📄 গুনাহ পরিহার করা
আল্লাহ তাআলার কাছে তালিবে ইলমের অনেক সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের সম্মানে আল্লাহ পাক তাদের চলার পথে ফেরেশতাদের নূরের পর বিছিয়ে দেন। তারা যতক্ষণ ইলম অন্বেষণে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর রাস্তায় থাকার মর্যাদা দিয়েছেন। অতএব স্বাভাবিক ভদ্রতার দাবী হচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে নিআমতদাতা মহা সত্তাকে মান্য করা。
বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির ঘটনা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে একটি হাদীস এক দুবার নয়, বরং সাতবার শুনেছি। হাদীসটি হচ্ছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বনী ইসরাঈলে কিফ্ল নামে এক ব্যক্তি ছিলো। এমন কোনো গুনাহ নেই, যা সে করতো না। একবার তার নিকট এক মহিলা আসলো। সে মহিলাকে কয়েক দীনারের শর্তে অপকর্ম করতে রাজি করালো। শর্ত সাপেক্ষে যখন সে উক্ত হারাম কাজ করার জন্য মহিলার দুই রানের মাঝে বসলো, তখন মহিলা কান্না করতে লাগলো আর কাঁপতে লাগলো। কিফ্ল তাকে জিজ্ঞেস করলো, কাঁদছো কেনো তুমি? আমি কি তোমার সাথে জোর-যবরদস্তি করছি?
মহিলা বললো, না, আপনি জোর-যবরদস্তি করেননি। তবে এটা এমন এক গুনাহ, যা আমি ইতিপূর্বে কোনো দিন করিনি। এই মুহূর্তে আমি অপারগ হয়ে তা করছি। অপারগতার কারণে আমি রাজি হয়েছি।
একথা শুনে কিফ্ল সাথে সাথে সেই মহিলার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বললো, যাও, দীনারগুলো তোমার। আর আজ থেকে কিফ্লও আর কোনো গুনাহ করবে না। আশ্চর্যজনকভাবে সেই রাতেই সে মারা গেলো। আর সকালে তার দরজায় গাইবীভাবে এই লেখা দেখা গেলো, غفر الله للكفل আল্লাহ তাআলা কিফলকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ১২৪
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, যে তালিবুল ইলমের মাঝে গুনাহের অধপতন ও অবনতি রয়েছে, সে তো কেবল কিছু শব্দ মুখস্থ করেছে। নিজের মেধা ও মেহনতের করে এক প্রকার জ্ঞান অর্জন করেছে। কিন্তু গুনাহের কারণে ইলমের নূর তাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই।
একজন ব্যক্তির মধ্যে যখন ইলমের নূর এসে পড়ে তখন সে ব্যক্তি إذا رأوه ذكر الله ]যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে যায়]১২৫ এই হাদীসের প্রয়োগক্ষেত্র হয়ে যায়। এ ধরনের ব্যক্তিকে দেখা মাত্র আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঈমান তাজা হয়। এমন ব্যক্তির মজলিসে বসলে মানুষের অন্তরে এই আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয় যে, আমার সাথে আর আল্লাহ তাআলার সাথে যেন একটি গভীর সম্পর্ক হয়ে যায় এবং গুনাহের প্রতি ঘৃণাবোধ, ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
এগুলো আল্লাহ তাআলার সেই সমস্ত বান্দার বৈশিষ্ট্য, যারা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জানতোড় চেষ্টা করার ফলে ইলমের নূর তাদের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে আলোকিত করে। ১২৬
গুনাহের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ না করার ভয়াবহতা
হযরত মালিক ইবনে দীনার রহ. বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা একবার ফেরেশতাদের হুকুম করলেন, অমুক জনবসতি ধ্বংস করে দাও। তখন ফেরেশতারা বললেন, হে আল্লাহ! সে জনবসতিতে আপনার একজন বুযুর্গ বান্দা আছে।
আল্লাহ তাআলা বললেন, তাকেসহ ধ্বংস করে দাও। কেননা, আমার নাফরমানী ও গুনাহ দেখার পরও তার মধ্যে কোনো দুঃখ বেদনা নেই। এতে তার চেহারা মলিন পর্যন্ত হয়নি।
হযরত ইউশা ইবনে নূন আলাইহিস সালাম এর প্রতি আল্লাহ তাআলা ওহী প্রেরণ করলেন, আপনার সম্প্রদায়ের এক লক্ষ লোককে আযাব দ্বারা ধ্বংস করা হবে, যাদের মধ্যে চল্লিশ হাজার নেককার আর বাকি ষাট হাজার বদকার। তখন তিনি বললেন, হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! বদকারদের ধ্বংস হওয়ার কারণ তো স্পষ্ট, তবে নেককার লোকদের ধ্বংসের কারণ কী?
উত্তরে বলা হলো, তারা বদলোকদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রাখে, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে, আনন্দ-ফুর্তি করে। আমার নাফরমানী ও গুনাহ দেখার পর তাদের চেহারায় বিরক্তির চিহ্নও দেখা যায় না। ১২৭
হযরত শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. বলেন, প্রত্যেকেরই চিন্তা করা উচিত, তার জানা মতে এমন কত গুনাহ সংগঠিত হচ্ছে, যে গুনাহগুলো সে চাইলেই নিষেধ করতে পারতো, কিন্তু তার উদাসীনতা, অসাবধানতা ও ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে তা হতে থাকে।
বড়ই আফসোসের কথা হলো, যদি আল্লাহর কোনো বান্দা সেই গুনাহ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়, তখন লোকেরা তার বিরোধিতা শুরু করে দেয় এবং তাকে নিয়ে বিদ্রুপ শুরু করে। তাকে সাহায্য না করে সবাই তার বিরোধিতায় লেগে পড়ে। ১২৮
আল্লাহ পাক দোষ গোপন রাখেন
বনী ইসরাঈলের যামানায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। ফলে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হচ্ছিলো না। কিছু লোক হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এর কাছে গিয়ে আবদার করলো। হে কালীমুল্লাহ! আল্লাহর কাছে আপনি দুআ করুন, তিনি যেনো আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষন করেন। আবেদনের ভিত্তিতে তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে তাদের মহল্লা থেকে দূরে এক জায়গায় একত্রিত হলেন। সংখ্যায় তারা সত্তর হাজার বা তার থেকে কিছু বেশি ছিলো। মূসা আলাইহিস সালাম খুবই মিনতির সাথে দুআ শুরু করলেন-
اِلٰهِي أَسْقِنَا غَيْثَكَ وَانْشُرْنَا عَلَيْنَا رَحْمَتَكَ ، وَارْحَمْنَا بِالْأَطْفَالِ الرُّكَّعِ وَالْبَهَائِمِ الرُّبَعِ وَالشَّيُوخِ الرُّكَّعِ.
হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমাদের উপর রহমত ছিটিয়ে দিন। মাসুম বাচ্চা, বোবা জানোয়ার, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ সবাই আপনার রহমতের আশাবাদী, তাদের প্রতি দয়া করুন। আমাদেরকে আপনার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন।
তিনি অবিরাম দুআ করে চলছেন। কিন্তু বৃষ্টির কোনো চিহ্নও পরিলক্ষিত হচ্ছিলো না। সূর্য আরো তীব্র হতে লাগলো। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বড়ই আশ্চর্য হলেন! ফলে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ কবুল না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করলেন-
إِنَّ فِيْكُمْ عَبْدًا يُبَارِزُنِي بِالْمَعَاصِيْ مُنْذُ أَرْبَعِيْنَ سَنَةً ، فَنَادِ فِي النَّاسِ حَتَّى يُخْرِجَ مِنْ بَيْنِ أَظْهَرِكُمْ فَبِهِ مَنَعْتُكُمْ.
তোমাদের মাঝে এমন এক লোক আছে, যে গত চল্লিশ বছর যাবত অবিরাম আমার নাফরমানী করে আসছে আর সে গুনাহের ব্যাপারে একগুঁয়ে। হে মুসা! তুমি লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও, সে যেন এ সমাগম থেকে বের হয়ে যায়। কেননা, তার কারণেই তোমাদেরকে বৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না। আর যতক্ষণ সে বের না হবে, ততক্ষণ বৃষ্টিও হবে না।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো দুর্বল, আমার আওয়াজও দুর্বল আর লোকদের সংখ্যা সত্তর হাজারেরও বেশি। আমি কীভাবে তাদের সকলের নিকট আওয়াজ পৌঁছাবো?
তখন জবাব আসলো, তোমার কাজ হলো ঘোষণা দেওয়া, আর আমার কাজ হলো, পৌঁছে দেওয়া।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে ডেকে বললেন,
أَيُّهَا الْعَبْدُ الْعَاصِي الَّذِي يُبَارِزُ اللَّهَ بِالْمَعَاصِيْ مُنْذُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ، أُخْرُجْ مِنْ بَيْنِ أَظْهُرِنَا ، فَبِكَ مَنَعْنَا الْمَطَرَ.
হে ওই পাপিষ্ঠ, নাফরমান বান্দা, যে বিগত চল্লিশ বছর যাবত নিজের প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে যাচ্ছো এবং তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছো, তুমি এই মজলিস থেকে বের হয়ে যাও। তোমার মন্দ কর্মের কারণেই আমরা রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
এ ঘোষণা শুনে গুনাহগার বান্দা তার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলো, কেউ তার আপন জায়গা থেকে সরছে না। ফলে সে বুঝতে পারলো, আমিই সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি। সে ভাবতে লাগলো, যদি আমি সবার সামনে দিয়ে বের হই, তাহলে প্রচুর লজ্জা পাবো আর আমার ব্যাপারে সবাই হাসাহাসি করবে। আর যদি বের না হই, তাহলে কেবল আমার কারণেই এই লোকগুলো বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে সে স্বীয় চেহারা কাপড়ের নিচে লুকিয়ে তার কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে লাগলো-
হে আমার রব! তুমি কত সম্মানিত ও সহনশীল, আমি চল্লিশ বছর তোমার নাফরমানী করছিলাম আর তুমি আমাকে অবকাশ দিয়ে আসছিলে। আর এই মুহূর্তে তো আমি তোমার অনুগতশীল হয়ে এসেছি। এখন আমার তাওবা কবুল করো এবং আমাকে ক্ষমা করে দিয়ে আজকের এই লজ্জা ও অপমান থেকে রক্ষা করো।
তার দুআ শেষ হতে না হতেই, কালো মেঘে ছেয়ে গেলো আকাশ, ঝুম বৃষ্টি আর শুরু হলো বাতাস।
পরক্ষণে মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ! আপনি কীভাবে বৃষ্টি নাযিল করলেন, অথচ সেই নাফরমান বান্দা মজলিস থেকে বের হয়নি?
আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মূসা! যার কারণে ইতিপূর্বে বৃষ্টি বন্ধ রেখেছিলাম, তার কারণেই এখন বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। কেননা, সে তাওবা করেছে।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আল্লাহ, তার সাথে আমার সাক্ষাত করিয়ে দাও, যাতে আমি তাকে একনজর দেখে নিতে পারি।
তখন ইরশাদ হলো-
مُوسَى إِنِّي لَمْ أَفْضَحْهُ وَهُوَ يَعْصِينِي ، أَ أَفْضَحُهُ وَهُوَ يُطِيعُنِي
হে মূসা! যখন সে আমার নাফরমানী করছিলো তখনই তো আমি তাকে অপমান ও অপদস্ত করিনি। আর এখন তো সে আমার অনুগত ও সৎ হয়ে গেছে, অতএব এখন তো কিছুতেই তাকে লজ্জিত ও অপমানিত করতে পারি না।
প্রিয় পাঠক! লক্ষ করুন, একজন মাত্র গুনাহগার ও নাফরমান ব্যক্তির জন্য বৃষ্টি হচ্ছিলো না। বর্তমানে তো অল্পকিছু লোক ছাড়া বাকি সবাই গুনাহ ও নাফরমানীতে লিপ্ত, তাহলে আমাদের কী অবস্থা হবে হাশরের মাঠে? সূরায়ে জ্বিন এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা সত্যিই বলেছেন,
وَأَلَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا
তারা যদি সঠিক পথে অবিচল থাকতো, তাহলে আমি অবশ্যই প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে সমৃদ্ধ করতাম।১২৯
উপদেশ
ইমাম গাজালী রহ. বলেন, সকালে যখন তুমি ঘুম থেকে জাগ্রত হও, তখন মনে মনে একটি প্রতিজ্ঞা করো, রাতে শোয়ার আগ পর্যন্ত আমি আজ কোনো প্রকার গুনাহ করবো না এবং সকল ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত আদায় করবো। আল্লাহ তাআলার হক ও বান্দার হক পুরোপুরি আদায় করবো।
এরপর যেকোনো কাজ করার পূর্বে চিন্তা করবে, এই কাজটি কি আমার প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী হচ্ছে? যদি পরিপন্থী হয়, তাহলে ছেড়ে দেবে।
আর রাতে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করবে, আমার দ্বারা কি আমার প্রতিশ্রুতির বিপরীত কোনো কাজ সম্পন্ন হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে তাওবা করে নেবে, আর মনকে সামান্য শাস্তি দাও। শাস্তিস্বরূপ আট-দশ রাকআত নফল নামায পড়তে বাধ্য করো। আর যদি প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী কোনো কাজ না হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলার শুকর আদায় করো। ১৩০
যখন গুনাহ করার ইচ্ছা মনে উদ্রেক হয়, তখন নিচের দুআটি গুরুত্বের সাথে পড়তে থাকো-
رَبَّنَا أَفْرِغْعَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে পরিপূর্ণ ধৈর্য দান করুন এবং মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন।১৩১
সুন্নাতের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়ার পরিণতি
'আহলুল কুবৃর' নামক গ্রন্থে আল্লামা যাইনুদ্দীন ইবনে রজব রহ. লিখেছেন- একবার এক লোক আমার কাছে আসলো, যে পূর্বে কাফন চুরি করতো। এই হীন কাজ সে এখন আর করে না; বরং এখন সে সৎভাবে জীবন যাপন করছে।
আল্লামা যাইনুদ্দীন রহ. সে ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো জীবনে অনেক মুসলমানের কাফন চুরি করেছো, যারফলে মৃত মানুষের অবস্থা তুমি ভালো জানো। অতএব তুমি আমাকে বলো, যখন তুমি মৃত ব্যক্তির চেহারা খুলতে, তখন তার চেহারা কোন দিকে ফিরোনো থাকতো?
সে বললো, বেশির ভাগ লোকের চেহারা কিবলা থেকে অন্য দিকে ফিরানো পেয়েছি।
হযরত যাইনুদ্দীন রহ. এ কথা শুনে খুবই আশ্চর্য হলেন। কেননা, দাফন করার সময় সাধারণত কিবলার দিকে মুখ করে মুসলমানদের দাফন করা হয়। তাই তিনি ইমাম আওযায়ী রহ.-কে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, ইমাম আওযায়ী রহ. শোনা মাত্রই তিনবার 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়লেন। অতঃপর বললেন, সম্ভবত সে সব লোক দুনিয়ার জীবনে সুন্নাত থেকে বিমুখ ছিলো। ১৩২
সাহাবায়ে কিরাম কখনো সুন্নাতের মাঝে ছোট বড় বলে পার্থক্য করতেন না। বরং তারা সব সুন্নাতকেই বড় মনে করতেন। এই জন্য তাঁরা সকল সুন্নাতের উপর আমল করতেন। আর আমরা ছোট বড় পার্থক্য করে অনেক সুন্নাতকেই ছেড়ে দিই। আল্লাহ তাআলা আমাদের মাফ করুন। ১৩৩
সবর ও ধৈর্যের গুণ অর্জন করতে হবে
মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করার জন্য মানুষের অভ্যন্তরে একটি শক্তি দেওয়া হয়েছে, যাকে নফসে লাউওয়ামা [نفس لوامة] বলে। সাধারণ মানুষের মাঝে যা অন্তর নামে প্রসিদ্ধ।
কোনো ব্যক্তি যখন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, তখন তাকে যে শক্তি সেই খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে, সেটাই হচ্ছে نفس لوامة । এ ছাড়াও এমন কিছু যোগ্যতা আছে, যেগুলো মানুষকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।
অপর দিকে এমন দুটি অপশক্তি রয়েছে, যেগুলো মানুষকে গুনাহ করতে উৎসাহিত করে। তন্মধ্যে একটি রয়েছে মানুষের অভ্যন্তরে, যেটাকে نفس أمارة বলে। এটা মানুষকে নেক কাজ থেকে বিরত রাখে আর খারাপ কাজে উৎসাহিত করে।
দ্বিতীয় অপশক্তি হলো, শয়তান। যার জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, মানুষকে নেক কাজ থেকে বিরত রাখা এবং খারাপ কাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এই বিপরীতমুখী দুটি শক্তির টানাটানির মাঝেই রয়েছে মানুষের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রত্যেকের জন্য জরুরী হলো, খারাপ কাজের উপর ভালো কাজকে প্রাধান্য দেওয়া। ভালো কাজকে খারাপ কাজের উপর প্রাধান্য দেওয়ার মধ্যে এক প্রকারের কষ্ট স্বীকার করতে হয়। শরীআতের পরিভাষায় একে সবর বা ধৈর্য বলে।
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়
• সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক চেয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি দুআ করা।
• নফসের সাথে যুদ্ধ করা, মনের কুমন্ত্রণা দূর করা এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা।
• আল্লাহ তাআলার উপস্থিতির কথা চিন্তা করা। তিনি আমাকে সর্বদা দেখছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে ভয় করা।
• গুনাহ করার সময় এই কথা চিন্তা করা, কেউ দেখলে কি আমি এমন গুনাহ করতে পারতাম? এভাবে নিজের ভেতর লজ্জাবোধ জাগ্রত করা। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি তোমার পরিবারের কোনো প্রভাবশালী সদস্যকে যেমন লজ্জা পাও, আল্লাহকে (কমপক্ষে) তেমন লজ্জা করো। ১৩৪
• এই চিন্তা করা, গুনাহরত অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে কীভাবে আমি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করবো? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে [কিয়ামতের দিন] সেই অবস্থায় উঠানো হবে, যে অবস্থায় সে মারা গেছে। ১৩৫
টিকাঃ
১২৪. মাআরিফুল কুরআন: ৬/২১৯, সূরা আম্বিয়া: ৮৫।
১২৫. ইবনে মাজাহ: পৃষ্ঠা-৩০৩।
১২৬. মাজালিসে ইলম ও যিকির: ২/৬৯।
১২৭. তাফসীরে বাহরে মুহীত: ৩/৫৩৩, সূরা মায়িদা: ৬৩।
১২৮. ফাযায়িলে আমল: পৃষ্ঠা নং- ৬০৭, ফাযায়িলে তাবলীগ।
১২৯. সানহারে আওরাক: ২০৯।
১৩০. ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ৪/৫২৪।
১৩১. সূরা আরাফ: ১২৬।
১৩২. আহলুল কুবৃর ও আহওয়ালু আহলিহা ইলান নুশুর: ৬৬।
১৩৩. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/১৮০।
১৩৪. মুসনাদে বায্যার: ৭/৮৯।
১৩৫. সহীহ মুসলিম: হাদীস নং-২২০৬।
📄 অসৎ সঙ্গ পরিহার করা
অসৎ সংশ্রবের ফলে অজান্তে মানুষের মধ্যে বদঅভ্যাস চলে আসে। জনৈক কবি বলেন,
ألا تصحبالكسلانفيحياته + كمصالح بفساد آخر يفسد عدوي البليد إلى الجليد مريعة + كالجمر يوضعفي الرماد فيخمد
অলস লোকের সাথে বসো না। কেননা, অনেক ভালো মানুষ অন্য লোকদের খারাপীর কারণে খারাপ হয়ে গেছে। নির্বোধ ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া সুবোধ ছেলের উপর এমনভাবে পড়ে, যেভাবে অঙ্গারকে যদি ছাইয়ের উপর রেখে দেওয়া হয়, তাহলে অঙ্গার নিভে যায়।
পরিবেশ ও সঙ্গী দ্বারা মানুষ অনেক প্রভাবিত হয়। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্নভাবে সতর্ক করেছেন। অতএব যথাসম্ভব আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে মহব্বত রাখো। বেশি বেশি তাদের সংশ্রবে থাকো। বদ-দীন ও অসৎ লোকদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকো।
হযরত লুকমান হাকীম স্বীয় ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, প্রিয় বৎস! নেককার বান্দাদের মজলিসে বসবে। এতে তোমার কল্যাণ হবে। যদি তাদের উপর রহমত বর্ষণ হয়, তাহলে তুমিও তাতে শরীক থাকবে। অসৎ লোকদের সংশ্রবে কখনো বসবে না। তাদের থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। তাদের উপর যদি কোনো আযাব পতিত হয়, তাহলে তুমি এর থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কেমন লোকদের সংশ্রব অবলম্বন করা হবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যাদের কথা শুনলে ইলম বৃদ্ধি পায়, যাদের আমল দেখে আখেরাতের কথা মনে পড়ে, এমন লোকদের সংশ্রব গ্রহণ করবে। ১৩৬
টিকাঃ
১৩৬. হুসূলে ইলমকে আদাব: ১৭০-১৭২, ১৭৮-১৭৯।
📄 ছাত্র যামানায় মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার
প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের এক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ- এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর ব্যবহার যদি শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে এই নিয়ে লেখার কোনো জরুরত ছিলো না। কিন্তু ব্যবহারকারীদের অনেকেই বিশেষ প্রয়োজনে এর ব্যবহার শুরু করলেও তারা তাদের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অপ্রয়োজনীয় লিংকে ঢুকে লম্বা সময়ের জন্য তারা হারিয়ে যাচ্ছেন। ৫-১০ মিনিটের জন্য একটি ওয়েবসাইটে ঢুকার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের।
আমার সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা হয় মুসলমানদের সেই শ্রেণীটাকে নিয়ে, যারা গুনাহ থেকে সবসময় বেঁচে থাকতে চান, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তারা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারছেন না। আমার সবচেয়ে বেশি আফসোস হয় মাদরাসার ছাত্রদের হাতে এই ডিভাইসটি দেখে। তাঁদের হাতে এই ভয়াবহ যন্ত্রটি দেখে আমার মনে হয়, এই বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সমাজের সর্বোত্তম শ্রেণীটাও। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের ঈমান, আমল, মূলোবোধ, সংস্কৃতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লেখাপড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যখন ছাত্ররা বই-পুস্তক ও কিতাবের জগতে হারিয়ে যাওয়ার কথা, তখন তারা উস্তাদ ও গার্ডিয়ানকে ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর তাতে চুঁ মারছে। কে কী কমেন্ট করছে, কতটা লাইক শেয়ার হচ্ছে তা দেখার জন্য অস্থির থাকে। কখন নামায, ক্লাস, মিটিং ইত্যাদি শেষ হবে আর ফেইসবুকে ঢুকবে এ জন্য মন বেচাইন থাকে। ক্লাসের ফেল করা এক- দেড়শো ছাত্রের লাইক আর কমেন্ট পড়ে খুব আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। এমন সব লোকদের কমেন্টের ভিত্তিতে নিজেকে বিপ্লবী নেতা ভাবছে, যারা রাত দুটোয় তোমার লেখায় লাইক দেয় এবং যাদেরকে নিয়ে তাদের মা-বাবাই সবসময় অস্থির ও পেরেশান থাকে। তাদের নিয়ে কীভাবে তুমি সমাজ নির্মাণ করবে? হিরো হওয়া কি এতই সহজ? আসলে এটা চরম ধোঁকা।
ছাত্র বন্ধুরা, ভেবে দেখুন, ইন্টারনেটে ঢুকে কতটা সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন নিজেদের প্রয়োজনের মধ্যে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আগে আমরা মোবাইল চালাইতাম। এখন মোবাইল আমাদেরকে চালায়। অজানা মোহে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে আমাদের। ফলে আমরা তিলাওয়াতের সময় পাচ্ছি না। যিকির-আযকারের ফুরসত পাচ্ছি না। বই-পত্র পড়ার সুযোগ পাচ্ছি না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
علامة اعراض الله عن العبد اشتغاله بما لا يعنيه وإن امرأ لو ذهبت ساعة من عمره في غير ما خلق له الجدير أن تطول حسرته يوم القيامة.
কোনো বান্দা যদি অর্থহীন কাজ নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, তার থেকে আল্লাহ তাআলা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কোনো ব্যক্তির জীবনের যৎসামান্য মুহূর্তও যদি এমন কাজে চলে যায়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি, তাহলে নির্ঘাত এর জন্য একদিন তাকে আফসোস করতে হবে। ১৩৭
ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে আমাদের লজ্জাও কমে যাচ্ছে। অনিচ্ছাকৃত চোখে পড়া অশ্লীলতা দেখতে দেখতে চোখ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধবোধ ও খারাপ লাগার অনুভূতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবাধে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যাতায়াতের অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। অভ্যাস এমন জিনিস, যার মাধ্যমে বুযুর্গ ব্যক্তিরও নিজের অজান্তে আস্তে আস্তে গুনাহের সাথে আপোস হয়ে যায়। অথচ এই ব্যক্তিটি একসময় কঠোরভাবে নজরের হিফাযত করতেন। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে তাঁরা তাদের তাকওয়া-পরহেযগারী ধরে রাখতে পারছেন না।
একজন পরহেযগার ও বুযুর্গ মানুষকে একটি স্মার্টফোন অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পাক্কা ফাসিকে পরিণত করে দিতে পারে। বাইরের খোলসটা ঠিক রেখে ভেতরটা খালি করে দিতে পারে। এই মানুষটাকে চোখের যিনা থেকে শুরু করে ধর্ষণের পথেও টেনে নিতে পারে। এটা কেবল আশঙ্কা নয়, বাস্তবে এ উদাহরণও আছে অনেক। ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে পরকালীন ক্ষতির পাশাপাশি দুনিয়াবীও অনেক ক্ষতি হচ্ছে। দিনে-রাতে প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। যার পভাব পড়ছে দৈনন্দিন কাজে-কর্মে। সময়ের কাজ সময়ে করা হচ্ছে না। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সব ক্ষতি যদি বাদও দেওয়া হয়, তবু এর সময় নষ্ট করার যে ক্ষমতা, একজন মানুষের জীবনের সম্ভবনাগুলো শেষ করে দিতে তা-ই যথেষ্ট। এর পাশাপাশি যদি চারিত্রিক ক্ষতিকে যোগ করা হয়, তাহলে কীভাবে একজন দুর্বল ঈমানদারের জন্য এর ব্যবহার কীভাবে জায়িয হতে পারে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম জাওযী রহ. বলেন, সময়ের অপচয় মৃত্যুর চেয়েও জঘন্য। কেননা, মৃত্যু তো শুধু দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, কিন্তু সময়ের অপচয় মানুষকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ১৩৮
একজন মানুষ যখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে লিপ্ত থাকে, তখন তার ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অসংখ্য গুনাহ হতে থাকে। অন্তরে গুনাহের কালো দাগ পড়তে থাকে। কালো দাগ পড়তে পড়তে একসময় অন্তর শক্ত হয়ে যায়। অন্তর অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। ফলে আল্লাহর কথা, নবীজীর কথা, আখিরাতের কথা আর অন্তরকে স্পর্শ করে না। যদিও সে তখন আমল জারীও রাখে, তথাপি সে আমলে থাকে না কোনো প্রাণ। সে ইবাদত হয় ভাস্কর্যের মতো প্রাণহীন। দুআতে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না। জিহ্বায় যিকির-আযকার ও তিলাওয়াতের স্বাদ অনুভূত হয় না। হৃদয়ে থাকে না প্রশান্তি বলে কিছু। এ যেন এক মৃত অন্তর।
প্রশান্ত একটা অন্তর পেতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের জাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকলে অন্তর ঠান্ডা থাকে। যেকোনো আগ্রহী ব্যক্তি সপ্তাহখানেক অনলাইন থেকে দূরে থাকলেই এর বাস্তবতা বুঝতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের ভেবে দেখে দরকার, বাস্তবে স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রয়োজন কতটুকু আমার? এ ছাড়া কি আমি চলতে পারবো না? যারা ব্যবহার করছেন না তাদের কি দিন পার হচ্ছে না? যাদের একান্ত প্রয়োজন তাদের কথা বাদ দিলাম। আপনার কতোটুকু প্রয়োজন ভেবে দেখুন। চিন্তা করে দেখুন, এর কারণে দৈনিক আপনার কী পরিমাণ কবীরা গুনাহ হচ্ছে। কতোবার পরনারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ছে। কতো সময় অপচয় হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজ রেখে কতো সময় অর্থহীন কাজে ব্যয় হচ্ছে। ধ্বংসের যে অতল গহ্বরে আমরা পড়ে আছি, তা থেকে যদি নিজেরা উদ্ধার না হই, কেউ এসে উদ্ধার করবে না। উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। নিজের উন্নতির চিন্তা নিজেকেই করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى (٤٠) فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
আর যে বক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজের আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখে, জান্নাত হবে তার আশ্রয়স্থল। ১৩৯
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকটা বুঝে সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১৩৭. রূহুল বায়ান : ১/৩৬৩। সূরা বাকারার ২৩৩নং আয়াতের ব্যাখ্যায়। মাকতাবা শামেলা সংস্করণ।
১৩৮. আলফাওয়াইদ : ৩৬।
১৩৯. সূরা নাযিআত : ৪০-৪১।
📄 সৎ কাজে এগিয়ে থাকা
শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. স্বীয় জীবনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন, আমি গ্রীষ্মকালের দুপুরে যোহরের নামাযের কিছু সময় পূর্বে হারামের চত্তরে বসা ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে লোকদের পানি পান করাতে লাগলো। কেউ তার ডান হাত থেকে, কেউ তার বাম হাত থেকে পানপাত্র নিচ্ছিলো। আর বৃদ্ধ যমযম কূপ থেকে পানি নিয়ে সকলকে পানি পান করাচ্ছিলেন।
একে একে তিনি বড় এক দলকে পানি পান করিয়ে ফেললেন। পরিশ্রমের ফলে তাঁর শরীর থেকে ঘাম ঝরছিলো। অথচ অন্যান্য লোক বসে বসে অপেক্ষা করছিলো কখন তার পালা আসবে আর সে সেই বৃদ্ধের কাছ থেকে পানি পান করবে।
শাইখ আবু গুদ্দাহ রহ. এই ঘটনা বর্ণনা করে নিজের মন্তব্য বর্ণনা করলেন, আমি আশ্চর্য হচ্ছিলাম তার শরীর এবং তাঁর ধৈর্য দেখে। লোকদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখে। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে লোকদের পানি পান করানো দেখে।
আমি বুঝতে পেরেছি, ভালো কাজ করা সে লোকদের জন্য সহজ, যার জন্য আল্লাহ তাআলা তা সহজ করে দেন। আল্লাহ তাআলার কাছে ভালো কাজের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যাকে পছন্দ করেন, তাকে তা থেকে দান করেন। আল্লাহ তাআলাই ভালো গুণ ও বৈশিষ্ট্য দানকারী।
খুব অল্প সংখ্যক লোকই নিচের দুটি গুণের অধিকারী হয়ে থাকে-
• মানুষের সাথে সৎ ব্যবহার করা।
• কাউকে কষ্ট না দেওয়া। ১৪০
যে ছেলে বড় হবে শৈশবেই বুঝা যায়
হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. শৈশবে কোনো বখাটে ছেলেদের সাথে মিশতেন না। দুষ্ট ছেলেদের সাথে খেলাধুলা করতেন না। শৈশবেই তাঁর মাঝে ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো। তাঁর খেলাধুলার ধরন ছিলো, খোলা মাঠে তিনি জামাআতে নামায পড়ার ধরন নকল করতেন। বিশেষ প্রয়োজনে বাজারে যাওয়ার পথে মসজিদ নজরে পড়লে সোজা মসজিদে প্রবেশ করে মিম্বারে দাঁড়াতেন এবং খুতবার ন্যায় কিছু পড়ে ফিরে আসতেন। যেনো অপরিপক্ক বয়সেই ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি তিনি টেনে আনতেন। মাত্র বারো বছর বয়সেই তাঁর তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠেছিলো। ফলে গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ ও তাসবীহ পড়ায় আত্মনিয়োগ করতেন। তাঁর মা জীবিত ছিলেন না, ফলে তিনি তাঁর নানীর নিকট থাকতেন। নানী তাঁর ব্যাপারে খুব দুঃখ করে বলতেন, এতো ছোট্ট বয়সে এতো কষ্ট করছে। ১৪১
হাকীমুল উম্মাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, ছাত্ররা যদি চান্ত, ইশরাকের সময় কমপক্ষে দুই রাকআত নামায পড়ে নেয় আর শেষরাতে পড়ার জন্য উঠার সময় দুই রাকআত তাহাজ্জুদ পড়ে কিতাব শুরু করে এমনিভাবে চলাফেরার সময় অনর্থক কথাবার্তা না বলে দরূদ শরীফ পড়ে তাহলে বলুন, এতে তাদের পড়ালেখায় এমন কী সমস্যা হয়ে যাবে।
উপরোক্ত ইবাদতের ফলে তাদের ভেতরে এমন অবস্থা তৈরি হবে, যার ফলে তাদের মাঝে ইবাদতের নূর ও যিকিরের যোগ্যতা তৈরি হয়ে যাবে। উপরন্তু তাদের লেখাপড়ায়ও কোনো ত্রুটি হবে না। ১৪২
তাকবীরে উলা ছুটে যাওয়ার কারণে অনুশোচনা
'তাযকিরাতুর রশীদ' নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, এক বছর দারুল উলূম দেওবন্দের এক পাগড়ি প্রদান অনুষ্ঠানে মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. যখন গিয়ে পৌঁছেছেন তখন আসরের নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিলো। নামায পড়ানোর জন্য হযরত মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবী রহ. জায়নামাযে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের প্রচণ্ড ভীড় এবং মুসাফাহার প্রচুর চাপ থাকা সত্ত্বেও দ্রুততার সাথে যখন তিনি নামাযে শরীক হলেন, তখন কিরাআত শুরু হয়ে গিয়েছিলো। সালাম ফিরানোর পর দেখা গেলো, হযরত গাঙ্গুহী রহ. মনোক্ষুণ্ণ এবং তাঁর চেহারায় চিন্তার ছাপ।
হযরত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে লাগলেন, আফসোস! দীর্ঘ বাইশ বছর পর আজ তাকবীরে উলা ছুটে গেলো। ১৪৩
নামাযকে বলো না কাজ আছে, কাজকে বলো আমার নামায আছে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্দর চরিত্র ও উত্তম গুণাবলির মাধ্যমে পৃথিবীতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছেন এবং মাত্র তেইশ বছরে পুরো আরব ভূখণ্ডের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। বরং পুরো পৃথিবীর চেহারা পাল্টে দিয়েছেন।
এই বিপ্লব সাধন হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মাতকে যে কাজ করার হুকুম দিতেন, প্রথমে তিনি সে কাজটির উপর নিজে আমল করতেন। যেমন, আমাদের তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার হুকুম দিয়েছেন অথচ তিনি দৈনিক আট ওয়াক্ত নামায পড়তেন। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায, চান্ত, ইশরাক ও তাহাজ্জুদের নামায। বরং তাঁর অবস্থা ছিলো, যখনই তিনি কোনো বিপদের সম্মুখীন হতেন, তখনই তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। ১৪৪ আল্লাহ তাআলার প্রতি মনোনিবেশ হয়ে দুআ শুরু করে দিতেন। আর তিনি বলতেন جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ -আমার চোখের শীতলতা হচ্ছে নামায। ১৪৫
বুযুর্গানে দীনের বৃদ্ধ বয়সে মামূলাতের প্রতি গুরুত্বারোপ
মাওলানা আশিক ইলাহী বুলন্দ শহরী রহ. নিজের সফরের একটি ঘটনা উল্লেখ করে লিখেন, একবার হযরত খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. জয়পুর সফর করছিলেন। আমি তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের গাড়ি ইশার সময় গিয়ে পৌঁছলো। মেজবান আমাদেরকে নিয়ে একটি সরাইখানায় উঠলেন। তা ছিলো খুবই সংকীর্ণ ও অন্ধকারচ্ছন্ন। কামরাগুলোতে না ছিলো আলোর ব্যবস্থা, না ছিলো খানা-পিনার কোনো উপকরণ।
কোনো রকম একটি চেরাগ জ্বালিয়ে মেজবান আলো ও খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য বাইরে গেলেন। হযরতের সাথে আমার অসংখ্যবার সফর করার সুযোগ হয়েছে। ফলে আমার খুব ভালো করেই জানা ছিলো, হযরত তাঁর নিয়মিত আমলগুলো খুব নিয়ম করে পালন করেন। তবে আজকের কষ্ট ক্লেশের কথা মনে করে আমার ধারণাও হয়নি, হযরত আজ রাতেও তাহাজ্জুদের জন্য উঠবেন। এদিকে যে চেরাগ জ্বালানো হয়েছিলো, তা মিটমিট করে জ্বলছিলো। একপর্যায়ে তাও নিভে গেলো। ফলে শুয়ে পড়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উপায় ছিলো না।
সুবহে সাদিকের কিছুক্ষণ পূর্বে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেলো। হযরতের খাটের দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি খাটে নেই, আমি ভয় পেয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম, আর খুঁজতে লাগলাম, হযরত কোথায় গিয়েছেন।
তারার আলোতে দূরে একটি মসজিদ দেখতে পেলাম। হযরতের খুঁজতে আমি সেদিকে গেলাম। মসজিদের বারান্দায় পা রাখতেই হযরতের আওয়াজ কানে আসলো। মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে তিলাওয়াত করছেন আর আপন প্রভুর দাসত্বের হাজিরী হিসেবে আমল করে যাচ্ছেন। হযরতের আওয়াজে ক্রন্দন ও কম্পন ছিলো আর কণ্ঠস্বর ছিলো ডর ও ভয় মিশ্রিত।
ভয়ে আমার শরীরে ঘাম এসে গেলো আর আমি নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলাম। ধিক! তোর যৌবনের প্রতি, হযরত এই বৃদ্ধ বয়সে দুর্বলতা সত্ত্বেও এতো কর্মক্ষম আর তুই এই ভরা যৌবনেও দুর্বল ও অক্ষম। ১৪৬
ছাত্রদের একটি ভ্রান্ত ধারণা
ছাত্রদের মধ্যে এই ধারণা কাজ করে যে, এখন তো পড়ালেখা করছি, যখন পড়ালেখা শেষ হয়ে যাবে তখন কোমর বেঁধে ইবাদতে নেমে যাবো। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা।
যে গুনাহ আজ ছাড়তে পারছো না, তা কখনোই ছাড়তে পারবে না। যে ইবাদত আজ করতে পারছো না, তা কখনোই আর করতে পারবে না। নিজের প্রতি আজ যার নিয়ন্ত্রণ নেই, কালও তুমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বরং আজ আমল করা সহজ। যত সময় অতিবাহিত হবে ধীরে ধীরে খারাপ অভ্যাসগুলো অন্তরে গেঁথে যাবে। ১৪৭ জনৈক কবি বলেন-
إِنَّ لِلَّهِ عِبَادًا فُطُنًا + طَلَّقُوْا الدُّنْيَا وَخَافُوا الْفِتَنَا نَظَرُوا فِيهَا فَلَمَّا عَلِمُوا + أَنَّهَا لَيْسَتْ لِحَيِّ وَطَنَا جَعَلُوْا حُجَّةً وَاتَّخَذُوْا + صَالِحَ الْأَعْمَالِ فِيْهَا سُفُنَا
আল্লাহ তাআলার এমন কিছু বুদ্ধিমান বান্দা রয়েছে, যারা ফিতনা ফাসাদের ভয়ে দুনিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে। দুনিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করে তাঁরা এই ফলাফলে উপনীত হয়েছেন যে, দুনিয়া কোনো জীবন্ত মানুষের আবাসস্থল নয়। তাই তারা দুনিয়াকে এক উত্তাল সমুদ্র হিসেবে ভেবে নিয়ে সৎ আমলের কিস্তির মাধ্যমে তা পার করেছেন।
এক বৈঠকে ২৬ পারা তিলাওয়াত!
মুহাদ্দিসুল আসর হযরতুল আল্লামা মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরী রহ. বলতেন, যখন আমি দারুল উলূম দেওবন্দের ছাত্র ছিলাম তখন একদিন একটি ছোট কাঁচা মসজিদে ফজর নামায পড়েছি, সে মসজিদে জুমআর নামায হতো না।
নামাযের পর আমি মাটিতে চাদর বিছিয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করে দিলাম। জুমআর নামাযের আগ পর্যন্ত এক বৈঠকে ছাব্বিশ পারা পড়ে ফেললাম। যেহেতু জুমআর জন্য অন্য মসজিদে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো, তাই পুরো খতম দিতে পারিনি। অন্যথায় খতম করে উঠতাম। ১৪৮
হযরত হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সময় এই পরিমাণ মনোনিবেশ করো, যেনো তিলাওয়াতের সময় তোমার অবস্থা এমন হয় যে, তুমি মনে করবে, এই তিলাওয়াত আমি করছি না, বরং আল্লাহ তাআলা আমাকে দিয়ে পড়াচ্ছেন। যেমন, রেডিও থেকে তো আওয়াজ বের হয় কিন্তু এই আওয়াজ সেই রেডিও এর নয়, বরং তা কোনো মানুষের, যা এই রেডিও এর মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে। এ রকমই উপলব্ধি থাকা চাই তিলাওয়াতের সময়। ১৪৯
টিকাঃ
১৪০. লা তাহযান: ২৯।
১৪১. বরুকা বাচপন: ৬৩।
১৪২. তুহফাতুল উলামা : ১/১২৯।
১৪৩. তাযকিরাতুর রশীদ: ২/১৬।
১৪৪. মিশকাত: ১১৭, কিতাবুস সালাহ, বাবুত তাতাউউ।
১৪৫. সুনানুন নাসায়ী: ২/৯৩, কিতাবু আশারাতিন নিসা।
১৪৬. তাযকিরাতুল খলীল : ৫৬।
১৪৭. আদাবুল মুআশারাত: ২৪৫।
১৪৮. উশাকে কুরআনে কারীম কে ঈমান আফরূয ওয়াকিআত : ১৭৮।
১৪৯. মাজালিসে ইলম ও যিকির: ২/৫০।