসার ছাত্রদের হাতে এই ডিভাইসটি দেখে। তাঁদের হাতে এই ভয়াবহ যন্ত্রটি দেখে আমার মনে হয়, এই বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সমাজের সর্বোত্তম শ্রেণীটাও। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের ঈমান, আমল, মূলোবোধ, সংস্কৃতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লেখাপড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যখন ছাত্ররা বই-পুস্তক ও কিতাবের জগতে হারিয়ে যাওয়ার কথা, তখন তারা উস্তাদ ও গার্ডিয়ানকে ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর তাতে চুঁ মারছে। কে কী কমেন্ট করছে, কতটা লাইক শেয়ার হচ্ছে তা দেখার জন্য অস্থির থাকে। কখন নামায, ক্লাস, মিটিং ইত্যাদি শেষ হবে আর ফেইসবুকে ঢুকবে এ জন্য মন বেচাইন থাকে। ক্লাসের ফেল করা এক- দেড়শো ছাত্রের লাইক আর কমেন্ট পড়ে খুব আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। এমন সব লোকদের কমেন্টের ভিত্তিতে নিজেকে বিপ্লবী নেতা ভাবছে, যারা রাত দুটোয় তোমার লেখায় লাইক দেয় এবং যাদেরকে নিয়ে তাদের মা-বাবাই সবসময় অস্থির ও পেরেশান থাকে। তাদের নিয়ে কীভাবে তুমি সমাজ নির্মাণ করবে? হিরো হওয়া কি এতই সহজ? আসলে এটা চরম ধোঁকা।
ছাত্র বন্ধুরা, ভেবে দেখুন, ইন্টারনেটে ঢুকে কতটা সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন নিজেদের প্রয়োজনের মধ্যে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আগে আমরা মোবাইল চালাইতাম। এখন মোবাইল আমাদেরকে চালায়। অজানা মোহে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে আমাদের। ফলে আমরা তিলাওয়াতের সময় পাচ্ছি না। যিকির-আযকারের ফুরসত পাচ্ছি না। বই-পত্র পড়ার সুযোগ পাচ্ছি না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
علامة اعراض الله عن العبد اشتغاله بما لا يعنيه وإن امرأ لو ذهبت ساعة من عمره في غير ما خلق له الجدير أن تطول حسرته يوم القيامة.
কোনো বান্দা যদি অর্থহীন কাজ নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, তার থেকে আল্লাহ তাআলা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কোনো ব্যক্তির জীবনের যৎসামান্য মুহূর্তও যদি এমন কাজে চলে যায়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি, তাহলে নির্ঘাত এর জন্য একদিন তাকে আফসোস করতে হবে। ১৩৭
ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে আমাদের লজ্জাও কমে যাচ্ছে। অনিচ্ছাকৃত চোখে পড়া অশ্লীলতা দেখতে দেখতে চোখ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধবোধ ও খারাপ লাগার অনুভূতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবাধে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যাতায়াতের অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। অভ্যাস এমন জিনিস, যার মাধ্যমে বুযুর্গ ব্যক্তিরও নিজের অজান্তে আস্তে আস্তে গুনাহের সাথে আপোস হয়ে যায়। অথচ এই ব্যক্তিটি একসময় কঠোরভাবে নজরের হিফাযত করতেন। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে তাঁরা তাদের তাকওয়া-পরহেযগারী ধরে রাখতে পারছেন না।
একজন পরহেযগার ও বুযুর্গ মানুষকে একটি স্মার্টফোন অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পাক্কা ফাসিকে পরিণত করে দিতে পারে। বাইরের খোলসটা ঠিক রেখে ভেতরটা খালি করে দিতে পারে। এই মানুষটাকে চোখের যিনা থেকে শুরু করে ধর্ষণের পথেও টেনে নিতে পারে। এটা কেবল আশঙ্কা নয়, বাস্তবে এ উদাহরণও আছে অনেক। ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে পরকালীন ক্ষতির পাশাপাশি দুনিয়াবীও অনেক ক্ষতি হচ্ছে। দিনে-রাতে প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। যার পভাব পড়ছে দৈনন্দিন কাজে-কর্মে। সময়ের কাজ সময়ে করা হচ্ছে না। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সব ক্ষতি যদি বাদও দেওয়া হয়, তবু এর সময় নষ্ট করার যে ক্ষমতা, একজন মানুষের জীবনের সম্ভবনাগুলো শেষ করে দিতে তা-ই যথেষ্ট। এর পাশাপাশি যদি চারিত্রিক ক্ষতিকে যোগ করা হয়, তাহলে কীভাবে একজন দুর্বল ঈমানদারের জন্য এর ব্যবহার কীভাবে জায়িয হতে পারে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম জাওযী রহ. বলেন, সময়ের অপচয় মৃত্যুর চেয়েও জঘন্য। কেননা, মৃত্যু তো শুধু দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, কিন্তু সময়ের অপচয় মানুষকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ১৩৮
একজন মানুষ যখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে লিপ্ত থাকে, তখন তার ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অসংখ্য গুনাহ হতে থাকে। অন্তরে গুনাহের কালো দাগ পড়তে থাকে। কালো দাগ পড়তে পড়তে একসময় অন্তর শক্ত হয়ে যায়। অন্তর অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। ফলে আল্লাহর কথা, নবীজীর কথা, আখিরাতের কথা আর অন্তরকে স্পর্শ করে না। যদিও সে তখন আমল জারীও রাখে, তথাপি সে আমলে থাকে না কোনো প্রাণ। সে ইবাদত হয় ভাস্কর্যের মতো প্রাণহীন। দুআতে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না। জিহ্বায় যিকির-আযকার ও তিলাওয়াতের স্বাদ অনুভূত হয় না। হৃদয়ে থাকে না প্রশান্তি বলে কিছু। এ যেন এক মৃত অন্তর।
প্রশান্ত একটা অন্তর পেতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের জাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকলে অন্তর ঠান্ডা থাকে। যেকোনো আগ্রহী ব্যক্তি সপ্তাহখানেক অনলাইন থেকে দূরে থাকলেই এর বাস্তবতা বুঝতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের ভেবে দেখে দরকার, বাস্তবে স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রয়োজন কতটুকু আমার? এ ছাড়া কি আমি চলতে পারবো না? যারা ব্যবহার করছেন না তাদের কি দিন পার হচ্ছে না? যাদের একান্ত প্রয়োজন তাদের কথা বাদ দিলাম। আপনার কতোটুকু প্রয়োজন ভেবে দেখুন। চিন্তা করে দেখুন, এর কারণে দৈনিক আপনার কী পরিমাণ কবীরা গুনাহ হচ্ছে। কতোবার পরনারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ছে। কতো সময় অপচয় হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজ রেখে কতো সময় অর্থহীন কাজে ব্যয় হচ্ছে। ধ্বংসের যে অতল গহ্বরে আমরা পড়ে আছি, তা থেকে যদি নিজেরা উদ্ধার না হই, কেউ এসে উদ্ধার করবে না। উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। নিজের উন্নতির চিন্তা নিজেকেই করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى (٤٠) فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
আর যে বক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজের আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখে, জান্নাত হবে তার আশ্রয়স্থল। ১৩৯
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকটা বুঝে সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

টিকাঃ
১৩৭. রূহুল বায়ান : ১/৩৬৩। সূরা বাকারার ২৩৩নং আয়াতের ব্যাখ্যায়। মাকতাবা শামেলা সংস্করণ।
১৩৮. আলফাওয়াইদ : ৩৬।
১৩৯. সূরা নাযিআত : ৪০-৪১।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 সৎ কাজে এগিয়ে থাকা

📄 সৎ কাজে এগিয়ে থাকা


শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. স্বীয় জীবনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, আমি গ্রীষ্মকালের দুপুরে যোহরের নামাযের কিছু সময় পূর্বে হারামের চত্তরে বসা ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে লোকদের পানি পান করাতে লাগলো। কেউ তার ডান হাত থেকে, কেউ তার বাম হাত থেকে পানপাত্র নিচ্ছিলো। আর বৃদ্ধ যমযম কূপ থেকে পানি নিয়ে সকলকে পানি পান করাচ্ছিলেন।
একে একে তিনি বড় এক দলকে পানি পান করিয়ে ফেললেন। পরিশ্রমের ফলে তাঁর শরীর থেকে ঘাম ঝরছিলো। অথচ অন্যান্য লোক বসে বসে অপেক্ষা করছিলো কখন তার পালা আসবে আর সে সেই বৃদ্ধের কাছ থেকে পানি পান করবে।
শাইখ আবু গুদ্দাহ রহ. এই ঘটনা বর্ণনা করে নিজের মন্তব্য বর্ণনা করলেন, আমি আশ্চর্য হচ্ছিলাম তার শরীর এবং তাঁর ধৈর্য দেখে। লোকদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখে। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে লোকদের পানি পান করানো দেখে।
আমি বুঝতে পেরেছি, ভালো কাজ করা সে লোকদের জন্য সহজ, যার জন্য আল্লাহ তাআলা তা সহজ করে দেন। আল্লাহ তাআলার কাছে ভালো কাজের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যাকে পছন্দ করেন, তাকে তা থেকে দান করেন। আল্লাহ তাআলাই ভালো গুণ ও বৈশিষ্ট্য দানকারী।
খুব অল্প সংখ্যক লোকই নিচের দুটি গুণের অধিকারী হয়ে থাকে-
• মানুষের সাথে সৎ ব্যবহার করা।
• কাউকে কষ্ট না দেওয়া। ১৪০

যে ছেলে বড় হবে শৈশবেই বুঝা যায়
হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. শৈশবে কোনো বখাটে ছেলেদের সাথে মিশতেন না। দুষ্ট ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করতেন না। শৈশবেই তাঁর মাঝে ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো। তাঁর খেলাধুলার ধরন ছিলো, খোলা মাঠে তিনি জামাআতে নামায পড়ার ধরন নকল করতেন। বিশেষ প্রয়োজনে বাজারে যাওয়ার পথে মসজিদ নজরে পড়লে সোজা মসজিদে প্রবেশ করে মিম্বারে দাঁড়াতেন এবং খুতবার ন্যায় কিছু পড়ে ফিরে আসতেন। যেনো অপরিপক্ক বয়সেই ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি তিনি টেনে আনতেন। মাত্র বারো বছর বয়সেই তাঁর তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছিলো। ফলে গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ ও তাসবীহ পড়ায় আত্মনিয়োগ করতেন। তাঁর মা জীবিত ছিলেন না, ফলে তিনি তাঁর নানীর নিকট থাকতেন। নানী তাঁর ব্যাপারে খুব দুঃখ করে বলতেন, এতো ছোট্ট বয়সে এতো কষ্ট করছে। ১৪১
হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, ছাত্ররা যদি চান্ত, ইশরাকের সময় কমপক্ষে দুই রাকআত নামায পড়ে নেয় আর শেষরাতে পড়ার জন্য উঠার সময় দুই রাকআত তাহাজ্জুদ পড়ে কিতাব শুরু করে এমনিভাবে চলাফেরার সময় অনর্থক কথাবার্তা না বলে দরূদ শরীফ পড়ে তাহলে বলুন, এতে তাদের পড়ালেখায় এমন কী সমস্যা হয়ে যাবে।
উপরোক্ত ইবাদতের ফলে তাদের ভেতরে এমন অবস্থা তৈরি হবে, যার ফলে তাদের মাঝে ইবাদতের নূর ও যিকিরের যোগ্যতা তৈরি হয়ে যাবে। উপরন্তু তাদের লেখাপড়ায়ও কোনো ত্রুটি হবে না। ১৪২

তাকবীরে উলা ছুটে যাওয়ার কারণে অনুশোচনা
'তাযকিরাতুর রশীদ' নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এক বছর দারুল উলূম দেওবন্দের এক পাগড়ি প্রদান অনুষ্ঠানে মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. যখন গিয়ে পৌঁছেছেন তখন আসরের নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিলো। নামায পড়ানোর জন্য হযরত মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবী রহ. জায়নামাযে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের প্রচণ্ড ভীড় এবং মুসাফাহার প্রচুর চাপ থাকা সত্ত্বেও দ্রুততার সাথে যখন তিনি নামাযে শরীক হলেন, তখন কিরাআত শুরু হয়ে গিয়েছিলো। সালাম ফিরানোর পর দেখা গেলো, হযরত গাঙ্গুহী রহ. মনোক্ষুণ্ণ এবং তাঁর চেহারায় চিন্তার ছাপ।
হযরত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে লাগলেন, আফসোস! দীর্ঘ বাইশ বছর পর আজ তাকবীরে উলা ছুটে গেলো। ১৪৩

নামাযকে বলো না কাজ আছে, কাজকে বলো আমার নামায আছে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্দর চরিত্র ও উত্তম গুণাবলির মাধ্যমে পৃথিবীতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছেন এবং মাত্র তেইশ বছরে পুরো আরব ভূখণ্ডের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। বরং পুরো পৃথিবীর চেহারা পাল্টে দিয়েছেন।
এই বিপ্লব সাধন হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মাতকে যে কাজ করার হুকুম দিতেন, প্রথমে তিনি সে কাজটির উপর নিজে আমল করতেন। যেমন, আমাদের তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার হুকুম দিয়েছেন অথচ তিনি দৈনিক আট ওয়াক্ত নামায পড়তেন। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায, চান্ত, ইশরাক ও তাহাজ্জুদের নামায। বরং তাঁর অবস্থা ছিলো, যখনই তিনি কোনো বিপদের সম্মুখীন হতেন, তখনই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। ১৪৪ আল্লাহ তাআলার প্রতি মনোনিবেশ হয়ে দুআ শুরু করে দিতেন। আর তিনি বলতেন جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ -আমার চোখের শীতলতা হচ্ছে নামায। ১৪৫

বুযুর্গানে দীনের বৃদ্ধ বয়সে মামূলাতের প্রতি গুরুত্বারোপ
মাওলানা আশিক ইলাহী বুলন্দ শহরী রহ. নিজের সফরের একটি ঘটনা উল্লেখ করে লিখেন, একবার হযরত খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. জয়পুর সফর করছিলেন। আমি তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের গাড়ি ইশার সময় গিয়ে পৌঁছলো। মেজবান আমাদেরকে নিয়ে একটি সরাইখানায় উঠলেন। তা ছিলো খুবই সংকীর্ণ ও অন্ধকারচ্ছন্ন। কামরাগুলোতে না ছিলো আলোর ব্যবস্থা, না ছিলো খানা-পিনার কোনো উপকরণ।
কোনো রকম একটি চেরাগ জ্বালিয়ে মেজবান আলো ও খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য বাইরে গেলেন। হযরতের সাথে আমার অসংখ্যবার সফর করার সুযোগ হয়েছে। ফলে আমার খুব ভালো করেই জানা ছিলো, হযরত তাঁর নিয়মিত আমলগুলো খুব নিয়ম করে পালন করেন। তবে আজকের কষ্ট ক্লেশের কথা মনে করে আমার ধারণাও হয়নি, হযরত আজ রাতেও তাহাজ্জুদের জন্য উঠবেন। এদিকে যে চেরাগ জ্বালানো হয়েছিলো, তা মিটমিট করে জ্বলছিলো। একপর্যায়ে তাও নিভে গেলো। ফলে শুয়ে পড়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উপায় ছিলো না।
সুবহে সাদিকের কিছুক্ষণ পূর্বে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেলো। হযরতের খাটের দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি খাটে নেই, আমি ভয় পেয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম, আর খুঁজতে লাগলাম, হযরত কোথায় গিয়েছেন।
তারার আলোতে দূরে একটি মসজিদ দেখতে পেলাম। হযরতের খুঁজতে আমি সেদিকে গেলাম। মসজিদের বারান্দায় পা রাখতেই হযরতের আওয়াজ কানে আসলো। মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করছেন আর আপন প্রভুর দাসত্বের হাজিরী হিসেবে আমল করে যাচ্ছেন। হযরতের আওয়াজে ক্রন্দন ও কম্পন ছিলো আর কণ্ঠস্বর ছিলো ডর ও ভয় মিশ্রিত।
ভয়ে আমার শরীরে ঘাম এসে গেলো আর আমি নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলাম। ধিক! তোর যৌবনের প্রতি, হযরত এই বৃদ্ধ বয়সে দুর্বলতা সত্ত্বেও এতো কর্মক্ষম আর তুই এই ভরা যৌবনেও দুর্বল ও অক্ষম। ১৪৬

ছাত্রদের একটি ভ্রান্ত ধারণা
ছাত্রদের মধ্যে এই ধারণা কাজ করে যে, এখন তো পড়ালেখা করছি, যখন পড়ালেখা শেষ হয়ে যাবে তখন কোমর বেঁধে ইবাদতে নেমে যাবো। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা।
যে গুনাহ আজ ছাড়তে পারছো না, তা কখনোই ছাড়তে পারবে না। যে ইবাদত আজ করতে পারছো না, তা কখনোই আর করতে পারবে না। নিজের প্রতি আজ যার নিয়ন্ত্রণ নেই, কালও তুমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বরং আজ আমল করা সহজ। যত সময় অতিবাহিত হবে ধীরে ধীরে খারাপ অভ্যাসগুলো অন্তরে গেঁথে যাবে। ১৪৭ জনৈক কবি বলেন-
إِنَّ لِلَّهِ عِبَادًا فُطُنًا + طَلَّقُوْا الدُّنْيَا وَخَافُوا الْفِتَنَا نَظَرُوا فِيهَا فَلَمَّا عَلِمُوا + أَنَّهَا لَيْسَتْ لِحَيِّ وَطَنَا جَعَلُوْا حُجَّةً وَاتَّخَذُوْا + صَالِحَ الْأَعْمَالِ فِيْهَا سُفُنَا
আল্লাহ তাআলার এমন কিছু বুদ্ধিমান বান্দা রয়েছে, যারা ফিতনা ফাসাদের ভয়ে দুনিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে। দুনিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করে তাঁরা এই ফলাফলে উপনীত হয়েছেন যে, দুনিয়া কোনো জীবন্ত মানুষের আবাসস্থল নয়। তাই তারা দুনিয়াকে এক উত্তাল সমুদ্র হিসেবে ভেবে নিয়ে সৎ আমলের কিস্তির মাধ্যমে তা পার করেছেন।

এক বৈঠকে ২৬ পারা তিলাওয়াত!
মুহাদ্দিসুল আসর হযরতুল আল্লামা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরী রহ. বলতেন, যখন আমি দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্র ছিলাম তখন একদিন একটি ছোট কাঁচা মসজিদে ফজর নামায পড়েছি, সে মসজিদে জুমআর নামায হতো না।
নামাযের পর আমি মাটিতে চাদর বিছিয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করে দিলাম। জুমআর নামাযের আগ পর্যন্ত এক বৈঠকে ছাব্বিশ পারা পড়ে ফেললাম। যেহেতু জুমআর জন্য অন্য মসজিদে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো, তাই পুরো খতম দিতে পারিনি। অন্যথায় খতম করে উঠতাম। ১৪৮
হযরত হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সময় এই পরিমাণ মনোনিবেশ করো, যেনো তিলাওয়াতের সময় তোমার অবস্থা এমন হয় যে, তুমি মনে করবে, এই তিলাওয়াত আমি করছি না, বরং আল্লাহ তাআলা আমাকে দিয়ে পড়াচ্ছেন। যেমন, রেডিও থেকে তো আওয়াজ বের হয় কিন্তু এই আওয়াজ সেই রেডিও এর নয়, বরং তা কোনো মানুষের, যা এই রেডিও এর মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে। এ রকমই উপলব্ধি থাকা চাই তিলাওয়াতের সময়। ১৪৯

টিকাঃ
১৪০. লা তাহযান: ২৯।
১৪১. বরুকা বাচপন: ৬৩।
১৪২. তুহফাতুল উলামা : ১/১২৯।
১৪৩. তাযকিরাতুর রশীদ: ২/১৬।
১৪৪. মিশকাত: ১১৭, কিতাবুস সালাহ, বাবুত তাতাউউ।
১৪৫. সুনানুন নাসায়ী: ২/৯৩, কিতাবু আশারাতিন নিসা।
১৪৬. তাযকিরাতুল খলীল : ৫৬।
১৪৭. আদাবুল মুআশারাত: ২৪৫।
১৪৮. উশাকে কুরআনে কারীম কে ঈমান আফরূয ওয়াকিআত : ১৭৮।
১৪৯. মাজালিসে ইলম ও যিকির: ২/৫০।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 অন্তরে পরকালের ভয় সৃষ্টি করা

📄 অন্তরে পরকালের ভয় সৃষ্টি করা


তাকওয়া ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হক ও বাতিল চেনার যোগ্যতা অর্জন হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانَا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرُ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ ﴾
হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করার যোগ্যতা দান করবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী।১৫০
হযরত থানবী রহ. লেখেন, يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا অর্থাৎ তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করলে তোমাদেরকে পার্থক্যকারী যোগ্যতা দান করবেন। এখানে পার্থক্য বলতে আমলী ও ইলমী পার্থক্য [কাজের মাধ্যমে পার্থক্য ও জানার মাধ্যমে পার্থক্য] উভয়টিই উদ্দেশ্য।
ইলমী পার্থক্য হলো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এমন অন্তরদৃষ্টি সম্পন্ন নূর ও ঈমান দান করবেন, যার মাধ্যমে ন্যায় ও অন্যায় এর মাঝে পার্থক্য করা তোমার জন্য সহজ হয়ে যাবে।
আর আমলী পার্থক্য হলো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে শত্রুর উপর বিজয় দান করবেন এবং আখেরাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন。

এক বুযুর্গ ব্যক্তির শিক্ষণীয় একটি ঘটনা
এক বুযুর্গ ব্যক্তি এক মুসলমান অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন। ঘটনাক্রমে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে লোকটি মারা গেলো। তখন সে ঘরে একটি চেরাগ জ্বলছিলো। বুযুর্গ ব্যক্তি সাথে সাথে সেই চেরাগটি নিভিয়ে দিলেন। অতঃপর নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে তেল আনিয়ে চেরাগ জ্বালালেন। লোকেরা এই ঘটনার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন-
যতক্ষণ অসুস্থ লোকটি জীবিত ছিলো, ততক্ষণ এই চেরাগটি তার সম্পদ ছিলো। তাই চেরাগের আলো গ্রহণ করা ঠিক ছিলো। যখনই তিনি মারা গেলেন, সাথে সাথে তার সম্পদে ওয়ারিসদের মালিকানা চলে এসেছে। সুতরাং এখন এই চেরাগ ব্যবহার করার জন্য আমাদেরকে তার সকল ওয়ারিসদের অনুমতি নিতে হবে। আর তারা যেহেতু এখানে উপস্থিত নেই, তাই আমি আমার পক্ষ থেকে টাকা দিয়ে তেল কিনে চেরাগ জ্বালিয়েছি। ১৫১

উপদেশ
তুমি সবসময় তোমার লেনদেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবে। অন্যের কোনো জিনিস ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ব্যবহার করে সাথে সাথে ফেরত দিয়ে দেবে। সাথে সাথে যদি জিনিসটি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তা নিজের জিনিসপত্রের সাথে মিলিয়ে রাখবে না, সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখবে। যাতে তোমার অবর্তমানে চিনতে কষ্ট না হয়। এমনিতেই তো অনুমতি ছাড়া কারো জিনিস ব্যবহার করা গুনাহ, তবে যদি কোনো সময় কারো জিনিস ব্যবহার করো, তাহলে ব্যবহার করার পর অবিলম্বে জিনিসটি আপন স্থানে রেখে দেবে, যেনো এই ব্যাপারে মালিকের কোনো পেরেশানী না হয়। ১৫২

বাদশাহী জীবনে পরকালীন চিন্তা
খলীফা হারুনুর রশীদের এক ছেলে ছিলো, যার বয়স ছিলো আনুমানিক ১৬ বছর। সে অধিকাংশ সময় কাটাতো দুনিয়াবিমুখ বুযুর্গ ব্যক্তিদের মজলিসে ও কবরস্তানে।
কবরবাসীদের লক্ষ করে সে বলতো, তোমরা আমাদের পূর্বে এই দুনিয়াতে ছিলে, তোমরাই এই দুনিয়ার মালিক ছিলে, কিন্তু এই দুনিয়া তোমাদেরকেও ছাড়েনি; কবরে পৌঁছে দিয়েছে। হায়! যদি আমি জানতে পারতাম, কবরের জীবন কী অবস্থায় তোমাদের অতিবাহিত হচ্ছে। হায়! যদি জানতে পারতাম, কবরে তোমাদেরকে কী কী প্রশ্ন করা হচ্ছে।
সে অধিকাংশ সময় এই কবিতা আবৃতি করতো-
تَرُوْعُنِي الجَنَائِزُ كُلَّ يَوْمٍ وَيَحْزُنُنِي بُكَاءُ النَّائِحَاتِ
প্রতিদিন অসংখ্য জানাযা আমাকে ভয় দেখায়, মৃতদের জন্য জীবিতদের ক্রন্দন আমাকে চিন্তায় ফেলে দেয়।
একদিন সে তার পিতা হারুনুর রশীদের এক মজলিসে উপস্থিত হলো। সে মজলিসে উপস্থিত ছিলো সকল মন্ত্রী ও সভাসদবৃন্দ। ছেলের গায়ে ছিলো সাধারণ একটি কাপড়, মাথায় ছিলো একটি লুঙ্গি বাঁধা। শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ও সভাসদবৃন্দ বলতে লাগলো। এই পাগল ছেলের কারণে আমাদের বাদশাহ অন্যান্য বাদশার কাছে লজ্জিত হতে হচ্ছে। বাদশাহ মহোদয় যদি সতর্ক করেন, তাহলে হয়তো সে তার এই অবস্থা থেকে ফিরে আসবে। বাদশাহ এই কথা শুনে তার ছেলেকে বললো, বেটা! তুমি তো লোকদের দৃষ্টিতে আমাকে অপদস্থ করে ফেলছো?
ছেলে বাবার এ কথার কোনো উত্তর দিলো না। কিন্তু করলো কী, সেখানে একটি পাখি বসা ছিলো, সে পাখিকে বললো, সেই সত্তার কসম, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তুমি আমার হাতে এসে বসো। সাথে সাথে পাখিটি তার হাতে এসে বসে গেলো। অতঃপর পাখিটিকে বললো, এখন তুমি তোমার আপন জায়গায় চলে যাও। সাথে সাথে পাখিটি উড়ে গিয়ে আপন স্থানে চলে গেলো।
অতঃপর ছেলেটি বললো, আব্বাজান! আসল কথা হলো, আপনি দুনিয়ার প্রতি যে ভালোবাসা রাখেন, সেই ভালোবাসা আমাকে অপমানিত করে। তাই আমি ইচ্ছা করেছি, আপনার কাছ থেকে আমি চলে যাবো।
একথা বলে সে মজলিস থেকে উঠে গেলো এবং কেবল একটি কুরআন শরীফ সাথে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। যাওয়ার সময় তার মা তাকে একটি মহামূল্যবান আংটি দিলো, যাতে সে প্রয়োজনের সময় বিক্রি করে কাজে লাগাতে পারে।
সে বাড়ি থেকে বের হয়ে বসরা শহরে পৌঁছে সেখানে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে থাকে। সপ্তাহে কেবল সোমবার কাজ করতো আর বাকি ছয় দিন একদিনের মজুরী খরচ করতো। সে মজুরী নিতো এক দিরহাম ও এক দানিক তথা এক দিরহামের ছয় ভাগের এক ভাগ। এর চেয়ে কমও নিতো না, বেশিও নিতো না। আর প্রতিদিন এক দানিক খরচ করতো।
হযরত আবু আমির বসরী রহ. বলেন, আমার একটা দেওয়াল ভেঙে পড়ে গিয়েছিলো। তা পুননির্মাণের জন্য আমি একজন মিস্ত্রি খোঁজ করছিলাম। এক ব্যক্তি তার দিকে ইশারা করে আমাকে বললো, এই লোকটি রাজমিস্ত্রির কাজ করে, আমি তাকিয়ে দেখলাম, খুবই সুন্দর একটি ছেলে বসে আছে। তার কাছে একটি থলে পড়ে আছে আর সে কুরআন শরীফ দেখে দেখে পড়ছিলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে ছেলে! তুমি কি কাজ করবে? সে বললো, কেনো নয়? কাজ করার জন্যই তো জন্ম গ্রহণ করেছি। আপনি বলুন, আমার দ্বারা কোন সেবা আপনি নেবেন?
আমি তাকে বললাম, ঘর তৈরি করার কাজ করাতে চাই। সে বললো, এক দিরহাম ও এক দানিক মুজুরী লাগবে এবং নামাযের সময় কাজ করতে পারবো না।
আমি তার দেওয়া শর্ত মেনে নিয়ে তাকে কাজে নিয়ে নিলাম। মাগরিবের সময় আমি দেখলাম, সে একাই দশজন কর্মচারীর কাজ করেছে। তাই আমি তাকে দুই দিরহাম মজুরী দিলাম, কিন্তু সে তার শর্তের চেয়ে বেশি নিতে অস্বীকার করলো। বরং সে এক দিরহাম ও এক দানিক নিয়ে চলে গেলো। দ্বিতীয় দিন আমি তার খোঁজে বের হলাম, তাকে আমি কোথাও পেলাম না। খোঁজ নেওয়ার জন্য আমি মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করলাম। একটি ছেলে শ্রমিক ছিলো, কেউ কি জানো, সে কোথায় আছে? কোথায় তাকে পাওয়া যাবে?
লোকেরা বললো, সে শুধু সোমবারে কাজে আসে। এর পূর্বে আপনি তাকে কোথাও পাবেন না। তার কাজের প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি হলো, যারফলে আমি ছয়দিন যাবত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখলাম। ছয়দিন পর সোমবার দিন তার খোঁজে বের হয়ে তাকেপেয়ে গেলাম। পূর্বের ন্যায় তাকে কুরআন শরীফ তিলাওয়াতরত দেখতে পেলাম। আমি তাকে সালাম দিয়ে কাজ করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। সে পূর্বের ন্যায় দুটি শর্তে রাজি হলো। আমিও তার শর্ত মেনে নিলাম।
সে আমার সাথে এসে কাজে লেগে গেলো। আমার ভেতর এই কৌতূহল কাজ করছিলো যে, গত সোমবারে সে একা কীভাবে দশজনের কাজ করলো। তাই এই বার আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে তার কাজ করার অবস্থা দেখছিলাম। আমি দেখতে পেলাম, সে হাত দিয়ে দেয়ালের উপর সিমেন্টের মিশ্রণ দিচ্ছে আর ইট একটি আরেকটির সাথে আপনা আপনি জোড়া লেগে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস হয়ে গেলো, সে আল্লাহর ওলী হবে। আর আল্লাহর ওলীদের কাজে গায়েব থেকে সাহায্য আসে।
যখন সন্ধ্যা হলো আমি তাকে তিন দিরহাম দিতে চাইলাম, সে নিতে অস্বীকার করলো। সে বললো, এতো দিরহাম দিয়ে আমি কী করবো। অতঃপর এক দিরহাম ও এক দানিক নিয়ে সে চলে গেলো। আমি আবার এক সপ্তাহ অপেক্ষা করলাম এবং তৃতীয় সোমবার তার খোঁজে বের হলাম, কিন্তু তাকে পেলাম না। লোকদের মাঝে আমি তাকে খোঁজ করলাম। তখন এক ব্যক্তি আমাকে বললো, সে তিনদিন যাবত অসুস্থ। অমুক বিরান জঙ্গলে সে পড়ে আছে।
আমাকে সে জঙ্গলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমি এক ব্যক্তিকে মজুরী দিয়ে রাজি করালাম। সে ব্যক্তি আমাকে সাথে করে নিয়ে সেই নির্জন জঙ্গলে পৌঁছলো। আমি দেখলাম, ছেলেটি বেঁহুশ হয়ে পড়ে আছে। অর্ধেক ইটের টুকরা মাথার বালিশ। আমি তাকে সালাম দিলাম, সে সালামের উত্তর দিলো না। আমি তাকে দ্বিতীয়বার সালাম দিলাম, তখন সে চোখ খুললো ও আমাকে চিনে ফেললো। আমি দ্রুত তার মাথাটা ইট থেকে নিয়ে আমার কোলে রাখলাম। সে মাথা সরিয়ে ফেললো এবং কয়েকটি কবিতা পাঠ করলো, যার উল্লেখযোগ্য দুটি পংক্তি হলো-
يَا صَاحِبِي لَا تَغْتَرِرْ بَتَنَعَمِ ، فَالْعُمْرُ يَنْفَدُ وَالنَّعِيمُ يَزُولُ وَإِذَا حَمَلْتَ إِلَى الْقُبُوْرِ جَنَازَةً ، فَاعْلَمْ بِأَنَّكَ بَعْدَهَا مَحْمُوْلُ
হে আমার দোস্ত! দুনিয়ার ভোগবিলাসের ধোঁকায় পড়ো না। বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই সব ভোগবিলাসও নিঃশেষ হয়ে যাবে।
যখন তুমি কোনো মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কবরস্তানে যাবে, তখন এই বিশ্বাস করে নিয়ো যে, তোমাকে একদিন এভাবে বহন করে নিয়ে যাওয়া হবে।
অতঃপর সে আমাকে বললো, হে আবু আমির! যখন আমার রূহ বের হয়ে যাবে, তখন আমাকে আমার এই কাপড়ে দাফন দেবে। আমি বললাম, হে আমার প্রিয়তম! আমি তোমার জন্য নতুন কাফনের ব্যবস্থা করবো, এতে তেমন উল্লেখযোগ্য খরচ হবে না।
সে উত্তর দিলো, নতুন কাপড়ের ব্যাপারে জীবিত লোকেরা বেশি অধিকার রাখে। [হুবহু এমন উত্তর হযরত আবু বকর রা. দিয়েছিলেন। তিনিও মৃত্যু শয্যায় অসিয়্যাত করেছিলেন, আমাকে এই পুরাতন চাদর দিয়ে কাফন দিয়ে দেবে। যখন তাঁর কাছে নতুন কাপড়ের জন্য অনুমতি চাওয়া হলো, তখন হযরত আবু বকর রা. উপরোক্ত উত্তরই দিয়েছিলেন।]
যুবকটি বললো, কাফন পুরনো হোক বা নতুন তা তো বিলীন হয়েই যাবে। মানুষের সাথে কেবল তার আমলই থাকবে।
অতঃপর সে বললো, এই লুঙ্গি ও বদনাটা আমার কবর খননকারীদের মজুরী হিসেবে দিয়ে দেবেন। আর আমার আংটি এবং কুরআন শরীফটি হারুনুর রশীদের কাছে পৌঁছে দেবেন। তার হাতেই যেনো এগুলো দেওয়া হয়। তাকে বলবেন, এই জিনিসগুলো এক অপরিচিত যুবক আমার কাছে আমানত রেখে বলেছে, এগুলো যেনো আপনার হাতে পৌঁছে দিই। আর সে আপনাকে বলেছে, এরকম যেনো না হয় যে, উদাসীনতা ও ধোঁকার মধ্যে আপনার মৃত্যু এসে গেছে।
আবু আমির বসরী রহ. বলেন, তখন আমি বুঝতে পেরেছি, এই যুবক বাদশার ছেলে। তার মৃত্যুর পর তার অসিয়্যাত অনুযায়ী দাফন করেছি। আর লুঙ্গি ও বদনা কবর খননকারীদের দিয়েছি। আর কুরআন শরীফ ও আংটি নিয়ে আমি বাগদাদে পৌঁছলাম।
যখন আমি রাজপ্রাসাদের নিকট পৌঁছলাম, তখন বাদশাহ ঘোড়ায় চড়ে বের হচ্ছিলেন। আমি একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখলাম, প্রথমে অনেক বড় একটি সৈন্যদল বের হলো, যাতে প্রায় এক হাজার ঘোড়সাওয়ার ছিলো। একের পর এক, এরকম দশটি সৈন্যদল বের হলো। প্রত্যেকটিতে প্রায় এক হাজার করে সাওয়ারী ছিলো। দশম বাহিতে বাদশাহ নিজে ছিলেন। আমি উচ্চস্বরে আওয়ায দিয়ে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পারিবারিক সম্পর্কের কসম, আপনি একটু থামুন! আমার আওয়াযের কারণে তিনি আমাকে দেখলেন। আমি দ্রুত তার কাছে গিয়ে বললাম, আমার কাছে একজন অপরিচিত যুবকের আমানত রয়েছে, সে আমাকে অসিয়্যাত করেছে, এই দুটি জিনিস আপনার কাছে পৌঁছে দিতে।
বাদশাহ এগুলো দেখে চিনে ফেললেন। অতঃপর কিছুক্ষণ মাথা নত করে রাখলেন। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিলো। তিনি একজন দারোয়ানকে বললেন, এই লোকটিকে তোমার সাথে রাখো। ফিরে এসে যখন আমি তাকে ডাকবো, তখন আমার কাছে তুমি তাকে নিয়ে আসবে।
অতঃপর যখন তিনি বাইর থেকে রাজপ্রাসাদে ফিরলেন, তখন নিজ কামরার পর্দা টেনে দিয়ে দারোয়ানকে বললেন, সে ব্যক্তিকে ডেকে আনো, যদিও সে আমার দুঃখকে তাজা করবে। দারোয়ান আমার কাছে এসে বললো, আমীরুল মুমিনীন আপনাকে ডেকেছেন, তবে শুনুন, আমীরুল মুমিনীনের আঘাত পাওয়ার চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছে। অতএব যদি আপনার দশটি কথা বলার ইচ্ছা থাকে তাহলে পাঁচটি কথা বলে যথেষ্ট করবেন। এই কথা বলে সে আমাকে বাদশার কাছে নিয়ে গেলো।
সে সময় বাদশাহ একেবারে একা বসা ছিলেন। আমাকে বললেন, আমার নিকট আসো। আমি তার নিকটে গিয়ে বসলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বলতে শুরু করলেন, তুমি কি আমার ছেলেকে চিনতে? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি তাকে চিনতাম।
সে কী কাজ করতো? রাজমিস্ত্রির কাজ। তুমিও কি তার দ্বারা কোনো নির্মাণ কাজ করিয়েছো। হ্যাঁ, করিয়েছি।
তোমার কি এই চিন্তা হলো না যে, তার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচা হযরত আব্বাস রা. এর বংশধর।]
আমি বললাম, আমীরুল মুমিনীন! প্রথমত আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি, অতঃপর আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি তখন জানতাম না যে, সে আসলে কে? তার মৃত্যুর সময় আমি তার আসল অবস্থা জানতে পেরেছি।
অতঃপর বাদশাহ বললো, তুমি কি নিজ হাতে তাকে গোসল দিয়েছো?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
তোমার হাতটা দাও। এই বলেই খলীফা আমার হাতটা তার বুকে চেপে ধরলেন।
অতঃপর দুঃখ প্রকাশ করে কিছু কবিতা আবৃত্তি করলেন। তারপর তার কবরে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। আবু আমির তাঁর সাথে ছিলেন। তার কবরের কাছে পৌঁছে হারুনুর রশীদ কয়েকটি কবিতা পাঠ করলেন, যেগুলোর অর্থ হলো-
হায়! সে এমন এক মুসাফির, যে আপন সফর থেকে কখনোই ফিরে আসবে না। কম বয়সেই মৃত্যু তাকে কেড়ে নিয়েছে।
হে আমার চোখের প্রশান্তি! তুমি আমার জন্য ভালোবাসা ও হৃদয়ের শান্তি ছিলে, দীর্ঘ রাতে এবং সংক্ষিপ্ত রাতে।
তুমি মৃত্যুর এমন এক পেয়ালা পান করেছো, যা অচিরেই তোমার বৃদ্ধ বাবা বৃদ্ধ বয়সে পান করবে। এমনকি দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তিই তা পান করবে। চাই সে জঙ্গলে বসবাসকারী হোক বা শহরে বসবাসকারী।
ব্যস, সকল প্রশংসা সেই সত্তার, যিনি একক, যাঁর কোনো শরীক নেই। যাঁর লেখা তাকদীরের মাঝেই রয়েছে এই কারিশমা।
আবু আমির রহ. বলেন, এই ঘটনার পরবর্তী রাতে যখন আমি আমার দৈনন্দিন আমল শেষ করে মাত্র ঘুমালাম, তখন আমি স্বপ্নে একটি নূরের গম্বুজ দেখতে পেলাম, যার উপরে মেঘমালার ন্যায় নূর আর নূর ছড়ানো ছিলো। সেই নূরের মেঘ থেকে ওই যুবক আমাকে ডাক দিয়ে বললো, হে আবু আমির, তোমাকে আল্লাহ তাআলা উত্তম বিনিময় দান করুন। তুমি আমার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেছো এবং আমার অসিয়্যাত পুরা করেছো।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আমার প্রিয়তম! তোমার অবস্থা কী?
সে বলতে লাগলো, আমি এমন মাওলার কাছে পৌঁছেছি, যিনি অত্যন্ত দয়ালু, তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট। আমার মাওলা আমাকে এমন জিনিস দিয়েছেন, যা কখনো কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান যার ব্যাপারে কিছু শুনেনি আর না কোনো ব্যক্তির হৃদয় তার ব্যাপারে চিন্তা করেছে। এটা একটি প্রসিদ্ধ হাদীসের অংশ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন নিআমত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা না কোনো চোখ কখনো তা দেখেছে, না কোনো কান তা কখনো শুনেছে, না কারো হৃদয়ে সেই জিনিসের কথা উদয় হয়েছে। ১৫৩
এই ব্যাপারে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, আল্লাহ তাআলাও তার সাথে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা করেন। ১৫৪
এ রকম ব্যক্তি তো সর্বদা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমান থাকে এবং মুখে মুখে একথা বলতে থাকে غَدًا نَلْقِي الْأَحِبَّةَ مُحَمَّدًا وَحِزْبَهُ - আমি আগামীকালই আমার বন্ধু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাদের সাথে সাক্ষাত করবো।
এমন মৃত্যুর জন্য সারাটি জীবন শরীআত ও সুন্নাতের অনুসরণে অতিবাহিত করতে হয় এবং সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। অতএব আসুন, কিছুটা সময় দুনিয়াবী সকল ব্যস্ততা থেকে ফারিগ হয়ে মৃত্যুর চিন্তা করি যে, মৃত্যু অবশ্যই আসবে, যেকোনো সময় আসতে পারে, এর জন্য আমি কতটুকু প্রস্তুত আছি। ১৫৫

জীবনের উদ্দেশ্য
হযরত বাহলুল রহ. বলেন, আমি একবার বসরা শহরের এক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তার মাঝে কয়েকটি ছেলে আখরোট ও বাদাম নিয়ে খেলছিলো। অন্য একটি ছেলে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলো। আমি মনে করলাম, তার কাছে বাদাম ও আখরোট না থাকায় হয়তো সে কান্না করছে। আমি তাকে বললাম, বাবা! আমি তোমাকে বাদাম ও আখরোট কিনে দেবো, তুমিও তাদের সাথে খেলা করবে।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আরে বেকুফ! আমরা কি খেলাধুলা করার জন্য সৃষ্ট হয়েছি? আমি বললাম, তাহলে কোন কাজের জন্য সৃষ্ট হয়েছো? সে বললো, ইলম অর্জন করতে ও সেই মুতাবিক ইবাদত করতে। আমি বললাম, আল্লাহ তাআলা তোমার জীবনে বরকত দান করুন, তুমি এই কথা কোথা থেকে জানতে পেরেছো? সে বললো, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ﴾ তোমরা কি মনে করেছো, আমি তোমাদেরকে এমনি এমনি সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করানো হবে না? ১৫৬
আমি বললাম, বেটা! তোমাকে তো বড় জ্ঞানী মনে হচ্ছে, তুমি আমাকে কিছু উপদেশ দাও।
অতঃপর সে চারটি কবিতা আবৃতি করলো, যার অর্থ হলো- আমি লক্ষ করছি, দুনিয়া দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। আজকের দিন একটু পরই গতকাল হয়ে যাবে। সর্বদায় আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকি।
না এই দুনিয়া কোনো জীবিত ব্যক্তির জন্য বাকি থাকবে আর না কোনো জীবিত ব্যক্তি এই দুনিয়ার জন্য বাকি থাকবে।
আমার মনে হয়, মৃত্যু ও আকস্মিক দুর্ঘটনা দুটি ঘোড়া, যে দুটি মানুষের দিকে দ্রুত ছুটে আসছে।
অতএব ওহে দুনিয়ার মোহে আচ্ছন্ন ও বুদ্ধিহীন লোক! একটু চিন্তা করো আর পরকালের জন্য দুনিয়া থেকে নিজের জন্য এমন পাথেয় উপার্জন করে নাও, যা আখেরাতের জীবনে উপকারে আসবে।
এই পংক্তিগুলো পাঠ করে ছোট্ট শিশুটি আসমানের দিকে তাকিয়ে দুই হাত উপরে উঠালো, তখন অশ্রুধারা তার গণ্ডদেশে প্রবাহিত হচ্ছিলো। অতঃপর আরো দুটি কবিতা আবৃতি করলো,
يَا مَنْ إِلَيْهِ الْمُبْتَهَلْ ، يَا مَنْ عَلَيْهِ الْمُتَّكَلُ ، يَا مَنْ إِذَا مَا آمِلُ يَرْجُوهُ لَمْ يَخْطُ الْأَمَلُ
হে সেই সত্তা, যাঁর কাছে বিনয় প্রকাশ করা যায় এবং যাঁর উপরই ভরসা করা যায়। হে সেই পবিত্র সত্তা, যখন কোনো ব্যক্তি তার প্রতি আশা করে, তবে সে কখনো নিরাশ হয় না, তার আকাঙ্ক্ষা অবশ্যই পূরণ হয়।
এই কবিতাদ্বয় পাঠ করে ছেলেটি বেঁহুশ হয়ে পড়ে গেলো। আমি জলদি করে তার মাথা আমার কোলে তুলে নিলাম এবং তার চেহারায় যে মাটি লেগেছিলো তা আমার আস্তিন দ্বারা মুছতে লাগলাম।
তার জ্ঞান ফিরার পর তাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, বেটা! এই বয়সে তোমার এতো ভয় কিসের? এখনো তো তুমি অনেক ছোট্ট। এই বয়সে তো তোমার আমলনামায় এখনো গুনাহ লেখা হচ্ছে না।
সে বলে উঠলো, বাহলুল! তুমি দূর হও। আমি আমার আম্মাকে সবসময় দেখি, যখন তিনি আগুন জ্বালাতে চান, তখন প্রথমে ছোট ছোট কাঠের টুকরাগুলো চুলায় রাখেন, অতঃপর বড় লাকড়ি রাখেন। আমার ভয় হয়, জাহান্নামে আগুনে ছোট কাঠের স্থানে আমাকে না জানি রেখে দেওয়া হয়।
আমি তাকে বললাম, বাবা! তোমাকে বড়ই প্রজ্ঞাবান মনে হচ্ছে, আমাকে সামান্য কিছু উপদেশ দাও। অতঃপর সে এই ব্যাপারে আরো চৌদ্দটি কবিতা পাঠ করলো, যেগুলোর অর্থ হলো- আমি উদাসীনতায় পড়ে আছি, অথচ মৃত্যু আহ্বানকারী ফেরেশতা আমার পিছে পিছে চলছে মৃত্যুকে আহ্বান করতে। আমি যদি আজ নাও যাই, তবে আগামীকাল অবশ্যই চলে যেতে হবে।
আমি আমার শরীরকে ভালো ভালো ও নরম নরম কাপড় দ্বারা সুসজ্জিত করেছি। অথচ মৃত্যুর পর নিঃসন্দেহে আমার শরীর গলে ও পচে যাবে। এই দৃশ্যটি মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে। এমনকি কবর দেশে আমি পচে ধ্বংস হয়ে পড়ে থাকবো।
আমার উপর মাটির স্তূপ হয়ে থাকবে আর নিচে থাকবে কবরের একটি গভীর গর্ত। শেষ হয়ে যাবে আমার এই সৌন্দর্য ও লাবণ্য, সবই শেষ হয়ে যাবে। আমি একদম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো। আমার হাড্ডির উপর না কোনো গোশত থাকবে, না কোনো চামড়া থাকবে।
আমি দেখছি, দ্রুত আমার জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে আর ইচ্ছা-বাসনাগুলো বাকি থেকে যাচ্ছে। আমি দীর্ঘ সফরের যাত্রী, অথচ সামান্য পাথেয়ও আমার সাথে নেই। অন্য দিকে আমি প্রকাশ্যঅসংখ্য গুনাহ করে আমার রক্ষাকারী ও পর্যবেক্ষণকারী সত্তা আল্লাহ তাআলার বিরোধিতা করছি এবং জঘন্য খারাপ কাজ করে যাচ্ছি, যার ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।
অথচ আমি লোকদের থেকে নিজের অপরাধ গোপন করার পর্দা টেনে দিয়েছি, যাতে তা কারো সামনে প্রকাশ না পায়। অথচ আমার যত গোপন গুনাহ রয়েছে, এর সবগুলোই কাল হাশরের মাঠে মালিকের সামনে প্রকাশ পেয়ে যাবে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর ব্যাপারে আমার অবশ্যই ভয় ছিলো কিন্তু তাঁর সহনশীলতার প্রতি অগাধ আস্থা ছিলো, যাঁর কারণে দুঃসাহস করে ফেলি এবং তাঁর প্রতি এই আশা ছিলো যে, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি ছাড়া ক্ষমা করার অধিকার কে রাখেন। অবশ্যই সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য।
যদি মৃত্যু ও মৃত্যুর পর পচে গলে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিপদ না হতো, তবুও দুনিয়াবী জীবনের কৌতুক থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের আকল ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, আমরা কোনো কথার দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ করি না। ব্যস, এখন এই আশা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই যে, হায়, যদি গুনাহ ক্ষমাকারী আমাকে ক্ষমা করেন。
যখন কোনো গোলামের কোনো অপরাধ হয়ে যায় তাহলে তার মালিকই তো তাকে ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই আমি আপনার এক নিকৃষ্টতম বান্দা, যে তার মালিকের প্রতিশ্রুতিতে খেয়ানত করেছে, আর অযোগ্য গোলাম এমনই হয় যে, তাঁর কোনো কথা ও প্রতিশ্রুতি ঠিক থাকে না।
হে আমার মালিক! যখন তোমার আগুন আমার শরীরকে জ্বালিয়ে দেবে, তখন আমার কী পরিণতি হবে, যখন শক্ত থেকে শক্ত পাথরও সেই আগুনের তাপ সহ্য করতে পারবে না। মৃত্যুর সময় আমি একাকী রয়ে যাবো। কবরেও একাই যাবো। কবর থেকেও একাই উঠবো। কোথাও আমার কোনো সহকারী থাকবে না। অবশেষে হে পবিত্র সত্তা! যিনি একক, যাঁর কোনো শরীক নেই, তুমি এমন এক ব্যক্তির প্রতি দয়া করো, যে সম্পূর্ণ একা রয়ে গেছে।
বাহলুল রহ. বলেন, তার এই কবিতাগুলো আমার উপর এমন প্রভাব বিস্তার করেছে যে, আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলাম। অনেক্ষণ পর যখন আমার হুঁশ ফিরে আসলো, তখন ছেলেটি চলে গিয়েছিলো। আমি অন্যান্য বাচ্চাদেরকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা বললো, আপনি তাকে চিনেন না? সে তো হযরত হুসাইন রা. এর বংশধর। আমি বললাম, আমার চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম যে, এই ফল কোন গাছের? আসলে এই ফল এমন গাছেরই হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই বংশধর থেকে উপকার লাভ করার তাওফীক দান করুন। আমীন। ১৫৭

প্রকৃত আলেম কে?
হযরত মাওলানা মুফতী শফী রহ. বলেন, এক ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, আলেম কে? তিনি বললেন, العالم العامل ، راغب إلى الآخرة ، زاهد في الدنيا আলেম সেই ব্যক্তি, যে আমলওয়ালা, আখেরাতের প্রতি যিনি আগ্রহী এবং দুনিয়ার প্রতি যিনি অনাগ্রহী। ১৫৮

আল্লাহ তাআলার ভয়
এক বুযুর্গ ব্যক্তি এক ছাত্রের ঘটনা শুনিয়েছেন, ছাত্রটি দিল্লিতে পড়ালেখা করতো এবং দিল্লির এক মহল্লার মসজিদে থাকতো। এক মহিলা সেই মহল্লায় তার এক আত্মীয়ের সাথে সাক্ষাত করতে আসলো, হঠাৎ সেই এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গেলে মহিলাটি অনন্যোপায় হয়ে ওই মসজিদে আশ্রয় নিলো। সময়টি ছিলো রাতের বেলা।
ছাত্রটি তাকে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে তার কাছে ওযর পেশ করে বললো, আপনার এখানে থাকা ঠিক হবে না। লোকেরা দেখলে আমার বদনাম হয়ে যাবে। আমাকে মসজিদ থেকে বের করে দেবে। এতে আমার পড়ালেখায় বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হবে।
মহিলাটি বাইরের অবস্থার কথা জানিয়ে বললো, এই অবস্থায় বাইরে বের হওয়া ঠিক হবে না। এতে আমার ইজ্জত আব্রু ও জীবন নাশের আশঙ্কা রয়েছে। ছাত্রটি একথা শুনে চুপ হয়ে গেলো এবং তাকে বললো, তুমি মসজিদের এক কোনায় বসে থাকো। আর নিজে তার কামরায় ঢুকে কিতাব অধ্যয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সে সারা রাত কিতাব অধ্যয়ন করলো। আর অধ্যয়নের মাঝে বার বার বাতির আগুনে তার আঙ্গুল দিচ্ছিলো। সারা রাত এভাবেই কাটালো।
যখন সকাল হওয়ার উপক্রম হলো, তখন ছাত্রটি বললো, বিশৃঙ্খলাকারীরা নিজেদের ঘরে চলে গেছে। এখন রাস্তা খালি, আসুন, আপনাকে আমি আপনার ঘরে পৌঁছে দিই। মহিলাটি বললো, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত যাবো না, যতক্ষণ না আপনি এই ঘটনার রহস্য না বলবেন যে, কী কারণে আপনি বার বার বাতির আগুনে আপনার আঙ্গুল প্রবেশ করাচ্ছিলেন।
ছাত্রটি বললো, আপনার এই সব জানার কী দরকার? আপনি এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে যাবেন না। কিন্তু মহিলা নাছোড় বান্দা; রহস্য জানার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলো। ছাত্রটি বললো, শয়তান বার বার আমাকে আপনার ব্যাপারে কুমন্ত্রণা দিচ্ছিলো এবং আপনার সাথে খারাপ কাজ করতে আমাকে উৎসাহিতকরছিলো, তাই আমি আঙ্গুল আগুনে রেখে আমার নফসকে বলছিলাম, এই পৃথিবীর সামান্য আগুন সহ্য করতে পারছো না, তাহলে জাহান্নামের আগুনের ব্যাপারে কীভাবে দুঃসাহস দেখাচ্ছো? আল্লাহ তাআলার শুকর যে, আল্লাহ তাআলা আমাকে হিফাযত করেছেন।
মহিলা এসব শুনে ঘরে চলে আসলো। সে এক ধনী লোকের মেয়ে ছিলো। তার বিয়ে আরেক ধনী লোকের ছেলের সাথে হওয়ার কথা চলছিলো। সে উক্ত ছেলেকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালো এবং পিতামাতাকে বললো, আমি অমুক ছাত্রের সাথে নিজেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাই। তার পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজন তাকে বুঝাতে লাগলো, ছাত্রটিকে বিয়ে না করতে। অনেকে এই মেয়ে ও ছাত্রটির ব্যাপারে খারাপ ধারণাও করতে লাগলো। যখন মেয়ে বুঝতে পারলো যে, তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা হচ্ছে তখন সে পুরো ঘটনা শুনিয়ে বললো, আমি কেবল তাকেই বিয়ে করবো। কেননা, তার হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার ভয় রয়েছে আর যার হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার ভয় থাকে সে কাউকে কষ্ট দেয় না।
অবশেষে মেয়েটির বিয়ে সেই ছাত্রের সাথেই হলো। ফলে ছাত্রটি সেই ঘরের মালিক হয়ে গেলো। ১৫৯

উপদেশ
মানুষের উচিত, প্রতিদিন একটা সময় মৃত্যু, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করা। এতে অন্তরে কোমলতা ও ভয় সৃষ্টি হবে। ফলে নেক কাজের প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি হবে এবং গুনাহ ত্যাগ করাও সহজ হয়ে যাবে। ১৬০ তাকওয়া অর্জনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শেখানো নিচের দুআটি গুরুত্বের সাথে পড়তে হবে।
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَهَا وَزَكَّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّهَا ، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে তাকওয়া দান করুন এবং অন্তরকে পবিত্র করুন। আপনিই সর্বোত্তম পবিত্রকারী, আপনিই এই নফসের মালিক ও তত্ত্বাবধায়ক। ১৬১

টিকাঃ
১৫০. সূরা আনফাল: ২৯।
১৫১. মাআরিফুল কুরআন: ২/৩১৭, সূরা নিসা: ১০।
১৫২. আদাবুল মুআশারাত: ১৮৮।
১৫৩. নুযহাতুল বাসাতীন: ৬৮-৭২, হিকায়াত নং-১৮।
১৫৪. সহীহ বুখারী : ২/৯৬৩, কিতাবুর রিকাক, বাবু মান আহাব্বা লিকাআল্লাহ।
১৫৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/২৮০।
১৫৬. সূরা মুমিনুন: ১১৫।
১৫৭. নুযহাতুল বাসাতীন: ১০২-১০৩, হিকায়াত নং-৫৬।
১৫৮. মাজালিসে মুফতিয়ে আযম : ৫৯।
১৫৯. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ২৩।
১৬০. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/১৭১।
১৬১. মুসনাদে আহমাদ : ৫/৪৯৯।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 অন্যের সংশোধনের ফিকির করা

📄 অন্যের সংশোধনের ফিকির করা


আমরা তালিবে ইলম। আমরা নবীদের ইলম অর্জন করছি। আমাদের দায়িত্ব সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। যাদের কুরআন ও সুন্নাহর ইলম নেই, তারা মানুষকে পরিচালনা করার যোগ্য নয়। কেননা, মানুষকে পথ দেখানো ও পরিচালনা করা কুরআন ও সুন্নাতের সাথে সম্পৃক্ত।
এই জন্য সাধারণ লোকের জন্য আলেমদের দেখানো পথে চলা এবং আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া ফরয। আর পথ দেখানো দায়িত্ব কেবল একজন আলেমে রব্বানী-ই আদায় করতে পারেন, যারা খুলুসিয়্যাত ও নিষ্ঠার সাথে কুরআন ও হাদীসে অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন।

ফারুকে আযমের উপদেশ
হাফিয ইবনে কাসীর রহ. ইবনে আবী হাতিম রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, শাম দেশে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলো। লোকটি ফারূকে আযমের কাছে প্রায়ই আসতেন। হঠাৎ কিছুদিন লোকটি আসছিলো না। তাই উমর রা. লোকদের কাছে তার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। লোকেরা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! তার কথা আর জিজ্ঞেস করবেন না। সে তো মদ পান করে সারাদিন মাতাল হয়ে থাকে।
উমর ফারুক রা. রাজলেখককে ডেকে বললেন, একটি চিঠি লেখো-
من عمر بن الخطاب إلى فلان بن فلان ، سلام عليك فإني أحمد إليك الله الذي لا إله إلا هو ، غافر الذنب وقابل التوب شديد العقاب ذي الطول لا اله إلا هو ، إليه المصير.
উমর ইবনে খাত্তাবের পক্ষ থেকে অমুকের ছেলে অমুকের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। পর সংবাদ, আমি আপনার কাছে আল্লাহ পাকের প্রশংসা পাঠ করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি গুনাহসমূহ ক্ষমাকারী। তাওবা কবুলকারী। কঠিন শাস্তি দানকারী। বড় কুদরতের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তার দিকেই সকলে প্রত্যাবর্তিত হবে।
অতঃপর তিনি মজলিসের সকলকে বললেন, তোমরা সকলে দুআ করো, আল্লাহ তাআলা যেনো তার অন্তরকে ফিরিয়ে দেন এবং তার তাওবা কবুল করেন।
ফারুকে আযম রা. যেই বার্তাবাহকের হাতে এই চিঠিটি পাঠিয়ে ছিলেন, তাকে বলে দিলেন, এই চিঠিটি তার হাতে ততক্ষণ দেবেন না, যতক্ষণ না সে তার নেশা থেকে হুঁশে ফিরে না আসে এবং অন্য কারো মাধ্যমে নয়; বরং আপনি সরাসরি তাঁর হাতে দেবেন।
যখন লোকটির হাতে ফারূকে আযমের চিঠি পৌঁছলো, সে বার বার চিঠির শব্দগুলো পাঠ করছিলো আর চিন্তা করছিলো, এই চিঠিতে আমাকে শাস্তির ব্যাপারে ভয়ও দেখানো হয়েছে আবার আমাকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। চিঠিটি পড়ে দীর্ঘ সময় তিনি কান্না করলেন এবং মদ পান করা থেকে ফিরে আসলেন এবং এমনভাবে তাওবা করলো যে, জীবনে আর কখনো মদের কাছেও যাননি।
হযরত উমর ফারূক রা. এর কাছে যখন তার পরিবর্তনের সংবাদ আসলো, তখন তিনি উপস্থিত লোকদের বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি বিভ্রান্ত হয়ে গুনাহের সাগরে হাবুডুবু খাবে তখন তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার ফিকির তোমাদের করা উচিত। এ ক্ষেত্রে তোমরা তাকে আল্লাহ পাকের রহমত ও দয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দাও এবং তার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতো থাকো, যেনো সে তাওবা করে সুপথে ফিরে আসে।
এ ব্যাপারে তোমরা শয়তানের সাহায্যকারী হবে না; তাকে উল্টাপাল্টা বলে রাগান্বিত করে ইসলাম থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেবে না। ১৬২

উপদেশ
যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে গুনাহে লিপ্ত দেখো, তখন তোমার ফরয হচ্ছে, তাকে বাধা প্রদান করা। তবে তোমার যদি নিশ্চিত জানা থাকে যে, তাকে বাধা দিলে সে গুনাহ থেকে তো ফিরে আসবেই না, বরং উল্টো শরীআত নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা শুরু করবে এবং দীন ও ধর্মকে অপদস্ত করবে। এমনকি সে কুফুরীতে পতিত হতে পারে। কারণ, শরীআতের ও ধর্মের কোনো হুকুমকে অপদস্ত করা কেবল গুনাহই নয়, বরং তা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে কাফির বানিয়ে দেয়।
এ কারণেই যদি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, যদি ওই ব্যক্তিকে এই মুহূর্তে গুনাহ থেকে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে সে শরীআতের হুকুমকে অপদস্ত করবে, তাহলে এমন পরিস্থিতিতে النهي عن المنكر এর ফরযিয়্যাত বাতিল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে তাকে বাধা না দিয়ে নিজেকে উক্ত গুনাহ থেকে সরিয়ে রাখতে হবে এবং তার জন্য এই দুআ করতে হবে, হে আল্লাহ! আপনার এই বান্দা অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে আছে। আপনি নিজ অনুগ্রহ ও দয়ায় তাকে এই অসুস্থতা থেকে বের করে সুস্থতার জীবন দান করুন।' ১৬৩

জ্ঞানী সুলভ পন্থা
হযরত হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানবী রহ.-কে আল্লাহ তাআলা চরিত্র সংশোধনের বিশেষ এক যোগ্যতা দান করেছিলেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেকমতপূর্ণ পদ্ধতি দান করেছিলেন। উর্দু ভাষার প্রসিদ্ধ কবি, প্রিয় ব্যক্তিত্ব মুহতারাম মুরাদাবাদী রহ. এর একটি ঘটনা আছে। ঘটনাটি হলো-
এক মজলিসে হযরত খাজা আযীযুল হাসান রহ. বলেন, আমি হযরত থানবী রহ.-কে বললাম, একবার আমার সাথে কবি মুরাদাবাদী এর সাক্ষাত হয়েছিলো। সে বলছিলো, থানাভবন দেখার আমার খুব শখ। কিন্তু আমি এক বিপদে আছি। আমি মদ পান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি না। ফলে আমি সেখানে যেতে পারছি না। কোন মুখ নিয়ে আমি সেখানে উপস্থিত হবো।
থানবী রহ. খাজা সাহেবকে বললেন, আপনি কী উত্তর দিয়েছেন?
খাজা সাহেব বললেন, আমি তাকে বলেছি, হ্যাঁ, এটা তো ঠিকই, এ অবস্থায় বুযুর্গদের কাছে যাওয়া ঠিক হবে না।
থানবী রহ. বললেন, তাই নাকি খাজা সাহেব! আমি তো মনে করেছিলাম, আপনি আমার পথ ও পন্থা বুঝে ফেলেছেন। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
খাজা সাহেবকে আশ্চর্য হতে দেখে থানবী রহ. বললেন, আপনি এটা বলে দিতেন, যে অবস্থায় আছেন সে অবস্থাতেই থানাভবন চলে আসুন। এমনও তো হতে পারে যে, এই সাক্ষাতই আপনার জন্য এই বিপদ থেকে মুক্তির উপায় হয়ে যাবে।
খাজা সাহেব মজলিস থেকে উঠে গেলেন। হঠাৎ একদিন কবি সাহেবের সাথে তার দেখা হলো, তখন তিনি পুরো ঘটনা কবি সাহেবকে শোনালেন। তিনি এই ঘটনা শুনে প্রচুর কাঁদলেন এবং প্রতিশ্রুতি করলেন, যদি আমি মরেও যাই, তবুও এই খারাপ জিনিসের দিকে অগ্রসর হবো না।
এমনটিই হলো। মদ ছাড়ার কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক হয়ে গেলো, তখন লোকেরা বললো, এই অবস্থায় শরীআত আপনাকে প্রয়োজন পরিমাণ মদ পান করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু কবি সাহেবের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিলো, মরে গেলেও নিকৃষ্ট জিনিসের দিকে আর হাত বাড়াবেন না।
আল্লাহ তাআলা হিম্মত ও সদিচ্ছাকারীর প্রতি সাহায্য করেন। এখানেও আল্লাহ তাআলার সাহায্য হলো। কিছুদিনের মধ্যে তিনি পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। অতঃপর তিনি থানাভবন এসেছেন। হযরত থানবী রহ. তাকে খুব সম্মানের সাথে গ্রহণ করলেন। ১৬৪

উপদেশ
শরীআতের কথা বলার সময় সর্বদা নিয়্যাত সহীহ রাখতে হবে। এমনটি মনে করা যাবে না যে, আমি সংশোধনকারী, বড় ব্যক্তি, তার চেয়ে বড় দীনদার ও মুত্তাকী। আর সেই ব্যক্তি পাপী ও অপরাধী। আমি তার সংশোধনের জন্য এসেছি।
যদি উপরোক্ত নিয়্যাতে কেউ দাওয়াত দেয়, তাহলে এতে শ্রবণকারীর অন্তরে তোমার কথার কোনো প্রভাব পড়বে না। এতে না শ্রবণকারীর ফায়দা হবে, না তার নিজের কোনো ফায়দা হবে। কারণ, বদনিয়্যাতের কারণে তার হৃদয়ে অহংকার সৃষ্টি হবে। ফলে তার আমল আল্লাহ তাআলার কাছে কবুল হবে না। বরং সব চেষ্টা বৃথা যাবে। এ জন্য যেকোনো কাজ করার আগে নিয়্যাতকে ঠিক করে নেওয়া খুবই জরুরী। ১৬৫

আল্লামা নানুতুবী রহ. এর দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি
মরহুম আমীর শাহ খান বলেন, মুনশী মুমতায আলীর ছাপাখানা যখন মিরাঠ শহরে ছিলো, মাওলানা নানুতুবী রহ. তখন সেই ছাপাখানায় কাজ করতেন। সেখানে একজন কর্মচারী ছিলো হাফেযে কুরআন। সে ছিলো বেপরোয়া। চুড়িদার পায়জামা পরতো। দাড়ি খাটো করে রাখতো। নামায পড়তো না কখনো।
হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ. এর সাথে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। এমনকি হযরত তাকে গোসল করিয়ে দিতেন। শরীর মেজে দিতেন। হাফেয সাহেবও হযরতকে গোসল করিয়ে দিতেন। তাঁরা একে অপরকে চুল আঁচড়িয়ে দিতেন।
কখনো যদি হযরতের কাছে মিষ্টি জাতীয় কিছু আসতো, তাহলে তার জন্য একটা অংশ রেখে দিতেন। এককথায় তাদের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। এই বেপরোয়া হাফেয সাহেবের সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে হযরতের অন্যান্য বন্ধুরা অসন্তুষ্ট ছিলো। হযরত এই দিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না।
এক জুমআর দিনে অভ্যাস অনুযায়ী হযরত নানুতুবী হাফেয সাহেবকে গোসল করালেন। হাফেয সাহেবও হযরতকে গোসল করালেন। সেদিন হযরত তাকে বললেন, হাফেয সাহেব! তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব রয়েছে। অতএব আমাদের উভয়ের চালচলন এক রকম হওয়া উচিত। এটা ঠিক নয় যে, তোমার চালচলন এক রকম হবে আর আমার চালচলন আরেক রকম হবে। এ কারণে আমি তোমার মতো চলতে ইচ্ছা করেছি। তুমি তোমার কাপড় দাও। আমি তোমার কাপড় পরিধান করবো। আর এই যে লম্বা দাড়ি দেখছো, এগুলো তুমি খাটো করে দাও। আমি তোমার সাথে ওয়াদা করছি, আমি এই কাপড় পরা ছাড়বো না। দাড়িও আর বড় করবো না।
হাফেয সাহেব একথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে বললো, এটা কীভাবে সম্ভব! বরং আপনি আমাকে আপনার একটি জামা দিন, আমি তা পরিধান করবো। আর কোনো দিন দাড়িতে হাত দেবো না।
অতঃপর হযরত তাকে নিজের কাপড় পরিয়ে দিলেন এবং সে দাড়ি রেখে দিলো। ওই দিনের পর থেকে সে পরিপূর্ণ নামাযী ও সৎ হয়ে গেলো। ১৬৬

উপদেশ
মুফতী তাকী উসমানী [দা.বা.] বলেন, যখন কাউকে শরীআতের কথা বলবে, তখন সঠিক পদ্ধতিতে বলবে। মহব্বত, ভালোবাসা ও তার কল্যাণকামী হয়ে বলবে। লোকদের সামনে এমনভাবে বলবে না, যাতে সে অপমান বোধ করে।
হযরত মাওলানা শিব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. প্রায় সময় একটি কথা বলতেন, যা আমার পিতার মুখে একাধিকবার শুনেছি, তা হলো, হক কথা যখন সঠিক পদ্ধতিতে এবং ইখলাসের সাথে বলা হবে, তখন তা কখনোই বিফলে যাবে না। ১৬৭

একেই বলে সাহসিকতা
একদিন হযরত মাওলানা মুযাফ্ফর হুসাইন কান্ধলবী রহ. দেখলেন, এক পাহলোয়ান মসজিদে এসে গোসল করতে চাইলো। মুআযযিন তাকে ধমক দিয়ে বললো, কত বড় সাহস! নামায নেই, রোযা নেই, আবার গোসল করতে মসজিদে চলে এসেছে।
মাওলানা কান্ধলবী রহ. মুআযযিন সাহেবকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই তার গোসলের জন্য পানি ভরতে লাগলেন আর তাকে বললেন, মাশাআল্লাহ, তোমাকে দেখে তো বড় পাহলোয়ান মনে হচ্ছে, এমনিতেই তুমি অনেক মেহনত করো। এখন নিজের নফসের ক্ষেত্রে একটু মেহনত করো। নফসের উপর চাপ প্রয়োগ করো, সাহস করে নামায শুরু করে দাও, আসল পাহলোয়ানগিরী তো এটাই।
হযরতের কথা শুনে সে লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেলো এবং এমন প্রভাবান্বিত হলো যে, সেদিন থেকে সে নামাযের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করলো। ১৬৮

উপদেশ
কিছু লোকের প্রতি নরম ব্যবহারের প্রভাব বেশি কার্যকর হয়। আর কঠিন আচরণের কারণে তার ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। এ জন্য মানুষের স্বভাবের প্রতি লক্ষ রেখে কথা বলতে হবে।

এক রাখালের আশ্চর্য ঘটনা
খাইবারের যুদ্ধে এক রাখাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে উপস্থিত হলো। সে ইয়াহুদীদের ছাগল চরাতো। ছাগল চরানোর সময় সে দেখলো, খাইবারের বাইরে মুসলমানদের ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। সে চিন্তা করলো, আমি গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাত করে দেখে আসি, মুসলমানরা আসলে কী করে, কী বলে? প্ল্যান অনুযায়ী সে ছাগল চরাতে চরাতে মুসলিম বাহিনীর কাছে পৌঁছে তাদের জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের সরদার কোথায়? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, আমাদের নেতা তাঁবুর ভেতর আছেন। কথাটা প্রথমে রাখালের বিশ্বাস হচ্ছিলো না। সে মনে করলো, এতো বড় সৈন্যদলের সরদার এই সাধারণ তাঁবুতে কীভাবে থাকতে পারে। তার চিন্তায় ছিলো, যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক বড় বাদশাহ, তাই তিনি অনেক সাজ-সজ্জা ও আড়ম্বরপূর্ণ তাঁবুতে থাকবেন। কিন্তু এটা তো খেজুরের পাতায় নির্মিত তাঁবু। যাক, পরিশেষে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাক্ষাত করতে তাঁবুতে প্রবেশ করলো। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাক্ষাত করে সে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কী পয়গাম নিয়ে এসেছেন এবং কিসের দাওয়াত দিচ্ছেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং তাকে ইসলামের অমীয় বার্তা শুনালেন।
রাখাল বললো, যদি আমি ইসলামের দাওয়াত কবুল করি, তাহলে আমার পরিণাম ও মর্যাদা কী হবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইসলাম গ্রহণের পর তুমি আমাদের ভাই হয়ে যাবে। আমরা তোমাকে আমাদের বুকে টেনে নেবো।
রাখাল বললো, আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন- আমি কোথায় আর আপনি কোথায়? আমি হলাম এক নগণ্য রাখাল, কৃষ্ণাঙ্গ, আমার শরীর থেকে দূর্গন্ধ বের হচ্ছে। এই অবস্থায় কীভাবে আমাকে আপনি বুকে টেনে নেবেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্যই আমরা তোমাকে বুকে টেনে নেবো। তোমার শরীরের কালো বর্ণকে আল্লাহ তাআলা নূর দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। তোমার শরীরের দূর্গন্ধকে আল্লাহ তাআলা খুশবু দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।
একথা শুনে সে তৎক্ষণাৎ কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে মুসলমান হয়ে গেলো। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এখন আমার কাজ কী?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমন সময় ইসলাম গ্রহণ করেছো, যখন নামাযেরও সময় নয় যে, তোমাকে নামায পড়তে বলবো। রোযার সময় নয় যে, তোমাকে রোযা রাখতে বলবো। তোমার উপর যাকাতও ফরয নয় যে, তোমাকে যাকাত দিতে বলবো। তবে একটি ইবাদত আছে, যা তলোয়ারের ছায়ায় সম্পাদন হয়, তা হলো, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ।
রাখাল বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এই জিহাদে অংশ গ্রহণ করবো। আপনি অবশ্যই জানুন, যে ব্যক্তি যুদ্ধে যায় তার দুটি অবস্থার একটি অবশ্যই হবে। ১. হয়তো সে শহীদ হবে। ২. নয়তো সে গাজী হবে। যদি আমি জিহাদে শহীদ হই, তাহলে আপনি আমার জান্নাতের দায়িত্ব নেবেন কিনা?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি এ কথার দায়িত্ব নিচ্ছি যে, যদি তুমি এই জিহাদে শরীক হও, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবেন। তোমার শরীরের দুর্গন্ধ সুঘ্রাণে পরিণত করবেন। তোমার চেহারার কৃষ্ণবর্ণ শুভ্র বর্ণে পরিবর্তন করে দেবেন।
যেহেতু সেই রাখাল ইয়াহুদীদের বকরী চরাতে চরাতে এদিকে এসেছিলো তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তুমি ইয়াহুদীদের যে ছাগল চরানোর জন্য নিয়ে এসেছো, সেগুলো ফেরত দিয়ে এসো। কেননা, এগুলো তোমার কাছে আমানত। ১৬৯

উপদেশ
আলোচ্য জিহাদটি কোনো দেশ দখল করার জন্য হয়নি, কোনো ক্ষমতা লাভ করার জন্যও হয়নি। বরং তা হয়েছিলো সত্যকে সমুন্নত করার জন্য। সত্যকে পদদলিত করে কখনো জিহাদ হয় না। গুনাহ ও অবৈধ পথে আল্লাহর দীনের দাওয়াত হয় না। ১৭০

ইসলামে ভ্রাতৃত্ববোধ
হযরত থানবী রহ. একবার কালপি শহরে গেলেন। সেখানে এক ব্যক্তি খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে কাপড় পরে জামে মসজিদে নামায পড়তে আসলো। গ্রামের লোকদের থেকে জানা গেলো, সে পূর্বে নিম্নশ্রেণীর মেথর ছিলো। এখন মুসলমান হয়েছে। তাই সেখানকার চৌধুরী ব্যক্তিরা তার সাথে খানা-পিনা খাওয়া তো দূরের কথা, তার থেকে প্লেটও নিতো না।
একবার সেখানে একটি মাহফিল হচ্ছিলো, সেখানে সবাই উপস্থিত ছিলো। কিছু লোক হযরত থানবী রহ. এর কাছে আবেদন করলো, তিনি যেনো চৌধুরী ব্যক্তিদের বুঝিয়ে দেন যে, এভাবে এই মেথর লোকটি থেকে দূরে সরে থাকা ঠিক নয়। এতে সে অনেক কষ্ট পায়।
অবস্থা দেখে হযরত বুঝতে পারলেন, শুধু বুঝিয়ে দিলে হবে না। বুঝানোর কারণে তো তারা হযরতের সামনে হ্যাঁ, হ্যাঁ বলবে। পরে কেউ এর পরওয়া করবে না।
হযরত থানবী রহ. একটি পাত্রে পানি আনতে বললেন, যখন পানি আনা হলো তখন থানবী রহ. সেই নও মুসলিমকে বললেন, পাত্রে মুখ লাগিয়ে পানি পান করো। অতঃপর উচ্ছিষ্ট পানির পাত্রটি হযরত থানবী রহ. তার থেকে নিয়ে ওই জায়গায় মুখ লাগিয়ে পান করলেন, যেই জায়গায় মুখ লাগিয়ে ওই নও মুসলিম পানি পান করেছিলো। অতঃপর সবাইকে লক্ষ করে বললেন, সবাই এই পাত্র থেকে পানি পান করো, তখন তিনি কাউকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। তাই সবাই যেভাবেই হোক পানি পান করে নিলো।
অতঃপর থানবী রহ. বললেন, ভাইয়েরা আমরা! এখন থেকে তোমরা কেউ তার থেকে দূরে সরে থাকবে না।
একজন বললো, তার থেকে বেঁচে থাকার এখন আর কীইবা আছে? শিক্ষা দেওয়ার উক্ত পদ্ধতির ফলে আমাদের প্রথা নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আমরা তাকে আমাদের সাথে খাওয়াবো, পান করাবো। যখন আপনি তার ঝুটা পানি পান করিয়ে দিলেন, তখন তার থেকে দূরে থাকার আর কিছু বাকি নেই। ১৭১

উপদেশ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, المسلم أخو المسلم অর্থাৎ এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। ১৭২ অতএব মানুষ নিজ ভাইয়ের সাথে যে আচরণ করে, প্রত্যেক মুসলমানের সাথে তার তাই করা উচিত। চাই সে পরিচিত হোক বা অপরিচিত। তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাক বা না থাক। তার সাথে বন্ধুত্ব থাক বা না থাক। তবুও তুমি তাকে আপন ভাই মনে করবে। এই একটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধনী গরীব, উঁচু নীচুর পার্থক্য বিলীন করে দিয়েছেন।
সুতরাং এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। চাই সে যে ভাষাভাষীর-ই হোক। যে দেশেরই হোক। যে পেশারই হোক। যে বংশেরই হোক। সর্বাবস্থায় সে তোমার ভাই। ১৭৩

দাওয়াত ও তাবলীগের হিকমতপূর্ণ পথ ও পদ্ধতি
হযরত মাওলানা মুযাফ্ফর হুসাইন কান্ধলবী রহ. একবার জালালাবাদ বা শামলি শহরে অবস্থান করছিলেন। সেখানে একটি মসজিদ বিরাণ অবস্থায় পড়েছিলো।
তিনি কুয়া থেকে পানি তুলে উযু করলেন। অতঃপর মসজিদটি ঝাড়ু দিলেন। এরপর এক লোককে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে কোনো নামাযী লোক নেই?
লোকটি বললো, না, নেই। সামনে খান সাহেবের বাড়ী, যে মদ্যপ ও যিনাকারী। যদি সে নামায পড়া শুরু করে, তাহলে তার সাথে আরো দুচারজন নামাযী হয়ে যাবে।
মাওলানা একথা শুনে খান সাহেবের কাছে গেলেন। তিনি নেশায়মত্ত ছিলেন। তার পাশে এক তরুণী বসা ছিলো।
মাওলানা তাকে বললেন, ভাই খান সাহেব! যদি তুমি নামায পড়া শুরু করো, তাহলে তোমার দেখাদেখি আরো কিছু লোক নামায পড়বে। এতে করে জুমআর নামায এই মসজিদে চালু হবে। ফলে মসজিদটি আবাদ হয়ে যাবে।
খান সাহেব বললেন, আমি উযু জানি না আর এই খারাপ দুই অভ্যাসও ছাড়তে পারি না।
মাওলানা বললেন, তুমি উযু ছাড়াই নামায পড়া শুরু করো আর যদি মদ ছাড়তে না পারো, তাহলে মদও পান করতে থাকো।
সে প্রতিজ্ঞা করলো, আমি উযু ছাড়াই নামায পড়বো। মাওলানা সেখান থেকে ফিরে এসে নামাযে দাঁড়ালেন। সিজদায় গিয়ে অজোরে কান্না করলেন।
এক ব্যক্তি বললো, হযরত! আপনার দ্বারা আজ এমন দুটি কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা ইতিপূর্বে হয়নি। একটি হলো, আপনি মদ পান করার অনুমতি দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি হলো, আপনি সিজদায় অনেক কান্না করেছেন।
তিনি বললেন, সিজদায় আমি মহান রবের কাছে প্রার্থনা করেছি, হে রাব্বুল ইয্যত! আমি তো জায়নামাযে দঁড় করিয়ে দিয়েছি, এখন আপনার কাজ। দিল তো আপনার হাতে।
আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে খান সাহেবের এমন অবস্থা হয়েছে যে, যখন তরুণী উঠে গেলো তখন যোহরের সময় ছিলো। নিজের প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে গেলো। মনে মনে ভাবলো, আজ প্রথম দিন তাই গোসল করে নিই। কাল থেকে উযু ছাড়াই নামায পড়ে নেবো। লোকটি গোসল করলো। পাক সাফ কাপড় পরিধান করলো। অতঃপর নামায আদায় করলো। নামায শেষ করে বাগানে চলে গেলো। আসর ও মাগরিবের নামায বাগানে সেই উযু দিয়ে পড়লো। মাগরিবের পর যখন ঘরে পৌঁলো তখন ঘরে একজন তরুণী অবস্থান করছিলো। প্রথমে খানা খেতে ঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে স্বীয় স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি পড়লে তার প্রতি আসক্ত হয়ে যায় সে। ফলে বাইরের ঘরে গিয়ে তরুণীকে বললো, ভবিষ্যতে কখনো আর এই বাড়ীতে আসবে না। ১৭৪

উপদেশ
যখন আল্লাহ তাআলার কোনো বান্দা নিজের অহংকার দূর করে নিজেকে ছোট করে আল্লাহর জন্য কথা বলে, তখন দুনিয়ার লোকরো বুঝতে পারে যে, এতে তার দুনিয়াবী কোনো লাভ নেই। সে যা কিছু বলছে, সব আল্লাহর জন্য বলছে তখন তার কথায় প্রভাব পড়ে।
যেমন হযরত শাহ ইসমাঈল শহীদ রহ. এর এক ওয়াজে হাজার হাজার লোক তার হাতে তাওবা করতো। সুবহানাল্লাহ।
আমরা প্রথমত দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ ছেড়ে দিয়েছি। যারা করে তারাও এমন পন্থায় করে, যে পন্থা লোকদের ক্রোধান্বিত করে তোলে। যার কারণে পরিপূর্ণ ফায়দা হয় না। এজন্য তিনটি কথা মনে রাখতে হবে।
১. কথা হক হতে হবে। ২. নিয়্যাত সঠিক হতে হবে। ৩. পদ্ধতি সঠিক হতে হবে। ১৭৫

ব্যথিত হৃদয়
আমীন গিলানী লিখেছেন, মাওলানা নূরুল হাসান বুখারী রহ. বর্ণনা করেছেন, একবার 'খাইরুল মাদারিস জানান্দার' এর মাহফিলে হযরত মাওলানা আতাউল্লাহ সাহেব উপস্থিত ছিলেন। তিনি খাবারের দস্তরখানে বসে সামনে একজন যুবক মেথরকে দেখতে পেলেন। শাহ সাহেব বললেন, আসো ভাই! খানা খাও। সে বললো, হযরত! আমি তো মেথর। আপনার সাথে খাওয়ার যোগ্য নই আমি।
শাহ সাহেব ব্যথিত স্বরে বললেন, আরে ভাই, তুমিও তো মানুষ, নাকি? তোমারও তো ক্ষুধা অনুভব হয়, নাকি? এ কথা বলে তিনি নিজে উঠে তাকে হাত ধরে সাথে বসালেন। বেচারা থর থর করে কাঁপছিলো আর বলছিলো, আমি তো একজন মেথর।
শাহ সাহেব রহ. নিজ হাতে রুটি টুকরা করলেন। তরকারীর ঝুলে চুবিয়ে তার মুখে পুরে দিলেন। অতঃপর যখন তার ইতস্ততবোধ কিছুটা দূর হলো, তখন শাহ সাহেব তার মুখে এক টুকরো আলু দিলেন। সে যখন আলুর অর্ধেক তার দাঁত দ্বারা কেটে মুখে নিলো, তখন বাকি অর্ধেক আলু হযরত নিজেই খেলেন।
এমনিভাবে মেথর লোকটি যখন পানি পান করে কিছু পানি রেখে দিলো, হযরত তার অবশিষ্ট পানি পান করলেন। সে খাবার খেয়ে গায়েব হয়ে গেলো।
উক্ত ঘটনা তার উপর বিশাল প্রভাব ফেললো। সে খুব কান্না করলো। সে তার অবস্থা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলো। আসরের সময় সে তার যুবতী স্ত্রী এবং তার কোলের সন্তান নিয়ে এসে বললো, শাহ সাহেব! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদেরকে কালিমা পড়িয়ে মুসলমান বানিয়ে নিন। এভাবে স্বামী স্ত্রী উভয়ে মুসলমান হয়ে গেলো।
কবি চমৎকার বলেছেন,
তার ভঙ্গিমা হৃদয় কাড়া
তার সুর অন্তর কাড়া
যে হৃদয় জয় করতে পারে
সে জয় করতে পারে যামানা। ১৭৬

উপদেশ : যে ব্যক্তি কাফির, তুমি তার কুফুরীকে ঘৃণা করো। সেই ব্যক্তিকে নয়। বরং তার ব্যাপারে দুআ করো, আল্লাহ তাআলা যেনো তাকে হিদায়াত দান করেন। ১৭৭

অন্তর থেকে যে কথা বের হয় তা অন্তরে গিয়ে প্রবেশ করে
পাটিয়ালা শহরে একটি জলসা হচ্ছিলো। আমীরে শরীআত সাইয়িদ আতাউল্লাহ শাহ বুখারী রহ. সেই জলসায় বক্তৃতা করার জন্য গেলেন। জলসাটি একটি বড় বিল্ডিং এর ছাদের উপর হচ্ছিলো। বিল্ডিংটির অনেকগুলো সিঁড়ি ছিলো। শাহ সাহেব জলসায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি অতিক্রম করছিলেন। তিনি দেখলেন, এক যুবক ঝাড়ু হাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। শাহ সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ছেলে! তুমি কে? যুবক উত্তর দিলো, জনাব! আমি ক্লিনার, সিঁড়ি পরিষ্কার করি।
শাহ সাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। অতঃপর তার বুকে হাত রেখে বললেন, এটাও একটু পরিষ্কার করো। হাত দিয়ে তার অন্তরের দিকে ইশারা করলেন।
শাহ বুখারী রহ. এ কথা বলে জলসায় চলে গেলেন। সম্ভবত আধা ঘণ্টা পর মাওলানা আবদুল জাব্বার শাহ বুখারী সাহেবের কাছে এসে বললেন, শাহ সাহেব! আপনি তাকে কী বলে এসেছেন? শাহ সাহেব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে? তিনি বললেন, ক্লিনারকে। শাহ সাহেব বললেন, কিছুই তো বলিনি।
মাওলানা আবদুল জাব্বার রহ. বললেন, হযরত! সে তো রাস্তায় ছটফট করছে। তাকে অস্থির ও উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সে বলছে, শাহ সাহেবকে বলুন, তিনি যেনো আমাকে এক্ষুনি মুসলমান বানিয়ে তিনি নিজেই আমার অন্তরকে পরিষ্কার করে দেন।
শাহ সাহেবের নির্দেশে তাকে জলসায় আনা হলো। অতঃপর সকলের সামনে সে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলো।
লোকটি শাহ সাহেবকে দুআ দিতে দিতে বলতে লাগলো, হযরত! আপনি যখনই আমাকে আপনার বুকের সাথে লাগালেন, আমার অন্তর আলোকিত হয়ে গেলো। আমি ইসলাম গ্রহণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলাম। ১৭৮

উপদেশ
হযরত মুফতী তাকী উসমানী [হাফিযাহুল্লাহ] তার পিতা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ও ডাক্তার আবদুল হাই রহ. এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন-
হযরত থানবী রহ. বলতেন, আমি প্রত্যেক মুসলমানকে বর্তমান অবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে আর প্রত্যেক কাফিরকে ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার চেয়ে উত্তম মনে করি।
ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, যদিও সে এখন কুফরের মধ্যে ডুবে আছে, কিন্তু কে জানে, যদি আল্লাহ তাআলা তাকে তাওবা করার তাওফীক দান করেন এবং সে কুফরীর অন্ধকার থেকে বের হয়ে যায় আর আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন, তাহলে সে কাফির আমার থেকেও আগে চলে যাবে।
আর যে ব্যক্তি মুসলমান, ঈমান ওয়ালা, আল্লাহ তাআলা তাকে ঈমানের সম্পদ দান করেছেন, কে জানে, আল্লাহ তাআলার সাথে তার সম্পর্ক কেমন। কেননা, প্রত্যেক মানুষের আল্লাহর সাথে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে, কারো ব্যাপারে নির্দিষ্ট উক্তি করা উচিত নয়। এই জন্য আমি প্রত্যেক মুসলমানকে আমার চেয়ে উত্তম মনে করি। ১৭৯
এমন গুণ অর্জন করার জন্য আমাদের নিচের দুআর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا هَادِينَ مُهْتَدِينَ غَيْرَ ضَالِّينَ وَلَا مُضِلِّينَ سِلْمًا لِأَوْلِيَائِكَ وَحَرْبًا لِأَعْدَائِكَ يُحِبُّ بِحُبِّكَ مَنْ حَبَّكَ وَنُعَادِي بِعَدَاوَتِكَ مَنْ خَالَفَكَ مِنْ خَلْقِكَ.
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে অন্যের হিদায়াতের কারণ বানান এবং আমাদের হিদায়াত দান করুন। আমাদের নিজেদেরকেও পথভ্রষ্ট করবেন না এবং অন্যের পথভ্রষ্টের কারণও আমাদের বানাবেন না। আপনার বন্ধুদের জন্য সন্ধি, আপনার শত্রুদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ। যে ব্যক্তি আপনাকে ভালোবাসে আপনার সন্তুষ্টির জন্য, আমরাও তার সাথে ভালোবাসা রাখি। আর আপনার মাখলুকের মধ্যে যে আপনার বিরোধিতা করে, আপনার বিরোধিতার কারণে আমরাও তার সাথে শত্রুতা পোষণ করি। ১৮০
سبحان ربك رب العزة عما يصفون ، وسلام على المرسلين والحمد لله رب العالمين।

টিকাঃ
১৬২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১১৬৪, সূরাতুল মুমিন: ০৩।
১৬৩. ইসলাহী খুতুবাত : ৮/৩৪।
১৬৪. আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে: ১১০।
১৬৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/৩৬।
১৬৬. আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে: ১১১।
১৬৭. ইসলাহী খুতুবাত : ৮/৩৬।
১৬۸. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ : ৯৬।
১৬৯. ইসলাহী খুতুবাত: ৯/১১০।
১৭০. ইসলাহী খুতুবাত : ৩/১৬৩।
১৭১. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ : ৫৬।
১৭২. আবূ দাউদ: ২/৩১৪, কিতাবুল আদব।
১৭৩. ইসলাহী খুতুবাত : ৮/২০০।
১৭৪. আকাবিরে দেওবন্দ কিয়া থে: ১০৯।
১৭৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/৪১।
১৭৬. কিতাবু কি দরস গাহ মে: ১১৩।
১৭৭. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/৭৫।
১৭৮. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ: ২০৭।
১৭৯. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/৭৬।
১৮০. কানযুল উম্মাল: ২/৭৫, কিতাবুল আযকার ফী জাওয়ামিইদ দুআ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px