📄 উত্তম চরিত্র গঠন
তুমি তালিবুল ইলম। তুমি নবীর ওয়ারিস। তোমার চরিত্র এমন হওয়া উচিত যে, তোমার মধ্যে অহংকার থাকবে না। বরং বিনয় ও নম্রতা থাকবে। থাকবে না হিংসা ও ক্রোধ। থাকবে শুধু সকলের কল্যাণকামিতা ও সহমর্মিতার মনোভাব। লৌকিকতা থাকবে না, বরং আল্লাহর জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকবে। সর্বক্ষেত্রে উত্তম চরিত্র গ্রহণ করবে এবং মন্দ চরিত্র থেকে বিরত থাকবে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ঘটনা
তাফসীরে দুরে মানছুরে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একবার তাঁর সামনে এক ব্যক্তি বললো, অমুক অমুক ব্যক্তিদের মাঝে পারস্পরিক ঝগড়া আছে। ফলে একজন অপরজনকে ছেড়ে দিয়েছে।
তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বললেন, তোমরা কি মনে করেছো যে, আমি তোমাদেরকে বলবো, যাও, তোমরা তাদের দুজনের সাথে যুদ্ধ করো। কখনো না, বরং যাও, তাদেরকে নম্রভাবে বুঝাও। যদি তারা মেনে নেয়, তবে তো ভালো। আর যদি না মানে তাহলে তাদের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে নিজের চিন্তায় লেগে থাকো।
বর্তমানে এই বিষয়টি খুবই জরুরী
হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, বর্তমানে এই বিষয়টি খুবই জরুরী যে, প্রত্যেকই নিজের চিন্তায় বিভোর থাকা এবং নিজের সংশোধনে সচেষ্ট হওয়া। নিজের খবর না রেখে অন্যের সংশোধনে বিভোর থাকার রোগ আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
কবি বলেন,
تھے جو اپنے عیوب سے بے خبر + رہے دیکھتے اور و روں کے عیب وہنر پڑی اپنی برائیوں پہ جو نظر + تو جہاں میں کوئی برا نہ رہا
যতক্ষণ ছিলো অনবহিত নিজের দোষ-ত্রুটি, কেবল নজরে পড়ছিলো অন্যের দোষ-ত্রুটি। যখনই পড়লো দৃষ্টি নিজের ত্রুটি, মন্দ রইলো না আর পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি।
নিজের হাকীকত ভুলে যেয়ো না
হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- বনী ইসরাইলের তিনজন ব্যক্তি ছিলো। একজন কুষ্ঠরোগী, দ্বিতীয়জন টাকওয়ালা আর তৃতীয়জন অন্ধ। আল্লাহ তাআলা এই তিনজনকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। সে লক্ষ্যে তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে কুষ্ঠরোগীর কাছে গিয়ে বললেন, তোমার পছন্দনীয় জিনিস কী? কুষ্ঠরোগী বললো, ত্বক ফর্সা হওয়া ও আমার শরীরের চামড়া সুন্দর হওয়া। কেননা, এই রোগের কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে。
ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিলেন। এতে তার রোগ দূর হয়ে গেলো এবং তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দেওয়া হলো। এরপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?
সে বললো, উট বা গাভী [কুষ্ঠরোগী এবং টাকওয়ালাএ দুজনের একজন উটের কথা বলেছেন, অপরজন গাভীর কথা। কিন্তু বর্ণনাকারীর সন্দেহ হয়ে গেছে যে, কে কোনটা বলেছিলো] তার চাহিদার ভিত্তিতে তাকে ১০ বাচ্চা বিশিষ্ট একটি উট দেওয়া হলো। এরপর ফেরেশতা তার জন্য দুআ করলেন, এতে তোমার জন্য বরকত হোক।
এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে এসে বললেন, 'তুমি কী চাও?
সে বললো, সুন্দর চুল চাই, যেন আমার এই রোগ ভালো হয়ে যায়। কেননা, এ রোগের কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলালে তার রোগ দূর হয়ে যায় এবং মাথায় সুন্দর চুল গজায়।
এরপর ফেরেশতা তাকে বললেন, তুমি কোন সম্পদ পছন্দ করো?
সে বললো, গাভী। ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দিয়ে বললেন, এতে তোমার বরকত হোক। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে এসে বললেন, তুমি কী চাও?
সে বললো, আমি চাই, আল্লাহ যেন আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন এবং আমি মানুষদের দেখতে পাই। ফেরেশতা তার চোখে হাত বুলালে আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা বললেন, কোন সম্পদ তোমার পছন্দ?
সে বললো, ভেড়া-ছাগল। ফেরেশতা তাকে বাচ্চাদানকারী একটি ছাগল দিলেন।
প্রথম দুজনের পশুও বাচ্চা জন্ম দিলো এবং এই অন্ধের ছাগলও বাচ্চা জন্ম দিলো। সকলের সম্পদে এতো বরকত হলো যে, প্রথমজনের উটে পুরো একটি উপত্যকা ভরে গেলো। এমনিভাবে দ্বিতীয়জনের গাভী দিয়ে একটি উপত্যকা আর তৃতীয়জনের ছাগল দিয়ে একটি উপত্যকা ভরে গেলো।
দীর্ঘদিন পর সেই ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে তার পূর্বাকৃতিতে [কুষ্ঠরোগীর আকৃতিতে] এসে তাকে বললেন, 'আমি একজন দরিদ্র-মিসকীন মানুষ। ভ্রমণের সকল সম্বল রাস্তায় শেষ হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ এবং তারপর আপনি ব্যতীত আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। সেই সত্তা, যিনি তোমাকে এই সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া দিয়েছেন এবং উটের আকৃতিতে তোমাকে অনেক ধন-সম্পদ দান করেছেন তার ওসীলায় আমি তোমার কাছে শুধু একটি উট চাই, যেন আমার ভ্রমণ পুরা হয়ে যায়।'
সে ব্যক্তি বললো, আমার অনেক দায়িত্ব ও যিম্মাদারী আছে। [আমি তোমাকে কিছু দিতে পারবো না]
ফেরেশতা বললেন, আমি মনে হয় তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি কি ইতিপূর্বে কুষ্ঠরোগী ছিলে না, মানুষজন তোমাকে তিরষ্কার করতো? তুমি কি দরিদ্র ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন।
সে বললো, আমি এই সম্পদ আমার বাপ-দাদার থেকে ওয়ারিস সূত্রে পেয়েছি।
ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যুক হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহ তাআলা যেনো তোমাকে সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, যে অবস্থায় তুমি ইতিপূর্বে ছিলে।
এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে তার পূর্বের আকৃতিতে আসলেন এবং তার কাছে তা-ই বললেন, যা কুষ্ঠরোগীর কাছে গিয়ে বলেছিলেন। সেও ঠিক তেমনি উত্তর দিলো, যেমন উত্তর কুষ্ঠরোগী দিয়েছিলো। ফেরেশতা তাকেও [বদ দুআ দিয়ে] বললেন, যদি তুমি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহ তাআলা যেনো তোমাকে তোমার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।
অতঃপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে তার পূর্বের আকৃতিতে এসে বললেন, আমি এক মিসকীন মুসাফির, যার ভ্রমণের সকল সম্বল ও উপকরণ রাস্তায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ এবং আপনি ব্যতীত আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে আমার বাড়ি পৌঁছাবে। যে আল্লাহ আপনাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন তার ওসীলায় আমি আপনার কাছে একটি ছাগল চাচ্ছি, যেন আমার সফর পুরা করতে পারি।
অন্ধ ব্যক্তি বললো, অবশ্যই আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ও নিঃস্ব ছিলাম, আল্লাহ আমাকে ধনী বানিয়েছেন। [এগুলো তার দেয়া সম্পত্তি] তোমার যত মন চায়, নিয়ে নাও। আল্লাহর কসম, আজ আমি কোনো জিনিসে তোমার সাথে কঠোরতা ও সংকীর্ণতা করবো না। তোমার মন যা চায়, নিয়ে নাও।
ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তোমার কাছে রেখে দাও। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা নিয়েছেন, আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার দুই সাথীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন।
ফায়দা
মানুষের একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো, বিপদে হতাশ হওয়া ও মনোবল হারিয়ে ফেলা এবং আনন্দ ও সুখের সময় আয়েশে মত্ত হয়ে নিজের মৌলিক অবস্থা ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। যদি কোনো দল ও গোষ্ঠীর চরিত্র এমন হয় যে, তারা মুসীবতে ধৈর্যশীল এবং সুখের সময় কৃতজ্ঞ হয় তবে এটা তাদের উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ এবং এটা তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনকে আল্লাহ তাআলা যে সকল বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম হলো-
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধৈর্য্য ও কৃতজ্ঞতার সম্পদে সম্পদশালী করেছিলেন। তাদেরকে এই সম্পদ তাদের জ্ঞানের কারণে নয়, বরং আল্লাহ তাআলা নিজের জ্ঞান ও ধৈর্য্যের সামান্য পরিমাণ তাদের দান করেছেন। এই ধৈর্য আর কৃতজ্ঞতা তারই ফসল।
আমি অমুকের ছেলে অমুক, তুমি কে?
হযরত উবাই ইবনে কাব রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে একবার দুই ব্যক্তি একে অন্যের বংশের বিশ্লেষণ করতে শুরু করলো। একজন বললো, আমি অমুকের ছেলে অমুক। তুমি কে? তোমার তো মা নেই? এটা একটা অবজ্ঞাসূচক বাক্য। রাসূলুল্লাহ [এই কথা শুনে] বললেন, মূসা আলাইহিস সালাম এর যুগে দুইব্যক্তি পরস্পরের বংশ বিশ্লেষণ করছিলো। তাদের একজন বলেছিলো, আমি অমুকের ছেলে অমুক -এভাবে সে তার পূর্ব পুরুষের নয়জনের নাম বলেছে- তুমি কে? তোমার তো মা নেই? উত্তরে অপরজন বলেছিলো, আমি অমুকের ছেলে আর অমুক ইসলামের ছেলে। [অর্থাৎ আমার নাম এই, আমার বাবার নাম এই আর তিনি ইসলামের ছেলে, অর্থাৎ মুসলমান ছিলেন] তখন আল্লাহ তাআলা মূসা আলাইহিস সালাম এর কাছে এ মর্মে ওহী পাঠালেন যে, এ দুইজন বংশ বিশ্লেষণকারী। এদের মধ্যে হে সেই ব্যক্তি, যে জাহান্নামের নয়জন পূর্বপুরুষের নাম গণনা করেছো, তুমি তাদের দশমজন। আর হে সেই ব্যক্তি, যে জান্নাতের দুইজনের বংশ বর্ণনা করেছো। তুমি জান্নাতে তাদের তৃতীয়জন।
অহংকার তিন প্রকার
মুফতী শফী রহ. বলেন, অহংকারের স্তর তিনটি। যথা-
১. استکبار : যে অহংকার অন্তরে থাকে, কাজকর্মে প্রকাশ পায় না। তাকে আরবীতে 'ইস্তিকবার' বলে। কুরআনে কারীমের ইরশাদ হয়েছে-
انه لا يحب المستكبرين : নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুস্তাকবিরীনদেরকে (অহংকারী) পছন্দ করেন না।
২. যে অহংকার অন্তরেও থাকে, কাজকর্মেও প্রকাশ পায়। এ স্তরকে আরবীতে 'মুখতাল' বলা হয়।
৩. যে অহংকার অন্তরেও থাকে, কাজকর্মেও প্রকাশ পায় এবং মুখেও চর্চা হয়। এটাকে আরবীতে 'ফাখুর' বলা হয়। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে-
إن الله لا يحب كل مختال فخور : নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কোনো অহংকারী ও ঔদ্ধত্যকারীকে পছন্দ করেন না।
গালীর জবাব আল্লাহ ওয়ালারা কীভাবে দিতেন
হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর সম্মানিত উস্তাদ মাওলানা আহমাদ আলী রহ. এর শিশুকালের অবস্থা ছিলো, খেলাধুলার মধ্যে যখন অন্যান্য শিশুরা তাকে গালী দিতো, তখন তিনি তাদেরকে গালী দিতেন না। তার সবচেয়ে বড় প্রতিউত্তর ছিলো, তোমরাই এমন। কী মজার উত্তর। আর শিশুকালেই এতটুকু উত্তর দিতেন, পরে এতটুকুও দিতেন না। এটাই আহলুল্লাহদের পদ্ধতি।
শেখ সাদী রহ. এর স্মরণীয় একটি বাণী
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. শেখ সাদী রহ. এর একটি বক্তব্য বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা যখন কাউকে অপদস্ত করতে চান, তখন সে ভালো মানুষদের মন্দ কাজগুলোতে লিপ্ত হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা যখন কারো গোপনীয়তা লুকাতে চান, তখন সে কোনো দোষী ব্যক্তিরও খারাপ বলে না।
মানুষের শরীরের সবচেয়ে খারাপ ও সবচেয়ে ভালো দুটি অঙ্গ
লুকমান হাকীমের মনিব একদিন তাকে বললেন, একটি ছাগল যবাই করে তার সবচেয়ে উত্তম দুটি অংশ আমার কাছে নিয়ে আসো। তিনি ছাগল যবাই করে তার হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা মনিবের কাছে নিয়ে আসলেন।
মালিক আবার হুকুম দিলেন, আরেকটি ছাগল যবাই করে তার সবচেয়ে খারাপ দুটি অংশ আমার কাছে নিয়ে আসো। তিনি ছাগল যবাই করে এবারও তার হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা মনিবের কাছে নিয়ে আসলেন।
মনিব বললেন, আমি যখন সবচেয়ে উত্তম দুটি অংশ আনতে বলেছি, তখনও এই দুটি অংশই এনেছো। আবার যখন সবচেয়ে খারাপ দুটি অংশ আনতে বলেছি তখনও এ দুটি অংশই এনেছো? এর কারণ কী?
হযরত লুকমান হাকীম বললেন, ওহে মালিক! হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা ভালো থাকলে এ দুটি অংশ থেকে উত্তম শরীরের অন্য কোনো অংশ হতে পারে না। আবার এ দুটি অংশ নষ্ট হয়ে গেলে এর চেয়ে খারাপ কোনো অংশ হতে পারে না। এ জন্য এ দুটি অংশই সবচেয়ে উত্তম, আবার এ দুটি অংশই সবচেয়ে খারাপ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নিআমত
জিহ্বা আল্লাহ প্রদত্ত বিরাট বড় নিআমত। অনেককে তিনি জিহ্বা দিয়েছেন, কিন্তু তাতে বলার ক্ষমতা দেননি। আল্লাহ তাআলার লাখো কোটি শুকর যে, তিনি আমাদের জিহ্বাতে বলার ক্ষমতা দিয়েছেন।
এটা কতবড় নিআমত, এ নিয়ে সামান্য সময় চিন্তা করুন। এ মেশিনটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সাথে থাকে। এটার সার্ভিসিংয়ের প্রয়োজন পড়ে না, পেট্রোলেরও প্রয়োজন হয় না। খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার প্রয়োজনও হয় না। কিন্তু এই মেশিন আমাদের মালিকানা সম্পদ নয়, বরং এটি আমাদের কাছে আল্লাহ তাআলার আমানত। যেহেতু এটা আমানত, তাই এটিকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করতে হবে। এমন যেন না হয় যে, মনে যা আসলো তা-ই বলে দিলাম। বরং যে কথা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হবে, সেটাই বের করবো, কখনো কোনো অশ্লীল ও গুনাহের কথা বলবো না।
সত্য বলার বরকতে তিনি বেঁচে গেলেন
হযরত হাসান বসরী রহ. অনেক বড় বুযুর্গ ছিলেন। ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উপর অনেক যুলুম করেছিলো। একবার হাজ্জাজ ইবনে ইউছুফ তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য রওয়ানা করেন। হাসান বসরী রহ. জানতে পেরে সে সময়ের অনেক বড় বুযুর্গ হাবীব আজমী রহ. এর ইবাদতখানায় লুকিয়ে গেলেন। হাসান বসরী রহ.এর পিছে পিছে হাজ্জাজও সেখানে গিয়ে পৌঁছে হাবীব আজমী রহ. -কে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি হাসান বসরীকে দেখেছেন?
হ্যাঁ, সে আমার ইবাদত খানায় লুকিয়ে আছে। হাজ্জাজ ভিতরে গিয়ে হাসান বসরী রহ.-কে কোথাও পেলো না। বাইরে এসে হাবীব আজমী রহ.-কে বললো, 'আপনি মিথ্যা বললেন কেনো? হাসান বসরী তো ভেতরে নেই?
তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি মিথ্যা বলিনি, সে ভেতরেই আছে।
হাজ্জাজ দুই তিনবার খোঁজাখুঁজি করলো, কিন্তু হাসান বসরী রহ.- কে কোথাও পেলো না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেলো। তার যাওয়ার পর হাসান বসরী রহ. বাইরে এসে বললেন, হে হাবীব, আমি জেনে গেছি, আল্লাহ তাআলা আপনার বরকতে আমাকে বাঁচিয়েছেন। হযরত হাবীব আজমী রহ. বললেন, না, আমার বরকতে না, বরং এটা আমার সত্য বলার ফসল, যা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন। যদি আমি মিথ্যা বলতাম, তাহলে আমাদের দুজনকেই সে লাঞ্ছিত করতো।
তাকওয়া আপনি কীভাবে অর্জন করবেন
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, 'সাদেক্বীন' সেই সব লোকদের বলে, যাদের নিয়ত হয় খালেস এবং যাদের কথা হয় সত্য। আর যাদের নিয়ত ও কথা বিশুদ্ধ হয়, তাদের আমলও বিশুদ্ধ হয়। তারা সবসময় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ব্যাকুল থাকেন। যে সকল লোকদের নিয়ত বিশুদ্ধ, কথা বিশুদ্ধ এবং আমলও বিশুদ্ধ, আপনি তাদের সঙ্গ গ্রহণ করুন, তাকওয়া এমনিতেই এসে যাবে।
শেখ সাদী রহ. এর প্রতি তাঁর পিতার আশ্চর্য উপদেশ
'গুলিস্তাঁ'র দ্বিতীয় অধ্যায়ে শেখ সা'দী রহ. লিখেছেন, শৈশবে আমি রাত-দিন ইবাদতে লিপ্ত থাকতাম। সবসময় কুরআন কারীম বগলে রাখতাম। একরাতে বাবার খিদমাতে উপস্থিত ছিলাম। কিছু লোক ওদিকে ঘুমিয়েছিলো। আমি বাবাকে বললাম, এদের কী হলো! এরা এমনভাবে ঘুমিয়ে আছে, যেন মরে গেছে। আহ্! যদি এরা সজাগ থেকে দুই রাকআত নামায পড়তো!!
বাবা বললেন, 'প্রিয় বৎস! ইবাদত না করে যদি তুমি এ সময় ঘুমিয়ে থাকতে, তাহলে আরও ভালো হতো। কেননা, কমপক্ষে তুমি গীবতের মতো জঘন্য গুনাহ থেকে বাঁচতে পারতে।
ইমাম বুখারী রহ. এর বক্তব্য
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর একটি বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। বক্তব্যটি হলো-
ما اغتبت أحدا منذ علمت أن الغيبة حرام، لأرجو أن ألقى الله ولا يحاسبني أني اغتبت أحدا
যখন থেকে আমি জানতে পেরেছি, গীবত হারাম তখন, থেকে আমি কারো গীবত করিনি। আমি আশা করছি যে, আমি আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাত করবো আর তিনি আমাকে কারো গীবত করেছি কিনা এ মর্মে জিজ্ঞাসা করবেন না।
খলীফার ক্ষমা প্রার্থনা
একবার খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক রাগান্বিত হয়ে একব্যক্তিকে অনেক গালী দিয়ে ফেলেছিলেন। সে ব্যক্তি চুপ থেকে শুনছিলো। খলীফা যখন একটু চুপ হলেন তখন সে ব্যক্তি বললো, আমীরুল মুমিনীন, এ ধরনের নোংরা গালী দিতে আপনার লজ্জা হয় না? আল্লাহ কি আপনাকে শাসনক্ষমতা দিয়েছেন প্রজাদেরকে গালী দেওয়ার জন্য?
হিশামের রাগ তখন চলে গিয়েছিলো। সে ব্যক্তির কথা শুনে তিনি অনেক লজ্জিত হয়ে বললেন, ভাই, তুমি আমাকে গালী দিয়ে তোমার প্রতিশোধ নিয়ে নাও।
সে ব্যক্তি বললো, গালী দিয়ে আমি কি সেই ভুল করবো, যা আপনি করেছেন? আমি তো মুখ থেকে গালী বের করাকে গুনাহ মনে করি।
হিশাম বললেন, আচ্ছা, বিনিময়ে তুমি রুপিয়া চেয়ে নিয়ে নাও। সেই ব্যক্তি বললো, জনাব, রুপিয়া তো গালীর বিনিময় হতে পারে না।
হিশাম বললেন, ভাই, তাহলে আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দাও।
সেই ব্যক্তি বললো, ‘জ্বী, এবার ঠিক আছে। আমি আল্লাহ তাআলার জন্য আপনাকে মাফ করে দিলাম’।
হিশাম মাথা ঝুঁকিয়ে চুপ করে রইলেন কতক্ষণ। কিছুক্ষণ পর বললেন, আল্লাহর কসম, ভবিষ্যতে আমি কাউকে কখনো গালী দেবো না।
যে গুনাহের ব্যাপারে অনেকেই উদাসীন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سباب المسلم فسوق وقتاله كفر
মুসলমানকে গালী দেওয়া ফাসেকী। আর মুসলমানকে হত্যা করা কুফুরী।
হযরত মাওলান মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী [দা.বা.] বলেন, রাগে গোস্সায় কাউকে এমনভাবে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা, যারফলে তার দিল ভেঙে যায়। এটাও অনেক বড় গুনাহ। অথচ অনেকেই এ ব্যাপারে উদাসীন।
সৃষ্টিজীবের প্রতি ভালোবাসা রাখা স্রষ্টার ভালোবাসার দাবী
মাখলুকের সাথে আল্লাহ তাআলার অনেক প্রেম। আপনি নিজেই এটা বুঝতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি শ্রম দিয়ে নিজের হাতে একটা জিনিস বানালো। তার বানানো সেই জিনিসটা পাথর হলেও সেটার প্রতি তার মহব্বত ও ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। সে ভাবে, এটা বানাতে আমি সময় ব্যয় করেছি। পরিশ্রম করেছি। অতএব এটা আমার সম্পদ। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা নিজে মাখলুক বানিয়েছেন। তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনিও তাঁর মাখলুককে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসেন। সুতরাং যদি কারো এই দাবী থাকে যে, সে আল্লাহকে ভালোবাসে, তাহলে আল্লাহ তাআলার মাখলুককেও তার ভালোবাসতে হবে।
আল্লাহওয়ালাকে ভালোবাসলে আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন
আবু হুরাইরা রা. রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অন্য মহল্লায় রওয়ানা হলো। যাওয়ার পথে আল্লাহ তাআলা তার জন্য অপেক্ষমান মানুষরূপী একজন ফেরেশতা বসিয়ে রাখলেন। লোকটি ফেরেশতার কাছে পৌঁছলে সেই ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছেন?
লোকটি বললো, ওই মহল্লায় আমার একজন (মুসলমান) ভাই আছেন, তার সাথে সাক্ষাত করার জন্য।
ফেরেশতা বললেন, তার উপর কি তোমার কোনো হক আছে, যার জন্য তুমি সেখানে যাচ্ছো?
তিনি বললেন, না। সেখানে যাওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার জন্য আমি তাকে মহব্বত করি।
ফেরেশতা বললেন, নিশ্চয় আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য প্রেরিত। [এই সংবাদ দেওয়ার জন্য যে,] নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাও তোমাকে ঠিক ততটাই মহব্বত করেন, যতটা তুমি তাকে মহব্বত করো।
আলী বিন হুসাইন রা. এর সহিষ্ণুতা
ইমাম বাইহাকী রহ. হযরত যাইনুল আবেদীন আলী বিন হুসাইন রা. এর আশ্চর্য একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আলী বিন হুসাইন রা. এর এক বাঁদী তাঁকে উযু করাচ্ছিলেন। হঠাৎ পানির পাত্র তার হাত থেকে ছুটে আলী বিন হুসাইনের গায়ে পড়ে তাঁর কাপড় ভিজে যায়। এ মুহূর্তে ক্রোধ আসা একেবারেই স্বাভাবিক ছিলো। বাঁদী ভয় পেয়ে সাথে সাথে কুরআনের আয়াত পাঠ করলো 'والكاظمين الغيظ' [তারা ক্রোধ সংবরণকারী]। এই আয়াত শোনার সাথে সাথে নববী পরিবারের এই বুযুর্গের সকল রাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। এরপর বাঁদী আয়াতের দ্বিতীয় বাক্য তিলাওয়াত করলেন, 'والعافين عن الناس
[আর তারা মানুষদেরকে ক্ষমাকারী]। এই আয়াত শুনে আলী বিন হুসাইন বললেন, আমি তোমাকে অন্তর থেকে মাফ করে দিলাম। বাঁদী অনেক চালাক ছিলো। সে তৃতীয় বাক্যও শুনিয়ে দিলো, ' والله يحب المحسنين' [আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন]। এই আয়াতে মানুষের প্রতি ইহসান করা এবং সুন্দর ব্যবহার করার দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হযরত আলী বিন হুসাইন রা. এই আয়াত শুনে বললেন, যাও, আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম।
অপরাধীকে মাফ করে দেওয়া একটি মহৎ গুণ
কোমল হৃদয় থেকে যে ডালপালা গজায়, তার মধ্য অন্যতম একটি হচ্ছে, অপরাধী এবং অসৎ আচরণকারীদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া। তাদের থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নিজের উম্মতকে বিশেষভাবে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যদিও ইনসাফের সাথে ভুলের সাজা দেওয়া বৈধ, কিন্তু সাজা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর জন্য ক্ষমা করে দেওয়া অনেক ফযীলতপূর্ণ কাজ।
ইমাম আযম আবু হানীফা রহ. এর সহনশীলতা
লোকভর্তি বাজারে একব্যক্তি আবু হানীফা রহ.-কে গালী দিয়েছিলো এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিলো। ইমাম আবূ হানীফা রহ. ধৈর্য্য ধরলেন, তাকে কিছুই বললেন না। ঘরে এসে একটি থলেতে যথেষ্ট পরিমাণ দীনার-দিরহাম ভরে সেটা নিয়ে গালীদাতার বাড়ীতে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন।
সে ব্যক্তি বের হলে তার সামনে টাকার থলে দিয়ে বললেন, ভাই, আজ আপনি আমার উপর অনেক বড় ইহসান করেছেন। আপনার সাওয়াবগুলো আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। আমি তার বিনিময় পরিশোধের জন্য এই তুহফা নিয়ে এসেছি।
ইমাম আবু হানীফা রহ. এর এই অদ্ভুত আচরণে সে প্রভাবিত হয়ে গেলো। ভবিষ্যতের জন্য এই অসৎ আচরণ থেকে পরিপূর্ণ তাওবা করে নিলো। আবূ হানীফা রহ. এর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁর খিদমাতে উপস্থিত হলেন। তাঁর কাছে ইলম অর্জন করা শুরু করলেন। অবশেষে তিনি আবূ হানীফা রহ. এর ছাত্রদের মধ্যে বড় একজন আলেমের অবস্থান গ্রহণ করলেন।
রাগ উঠলে আপনি কী করবেন
যখন অন্তরে উত্তেজনা ও ক্রোধের অবস্থা তৈরি হয় তখন প্রথমেই সে কাজ করবে, যা আল্লাহ করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وإما ينزغنك من الشيطان نزغ فاستعذ بالله
যখন শয়তান তোমাকে কোনো কুমন্ত্রণা দেয়, তখনই আল্লাহর কাছে [বিতাড়িত শয়তান থেকে] আশ্রয় প্রার্থনা করো।
দ্বিতীয়ত সে কাজ করো, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করতে বলেছেন, যখন মনে ক্রোধের তীব্রতা অনুভূত হবে, তখন যদি তুমি দাঁড়ানো থাকো, তাহলে বসে যাও, এরপরও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয়, তাহলে শুয়ে পড়ো।
রাগ দমনের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে, রাগ হওয়ার সাথে সাথে এই চিন্তা করবে যে, সামান্য অপরাধের কারণে তার উপর যে পরিমাণ রাগ করেছি, তুচ্ছ অপরাধের কারণে আমার আল্লাহও যদি আমার উপর সেই পরিমাণ রাগ করেন, তাহলে আমার কী অবস্থা হবে?
অনুপম ত্যাগ
ইবরাহীম তাইমী এবং ইবরাহীম নাখয়ী রহ. সমকালীন দুইজন মহীয়সী ব্যক্তি। তাঁরা দুজনই উঁচু স্তরের 'তাবে তাবেঈন'। এই উম্মাহের জালিম সরকার হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হাজারো আলেম ও জ্ঞানীদেরকে জেলে ঢুকিয়েছে এবং হাজারো মানুষকে শহীদ করেছে বা করতে চেয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ইবরাহীম নাখয়ী রহ.।
তাকে হাজ্জাজ জেলে নিতে চেয়েছিলো, তাই হাজ্জাজের বাহিনী তাঁর খোঁজে ব্যস্ত ছিলো। আর তিনিও তাদের থেকে আত্মগোপনে থাকতেন।
একদিন হাজ্জাজের বাহিনীকে এক ব্যক্তি বললো, ইবরাহীম অমুক স্থানে আছেন। একই সময়ে ঘটনাক্রমে সেখানেই ইবরাহীম তাইমীও উপস্থিত ছিলেন। হাজ্জাজের সিপাহী তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, ইবরাহীম কে? সে কোথায়? ইবরাহীম তাইমী জানতেন যে, এরা তাঁকে তালাশ করছে না। বরং ইবরাহীম নাখয়ীকে খুঁজছে। তদুপরি তিনি এক অবাক করা আচরণ করলেন। তিনি ইবরাহীম নাখয়ীর ঠিকানা দেওয়ার পরিবর্তে বললেন, আমিই ইবরাহীম নাখয়ী। এটা বলে নিজেই গ্রেফতার হলেন।
পরিশেষে হাজ্জাজের নির্দেশে 'দীনাস' নামক বন্দিশালায় তাঁকে বন্দি করা হলো। যেখানে রোদ থেকে বাঁচার জন্য কোনো ছায়ার ব্যবস্থ ছিলো না এবং শীত নিবারণেরও কোনো উপকরণ ছিলো না। উপরন্তু সেখানে এক শিকলে দুজন করে বাঁধা হয়েছিলো। এই বন্দিশালায় কষ্টে ইবরাহীম তাইমী এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর মা তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে জেলখানায় এসে তাঁকে চিনতেই পারেননি। কিছুদিন পর জেলখানায়ই তার ইন্তিকাল হলো। মানুষজন তাকে জিজ্ঞাসাও করেছিলো যে, সিপাহী তো আপনাকে খুঁজেনি, আপনি কেনো স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হলেন? তিনি বললেন, ইবরাহীম নাখয়ীর মতো যমানার ইমামকে মানুষ গ্রেফতার করুক, এটা আমার কাছে ভালা মনে হয়নি।
ইহসানের সর্বোচ্চ স্তর কোনটি
ইহসানের একটি সর্বোচ্চ স্তর এটাও যে, মানুষ যখন কোনো জিনিসের খুব বেশি অভাববোধ করে এবং তার সামনে সেই একই জিনিসের অভাববোধকারী অন্য কোনো ব্যক্তি সে পায়, তখন সে তাকে ঐ জিনিসটি দিয়ে নিজে কষ্ট সহ্য করবে। এটারই নাম 'ঈসার' বা অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া। মানবিক চরিত্রের মধ্যে এই চরিত্রটির অবস্থান অবশ্যই সর্বোচ্চ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কর্মধারাও এমনই ছিলো। অন্যদেরকেও এই কাজের জন্য তিনি প্রচুর উৎসাহ দিতেন।
স্মরণ রাখার মতো একটি ঘটনা
এক মুজতাহিদ ইমামের সামনে এক ব্যক্তি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের উপর অপবাদ আরোপ করলো যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিম এবং চূড়ান্ত অসৎ ব্যক্তি। সে হাজার হাজার সাহাবী, তাবেয়ীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। এজন্যই সাধারণভাবে মানুষের মনে তাকে মন্দ বলার মন্দতা নেই।
যেই বুযুর্গের সামনে হাজ্জাজের উপর এই অপবাদ আরোপ করা হলো, তিনি সেই অপবাদ আরোপকারীকে বললেন, যদি অন্যায়ভাবে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার প্রতিশোধ আল্লাহ তাআলা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ থেকে নেন তাহলে আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তি থেকেও হাজ্জাজের প্রতিশোধ নেবেন, যে হাজ্জাজের উপর যুলুম করেছে। আল্লাহর আদালতে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। তাই গুনাহগার এবং অসৎ লোকদের উপর অন্যদেরকে এই স্বাধীনতা দেননি যে, যার যা ইচ্ছা তাদের উপর অপবাদ দেবে, তিরস্কার করবে।
ইসলামী ফিকহের একটি বিশেষ হুকুম
ইসলামী আইনে একটি বিশেষ নির্দেশনা আছে। যার সারকথা হলো, যুলুমের প্রতিশোধ যুলুমের মাধ্যমে নেওয়া জায়িয নেই। প্রতিশোধের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতি লক্ষ রাখা আবশ্যক। মাযলূম ব্যক্তি যতক্ষণ এই নির্দেশনার উপর আমল করবে, সে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা তার সাহায্যকারী হবেন। আর যদি সে প্রতিশোধের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে, তবে সে মাযলুম থেকে জালিম হয়ে যাবে। এখন তার সাথে আল্লাহর আচরণ পূর্বের বিপরীত হবে। আল্লাহ তাআলার সাহায্য তার পরিবর্তে এখন যালিম প্রাপ্ত হবে।
অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ না থাকা জান্নাতী হওয়ার নিদর্শন
আল্লামা হাফিয ইবনে কাসির রহ. মুসনাদে আহমাদের সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আনাস রা. ইরশাদ করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে বসা ছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তোমাদের সামনে একজন লোক আসবে, সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। পরক্ষণে একজন আনসারী সাহাবী আসলেন, যাঁর দাড়ি থেকে সদ্য উযুর পানি ঝরছিলো আর তাঁর বাঁ হাতে তার জোড়া চটি জুতা ছিলো। দ্বিতীয় দিনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুরূপ বললেন, আর এই আনসারী সাহাবী পূর্বের অবস্থায় আমাদের সামনে আসলেন। তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটলো।
অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিস থেকে উঠে গেলেন, তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. সেই সাহাবীর পিছু নিলেন এবং তাঁকে তিনি বললেন, আমি একজনের সাথে ঝগড়া করে কসম করেছি, তিনদিন আমি আমার ঘরে ঢুকবো না। অতএব আপনি যদি সমুচীন মনে করেন, তাহলে আমাকে তিনদিন আপনার ঘরে জায়গা দিন। তখন সে সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা.-কে তাঁর ঘরে থাকতে দিলেন।
তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. তিনদিন তাঁর সাথে রাত যাপন করলেন। এই তিনদিনের একদিনও তাঁকে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে দেখেননি। তবে দেখেছেন ঘুমাতে যাওয়ার সময় বিছানায় শুয়ে কিছু সময় যিকির করতে। অতঃপর ফজরের নামাযের জন্য ঘুম থেকে উঠতে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, তবে তিনদিনের কোনো একটি মুহূর্তও আমি তাঁর মুখে কল্যাণকর কথা ছাড়া অন্য কোনো কথা শুনিনি। যখন তিনদিন অতিবাহিত হচ্ছিলো আর আমার অন্তরে তাঁর আমলের তুচ্ছতার ব্যাপারে বিভিন্ন খেয়াল আসছিলো, তখন আমি তাঁর সাথে তিনদিন থাকার কারণ জানিয়ে বললাম, আমার ঘরে কোনো ঝগড়া হয়নি, কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জবান থেকে তিন দিন যাবত একথা শুনে আসছি, এক্ষুনি তোমাদের সামনে এমন এক লোক আসবে, যে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। তিনদিনই পরক্ষণে আপনি আমাদের সামনে এসেছেন। এই জন্য আমি ইচ্ছা করেছি, আপনার সাথে থেকে আমি দেখবো, আপনার সেই বিশেষ আমলটি কী, যার জন্য আপনার এই মর্যাদা অর্জন হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তিনদিনে আমি আপনাকে বড় কোনো আমল করতে দেখিনি। অতএব আপনিই বলুন, কি এমন জিনিস, যার কারণে আপনার এই মর্যাদা? আনসারী সাহাবী বললেন, আপনি যা দেখেছেন, তা ছাড়া আমার আর কোনো বিশেষ আমল নেই।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. বলেন, আমি তাঁর এই কথা শুনে ফিরে আসছিলাম, তখন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, হ্যাঁ, একটি আমল আছে। তা হলো, আমার অন্তরে মুসলমানের প্রতি কোনো প্রকার বিদ্বেষ এবং খারাপ ধারণা নেই। আল্লাহ যাকে কোনো কল্যাণ দান করেন, তার প্রতি অন্তরে কোনো হিংসা পোষণ করি না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বললেন, এটাই সেই গুণ, যা আপনাকে এই সুউচ্চ মাকাম দান করেছে।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. বলেন, বিদ্বেষ ও শত্রুতার অর্থ হচ্ছে, সর্বদায় এই চিন্তায় থাকা যে, যদি সুযোগ পাই তাহলে তাকে কষ্ট দেবো। এমনিভাবে অন্যের কষ্টের ব্যাপারে মনে আনন্দ অনুভব হওয়াও বিদ্বেষ ও শত্রুতার নিদর্শন। বিদ্বেষ ও শত্রুতা মদ পান করার মতই একটি হারাম ও জঘন্য গুনাহ।
হিংসা থেকে বাঁচার উপায়
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. বলেছেন, হিংসা দূর করার উপায় হলো, যার প্রতি হিংসা হয়, তার সাথে সম্মান ও অনুগ্রহের ব্যবহার করতে থাকা। যদি তা করা সম্ভব না হয়, তাহলে মানুষের সামনে তার ভালো গুণগুলো আলোচনা করতে থাকা। ইনশাআল্লাহ এতে তার প্রতি হিংসা দূর হয়ে যাবে। অতএব প্রত্যেক ছাত্রের উচিত, সৎ ও ভালো অভ্যাস গ্রহণ করা। আর খারাপ ও মন্দ স্বভাব পরিহার করা এবং এর জন্য সর্বদায় নিচের দুটি দুআ করতে থাকা।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الشَّقَاقِ، وَالنِّفَاقِ، وَسُوءِ الْأَخْلَاقِ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুর্ভাগ্য, নেফাকী এবং মন্দ স্বভাব থেকে পানাহ চাই।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلَاقِ، وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ
হে আল্লাহ! আমি মন্দ স্বভাব, মন্দ কর্ম ও প্রবৃত্তির খারাবী থেকে আপনার আশ্রয় চাই।
টিকাঃ
৯২. দুরে মানসূর: ৩/২০০; সুরা মায়েদা, আয়াত : ১০৫।
৯৩. মালফুযাতে হাকীমুল উম্মাত।
৯৪. সহীহুল বুখারী, আহাদীসুল আম্বিয়া অধ্যায়: ১/৪৯২।
৯৫. মাআরিফুল হাদীস: ২/৩০৬।
৯৬. মুসনাদুল ইমাম আহমাদ: ৩৫/১১০ হাদীস নং: ২১১৭৮।
৯৭. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-২৯৮।
৯৮. খুতুবাতে হাকীমুর উম্মাত: ২৯/১৮০।
৯৯. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-৩৮৩।
১০০. কিতাবু কী দরসেগাহ মে: পৃষ্ঠা-৭১।
১০১. ইসলাহী খুতুবাত: ৪/১৪৭।
১০২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৫/৩৯০।
১০৩. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ১/৩০৮।
১০৪. গুলিস্তাঁ : পৃষ্ঠা-৭১।
১০৫. মুকাদ্দিমাতু ফাতহিল বারী: ১/৬৬৫।
১০৬. আল কামিল লি ইবনিল আসীর: ৫/২৬৩।
১০৭. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/২৬৮।
১০৮. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/২২৩।
১০৯. সহীহু মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ: ২/৩১৬।
১১০. রুহুল মাআনী: ৩/৫৯, সূরা নিসা, আয়াত: ১৩৪।
১১১. মাআরিফুল হাদীস: ২/১৮৩,১৮৫।
১১২. মাআরিফুল কুরআন: ২/১৯০।
১১৩. সূরা আরাফ, আয়াত: ২০০।
১১৪. সুনানে আবী দাউদ: ২/৩০৩, কিতাবুল আদাব, বাবু মা ইয়াকূলু ইনদাল গাযব।
১১৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/২৭৬।
১১৬. তাবাকাতে ইবনে সাদ: ৬/১৯৯।
১১৭. মাআরিফুল হাদীস: ২/১৯৩।
১১৮. মাআরিফুল কুরআন: ৫/৪৭৮, সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৩।
১১৯. মাআরিফুল কুরআন: ৫/৪৭৮, সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৩।
১২০. মুসনাদে আহমাদ: পৃষ্ঠা নং-৬৪৫, হাদীস নং-১২২৮৬।
১২১. মাজালিসে মুফতিয়ে আযম: ২০৪/২৯৯।
১২২. সুনানুন নাসায়ী: ২/৩১৩; কিতাবুল ইসতিআযাহ।
১২৩. মিশকাত: ১/২17, বাবুল ইসতিআযাহ।
📄 গুনাহ পরিহার করা
আল্লাহ তাআলার কাছে তালিবে ইলমের অনেক সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের সম্মানে আল্লাহ পাক তাদের চলার পথে ফেরেশতাদের নূরের পর বিছিয়ে দেন। তারা যতক্ষণ ইলম অন্বেষণে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর রাস্তায় থাকার মর্যাদা দিয়েছেন। অতএব স্বাভাবিক ভদ্রতার দাবী হচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে নিআমতদাতা মহা সত্তাকে মান্য করা。
বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির ঘটনা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে একটি হাদীস এক দুবার নয়, বরং সাতবার শুনেছি। হাদীসটি হচ্ছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বনী ইসরাঈলে কিফ্ল নামে এক ব্যক্তি ছিলো। এমন কোনো গুনাহ নেই, যা সে করতো না। একবার তার নিকট এক মহিলা আসলো। সে মহিলাকে কয়েক দীনারের শর্তে অপকর্ম করতে রাজি করালো। শর্ত সাপেক্ষে যখন সে উক্ত হারাম কাজ করার জন্য মহিলার দুই রানের মাঝে বসলো, তখন মহিলা কান্না করতে লাগলো আর কাঁপতে লাগলো। কিফ্ল তাকে জিজ্ঞেস করলো, কাঁদছো কেনো তুমি? আমি কি তোমার সাথে জোর-যবরদস্তি করছি?
মহিলা বললো, না, আপনি জোর-যবরদস্তি করেননি। তবে এটা এমন এক গুনাহ, যা আমি ইতিপূর্বে কোনো দিন করিনি। এই মুহূর্তে আমি অপারগ হয়ে তা করছি। অপারগতার কারণে আমি রাজি হয়েছি।
একথা শুনে কিফ্ল সাথে সাথে সেই মহিলার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বললো, যাও, দীনারগুলো তোমার। আর আজ থেকে কিফ্লও আর কোনো গুনাহ করবে না। আশ্চর্যজনকভাবে সেই রাতেই সে মারা গেলো। আর সকালে তার দরজায় গাইবীভাবে এই লেখা দেখা গেলো, غفر الله للكفل আল্লাহ তাআলা কিফলকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ১২৪
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, যে তালিবুল ইলমের মাঝে গুনাহের অধপতন ও অবনতি রয়েছে, সে তো কেবল কিছু শব্দ মুখস্থ করেছে। নিজের মেধা ও মেহনতের করে এক প্রকার জ্ঞান অর্জন করেছে। কিন্তু গুনাহের কারণে ইলমের নূর তাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই।
একজন ব্যক্তির মধ্যে যখন ইলমের নূর এসে পড়ে তখন সে ব্যক্তি إذا رأوه ذكر الله ]যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে যায়]১২৫ এই হাদীসের প্রয়োগক্ষেত্র হয়ে যায়। এ ধরনের ব্যক্তিকে দেখা মাত্র আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঈমান তাজা হয়। এমন ব্যক্তির মজলিসে বসলে মানুষের অন্তরে এই আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয় যে, আমার সাথে আর আল্লাহ তাআলার সাথে যেন একটি গভীর সম্পর্ক হয়ে যায় এবং গুনাহের প্রতি ঘৃণাবোধ, ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
এগুলো আল্লাহ তাআলার সেই সমস্ত বান্দার বৈশিষ্ট্য, যারা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জানতোড় চেষ্টা করার ফলে ইলমের নূর তাদের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে আলোকিত করে। ১২৬
গুনাহের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ না করার ভয়াবহতা
হযরত মালিক ইবনে দীনার রহ. বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা একবার ফেরেশতাদের হুকুম করলেন, অমুক জনবসতি ধ্বংস করে দাও। তখন ফেরেশতারা বললেন, হে আল্লাহ! সে জনবসতিতে আপনার একজন বুযুর্গ বান্দা আছে।
আল্লাহ তাআলা বললেন, তাকেসহ ধ্বংস করে দাও। কেননা, আমার নাফরমানী ও গুনাহ দেখার পরও তার মধ্যে কোনো দুঃখ বেদনা নেই। এতে তার চেহারা মলিন পর্যন্ত হয়নি।
হযরত ইউশা ইবনে নূন আলাইহিস সালাম এর প্রতি আল্লাহ তাআলা ওহী প্রেরণ করলেন, আপনার সম্প্রদায়ের এক লক্ষ লোককে আযাব দ্বারা ধ্বংস করা হবে, যাদের মধ্যে চল্লিশ হাজার নেককার আর বাকি ষাট হাজার বদকার। তখন তিনি বললেন, হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! বদকারদের ধ্বংস হওয়ার কারণ তো স্পষ্ট, তবে নেককার লোকদের ধ্বংসের কারণ কী?
উত্তরে বলা হলো, তারা বদলোকদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রাখে, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে, আনন্দ-ফুর্তি করে। আমার নাফরমানী ও গুনাহ দেখার পর তাদের চেহারায় বিরক্তির চিহ্নও দেখা যায় না। ১২৭
হযরত শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. বলেন, প্রত্যেকেরই চিন্তা করা উচিত, তার জানা মতে এমন কত গুনাহ সংগঠিত হচ্ছে, যে গুনাহগুলো সে চাইলেই নিষেধ করতে পারতো, কিন্তু তার উদাসীনতা, অসাবধানতা ও ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে তা হতে থাকে।
বড়ই আফসোসের কথা হলো, যদি আল্লাহর কোনো বান্দা সেই গুনাহ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়, তখন লোকেরা তার বিরোধিতা শুরু করে দেয় এবং তাকে নিয়ে বিদ্রুপ শুরু করে। তাকে সাহায্য না করে সবাই তার বিরোধিতায় লেগে পড়ে। ১২৮
আল্লাহ পাক দোষ গোপন রাখেন
বনী ইসরাঈলের যামানায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। ফলে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হচ্ছিলো না। কিছু লোক হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এর কাছে গিয়ে আবদার করলো। হে কালীমুল্লাহ! আল্লাহর কাছে আপনি দুআ করুন, তিনি যেনো আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষন করেন। আবেদনের ভিত্তিতে তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে তাদের মহল্লা থেকে দূরে এক জায়গায় একত্রিত হলেন। সংখ্যায় তারা সত্তর হাজার বা তার থেকে কিছু বেশি ছিলো। মূসা আলাইহিস সালাম খুবই মিনতির সাথে দুআ শুরু করলেন-
اِلٰهِي أَسْقِنَا غَيْثَكَ وَانْشُرْنَا عَلَيْنَا رَحْمَتَكَ ، وَارْحَمْنَا بِالْأَطْفَالِ الرُّكَّعِ وَالْبَهَائِمِ الرُّبَعِ وَالشَّيُوخِ الرُّكَّعِ.
হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমাদের উপর রহমত ছিটিয়ে দিন। মাসুম বাচ্চা, বোবা জানোয়ার, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ সবাই আপনার রহমতের আশাবাদী, তাদের প্রতি দয়া করুন। আমাদেরকে আপনার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন।
তিনি অবিরাম দুআ করে চলছেন। কিন্তু বৃষ্টির কোনো চিহ্নও পরিলক্ষিত হচ্ছিলো না। সূর্য আরো তীব্র হতে লাগলো। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বড়ই আশ্চর্য হলেন! ফলে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ কবুল না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করলেন-
إِنَّ فِيْكُمْ عَبْدًا يُبَارِزُنِي بِالْمَعَاصِيْ مُنْذُ أَرْبَعِيْنَ سَنَةً ، فَنَادِ فِي النَّاسِ حَتَّى يُخْرِجَ مِنْ بَيْنِ أَظْهَرِكُمْ فَبِهِ مَنَعْتُكُمْ.
তোমাদের মাঝে এমন এক লোক আছে, যে গত চল্লিশ বছর যাবত অবিরাম আমার নাফরমানী করে আসছে আর সে গুনাহের ব্যাপারে একগুঁয়ে। হে মুসা! তুমি লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও, সে যেন এ সমাগম থেকে বের হয়ে যায়। কেননা, তার কারণেই তোমাদেরকে বৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না। আর যতক্ষণ সে বের না হবে, ততক্ষণ বৃষ্টিও হবে না।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো দুর্বল, আমার আওয়াজও দুর্বল আর লোকদের সংখ্যা সত্তর হাজারেরও বেশি। আমি কীভাবে তাদের সকলের নিকট আওয়াজ পৌঁছাবো?
তখন জবাব আসলো, তোমার কাজ হলো ঘোষণা দেওয়া, আর আমার কাজ হলো, পৌঁছে দেওয়া।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে ডেকে বললেন,
أَيُّهَا الْعَبْدُ الْعَاصِي الَّذِي يُبَارِزُ اللَّهَ بِالْمَعَاصِيْ مُنْذُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ، أُخْرُجْ مِنْ بَيْنِ أَظْهُرِنَا ، فَبِكَ مَنَعْنَا الْمَطَرَ.
হে ওই পাপিষ্ঠ, নাফরমান বান্দা, যে বিগত চল্লিশ বছর যাবত নিজের প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে যাচ্ছো এবং তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছো, তুমি এই মজলিস থেকে বের হয়ে যাও। তোমার মন্দ কর্মের কারণেই আমরা রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
এ ঘোষণা শুনে গুনাহগার বান্দা তার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলো, কেউ তার আপন জায়গা থেকে সরছে না। ফলে সে বুঝতে পারলো, আমিই সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি। সে ভাবতে লাগলো, যদি আমি সবার সামনে দিয়ে বের হই, তাহলে প্রচুর লজ্জা পাবো আর আমার ব্যাপারে সবাই হাসাহাসি করবে। আর যদি বের না হই, তাহলে কেবল আমার কারণেই এই লোকগুলো বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে সে স্বীয় চেহারা কাপড়ের নিচে লুকিয়ে তার কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে লাগলো-
হে আমার রব! তুমি কত সম্মানিত ও সহনশীল, আমি চল্লিশ বছর তোমার নাফরমানী করছিলাম আর তুমি আমাকে অবকাশ দিয়ে আসছিলে। আর এই মুহূর্তে তো আমি তোমার অনুগতশীল হয়ে এসেছি। এখন আমার তাওবা কবুল করো এবং আমাকে ক্ষমা করে দিয়ে আজকের এই লজ্জা ও অপমান থেকে রক্ষা করো।
তার দুআ শেষ হতে না হতেই, কালো মেঘে ছেয়ে গেলো আকাশ, ঝুম বৃষ্টি আর শুরু হলো বাতাস।
পরক্ষণে মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ! আপনি কীভাবে বৃষ্টি নাযিল করলেন, অথচ সেই নাফরমান বান্দা মজলিস থেকে বের হয়নি?
আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মূসা! যার কারণে ইতিপূর্বে বৃষ্টি বন্ধ রেখেছিলাম, তার কারণেই এখন বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। কেননা, সে তাওবা করেছে।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আল্লাহ, তার সাথে আমার সাক্ষাত করিয়ে দাও, যাতে আমি তাকে একনজর দেখে নিতে পারি।
তখন ইরশাদ হলো-
مُوسَى إِنِّي لَمْ أَفْضَحْهُ وَهُوَ يَعْصِينِي ، أَ أَفْضَحُهُ وَهُوَ يُطِيعُنِي
হে মূসা! যখন সে আমার নাফরমানী করছিলো তখনই তো আমি তাকে অপমান ও অপদস্ত করিনি। আর এখন তো সে আমার অনুগত ও সৎ হয়ে গেছে, অতএব এখন তো কিছুতেই তাকে লজ্জিত ও অপমানিত করতে পারি না।
প্রিয় পাঠক! লক্ষ করুন, একজন মাত্র গুনাহগার ও নাফরমান ব্যক্তির জন্য বৃষ্টি হচ্ছিলো না। বর্তমানে তো অল্পকিছু লোক ছাড়া বাকি সবাই গুনাহ ও নাফরমানীতে লিপ্ত, তাহলে আমাদের কী অবস্থা হবে হাশরের মাঠে? সূরায়ে জ্বিন এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা সত্যিই বলেছেন,
وَأَلَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا
তারা যদি সঠিক পথে অবিচল থাকতো, তাহলে আমি অবশ্যই প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে সমৃদ্ধ করতাম।১২৯
উপদেশ
ইমাম গাজালী রহ. বলেন, সকালে যখন তুমি ঘুম থেকে জাগ্রত হও, তখন মনে মনে একটি প্রতিজ্ঞা করো, রাতে শোয়ার আগ পর্যন্ত আমি আজ কোনো প্রকার গুনাহ করবো না এবং সকল ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত আদায় করবো। আল্লাহ তাআলার হক ও বান্দার হক পুরোপুরি আদায় করবো।
এরপর যেকোনো কাজ করার পূর্বে চিন্তা করবে, এই কাজটি কি আমার প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী হচ্ছে? যদি পরিপন্থী হয়, তাহলে ছেড়ে দেবে।
আর রাতে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করবে, আমার দ্বারা কি আমার প্রতিশ্রুতির বিপরীত কোনো কাজ সম্পন্ন হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে তাওবা করে নেবে, আর মনকে সামান্য শাস্তি দাও। শাস্তিস্বরূপ আট-দশ রাকআত নফল নামায পড়তে বাধ্য করো। আর যদি প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী কোনো কাজ না হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলার শুকর আদায় করো। ১৩০
যখন গুনাহ করার ইচ্ছা মনে উদ্রেক হয়, তখন নিচের দুআটি গুরুত্বের সাথে পড়তে থাকো-
رَبَّنَا أَفْرِغْعَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে পরিপূর্ণ ধৈর্য দান করুন এবং মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন।১৩১
সুন্নাতের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়ার পরিণতি
'আহলুল কুবৃর' নামক গ্রন্থে আল্লামা যাইনুদ্দীন ইবনে রজব রহ. লিখেছেন- একবার এক লোক আমার কাছে আসলো, যে পূর্বে কাফন চুরি করতো। এই হীন কাজ সে এখন আর করে না; বরং এখন সে সৎভাবে জীবন যাপন করছে।
আল্লামা যাইনুদ্দীন রহ. সে ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো জীবনে অনেক মুসলমানের কাফন চুরি করেছো, যারফলে মৃত মানুষের অবস্থা তুমি ভালো জানো। অতএব তুমি আমাকে বলো, যখন তুমি মৃত ব্যক্তির চেহারা খুলতে, তখন তার চেহারা কোন দিকে ফিরোনো থাকতো?
সে বললো, বেশির ভাগ লোকের চেহারা কিবলা থেকে অন্য দিকে ফিরানো পেয়েছি।
হযরত যাইনুদ্দীন রহ. এ কথা শুনে খুবই আশ্চর্য হলেন। কেননা, দাফন করার সময় সাধারণত কিবলার দিকে মুখ করে মুসলমানদের দাফন করা হয়। তাই তিনি ইমাম আওযায়ী রহ.-কে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, ইমাম আওযায়ী রহ. শোনা মাত্রই তিনবার 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়লেন। অতঃপর বললেন, সম্ভবত সে সব লোক দুনিয়ার জীবনে সুন্নাত থেকে বিমুখ ছিলো। ১৩২
সাহাবায়ে কিরাম কখনো সুন্নাতের মাঝে ছোট বড় বলে পার্থক্য করতেন না। বরং তারা সব সুন্নাতকেই বড় মনে করতেন। এই জন্য তাঁরা সকল সুন্নাতের উপর আমল করতেন। আর আমরা ছোট বড় পার্থক্য করে অনেক সুন্নাতকেই ছেড়ে দিই। আল্লাহ তাআলা আমাদের মাফ করুন। ১৩৩
সবর ও ধৈর্যের গুণ অর্জন করতে হবে
মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করার জন্য মানুষের অভ্যন্তরে একটি শক্তি দেওয়া হয়েছে, যাকে নফসে লাউওয়ামা [نفس لوامة] বলে। সাধারণ মানুষের মাঝে যা অন্তর নামে প্রসিদ্ধ।
কোনো ব্যক্তি যখন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, তখন তাকে যে শক্তি সেই খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে, সেটাই হচ্ছে نفس لوامة । এ ছাড়াও এমন কিছু যোগ্যতা আছে, যেগুলো মানুষকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।
অপর দিকে এমন দুটি অপশক্তি রয়েছে, যেগুলো মানুষকে গুনাহ করতে উৎসাহিত করে। তন্মধ্যে একটি রয়েছে মানুষের অভ্যন্তরে, যেটাকে نفس أمارة বলে। এটা মানুষকে নেক কাজ থেকে বিরত রাখে আর খারাপ কাজে উৎসাহিত করে।
দ্বিতীয় অপশক্তি হলো, শয়তান। যার জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, মানুষকে নেক কাজ থেকে বিরত রাখা এবং খারাপ কাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এই বিপরীতমুখী দুটি শক্তির টানাটানির মাঝেই রয়েছে মানুষের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রত্যেকের জন্য জরুরী হলো, খারাপ কাজের উপর ভালো কাজকে প্রাধান্য দেওয়া। ভালো কাজকে খারাপ কাজের উপর প্রাধান্য দেওয়ার মধ্যে এক প্রকারের কষ্ট স্বীকার করতে হয়। শরীআতের পরিভাষায় একে সবর বা ধৈর্য বলে।
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়
• সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক চেয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি দুআ করা।
• নফসের সাথে যুদ্ধ করা, মনের কুমন্ত্রণা দূর করা এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা।
• আল্লাহ তাআলার উপস্থিতির কথা চিন্তা করা। তিনি আমাকে সর্বদা দেখছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে ভয় করা।
• গুনাহ করার সময় এই কথা চিন্তা করা, কেউ দেখলে কি আমি এমন গুনাহ করতে পারতাম? এভাবে নিজের ভেতর লজ্জাবোধ জাগ্রত করা। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি তোমার পরিবারের কোনো প্রভাবশালী সদস্যকে যেমন লজ্জা পাও, আল্লাহকে (কমপক্ষে) তেমন লজ্জা করো। ১৩৪
• এই চিন্তা করা, গুনাহরত অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে কীভাবে আমি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করবো? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে [কিয়ামতের দিন] সেই অবস্থায় উঠানো হবে, যে অবস্থায় সে মারা গেছে। ১৩৫
টিকাঃ
১২৪. মাআরিফুল কুরআন: ৬/২১৯, সূরা আম্বিয়া: ৮৫।
১২৫. ইবনে মাজাহ: পৃষ্ঠা-৩০৩।
১২৬. মাজালিসে ইলম ও যিকির: ২/৬৯।
১২৭. তাফসীরে বাহরে মুহীত: ৩/৫৩৩, সূরা মায়িদা: ৬৩।
১২৮. ফাযায়িলে আমল: পৃষ্ঠা নং- ৬০৭, ফাযায়িলে তাবলীগ।
১২৯. সানহারে আওরাক: ২০৯।
১৩০. ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ৪/৫২৪।
১৩১. সূরা আরাফ: ১২৬।
১৩২. আহলুল কুবৃর ও আহওয়ালু আহলিহা ইলান নুশুর: ৬৬।
১৩৩. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/১৮০।
১৩৪. মুসনাদে বায্যার: ৭/৮৯।
১৩৫. সহীহ মুসলিম: হাদীস নং-২২০৬।
📄 অসৎ সঙ্গ পরিহার করা
অসৎ সংশ্রবের ফলে অজান্তে মানুষের মধ্যে বদঅভ্যাস চলে আসে। জনৈক কবি বলেন,
ألا تصحبالكسلانفيحياته + كمصالح بفساد آخر يفسد عدوي البليد إلى الجليد مريعة + كالجمر يوضعفي الرماد فيخمد
অলস লোকের সাথে বসো না। কেননা, অনেক ভালো মানুষ অন্য লোকদের খারাপীর কারণে খারাপ হয়ে গেছে। নির্বোধ ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া সুবোধ ছেলের উপর এমনভাবে পড়ে, যেভাবে অঙ্গারকে যদি ছাইয়ের উপর রেখে দেওয়া হয়, তাহলে অঙ্গার নিভে যায়।
পরিবেশ ও সঙ্গী দ্বারা মানুষ অনেক প্রভাবিত হয়। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্নভাবে সতর্ক করেছেন। অতএব যথাসম্ভব আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে মহব্বত রাখো। বেশি বেশি তাদের সংশ্রবে থাকো। বদ-দীন ও অসৎ লোকদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকো।
হযরত লুকমান হাকীম স্বীয় ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, প্রিয় বৎস! নেককার বান্দাদের মজলিসে বসবে। এতে তোমার কল্যাণ হবে। যদি তাদের উপর রহমত বর্ষণ হয়, তাহলে তুমিও তাতে শরীক থাকবে। অসৎ লোকদের সংশ্রবে কখনো বসবে না। তাদের থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। তাদের উপর যদি কোনো আযাব পতিত হয়, তাহলে তুমি এর থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কেমন লোকদের সংশ্রব অবলম্বন করা হবে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়, যাদের কথা শুনলে ইলম বৃদ্ধি পায়, যাদের আমল দেখে আখেরাতের কথা মনে পড়ে, এমন লোকদের সংশ্রব গ্রহণ করবে। ১৩৬
টিকাঃ
১৩৬. হুসূলে ইলমকে আদাব: ১৭০-১৭২, ১৭৮-১৭৯।
📄 ছাত্র যামানায় মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার
প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের এক প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ- এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর ব্যবহার যদি শুধু প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে এই নিয়ে লেখার কোনো জরুরত ছিলো না। কিন্তু ব্যবহারকারীদের অনেকেই বিশেষ প্রয়োজনে এর ব্যবহার শুরু করলেও তারা তাদের প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অপ্রয়োজনীয় লিংকে ঢুকে লম্বা সময়ের জন্য তারা হারিয়ে যাচ্ছেন। ৫-১০ মিনিটের জন্য একটি ওয়েবসাইটে ঢুকার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের।
আমার সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা হয় মুসলমানদের সেই শ্রেণীটাকে নিয়ে, যারা গুনাহ থেকে সবসময় বেঁচে থাকতে চান, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তারা গুনাহ থেকে বাঁচতে পারছেন না। আমার সবচেয়ে বেশি আফসোস হয় মাদরাসার ছাত্রদের হাতে এই ডিভাইসটি দেখে। তাঁদের হাতে এই ভয়াবহ যন্ত্রটি দেখে আমার মনে হয়, এই বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সমাজের সর্বোত্তম শ্রেণীটাও। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের ঈমান, আমল, মূলোবোধ, সংস্কৃতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লেখাপড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যখন ছাত্ররা বই-পুস্তক ও কিতাবের জগতে হারিয়ে যাওয়ার কথা, তখন তারা উস্তাদ ও গার্ডিয়ানকে ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেটে। ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর তাতে চুঁ মারছে। কে কী কমেন্ট করছে, কতটা লাইক শেয়ার হচ্ছে তা দেখার জন্য অস্থির থাকে। কখন নামায, ক্লাস, মিটিং ইত্যাদি শেষ হবে আর ফেইসবুকে ঢুকবে এ জন্য মন বেচাইন থাকে। ক্লাসের ফেল করা এক- দেড়শো ছাত্রের লাইক আর কমেন্ট পড়ে খুব আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। এমন সব লোকদের কমেন্টের ভিত্তিতে নিজেকে বিপ্লবী নেতা ভাবছে, যারা রাত দুটোয় তোমার লেখায় লাইক দেয় এবং যাদেরকে নিয়ে তাদের মা-বাবাই সবসময় অস্থির ও পেরেশান থাকে। তাদের নিয়ে কীভাবে তুমি সমাজ নির্মাণ করবে? হিরো হওয়া কি এতই সহজ? আসলে এটা চরম ধোঁকা।
ছাত্র বন্ধুরা, ভেবে দেখুন, ইন্টারনেটে ঢুকে কতটা সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন নিজেদের প্রয়োজনের মধ্যে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। আগে আমরা মোবাইল চালাইতাম। এখন মোবাইল আমাদেরকে চালায়। অজানা মোহে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে আমাদের। ফলে আমরা তিলাওয়াতের সময় পাচ্ছি না। যিকির-আযকারের ফুরসত পাচ্ছি না। বই-পত্র পড়ার সুযোগ পাচ্ছি না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-
علامة اعراض الله عن العبد اشتغاله بما لا يعنيه وإن امرأ لو ذهبت ساعة من عمره في غير ما خلق له الجدير أن تطول حسرته يوم القيامة.
কোনো বান্দা যদি অর্থহীন কাজ নিয়ে পড়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, তার থেকে আল্লাহ তাআলা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কোনো ব্যক্তির জীবনের যৎসামান্য মুহূর্তও যদি এমন কাজে চলে যায়, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি, তাহলে নির্ঘাত এর জন্য একদিন তাকে আফসোস করতে হবে। ১৩৭
ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে আমাদের লজ্জাও কমে যাচ্ছে। অনিচ্ছাকৃত চোখে পড়া অশ্লীলতা দেখতে দেখতে চোখ অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে অপরাধবোধ ও খারাপ লাগার অনুভূতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবাধে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যাতায়াতের অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। অভ্যাস এমন জিনিস, যার মাধ্যমে বুযুর্গ ব্যক্তিরও নিজের অজান্তে আস্তে আস্তে গুনাহের সাথে আপোস হয়ে যায়। অথচ এই ব্যক্তিটি একসময় কঠোরভাবে নজরের হিফাযত করতেন। এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে তাঁরা তাদের তাকওয়া-পরহেযগারী ধরে রাখতে পারছেন না।
একজন পরহেযগার ও বুযুর্গ মানুষকে একটি স্মার্টফোন অল্প কয়েক দিনের মধ্যে পাক্কা ফাসিকে পরিণত করে দিতে পারে। বাইরের খোলসটা ঠিক রেখে ভেতরটা খালি করে দিতে পারে। এই মানুষটাকে চোখের যিনা থেকে শুরু করে ধর্ষণের পথেও টেনে নিতে পারে। এটা কেবল আশঙ্কা নয়, বাস্তবে এ উদাহরণও আছে অনেক। ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে পরকালীন ক্ষতির পাশাপাশি দুনিয়াবীও অনেক ক্ষতি হচ্ছে। দিনে-রাতে প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। যার পভাব পড়ছে দৈনন্দিন কাজে-কর্মে। সময়ের কাজ সময়ে করা হচ্ছে না। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সব ক্ষতি যদি বাদও দেওয়া হয়, তবু এর সময় নষ্ট করার যে ক্ষমতা, একজন মানুষের জীবনের সম্ভবনাগুলো শেষ করে দিতে তা-ই যথেষ্ট। এর পাশাপাশি যদি চারিত্রিক ক্ষতিকে যোগ করা হয়, তাহলে কীভাবে একজন দুর্বল ঈমানদারের জন্য এর ব্যবহার কীভাবে জায়িয হতে পারে।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম জাওযী রহ. বলেন, সময়ের অপচয় মৃত্যুর চেয়েও জঘন্য। কেননা, মৃত্যু তো শুধু দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, কিন্তু সময়ের অপচয় মানুষকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ১৩৮
একজন মানুষ যখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে লিপ্ত থাকে, তখন তার ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অসংখ্য গুনাহ হতে থাকে। অন্তরে গুনাহের কালো দাগ পড়তে থাকে। কালো দাগ পড়তে পড়তে একসময় অন্তর শক্ত হয়ে যায়। অন্তর অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। ফলে আল্লাহর কথা, নবীজীর কথা, আখিরাতের কথা আর অন্তরকে স্পর্শ করে না। যদিও সে তখন আমল জারীও রাখে, তথাপি সে আমলে থাকে না কোনো প্রাণ। সে ইবাদত হয় ভাস্কর্যের মতো প্রাণহীন। দুআতে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না। জিহ্বায় যিকির-আযকার ও তিলাওয়াতের স্বাদ অনুভূত হয় না। হৃদয়ে থাকে না প্রশান্তি বলে কিছু। এ যেন এক মৃত অন্তর।
প্রশান্ত একটা অন্তর পেতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের জাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকলে অন্তর ঠান্ডা থাকে। যেকোনো আগ্রহী ব্যক্তি সপ্তাহখানেক অনলাইন থেকে দূরে থাকলেই এর বাস্তবতা বুঝতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের ভেবে দেখে দরকার, বাস্তবে স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রয়োজন কতটুকু আমার? এ ছাড়া কি আমি চলতে পারবো না? যারা ব্যবহার করছেন না তাদের কি দিন পার হচ্ছে না? যাদের একান্ত প্রয়োজন তাদের কথা বাদ দিলাম। আপনার কতোটুকু প্রয়োজন ভেবে দেখুন। চিন্তা করে দেখুন, এর কারণে দৈনিক আপনার কী পরিমাণ কবীরা গুনাহ হচ্ছে। কতোবার পরনারীর প্রতি দৃষ্টি পড়ছে। কতো সময় অপচয় হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজ রেখে কতো সময় অর্থহীন কাজে ব্যয় হচ্ছে। ধ্বংসের যে অতল গহ্বরে আমরা পড়ে আছি, তা থেকে যদি নিজেরা উদ্ধার না হই, কেউ এসে উদ্ধার করবে না। উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। নিজের উন্নতির চিন্তা নিজেকেই করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى (٤٠) فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
আর যে বক্তি তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজের আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে বাঁচিয়ে রাখে, জান্নাত হবে তার আশ্রয়স্থল। ১৩৯
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকটা বুঝে সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১৩৭. রূহুল বায়ান : ১/৩৬৩। সূরা বাকারার ২৩৩নং আয়াতের ব্যাখ্যায়। মাকতাবা শামেলা সংস্করণ।
১৩৮. আলফাওয়াইদ : ৩৬।
১৩৯. সূরা নাযিআত : ৪০-৪১।