📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 উস্তাদের খিদমত ও তাঁদের প্রতি আদব প্রদর্শন

📄 উস্তাদের খিদমত ও তাঁদের প্রতি আদব প্রদর্শন


আরবী প্রসিদ্ধ একটি বাক্য আছে, العلمكلهأدب -ইলম পুরোটাই আদব। সব যুগে যেসব মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফতী ইলমের মাধ্যমে জগতের খেদমত করে গেছেন, তাঁরা সকলেই উস্তাদের আদব ও ইহতিরাম করেই সমাদৃত হয়েছে। হযরত আলী রা. বলেছেন, আমি সেই ব্যক্তির গোলাম, যিনি আমাকে একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে আমাকে বিক্রিও করে দিতে পারেন, ইচ্ছা করলে গোলাম হিসাবে নিজের কাছে রেখেও দিতে পারেন।
প্রিয় পাঠক! উস্তাদের সাথে আদব ও ইহতিরাম একজন তালিবুল ইলমকে সফলতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। এসব মুআদ্দাব ছাত্ররাই পরবর্তী জীবনে দীন প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তাঁদের দ্বারাই হাজারো পথহারা মানুষ সুপথের সন্ধান পায়। তাঁরা যমীনের নক্ষত্রের মতো, অসংখ্য মানুষের চলার পথে আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করে। তাঁদের সংশ্রবে এমন যাদু এবং প্রভাব থাকে যে, তাঁদের স্বল্প সোহবতে লাখো মানুষ গুনাহের জীবন থেকে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। তাঁদের অন্তরদৃষ্টির কারণে অসংখ্য জটিল জটিল মাসআলা হল হয়ে যায়।
আকাবিরে দেওবন্দ; মাওলানা কাসিম নানুতুবী রহ., হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ., হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ., হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. ও হযরত মাদানী রহ. এর মতো বড় বড় হাস্তিগণ উস্তাদের খেদমত ও আদবের কারণেই বড় হয়েছেন। আজও যদি তালিবে ইলমরা আসাতিযায়ে কিরামের সম্মান ও আদব করে, তাহলে তারাও ভবিষ্যতে সারা বিশ্বের আদর্শ ও ইমাম হবে। ইনশাআল্লাহ।

উস্তাদের সাথে আদব বজায় রাখার বরকত
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ 'মাআরিফুল কুরআন' এ লিখেছেন, সূরায়ে হুজুরাতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা যে আদব শিক্ষা দিয়েছেন, তা কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য নয়, বরং সমস্ত বুযুর্গ আলেমদের জন্যও প্রযোজ্য। যে আদব ও ইজ্জত-সম্মান মূল ব্যক্তির জন্য হয়, তার প্রতিনিধীদের জন্যও তা-ই হয়। এ কথার পক্ষে আল্লামা আলুসী রহ. প্রমাণ পেশ করেছেন,
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর কাছে 'ফন্নে কিরাআত' পড়ার জন্য যেতেন। হযরত উবাই ইবনে কাআব এতো বড় মাপের কারী ছিলেন যে, তাঁর উপাধী ছিলো 'সাইয়িদুল কুররা' [কিরাআত সম্রাট]। হযরত উমর রা.-ও তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁর ব্যাপারে ওহী নাযিল হয়েছে, হে নবী! আপনি উবাই ইবনে কাআব এর কাছে গিয়ে সূরা বাইয়িনা তিলাওয়াত করুন। এর কী কারণ? এর কারণ হচ্ছে, এ সূরায় ইয়াহুদী আলেমদের আলোচনা এসেছে। আর তিনি ছিলেন একজন ইয়াহুদী আলেম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, হে উবাই! আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন তোমার কাছে এসেযেনো আমি সূরা বাইয়িনা তিলাওয়াত করি। হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা কি আমার নাম নিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা তোমার নাম নিয়েছেন। এই কথা শোনামাত্রই হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
বলছিলাম, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর কাছে কুরআনে কারীম পড়ার জন্য যেতেন। কিরাআত শেখার জন্য যেতেন। একদা ইবনে আব্বাস রা. তাঁর বাড়ীতে গিয়ে দেখে, দরজা বন্ধ। তিনি দরজায় কড়া নাড়াননি। চৌকাঠে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. ঘুম থেকে উঠে ধীরে সুস্থে উযু করলেন। অতঃপর ঠাণ্ডা মাথায় দরজা খুলে দেখেন, দরজার সামনে একজন লোক বসা। কে সেই লোক? রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচাতো ভাই, সাইয়িদুনা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ওহে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস! আপনি নবী আলাইহিস সালাম এর চাচাতো ভাই। আপনার মতো মহান ব্যক্তি এভাবে চৌকাঠে বসলে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। আপনি দরজায় কড়া নাড়লেই তো আমি দরজা খুলে দিতাম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বললেন, কস্মিনকালেও এমন হতে পারে না। কিছুতেই আমি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করতে পারি না। আল্লাহ তাআলা সূরা হুজুরাতে যে আদব শিখিয়েছেন, তা হক্কানী উলামায়ে কিরামের জন্যও। এ জন্যই আমি আপনার দরজায় কড়া নাড়িনি।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ . لَا يَعْقِلُونَ، وَلَوْ أَنَّهُمْ صَبَرُوا حَتَّى تَخْرُجَ إِلَيْهِمْ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ)
[হে রাসূল!] যারা আপনাকে হুজরার বাইরে থেকে ডাকে, তাদের অধিকাংশেরই বুদ্ধি নেই। আপনি বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত যদি তারা ধৈর্য ধারণ করতো, তাহলে তা-ই তাদের জন্য মঙ্গল হতো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এ জন্য আমি নির্বুদ্ধিতা করিনি। আমি সেই ধৈর্য ধরতে চেয়েছি, যার প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ পাক করেছেন। আমি সেই কল্যাণ কীভাবে ছাড়তে পারি, যার কথা আল্লাহ তাআলা বলেছেন।
আপনি আলেমে দীন। নায়েবে নবী। আপনার সাথে সেই আদব আমি বজায় রাখার চেষ্টা করেছি, যার কথা আল্লাহ তাআলা সূরা হুজুরাতে বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা আলুসী রহ. বলেন, এই ঘটনা আমি শৈশবেই পড়েছি। আলহামদু লিল্লাহ, এর পর সারা জীবন এই আদবের উপর চলেছি। কখনো উস্তাদের দরজায় আঘাত করিনি।
তিনি বলেন, বুযুর্গদের সাথে আদব রক্ষা করা কখনো তোমাকে এমন মাকামে পৌঁছে দেবে, যে মাকামে এক শ বছর তাহাজ্জুদ পড়েও তুমি পৌঁছতে পারবে না।
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে বললেন, বসে যাও। সাথে সাথে সকল সাহাবী বসে গেলেন। মজলিস শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দরজার দিকে গেলেন, সেখানে তিনি দেখতে পেলেন, একজন সাহাবী এমনভাবে বসে আছেন যে, এক পা ভেতরে আরেক পা চৌকাটের বাইরে। দরজার মাঝে তিনি বসে আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এভাবে বসে আছো কেনো? সাহাবী বললেন, আপনি যখন বসার আদেশ দিয়েছিলেন তখন আমার এই অবস্থা ছিলো। হুকুম শোনার পর আমার ভয় হলো, ভেতরের পা যদি সামনে অগ্রসর করি, তাহলে না জানি নাফরমানী হয়ে যায় আর বাইরে পা যদি ভেতরে প্রবেশ করি, না জানি অবাধ্যতা হয়ে যায়। এই জন্য যে অবস্থায় ছিলাম সেই অবস্থায় বসে গিয়েছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে মজলিস থেকে বের হয়ে বকরীর পালের কাছে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন হযরত আবু দারদা রা. বসে আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে বসে আছো কেনো? আবু দারদা রা. বললেন, আমি শুনতে পেয়েছি, আপনি বলেছেন, বসে যাও। এ আদেশ শুনে আমি সাথে সাথে বসে গিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো মসজিদে অবস্থানরতদের আদেশ করেছি। তিনি বললেন, আপনার হুকুম শোনার পর আমি এই চিন্তা করিনি যে, এটা মসজিদে অবস্থানরতদের জন্য, না বাইরে অবস্থানরতদের জন্য।

বেয়াদবীর পরিণতি
হযরত আলী রা. ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কিছু স্বর্ণ পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো চারজন ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। তারা হলেন, ১. আকরা বিন হাবিস হানযালী, ২. মুজাশায়ী, ৩. উয়াইনা বিন বদর ফাযারী ও ৪. যায়িদ তায়ী।
এতে কুরাইশ ও আনসারের লোকেরা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলতে লাগলো, আমাদেরকে রেখে নজদের সরদারদেরকে দেওয়া হলো কেনো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাদের হৃদয়গ্রাহী করার জন্য দিয়েছি। এরই মধ্যে একজন ব্যক্তি, যার চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, কপাল উত্থিত, দাড়ি ঘন, মাথার চুল মুণ্ডানো, ওই লোক বলে উঠলো, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমিই যদি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করি, তাহলে তাঁর আনুগত্য করবে কে? আল্লাহ তাআলা আমাকে আমীন [বিশ্বস্ত] বানিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তোমরা আমাকে বিশ্বস্ত আমানত মনে করো না।
উক্ত ব্যক্তির এই বেয়াদবীর কারণে এক সাহাবী তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে অনুমতি দেননি। তাঁকে বাধা দিয়েছেন। অতঃপর যখন সেই ব্যক্তি মজলিস থেকে উঠে চলে যেতে লাগলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারপর তার কওম থেকে এমন একটি জামাআত সৃষ্টি হবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। দীন থেকে তারা এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেভাবে তীর কামান থেকে বের হয়ে যায়। তারা মুসলমানদের হত্যা করবে, মূর্তিপূজারীদেরকে ছেড়ে দেবে, তাদেরকে কিছুইকরবে না। আমি যদি তাদেরকে পাই, তাদের আবির্ভাব পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তাহলে তাদেরকে হত্যা কর সাফ করে ফেলবো, যেভাবে আল্লাহ তাআলার আযাব আদ সম্প্রদায়কে মেরে সাফ করে দিয়েছে।
হাদীসের উক্ত ঘটনা থেকে বোঝা গেলো, যে সব লোক বড়দের এবং বুযুর্গদের জায়িয এবং হেকমতপূর্ণ কাজে আপত্তি করবে, সমালোচনা করবে, তাদের দুনিয়াবী শাস্তি হলো, তাদের সন্তানরা বদ- দীন এবং গোমরা হবে। এই জন্য কোনো ব্যক্তি যদি চায়, তার সন্তান ইসলামের উপর অবিচল থাকুক, বদ-দীন এবং গোমরাহ না হোক, তার উচিত, স্বীয় আকাবির ও বুযুর্গানে দীনের কাজে আপত্তি না করা ও তাঁদের সাথে বেয়াদবী না করা।
অন্য এক হাদীসের সারমর্ম হলো, নামাযের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যদি ইমামের আগে রুকু সাজদা করে, অথবা ইমামের আগে কোনো রুকন আদায় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার আকৃতি গাধার আকৃতির ন্যায় করে দেবেন।
এক আলেম এই হাদীস পড়ার পর তাঁর অন্তরে শয়তান এই কুমন্ত্রণা দিলো যে, এটা কীভাবে হতে পারে? একবার পরীক্ষা করার জন্য জেনে-বুঝে ইমামের আগে রুকু সিজদা করে ফেললো। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর আকৃতি গাধার আকৃতির ন্যায় করে দেন।
সেই আলেম অত্যন্ত আফসোস এবং লজ্জার কারণে নেকাব পরিধান করে হাদীস পড়াতে লাগলেন। এক বছর পর যখন ছাত্ররা ফারেগ হয়ে চলে যাওয়ার সময় হলো, তখন ছাত্ররা আবেদন করলো, উস্তাদে মুহতারাম! আমরা এক বছর যাবত আপনার কাছে হাদীস পড়েছি, কিন্তু এ দীর্ঘ সময় আপনার দর্শন থেকে বঞ্চিত ছিলাম। আজ বিদায়ের প্রাক্কালে আপনার দর্শন লাভে ধন্য হতে চাই।
এ আবেদন শোনার পর উস্তাদ কেঁদে ফেললেন। কেঁদে কেঁদে বললেন, তোমরা কখনো সহীহ হাদীসের ব্যাপারে সন্দেহ সংশয় করবে না। হাদীসের সাথে বেয়াদবী করবে না। আমি একবার এক হাদীসের ব্যাপারে সংশয় করেছিলাম, যার ফলে আল্লাহ তাআলা আমার আকৃতি বিকৃত করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে, আমাদের বংশধরকে বেয়াদবী থেকে বেঁচে বুযুর্গানে দীনের সম্মান ইজ্জত ও তাঁদের সাথে আদব বজায় রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন। সুম্মা আমীন।

উস্তাদের সামনে বসার আদব
১. উস্তাদের সামনে অত্যন্ত বিনয় ও আদবের সাথে বসবে।
২. সবসময় উস্তাদের কাছাকাছি জায়গায় বসার চেষ্টা করবে। যাতে উস্তাদের কথা স্পষ্টভাবে শোনা যায়। তবে এতো কাছে বসবে না, যা বেয়াদবীর মনে গণ্য হয়। কমপক্ষে দুই থেকে তিন ফিট দূরত্বে বসবে।
৩. পূর্ণ মনোযোগের সাথে বসবে। চোখ কান খোলা রাখবে। মনোযোগ পূর্ণ উস্তাদের দিকে রাখবে। এদিক সেদিক তাকাবে না। এটা বেয়াদবী।
৪. এক কথা যেনো উস্তাদকে দ্বিতীয় বার বলতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবে। পূর্ণ মনোযোগ উস্তাদের দিকে রাখবে। হযরত কাতাদা রহ. বলেন, আমি কখনো কোনো কথা দ্বিতীয় বার বলার জন্য উস্তাদকে বলিনি। যখনই কোনো কথা আমার কানে এসেছে, সাথে সাথে তা আমি মুখস্থ করে নিয়েছি। কোনো কথা যেনো না ছুটে, সেদিকে আমার পূর্ণ দৃষ্টি থাকতো।
৫. উস্তাদের সামনে কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে বা টেক লাগিয়ে বসবে না। এটা চরম বেয়াদবী। আল্লামা শরীক রহ. এর দরসে খলীফা মাহদীর এক ছেলে বসতো। সে একদা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে শাইখ শরীককে এক হাদীসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো। শরীক তার দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করলেন না। ছেলে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলো, তখনও কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন না। অতঃপর সেই ছেলে বললো, আপনি খলীফার সন্তানকে অপমান করছেন। শাইখ শরীক রহ. বললেন, দীনী ইলম তার চেয়েও অধিক মূল্যবান। আমি ইলমকে অসম্মানী করতে পারি না। অর্থাৎ, হেলান দিয়ে প্রশ্ন করা ইলমের আদবের পরিপন্থী।
৬. দরসে জামার হাতা গুটিয়ে বসা বেয়াদবী। এমনিভাবে শরীরের কোনো অঙ্গ নিয়ে খেলা করা, দাঁত খিলাল করা, নাক পরিষ্কার করা, দরসে বসে পা নাড়ানো ইত্যাদি বেয়াদবী। এসব বেয়াদবী থেকে বেঁচে থাকবে।
৭. উস্তাদের সামনে এক ছাত্র অপর ছাত্রকে ধমক দেওয়া বেয়াদবী।
৮. দরসে কাশি বা হাঁচি আসলে যথাসম্ভব নিচু আওয়াজে হাঁচি কাশি দেওয়া। হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখবে। হাই আসলে মুখে হাত রাখবে।

কয়েকটি আদব
১. তালিবুল ইলমের জন্য জরুরী হলো, স্বীয় উস্তাদকে সর্বোচ্চ সম্মান করা। হযরত মুগীরা রহ. বলেন, আমরা উস্তাদকে এই পরিমাণ ভয় পেতাম, যে পরিমাণ ভয় মানুষ বাদশাহকে পেয়ে থাকে।
২. স্বীয় উস্তাদকে সবচেয়ে বড় হুজুর মনে করা। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, যার ভেতরে উস্তাদের বড়ত্ব থাকবে না, সে কামিয়াব হতে পারবে না।
৩. উস্তাদের সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রাখা। তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে সবসময় বেঁচে থাকা।
৪. নিজের করণীয় ও বর্জনীয় ব্যাপারে উস্তাদ থেকে পরামর্শ নেওয়া।
৫. উস্তাদের সামনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। উস্তাদ নিজের সমবয়সী কিংবা কম বয়সী হলেও তাঁর সামনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।
৬. উস্তাদের শাসন ও ধমক সহ্য করা। কোনো ধরনের পতিক্রিয়া প্রদর্শন না করা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা উস্তাদের কঠোর শাসন মেনে ইলম অর্জন করে, তাদের ভবিষ্যত আলোকিত হয়। যারা উস্তাদের শাসন মানতে পারে না, তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে না।
৭. নিজেকে উস্তাদের কাছে সোপর্দ করে দেওয়া। সার্বিক বিষয়ে উস্তাদের পরামর্শে চলা। একজন রোগী যেমন সম্পূর্ণরূপে নিজেকে ডাক্তারের কাছে সঁপে দেয়, তেমনিভাবে প্রতিটি ছাত্র নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উস্তাদের কাছে সঁপে দেওয়া।

ইলমে দীন পাওয়ার জন্য আদব বজায় রাখা খুবই জরুরী
ইমাম তাবরানী রহ. রিওয়ায়াত নকল করেছেন, وتواضعو المن تعلمون منه -যাঁর থেকে ইলম অর্জন করবে, তাঁর সামনে বিনয় প্রদর্শন করবে। হযরত থানবী রহ. বলতেন, উস্তাদের প্রতি যে পরিমাণ মুহব্বত থাকবে, উস্তাদের সাথে যে পরিমাণ আদব ও ইহতিরাম বজায় রাখবে, ইলমের মধ্যে সেই পরিমাণ বরকত লাভ করবে। আল্লাহ তাআলার রীতিও এটাই যে, উস্তাদ সন্তুষ্ট না থাকলে ইলম আসবে না। আসতে পারে না।
হযরত থানবী রহ. এ-ও লিখেছেন যে, উস্তাদের সাথে আদব রক্ষা করা তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত। যার মধ্যে এই গুণ নেই, সে মুত্তাকী হতে পারে না।
যে মহান ব্যক্তি থেকে দীনী বা দুনিয়াবী কোনো উপকার লাভ করবে, তাঁর সামনে নিজেকে মিটিয়ে দেবে। তাঁর সাথে আদব রক্ষা করে চলবে। তাঁর আনুগত্য এবং খিদমাতকে নিজের সৌভাগ্য মনে করবে। আগ্রহের সাথে পড়বে, পঠিত বিষয়গুলো খুব স্মরণ রাখবে। এসবের কারণে উস্তাদ এতটা আপ্লুত ও আনন্দিত হবেন যে, লক্ষ টাকা হাদিয়া দিলেও তাঁরা ততটা আনন্দিত ও খুশি হবেন না। কথায় বা কাজে যদি কোনো ভুল হয়ে যায়, সাথে সাথে নিজের ভুল স্বীকার করে নেবে। কথা ঘুরাবে না। কেননা, এটা অহংকরের নিদর্শন।

উস্তাদের খেদমত করার বরকত
উস্তাদের খেদমত করার এই ধারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানা থেকে অদ্যবধি চলে আসছে। এর কিছু নমুনা পেশ করা হলো।
এক. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উযুর জন্য পানি দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য দুআ করেছেন।
দুই. হযরত আনাস রা. দশ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে থেকেছেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জান মাল ও সন্তান-সন্তুতিতে বরকতের জন্য দুআ করেছেন।
তিন. ইমাম কাযী ফখরুদ্দীন আসারবন্দীকে মরু শহরে সুলতানের কাছে এই অবস্থায় দেখা গেছে যে, বাদশাহ স্বয়ং তার খেদমত করছেন আর বার বার বলছেন, আমি এই রাজত্ব এবং ইজ্জত সম্মান কেবলই উস্তাদের খেদমতের উসীলায় পেয়েছি। আমি আমার উস্তাদ আবূ যাইদ দাব্বুসীর অনেক খেদমত করতাম। এমনকি ত্রিশ বছর পর্যন্ত লাগাতার তাঁর খানা রান্না করেছি এবং তাঁর শান ও আযমতের দিক খেয়াল করে আমি এর থেকে কোনো কিছু খাইনি।
চার. খলীফা হারুনুর রশীদ স্বীয় ছেলেকে হযরত আসমায়ী রহ. এর কাছে ইলম শেখার জন্য পাঠিয়েছিলেন। খলীফা হারুনুর রশীদ একদিন দেখতে পেলেন, আসমায়ী রহ. উযু করছেন আর শাহযাদা উযুর পানি ঢালছে। খলীফা এই দৃশ্য দেখে হযরত আসমায়ী রহ.-কে বললেন, আমি তাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছি ইলম শেখার জন্য এবং আপনার থেকে আদব শেখার জন্য, কিন্তু আপনি কী আদব শিক্ষা দিচ্ছেন? তার তো উচিত ছিলো, এক হাত দিয়ে পানি ঢালা আর অপর হাত দিয়ে আপনার পা ধুয়ে দেওয়া।
পাঁচ. হাম্মাদ বিন মুসলিম রহ. এর স্ত্রী বলেন যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. আমাদের বাজার করতেন। দুধ দোহন করতেন। এমনিভাবে ঘরের যাবতীয় কাজ করতেন। হাম্মাদ রহ. ইমাম আবু হানীফা রহ. এর উস্তাদ ছিলেন।
ছয়. হযরত মাআন বিন ঈসা ছিলেন ইমাম মালেক রহ. এর একজন শাগরেদ। তিনি স্বীয় যুগের একজন বড় মুহাক্কিক ও মুফতী ছিলেন। তাঁর এই মর্যাদা উস্তাদের খেদমতের ফলে অর্জন হয়েছে। ইমাম মালেক রহ. যখন দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। লাঠির উপর ভর করে চলার বয়স হয়েছিলো, লাঠির পরিবর্তে হযরত মাআন ইবনে ঈসা তাঁর সাথে থাকতেন। ইমাম মালেক রহ. তাঁর কাঁধে ভর করে চলতেন।
সাত. মাওলানা কাসিম নানুতুবী রহ. এর কাছে হায়দারাবাদ দক্ষিণের দুইজন শাহযাদা পড়ার জন্য আসতো। তিনি মাঝেমধ্যে তাদের দ্বারা হাত পা টেপাতেন এবং বলতেন, তাদের দ্বারা আমার হাত পা টেপানোর প্রয়োজন নেই, কিন্তু ইলম এভাবেই আসে।

উস্তাদের সাথে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর আদব
ইমামে আযম আবু হানীফা রহ. বলেন, আমার উস্তাদ হাম্মাদ রহ. যখন ইন্তিকাল করেছেন, তখন থেকে আমি প্রত্যেক নামাযের পর তাঁর জন্য ও আমার সম্মানিত পিতার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমি কখনো আমার মুহতারাম উস্তাদের ঘরের দিকে আমার পা ছড়িয়ে বসিনি। যদিও আমার এবং তাঁর ঘরের মাঝে ছয় গলী [ও যথেষ্ট পরিমাণ ঘর] এর দূরত্ব ছিলো।

উস্তাদের খেদমত কেনো করা উচিত
উস্তাদুল মুহাদ্দিসীন সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, উস্তাদের সাথে আদব বজায় রাখা এবং তাঁদের কৃতজ্ঞতা আদায় করা অত্যন্ত জরুরী। উস্তাদগণ আমাদের জন্য অনেক বড় মুহসিন ও কল্যাণকামী। পিতা- মাতাও আমাদের মুহসিন ও কল্যাণকামী। তাঁরা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। বহু যাতনা বরদাস্ত করেছেন। কিন্তু তাঁদের যাপিত সকল কষ্ট ছিলো শারীরিক প্রবৃদ্ধির জন্য। আর যতক্ষণ পর্যন্ত এই শরীরের সাথে ঈমান না থাকবে, ততক্ষণ এই শরীরের কোনো মূল্য নেই। ঈমানের তারাক্বী ও উন্নতি ইলমের মাধ্যমে অর্জিত হয়। আর আমাদের ইলমী প্রবৃদ্ধি উস্তাদদের মাধ্যমেই হয়। উস্তাদদের থেকে আমরা কুরআন-হাদীসের জ্ঞান পাই এবং ঈমানের দীপ্তি পাই। সুতরাং উস্তাদগণ আমাদের মুহসিন, তাই তাঁদের ইকরাম ও সম্মান করা উচিত।

ইলমের কাছে আসতে হয়, ইলম কারো কাছে যায় না
ইমাম আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম রহ. [মৃত ২২৪হিজরী] নিজের শিক্ষাজীবনের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আমি যখন কোনো মুহাদ্দিস বা কোনো আলেমের কাছে উপস্থিত হতাম, তখন বাইর থেকে আওয়ায দিতাম না এবং দরজায়ও টোকা দিতাম না। বরং সর্বদা বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁদের বের হওয়ার অপেক্ষা করতাম। আমি আহলে ইলমের এই সম্মান কুরআন থেকে শিখেছি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
ولو أنهم صبروا حتى تخرج إليهم لكان خيرا لهم
আপনি নিজে তাদের কাছে যাওয়া পর্যন্ত যদি তারা অপেক্ষা করতো তবে তাদের জন্য ভালো হতো।
আল্লামা দাউদী রহ. ‘তাবাকাতুল মুফাসসিরীন’ কিতাবে লিখেন, এটা আহলে ইলমের প্রতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদব।
এই আদব পালনে অগ্রগামী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। তিনি যাইদ ইবনে সাবিত রা. এর ঘরের দরজায় তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, অথচ প্রচণ্ড বাতাস তার চেহারা ধূলিমিশ্রিত করে দিচ্ছিলো। হযরত যাইদ ইবনে সাবিত রা. বাইরে এসে তাঁকে দেখে যখন বললেন, হে রাসূলের চাচাত ভাই! যদি আপনি সংবাদ দিতেন, তাহলে আমিই আপনার কাছে চলে আসতাম। তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন, ইলমের কাছে আসতে হয়, [ইলম কারো কাছে যায় না]।

আদবের সারকথা
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, আদবের সার ও মূলকথা হলো, স্বীয় কথা ও কাজ দ্বারা বড় কাউকে সামান্য পরিমাণ কষ্টও না দেওয়া। অন্যথায় ইলম অর্জন তো দূরের কথা, কখনো সে কঠিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। কেননা, যেভাবে শাইখের অনুরাগ ও করুণা উন্নতির কারণ, ঠিক তেমনি তাঁর ক্রোধ ও মনোকষ্ট বঞ্চিত হওয়ার কারণ। যদি জেনেবোঝে এমন কাজ করা হয়, তবে তো তা দ্বারা অন্তর আহত হয়। আর যদি অনিচ্ছায় হয়, তবে তা দ্বারাও কখনো অন্তরে পেরেশানী আসে, যা তালিবে ইলমের জন্য বঞ্চিত ও দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

উস্তাদের জন্য দুআ করা
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. এর প্রতি খুব আস্থা ও ভালোবাসা রাখতেন। সবসময় তিনি তাঁর খুব ইয্যত-সম্মান করতেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. বাহনে আরোহন করলে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর পেছনে পায়ে হেঁটে হেঁটে তাঁকে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞেস করতেন। এই আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর নিজের বক্তব্য হলো,
আমি ত্রিশ বছর যাবত এমন কোনো নামায পড়িনি, যাতে আমি ইমাম শাফেয়ী রহ. এর জন্য দুআ করিনি।

উস্তাদকে মহব্বত করলে কী লাভ
হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, ছাত্র যদি উস্তাদকে মহব্বত করে তাহলে উস্তাদেরও তাঁর প্রতি মহব্বত তৈরি হয়ে যায়। মাওলানা কাসিম নানুতী রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলার স্বাভাবিক নিয়ম হলো, উস্তাদের সাথে বে-আদবীর কারণে ইলম অর্জিত না হওয়া।
তিনি বলেন, আমাকে আল্লাহ তাআলা যা কিছু দিয়েছেন, তা কেবল উস্তাদ ও বুযুর্গদের সাথে আদব রক্ষা করা এবং তাঁদের সাথে মহব্বত রাখার কারণেই দিয়েছেন। হাদীসে আছে, যার থেকে ইলম শেখো তাঁর সাথে বিনয় ও আদব রক্ষা করে চলো।

উস্তাদের দুআর প্রভাব
মাযাহিরুল উলূমের মুহাদ্দিস এবং সদরুল মুদাররিসীন হযরত মাওলানা শাহ আব্দুর রহমান রহ. বলেন, সাহারানপুর পড়ার জন্য আমি যখন আমার এলাকা থেকে এসেছি, তখন সকল উস্তাদের সাথে সাক্ষাত করে এসেছি। তবে যে উস্তাদের কাছে আমি প্রাথমিক কিতাব পড়েছি, তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে পারিনি। এরপর আমি যখন সাহারানপুর এসে পড়া শুরু করলাম, তখন কিতাব আমার মোটেই বুঝে আসছিলো না। অথচ আমাকে জামাতের খুব বুঝমান ছাত্র মনে করা হতো। এর কারণ কী হতে পারে, এ নিয়ে চিন্তা করলে আল্লাহ তাআলা আমাকে সুপথ দেখিয়েছেন। তাই আমি ওই উস্তাদের কাছে চিঠি লিখে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি এবং সাক্ষাত না হওয়ার কারণ উল্লেখ করেছি। উস্তাদ উত্তলে লিখেছেন, আমি তো মনে করেছি, আমাকে ছোট মনে করে তুমি আমার সাথে সাক্ষাত করোনি। কিন্তু তোমার চিঠি পড়ে বুঝতে পারলাম, আমি যা ভেবেছি ব্যাপারটি মূলত তা নয়। এরপর চিঠিতে দুআর কিছু বাক্য লিখে দিলেন।
হযরত মাওলানা আব্দুর রহমান রহ. বলেন, উস্তাদদের ইহতিরামের ফলেই আজ তোমাদের সামনে তিরমিযী পড়াচ্ছি।
তার দরসের অবস্থা ছিলো, সমকালীন সবাই একথার উপর একমত ছিলো যে, পুরো দেশে তাঁর থেকে ভালোভাবে কেউ তিরমিযী পড়াতে পারে না।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা, যেটি অনেকেই জানে না
মুফতী শফী রহ. বলেন, আমি যখন মধ্যমস্তরের কিতাব পড়ি, তখন একবার থানবী রহ. দারুল উলূমের মসজিদে বয়ান করলেন। আলোচনার বিষয় ছিলো, মানুষ বুযুর্গদের তো এই ভেবে সম্মান করে যে, তাঁরা বুযুর্গ, আল্লাহওয়ালা, ইবাদতগুযার এবং যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখ। কিন্তু যাঁরা বড় আলেম, তাঁদেরকে এই ভেবে সম্মান করে না যে, তাঁরা অনেক ইলমওয়ালা। তাঁরা তাদের উস্তাদ হলেও না।
তিনি বলেন, 'আমি এখানে এসে দেখেছি, উস্তাদের সাথে আদব দেখানো হয়, তাদের শ্রদ্ধা করা হয়। কিন্তু নিজের উস্তাদের সাথে আদব রক্ষা করা হচ্ছে না। কেননা, উস্তাদের উস্তাদকে মনে করা হয় তিনি বুযুর্গ। তখন তিনি মাওলানা ইযায আলী রহ. এর নাম নিয়েছেন। যিনি আমার অনেক সম্মানিত উস্তাদ। তখন হযরত মাওলানা শাইখুল হিন্দ রহ. জীবিত ছিলেন এবং দারুল উলূমে উপস্থিত ছিলেন।
হযরত ওয়ালা রহ. বলেন, তোমরা তোমাদের উস্তাদ মাওলানা ইযায আলী রহ. এর ততোটা সম্মান করো না, যতটা সম্মান করো শাইখুল হিন্দ রহ.এর। অথচ তিনি তোমাদের সরাসরি উস্তাদ নন। তাঁর আদব ও ইহতিরাম বেশি করো। তাঁর ইলমের কারণে নয়, বরং তাঁর বুযুর্গীর কারণে।
হযরত ওয়ালা রহ. বলেন, আমি উভয়কেই ইহতিরাম ও সম্মানের উপযুক্ত মনে করি। বুযুর্গী স্বতন্ত্রভাবে আদবের উপযুক্ত আর ইলমও স্বতন্ত্রভাবে আদব ও ইহতিরামের উপযুক্ত। কেননা, আল্লাহ যদি কাউকে দীনের জ্ঞান দান করেন, যদি তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন, এছাড়াও অন্য কোনো ইবাদত না করেন এবং তিনি বুযুর্গদের মধ্যে গণ্য না হন। তবে তিনি গুনাহে জড়িতও নন। বরং সাধারণ মুসলমানদের মতো নেককার মুসলমান এবং দ্বীনের জ্ঞানও রাখেন, তাহলে আমি তাঁরও ইয্যত-সম্মান করি, তাঁর ইলমের কারণে।

যিনি এক মুহূর্তের জন্যও উস্তাদকে অসন্তুষ্ট করেননি
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, আমি ইলম অর্জনের জন্য খুব বেশি মেহনত করিনি এবং অধিক পরিমাণে কিতাবও আমি মুতালাআ করিনি। তবে আমি আমার কোনো উস্তাদকে এক মুহূর্তের জন্যও অসন্তুষ্ট হতে দিইনি। সেটার বরকতেই আল্লাহ তাআলা আমাকে দীন এবং ইলমে দীনের কিছু খিদমাত করার তাওফীক দিয়েছেন। সাধারণত তিনি আকবার মরহুমের এই শের পড়তেন-
دل ہوتا ہے بزرگوں کی نظر سے پیدا ۔ نہ کتابوں سے ، نہ کالج سے نہ زر سے پیدا
কিতাব, কলেজ আর অর্থবিত্ত দ্বারা অন্তর তৈরি হয়না, অন্তর তো বুযুর্গদের দৃষ্টির কারণেই তৈরি হয়।

মুসলিম বাদশাহদের অন্তরে ইলম ও আলেমদের মর্যাদা
মুসলিম বাদশাহদের অন্তরে ইলম ও আহলুল ইলমের কী পরিমাণ সম্মান ও মর্যাদা ছিলো, তা নিচের ঘটনা থেকেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
একবার খলীফা মুতাযিদ বিল্লাহ, সাবিত বিন কুররাহের হাতে হাত রেখে বাগানে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ খলীফা সাবিত বিন কুররাহের হাত থেকে একটানে নিজের হাত সরিয়ে ফেললেন। এতে আশ্চর্য হয়ে সাবিত জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, হাত সরিয়ে নিলেন যে? ঘটনা কী?
খলীফা বললেন, আমার হাত আপনার হাতের উপরে ছিলো, যা স্পষ্ট বেয়াদবী। জ্ঞানীর হাত উপরে থাকা উচিত।

উস্তাদের ছেলেদের সাথে আদব রক্ষা করা
হযরত নানুতবী রহ. এর ছেলে মুহাম্মাদ আহমাদ শাইখুল হিন্দ রহ. এর ছাত্র ছিলো। রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ. এর ছেলে হাকীম মাসউদ শাইখুল হিন্দ রহ. এর মুরীদ ছিলো। শাইখুল হিন্দ রহ. উভয়জনকে খাটিয়াতে বসিয়ে তিনি যমীনে বসতেন। একবার তিনি তাদেরকে লক্ষ করে বলেছেন, মুহাম্মাদ আহমাদ! তুমি আমার উস্তাদের ছেলে। মাসউদ আহমাদ! তুমি আমার মুরব্বীর ছেলে। আমি তাদের যথাযথ হক আদায় করতে পারিনি। তোমাদের কাছে আমার আবেদন, যদি তোমাদের পিতা জিজ্ঞেস করে, মাহমূদ তোমাদের সাথে কী আচরণ করেছে? তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমার খেয়াল রাখবে। আমাকে লাঞ্ছিত করবে না।

উস্তাদ রাগ করলে করণীয়
তালিবে ইলমদের জন্য উস্তাদদের সন্তান এবং তাদের সম্পৃক্তদেরও সম্মান করা উচিত। উস্তাদ যদি কোনো কারণে রাগ করেন, তাহলে মাফ চাওয়া এবং তাদেরকে খুশী করা আবশ্যক। কারো অবস্থা দেখে বা কোনো কথার কারণে যদি উস্তাদ রাগ করেন, তাহলে তালিবুল ইলম তা বরদান্ত করবে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে নেবে। শাসন করার কারণে ভ্রু কুঞ্চিত করবে না ও মুখ কালো করে রাখবে না।

টিকাঃ
৫৭. সূরা হুজুরাত : ৪-৫।
৫৮. তাযকিরাতুস সামি ওয়াল মুতাকাল্লিম: পৃষ্ঠা-৮৮।
৫৯. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৩৯।
৬০. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৩৯।
৬১. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৩৯।
৬২. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৪০।
৬৩. আপবীতি: ৬/৮৬।
৬৪. তাহযীবুল আসমা: ২/২১৮।
৬৫. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ১/১৮৪।
৬৬. সুরা হুজুরাত, আয়াত: ০৫।
৬৭. মিসালী বাষ্পান: পৃষ্ঠা-১১৫।
৬৮. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ২/৫৫।
৬৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১০/৩২৬।
৭০. আদাবুল মুআশারাত: পৃষ্ঠা- ২৩৩।
৭১. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: পৃষ্ঠা-৩১।
৭২. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-২১৭।
৭৩. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-৬২৮।
৭৪. মাজালিসে মুফতীয়ে আযম: ৫৯৬, আদ-দাওলাতুল আব্বাসিয়া ফী আসরিল মুতাযিদ বিল্লাহ : ৪০৪, উয়ূনুল আন্না ফী তাবাকাতিল আতিব্বাহ, ইবনু আবী উসাইবিয়া কৃত: ২৯৬। মুতাযিদ বিল্লাহ এর নাম হচ্ছে, আবুল আব্বাস আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল মুতাযিদ বিল্লাহ ( ২৪২-২৮৯ হি.) আর সাবিত বিন কুরাহ (২২১-২৮৮ হি.) সমকালীন একজন দার্শনিক ও ডক্টর এবং 'সাবিয়ান' বা 'সাবি' ধর্মের অনুসারী। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, তারা ভ্রষ্টতার উপরই মারা গিয়েছে। (সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৪৮৫; ওফায়াতুল আয়ান: ১/৩১৩।
৭৫. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ১/১৮৬।
৭৬. আদাবুল মুআশারাত কিছুটা পরিবর্তন সহ: পৃষ্ঠা-৩৩৩।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 আসবাবে ইলমের ইহতিরাম ও সম্মান প্রদর্শন

📄 আসবাবে ইলমের ইহতিরাম ও সম্মান প্রদর্শন


উস্তাদের সাথে আদব বজায় রাখার সাথে সাথে আসবাবে ইলমের আদবও রক্ষা করবে। অনেক তালিবে ইলম যমীনে কিতাব বিছিয়ে অথবা যমীনে একটি কাপড় বিছিয়ে তাতে হাদীস ও তাফসীরের কিতাবাদী রেখে পড়া শুরু করে দেয়। অথচ কাপড়ও যমীনের হুকুমে। এসকল কাজ কিতাবের আদবের পরিপন্থী। আমাদের চিন্তা করা উচিত, আমাদের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মান-মর্যাদা কতটুকু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস অথবা তাঁর আলোচনা যখন আমাদের সামনে আসে তখন সেগুলোরও সে পরিমাণ আদব ও ইহতিরাম করা চাই। হাদীস ও ফিকহের কিতাবগুলো কোনো উঁচু জায়গায় রেখে পড়া উচিত। কিতাবের দিকে পা ছড়িয়ে বসা থেকেও আমাদের বিরত থাকা উচিত। কেননা, কিতাবের দিকে পা ছড়িয়ে বসা কিতাবের আদবের পরিপন্থী।

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কর্তৃক কুরআনের ইহতিরাম
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ইমাম আবু হানীফা রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্রদের একজন। ফিকহ, বিচারকার্য এবং ফতোয়া প্রদানে তাঁর অভাবনীয় পাণ্ডিত্য ও অনুপম যোগ্যতা ছিলো। ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দরসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো, তিনি কুরআন হিফজ করা ব্যতীত কাউকে নিজের দরসে অংশগ্রহণের অনুমতি দিতেন না। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. -ও হাফেযে কুরআন ছিলেন।
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে দুই ব্যক্তি ঝগড়ায়লিপ্ত ছিলো। তাদের একজন অপরজনকে উদ্দেশ্য করে বললো, তোমার আর আমার উদাহরণ তো কুরআনের এই আয়াতের মতো।
إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةً وَلِي نَعْجَةٌ وَاحِدَةٌ فَقَالَ أَخْفِلْنِيهَا
নিশ্চয় এ তো আমার ভাই। তার আছে ৯৯টি দুম্বা। আর আমার আছে (মাত্র) একটি দুম্বা। বাহ্,ও বলে, এই একটিও আমাকে দিয়ে দাও।
এ কথা শোনার সাথে সাথে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. রাগ আর অনুতাপে ফেটে পড়ছিলেন। তাঁর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়লেন। যখন তাঁর অবস্থা কিছুটা ভালো হলো, তিনি ওই ব্যক্তিকে রাগের সুরে বললেন, তুমি কি আল্লাহকে মোটেও ভয় পাওনা? তুমি কি আল্লাহর কালামকে সাধারণ কথা-বার্তা মনে করেছো? কুরআন পাঠকারীর জন্য খুশু-খুজুর সাথে, আল্লাহর ভয় ও ডর নিয়ে কুরআন পাঠ করা উচিত; এমন যেন না হয় যে, কুরআন পাঠ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি তোমার মধ্যে এর বিন্দুমাত্র দেখছি না। তোমার কী বিবেক চলে গেছে যে, আল্লাহর কালামকে খেল-তামাশার বিষয় বানিয়ে নিলে?

কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে খেলতামাশা সূচনা করা চরম বেয়াদবী
কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের সময় কুরআনের এই আযমত ও বড়ত্ব অন্তরে রেখে তিলাওয়াত করবে যে, অনেক উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন এই কালাম, যেই মহান স্রষ্টার এই কালাম, তাঁর বড়ত্ব ও মহত্বও অন্তরে রাখবে। অর্থের প্রতি খেয়াল করে কুরআনে কারীম তিলাওয়াত করবে। কুরআন মাজীদ শিখে ভুলে যাওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বিভিন্ন খেল-তামাশার সূচনা করা সুমহান এই কালামের সাথে বে-আদবীর শামিল। আল্লাহ পাক আমাদের হিফাযত করুন।

আল্লামা কাশমিরী রহ. এত বড় আলেম হলেন কীভাবে?
একবার মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সাহেব রহ. দরসে বললেন, একবার আল্লামা কাশমীরী রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনি কাশমীরী হলেন কীভাবে?
উত্তরে কাশমীরী রহ. বললেন, কিতাবের আদব রক্ষা করে। উপস্থিত লোকেরা বললো, কিতাবের আদব তো অনেকেই রক্ষা করে। কাশ্মীরী রহ. বললেন, আমি যতটা করি, তারা হয়তো ততটা করে না। উযু ব্যতীত কোনো দীনী কিতাব আমি কখনো মুতালাআ করিনি। মুতালাআ চলাকালীন কিতাবকে আমার অনুগামী বানাইনি, বরং আমি নিজেকে কিতাবের অনুসারী বানাই। যেমন, বুখারী শরীফ পড়ার সময় 'হাশিয়া' পড়তে হলে আমি কিতাব স্বীয় জায়গায় রেখে নিজের জায়গা পরিবর্তন করে ঘুরে ঘুরে চারপাশের 'হাশিয়া' পড়ে নিতাম। আমি টেবিলে বসেও কখনো কিতাবকে পায়ের দিকে রাখতাম না। বরং নিজের মাথা বরাবর রাখতাম। সবশেষে তিনি বললেন, কিতাবের আদব রক্ষা করা আমাকে আনোয়ার শাহ কাশমীরী বানিয়েছে।

দুটি আদব
তালিবে ইলমদের উচিত, নিজের ব্যবহারের কোনো কিছু কিতাবের উপর না রাখা। কিতাবের উপর দোয়াতকালি রাখা এক ব্যক্তির অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। উস্তাদ তাকে দেখে বললেন, তুমি নিজের ইলম দ্বারা কোনো উপকৃত হতে পারবে না। কিতাবের মধ্যে অনর্থক এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না লেখাও কিতাবের প্রতি আদব।

উযু ব্যতীত দরসে না বসা
হযরত মাওলানা সিরাজ আহমাদ সাহেব রহ. দারুল উলূম দেওবন্দে হাদীস পড়াতেন। দরস চলাকালীন একদিন কোনো জানাযা এসে গেলে মাওলানা নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন অনেক ছাত্র উযু করতে চলে গেলো। জানাযার নামায পড়ে এসে মানুষজন দেখলো, মাওলানা কাঁদছেন। একজন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে হযরত বলেন, আমরা রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ. এর কাছে হাদীস ও তাফসীরের সবক উযু ব্যতীত কখনো পড়িনি। আজকালের তালিবে ইলমরা উযু ছাড়া এসব সবক পড়ছে, এই দুঃখে আমি কাঁদছি।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আদব
তালিবে ইলমদের উচিত, ধর্মীয় কিতাবের আদব ও ইহতিরাম করা। উযু ব্যতীত কোনো কিতাব স্পর্শ না করা। কিতাবের দিকে পা না ছড়ানো। তাফসীরের কিতাবের নিচে হাদীসের কিতাব, হাদীসের কিতাবের নিচে ফিকহের কিতাব এবং ফিকহের কিতাবের নিচে অন্যান্য শাস্ত্রের কিতাব রাখা। কিতাব উঠানোর সময় আদবের সাথে উঠানো। কাউকে কিতাব দেওয়ার প্রয়োজন হলে ছুড়ে না দেওয়া।

আল্লামা কাশমীরী রহ. এর সতর্কীকরণ
হযরত মাওলানা আযীযুর রহমান রহ. বলেন, ১৩৮১ হিজরীর যুলকাদা মাসের ৫ তারিখে আমি যখন মদীনা মুনাওরায় মাওলানা সাইয়িদ বদরে আলম মুহাজিরে মাদানী রহ. এর কাছে পৌঁছলাম, তখন আলোচনাসভা চলছিলো। তাতে তিনি বললেন, দেওবন্দে আমি একবার শুয়ে শুয়ে কিতাব মুতালাআ করছিলাম। আমার রুমের সামনে দিয়ে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমীরী রহ. যাচ্ছিলেন। আমাকে সে অবস্থায় দেখে খুব রাগ করলেন এবং অসন্তুষ্ট হয়ে শুধু এতটুকু বললেন, 'আমি সারাজীবন তেপায়া ব্যতীত কিতাব রাখিনি।' শেষ বয়সে অসুস্থতার সময় শাহ সাহেব রহ. একটি রুমাল বিছিয়ে তাতে কিতাব রাখতেন।

কিতাব কীভাবে রাখবেন
যেকোনো কাজে যখন আদব ও হুকুকের প্রতি লক্ষ রাখা হয়, তখন তাতে কল্যাণ ও বরকত হয়। বুযুর্গানে দীন লিখেছেন, যেমনিভাবে উস্তাদের ইহতিরাম, সম্মান ও আদব রক্ষা করা জরুরী, ঠিক তেমনিভাবে দীনী কিতাবের ইহতিরাম ও আদব রক্ষা করাও জরুরী। আদব ও ইহতিরামের কারণে ইলমী আলোচনা খুব বুঝে আসে এবং ইলমের কারণে আমলের তাওফীক হয়। যারা কিতাবের ইহতিরাম করে না, তারা ইলমের নূর ও আলো থেকে বঞ্চিত থাকে। বে-আদব রবের করুনা থেকে বঞ্চিত। প্রথমে দীনী কিতাবের বড়ত্ব নিজের অন্তরে রাখতে হবে। তারপর দীনী কিতাব আদব ও ইহতিরামের সাথে রাখবে ও উঠাবে। কিতাব জোরে রাখবে না বরং কাঁচের পেয়ালা যেভাবে রাখা হয়, সেভাবে যত্ন করে রাখবে। ডান হাতে কিতাব উঠাবে। ব্যাগের মতো কিতাব ঝুলিয়ে রাখবে না বরং সীনার সাথে লাগিয়ে রাখবে।

কিতাবের প্রতি আদব প্রদর্শনের কয়েকটি দিক
১. উযু ছাড়া স্পর্শ না করা।
ইলম শেখার যেসব উপকরণ রয়েছে, এর মধ্যে 'কিতাব' সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অতএব কিতাবের প্রতি যে পরিমাণ সম্মান প্রদর্শন করা হবে, ইলমের মধ্যে সেই পরিমাণ পূর্ণতা আসবে। ইমাম হালওয়ানী রহ. বলেন, আমরা এই ইলমকে আদবের মাধ্যমে শিখেছি। আমি উযু ছাড়া সাদা কাগজকেও স্পর্শ করতাম না।
তালিবুল ইলমদের উচিত, উযুসহ কিতাব স্পর্শ করা। হযরত কাতাদা রহ. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসসমূহকে উযুসহ বর্ণনা করা পছন্দ করতেন।
ইমাম মালিক রহ. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসকে সম্মানের কারণে উযু ছাড়া বর্ণনা করতেন না।
শামসুল আইম্মা সারাখসী রহ. এর বাতাস বের হওয়ার রোগ থাকা সত্ত্বেও উযু ছাড়া তিনি কিতাব হাতে নিতেন না। একবার মুতালাআর মাঝে তাকে সত্তর বার উযু করতে হয়েছে। তার যুক্তি ছিলো, ইলম হচ্ছে নূর এবং উযুও নূর। এজন্য ইলমের নূর উযুর নূরের কারণে বৃদ্ধি পাবে।
হযরত ইসহাক রহ. বলেন, আমি ইমাম আমাশ রহ.-কে দেখেছি, যখনই তিনি হাদীস বর্ণনা করতেন, উযু করে নিতেন। উযু করা সম্ভব না হলে তায়াম্মুম করে নিতেন।
২. কিতাবের দিকে পা না দেওয়া।
৩. তাফসীর, হাদীস ও ফিকহের কিতাবাদীকে অন্যান্য বিষয়ের কিতাবাদীর উপর রাখা।
৪. কিতাবকে আদবের সাথে উঠানো। কাউকে কোনো কিতাব দেওয়ার সময় ছুড়ে না মারা। এটা বেয়াদবী।
৫. কিতাবের উপর কোনো কিছু না রাখা। শাইখুল ইসলাম রহ. বলতেন, এক ছাত্র কিতাবের উপর দোয়াত রাখতো। আমাদের উস্তাদ তাকে বললেন, তুমি স্বীয় ইলম দিয়ে উপকৃত হতে পারবে না।
৬. কিতাব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
৭. অনেক ছাত্র বাঁ হাতে কিতাব আর ডান হাতে জুতা নিয়ে চলে। এ কাজটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। বড় বেয়াদবী। এ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে জুতাকে দীনী কিতাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়।
হিশাম ইবনে উরওয়াহ রহ. স্বীয় বাবা 'উরওয়াহ' এর সকল কিতাব আগুনে জ্বলে গিয়েছিলো। এতে তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, হায়! কিতাবের পরিবর্তে যদি আমার পরিবার জ্বলে যেতো!

টিকাঃ
৭৭. সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৩।
৭৮. মানাকিবুল ইমাম আবু হানীফা, মুওয়াফ্ফাক মাক্কী: ২/২৪৪।
৭৯. বা আদাব বা নসীব : পৃষ্ঠা-৭২,৭৪।
৮০. বা আদাব বা নসীব : পৃষ্ঠা-১२०।
৮১. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ: পৃষ্ঠা-১১৫।
৮২. বা আদাব বা নসীব : পৃষ্ঠা-১১৯।
৮৩. নাসাইহে আযীযিয়্যাহ : পৃষ্ঠা-৯০।
৮৪. তুহফাতুত তলাবা ওয়াল উলামা: পৃষ্ঠা-২৬৭।
৮৫. তালীমুল মুতাআল্লিম: পৃষ্ঠা-২৪।
৮৬. জামিউ বায়ানিল ইলম: ২/২৪৩।
৮۷. জামিউ বায়ানিল ইলম: ২/২৪৩।
৮৮. তালীমুল মুতাআল্লিম: ২৫।
৮৯. জামিউ বায়ানিল ইলম : ২/২৪৩।
৯০. তালীমুল মুতাআল্লিম : ২৫।
৯১. জামিউ বায়ানিল ইলম: ১/৯০।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 উত্তম চরিত্র গঠন

📄 উত্তম চরিত্র গঠন


তুমি তালিবুল ইলম। তুমি নবীর ওয়ারিস। তোমার চরিত্র এমন হওয়া উচিত যে, তোমার মধ্যে অহংকার থাকবে না। বরং বিনয় ও নম্রতা থাকবে। থাকবে না হিংসা ও ক্রোধ। থাকবে শুধু সকলের কল্যাণকামিতা ও সহমর্মিতার মনোভাব। লৌকিকতা থাকবে না, বরং আল্লাহর জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকবে। সর্বক্ষেত্রে উত্তম চরিত্র গ্রহণ করবে এবং মন্দ চরিত্র থেকে বিরত থাকবে।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ঘটনা
তাফসীরে দুরে মানছুরে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একবার তাঁর সামনে এক ব্যক্তি বললো, অমুক অমুক ব্যক্তিদের মাঝে পারস্পরিক ঝগড়া আছে। ফলে একজন অপরজনকে ছেড়ে দিয়েছে।
তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বললেন, তোমরা কি মনে করেছো যে, আমি তোমাদেরকে বলবো, যাও, তোমরা তাদের দুজনের সাথে যুদ্ধ করো। কখনো না, বরং যাও, তাদেরকে নম্রভাবে বুঝাও। যদি তারা মেনে নেয়, তবে তো ভালো। আর যদি না মানে তাহলে তাদের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে নিজের চিন্তায় লেগে থাকো।

বর্তমানে এই বিষয়টি খুবই জরুরী
হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, বর্তমানে এই বিষয়টি খুবই জরুরী যে, প্রত্যেকই নিজের চিন্তায় বিভোর থাকা এবং নিজের সংশোধনে সচেষ্ট হওয়া। নিজের খবর না রেখে অন্যের সংশোধনে বিভোর থাকার রোগ আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
কবি বলেন,
تھے جو اپنے عیوب سے بے خبر + رہے دیکھتے اور و روں کے عیب وہنر پڑی اپنی برائیوں پہ جو نظر + تو جہاں میں کوئی برا نہ رہا
যতক্ষণ ছিলো অনবহিত নিজের দোষ-ত্রুটি, কেবল নজরে পড়ছিলো অন্যের দোষ-ত্রুটি। যখনই পড়লো দৃষ্টি নিজের ত্রুটি, মন্দ রইলো না আর পৃথিবীর কোনো ব্যক্তি।

নিজের হাকীকত ভুলে যেয়ো না
হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- বনী ইসরাইলের তিনজন ব্যক্তি ছিলো। একজন কুষ্ঠরোগী, দ্বিতীয়জন টাকওয়ালা আর তৃতীয়জন অন্ধ। আল্লাহ তাআলা এই তিনজনকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। সে লক্ষ্যে তাদের কাছে একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে কুষ্ঠরোগীর কাছে গিয়ে বললেন, তোমার পছন্দনীয় জিনিস কী? কুষ্ঠরোগী বললো, ত্বক ফর্সা হওয়া ও আমার শরীরের চামড়া সুন্দর হওয়া। কেননা, এই রোগের কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে。
ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিলেন। এতে তার রোগ দূর হয়ে গেলো এবং তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দেওয়া হলো। এরপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন সম্পদ তোমার কাছে অধিক প্রিয়?
সে বললো, উট বা গাভী [কুষ্ঠরোগী এবং টাকওয়ালাএ দুজনের একজন উটের কথা বলেছেন, অপরজন গাভীর কথা। কিন্তু বর্ণনাকারীর সন্দেহ হয়ে গেছে যে, কে কোনটা বলেছিলো] তার চাহিদার ভিত্তিতে তাকে ১০ বাচ্চা বিশিষ্ট একটি উট দেওয়া হলো। এরপর ফেরেশতা তার জন্য দুআ করলেন, এতে তোমার জন্য বরকত হোক।
এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে এসে বললেন, 'তুমি কী চাও?
সে বললো, সুন্দর চুল চাই, যেন আমার এই রোগ ভালো হয়ে যায়। কেননা, এ রোগের কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলালে তার রোগ দূর হয়ে যায় এবং মাথায় সুন্দর চুল গজায়।
এরপর ফেরেশতা তাকে বললেন, তুমি কোন সম্পদ পছন্দ করো?
সে বললো, গাভী। ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দিয়ে বললেন, এতে তোমার বরকত হোক। এরপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে এসে বললেন, তুমি কী চাও?
সে বললো, আমি চাই, আল্লাহ যেন আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন এবং আমি মানুষদের দেখতে পাই। ফেরেশতা তার চোখে হাত বুলালে আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা বললেন, কোন সম্পদ তোমার পছন্দ?
সে বললো, ভেড়া-ছাগল। ফেরেশতা তাকে বাচ্চাদানকারী একটি ছাগল দিলেন।
প্রথম দুজনের পশুও বাচ্চা জন্ম দিলো এবং এই অন্ধের ছাগলও বাচ্চা জন্ম দিলো। সকলের সম্পদে এতো বরকত হলো যে, প্রথমজনের উটে পুরো একটি উপত্যকা ভরে গেলো। এমনিভাবে দ্বিতীয়জনের গাভী দিয়ে একটি উপত্যকা আর তৃতীয়জনের ছাগল দিয়ে একটি উপত্যকা ভরে গেলো।
দীর্ঘদিন পর সেই ফেরেশতা কুষ্ঠরোগীর কাছে তার পূর্বাকৃতিতে [কুষ্ঠরোগীর আকৃতিতে] এসে তাকে বললেন, 'আমি একজন দরিদ্র-মিসকীন মানুষ। ভ্রমণের সকল সম্বল রাস্তায় শেষ হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ এবং তারপর আপনি ব্যতীত আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। সেই সত্তা, যিনি তোমাকে এই সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া দিয়েছেন এবং উটের আকৃতিতে তোমাকে অনেক ধন-সম্পদ দান করেছেন তার ওসীলায় আমি তোমার কাছে শুধু একটি উট চাই, যেন আমার ভ্রমণ পুরা হয়ে যায়।'
সে ব্যক্তি বললো, আমার অনেক দায়িত্ব ও যিম্মাদারী আছে। [আমি তোমাকে কিছু দিতে পারবো না]
ফেরেশতা বললেন, আমি মনে হয় তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি কি ইতিপূর্বে কুষ্ঠরোগী ছিলে না, মানুষজন তোমাকে তিরষ্কার করতো? তুমি কি দরিদ্র ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন।
সে বললো, আমি এই সম্পদ আমার বাপ-দাদার থেকে ওয়ারিস সূত্রে পেয়েছি।
ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যুক হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহ তাআলা যেনো তোমাকে সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, যে অবস্থায় তুমি ইতিপূর্বে ছিলে।
এরপর ফেরেশতা টাকওয়ালার কাছে তার পূর্বের আকৃতিতে আসলেন এবং তার কাছে তা-ই বললেন, যা কুষ্ঠরোগীর কাছে গিয়ে বলেছিলেন। সেও ঠিক তেমনি উত্তর দিলো, যেমন উত্তর কুষ্ঠরোগী দিয়েছিলো। ফেরেশতা তাকেও [বদ দুআ দিয়ে] বললেন, যদি তুমি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তাহলে আল্লাহ তাআলা যেনো তোমাকে তোমার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেন।
অতঃপর ফেরেশতা অন্ধ ব্যক্তির কাছে তার পূর্বের আকৃতিতে এসে বললেন, আমি এক মিসকীন মুসাফির, যার ভ্রমণের সকল সম্বল ও উপকরণ রাস্তায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আল্লাহ এবং আপনি ব্যতীত আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে আমার বাড়ি পৌঁছাবে। যে আল্লাহ আপনাকে দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন তার ওসীলায় আমি আপনার কাছে একটি ছাগল চাচ্ছি, যেন আমার সফর পুরা করতে পারি।
অন্ধ ব্যক্তি বললো, অবশ্যই আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি দরিদ্র ও নিঃস্ব ছিলাম, আল্লাহ আমাকে ধনী বানিয়েছেন। [এগুলো তার দেয়া সম্পত্তি] তোমার যত মন চায়, নিয়ে নাও। আল্লাহর কসম, আজ আমি কোনো জিনিসে তোমার সাথে কঠোরতা ও সংকীর্ণতা করবো না। তোমার মন যা চায়, নিয়ে নাও।
ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তোমার কাছে রেখে দাও। অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা নিয়েছেন, আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার দুই সাথীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

ফায়দা
মানুষের একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো, বিপদে হতাশ হওয়া ও মনোবল হারিয়ে ফেলা এবং আনন্দ ও সুখের সময় আয়েশে মত্ত হয়ে নিজের মৌলিক অবস্থা ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। যদি কোনো দল ও গোষ্ঠীর চরিত্র এমন হয় যে, তারা মুসীবতে ধৈর্যশীল এবং সুখের সময় কৃতজ্ঞ হয় তবে এটা তাদের উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ এবং এটা তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনকে আল্লাহ তাআলা যে সকল বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম হলো-
আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ধৈর্য্য ও কৃতজ্ঞতার সম্পদে সম্পদশালী করেছিলেন। তাদেরকে এই সম্পদ তাদের জ্ঞানের কারণে নয়, বরং আল্লাহ তাআলা নিজের জ্ঞান ও ধৈর্য্যের সামান্য পরিমাণ তাদের দান করেছেন। এই ধৈর্য আর কৃতজ্ঞতা তারই ফসল।

আমি অমুকের ছেলে অমুক, তুমি কে?
হযরত উবাই ইবনে কাব রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে একবার দুই ব্যক্তি একে অন্যের বংশের বিশ্লেষণ করতে শুরু করলো। একজন বললো, আমি অমুকের ছেলে অমুক। তুমি কে? তোমার তো মা নেই? এটা একটা অবজ্ঞাসূচক বাক্য। রাসূলুল্লাহ [এই কথা শুনে] বললেন, মূসা আলাইহিস সালাম এর যুগে দুইব্যক্তি পরস্পরের বংশ বিশ্লেষণ করছিলো। তাদের একজন বলেছিলো, আমি অমুকের ছেলে অমুক -এভাবে সে তার পূর্ব পুরুষের নয়জনের নাম বলেছে- তুমি কে? তোমার তো মা নেই? উত্তরে অপরজন বলেছিলো, আমি অমুকের ছেলে আর অমুক ইসলামের ছেলে। [অর্থাৎ আমার নাম এই, আমার বাবার নাম এই আর তিনি ইসলামের ছেলে, অর্থাৎ মুসলমান ছিলেন] তখন আল্লাহ তাআলা মূসা আলাইহিস সালাম এর কাছে এ মর্মে ওহী পাঠালেন যে, এ দুইজন বংশ বিশ্লেষণকারী। এদের মধ্যে হে সেই ব্যক্তি, যে জাহান্নামের নয়জন পূর্বপুরুষের নাম গণনা করেছো, তুমি তাদের দশমজন। আর হে সেই ব্যক্তি, যে জান্নাতের দুইজনের বংশ বর্ণনা করেছো। তুমি জান্নাতে তাদের তৃতীয়জন।

অহংকার তিন প্রকার
মুফতী শফী রহ. বলেন, অহংকারের স্তর তিনটি। যথা-
১. استکبار : যে অহংকার অন্তরে থাকে, কাজকর্মে প্রকাশ পায় না। তাকে আরবীতে 'ইস্তিকবার' বলে। কুরআনে কারীমের ইরশাদ হয়েছে-
انه لا يحب المستكبرين : নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুস্তাকবিরীনদেরকে (অহংকারী) পছন্দ করেন না।
২. যে অহংকার অন্তরেও থাকে, কাজকর্মেও প্রকাশ পায়। এ স্তরকে আরবীতে 'মুখতাল' বলা হয়।
৩. যে অহংকার অন্তরেও থাকে, কাজকর্মেও প্রকাশ পায় এবং মুখেও চর্চা হয়। এটাকে আরবীতে 'ফাখুর' বলা হয়। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে-
إن الله لا يحب كل مختال فخور : নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কোনো অহংকারী ও ঔদ্ধত্যকারীকে পছন্দ করেন না।

গালীর জবাব আল্লাহ ওয়ালারা কীভাবে দিতেন
হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর সম্মানিত উস্তাদ মাওলানা আহমাদ আলী রহ. এর শিশুকালের অবস্থা ছিলো, খেলাধুলার মধ্যে যখন অন্যান্য শিশুরা তাকে গালী দিতো, তখন তিনি তাদেরকে গালী দিতেন না। তার সবচেয়ে বড় প্রতিউত্তর ছিলো, তোমরাই এমন। কী মজার উত্তর। আর শিশুকালেই এতটুকু উত্তর দিতেন, পরে এতটুকুও দিতেন না। এটাই আহলুল্লাহদের পদ্ধতি।

শেখ সাদী রহ. এর স্মরণীয় একটি বাণী
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. শেখ সাদী রহ. এর একটি বক্তব্য বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা যখন কাউকে অপদস্ত করতে চান, তখন সে ভালো মানুষদের মন্দ কাজগুলোতে লিপ্ত হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা যখন কারো গোপনীয়তা লুকাতে চান, তখন সে কোনো দোষী ব্যক্তিরও খারাপ বলে না।

মানুষের শরীরের সবচেয়ে খারাপ ও সবচেয়ে ভালো দুটি অঙ্গ
লুকমান হাকীমের মনিব একদিন তাকে বললেন, একটি ছাগল যবাই করে তার সবচেয়ে উত্তম দুটি অংশ আমার কাছে নিয়ে আসো। তিনি ছাগল যবাই করে তার হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা মনিবের কাছে নিয়ে আসলেন।
মালিক আবার হুকুম দিলেন, আরেকটি ছাগল যবাই করে তার সবচেয়ে খারাপ দুটি অংশ আমার কাছে নিয়ে আসো। তিনি ছাগল যবাই করে এবারও তার হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা মনিবের কাছে নিয়ে আসলেন।
মনিব বললেন, আমি যখন সবচেয়ে উত্তম দুটি অংশ আনতে বলেছি, তখনও এই দুটি অংশই এনেছো। আবার যখন সবচেয়ে খারাপ দুটি অংশ আনতে বলেছি তখনও এ দুটি অংশই এনেছো? এর কারণ কী?
হযরত লুকমান হাকীম বললেন, ওহে মালিক! হৃৎপিণ্ড ও জিহ্বা ভালো থাকলে এ দুটি অংশ থেকে উত্তম শরীরের অন্য কোনো অংশ হতে পারে না। আবার এ দুটি অংশ নষ্ট হয়ে গেলে এর চেয়ে খারাপ কোনো অংশ হতে পারে না। এ জন্য এ দুটি অংশই সবচেয়ে উত্তম, আবার এ দুটি অংশই সবচেয়ে খারাপ।

একটি গুরুত্বপূর্ণ নিআমত
জিহ্বা আল্লাহ প্রদত্ত বিরাট বড় নিআমত। অনেককে তিনি জিহ্বা দিয়েছেন, কিন্তু তাতে বলার ক্ষমতা দেননি। আল্লাহ তাআলার লাখো কোটি শুকর যে, তিনি আমাদের জিহ্বাতে বলার ক্ষমতা দিয়েছেন।
এটা কতবড় নিআমত, এ নিয়ে সামান্য সময় চিন্তা করুন। এ মেশিনটি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সাথে থাকে। এটার সার্ভিসিংয়ের প্রয়োজন পড়ে না, পেট্রোলেরও প্রয়োজন হয় না। খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার প্রয়োজনও হয় না। কিন্তু এই মেশিন আমাদের মালিকানা সম্পদ নয়, বরং এটি আমাদের কাছে আল্লাহ তাআলার আমানত। যেহেতু এটা আমানত, তাই এটিকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করতে হবে। এমন যেন না হয় যে, মনে যা আসলো তা-ই বলে দিলাম। বরং যে কথা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হবে, সেটাই বের করবো, কখনো কোনো অশ্লীল ও গুনাহের কথা বলবো না।

সত্য বলার বরকতে তিনি বেঁচে গেলেন
হযরত হাসান বসরী রহ. অনেক বড় বুযুর্গ ছিলেন। ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার উপর অনেক যুলুম করেছিলো। একবার হাজ্জাজ ইবনে ইউছুফ তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য রওয়ানা করেন। হাসান বসরী রহ. জানতে পেরে সে সময়ের অনেক বড় বুযুর্গ হাবীব আজমী রহ. এর ইবাদতখানায় লুকিয়ে গেলেন। হাসান বসরী রহ.এর পিছে পিছে হাজ্জাজও সেখানে গিয়ে পৌঁছে হাবীব আজমী রহ. -কে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কি হাসান বসরীকে দেখেছেন?
হ্যাঁ, সে আমার ইবাদত খানায় লুকিয়ে আছে। হাজ্জাজ ভিতরে গিয়ে হাসান বসরী রহ.-কে কোথাও পেলো না। বাইরে এসে হাবীব আজমী রহ.-কে বললো, 'আপনি মিথ্যা বললেন কেনো? হাসান বসরী তো ভেতরে নেই?
তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি মিথ্যা বলিনি, সে ভেতরেই আছে।
হাজ্জাজ দুই তিনবার খোঁজাখুঁজি করলো, কিন্তু হাসান বসরী রহ.- কে কোথাও পেলো না। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেলো। তার যাওয়ার পর হাসান বসরী রহ. বাইরে এসে বললেন, হে হাবীব, আমি জেনে গেছি, আল্লাহ তাআলা আপনার বরকতে আমাকে বাঁচিয়েছেন। হযরত হাবীব আজমী রহ. বললেন, না, আমার বরকতে না, বরং এটা আমার সত্য বলার ফসল, যা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন। যদি আমি মিথ্যা বলতাম, তাহলে আমাদের দুজনকেই সে লাঞ্ছিত করতো।

তাকওয়া আপনি কীভাবে অর্জন করবেন
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, 'সাদেক্বীন' সেই সব লোকদের বলে, যাদের নিয়ত হয় খালেস এবং যাদের কথা হয় সত্য। আর যাদের নিয়ত ও কথা বিশুদ্ধ হয়, তাদের আমলও বিশুদ্ধ হয়। তারা সবসময় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ব্যাকুল থাকেন। যে সকল লোকদের নিয়ত বিশুদ্ধ, কথা বিশুদ্ধ এবং আমলও বিশুদ্ধ, আপনি তাদের সঙ্গ গ্রহণ করুন, তাকওয়া এমনিতেই এসে যাবে।

শেখ সাদী রহ. এর প্রতি তাঁর পিতার আশ্চর্য উপদেশ
'গুলিস্তাঁ'র দ্বিতীয় অধ্যায়ে শেখ সা'দী রহ. লিখেছেন, শৈশবে আমি রাত-দিন ইবাদতে লিপ্ত থাকতাম। সবসময় কুরআন কারীম বগলে রাখতাম। একরাতে বাবার খিদমাতে উপস্থিত ছিলাম। কিছু লোক ওদিকে ঘুমিয়েছিলো। আমি বাবাকে বললাম, এদের কী হলো! এরা এমনভাবে ঘুমিয়ে আছে, যেন মরে গেছে। আহ্! যদি এরা সজাগ থেকে দুই রাকআত নামায পড়তো!!
বাবা বললেন, 'প্রিয় বৎস! ইবাদত না করে যদি তুমি এ সময় ঘুমিয়ে থাকতে, তাহলে আরও ভালো হতো। কেননা, কমপক্ষে তুমি গীবতের মতো জঘন্য গুনাহ থেকে বাঁচতে পারতে।

ইমাম বুখারী রহ. এর বক্তব্য
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. ইমাম বুখারী রহ. এর একটি বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। বক্তব্যটি হলো-
ما اغتبت أحدا منذ علمت أن الغيبة حرام، لأرجو أن ألقى الله ولا يحاسبني أني اغتبت أحدا
যখন থেকে আমি জানতে পেরেছি, গীবত হারাম তখন, থেকে আমি কারো গীবত করিনি। আমি আশা করছি যে, আমি আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাত করবো আর তিনি আমাকে কারো গীবত করেছি কিনা এ মর্মে জিজ্ঞাসা করবেন না।

খলীফার ক্ষমা প্রার্থনা
একবার খলীফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিক রাগান্বিত হয়ে একব্যক্তিকে অনেক গালী দিয়ে ফেলেছিলেন। সে ব্যক্তি চুপ থেকে শুনছিলো। খলীফা যখন একটু চুপ হলেন তখন সে ব্যক্তি বললো, আমীরুল মুমিনীন, এ ধরনের নোংরা গালী দিতে আপনার লজ্জা হয় না? আল্লাহ কি আপনাকে শাসনক্ষমতা দিয়েছেন প্রজাদেরকে গালী দেওয়ার জন্য?
হিশামের রাগ তখন চলে গিয়েছিলো। সে ব্যক্তির কথা শুনে তিনি অনেক লজ্জিত হয়ে বললেন, ভাই, তুমি আমাকে গালী দিয়ে তোমার প্রতিশোধ নিয়ে নাও।
সে ব্যক্তি বললো, গালী দিয়ে আমি কি সেই ভুল করবো, যা আপনি করেছেন? আমি তো মুখ থেকে গালী বের করাকে গুনাহ মনে করি।
হিশাম বললেন, আচ্ছা, বিনিময়ে তুমি রুপিয়া চেয়ে নিয়ে নাও। সেই ব্যক্তি বললো, জনাব, রুপিয়া তো গালীর বিনিময় হতে পারে না।
হিশাম বললেন, ভাই, তাহলে আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দাও।
সেই ব্যক্তি বললো, ‘জ্বী, এবার ঠিক আছে। আমি আল্লাহ তাআলার জন্য আপনাকে মাফ করে দিলাম’।
হিশাম মাথা ঝুঁকিয়ে চুপ করে রইলেন কতক্ষণ। কিছুক্ষণ পর বললেন, আল্লাহর কসম, ভবিষ্যতে আমি কাউকে কখনো গালী দেবো না।

যে গুনাহের ব্যাপারে অনেকেই উদাসীন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سباب المسلم فسوق وقتاله كفر
মুসলমানকে গালী দেওয়া ফাসেকী। আর মুসলমানকে হত্যা করা কুফুরী।
হযরত মাওলান মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী [দা.বা.] বলেন, রাগে গোস্সায় কাউকে এমনভাবে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা, যারফলে তার দিল ভেঙে যায়। এটাও অনেক বড় গুনাহ। অথচ অনেকেই এ ব্যাপারে উদাসীন।

সৃষ্টিজীবের প্রতি ভালোবাসা রাখা স্রষ্টার ভালোবাসার দাবী
মাখলুকের সাথে আল্লাহ তাআলার অনেক প্রেম। আপনি নিজেই এটা বুঝতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি শ্রম দিয়ে নিজের হাতে একটা জিনিস বানালো। তার বানানো সেই জিনিসটা পাথর হলেও সেটার প্রতি তার মহব্বত ও ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। সে ভাবে, এটা বানাতে আমি সময় ব্যয় করেছি। পরিশ্রম করেছি। অতএব এটা আমার সম্পদ। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা নিজে মাখলুক বানিয়েছেন। তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনিও তাঁর মাখলুককে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসেন। সুতরাং যদি কারো এই দাবী থাকে যে, সে আল্লাহকে ভালোবাসে, তাহলে আল্লাহ তাআলার মাখলুককেও তার ভালোবাসতে হবে।

আল্লাহওয়ালাকে ভালোবাসলে আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন
আবু হুরাইরা রা. রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে অন্য মহল্লায় রওয়ানা হলো। যাওয়ার পথে আল্লাহ তাআলা তার জন্য অপেক্ষমান মানুষরূপী একজন ফেরেশতা বসিয়ে রাখলেন। লোকটি ফেরেশতার কাছে পৌঁছলে সেই ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছেন?
লোকটি বললো, ওই মহল্লায় আমার একজন (মুসলমান) ভাই আছেন, তার সাথে সাক্ষাত করার জন্য।
ফেরেশতা বললেন, তার উপর কি তোমার কোনো হক আছে, যার জন্য তুমি সেখানে যাচ্ছো?
তিনি বললেন, না। সেখানে যাওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার জন্য আমি তাকে মহব্বত করি।
ফেরেশতা বললেন, নিশ্চয় আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য প্রেরিত। [এই সংবাদ দেওয়ার জন্য যে,] নিশ্চয় আল্লাহ তাআলাও তোমাকে ঠিক ততটাই মহব্বত করেন, যতটা তুমি তাকে মহব্বত করো।

আলী বিন হুসাইন রা. এর সহিষ্ণুতা
ইমাম বাইহাকী রহ. হযরত যাইনুল আবেদীন আলী বিন হুসাইন রা. এর আশ্চর্য একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আলী বিন হুসাইন রা. এর এক বাঁদী তাঁকে উযু করাচ্ছিলেন। হঠাৎ পানির পাত্র তার হাত থেকে ছুটে আলী বিন হুসাইনের গায়ে পড়ে তাঁর কাপড় ভিজে যায়। এ মুহূর্তে ক্রোধ আসা একেবারেই স্বাভাবিক ছিলো। বাঁদী ভয় পেয়ে সাথে সাথে কুরআনের আয়াত পাঠ করলো 'والكاظمين الغيظ' [তারা ক্রোধ সংবরণকারী]। এই আয়াত শোনার সাথে সাথে নববী পরিবারের এই বুযুর্গের সকল রাগ ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। এরপর বাঁদী আয়াতের দ্বিতীয় বাক্য তিলাওয়াত করলেন, 'والعافين عن الناس
[আর তারা মানুষদেরকে ক্ষমাকারী]। এই আয়াত শুনে আলী বিন হুসাইন বললেন, আমি তোমাকে অন্তর থেকে মাফ করে দিলাম। বাঁদী অনেক চালাক ছিলো। সে তৃতীয় বাক্যও শুনিয়ে দিলো, ' والله يحب المحسنين' [আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন]। এই আয়াতে মানুষের প্রতি ইহসান করা এবং সুন্দর ব্যবহার করার দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হযরত আলী বিন হুসাইন রা. এই আয়াত শুনে বললেন, যাও, আমি তোমাকে মুক্ত করে দিলাম।

অপরাধীকে মাফ করে দেওয়া একটি মহৎ গুণ
কোমল হৃদয় থেকে যে ডালপালা গজায়, তার মধ্য অন্যতম একটি হচ্ছে, অপরাধী এবং অসৎ আচরণকারীদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া। তাদের থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নিজের উম্মতকে বিশেষভাবে এর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। যদিও ইনসাফের সাথে ভুলের সাজা দেওয়া বৈধ, কিন্তু সাজা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধু আল্লাহর জন্য ক্ষমা করে দেওয়া অনেক ফযীলতপূর্ণ কাজ।

ইমাম আযম আবু হানীফা রহ. এর সহনশীলতা
লোকভর্তি বাজারে একব্যক্তি আবু হানীফা রহ.-কে গালী দিয়েছিলো এবং তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছিলো। ইমাম আবূ হানীফা রহ. ধৈর্য্য ধরলেন, তাকে কিছুই বললেন না। ঘরে এসে একটি থলেতে যথেষ্ট পরিমাণ দীনার-দিরহাম ভরে সেটা নিয়ে গালীদাতার বাড়ীতে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন।
সে ব্যক্তি বের হলে তার সামনে টাকার থলে দিয়ে বললেন, ভাই, আজ আপনি আমার উপর অনেক বড় ইহসান করেছেন। আপনার সাওয়াবগুলো আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। আমি তার বিনিময় পরিশোধের জন্য এই তুহফা নিয়ে এসেছি।
ইমাম আবু হানীফা রহ. এর এই অদ্ভুত আচরণে সে প্রভাবিত হয়ে গেলো। ভবিষ্যতের জন্য এই অসৎ আচরণ থেকে পরিপূর্ণ তাওবা করে নিলো। আবূ হানীফা রহ. এর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁর খিদমাতে উপস্থিত হলেন। তাঁর কাছে ইলম অর্জন করা শুরু করলেন। অবশেষে তিনি আবূ হানীফা রহ. এর ছাত্রদের মধ্যে বড় একজন আলেমের অবস্থান গ্রহণ করলেন।

রাগ উঠলে আপনি কী করবেন
যখন অন্তরে উত্তেজনা ও ক্রোধের অবস্থা তৈরি হয় তখন প্রথমেই সে কাজ করবে, যা আল্লাহ করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وإما ينزغنك من الشيطان نزغ فاستعذ بالله
যখন শয়তান তোমাকে কোনো কুমন্ত্রণা দেয়, তখনই আল্লাহর কাছে [বিতাড়িত শয়তান থেকে] আশ্রয় প্রার্থনা করো।
দ্বিতীয়ত সে কাজ করো, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করতে বলেছেন, যখন মনে ক্রোধের তীব্রতা অনুভূত হবে, তখন যদি তুমি দাঁড়ানো থাকো, তাহলে বসে যাও, এরপরও যদি ক্রোধ প্রশমিত না হয়, তাহলে শুয়ে পড়ো।
রাগ দমনের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে, রাগ হওয়ার সাথে সাথে এই চিন্তা করবে যে, সামান্য অপরাধের কারণে তার উপর যে পরিমাণ রাগ করেছি, তুচ্ছ অপরাধের কারণে আমার আল্লাহও যদি আমার উপর সেই পরিমাণ রাগ করেন, তাহলে আমার কী অবস্থা হবে?

অনুপম ত্যাগ
ইবরাহীম তাইমী এবং ইবরাহীম নাখয়ী রহ. সমকালীন দুইজন মহীয়সী ব্যক্তি। তাঁরা দুজনই উঁচু স্তরের 'তাবে তাবেঈন'। এই উম্মাহের জালিম সরকার হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হাজারো আলেম ও জ্ঞানীদেরকে জেলে ঢুকিয়েছে এবং হাজারো মানুষকে শহীদ করেছে বা করতে চেয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ইবরাহীম নাখয়ী রহ.।
তাকে হাজ্জাজ জেলে নিতে চেয়েছিলো, তাই হাজ্জাজের বাহিনী তাঁর খোঁজে ব্যস্ত ছিলো। আর তিনিও তাদের থেকে আত্মগোপনে থাকতেন।
একদিন হাজ্জাজের বাহিনীকে এক ব্যক্তি বললো, ইবরাহীম অমুক স্থানে আছেন। একই সময়ে ঘটনাক্রমে সেখানেই ইবরাহীম তাইমীও উপস্থিত ছিলেন। হাজ্জাজের সিপাহী তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, ইবরাহীম কে? সে কোথায়? ইবরাহীম তাইমী জানতেন যে, এরা তাঁকে তালাশ করছে না। বরং ইবরাহীম নাখয়ীকে খুঁজছে। তদুপরি তিনি এক অবাক করা আচরণ করলেন। তিনি ইবরাহীম নাখয়ীর ঠিকানা দেওয়ার পরিবর্তে বললেন, আমিই ইবরাহীম নাখয়ী। এটা বলে নিজেই গ্রেফতার হলেন।
পরিশেষে হাজ্জাজের নির্দেশে 'দীনাস' নামক বন্দিশালায় তাঁকে বন্দি করা হলো। যেখানে রোদ থেকে বাঁচার জন্য কোনো ছায়ার ব্যবস্থ ছিলো না এবং শীত নিবারণেরও কোনো উপকরণ ছিলো না। উপরন্তু সেখানে এক শিকলে দুজন করে বাঁধা হয়েছিলো। এই বন্দিশালায় কষ্টে ইবরাহীম তাইমী এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর মা তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে জেলখানায় এসে তাঁকে চিনতেই পারেননি। কিছুদিন পর জেলখানায়ই তার ইন্তিকাল হলো। মানুষজন তাকে জিজ্ঞাসাও করেছিলো যে, সিপাহী তো আপনাকে খুঁজেনি, আপনি কেনো স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হলেন? তিনি বললেন, ইবরাহীম নাখয়ীর মতো যমানার ইমামকে মানুষ গ্রেফতার করুক, এটা আমার কাছে ভালা মনে হয়নি।

ইহসানের সর্বোচ্চ স্তর কোনটি
ইহসানের একটি সর্বোচ্চ স্তর এটাও যে, মানুষ যখন কোনো জিনিসের খুব বেশি অভাববোধ করে এবং তার সামনে সেই একই জিনিসের অভাববোধকারী অন্য কোনো ব্যক্তি সে পায়, তখন সে তাকে ঐ জিনিসটি দিয়ে নিজে কষ্ট সহ্য করবে। এটারই নাম 'ঈসার' বা অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া। মানবিক চরিত্রের মধ্যে এই চরিত্রটির অবস্থান অবশ্যই সর্বোচ্চ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কর্মধারাও এমনই ছিলো। অন্যদেরকেও এই কাজের জন্য তিনি প্রচুর উৎসাহ দিতেন।

স্মরণ রাখার মতো একটি ঘটনা
এক মুজতাহিদ ইমামের সামনে এক ব্যক্তি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের উপর অপবাদ আরোপ করলো যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইসলামী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিম এবং চূড়ান্ত অসৎ ব্যক্তি। সে হাজার হাজার সাহাবী, তাবেয়ীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে। এজন্যই সাধারণভাবে মানুষের মনে তাকে মন্দ বলার মন্দতা নেই।
যেই বুযুর্গের সামনে হাজ্জাজের উপর এই অপবাদ আরোপ করা হলো, তিনি সেই অপবাদ আরোপকারীকে বললেন, যদি অন্যায়ভাবে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার প্রতিশোধ আল্লাহ তাআলা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ থেকে নেন তাহলে আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তি থেকেও হাজ্জাজের প্রতিশোধ নেবেন, যে হাজ্জাজের উপর যুলুম করেছে। আল্লাহর আদালতে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। তাই গুনাহগার এবং অসৎ লোকদের উপর অন্যদেরকে এই স্বাধীনতা দেননি যে, যার যা ইচ্ছা তাদের উপর অপবাদ দেবে, তিরস্কার করবে।

ইসলামী ফিকহের একটি বিশেষ হুকুম
ইসলামী আইনে একটি বিশেষ নির্দেশনা আছে। যার সারকথা হলো, যুলুমের প্রতিশোধ যুলুমের মাধ্যমে নেওয়া জায়িয নেই। প্রতিশোধের ক্ষেত্রে ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতি লক্ষ রাখা আবশ্যক। মাযলূম ব্যক্তি যতক্ষণ এই নির্দেশনার উপর আমল করবে, সে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা তার সাহায্যকারী হবেন। আর যদি সে প্রতিশোধের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে, তবে সে মাযলুম থেকে জালিম হয়ে যাবে। এখন তার সাথে আল্লাহর আচরণ পূর্বের বিপরীত হবে। আল্লাহ তাআলার সাহায্য তার পরিবর্তে এখন যালিম প্রাপ্ত হবে।

অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ না থাকা জান্নাতী হওয়ার নিদর্শন
আল্লামা হাফিয ইবনে কাসির রহ. মুসনাদে আহমাদের সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত আনাস রা. ইরশাদ করেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে বসা ছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তোমাদের সামনে একজন লোক আসবে, সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। পরক্ষণে একজন আনসারী সাহাবী আসলেন, যাঁর দাড়ি থেকে সদ্য উযুর পানি ঝরছিলো আর তাঁর বাঁ হাতে তার জোড়া চটি জুতা ছিলো। দ্বিতীয় দিনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুরূপ বললেন, আর এই আনসারী সাহাবী পূর্বের অবস্থায় আমাদের সামনে আসলেন। তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটলো।
অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিস থেকে উঠে গেলেন, তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. সেই সাহাবীর পিছু নিলেন এবং তাঁকে তিনি বললেন, আমি একজনের সাথে ঝগড়া করে কসম করেছি, তিনদিন আমি আমার ঘরে ঢুকবো না। অতএব আপনি যদি সমুচীন মনে করেন, তাহলে আমাকে তিনদিন আপনার ঘরে জায়গা দিন। তখন সে সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা.-কে তাঁর ঘরে থাকতে দিলেন।
তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. তিনদিন তাঁর সাথে রাত যাপন করলেন। এই তিনদিনের একদিনও তাঁকে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে দেখেননি। তবে দেখেছেন ঘুমাতে যাওয়ার সময় বিছানায় শুয়ে কিছু সময় যিকির করতে। অতঃপর ফজরের নামাযের জন্য ঘুম থেকে উঠতে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, তবে তিনদিনের কোনো একটি মুহূর্তও আমি তাঁর মুখে কল্যাণকর কথা ছাড়া অন্য কোনো কথা শুনিনি। যখন তিনদিন অতিবাহিত হচ্ছিলো আর আমার অন্তরে তাঁর আমলের তুচ্ছতার ব্যাপারে বিভিন্ন খেয়াল আসছিলো, তখন আমি তাঁর সাথে তিনদিন থাকার কারণ জানিয়ে বললাম, আমার ঘরে কোনো ঝগড়া হয়নি, কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জবান থেকে তিন দিন যাবত একথা শুনে আসছি, এক্ষুনি তোমাদের সামনে এমন এক লোক আসবে, যে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। তিনদিনই পরক্ষণে আপনি আমাদের সামনে এসেছেন। এই জন্য আমি ইচ্ছা করেছি, আপনার সাথে থেকে আমি দেখবো, আপনার সেই বিশেষ আমলটি কী, যার জন্য আপনার এই মর্যাদা অর্জন হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তিনদিনে আমি আপনাকে বড় কোনো আমল করতে দেখিনি। অতএব আপনিই বলুন, কি এমন জিনিস, যার কারণে আপনার এই মর্যাদা? আনসারী সাহাবী বললেন, আপনি যা দেখেছেন, তা ছাড়া আমার আর কোনো বিশেষ আমল নেই।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. বলেন, আমি তাঁর এই কথা শুনে ফিরে আসছিলাম, তখন তিনি আমাকে ডেকে বললেন, হ্যাঁ, একটি আমল আছে। তা হলো, আমার অন্তরে মুসলমানের প্রতি কোনো প্রকার বিদ্বেষ এবং খারাপ ধারণা নেই। আল্লাহ যাকে কোনো কল্যাণ দান করেন, তার প্রতি অন্তরে কোনো হিংসা পোষণ করি না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বললেন, এটাই সেই গুণ, যা আপনাকে এই সুউচ্চ মাকাম দান করেছে।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. বলেন, বিদ্বেষ ও শত্রুতার অর্থ হচ্ছে, সর্বদায় এই চিন্তায় থাকা যে, যদি সুযোগ পাই তাহলে তাকে কষ্ট দেবো। এমনিভাবে অন্যের কষ্টের ব্যাপারে মনে আনন্দ অনুভব হওয়াও বিদ্বেষ ও শত্রুতার নিদর্শন। বিদ্বেষ ও শত্রুতা মদ পান করার মতই একটি হারাম ও জঘন্য গুনাহ।

হিংসা থেকে বাঁচার উপায়
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. বলেছেন, হিংসা দূর করার উপায় হলো, যার প্রতি হিংসা হয়, তার সাথে সম্মান ও অনুগ্রহের ব্যবহার করতে থাকা। যদি তা করা সম্ভব না হয়, তাহলে মানুষের সামনে তার ভালো গুণগুলো আলোচনা করতে থাকা। ইনশাআল্লাহ এতে তার প্রতি হিংসা দূর হয়ে যাবে। অতএব প্রত্যেক ছাত্রের উচিত, সৎ ও ভালো অভ্যাস গ্রহণ করা। আর খারাপ ও মন্দ স্বভাব পরিহার করা এবং এর জন্য সর্বদায় নিচের দুটি দুআ করতে থাকা।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنَ الشَّقَاقِ، وَالنِّفَاقِ، وَسُوءِ الْأَخْلَاقِ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুর্ভাগ্য, নেফাকী এবং মন্দ স্বভাব থেকে পানাহ চাই।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الْأَخْلَاقِ، وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ
হে আল্লাহ! আমি মন্দ স্বভাব, মন্দ কর্ম ও প্রবৃত্তির খারাবী থেকে আপনার আশ্রয় চাই।

টিকাঃ
৯২. দুরে মানসূর: ৩/২০০; সুরা মায়েদা, আয়াত : ১০৫।
৯৩. মালফুযাতে হাকীমুল উম্মাত।
৯৪. সহীহুল বুখারী, আহাদীসুল আম্বিয়া অধ্যায়: ১/৪৯২।
৯৫. মাআরিফুল হাদীস: ২/৩০৬।
৯৬. মুসনাদুল ইমাম আহমাদ: ৩৫/১১০ হাদীস নং: ২১১৭৮।
৯৭. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-২৯৮।
৯৮. খুতুবাতে হাকীমুর উম্মাত: ২৯/১৮০।
৯৯. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-৩৮৩।
১০০. কিতাবু কী দরসেগাহ মে: পৃষ্ঠা-৭১।
১০১. ইসলাহী খুতুবাত: ৪/১৪৭।
১০২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৫/৩৯০।
১০৩. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ১/৩০৮।
১০৪. গুলিস্তাঁ : পৃষ্ঠা-৭১।
১০৫. মুকাদ্দিমাতু ফাতহিল বারী: ১/৬৬৫।
১০৬. আল কামিল লি ইবনিল আসীর: ৫/২৬৩।
১০৭. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/২৬৮।
১০৮. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/২২৩।
১০৯. সহীহু মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াস সিলাহ: ২/৩১৬।
১১০. রুহুল মাআনী: ৩/৫৯, সূরা নিসা, আয়াত: ১৩৪।
১১১. মাআরিফুল হাদীস: ২/১৮৩,১৮৫।
১১২. মাআরিফুল কুরআন: ২/১৯০।
১১৩. সূরা আরাফ, আয়াত: ২০০।
১১৪. সুনানে আবী দাউদ: ২/৩০৩, কিতাবুল আদাব, বাবু মা ইয়াকূলু ইনদাল গাযব।
১১৫. ইসলাহী খুতুবাত: ৮/২৭৬।
১১৬. তাবাকাতে ইবনে সাদ: ৬/১৯৯।
১১৭. মাআরিফুল হাদীস: ২/১৯৩।
১১৮. মাআরিফুল কুরআন: ৫/৪৭৮, সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৩।
১১৯. মাআরিফুল কুরআন: ৫/৪৭৮, সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৩।
১২০. মুসনাদে আহমাদ: পৃষ্ঠা নং-৬৪৫, হাদীস নং-১২২৮৬।
১২১. মাজালিসে মুফতিয়ে আযম: ২০৪/২৯৯।
১২২. সুনানুন নাসায়ী: ২/৩১৩; কিতাবুল ইসতিআযাহ।
১২৩. মিশকাত: ১/২17, বাবুল ইসতিআযাহ।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 গুনাহ পরিহার করা

📄 গুনাহ পরিহার করা


আল্লাহ তাআলার কাছে তালিবে ইলমের অনেক সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের সম্মানে আল্লাহ পাক তাদের চলার পথে ফেরেশতাদের নূরের পর বিছিয়ে দেন। তারা যতক্ষণ ইলম অন্বেষণে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহর রাস্তায় থাকার মর্যাদা দিয়েছেন। অতএব স্বাভাবিক ভদ্রতার দাবী হচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে নিআমতদাতা মহা সত্তাকে মান্য করা。

বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির ঘটনা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে একটি হাদীস এক দুবার নয়, বরং সাতবার শুনেছি। হাদীসটি হচ্ছে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বনী ইসরাঈলে কিফ্ল নামে এক ব্যক্তি ছিলো। এমন কোনো গুনাহ নেই, যা সে করতো না। একবার তার নিকট এক মহিলা আসলো। সে মহিলাকে কয়েক দীনারের শর্তে অপকর্ম করতে রাজি করালো। শর্ত সাপেক্ষে যখন সে উক্ত হারাম কাজ করার জন্য মহিলার দুই রানের মাঝে বসলো, তখন মহিলা কান্না করতে লাগলো আর কাঁপতে লাগলো। কিফ্ল তাকে জিজ্ঞেস করলো, কাঁদছো কেনো তুমি? আমি কি তোমার সাথে জোর-যবরদস্তি করছি?
মহিলা বললো, না, আপনি জোর-যবরদস্তি করেননি। তবে এটা এমন এক গুনাহ, যা আমি ইতিপূর্বে কোনো দিন করিনি। এই মুহূর্তে আমি অপারগ হয়ে তা করছি। অপারগতার কারণে আমি রাজি হয়েছি।
একথা শুনে কিফ্ল সাথে সাথে সেই মহিলার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বললো, যাও, দীনারগুলো তোমার। আর আজ থেকে কিফ্লও আর কোনো গুনাহ করবে না। আশ্চর্যজনকভাবে সেই রাতেই সে মারা গেলো। আর সকালে তার দরজায় গাইবীভাবে এই লেখা দেখা গেলো, غفر الله للكفل আল্লাহ তাআলা কিফলকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। ১২৪

শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, যে তালিবুল ইলমের মাঝে গুনাহের অধপতন ও অবনতি রয়েছে, সে তো কেবল কিছু শব্দ মুখস্থ করেছে। নিজের মেধা ও মেহনতের করে এক প্রকার জ্ঞান অর্জন করেছে। কিন্তু গুনাহের কারণে ইলমের নূর তাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই।
একজন ব্যক্তির মধ্যে যখন ইলমের নূর এসে পড়ে তখন সে ব্যক্তি إذا رأوه ذكر الله ]যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে যায়]১২৫ এই হাদীসের প্রয়োগক্ষেত্র হয়ে যায়। এ ধরনের ব্যক্তিকে দেখা মাত্র আল্লাহর কথা স্মরণ হয়ে যায়। ঈমান তাজা হয়। এমন ব্যক্তির মজলিসে বসলে মানুষের অন্তরে এই আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয় যে, আমার সাথে আর আল্লাহ তাআলার সাথে যেন একটি গভীর সম্পর্ক হয়ে যায় এবং গুনাহের প্রতি ঘৃণাবোধ, ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
এগুলো আল্লাহ তাআলার সেই সমস্ত বান্দার বৈশিষ্ট্য, যারা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জানতোড় চেষ্টা করার ফলে ইলমের নূর তাদের হৃদয় ও মস্তিষ্ককে আলোকিত করে। ১২৬

গুনাহের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ না করার ভয়াবহতা
হযরত মালিক ইবনে দীনার রহ. বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা একবার ফেরেশতাদের হুকুম করলেন, অমুক জনবসতি ধ্বংস করে দাও। তখন ফেরেশতারা বললেন, হে আল্লাহ! সে জনবসতিতে আপনার একজন বুযুর্গ বান্দা আছে।
আল্লাহ তাআলা বললেন, তাকেসহ ধ্বংস করে দাও। কেননা, আমার নাফরমানী ও গুনাহ দেখার পরও তার মধ্যে কোনো দুঃখ বেদনা নেই। এতে তার চেহারা মলিন পর্যন্ত হয়নি।
হযরত ইউশা ইবনে নূন আলাইহিস সালাম এর প্রতি আল্লাহ তাআলা ওহী প্রেরণ করলেন, আপনার সম্প্রদায়ের এক লক্ষ লোককে আযাব দ্বারা ধ্বংস করা হবে, যাদের মধ্যে চল্লিশ হাজার নেককার আর বাকি ষাট হাজার বদকার। তখন তিনি বললেন, হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! বদকারদের ধ্বংস হওয়ার কারণ তো স্পষ্ট, তবে নেককার লোকদের ধ্বংসের কারণ কী?
উত্তরে বলা হলো, তারা বদলোকদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রাখে, একসাথে খাওয়া-দাওয়া করে, আনন্দ-ফুর্তি করে। আমার নাফরমানী ও গুনাহ দেখার পর তাদের চেহারায় বিরক্তির চিহ্নও দেখা যায় না। ১২৭

হযরত শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রহ. বলেন, প্রত্যেকেরই চিন্তা করা উচিত, তার জানা মতে এমন কত গুনাহ সংগঠিত হচ্ছে, যে গুনাহগুলো সে চাইলেই নিষেধ করতে পারতো, কিন্তু তার উদাসীনতা, অসাবধানতা ও ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে তা হতে থাকে।
বড়ই আফসোসের কথা হলো, যদি আল্লাহর কোনো বান্দা সেই গুনাহ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়, তখন লোকেরা তার বিরোধিতা শুরু করে দেয় এবং তাকে নিয়ে বিদ্রুপ শুরু করে। তাকে সাহায্য না করে সবাই তার বিরোধিতায় লেগে পড়ে। ১২৮

আল্লাহ পাক দোষ গোপন রাখেন
বনী ইসরাঈলের যামানায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। ফলে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হচ্ছিলো না। কিছু লোক হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এর কাছে গিয়ে আবদার করলো। হে কালীমুল্লাহ! আল্লাহর কাছে আপনি দুআ করুন, তিনি যেনো আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষন করেন। আবেদনের ভিত্তিতে তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে তাদের মহল্লা থেকে দূরে এক জায়গায় একত্রিত হলেন। সংখ্যায় তারা সত্তর হাজার বা তার থেকে কিছু বেশি ছিলো। মূসা আলাইহিস সালাম খুবই মিনতির সাথে দুআ শুরু করলেন-
اِلٰهِي أَسْقِنَا غَيْثَكَ وَانْشُرْنَا عَلَيْنَا رَحْمَتَكَ ، وَارْحَمْنَا بِالْأَطْفَالِ الرُّكَّعِ وَالْبَهَائِمِ الرُّبَعِ وَالشَّيُوخِ الرُّكَّعِ.
হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আমাদের উপর রহমত ছিটিয়ে দিন। মাসুম বাচ্চা, বোবা জানোয়ার, বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ সবাই আপনার রহমতের আশাবাদী, তাদের প্রতি দয়া করুন। আমাদেরকে আপনার রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিন।
তিনি অবিরাম দুআ করে চলছেন। কিন্তু বৃষ্টির কোনো চিহ্নও পরিলক্ষিত হচ্ছিলো না। সূর্য আরো তীব্র হতে লাগলো। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বড়ই আশ্চর্য হলেন! ফলে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ কবুল না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করলেন-
إِنَّ فِيْكُمْ عَبْدًا يُبَارِزُنِي بِالْمَعَاصِيْ مُنْذُ أَرْبَعِيْنَ سَنَةً ، فَنَادِ فِي النَّاسِ حَتَّى يُخْرِجَ مِنْ بَيْنِ أَظْهَرِكُمْ فَبِهِ مَنَعْتُكُمْ.
তোমাদের মাঝে এমন এক লোক আছে, যে গত চল্লিশ বছর যাবত অবিরাম আমার নাফরমানী করে আসছে আর সে গুনাহের ব্যাপারে একগুঁয়ে। হে মুসা! তুমি লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও, সে যেন এ সমাগম থেকে বের হয়ে যায়। কেননা, তার কারণেই তোমাদেরকে বৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না। আর যতক্ষণ সে বের না হবে, ততক্ষণ বৃষ্টিও হবে না।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো দুর্বল, আমার আওয়াজও দুর্বল আর লোকদের সংখ্যা সত্তর হাজারেরও বেশি। আমি কীভাবে তাদের সকলের নিকট আওয়াজ পৌঁছাবো?
তখন জবাব আসলো, তোমার কাজ হলো ঘোষণা দেওয়া, আর আমার কাজ হলো, পৌঁছে দেওয়া।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর সম্প্রদায়কে ডেকে বললেন,
أَيُّهَا الْعَبْدُ الْعَاصِي الَّذِي يُبَارِزُ اللَّهَ بِالْمَعَاصِيْ مُنْذُ أَرْبَعِينَ سَنَةً ، أُخْرُجْ مِنْ بَيْنِ أَظْهُرِنَا ، فَبِكَ مَنَعْنَا الْمَطَرَ.
হে ওই পাপিষ্ঠ, নাফরমান বান্দা, যে বিগত চল্লিশ বছর যাবত নিজের প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করে যাচ্ছো এবং তাঁর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছো, তুমি এই মজলিস থেকে বের হয়ে যাও। তোমার মন্দ কর্মের কারণেই আমরা রহমতের বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
এ ঘোষণা শুনে গুনাহগার বান্দা তার ডানে বামে তাকিয়ে দেখলো, কেউ তার আপন জায়গা থেকে সরছে না। ফলে সে বুঝতে পারলো, আমিই সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তি। সে ভাবতে লাগলো, যদি আমি সবার সামনে দিয়ে বের হই, তাহলে প্রচুর লজ্জা পাবো আর আমার ব্যাপারে সবাই হাসাহাসি করবে। আর যদি বের না হই, তাহলে কেবল আমার কারণেই এই লোকগুলো বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে সে স্বীয় চেহারা কাপড়ের নিচে লুকিয়ে তার কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করতে লাগলো-
হে আমার রব! তুমি কত সম্মানিত ও সহনশীল, আমি চল্লিশ বছর তোমার নাফরমানী করছিলাম আর তুমি আমাকে অবকাশ দিয়ে আসছিলে। আর এই মুহূর্তে তো আমি তোমার অনুগতশীল হয়ে এসেছি। এখন আমার তাওবা কবুল করো এবং আমাকে ক্ষমা করে দিয়ে আজকের এই লজ্জা ও অপমান থেকে রক্ষা করো।
তার দুআ শেষ হতে না হতেই, কালো মেঘে ছেয়ে গেলো আকাশ, ঝুম বৃষ্টি আর শুরু হলো বাতাস।
পরক্ষণে মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ! আপনি কীভাবে বৃষ্টি নাযিল করলেন, অথচ সেই নাফরমান বান্দা মজলিস থেকে বের হয়নি?
আল্লাহ তাআলা বললেন, হে মূসা! যার কারণে ইতিপূর্বে বৃষ্টি বন্ধ রেখেছিলাম, তার কারণেই এখন বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। কেননা, সে তাওবা করেছে।
মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, হে আল্লাহ, তার সাথে আমার সাক্ষাত করিয়ে দাও, যাতে আমি তাকে একনজর দেখে নিতে পারি।
তখন ইরশাদ হলো-
مُوسَى إِنِّي لَمْ أَفْضَحْهُ وَهُوَ يَعْصِينِي ، أَ أَفْضَحُهُ وَهُوَ يُطِيعُنِي
হে মূসা! যখন সে আমার নাফরমানী করছিলো তখনই তো আমি তাকে অপমান ও অপদস্ত করিনি। আর এখন তো সে আমার অনুগত ও সৎ হয়ে গেছে, অতএব এখন তো কিছুতেই তাকে লজ্জিত ও অপমানিত করতে পারি না।
প্রিয় পাঠক! লক্ষ করুন, একজন মাত্র গুনাহগার ও নাফরমান ব্যক্তির জন্য বৃষ্টি হচ্ছিলো না। বর্তমানে তো অল্পকিছু লোক ছাড়া বাকি সবাই গুনাহ ও নাফরমানীতে লিপ্ত, তাহলে আমাদের কী অবস্থা হবে হাশরের মাঠে? সূরায়ে জ্বিন এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা সত্যিই বলেছেন,
وَأَلَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا
তারা যদি সঠিক পথে অবিচল থাকতো, তাহলে আমি অবশ্যই প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে সমৃদ্ধ করতাম।১২৯

উপদেশ
ইমাম গাজালী রহ. বলেন, সকালে যখন তুমি ঘুম থেকে জাগ্রত হও, তখন মনে মনে একটি প্রতিজ্ঞা করো, রাতে শোয়ার আগ পর্যন্ত আমি আজ কোনো প্রকার গুনাহ করবো না এবং সকল ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাত আদায় করবো। আল্লাহ তাআলার হক ও বান্দার হক পুরোপুরি আদায় করবো।
এরপর যেকোনো কাজ করার পূর্বে চিন্তা করবে, এই কাজটি কি আমার প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী হচ্ছে? যদি পরিপন্থী হয়, তাহলে ছেড়ে দেবে।
আর রাতে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করবে, আমার দ্বারা কি আমার প্রতিশ্রুতির বিপরীত কোনো কাজ সম্পন্ন হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে তাওবা করে নেবে, আর মনকে সামান্য শাস্তি দাও। শাস্তিস্বরূপ আট-দশ রাকআত নফল নামায পড়তে বাধ্য করো। আর যদি প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী কোনো কাজ না হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলার শুকর আদায় করো। ১৩০
যখন গুনাহ করার ইচ্ছা মনে উদ্রেক হয়, তখন নিচের দুআটি গুরুত্বের সাথে পড়তে থাকো-
رَبَّنَا أَفْرِغْعَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ
হে আমাদের রব! আমাদেরকে পরিপূর্ণ ধৈর্য দান করুন এবং মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে মৃত্যু দান করুন।১৩১

সুন্নাতের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়ার পরিণতি
'আহলুল কুবৃর' নামক গ্রন্থে আল্লামা যাইনুদ্দীন ইবনে রজব রহ. লিখেছেন- একবার এক লোক আমার কাছে আসলো, যে পূর্বে কাফন চুরি করতো। এই হীন কাজ সে এখন আর করে না; বরং এখন সে সৎভাবে জীবন যাপন করছে।
আল্লামা যাইনুদ্দীন রহ. সে ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো জীবনে অনেক মুসলমানের কাফন চুরি করেছো, যারফলে মৃত মানুষের অবস্থা তুমি ভালো জানো। অতএব তুমি আমাকে বলো, যখন তুমি মৃত ব্যক্তির চেহারা খুলতে, তখন তার চেহারা কোন দিকে ফিরোনো থাকতো?
সে বললো, বেশির ভাগ লোকের চেহারা কিবলা থেকে অন্য দিকে ফিরানো পেয়েছি।
হযরত যাইনুদ্দীন রহ. এ কথা শুনে খুবই আশ্চর্য হলেন। কেননা, দাফন করার সময় সাধারণত কিবলার দিকে মুখ করে মুসলমানদের দাফন করা হয়। তাই তিনি ইমাম আওযায়ী রহ.-কে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, ইমাম আওযায়ী রহ. শোনা মাত্রই তিনবার 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়লেন। অতঃপর বললেন, সম্ভবত সে সব লোক দুনিয়ার জীবনে সুন্নাত থেকে বিমুখ ছিলো। ১৩২
সাহাবায়ে কিরাম কখনো সুন্নাতের মাঝে ছোট বড় বলে পার্থক্য করতেন না। বরং তারা সব সুন্নাতকেই বড় মনে করতেন। এই জন্য তাঁরা সকল সুন্নাতের উপর আমল করতেন। আর আমরা ছোট বড় পার্থক্য করে অনেক সুন্নাতকেই ছেড়ে দিই। আল্লাহ তাআলা আমাদের মাফ করুন। ১৩৩

সবর ও ধৈর্যের গুণ অর্জন করতে হবে
মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করার জন্য মানুষের অভ্যন্তরে একটি শক্তি দেওয়া হয়েছে, যাকে নফসে লাউওয়ামা [نفس لوامة] বলে। সাধারণ মানুষের মাঝে যা অন্তর নামে প্রসিদ্ধ।
কোনো ব্যক্তি যখন খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, তখন তাকে যে শক্তি সেই খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে উদ্বুদ্ধ করে, সেটাই হচ্ছে نفس لوامة । এ ছাড়াও এমন কিছু যোগ্যতা আছে, যেগুলো মানুষকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।
অপর দিকে এমন দুটি অপশক্তি রয়েছে, যেগুলো মানুষকে গুনাহ করতে উৎসাহিত করে। তন্মধ্যে একটি রয়েছে মানুষের অভ্যন্তরে, যেটাকে نفس أمارة বলে। এটা মানুষকে নেক কাজ থেকে বিরত রাখে আর খারাপ কাজে উৎসাহিত করে।
দ্বিতীয় অপশক্তি হলো, শয়তান। যার জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে, মানুষকে নেক কাজ থেকে বিরত রাখা এবং খারাপ কাজের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এই বিপরীতমুখী দুটি শক্তির টানাটানির মাঝেই রয়েছে মানুষের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রত্যেকের জন্য জরুরী হলো, খারাপ কাজের উপর ভালো কাজকে প্রাধান্য দেওয়া। ভালো কাজকে খারাপ কাজের উপর প্রাধান্য দেওয়ার মধ্যে এক প্রকারের কষ্ট স্বীকার করতে হয়। শরীআতের পরিভাষায় একে সবর বা ধৈর্য বলে।

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়
• সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক চেয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি দুআ করা।
• নফসের সাথে যুদ্ধ করা, মনের কুমন্ত্রণা দূর করা এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা।
• আল্লাহ তাআলার উপস্থিতির কথা চিন্তা করা। তিনি আমাকে সর্বদা দেখছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে ভয় করা।
• গুনাহ করার সময় এই কথা চিন্তা করা, কেউ দেখলে কি আমি এমন গুনাহ করতে পারতাম? এভাবে নিজের ভেতর লজ্জাবোধ জাগ্রত করা। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি তোমার পরিবারের কোনো প্রভাবশালী সদস্যকে যেমন লজ্জা পাও, আল্লাহকে (কমপক্ষে) তেমন লজ্জা করো। ১৩৪
• এই চিন্তা করা, গুনাহরত অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে কীভাবে আমি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করবো? মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে [কিয়ামতের দিন] সেই অবস্থায় উঠানো হবে, যে অবস্থায় সে মারা গেছে। ১৩৫

টিকাঃ
১২৪. মাআরিফুল কুরআন: ৬/২১৯, সূরা আম্বিয়া: ৮৫।
১২৫. ইবনে মাজাহ: পৃষ্ঠা-৩০৩।
১২৬. মাজালিসে ইলম ও যিকির: ২/৬৯।
১২৭. তাফসীরে বাহরে মুহীত: ৩/৫৩৩, সূরা মায়িদা: ৬৩।
১২৮. ফাযায়িলে আমল: পৃষ্ঠা নং- ৬০৭, ফাযায়িলে তাবলীগ।
১২৯. সানহারে আওরাক: ২০৯।
১৩০. ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন: ৪/৫২৪।
১৩১. সূরা আরাফ: ১২৬।
১৩২. আহলুল কুবৃর ও আহওয়ালু আহলিহা ইলান নুশুর: ৬৬।
১৩৩. ইসলাহী খুতুবাত: ৭/১৮০।
১৩৪. মুসনাদে বায্যার: ৭/৮৯।
১৩৫. সহীহ মুসলিম: হাদীস নং-২২০৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px