📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 ইলম অর্জনে আকাবিরদের অক্লান্ত পরিশ্রম

📄 ইলম অর্জনে আকাবিরদের অক্লান্ত পরিশ্রম


তালিবে ইলমের অন্তরে সর্বদায় ইলমের প্রতি আগ্রহ ও প্রবল টান থাকা উচিত। এমনিভাবে নিয়মিত মেহনত, অবিচলতা ও উঁচু হিম্মত রাখা অত্যন্ত জরুরী। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস মেহনতের মাধ্যমে অর্জন করতে চায়, সে তা পেয়েই যায়। মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু তার চেষ্টা সাধনা আর মেহনত অনুপাতেই পেয়ে থাকে। তালিবে ইলমের জন্য রাতজাগা আবশ্যক। যে ব্যক্তি রাতে নিজেকে জাগ্রত রাখে, দিনে তার অন্তর আনন্দ অনুভব করে। তাকরার এবং মুতালাআর জন্য শুরু এবং শেষ রাত অত্যন্ত উপযোগী। কেননা, মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময় এবং রাতের শেষ অংশ খুবই বরকতময় সময়।

ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এর রাতজাগা
এক রাতে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. এর কাছে অবস্থান করছিলেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. সারারাত নফল নামায পড়ছিলেন আর ইমাম মুহাম্মাদ রহ. সারারাত শুয়েছিলেন। এতে ইমাম শাফেয়ী রহ. খুবই আশ্চর্য হন। ফজরের আযান হলে উযুর জন্য তিনি ইমাম মুহাম্মাদ রহ.-কে পানি দিলেন। কিন্তু ইমাম মুহাম্মাদ রহ. উযু করা ব্যতীতই নামায পড়লেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন,
'আপনি তো ব্যক্তিগত লাভের জন্য সারা রাত ইবাদত করেছেন। আর আমি পুরো উম্মাতের উপকারিতার কথা চিন্তা করে সারারাত সজাগ ছিলাম। আমি কুরআনে কারীম থেকে এক হাজারের চেয়ে অধিক মাসআলা আবিষ্কার করেছি।'
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, 'এই কথা শুনে আমি নিজের রাতজাগার কথা ভুলে গেলাম। কেননা, ইবাদত করে রাত জাগা এতো কঠিন না, যতো কঠিন শুয়ে থেকে রাত জাগা!!'
ইমাম মুহাম্মাদ রহ. নয় শত নিরানব্বইটি কিতাব লিখেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, এ সুক্ষ্ম মাসআলাগুলো আপনি কোথা থেকে অর্জন করেছেন? তিনি বলেছেন, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী রহ. এর কিতাবসমূহ থেকে।
কথিত আছে, ইমাম মুহাম্মাদ রহ. কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা থেকে যে সকল মাসআলা উদঘাটন করেছেন, এর সংখ্যা ১০৭০১০০ [দশ লাখ সত্তর হাজার এক শ]।

নিয়মিত দরসে উপস্থিত থাকার গুরুত্ব
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেছেন, দরসে অনুপস্থিত থাকার কারণে অনেক ক্ষতি হয়। যদি আপনি কোনো সবকে অনুপস্থিত থাকেন, তবে হয়তো পরে আপনি সেটা মুতালাআ করে বা অন্য কোনো সাথীর থেকে শিখে নেবেন। কিন্তু বোঝার হক আদায় হবে না। সারা জীবন সেই সবকটি অস্পষ্ট থেকে যাবে। উস্তাদের সবকের বরকত কোনোভাবেই আপনার অর্জিত হবে না।

একটি ঘটনা
ইলম অর্জনে কারী আব্দুর রহমান পানিপথী রহ. এর এতটাই ঝোঁক ও ব্যস্ততা ছিলো যে, ছাত্র যামানায় তার সমবয়সী বা প্রিয় কোনো ব্যক্তি যদি তার সাথে সাক্ষাতের জন্য দিল্লী আসতো তাহলে তিনি 'আস-সালামু আলাইকুম' বলে অথবা সালাম কালাম ও হালপুরুস্তি করে সুস্পষ্ট করে বলে দিতেন, এর চেয়ে বেশি সময় আমার নেই। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো প্রয়োজনে সাক্ষাত করাবেন তখন বিস্তারিত কথা হবে, ইনশাআল্লাহ।
কারী আবদুর রহমান পানিপথী রহ. অনেক দূর থেকে পায়ে হেঁটে শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক রহ. এর দরসে আসতেন। কখনো সবক ছুটতে দিতেন না। একদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। সেদিন তাঁর সাথীরা ভেবেছিলো, আজ তো সে দরসে আসতে পারবে না। নিশ্চিত আজ তার সবক ছুটে যাবে। কিন্তু তার উস্তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো, যেকোনো উপায়ে সে দরসে উপস্থিত হবেই। সে সবক ছুটতে দেবে না। কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো, সত্যিই কারী সাহেব নিজে ভিজে আর কিতাবকে একটা পাত্রে রেখে চলে এসেছেন। তাঁর উস্তাদ শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক এই দৃশ্য দেখে খুব খুশী হলেন এবং তার জন্য প্রাণ খুলে দুআ করলেন।

ঘুম দূর করার পদ্ধতি
শাইখুল আরব ওয়াল আযম মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ. বলেন, আমি পরীক্ষার দিনগুলোতে রাতে কিতাবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তাম। পুরো রাতে সব মিলিয়ে এক দুই ঘণ্টা ঘুমাতাম। ঘুম দূর করার জন্য আমার কাছে 'লবণ চা' এর ব্যবস্থা রাখতাম। যখনই ঘুম প্রবলভাবে চেপে বসতো, চা পান করতাম। এতে ঘুম এক দুই ঘণ্টার জন্য দূর হয়ে যেতো। আমি সবসময় ঘুমের কাছে অসহায় ছিলাম। বিশেষ করে কিতাব পড়তে বসলেই ঘুম আমাকে কাবু করে ফেলতো। এ পদ্ধতি অবলম্বন করে আমি ঘুমের উপর বিজয়ী হয়েছি।

যোগ্যতা তৈরি না হওয়ার কারণ
একটা সময় ছিলো, যখন সামনের সবক মুতালাআ করার অনেক গুরুত্ব ছিলো। এখন সেটা আর নেই। এখন উস্তাদ অনেক মুতালাআ করে দরসে পড়ান আর ছাত্ররা মাহফিলের শ্রোতাদের মতো কেবল শ্রবণ করেন। সবক বোঝার জন্য ছাত্ররা নিজের থেকে উল্লেখযোগ্য মেহনত করে না। কিতাব বোঝার দায়িত্বটা উস্তাদের কাঁধে দিয়ে রেখেছে। এ কারণেই অসংখ্য প্রতিবন্ধী আলেম তৈরি হচ্ছে।
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, আপনি নির্জনে বসে কিতাব মুতালাআ করবেন। নিজের থেকে কিতাব বুঝার চেষ্টা করবেন। মুতালাআ শেষে কিতাবের ইবারতের দিকে তাকিয়ে ভাববেন, কী বুঝে আসলো আর কী বুঝে আসলো না। জানা ও অজানার মধ্যে পার্থক্য করবেন। এটাই প্রকৃত মুতালাআ। যেটা বুঝে এসেছে, উস্তাদের দরসে লক্ষ করবেন, আপনার বুঝটি সঠিক আছে কিনা। আর যেটা বুঝেননি, উস্তাদের দরসে সেটা খুব মনোযোগ সহকারে শুনবেন। এভাবে দাওরা পর্যন্ত পড়লে ইনশাআল্লাহ যোগ্যতা তৈরি হবেই। যদি মুতালাআ না করে দরসে বসেন, তাহলে উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা তৈরি হবে না। বরং আপনার যোগ্যতায় অনেক ত্রুটি থেকে যাবে।

একটি ঘটনা : অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তিনি 'হিবরুল উম্মাহ' উপাধী পেয়েছেন
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল করেন, আমি আমার এক আনসারী বন্ধুর কাছে গিয়ে বললাম, দোস্ত! আলহামদু লিল্লাহ, এখনো অনেক বড় বড় সাহাবায়ে কিরাম জীবিত আছেন। আমাদের উচিত, তাদের কাছে গিয়ে ইলম অর্জন করা। [অন্যথায়, তাদের মৃত্যুর পরে লোকেরা যখন আমাদের কাছে মাসআলা জানতে আসবে তখন আমাদের লজ্জিত হতে হবে।] আনসারী সেই বন্ধুটি খুব বেশি বিনয়ী ছিলেন। তিনি বললেন, আপনি দেখছি আশ্চর্য কথা বলছেন, এমন সময়ও কি কখনো আসবে, যখন আমাদের কাছে লোকদের আসার প্রয়োজন পড়বে? আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, তার এ কথা শুনে আমি তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে ইলম অর্জনের জন্য আমি কোমর বেঁধে নেমে গেলাম। যে সাহাবীর ব্যাপারেই আমি জানতে পেরেছি, তার কাছে হাদীসের কিছু ইলম আছে, আমি তার কাছে ছুটে গিয়েছি। তা অর্জন করেছি।
একবার আমি জানতে পারলাম, অমুক সাহাবী একটি হাদীস বর্ণনা করেন। দেরি না করে তার বাড়ীতে গেলাম। গিয়ে জানতে পারলাম, তিনি কাইলুলা করছেন। তাই আমি সেই সাহাবীর দরজাতেই চাদর মাথার নিচে রেখে শুয়ে পড়লাম। বাতাসের কারণে ধুলোবালি উড়ে আমার চেহারা এবং কাপড়-চোপড় ময়লা হয়ে গেলো। [আমি ইলমের ধ্যানে আত্মহারা ছিলাম] কাইলুলা শেষে তিনি আমাকে উক্ত অবস্থায় দেখে হতভম্ব হয়ে বললেন, হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ভাতিজা, আপনি এটা কী করলেন? একজন লোক পাঠিয়ে আমাকে ডাকলেই তো আমি আপনার দরবারে চলে আসতাম। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বললেন, এটা হয় না, এমনটা করলে ইলমের অবমূল্যায়ন করা হতো। এটা আমার দায়িত্ব ছিলো, তাই আমি নিজেই উপস্থিত হয়েছি।
প্রিয় তালিবুল ইলম! হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. স্বীয় বংশীয় মর্যাদা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি সকল মান মর্যাদা উপেক্ষা করে ইলম অর্জনের জন্য সাধারণ মানুষের মতো মুহাদ্দিসদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। অনেক কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করেছেন। এর ফলাফল এই দাঁড়িয়েছিলো যে, সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে তার উপাধী 'রাব্বানিয়্যুল উম্মাহ' ‘হিবরুল উম্মাহ' এবং 'তরজমানুল কুরআন' প্রসিদ্ধ ছিলো। সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে অদ্যবধি তার ফতোয়া চর্চা হচ্ছে এবং ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়ে আসছে।
উলামায়ে কিরাম বলেছেন- العلم عز لا ذل فيه ولا يدرك إلا بذل لا عِزَّ فيه
ইলম এমন এক স্থায়ী সম্মান, যাতে কোনো লাঞ্চনা নেই। কিন্তু তা এমন লাঞ্চনার মাধ্যমে অর্জিত হয়, যাতে কোনো সম্মান নেই।

যে রোগে আক্রান্ত হওয়া দরকার প্রতিটি তালিবুল ইলমের
খাতামুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশমীরী রহ. অধিকাংশ সময়ই কিতাব অধ্যয়নে মগ্ন থাকতেন। কিতাব মুতালাআয় তাঁর এমন আগ্রহ ছিলো যে, স্বভাবজাত ও শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া অযথা কোনো সময় নষ্ট করতেন না। একদা তিনি বললেন, ফাতহুল বারী, যা ১৩ খণ্ডের কিতাব তা আমি তেরোবার মুতালাআ করে শেষ করেছি। তিনি আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহ. প্রণীত বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'উমদাতুল কারী' কিতাবটি দাওরা হাদীস পড়ার আগের মাস তথা রমযান মাসেই আদ্যোপান্ত মুতালাআ করে শেষ করেছেন। এরপর বুখারী শরীফের সবক চলার সাথে সাথে 'ফাতহুল বারী' এর মুতালাআ জারী রেখেছিলেন। দরসের সবকের চেয়ে তাঁর ফাতহুল বারীর মুতালাআ এগিয়ে থাকতো। একবার শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি সতেরো দিন দরসে উপস্থিত থাকতে পারেননি। সুস্থ হয়ে এসে দেখেন তাঁর ফাতহুল বারীর মুতালাআ এখনো এগিয়ে রয়েছে।
হযরত কাশ্মীরী রহ. এর মুতালাআ শুধু দরসী কিতাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বরং ইলমে দীন সম্বলিত যেকোনো কিতাবই তিনি মুতালাআ করতেন। নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর জ্ঞানকে আবদ্ধ করে রাখতেন না। সাধারণ থেকে সাধারণ বিষয় মুতালাআ করার জন্য প্রচুর আগ্রহ ছিলো।
মিসর সফরে সিংহভাগ সময় বড় বড় প্রসিদ্ধ লাইব্রেরীতে কিতাব মুতালাআয় পার করতেন। হিজায সফরে হারামাইনের লাইব্রেরীগুলোকে আবাসস্থল বানিয়ে নিয়েছিলেন। ফরয, নফলের পরে কিতাব অধ্যয়নই ছিল তার ইবাদত। মৃত্যুশয্যায় মুতালাআ করতে ডাক্তার নিষেধ করা সত্ত্বেও যখনই সুযোগ হতো, তখনই মুতালাআ শুরু করতেন।
ডাক্তার বললেন, হযরত! এর দ্বারা রোগ বেড়ে যাবে। উত্তরে তিনি বললেন, কিতাব মুতালাআই আমার অসুস্থতা, যার কোনো চিকিৎসা নেই।
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. বলেন, একবার আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. খুব বেশি অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। একদিন ফজরের সময় এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো যে, হযরত ইন্তিকাল করেছেন। এই সংবাদ হযরতের ভক্তবৃন্দের উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো মনে হলো।
বাদ ফজর আমরা সকলে হযরত রহ. এর ঘরের দিকে রওয়ানা করলাম। আমাদের সাথে শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. -ও ছিলেন। আলহামদু লিল্লাহ, ঘরে পৌঁছে জানতে পারলাম, সংবাদটি ভুল ছিলো। তবে মৃত্যু না হলেও হযরতের কষ্টটা খুব বেশি হচ্ছিলো। হযরতকে দেখার জন্য আমরা সবাই রুমে প্রবেশ করে দেখলাম, হযরত নামাযের চৌকিতে বসে আছেন। হযরতের সামনে তেপায়ার উপর একটি কিতাব খুলে রাখা আছে। অন্ধকারের কারণে হযরত ঝুঁকে মুতালাআ করছেন। এই দৃশ্য দেখে আমরা আশ্চার্যান্বিত ও আশঙ্কাবোধ করছিলাম যে, এই পরিস্থিতিতে এতো কষ্ট করে মুতালাআ করা অসুস্থতা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ. হিম্মাত করে কিছুটা আত্মনির্ভর হয়ে বললেন,
হযরত, একটা বিষয় বুঝে আসেনি, এমন কী বিষয় রয়ে গেলো, যা আপনার এখনো মুতালাআয় আসেনি? আর যদি থেকেও থাকে, তবে এখনই এমন কী প্রয়োজন দেখা দিলো যে, সেটা কিছুদিনের জন্য বিলম্ব করা যাবেচ্ছ না? আর যদি এখনই সেটা আবশ্যকীয় হয়ে থাকে, তবে আমরা যারা আপনার খাদেম আছি তারা কোন কাজের জন্য? আপনি আমাদের যেকোনো একজনকে বললেই তো সে মাসআলা দেখে আপনাকে জানিয়ে দিতো। কিন্তু এতোসব কিছু বাদ দিয়ে আপনি এ মুহূর্তে এতো অন্ধকারে যে মেহনত করছেন, সেটা আমাদের জন্য বরদাস্ত করার মতো না।
উত্তর দিতে গিয়ে হযরত শাহ সাহেব রহ. কিছুক্ষণ মাওলানা শাব্বীর আহমাদ উসমানীর রহ.দিকে নিষ্পাপ ও নিরূপায়ের মতো তাকিয়ে রইলেন। এরপর বললেন, 'ভাই ঠিক বলেছো। কিন্তু এই কিতাব দেখাও তো একটা রোগ। এই রোগের কী করবো?'

দাওরা হাদীস শেষ করার পর করণীয়
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. বলেন, 'আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. আমাদেরকে দাওরায়ে হাদীসের বছর এ কথা খুব গুরুত্বের সাথে বলতেন, ফারেগ হওয়াকে [দাওরায়ে হাদীস শেষ করা] কখনো নিজের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করবে না। ফারাগাতের অর্থ হচ্ছে, এরপর একজন ব্যক্তির মুতালাআর সক্ষমতা তৈরি হয় এবং ইলমের দরজা তার জন্য উন্মুক্ত হয়। প্রতিটি ফারিগের কর্তব্য হচ্ছে, ইলমের কিছু মৌলিক কথা জেনে তুষ্ট থাকার পরিবর্তে এই দরজা দিয়ে গভীরে প্রবেশ করা এবং মুতালাআর সেই সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নিজের ইলমে ব্যাপকতা এবং গভীরতা অর্জন করা।'

লাগাতার এক সপ্তাহ পর্যন্ত ঘুমাতেন না যিনি
দারুল উলূম দেওবন্দে অধিক পড়ালেখার ক্ষেত্রে মাওলানা ইযায আলী রহ. একক ব্যক্তি ছিলেন। দারুল উলূমে তার শিক্ষক জীবনের প্রথম দিকে তার মুতালাআর অবস্থা এই ছিলো যে, লাগাতার এক সপ্তাহ যাবত তিনি ঘুমাতেন না। দিন-রাত কিতাব ব্যতীত অন্য কিছু তার হাতে এবং তার চোখের সামনে দেখা যেতো না।
মুফতী শফী সাহেব রহ. বলেন, এ সংক্রান্ত একটি ঘটনা হযরত মাওলানা ইযায আলী রহ. আমাকে একাধিকবার শুনিয়েছেন। তিনি বলতেন, আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. এর কাছে কোনো মাধ্যমে এই সংবাদ পৌঁছলো যে, ইযায আলী একাধারে এক সপ্তাহ যাবত কিতাব মুতালাআ করতে থাকেন। এ সময়ে তিনি দিনরাতে মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেন না। ধারাবাহিক রাতজাগার কারণে তার স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
শাহ সাহেব রহ. আর আমার মাঝে বিশেষ সম্পর্ক থাকার কারণে এই সংবাদ তাকে অস্থির করে তুলেছে। এই অস্থিরতার কারণে কনকনে শীতের মাঝে রাত বারোটায় তিনি আমার রুমে আসলেন। তখন আমি মুতালাআ করছিলাম আর বাস্তবেই আমার জাগ্রত থাকা এক সপ্তাহ থেকে অধিক হয়ে গিয়েছিলো। এতে আমার প্রতি তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে ধমক, শাসন ও বুঝ ইত্যাদি দিয়ে আমার হাত থেকে কিতাব নিয়ে যথাস্থানে রেখে দিয়েছেন।
মাওলানা ইযায আলী রহ. বলেন, শাহ সাহেব রহ. চলে যাওয়ার পর কয়েক মিনিট পর্যন্ত তার বুঝানোর প্রভাব আমার উপর ছিলো। কিন্তু পরে যখন আর সহ্য হচ্ছিল না তখন উঠে গিয়ে পুনরায় মুতালাআয় লিপ্ত হয়ে গেলাম।

ইলমের জন্য মুফতী শফী রহ. এর কষ্ট সাধনা
হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ছাত্র যমানায় তাকরার করার জন্য রাতে দারুল উলূমে যেতেন। যখন ঘরে আসতেন কখনো তখন রাত একটা বেজে যেতো। হযরত একবার দারুল উলূম করাচির ছাত্রদেরকে নসীহত করার সময় বললেন, 'রাতে আম্মাজান খানা গরম করে দেওয়ার জন্য আমার অপেক্ষা করতেন। তার এই অপেক্ষা করা আমার কাছে অনেক কষ্টের ছিলো। তাই অনেক অনুনয়-বিনয় করে এ কথার উপর তাকে রাজি করাতে পেরেছিলাম যে, আমার খানা একজায়গায় রেখে দেবেন। তাই করা হতো। ফলে শীতের রাতে তরকারীর উপর ঝোল জমাটবদ্ধ হয়ে থাকতো আর নিচে শুধু পানি জমে থাকতো। আমি সেটা খেয়েই ঘুমিয়ে যেতাম।

অন্ন ও বস্ত্রের সংকীর্ণতা ইলমের আধিক্যতার কারণ
অল্পকিছু যা-ই ব্যবস্থা হয় তালিবে ইলমের জন্য তাতে তুষ্ট থাকা উচিত। পরিধান করার জন্য প্রয়োজন পরিমাণ পেলেই সেটাকে অনেক বেশি মনে করা উচিত। কেননা, ছাত্র যামানায় খাবার ও পরিধেয় বস্ত্রের সংকীর্ণতা ইলমে আধিক্যতার কারণ হয়। ইলমের রাস্তায় সফরের সামানা তখনই পাওয়া যায় যখন ছাত্র যমানার কষ্টগুলো বরদান্ত করা হয়। আর এই কষ্টগুলো সহ্য করা তখনই সম্ভব যখন ইলম অন্বেষণের ব্যথা-বেদনা স্বীয় ভাগ্যে জুটে। তালিবে ইলম চাহিদার রশিকে বিভিন্ন রকমের আশা-আখাঙ্ক্ষা থেকে বিরত রাখবে। এর বরকতে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সদা বহমান ঝর্ণা তার অন্তর থেকে প্রবাহিত হবে।

কিতাবের সাথে হৃদ্যতা তৈরি করা জরুরী
হযরত মাওলানা কারী আব্দুর রহমান পানিপথী রহ. তখন অনেক ছোট। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি স্বীয় পিতার কাছে গ্রহণ করছেন। একদিন কারী সাহেব ভালোভাবে মুতালাআ করেননি। এ জন্য তার পিতা তাঁকে সবক পড়াননি। কারী সাহেবের এতে এতোটা অনুশোচনা হয়েছিলো যে, তিনি রাতের খানা খাননি। এটা দেখে তার মা কান্না করছিলেন। তার পিতা যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তখন তার মাকে বললেন, এটা কষ্ট পাওয়ার বিষয় নয়, বরং আনন্দিত হওয়ার বিষয়। কেননা, পড়ার সাথে তার আন্তরিকতা তৈরি হয়েছে।

২৪ ঘণ্টার রুটিন তৈরি করে নেবেন
তালিবুল ইলমের উচিত, দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে গনীমত মনে করা। একটি মিনিটও যেনো নষ্ট না হয়, সেদিকে পূর্ণ খেয়াল রাখা এবং দিনরাতের সময়গুলোকে ভাগ করে নেওয়া। প্রতিটি সময়ের যেনো একটি কাজ থাকে, প্রতিটি কাজের যেনো নির্দিষ্ট একটি সময় থাকে। রাতের শেষ ভাগ মুখস্থের সবচেয়ে উত্তম সময়। ইলমী আলোচনার জন্য ভোরের সময়টুকু সবচেয়ে উপযোগী। লেখার জন্য দিনের মধ্যভাগ আর মুতালাআ ও মুযাকারার জন্য রাতের বেলা সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

ইলমের সাথে শাহ আব্দুল হক রহ. এর হৃদ্যতা
শাহ আব্দুল হক রহ. বলেন, পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে আমি কখনো সময় মতো খানা খেতে পারিনি। পুরো রাত কখনো ঘুমোতে পারিনি। শীতের ঠান্ডা বাতাস আর গ্রীষ্মের প্রখর রোদে আমি প্রতিদিন দিল্লীর দরবারের মাদরাসায় যেতাম, যা আমাদের ঘর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে ছিলো। দুপুরে কিছুক্ষণ ঘরে থেকে কয়েক লুকমা খানা খেয়ে নিতাম। আমার বাবা-মা বলতেন, এলাকার ছেলেদের সাথে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করো আর সময়মতো ঘুমিয়ে পড়ো। আমি বলতাম, বাবা! খেলার উদ্দেশ্য তো অন্তরকে আনন্দিত করাই। সেই উদ্দেশ্য আমার পড়ালেখাতে অর্জিত হয়। কিছু পড়লে বা লিখলে আমার মন আনন্দিত হয়।
সাধারণত মা-বাবা সন্তানদেরকে পড়ার জন্য, মকতবে যাওয়ার জন্য তাগাদা দেয়। কিন্তু আমার মা-বাবা আমাকে খেলার জন্য উৎসাহিত করতো। কখনো মুতালাআ করতে করতে অর্ধরাত পার হয়ে যেতো। আমার পিতা এসে জিজ্ঞেস করতেন, বাবা! কী করো? তার কথা শুনে সাথে সাথে আমি শুয়ে বলতাম, আমি শুয়ে আছি। যেনো মিথ্যে না হয়। যখন তিনি নিশ্চিত হতেন আমি ঘুমিয়েছি, তখন আমি আবার উঠে পড়ায় ব্যস্ত হয়ে যেতাম। অধিক আশ্চর্যের কথা হলো, অধিকাংশ সময় মুতালাআ, মুযাকারা ও তাকরারের মধ্যে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও মতন, শরাহ ইত্যাদি থেকে যা কিছু পড়তাম তা লিখে রাখাকে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করতাম। আমি রাতের বেশিরভাগ সময় ও দিনের কিছু সময় মুতালাআ করতাম আর দিনের বেশিরভাগ সময় এবং রাতের কিছু সময় লিখতাম। আল্লাহ তাআলা আমাকে কুরআন মাজীদ হিফয করার তাওফীক দিয়েছেন। এক বছরের কিছু বেশি সময়ে আমি এই নিআমত অর্জন করেছি।

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর ইলম অন্বেষণ
ইমাম আবু ইউসুফরহ. রাতে একেবারেই ঘুমাতেন না। তার চারপাশে কিতাবের স্তূপ থাকতো। যখন পড়তে পড়তে কোনো এক বিষয়ে বিরক্তবোধ করতেন, তখন অন্য একটি কিতাব মুতালাআ শুরু করতেন। রাতে জাগ্রত থেকে যদি কোনো কঠিন মাসআলার সমাধান পেতেন, তখন তিনি খুশীতে আত্মহারা হয়ে বলতেন, কোথায় শাহজাদারা! তারা এই মজা কোথায় পাবে?
ইবরাহীম ইবনে জাররাহ রহ. বলেন, আমি নিজ কানে ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-কে বলতে শুনেছি, 'আমরাও ইলম অন্বেষণ করেছি এবং আমাদের সাথে এতো অধিক সংখ্যক লোকও ইলম অন্বেষণ করেছে, যাদেরকে গোনা সম্ভব নয়। কিন্তু ইলম দ্বারা কেবল সেই ব্যক্তি উপকৃত হয়েছে, দুধ যার অন্তর রঙিন করে দিয়েছে।'
এ কথা দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো, ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর পরিবারের লোকজন তার জন্য রুটি দুধে ভিজিয়ে রাখতেন। তিনি ভোরবেলা সেটা খেয়ে দরসে চলে যেতেন এবং দরস থেকে এসেও সেটাই খেতেন। ভালো খাবার রান্নার জন্য অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করতেন না। অথচ অন্যরা হালুয়া রুটি ইত্যাদি তৈরি করতে লিপ্ত হয়ে সবকের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হতো।
তিনি কাযা (বিচার কাজ পরিচালনা) ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দরস ও ইলমের খিদমতে লেগেছিলেন। জীবনে কখনো এমন হয়নি যে, দরস ও ইলমী মুযাকারা থেকে উদাসীন ছিলেন।
ইবরাহীম ইবনুল জাররাহ রহ. বর্ণনা করেন, আমি হযরত ইউসুফ রহ.-কে তাঁর মৃত্যুশয্যায় দেখতে গেলাম, গিয়ে দেখি তিনি ইলমী আলোচনা করছেন। কিছুক্ষণ অচেতন ছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে আসার পর আমাকে বললেন, ইবরাহীম! (হজ্জের সময়) পাথর নিক্ষেপ করা আরোহী অবস্থায় উত্তম না পায়দল অবস্থায়? আমি উত্তরে বললাম, পায়দল অবস্থায়। তিনি বললেন, তুমি ভুল বলেছো। আমি আবার বললাম, আরোহী অবস্থায়। তিনি বললেন, এটিও ভুল। অতঃপর তিনি নিজে ব্যাখ্যা দিলেন, যে জামরাহ (তথা সেই দেয়াল, হজ্জ করার সময় যাকে লক্ষ করে হাজী সাহেবরা পাথর নিক্ষেপ করে থাকেন) এর নিকট দুআ করা হয়, সেখানে পায়দল উত্তম। আর যেখানে দুআ নেই, সেখানে আরোহী অবস্থায় উত্তম।
ইবরাহীম রহ. বলেন, আমি তার নিকট থেকে উঠে দরজার কাছে এসেই শুনি তিনি ইন্তিকাল করেছেন।
'মানাকীরে মুমাইরী' গ্রন্থে একটু বৃদ্ধি করে এভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, আমি আরয করলাম, ইমাম সাহেব! আপনি এমন মুহূর্তেও মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছেন? তিনি উত্তর দিলেন, এতে কি কোনো সমস্যা আছে? কী আশ্চর্য, আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

চেষ্টা অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ হয়ে থাকে
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, মানুষ যতক্ষণ নিজের অন্তরকে কোনো বিষয়ের প্রতি পরিপূর্ণরূপে না ঝুঁকাবে, ততক্ষণ সে সেই বিষয়ে পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলার সাধারণ রীতি হলো, তিনি মানুষকে তার চেষ্টা অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত বস্তু দিয়ে থাকেন। মানুষের চেষ্টা বিনষ্ট হতে দেন না।
তালিবে ইলমের জন্য কোনোভাবেই সবকে অনুপস্থিত থাকা উচিত নয়; কেননা, সবকে অনুপস্থিত থাকলে বরকত চলে যায়। অন্তর দুর্বল হয়ে যায়। পঠিত বিষয় ভুলে যায়। আগ্রহে ভাটা পড়ে।

পড়ালেখার যামানায় আকাবিরদের অর্থনৈতিক দৈন্যতা
আবুল ফযল মুহাম্মাদ ইবনে তাহির আল মাকদিসী রহ. বলেন, ছাত্র যামানায় আমি 'তিন্নীস' নগরীতে কয়েক বছর অবস্থান করেছিলাম। তখন আমার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। আমার কাছে শুধু একটি দিরহাম ছিলো। অথচ রুটি ও কাগজ উভয়টিরই প্রয়োজন ছিলো আমার। সেই দিরহামটি দিয়ে আমি কী খরীদ করবো, তা নিয়ে আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। যদি রুটি ক্রয় করি, তাহলে কাগজ ক্রয়ের জন্য কিছুই থাকবে না। আর যদি কাগজ ক্রয় করি, তাহলে রুটি কেনার জন্য কিছুই থাকবে না।
এই দ্বিধাদ্বন্ধে আমার তিন দিন কেটে যায়। চতুর্থ দিন আমার ক্ষুধা এতটাই বেড়ে গিয়েছিলো যে, যদি আমি কাগজ কিনি তাহলে ক্ষুধার তীব্রতার কারণে আমার জন্য কিছুই লেখা সম্ভব হবে না। তাই আমি সেই দিরহামটি মুখে রেখে দিয়ে কোথাও থেকে খাবার ক্রয়ের জন্য বের হয়ে গেলাম। কুদরাতের কারিশমা দেখুন, দিরহামটি আমি গিলে ফেললাম এবং অনিচ্ছায় আমার হাসি এসে গেল। তাহির খিতাব রহ. আমাকে হাসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হাসছেন কেনো? আমি কথা ঘুরিয়ে ফেললাম। তিনি পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। এমনকি তালাকের শপথ খেয়ে আমাকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলেন। বাধ্য হয়ে আমি বিস্তারিত ঘটনা তাকে বললাম। তিনি আমার অবস্থা জেনে আমার জন্য স্বতন্ত্র খাবারের ব্যবস্থা করলেন।

ইমাম শাফেয়ী রহ. এর ইলম অন্বেষণ
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ধন-সম্পদ ও ইয্যত-সম্মান নিয়ে কোনো ব্যক্তি এই ইলম অর্জনের ময়দানে সফল হতে পারেনি। এই ময়দানে কেবল সেই ব্যক্তিই সফল হয়েছে, যে জীবন-যাপনে সংকীর্ণতা, উস্তাদদের সামনে নিজেকে ছোট করা এবং ইলম ও উলামায়ে কিরামের ইয্যত করাকে বেছে নিয়েছে।
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, আমি একেবারে ছোট বয়সেই ইয়াতীম হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মা খুব কষ্টে আমাকে প্রতিপালন করতেন। যখন আমি পড়তে যাওয়ার উপযুক্ত হয়েছি, আমার মা আমাকে মকতবে বসিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমার মায়ের পক্ষে আমার উস্তাদের আর্থিক খিদমাত করার সক্ষমতা ছিলো না। এই জন্য আমি আমার উস্তাদকে একথার উপর সম্মত করিয়েছিলাম যে, তিনি যখন কোথাও যাবেন বা কোনো কারণে পড়াতে পারবেন না, তখন মকতবের নিগরান হিসেবে আমি তার প্রতিনিধিত্ব করবো। এভাবে আমি কুরআন মাজীদ খতম করেছি।

হাজ্জাজ বাগদাদী রহ. এর ইলম অর্জন
হাফিযে হাদীস হাজ্জাজ বাগদাদী রহ. যখন হযরত শাবাবাহ রহ. এর কাছে ইলম অর্জনের জন্য যাচ্ছিলেন, তখন তার সফরের সামানা সব মিলিয়ে ছিলো তার দরদী মায়ের পাকানো একশ রুটি, যা তিনি একটি পাত্রে নিয়েছেন। রুটি তো তার মমতাময়ী মা দিয়েছেন আর তরকারী নির্ধারণ করে নিয়েছেন তাঁর বুদ্ধিমান এবং প্রেমাস্পদ ছেলে। তাও এতো অধিক পরিমাণে এবং এতো উন্নত মানের যে, আজ পর্যন্ত শত শত বছর অতিবাহিত হলেও সেই তরকারী এখনো ঠিক তখনকার মতো তরতাজা রয়েছে। কী সেই তরকারী? দজলা নদীর পানি!! হাজ্জাজ বাগদাদী প্রতিদিন একটি করে রুটি দজলার পানিতে ভিজিয়ে খেয়ে নিতেন এবং উস্তাদের কাছে পড়তেন। যে দিন রুটি শেষ হয়ে গিয়েছিলো, সেদিন উস্তাদের অনুগ্রহের দরজা তাকে ছাড়তে হয়েছে।

ছয় মাস জুতা ক্রয় করার প্রয়োজন হয়নি
শাইখুল হাদীস আল্লামা যাকারিয়া রহ. লিখেছেন, আমার বাবার কড়া নেগরানীর কারণে একাগ্রতা আমার দ্বিতীয় আরেকটি অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। সর্বদা সবার থেকে আলাদা হয়ে কিতাব অধ্যায়নে লিপ্ত থাকতাম। ইলম অর্জনে আমার ব্যস্ততা, নির্জন প্রিয়তা এবং ঘুরা-ফেরা ও আনন্দ-উৎসব থেকে বিমুখতার দৃষ্টান্ত নিচের ঘটনা থেকে বোঝা যাবে।
একবার আমার নতুন একজোড়া জুতা কে যেনো মাদরাসা থেকে নিয়ে গেছে। এরপর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত আমার আরেক জোড়া জুতা ক্রয় করার প্রয়োজন পড়েনি। কেননা, এই ছয় মাসে মাদরাসা থেকে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনই হয়নি আমার। মাদরাসার মসজিদে জুমআ হতো আর বাথরুমে সাধারণত এক দুই জোড়া জুতা থাকতোই, যা কারো জুতা পুরোনো হলে রেখে যেতো। এখনো পর্যন্ত এই রীতি চালু আছে। এই কারণেই কোনো প্রয়োজনে আমাকে মাদরাসা থেকে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। ফলে জুতাও ক্রয় করা লাগেনি।

নিজেকে সব ধরনের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রাখতে হবে
যতক্ষণ পর্যন্ত ইলমের প্রতিবন্ধক বিষয়াদি থেকে তুমি বিরত না থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার ইলম অর্জন হবে না। ইলম অর্জনের জন্য চূড়ান্ত চেষ্টা ব্যয় করা এবং সবধরণের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরী। কেননা, আল্লাহ তাআলা কারো সীনায় অন্তর দুটি দেননি, বরং একটাই দিয়েছেন। সুতরাং ইলম অন্বেষণকারী প্রতিটি ছাত্রের জন্য উচিত, ছাত্র যামানায় অন্তরকে অন্য কোনো দিকে ব্যস্ত না রাখা。

মুফতী আযীযুল হক রহ. এর চেষ্টা-মুজাহাদা
হযরত মাওলানা মুফতী আযীযুল হক রহ. ছিলেন জামিআ ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রাম এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর ভেতর ইলমের প্রতি কী পরিমাণ আগ্রহ ও ব্যাকুলতা ছিলো, তা বলা বাহুল্য। সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে নিজ কার্য সম্পাদনের জন্য ছাত্রাবস্থায় তিনি নেযামুল আওকাত তৈরি করে কাজ করতেন। তিনি দরসীপড়া, মুতালাআ, তাকরার, সামনের সবক মুতালাআ, অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য পড়া বোঝার জন্য এমনভাবে নিমগ্ন থাকতেন যে, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ইত্যাদির কথা একেবারে ভুলেই যেতেন।
জায়গিরে একাকী যেতেন। কোনো ইলমী মাসআলা নিয়ে চিন্তা করতে করতে যেতেন। কখনো এমন হতো যে, অন্তরে ইলমী মুযাকারা থাকার ফলে কোথায় যাচ্ছেন, কোন দিকে যাচ্ছেন, কোনো খবর থাকতো না। কিছুদূর যাওয়ার পর যখন ভুল পথে যাচ্ছেন জানতে পারতেন, তখন ইন্নালিল্লাহ বলে ফিরে আসতেন।

মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রহ. এর পরিশ্রম
শৈশব থেকেই মাওলানা আবুল কালাম আযাদ রহ. এর কিতাব মুতালাআর প্রতি প্রচুর আগ্রহ ছিলো। খেলাধুলার প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ ছিলো না। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর মুতালাআর প্রতি এমন আগ্রহ সৃষ্টি হলো যে, নাস্তার টাকা বাঁচিয়ে তা দিয়ে কিতাব ক্রয় করতেন। উর্দু কিতাব মুতালাআ করা ছিলো তাঁর পিতার নিকট জঘন্য অপরাধ। কিন্তু তার পরেও তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে উর্দু কিতাবসমূহ মুতালাআ করতেন। তিনি বিছানার নিচে কিতাব রেখে গভীর রাত পর্যন্ত মোমবাতি জ্বালিয়ে মুতালাআ করতেন। যে কারণে মাওলানার শরীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হতে থাকে। যখন তাঁর পিতা জানতে পারলেন যে, ছেলে (মাওলানা) দরসী কিতাব ছাড়াও বিভিন্ন কিতাব মুতালাআ করে, তখন মাওলানার পিতা কঠিনভাবে তা থেকে নিষেধ করেন এবং তাঁর প্রতি তদারকী করতে থাকেন।
মুতালাআ করতে করতে মাওলানার আগ্রহ ও আসক্তি আরো বৃদ্ধি পেলো। মিসর, শাম ও লেবানন থেকে কিতাব ক্রয় করে আনতে শুরু করলেন। ১৯০১ সালে মাওলানা যখন বোম্বাই গেলেন, সেটি তাঁর কিতাব মুতালাআ করার উত্তম স্থান হিসাবে নির্ধারণ হলো। কেননা, সেখানে ইরানীদের কিতাবের দোকান ছিলো। মিসরের প্রকাশিত কিতাবের লাইব্রেরীও ছিলো। ফলে কিতাব মুতালাআ ও নির্বাচনের উত্তম সুযোগ ছিলো।
মাওলানার আরবী পত্রিকা পড়ারও আগ্রহ ছিলো বেশি। এতে করে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের অবস্থা কেমন ইত্যাদি বিষয় অধিক হারে জানতে থাকেন। সম্ভবত হিন্দুস্তানে তার মতো অধিক মুতাআলা করার লোক খুব কমই পাওয়া যাবে।

ইমাম তাবরানী রহ. এর পরিশ্রম
ইমাম তাবরানী ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস। বড় মাপের লেখকও ছিলেন তিনি। তাঁর লেখার আধিক্যতা প্রত্যক্ষ করে একলোক তাঁকে প্রশ্ন করলো, জীবনের এই অল্প সময়ে এতো কিতাব কীভাবে লিখেছেন? উত্তরে তিনি বলেছেন, ত্রিশ বছর চাটাইয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। অর্থাৎ ঘুম ও আরাম বাদ দিয়ে চাটাইয়ের উপর কিতাব কলম নিয়ে পড়ে থেকেছি。

হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. এর চেষ্টা মুজাহাদা
হাকীমুল ইসলাম মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তৈয়্যব সাহেব রহ. বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দে লেখা-পড়াকালীন হযরত থানবী রহ. চারটি নিয়মের উপর চলতেন।
এক. হযরত থানবী রহ. কিছু সহপাঠী নির্বাচন করেছিলেন। তারা সকলে এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, ইশার নামাযের পর আমরা তাকরার, মুতালাআ কিছুই করবো না। বরং নামাযের পর সাথে সাথে শুয়ে যাবো। অতঃপর শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে মুতালাআ ও তাকরার করবো। যে কাজ অন্যান্যরা প্রথম রাতে করে, সেই কাজ আমরা শেষ রাতে করবো। সকল সাথী এর উপর একমত পোষণ করে আমল করতে লাগলো।
দুই. দেওবন্দের বাজারের চৌরাস্তায় প্রতিদিন আসরের নামাযের পর লোকজনকে জড়ো করে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাতেন এবং নিয়মিত ওয়াজ করতেন। শ্রোতা একজন হোক বা দশজন, এতে তিনি কোনো পরওয়া করতেন না। শীতকাল হোক বা গ্রীষ্ম। তিনি নিয়মিত ওয়াজ চালিয়ে যেতেন। এভাবে ছাত্রবস্থাতেই পুরো কুরআনের তাফসীর সেখানে শুনিয়েছেন।
তিন. জুমআর দিনকে তিনি উস্তাদদের খিদমতের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। মাওলানা ইয়াকুব সাহেব রহ. এর খিদমতে এক ঘণ্টা, মাওলানা সাঈদ আহমাদ দেহলবী রহ. এর খেদমতে এক ঘণ্টা এবং মাওলানা মানফাআত আলী রহ.-সহ সকল উস্তাদদের এক ঘণ্টা খিদমত করে দিতেন।
চার. তাঁর নামে যেসব চিঠি আসতো, সেগুলো তিনি একটি বাক্সে জমা করে রেখে দিতেন। সারা বছর যেসব চিঠি জমা হতো, সালানা ইমতিহান তথা বার্ষিক পরীক্ষার পর সেগুলো বের করে পড়তেন। দেখা যেতো, কোনোটাতে লেখা অমুকের ইন্তিকাল হয়েছে। অমুকের সন্তান হয়েছে ইত্যাদি। অতঃপর ছুটির অবসরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে কারো সমবেদনা, কারো বাড়িতে মোবারকবাদ জানাতেন। আত্মীয়- স্বজন অনুযোগ করে বলতো, আরে ভাই! আমরা চিঠি লিখেছি, অথচ তুমি কোনো উত্তর দাওনি। উত্তরে হযরত থানবী রহ. বলতেন, আমি তো পড়ালেখার জন্য গিয়েছিলাম। কিতাব পড়াই আমার কাজ ছিলো। চিঠি পড়ার সময় কোথায়? সব চিঠিই আমি একটি বাক্সে রেখে দিয়েছিলাম। বার্ষিক পরীক্ষার পর আমি সেগুলো পড়েছি। তাই এখন আমি আপনাদের খিদমতে হাযির হয়েছি।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. এর পরিশ্রম
হযরত দেহলবী রহ. এর মুতালাআর পরিধি কী পরিমাণ ছিলো, তা তার রচিত গ্রন্থাবলি দেখলেই অনুমান করা যায়।
একদা হযরত দেহলবী রহ. এর সুযোগ্য সন্তান মুতালাআর প্রাক্কালে পানি চাচ্ছেন। তখন আব্বাজান তার মাথা ধরে বললেন, হায় আফসোস! বংশ থেকে ইল্ম উঠে যাচ্ছে। তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে? আপনাকে এতো পেরেশান দেখাচ্ছে কেনো? মুতালাআ করা অবস্থায় পানির প্রতি মনোযোগ যায় কী করে? সে কীরূপ মুতালাআ করছে?
স্ত্রী বললো, এমন তো হতে পারে যে, অনিচ্ছাকৃতভাবে তার মুখ থেকে এটা বের হয়েছে। চলো, পরীক্ষা করে দেখা যাক। খাদেমকে বললো, পানি না দিয়ে গ্লাসে অন্য কিছু দিতে। খাদেম পানি না দিয়ে অন্য কিছু দিলো। সে তা পান করে নিলো। তখন আব্বাজানের আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো।

আল্লামা আবদুর রহমান ইবনে জাওযী রহ. এর পরিশ্রম
আল্লামা জাওযী রহ. প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। মুতালাআয় তার নিমগ্নতা এমন ছিলো যে, জুমআর নামায ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতেন না। মিম্বারে দাঁড়িয়ে একদা বলেছেন, আমি নিজ হাতে দুই হাজার ভলিয়ম (কিতাব) লিপিবদ্ধ করেছি।
হাদীস লেখার সময় কলমের কালি জমা করে রেখেছিলেন। মৃত্যুর সময় অসিয়্যাত করেছিলেন, আমার গোসলের পানি এই কালিগুলো দ্বারা গরম করো। কথিত আছে যে, গোসলের পানি গরম করার পরও এর কিছু কালি বেঁচে গিয়েছিলো।
'সাইয়িদুল খাওয়াতিন' নামক কাব্যগ্রন্থে তিনি লিখেছেন, আমার মন ও তবীয়ত কিতাব মুতালাআ করা ছাড়া অন্য কিছুতে প্রশান্তি লাভ করতো না। যখনই কোনো নতুন কিতাব সামনে আসতো, মনে হতো কোনো গুপ্তধন আমার হাতে এসেছে।
যদি বলি, বিশ হাজার কিতাব আমি মুতালাআ করেছি, তাহলে অত্যুক্তি হবে না। ছাত্রাবস্থায় আমি কিতাবগুলো মুতালাআ করে জানতে পেরেছি সালফে সালেহীনের অধ্যয়ন পদ্ধতি, তাদের আখলাক, চেষ্টা-মুজাহাদা, মুখস্থশক্তি, ইবাদতে একাগ্রতা এবং তাদের দুর্লভ ইলমের পরিধি সম্পর্কে। যা কিতাব মুতালাআ ছাড়া কখনই জানা সম্ভব হতো না।

আল্লামা ইবনে রুশদ রহ. এর পরিশ্রম
আল্লামা ইবনে রুশদ রহ. প্রসিদ্ধ ফকীহ ছিলেন। সারা জীবন তিনি কিতাব মুতালাআ করে কাটিয়েছেন। তিনি নিজ সম্পর্কে বলেন, জীবনে শুধু দুটি রাত কিতাব মুতালাআ করা ছাড়া কাটিয়েছি। ১. বিয়ের রাত। ২. শ্রদ্ধেয় পিতার ইন্তিকালের রাত।

ইমাম মুসলিম রহ. এর গভীর মনোযোগ
'বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন' নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে, একদা ইমাম মুসলিম রহ. হাদীসের কিতাব মুতালাআ করছেন, পাশেই খেজুর ভরা একটি টুকরি ছিলো। কিতাব মুতালাআর মাঝে মাঝে তিনি সেই টুকরি থেকে খেজুর নিয়ে খাচ্ছিলেন। মুতালাআয় এমন গভীর মনোযোগ ছিলো যে, খেজুর খাওয়ার প্রতি তাঁর কোনো খেয়ালই ছিলো না। ফলে এতো প্রচুর পরিমাণ খেজুর খেয়েছেন, যা হজম না হওয়ার কারণে তিনি ইন্তিকাল করেছেন।

মুফতিয়ে আযম মুফতী ফয়যুল্লাহ রহ. এর আগ্রহ
মুফতিয়ে আযম বাংলাদেশ মুফতী ফয়যুল্লাহ রহ. ছাত্র যামানা থেকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত কিতাব মুতালাআ এবং ইলমী মাশগালায় কাটিয়েছেন। কিতাব মুতালাআ করা যেন তার খাবারের ন্যায় প্রিয় ছিলো। অসুস্থ অবস্থায় ডাক্তার মুতালাআ করা থেকে নিষেধ করেছিলো। কিন্তু তিনি মুতালাআ করা থেকে বিরত ছিলেন না।
কিতাব মুতালাআ করার কারণে গৃহে থেকেও তিনি সর্বত্র প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার প্রণীত গ্রন্থাবলি তাঁর মুতালাআর পরিধির উপর সাক্ষ্য বহন করে। হিন্দুস্তানের কোনো একজন বড় আলেম মুফতী সাহেবের ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছেন। পরীক্ষা নেয়ার পর সেই আলেম মন্তব্য করেছিলেন, সম্ভবত ছাত্রটি মুসান্নিফ থেকেও বেশি বুঝেছে।
একদা জনৈক ব্যক্তি মুফতী সাহেবের কাছে পড়া ভুলে যাওয়ার অভিযোগ করলে তিনি জবাবে বললেন, ইনশাআল্লাহ, অধিক মুতালাআর মাধ্যমে তা দূর হয়ে যাবে।

টিকাঃ
৪. হাদায়িকুল হানাফিয়্যাহ: ২/১৩০, ১৫৯।
৫. মাজালিসে ইলম ওয়া যিকর: ১/১৭৪।
৬. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ: পৃষ্ঠা-১৯৫।
৭. তাফহীমাত বরায়ে হাফেজ ওয়া হাফেজাত: পৃষ্ঠা-৪৬।
৮. বড়ু কা বাচপান: পৃষ্ঠা-৮৮।
৯. মাজালিসে ইলম ওয়া যিকর: ১/১৭৪।
১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ: ৮ / ২০৯।
১১. কাশকুল: পৃষ্ঠা-২৩৮।
১২. তালীমুল মুতাআল্লিম: পৃষ্ঠা-৬৬।
১৩. নফহাতুল আম্বার কী হায়াতি ইমামিল আসর আশ শায়েখ আনওয়ার: পৃষ্ঠা- ৪৮-৪৯।
১৪. আকাবিরে দেওবন্দ কেয়া থে: পৃষ্ঠা-৪৩।
১৫. মাজালিসে মুফতীয়ে আযম: পৃষ্ঠা-৬২৪।
১৬. মাতায়ে ওয়াক্ত আওর কারাওয়ানে ইলম পৃষ্ঠা-২৫৫।
১৭. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ : পৃষ্ঠা-২২।
১৮. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ : পৃষ্ঠা-১৯৬।
১৯. তাযকিরাতুস সামি ওয়াল মুতাকাল্লিম: পৃষ্ঠা-৮৮ (দারুল বাশাইর সংস্করণ)
২০. বট্টু কা বাচপান: পৃষ্ঠা-২২,২৩。
২১. কাশকুল: পৃষ্ঠা-৭৪।
২২. উলামায়ে সালাফ: পৃষ্ঠা-২২।
২৩. রহমাতুল লিল মুতাআল্লিমীন: পৃষ্ঠা-৪৬।
২৪. আল জাফ্ট বাইনা রিজালিস সহীহাইন: পৃষ্ঠা-৩৩৬, সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৯/৩৬৭, লিখক শহরের নাম লিখেছেন 'তীস' কিন্তু 'সিয়ারে' 'তিন্নীস' লেখা আছে। তাছাড়া এখানে 'তাহির খিতাব' উল্লেখ আছে। কিন্তু সিয়ারে বলা হয়েছে, তার একজন দোস্ত। (অনুবাদক)
২৫. কাশকুল : পৃষ্ঠা-৭৪।
২৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ: ২/১৩০।
২৭. বট্টু কা বাচপান: পৃষ্ঠা-১১০।
২৮. তাযকিরাতুস সামি' ওয়াল মুতাকাল্লিম: পৃষ্ঠা-১১৫।
৩২. আকাবির কা মুতালাআ।
৩৩. হাকীমুল উম্মাত আওর উনকে মাজালিস: ৭-৯।
৩৪. আদাবুল মুআল্লিমীন।
৩৫. আকাবির কা মুতালাআ।
৩৬. আসলাফ কা যওকে মুতালাআ : ৪৭।
৩৭. আকাবির কা মুতালাআ: ২৪।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 বড়দের সময়ের মূল্যায়ন

📄 বড়দের সময়ের মূল্যায়ন


মানুষকে অল্প সময়ের যিন্দেগী দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে সে যা কিছু রোপণ করবে, পরবর্তী জীবনে সে ওই জিনিসেরই ফসল পাবে। এ দুনিয়া পরকালের শষ্যক্ষেত। অল্পদিনের এ যিন্দেগীর আমলের উপরই নির্ভর করবে পরকালীন সুখ-দুঃখ। এই জীবনের আমলের দ্বারাই সেই যিন্দেগী গঠিত হবে। কবি বলেন,
یہ خاکی اپنی فطرت میں نہ نوری ہے ، نہ ناری
মাটির তৈরি এই মানুষ, নিজ প্রকৃতিতে জান্নাতীও না, জাহান্নামীও না। কিন্তু রং-বেরঙের এ পৃথিবী উদাসীনতার হাজারও উপকরণ নিজের মধ্যে সুসজ্জিত করে রেখেছে। এখানে রয়েছে আলো- ঝলমলের হাজারো প্রদর্শনী, যাতে ডুবে গিয়ে জীবনের মূললক্ষ্য চোখের আড়ালে হারিয়ে যায়। এখানে চলতেই থাকে পিপাসার্ত কর্তৃক মরীচিকা দেখে সমুদ্র মনে করার ধোঁকা। উদাসীনতার এই আবর্ত থেকে বের হয়ে সৃষ্টির মূললক্ষ্যে মানুষের মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা কুরআনে অসংখ্য জায়গায় করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شَكُورًا
তিনিই সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন রাতদিনকে পরস্পর অনুগামী করে সেই ব্যক্তির জন্য, যে উপদেশ গ্রহণ করতে বা কৃতজ্ঞতা আদায় করতে চায়।
কুরআনে কারীমে দিন-রাতের কসমের সাথে সাথে বিভিন্ন সময়ের কসম করা হয়েছে। কোথাও ভোরের, কোথাও পূর্বাহ্ণের, কোথাও আসরের সময়ের কসম করা হয়েছে। মানুষকে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের প্রতি যত্নবান হওয়ার প্রতি গুরুত্ব প্রদানের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন সময়ের কসম খাওয়া হয়েছে।

কেউ সাক্ষাত করতে আসলে ছাত্রদের করণীয়
বস্তুত জীবনে সময়ের সঠিক মর্যাদা ও গুরুত্ব আকাবির বুযুর্গদের অন্তরে পুরোপুরি ছিলো। এতো গুরুত্বের পরও মাঝেমধ্যেই তাদের অন্তরে এই প্রশ্নের উদ্রেগ হতো, অপ্রয়োজনীয় কাজে আমার কোনো সময় নষ্ট হচ্ছে না তো? তাঁরা তাঁদের ছাত্রদের বলতেন, কেউ সাক্ষাত করতে আসলে কেবল সালামের উপর যথেষ্ট করবে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলবেনা। কেননা, সাক্ষাতের সময় প্রচলন হিসেবে সাধারণত ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করা হয়। আর তাতে সময় নষ্ট হয়ে থাকে।

সময়ের প্রতি ইবনে আকীল রহ. এর গুরুত্বারোপ
ইবনে আকীল রহ. ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম এবং হাম্বলী মাযহাবের একজন অন্যতম ইমাম। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সময়ের গুরুত্ব ও মর্যাদার অনুভূতি এবং ইলম অর্জনের প্রবল আগ্রহ ও জযবা দিয়েছিলেন। তিনি নিজের ব্যাপারে বলেন, আমি জীবনের একটা মুহূর্তও নষ্ট করিনি। এমনকি ইলমী আলোচনা করতে করতে আমার যবান যখন ক্লান্ত হয়ে যেতো এবং অধ্যায়ন করতে করতে আমার চোখ যখন অবসাদগ্রস্ত হয়ে যেতো তখন আমি শুয়ে শুয়ে মাসআলা নিয়ে চিন্তা করতাম। বিশ বছর বয়সে ইলমের যে আগ্রহ ও প্রেরণা আমার ভেতর ছিলো, এই আশি বছর বয়সে এসে সেই আগ্রহ-উদ্দীপনায় কোনো ঘাটতি আসেনি, বরং আরও বৃদ্ধি হয়েছে। আমি সাধ্যমত চেষ্টা করতাম, যেনো খাবারে সময় কম ব্যয় হয়। বরং অধিকাংশ সময়ে তো রুটির পরিবর্তে গম-যবের টুকরোগুলো পানিতে ভিজিয়ে খেয়ে নিতাম। কেননা, সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে উভয়ের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। রুটি চিবাতে এবং তা খেতে অনেক সময় লেগে যায়, অথচ টুকরোগুলো পানিতে ভিজিয়ে খেলে অনেক সময় বেঁচে যায়।

একটি মূল্যবান বাণী
আবুল হাসান আলী ইবনে মুহাম্মাদ রহ. তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'আদাবুদ দীনী ওয়াদ দুনিয়া' তে অনেক সুন্দর লিখেছেন। তিনি বলেন-
من تفرد بالعلم لم توحشه الخلوة ومن تسلى بالكتب لم يفته سلوة، ومن آنسه قراءة القرآن لم يوحشه مفارقة الإخوان
অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইলম নিয়ে নির্জনতা অবলম্বন করবে, নির্জনতা তার জন্য ভীতিকর হবে না। যে ব্যক্তি কিতাবকে নিজের সান্ত্বনার উপকরণ বানাবে, সে সান্ত্বনা পাবেই। কুরআন তিলাওয়াত যার প্রিয় হবে, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের বিচ্ছেদ তার দুশ্চিন্তা ও কষ্টের কারণ হবে না।

এক আল্লাহ ওয়ালার ২৪ ঘণ্টার রুটিন
আব্দুল গনী মাকদিসী রহ. এর ছাত্র যিয়াউদ্দীন তাঁর উস্তাদের ২৪ ঘণ্টার রুটিন বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আবদুল গনী মাকদিসী রহ. তাঁর জীবনের একটা মুহূর্তও নষ্ট করিনি। তিনি ফজরের নামায পড়ে সাধারণত কুরআন তিলাওয়াত করতেন, কখনো হাদীসের দরসও দিতেন। তিলাওয়াত ও হাদীসের দরস থেকে উঠে উযু করে যোহরের পূর্ব পর্যন্ত তিন শ রাকাত নফল নামায পড়তেন। এরপর কিছু সময় আরাম করতেন। যোহরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত তিনি শ্রবণ বা লিখনীতে লিপ্ত থাকতেন। রোযা থাকলে মাগরিবের সময় ইফতার করতেন। অন্যথায় ইশা পর্যন্ত নামাযে লিপ্ত থাকতেন। ইশার পর থেকে অর্ধরাত পর্যন্ত আরাম করতেন। তারপর উঠে উযু করে নামাযে লেগে যেতেন। ফজরের সময় পূনরায় উযু করতেন। কখনো কখনো তিনি সাত বারের মত উযু করতেন এবং বলতেন, যখন অঙ্গগুলো সিক্ত থাকে তখন নামায পড়তে আমার আনন্দ অনুভূত হয়। এটা তাঁর সারাজীবনের আমল ছিলো।

আব্দুর রহমান ইবনে আবী হাতিম রহ. এর সময়ের প্রতি যত্মারোপ
ইমাম আবু হাতিম রাযী রহ. এর ছেলে আব্দুর রহমান ইবনে আবী হাতিম রহ. 'জারহ ও তাদীল' এর ইমাম ছিলেন। তিনি বলেন, কখনো এমন হয়েছে যে, আব্বাজান খানা খাচ্ছেন আর আমি তাঁর কাছে পড়ছি। তিনি রাস্তায় চলছেন আর আমি তাঁর কাছে পড়ছি। তিনি প্রাকৃতিক ডাকে টয়লেটে যাচ্ছেন আর আমি তাঁর কাছে পড়ছি।
তিনি আরো বলেন, ছাত্র যামানায় একবার 'মিসরে' সাত মাস ছিলাম। শাইখদের দরসে বসার জন্য দিনের পুরো অংশের রুটিন ছিলো। তাই পুরো দিন পড়তাম আর রাতে লিখতাম।
একদিন আমি ও আমার এক সাথী সময়মতো এক শাইখের মজলিসে পৌঁছলাম। পৌঁছে বুঝতে পারলাম শাইখ অসুস্থ। দ্বিতীয় দরসের সময় যেহেতু বিলম্বে, তাই আমি একটি মাছ ক্রয় করে ঘরে রওয়ানা করছিলাম। ইতিমধ্যে পরবর্তী হাদীসের মজলিসের সময় হয়ে গেছে। মাছ রেখে আমি মজলিসে হাযির হয়ে যাই। তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে কিন্তু মাছ পাকানোর সুযোগ হয়নি। পাকানোর অবসর পাব না বলে সেই মাছটি আমি কাঁচা খেয়ে নিয়েছি। এই ঘটনা শুনিয়ে আব্দুর রহমান রহ. বলতেন,
لا يستطاع العلم براحة الجسم
ইলম শারীরীক আরামের সাথে কখনো অর্জন হতে পারে না।

চরম বাস্তব একটি কথা
বাস্তব কথা হলো, মানুষের যিম্মায় কাজ অনেক অনেক বেশি, সেই তুলনায় সময় অনেক কম। মানুষের ভবিষ্যত সম্ভাব্য, বর্তমানের স্থায়িত্ব নেই, আর অতিত তা তো তার সাধ্যের বাইরে। যে ব্যক্তি এখন থেকে কাজ শুরু করে দেবে, মেহনত-মুজাহাদা চালু রাখবে এবং নিজের দুনিয়া নিজ হাতে তৈরি করবে তার ভাগ্যে কিছুটা জুটবে। অন্যথায় এই কালাবর্তের সংকীর্ণ প্রান্তের কোনো চিকিৎসা নেই। কারো জন্য তা থেমে থাকে না এবং চলে যাওয়ার পর ফিরিয়ে আনাও সম্ভব হয় না।

ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. এর সময়ের মূল্যায়ন
একবার হযরত ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহ. একটি হাদীস শোনার জন্য মুহাম্মাদ ইবনে ফযল রহ. এর কাছে গিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে ফযল রহ. বর্ণনা করা শুরু করলেন, 'হাদ্দাসানা মুহাম্মাদ ইবনে সালামাহ... ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বললেন, যদি আপনি কিতাব দেখে বর্ণনা করতেন তাহলে ভালো হতো। মুহাম্মাদ ইবনে ফযল রহ. যদিও বিশ্বস্ত এবং গ্রহণযোগ্য রাবী, তবুও ইবনে মাঈন রহ. সতর্কতার জন্য এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য এ চাহিদা প্রকাশ করেছেন। মুহাম্মাদ ইবনে ফযল তার এই দাবীকে অপছন্দ করেননি। বরং ঘর থেকে কিতাব আনার জন্য উঠে যাওয়া শুরু করলেন।
প্রথম যুগের মুহাদ্দিসগণ মসজিদে হাদীসের দরস দিতেন। যদি উপস্থিতি এতো বেশি হতো যে, মসজিদে সংকুলান হচ্ছে না, তখন তারা বড় কোনো স্থানে দরস দিতেন। আর যদি উপস্থিতি কম হতো, তাহলে ঘরেই দরস দিতেন। ইবনে মাঈন রহ. ঘরের দরজায় বসে হাদীস শুনছিলেন। যখন মুহাম্মাদ ইবনে ফযল রহ. কিতাব আনার জন্য উঠতে উদ্যত হলেন, তখন ইবনে মাঈন রহ. তার কোর্তা আকড়ে ধরে বললেন, আপনি কিতাব আনা পর্যন্ত জীবিত থাকবেন কিনা জানি না, প্রথমে মুখে শুনিয়ে যান। তারপর কিতাব থেকে পুনরায় পড়িয়ে দিয়েন।

দুটি মূল্যবান বাণী
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. হাসান বসরী রহ. এর দুটি বক্তব্য বর্ণনা করেছেন।

প্রথম বাণী
ادركت أقواما كان أحدهم أشح على عموم منه على دراهمه ودنانيره
আমি এমন লোকদের [সাহাবায়ে কিরামগণ] পেয়েছি, যাঁরা দীনার- দিরহামের চেয়ে নিজেদের জীবনের মুহূর্তগুলোর প্রতি অধিক কৃপণ ছিলেন।

দ্বিতীয় বাণী
يا ابن آدم إياك والتسويف، فإنك بيومك ولست بغد، وإن يكن غد لك فكس في غد كما كست في اليوم، وإلا يكن لك لم تندم على ما فرطت في اليوم
হে আদম সন্তান! কালক্ষেপণ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, আজকের দিন তোমার কাছে সুনিশ্চিত, কালকের দিন অনিশ্চিত। যদি কালকের দিন পেয়েও যাও, তাহলে কালকের দিনও এমন হয়ে যাবে, যেমন আজকের দিন হয়েছে। [এই দিনের ব্যাপারে এটা বিশ্বাস করে নাও যে, এই আজকের দিনটি আমার কাছে আছে। কালকের দিন আমার কাছে নেই। যদি কালকের দিন এসেও যায়, তাহলে এতটুকু আক্ষেপ তোমার হবে না যে, আমি গতকালকে নষ্ট করেছিলাম।]

হাফেয মুনযিরী রহ. এর ইলমী ব্যস্ততা
নাম আব্দুল আযীম। দুনিয়াবাসীর কাছে তিনি 'হাফেয মুনযিরী' নামে প্রসিদ্ধ। ৫৭1 হিজরীতে তিনি মিসরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতেই ৬৫৬ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। হাফেজ মুনযিরী রহ. সপ্তম শতাব্দীর বড় মাপের একজন মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি কায়রোর প্রসিদ্ধ 'দারুল হাদীস কামিলা' মাদরাসায় বিশ বছর পর্যন্ত হাদীসের শাইখ ছিলেন।
যেখানে থেকে পড়ালেখা করতেন, সেখান থেকে মোটেই বের হতেন না। কাউকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্যও যেতেন না। কাউকে অভিনন্দন ও আনন্দ দানের জন্যও যেতেন না। পুরো জীবন একটি জিনিসকেই আপন করে নিয়েছিলেন এবং নিজের প্রিয় জীবনটিকে তাতেই ব্যয় করেছেন। তাঁর প্রিয়বস্তুটি হচ্ছে, ইলমী ব্যস্ততা।
আশ্চর্যের কথা হলো, তাঁর ছেলে রশীদুদ্দীন যখন ইন্তিকাল করলেন, যিনি একজন মযবুত আলেম ছিলেন, তখন তার জানাযা তিনি মাদরাসাতেই পড়িয়েছেন। এরপর যখন জানাযা উঠানো হয়েছে, তখন তিনি মাদরাসার দরজা পর্যন্ত এসে অশ্রুসজল চোখে বললেন, ‘যাও বৎস, এবার তুমি আল্লাহর কাছে ন্যস্ত।’ এই কথা বলেই তিনি সেখান থেকে চলে আসলেন। মাদরাসার দরজা থেকে বের হলেন না।

একটি চিঠি
ইবনে আকীল রহ. এক চিঠিতে লিখেন যে,
وَأَنْ أَجَلَّ تحصيل عند العقلاء بإجماع العلماء هو الوقت فهو غنيمة تنتهز فيها الفرص فالتكاليف كثيرة والأوقات خاطفة.
সকল আলেম এবং জ্ঞানীগণ এ কথার উপর একমত যে, মানুষের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো- সময়, যা মেপে মেপে তার ব্যয় করা উচিত। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সমন্বয়কারী সময় মূলত অনেক বড় গনীমত। তাই তার কদর করা উচিত। কেননা, মানুষের দায়িত্বে কাজ অনেক বেশি, অথচ সময় এমন যে, দ্রুত লাফিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে যিনি স্বর্ণ বানানো শেখার কথা ভুলেই গেছেন
মাওলানা রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ. বলেন, আমি আব্দুল গনী রহ. এর কাছে পড়ার সময় আমার খানা আনা-নেওয়ার রাস্তায় একজন মাজযুব [আল্লাহর পাগল] ব্যক্তি থাকতেন। একদিন তিনি আমাকে বললেন, মৌলবী, প্রতিদিন তুমি এ রাস্তা ধরে কোথায় যাও? অন্য কোনো রাস্তা নেই? আমি বললাম, খাবার আনতে যাই। অন্য রাস্তায় বাজার পড়ে আর বাজারে বিভিন্ন ধরনের জিনিসে আমার দৃষ্টি পড়ে। এই জন্য আমি এই রাস্তা ধরে যাতায়াত করি।
তিনি বললেন, তুমি হয়তো আর্থিক সংকীর্ণতা এবং ব্যয়ভারের কষ্টের শিকার। এক সময় তুমি আমার কাছে আসবে, আমি তোমাকে স্বর্ণ বানানো শেখাবো।
গাংগুহী রহ. বলেন, অমুক সময় আসবো বলে চলে এসেছি। কিন্তু পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে তার কথা ভুলেই গিয়েছি। দ্বিতীয় দিন সেই মাজযুব আবার স্মরণ করিয়ে দিলে আমি বললাম, 'পড়ার কারণে সময় পাইনি, জুমআর দিন সময় বের করে আসবো। জুমআর দিনও পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে স্মরণে ছিলো না। মাজযুবের সাথে আবার সাক্ষাত হলে তিনি বললেন, তুমি তো ওয়াদা মাফিক আসলে না।
আমি ভুলে যাওয়ার উযর পেশ করলাম এবং পরের জুমআয় আসার ওয়াদা করলাম। কিন্তু আমি কী করবো, মুতালাআর ব্যস্ততার কারণে জুমআর দিন মনেই থাকতো না। এভাবে কয়েক জুমআ অতিবাহিত হওয়ার পর শেষে এক জুমায় তিনি নিজেই আমার কাছে চলে আসলেন। আর আমাকে শাহ নিযামুদ্দীনের দরগাহের কাছে নিয়ে এক প্রকারের ঘাস দেখালেন এবং যে সকল স্থানে এই ঘাস উদাত হয়, সেগুলোও দেখালেন। তারপর সেই ঘাস ছিঁড়ে এনে আমার সামনে স্বর্ণ বানালেন। অতপর সেই স্বর্ণ আমাকে দিয়ে বললেন, এটা বিক্রয় করে নিজের প্রয়োজন পূরণ করবে।
কিন্তু কিতাব মুতালাআ থেকে আমি এতোটুকু অবসর পাচ্ছিলাম না যে, বাজারে গিয়ে সেই স্বর্ণ বিক্রয় করবো। তারপর একদিন সেই মাজযুব এসে স্বর্ণ বিক্রয় করে আমাকে টাকা দিয়ে গিয়েছেন।

ছেলের কাছে বাবার চিঠি
ইবনুল জাওযী রহ. নিজের ছেলের জন্য একটি উপদেশনামা লিখেছিলেন। তিনি তার নাম দিয়েছেন 'লাফতাতুল কাবিদ ফী নসীহাতিল ওয়ালাদ'। সময়ের গুরুত্ব এবং জীবনের মাহাত্ম ও গুরুত্ব নিয়ে সে কিতাবে তিনি লিখেছেন, প্রিয় বৎস! জীবন তো কিছু ঘণ্টার সমষ্টি। আর কিছু ঘন্টা কিছু মিনিটের সমষ্টি। জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস আল্লাহ প্রদত্ত নিআমত। অতএব প্রতিটি নিঃশ্বাসকে মূল্যায়ন করা উচিত। একটি মুহূর্তও যেনো কোনোভাবেই অনর্থক নষ্ট না হয়। অন্যথায় কিয়ামতের দিন জীবনের খাযানা খালি দেখে অনুতাপের অশ্রু প্রবাহিত করতে হবে। প্রতিটি মুহূর্ত কোথায় ব্যয় হচ্ছে তার হিসাব রাখা উচিত। প্রতিটি মিনিটকে উপকারী কাজে ব্যয় করার প্রচেষ্টায় থাকবে। জীবনকে অযথা অতিবাহিত করা থেকে বেঁচে থাকবে এবং কাজ করার অভ্যাস গড়বে। তাহলে তুমি তোমার ভবিষ্যত উজ্জ্বল দেখতে পাবে।

একটি আয়াত বোঝার জন্য এক শ তাফসীর অধ্যায়ন
আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী রহ. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর দাদা মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রহ. এর আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, তিনি জীবনের একটি মুহূর্তও নষ্ট হতে দিতেন না। তাঁর মধ্যে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপকারী কাজে ব্যয় করার গুরুত্ব এতো বেশি ছিলো যে, নিজের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণে যাওয়া সময় কোনো ছাত্রকে বলে যেতেন, তুমি কিতাব এতটুকু জোরে পড়ো, যেনো আমি শুনতে পাই, যাতে সময় নষ্ট না হয়। এই মাজদুদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রহ. এর নাতী তাকীউদ্দীন ইবনে তাইমিয়া রহ. কী বলে শুনুন-
ربما طالعت على الآية الواحدة نحو مأة تفسير، ثم أسأل الله الفهم وأقول: يا معلم آدم وأبراهيم علمني، وكنت أذهب إلى المساجد المهجورة ونحوها وأمرغ وجهي في التراب وأسأل الله تعالى وأقول يا معلم إبراهيم فهمني..
আমি কখনো একটি আয়াত বোঝার জন্য একশ তাফসীর অধ্যয়ন করতাম। এরপর আল্লাহর কাছে সেই আয়াতের বুঝ চাইতাম। আমি বলতাম, হে আদম ও ইবরাহীম রহ. এর শিক্ষক, আপনি আমাকে শেখান। আমি বিরাণ মসজিদে গিয়ে চেহারায় মাটি মর্দন করে বলতাম, হে ইবরাহীম রহ. এর শিক্ষক, আমাকে বুঝ দিন।

সময় বাঁচাবেন কীভাবে
ইবনুল জাওযী রহ. বলেন, সময়কে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানো তখনই সম্ভব, যখন অন্তরে সময়ের গুরুত্ব থাকবে। প্রত্যেকের এমন একটি রুটিন থাকা উচিত, যাতে বিভিন্ন কাজগুলো গুরুত্বের বিচারে ধারাবাহিকভাবে বণ্টন করা থাকবে। আমাদের সালাফগণ প্রিয় জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলোর অনেক বেশি গুরুত্বারোপকারী ছিলেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী আমির ইবনে আবদুল কাইস রহ. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, একবার এক ব্যক্তি তাঁর সাথে কথা বলতে চেয়েছেন। উত্তরে তিনি বলেছেন, সূর্যের চলন বন্ধ করো, তাহলে আমি তোমার সাথে কথা বলার জন্য সময় বের করবো!!

স্ত্রীর কাফন দাফনের কাজ শেষ করেই আবার দরসে উপস্থিত
হযরত মাওলানা ইযায আলী রহ. ৪৫ বছর দারুল উলূম দেওবন্দের উস্তাদ ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ইন্তিকাল করার পর, আসরের সময় দাফন সম্পন্ন হয়। ইযায আলী রহ. তখন মাগরিবের পর শামাইলে তিরমিযীর দরস দিতেন। সেদিনও বগলের নিচে কিতাব নিয়ে মাগরিবের পর দরসে উপস্থিত হয়েছেন। উপস্থিত লোকজন তাঁকে অনেক বলেছে। এমনকি মিনতি-তোষামোদ করেছে। কিন্তু তিনি বলেছেন, আমি তো আমার দায়িত্ব আদায় করবোই। হাদীস শেখানো থেকে বড় কাজ আর কী হতে পারে?!

উভয় জগতের মূল সম্পদ
ডাক্তার আব্দুল হাই আরেফী রহ. বলেন, সত্য কথা হলো, সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। বরং তুমি এটা বুঝতে পার যে, দীন ও দুনিয়ার মূল সম্পদই হচ্ছে এই সময়। যে ব্যক্তি সময় কাজে লাগাবে, তার দীনেরও উপকার হবে, দুনিয়ারও উপকার হবে।

ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. এর সময় সংরক্ষণ
ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. সময়ের মূল্য ও মর্যাদা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, সময় মানুষের মূল্যবান সম্পদ। একে ভালো ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করার গুরুত্ব এমন বিষয় নয়, যেটা প্রমাণ করার জন্য দলীল প্রয়োজন। এই জন্য মানুষের সাথে অনর্থক সাক্ষাত একেবারেই অপছন্দনীয়। মানুষ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকাও অনুচিত। কেননা, সাক্ষাত ও যোগাযোগ না থাকলে পারস্পরিক আন্তরিকতা, সম্প্রীতি সমূলে নিঃশেষ হয়ে যায়। আবার অনর্থক সাক্ষাতেও সময় নষ্ট হয়। এ জন্য আমি একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেছি, প্রথমে তো সাক্ষাত থেকে বাঁচার জন্য আমার সাধ্যমত চেষ্টা করি। যদি কারো সাথে সাক্ষাত ব্যতীত কোন উপায় না থাকে, তাহলে আমি কথাবার্তা একেবারেই সংক্ষেপ করে নিই। তা ছাড়া আমি এধরনের মুহূর্তগুলোর জন্য এমন কাজ রেখে দিই, যেগুলোতে বেশি মনোযোগের প্রয়োজন পড়ে না। যেমন, কলমের অগ্রভাগ কাটা [বাঁশের কলমের অগ্যভাগ কাটা লাগে লেখার প্রয়োজনে], কাগজ কাটা এবং অন্যান্য সহজ কাজ আমি সাক্ষাতের সময়ে করি। এভাবে আমার সাক্ষাতও হয়ে যায় এবং কাজও পূর্ণ হয়ে যায়।
সময়ের মূল্যায়ন আর মেহনতের বরকতেই আল্লাহ তাআলা ইবনুল জাওযী রহ. থেকে এতো অধিক পরিমাণে কাজ নিয়েছেন যে, আজ যদি কেউ তার লিখিত গ্রন্থগুলো শুধু লিখে কপি করতে চায়, তবে পুরো জীবনেও হয়তো করতে পারবে না। জীবনের বিভিন্ন ধাপ পরিবর্তন হলেও তার ইলম অন্বেষণের আগ্রহ পরিবর্তন হয়নি। বরং যৌবনকালে সেই আগ্রহ যেমন যুবক ছিলো, বার্ধক্য বয়সেও ঠিক তেমনই যুবক ছিলো। দুর্বলতা এবং বার্ধক্যের পরিবর্তিত স্রোত তাতে কোন ধরনের প্রভাব ফেলেনি। এমনকি বয়স যখন আশির ঘর অতিক্রম করছে, সেই সময়ও ইলম অন্বেষণের আগ্রহের এ অবস্থা ছিলো যে, নিজের ছেলের সাথে 'ওয়াসিত' নগরীতে আল্লামা বাকিল্লানী রহ. এর কাছে হাদীস পড়া শুরু করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
৩৮. সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬২।
৩৯. মাতায়ে ওয়াক্ত আওর কারাওয়ানে ইলম: পৃষ্ঠা-২১৫।
৪০. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলা: ১/১৪৫-১৪৬।
৪১. আদাবুদ দীনি ওয়াদ দুনিয়া: পৃষ্ঠা-৬৮।
৪২. তাযকিরাতুল হুফফাজ: ৪/১৩৭৪।
৪৩. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৩/২৬৬।
৪৪. শামাইলে তিরমিযী: পৃষ্ঠা-৫।
৪৫. আয যুহদ ওয়ার রাকাইক: পৃষ্ঠা-১০৮। দারুল মিরাজ সংস্করণ।
৪৬. তাবাক্বাতুল কুবরা, ইমাম সুবকী রহিমাহুল্লাহু: ৫/১০৯।
৪৭. যাইলু তাবাক্বাতিল হানাফিয়্যাহ: ১/১৪৬,১৪৯।
৪৮. আপবীতী: ২/৮১।
৪৯. কীমাতুয যামান ইনদাল উলামা : পৃষ্ঠা-৬২।
৫০. যাইলু তাবাকাতিল হানাবিলাহ: ২/২৪৯।
৫১. আল উকুদুদ দুররিয়‍্যাহ : পৃষ্ঠা-২৬।
৫২. সাইদুল খাতির: পৃষ্ঠা-১৫।
৫৩. খাযীনা: পৃষ্ঠা-১৪১।
৫৪. মাআসিরে হাকীমুল উম্মাত: পৃষ্ঠা-৩৬৭।
৫৫. কীমাতুয যামান ইনদাল উলামা : পৃষ্ঠা-৫৯।
৫৬. মাতায়ে ওয়াক্ত আওর কারওয়ানে ইলম: পৃষ্ঠা-২১০।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 উস্তাদের খিদমত ও তাঁদের প্রতি আদব প্রদর্শন

📄 উস্তাদের খিদমত ও তাঁদের প্রতি আদব প্রদর্শন


আরবী প্রসিদ্ধ একটি বাক্য আছে, العلمكلهأدب -ইলম পুরোটাই আদব। সব যুগে যেসব মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুফতী ইলমের মাধ্যমে জগতের খেদমত করে গেছেন, তাঁরা সকলেই উস্তাদের আদব ও ইহতিরাম করেই সমাদৃত হয়েছে। হযরত আলী রা. বলেছেন, আমি সেই ব্যক্তির গোলাম, যিনি আমাকে একটি হরফ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে আমাকে বিক্রিও করে দিতে পারেন, ইচ্ছা করলে গোলাম হিসাবে নিজের কাছে রেখেও দিতে পারেন।
প্রিয় পাঠক! উস্তাদের সাথে আদব ও ইহতিরাম একজন তালিবুল ইলমকে সফলতার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। এসব মুআদ্দাব ছাত্ররাই পরবর্তী জীবনে দীন প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তাঁদের দ্বারাই হাজারো পথহারা মানুষ সুপথের সন্ধান পায়। তাঁরা যমীনের নক্ষত্রের মতো, অসংখ্য মানুষের চলার পথে আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করে। তাঁদের সংশ্রবে এমন যাদু এবং প্রভাব থাকে যে, তাঁদের স্বল্প সোহবতে লাখো মানুষ গুনাহের জীবন থেকে তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। তাঁদের অন্তরদৃষ্টির কারণে অসংখ্য জটিল জটিল মাসআলা হল হয়ে যায়।
আকাবিরে দেওবন্দ; মাওলানা কাসিম নানুতুবী রহ., হযরত মাওলানা রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ., হযরত মাওলানা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহ., হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. ও হযরত মাদানী রহ. এর মতো বড় বড় হাস্তিগণ উস্তাদের খেদমত ও আদবের কারণেই বড় হয়েছেন। আজও যদি তালিবে ইলমরা আসাতিযায়ে কিরামের সম্মান ও আদব করে, তাহলে তারাও ভবিষ্যতে সারা বিশ্বের আদর্শ ও ইমাম হবে। ইনশাআল্লাহ।

উস্তাদের সাথে আদব বজায় রাখার বরকত
মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ 'মাআরিফুল কুরআন' এ লিখেছেন, সূরায়ে হুজুরাতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা যে আদব শিক্ষা দিয়েছেন, তা কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য নয়, বরং সমস্ত বুযুর্গ আলেমদের জন্যও প্রযোজ্য। যে আদব ও ইজ্জত-সম্মান মূল ব্যক্তির জন্য হয়, তার প্রতিনিধীদের জন্যও তা-ই হয়। এ কথার পক্ষে আল্লামা আলুসী রহ. প্রমাণ পেশ করেছেন,
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর কাছে 'ফন্নে কিরাআত' পড়ার জন্য যেতেন। হযরত উবাই ইবনে কাআব এতো বড় মাপের কারী ছিলেন যে, তাঁর উপাধী ছিলো 'সাইয়িদুল কুররা' [কিরাআত সম্রাট]। হযরত উমর রা.-ও তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁর ব্যাপারে ওহী নাযিল হয়েছে, হে নবী! আপনি উবাই ইবনে কাআব এর কাছে গিয়ে সূরা বাইয়িনা তিলাওয়াত করুন। এর কী কারণ? এর কারণ হচ্ছে, এ সূরায় ইয়াহুদী আলেমদের আলোচনা এসেছে। আর তিনি ছিলেন একজন ইয়াহুদী আলেম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, হে উবাই! আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন তোমার কাছে এসেযেনো আমি সূরা বাইয়িনা তিলাওয়াত করি। হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা কি আমার নাম নিয়েছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা তোমার নাম নিয়েছেন। এই কথা শোনামাত্রই হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর চোখ থেকে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
বলছিলাম, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. এর কাছে কুরআনে কারীম পড়ার জন্য যেতেন। কিরাআত শেখার জন্য যেতেন। একদা ইবনে আব্বাস রা. তাঁর বাড়ীতে গিয়ে দেখে, দরজা বন্ধ। তিনি দরজায় কড়া নাড়াননি। চৌকাঠে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হযরত উবাই ইবনে কাআব রা. ঘুম থেকে উঠে ধীরে সুস্থে উযু করলেন। অতঃপর ঠাণ্ডা মাথায় দরজা খুলে দেখেন, দরজার সামনে একজন লোক বসা। কে সেই লোক? রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচাতো ভাই, সাইয়িদুনা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ওহে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস! আপনি নবী আলাইহিস সালাম এর চাচাতো ভাই। আপনার মতো মহান ব্যক্তি এভাবে চৌকাঠে বসলে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। আপনি দরজায় কড়া নাড়লেই তো আমি দরজা খুলে দিতাম।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বললেন, কস্মিনকালেও এমন হতে পারে না। কিছুতেই আমি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করতে পারি না। আল্লাহ তাআলা সূরা হুজুরাতে যে আদব শিখিয়েছেন, তা হক্কানী উলামায়ে কিরামের জন্যও। এ জন্যই আমি আপনার দরজায় কড়া নাড়িনি।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ . لَا يَعْقِلُونَ، وَلَوْ أَنَّهُمْ صَبَرُوا حَتَّى تَخْرُجَ إِلَيْهِمْ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ)
[হে রাসূল!] যারা আপনাকে হুজরার বাইরে থেকে ডাকে, তাদের অধিকাংশেরই বুদ্ধি নেই। আপনি বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত যদি তারা ধৈর্য ধারণ করতো, তাহলে তা-ই তাদের জন্য মঙ্গল হতো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এ জন্য আমি নির্বুদ্ধিতা করিনি। আমি সেই ধৈর্য ধরতে চেয়েছি, যার প্রশংসা স্বয়ং আল্লাহ পাক করেছেন। আমি সেই কল্যাণ কীভাবে ছাড়তে পারি, যার কথা আল্লাহ তাআলা বলেছেন।
আপনি আলেমে দীন। নায়েবে নবী। আপনার সাথে সেই আদব আমি বজায় রাখার চেষ্টা করেছি, যার কথা আল্লাহ তাআলা সূরা হুজুরাতে বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা আলুসী রহ. বলেন, এই ঘটনা আমি শৈশবেই পড়েছি। আলহামদু লিল্লাহ, এর পর সারা জীবন এই আদবের উপর চলেছি। কখনো উস্তাদের দরজায় আঘাত করিনি।
তিনি বলেন, বুযুর্গদের সাথে আদব রক্ষা করা কখনো তোমাকে এমন মাকামে পৌঁছে দেবে, যে মাকামে এক শ বছর তাহাজ্জুদ পড়েও তুমি পৌঁছতে পারবে না।
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে বললেন, বসে যাও। সাথে সাথে সকল সাহাবী বসে গেলেন। মজলিস শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দরজার দিকে গেলেন, সেখানে তিনি দেখতে পেলেন, একজন সাহাবী এমনভাবে বসে আছেন যে, এক পা ভেতরে আরেক পা চৌকাটের বাইরে। দরজার মাঝে তিনি বসে আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এভাবে বসে আছো কেনো? সাহাবী বললেন, আপনি যখন বসার আদেশ দিয়েছিলেন তখন আমার এই অবস্থা ছিলো। হুকুম শোনার পর আমার ভয় হলো, ভেতরের পা যদি সামনে অগ্রসর করি, তাহলে না জানি নাফরমানী হয়ে যায় আর বাইরে পা যদি ভেতরে প্রবেশ করি, না জানি অবাধ্যতা হয়ে যায়। এই জন্য যে অবস্থায় ছিলাম সেই অবস্থায় বসে গিয়েছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে মজলিস থেকে বের হয়ে বকরীর পালের কাছে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন হযরত আবু দারদা রা. বসে আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে বসে আছো কেনো? আবু দারদা রা. বললেন, আমি শুনতে পেয়েছি, আপনি বলেছেন, বসে যাও। এ আদেশ শুনে আমি সাথে সাথে বসে গিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো মসজিদে অবস্থানরতদের আদেশ করেছি। তিনি বললেন, আপনার হুকুম শোনার পর আমি এই চিন্তা করিনি যে, এটা মসজিদে অবস্থানরতদের জন্য, না বাইরে অবস্থানরতদের জন্য।

বেয়াদবীর পরিণতি
হযরত আলী রা. ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কিছু স্বর্ণ পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো চারজন ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। তারা হলেন, ১. আকরা বিন হাবিস হানযালী, ২. মুজাশায়ী, ৩. উয়াইনা বিন বদর ফাযারী ও ৪. যায়িদ তায়ী।
এতে কুরাইশ ও আনসারের লোকেরা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলতে লাগলো, আমাদেরকে রেখে নজদের সরদারদেরকে দেওয়া হলো কেনো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাদের হৃদয়গ্রাহী করার জন্য দিয়েছি। এরই মধ্যে একজন ব্যক্তি, যার চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, কপাল উত্থিত, দাড়ি ঘন, মাথার চুল মুণ্ডানো, ওই লোক বলে উঠলো, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমিই যদি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী করি, তাহলে তাঁর আনুগত্য করবে কে? আল্লাহ তাআলা আমাকে আমীন [বিশ্বস্ত] বানিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তোমরা আমাকে বিশ্বস্ত আমানত মনে করো না।
উক্ত ব্যক্তির এই বেয়াদবীর কারণে এক সাহাবী তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে অনুমতি দেননি। তাঁকে বাধা দিয়েছেন। অতঃপর যখন সেই ব্যক্তি মজলিস থেকে উঠে চলে যেতে লাগলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারপর তার কওম থেকে এমন একটি জামাআত সৃষ্টি হবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। দীন থেকে তারা এমনভাবে বের হয়ে যাবে, যেভাবে তীর কামান থেকে বের হয়ে যায়। তারা মুসলমানদের হত্যা করবে, মূর্তিপূজারীদেরকে ছেড়ে দেবে, তাদেরকে কিছুইকরবে না। আমি যদি তাদেরকে পাই, তাদের আবির্ভাব পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তাহলে তাদেরকে হত্যা কর সাফ করে ফেলবো, যেভাবে আল্লাহ তাআলার আযাব আদ সম্প্রদায়কে মেরে সাফ করে দিয়েছে।
হাদীসের উক্ত ঘটনা থেকে বোঝা গেলো, যে সব লোক বড়দের এবং বুযুর্গদের জায়িয এবং হেকমতপূর্ণ কাজে আপত্তি করবে, সমালোচনা করবে, তাদের দুনিয়াবী শাস্তি হলো, তাদের সন্তানরা বদ- দীন এবং গোমরা হবে। এই জন্য কোনো ব্যক্তি যদি চায়, তার সন্তান ইসলামের উপর অবিচল থাকুক, বদ-দীন এবং গোমরাহ না হোক, তার উচিত, স্বীয় আকাবির ও বুযুর্গানে দীনের কাজে আপত্তি না করা ও তাঁদের সাথে বেয়াদবী না করা।
অন্য এক হাদীসের সারমর্ম হলো, নামাযের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যদি ইমামের আগে রুকু সাজদা করে, অথবা ইমামের আগে কোনো রুকন আদায় করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার আকৃতি গাধার আকৃতির ন্যায় করে দেবেন।
এক আলেম এই হাদীস পড়ার পর তাঁর অন্তরে শয়তান এই কুমন্ত্রণা দিলো যে, এটা কীভাবে হতে পারে? একবার পরীক্ষা করার জন্য জেনে-বুঝে ইমামের আগে রুকু সিজদা করে ফেললো। ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর আকৃতি গাধার আকৃতির ন্যায় করে দেন।
সেই আলেম অত্যন্ত আফসোস এবং লজ্জার কারণে নেকাব পরিধান করে হাদীস পড়াতে লাগলেন। এক বছর পর যখন ছাত্ররা ফারেগ হয়ে চলে যাওয়ার সময় হলো, তখন ছাত্ররা আবেদন করলো, উস্তাদে মুহতারাম! আমরা এক বছর যাবত আপনার কাছে হাদীস পড়েছি, কিন্তু এ দীর্ঘ সময় আপনার দর্শন থেকে বঞ্চিত ছিলাম। আজ বিদায়ের প্রাক্কালে আপনার দর্শন লাভে ধন্য হতে চাই।
এ আবেদন শোনার পর উস্তাদ কেঁদে ফেললেন। কেঁদে কেঁদে বললেন, তোমরা কখনো সহীহ হাদীসের ব্যাপারে সন্দেহ সংশয় করবে না। হাদীসের সাথে বেয়াদবী করবে না। আমি একবার এক হাদীসের ব্যাপারে সংশয় করেছিলাম, যার ফলে আল্লাহ তাআলা আমার আকৃতি বিকৃত করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে, আমাদের বংশধরকে বেয়াদবী থেকে বেঁচে বুযুর্গানে দীনের সম্মান ইজ্জত ও তাঁদের সাথে আদব বজায় রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন। সুম্মা আমীন।

উস্তাদের সামনে বসার আদব
১. উস্তাদের সামনে অত্যন্ত বিনয় ও আদবের সাথে বসবে।
২. সবসময় উস্তাদের কাছাকাছি জায়গায় বসার চেষ্টা করবে। যাতে উস্তাদের কথা স্পষ্টভাবে শোনা যায়। তবে এতো কাছে বসবে না, যা বেয়াদবীর মনে গণ্য হয়। কমপক্ষে দুই থেকে তিন ফিট দূরত্বে বসবে।
৩. পূর্ণ মনোযোগের সাথে বসবে। চোখ কান খোলা রাখবে। মনোযোগ পূর্ণ উস্তাদের দিকে রাখবে। এদিক সেদিক তাকাবে না। এটা বেয়াদবী।
৪. এক কথা যেনো উস্তাদকে দ্বিতীয় বার বলতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখবে। পূর্ণ মনোযোগ উস্তাদের দিকে রাখবে। হযরত কাতাদা রহ. বলেন, আমি কখনো কোনো কথা দ্বিতীয় বার বলার জন্য উস্তাদকে বলিনি। যখনই কোনো কথা আমার কানে এসেছে, সাথে সাথে তা আমি মুখস্থ করে নিয়েছি। কোনো কথা যেনো না ছুটে, সেদিকে আমার পূর্ণ দৃষ্টি থাকতো।
৫. উস্তাদের সামনে কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে বা টেক লাগিয়ে বসবে না। এটা চরম বেয়াদবী। আল্লামা শরীক রহ. এর দরসে খলীফা মাহদীর এক ছেলে বসতো। সে একদা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে শাইখ শরীককে এক হাদীসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো। শরীক তার দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করলেন না। ছেলে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলো, তখনও কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন না। অতঃপর সেই ছেলে বললো, আপনি খলীফার সন্তানকে অপমান করছেন। শাইখ শরীক রহ. বললেন, দীনী ইলম তার চেয়েও অধিক মূল্যবান। আমি ইলমকে অসম্মানী করতে পারি না। অর্থাৎ, হেলান দিয়ে প্রশ্ন করা ইলমের আদবের পরিপন্থী।
৬. দরসে জামার হাতা গুটিয়ে বসা বেয়াদবী। এমনিভাবে শরীরের কোনো অঙ্গ নিয়ে খেলা করা, দাঁত খিলাল করা, নাক পরিষ্কার করা, দরসে বসে পা নাড়ানো ইত্যাদি বেয়াদবী। এসব বেয়াদবী থেকে বেঁচে থাকবে।
৭. উস্তাদের সামনে এক ছাত্র অপর ছাত্রকে ধমক দেওয়া বেয়াদবী।
৮. দরসে কাশি বা হাঁচি আসলে যথাসম্ভব নিচু আওয়াজে হাঁচি কাশি দেওয়া। হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখবে। হাই আসলে মুখে হাত রাখবে।

কয়েকটি আদব
১. তালিবুল ইলমের জন্য জরুরী হলো, স্বীয় উস্তাদকে সর্বোচ্চ সম্মান করা। হযরত মুগীরা রহ. বলেন, আমরা উস্তাদকে এই পরিমাণ ভয় পেতাম, যে পরিমাণ ভয় মানুষ বাদশাহকে পেয়ে থাকে।
২. স্বীয় উস্তাদকে সবচেয়ে বড় হুজুর মনে করা। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, যার ভেতরে উস্তাদের বড়ত্ব থাকবে না, সে কামিয়াব হতে পারবে না।
৩. উস্তাদের সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রাখা। তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে সবসময় বেঁচে থাকা।
৪. নিজের করণীয় ও বর্জনীয় ব্যাপারে উস্তাদ থেকে পরামর্শ নেওয়া।
৫. উস্তাদের সামনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। উস্তাদ নিজের সমবয়সী কিংবা কম বয়সী হলেও তাঁর সামনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।
৬. উস্তাদের শাসন ও ধমক সহ্য করা। কোনো ধরনের পতিক্রিয়া প্রদর্শন না করা। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা উস্তাদের কঠোর শাসন মেনে ইলম অর্জন করে, তাদের ভবিষ্যত আলোকিত হয়। যারা উস্তাদের শাসন মানতে পারে না, তারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে না।
৭. নিজেকে উস্তাদের কাছে সোপর্দ করে দেওয়া। সার্বিক বিষয়ে উস্তাদের পরামর্শে চলা। একজন রোগী যেমন সম্পূর্ণরূপে নিজেকে ডাক্তারের কাছে সঁপে দেয়, তেমনিভাবে প্রতিটি ছাত্র নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উস্তাদের কাছে সঁপে দেওয়া।

ইলমে দীন পাওয়ার জন্য আদব বজায় রাখা খুবই জরুরী
ইমাম তাবরানী রহ. রিওয়ায়াত নকল করেছেন, وتواضعو المن تعلمون منه -যাঁর থেকে ইলম অর্জন করবে, তাঁর সামনে বিনয় প্রদর্শন করবে। হযরত থানবী রহ. বলতেন, উস্তাদের প্রতি যে পরিমাণ মুহব্বত থাকবে, উস্তাদের সাথে যে পরিমাণ আদব ও ইহতিরাম বজায় রাখবে, ইলমের মধ্যে সেই পরিমাণ বরকত লাভ করবে। আল্লাহ তাআলার রীতিও এটাই যে, উস্তাদ সন্তুষ্ট না থাকলে ইলম আসবে না। আসতে পারে না।
হযরত থানবী রহ. এ-ও লিখেছেন যে, উস্তাদের সাথে আদব রক্ষা করা তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত। যার মধ্যে এই গুণ নেই, সে মুত্তাকী হতে পারে না।
যে মহান ব্যক্তি থেকে দীনী বা দুনিয়াবী কোনো উপকার লাভ করবে, তাঁর সামনে নিজেকে মিটিয়ে দেবে। তাঁর সাথে আদব রক্ষা করে চলবে। তাঁর আনুগত্য এবং খিদমাতকে নিজের সৌভাগ্য মনে করবে। আগ্রহের সাথে পড়বে, পঠিত বিষয়গুলো খুব স্মরণ রাখবে। এসবের কারণে উস্তাদ এতটা আপ্লুত ও আনন্দিত হবেন যে, লক্ষ টাকা হাদিয়া দিলেও তাঁরা ততটা আনন্দিত ও খুশি হবেন না। কথায় বা কাজে যদি কোনো ভুল হয়ে যায়, সাথে সাথে নিজের ভুল স্বীকার করে নেবে। কথা ঘুরাবে না। কেননা, এটা অহংকরের নিদর্শন।

উস্তাদের খেদমত করার বরকত
উস্তাদের খেদমত করার এই ধারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানা থেকে অদ্যবধি চলে আসছে। এর কিছু নমুনা পেশ করা হলো।
এক. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উযুর জন্য পানি দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য দুআ করেছেন।
দুই. হযরত আনাস রা. দশ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খেদমতে থেকেছেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জান মাল ও সন্তান-সন্তুতিতে বরকতের জন্য দুআ করেছেন।
তিন. ইমাম কাযী ফখরুদ্দীন আসারবন্দীকে মরু শহরে সুলতানের কাছে এই অবস্থায় দেখা গেছে যে, বাদশাহ স্বয়ং তার খেদমত করছেন আর বার বার বলছেন, আমি এই রাজত্ব এবং ইজ্জত সম্মান কেবলই উস্তাদের খেদমতের উসীলায় পেয়েছি। আমি আমার উস্তাদ আবূ যাইদ দাব্বুসীর অনেক খেদমত করতাম। এমনকি ত্রিশ বছর পর্যন্ত লাগাতার তাঁর খানা রান্না করেছি এবং তাঁর শান ও আযমতের দিক খেয়াল করে আমি এর থেকে কোনো কিছু খাইনি।
চার. খলীফা হারুনুর রশীদ স্বীয় ছেলেকে হযরত আসমায়ী রহ. এর কাছে ইলম শেখার জন্য পাঠিয়েছিলেন। খলীফা হারুনুর রশীদ একদিন দেখতে পেলেন, আসমায়ী রহ. উযু করছেন আর শাহযাদা উযুর পানি ঢালছে। খলীফা এই দৃশ্য দেখে হযরত আসমায়ী রহ.-কে বললেন, আমি তাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছি ইলম শেখার জন্য এবং আপনার থেকে আদব শেখার জন্য, কিন্তু আপনি কী আদব শিক্ষা দিচ্ছেন? তার তো উচিত ছিলো, এক হাত দিয়ে পানি ঢালা আর অপর হাত দিয়ে আপনার পা ধুয়ে দেওয়া।
পাঁচ. হাম্মাদ বিন মুসলিম রহ. এর স্ত্রী বলেন যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. আমাদের বাজার করতেন। দুধ দোহন করতেন। এমনিভাবে ঘরের যাবতীয় কাজ করতেন। হাম্মাদ রহ. ইমাম আবু হানীফা রহ. এর উস্তাদ ছিলেন।
ছয়. হযরত মাআন বিন ঈসা ছিলেন ইমাম মালেক রহ. এর একজন শাগরেদ। তিনি স্বীয় যুগের একজন বড় মুহাক্কিক ও মুফতী ছিলেন। তাঁর এই মর্যাদা উস্তাদের খেদমতের ফলে অর্জন হয়েছে। ইমাম মালেক রহ. যখন দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। লাঠির উপর ভর করে চলার বয়স হয়েছিলো, লাঠির পরিবর্তে হযরত মাআন ইবনে ঈসা তাঁর সাথে থাকতেন। ইমাম মালেক রহ. তাঁর কাঁধে ভর করে চলতেন।
সাত. মাওলানা কাসিম নানুতুবী রহ. এর কাছে হায়দারাবাদ দক্ষিণের দুইজন শাহযাদা পড়ার জন্য আসতো। তিনি মাঝেমধ্যে তাদের দ্বারা হাত পা টেপাতেন এবং বলতেন, তাদের দ্বারা আমার হাত পা টেপানোর প্রয়োজন নেই, কিন্তু ইলম এভাবেই আসে।

উস্তাদের সাথে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর আদব
ইমামে আযম আবু হানীফা রহ. বলেন, আমার উস্তাদ হাম্মাদ রহ. যখন ইন্তিকাল করেছেন, তখন থেকে আমি প্রত্যেক নামাযের পর তাঁর জন্য ও আমার সম্মানিত পিতার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমি কখনো আমার মুহতারাম উস্তাদের ঘরের দিকে আমার পা ছড়িয়ে বসিনি। যদিও আমার এবং তাঁর ঘরের মাঝে ছয় গলী [ও যথেষ্ট পরিমাণ ঘর] এর দূরত্ব ছিলো।

উস্তাদের খেদমত কেনো করা উচিত
উস্তাদুল মুহাদ্দিসীন সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, উস্তাদের সাথে আদব বজায় রাখা এবং তাঁদের কৃতজ্ঞতা আদায় করা অত্যন্ত জরুরী। উস্তাদগণ আমাদের জন্য অনেক বড় মুহসিন ও কল্যাণকামী। পিতা- মাতাও আমাদের মুহসিন ও কল্যাণকামী। তাঁরা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। বহু যাতনা বরদাস্ত করেছেন। কিন্তু তাঁদের যাপিত সকল কষ্ট ছিলো শারীরিক প্রবৃদ্ধির জন্য। আর যতক্ষণ পর্যন্ত এই শরীরের সাথে ঈমান না থাকবে, ততক্ষণ এই শরীরের কোনো মূল্য নেই। ঈমানের তারাক্বী ও উন্নতি ইলমের মাধ্যমে অর্জিত হয়। আর আমাদের ইলমী প্রবৃদ্ধি উস্তাদদের মাধ্যমেই হয়। উস্তাদদের থেকে আমরা কুরআন-হাদীসের জ্ঞান পাই এবং ঈমানের দীপ্তি পাই। সুতরাং উস্তাদগণ আমাদের মুহসিন, তাই তাঁদের ইকরাম ও সম্মান করা উচিত।

ইলমের কাছে আসতে হয়, ইলম কারো কাছে যায় না
ইমাম আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম রহ. [মৃত ২২৪হিজরী] নিজের শিক্ষাজীবনের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখেন, আমি যখন কোনো মুহাদ্দিস বা কোনো আলেমের কাছে উপস্থিত হতাম, তখন বাইর থেকে আওয়ায দিতাম না এবং দরজায়ও টোকা দিতাম না। বরং সর্বদা বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁদের বের হওয়ার অপেক্ষা করতাম। আমি আহলে ইলমের এই সম্মান কুরআন থেকে শিখেছি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
ولو أنهم صبروا حتى تخرج إليهم لكان خيرا لهم
আপনি নিজে তাদের কাছে যাওয়া পর্যন্ত যদি তারা অপেক্ষা করতো তবে তাদের জন্য ভালো হতো।
আল্লামা দাউদী রহ. ‘তাবাকাতুল মুফাসসিরীন’ কিতাবে লিখেন, এটা আহলে ইলমের প্রতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদব।
এই আদব পালনে অগ্রগামী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। তিনি যাইদ ইবনে সাবিত রা. এর ঘরের দরজায় তাঁর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, অথচ প্রচণ্ড বাতাস তার চেহারা ধূলিমিশ্রিত করে দিচ্ছিলো। হযরত যাইদ ইবনে সাবিত রা. বাইরে এসে তাঁকে দেখে যখন বললেন, হে রাসূলের চাচাত ভাই! যদি আপনি সংবাদ দিতেন, তাহলে আমিই আপনার কাছে চলে আসতাম। তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন, ইলমের কাছে আসতে হয়, [ইলম কারো কাছে যায় না]।

আদবের সারকথা
শাইখুল হাদীস মাওলানা সলীমুল্লাহ খান রহ. বলেন, আদবের সার ও মূলকথা হলো, স্বীয় কথা ও কাজ দ্বারা বড় কাউকে সামান্য পরিমাণ কষ্টও না দেওয়া। অন্যথায় ইলম অর্জন তো দূরের কথা, কখনো সে কঠিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। কেননা, যেভাবে শাইখের অনুরাগ ও করুণা উন্নতির কারণ, ঠিক তেমনি তাঁর ক্রোধ ও মনোকষ্ট বঞ্চিত হওয়ার কারণ। যদি জেনেবোঝে এমন কাজ করা হয়, তবে তো তা দ্বারা অন্তর আহত হয়। আর যদি অনিচ্ছায় হয়, তবে তা দ্বারাও কখনো অন্তরে পেরেশানী আসে, যা তালিবে ইলমের জন্য বঞ্চিত ও দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

উস্তাদের জন্য দুআ করা
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ইমাম শাফেয়ী রহ. এর প্রতি খুব আস্থা ও ভালোবাসা রাখতেন। সবসময় তিনি তাঁর খুব ইয্যত-সম্মান করতেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. বাহনে আরোহন করলে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর পেছনে পায়ে হেঁটে হেঁটে তাঁকে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞেস করতেন। এই আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর নিজের বক্তব্য হলো,
আমি ত্রিশ বছর যাবত এমন কোনো নামায পড়িনি, যাতে আমি ইমাম শাফেয়ী রহ. এর জন্য দুআ করিনি।

উস্তাদকে মহব্বত করলে কী লাভ
হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, ছাত্র যদি উস্তাদকে মহব্বত করে তাহলে উস্তাদেরও তাঁর প্রতি মহব্বত তৈরি হয়ে যায়। মাওলানা কাসিম নানুতী রহ. বলেন, আল্লাহ তাআলার স্বাভাবিক নিয়ম হলো, উস্তাদের সাথে বে-আদবীর কারণে ইলম অর্জিত না হওয়া।
তিনি বলেন, আমাকে আল্লাহ তাআলা যা কিছু দিয়েছেন, তা কেবল উস্তাদ ও বুযুর্গদের সাথে আদব রক্ষা করা এবং তাঁদের সাথে মহব্বত রাখার কারণেই দিয়েছেন। হাদীসে আছে, যার থেকে ইলম শেখো তাঁর সাথে বিনয় ও আদব রক্ষা করে চলো।

উস্তাদের দুআর প্রভাব
মাযাহিরুল উলূমের মুহাদ্দিস এবং সদরুল মুদাররিসীন হযরত মাওলানা শাহ আব্দুর রহমান রহ. বলেন, সাহারানপুর পড়ার জন্য আমি যখন আমার এলাকা থেকে এসেছি, তখন সকল উস্তাদের সাথে সাক্ষাত করে এসেছি। তবে যে উস্তাদের কাছে আমি প্রাথমিক কিতাব পড়েছি, তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে পারিনি। এরপর আমি যখন সাহারানপুর এসে পড়া শুরু করলাম, তখন কিতাব আমার মোটেই বুঝে আসছিলো না। অথচ আমাকে জামাতের খুব বুঝমান ছাত্র মনে করা হতো। এর কারণ কী হতে পারে, এ নিয়ে চিন্তা করলে আল্লাহ তাআলা আমাকে সুপথ দেখিয়েছেন। তাই আমি ওই উস্তাদের কাছে চিঠি লিখে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি এবং সাক্ষাত না হওয়ার কারণ উল্লেখ করেছি। উস্তাদ উত্তলে লিখেছেন, আমি তো মনে করেছি, আমাকে ছোট মনে করে তুমি আমার সাথে সাক্ষাত করোনি। কিন্তু তোমার চিঠি পড়ে বুঝতে পারলাম, আমি যা ভেবেছি ব্যাপারটি মূলত তা নয়। এরপর চিঠিতে দুআর কিছু বাক্য লিখে দিলেন।
হযরত মাওলানা আব্দুর রহমান রহ. বলেন, উস্তাদদের ইহতিরামের ফলেই আজ তোমাদের সামনে তিরমিযী পড়াচ্ছি।
তার দরসের অবস্থা ছিলো, সমকালীন সবাই একথার উপর একমত ছিলো যে, পুরো দেশে তাঁর থেকে ভালোভাবে কেউ তিরমিযী পড়াতে পারে না।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা, যেটি অনেকেই জানে না
মুফতী শফী রহ. বলেন, আমি যখন মধ্যমস্তরের কিতাব পড়ি, তখন একবার থানবী রহ. দারুল উলূমের মসজিদে বয়ান করলেন। আলোচনার বিষয় ছিলো, মানুষ বুযুর্গদের তো এই ভেবে সম্মান করে যে, তাঁরা বুযুর্গ, আল্লাহওয়ালা, ইবাদতগুযার এবং যাহিদ বা দুনিয়াবিমুখ। কিন্তু যাঁরা বড় আলেম, তাঁদেরকে এই ভেবে সম্মান করে না যে, তাঁরা অনেক ইলমওয়ালা। তাঁরা তাদের উস্তাদ হলেও না।
তিনি বলেন, 'আমি এখানে এসে দেখেছি, উস্তাদের সাথে আদব দেখানো হয়, তাদের শ্রদ্ধা করা হয়। কিন্তু নিজের উস্তাদের সাথে আদব রক্ষা করা হচ্ছে না। কেননা, উস্তাদের উস্তাদকে মনে করা হয় তিনি বুযুর্গ। তখন তিনি মাওলানা ইযায আলী রহ. এর নাম নিয়েছেন। যিনি আমার অনেক সম্মানিত উস্তাদ। তখন হযরত মাওলানা শাইখুল হিন্দ রহ. জীবিত ছিলেন এবং দারুল উলূমে উপস্থিত ছিলেন।
হযরত ওয়ালা রহ. বলেন, তোমরা তোমাদের উস্তাদ মাওলানা ইযায আলী রহ. এর ততোটা সম্মান করো না, যতটা সম্মান করো শাইখুল হিন্দ রহ.এর। অথচ তিনি তোমাদের সরাসরি উস্তাদ নন। তাঁর আদব ও ইহতিরাম বেশি করো। তাঁর ইলমের কারণে নয়, বরং তাঁর বুযুর্গীর কারণে।
হযরত ওয়ালা রহ. বলেন, আমি উভয়কেই ইহতিরাম ও সম্মানের উপযুক্ত মনে করি। বুযুর্গী স্বতন্ত্রভাবে আদবের উপযুক্ত আর ইলমও স্বতন্ত্রভাবে আদব ও ইহতিরামের উপযুক্ত। কেননা, আল্লাহ যদি কাউকে দীনের জ্ঞান দান করেন, যদি তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন, এছাড়াও অন্য কোনো ইবাদত না করেন এবং তিনি বুযুর্গদের মধ্যে গণ্য না হন। তবে তিনি গুনাহে জড়িতও নন। বরং সাধারণ মুসলমানদের মতো নেককার মুসলমান এবং দ্বীনের জ্ঞানও রাখেন, তাহলে আমি তাঁরও ইয্যত-সম্মান করি, তাঁর ইলমের কারণে।

যিনি এক মুহূর্তের জন্যও উস্তাদকে অসন্তুষ্ট করেননি
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, আমি ইলম অর্জনের জন্য খুব বেশি মেহনত করিনি এবং অধিক পরিমাণে কিতাবও আমি মুতালাআ করিনি। তবে আমি আমার কোনো উস্তাদকে এক মুহূর্তের জন্যও অসন্তুষ্ট হতে দিইনি। সেটার বরকতেই আল্লাহ তাআলা আমাকে দীন এবং ইলমে দীনের কিছু খিদমাত করার তাওফীক দিয়েছেন। সাধারণত তিনি আকবার মরহুমের এই শের পড়তেন-
دل ہوتا ہے بزرگوں کی نظر سے پیدا ۔ نہ کتابوں سے ، نہ کالج سے نہ زر سے پیدا
কিতাব, কলেজ আর অর্থবিত্ত দ্বারা অন্তর তৈরি হয়না, অন্তর তো বুযুর্গদের দৃষ্টির কারণেই তৈরি হয়।

মুসলিম বাদশাহদের অন্তরে ইলম ও আলেমদের মর্যাদা
মুসলিম বাদশাহদের অন্তরে ইলম ও আহলুল ইলমের কী পরিমাণ সম্মান ও মর্যাদা ছিলো, তা নিচের ঘটনা থেকেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
একবার খলীফা মুতাযিদ বিল্লাহ, সাবিত বিন কুররাহের হাতে হাত রেখে বাগানে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ খলীফা সাবিত বিন কুররাহের হাত থেকে একটানে নিজের হাত সরিয়ে ফেললেন। এতে আশ্চর্য হয়ে সাবিত জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, হাত সরিয়ে নিলেন যে? ঘটনা কী?
খলীফা বললেন, আমার হাত আপনার হাতের উপরে ছিলো, যা স্পষ্ট বেয়াদবী। জ্ঞানীর হাত উপরে থাকা উচিত।

উস্তাদের ছেলেদের সাথে আদব রক্ষা করা
হযরত নানুতবী রহ. এর ছেলে মুহাম্মাদ আহমাদ শাইখুল হিন্দ রহ. এর ছাত্র ছিলো। রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ. এর ছেলে হাকীম মাসউদ শাইখুল হিন্দ রহ. এর মুরীদ ছিলো। শাইখুল হিন্দ রহ. উভয়জনকে খাটিয়াতে বসিয়ে তিনি যমীনে বসতেন। একবার তিনি তাদেরকে লক্ষ করে বলেছেন, মুহাম্মাদ আহমাদ! তুমি আমার উস্তাদের ছেলে। মাসউদ আহমাদ! তুমি আমার মুরব্বীর ছেলে। আমি তাদের যথাযথ হক আদায় করতে পারিনি। তোমাদের কাছে আমার আবেদন, যদি তোমাদের পিতা জিজ্ঞেস করে, মাহমূদ তোমাদের সাথে কী আচরণ করেছে? তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমার খেয়াল রাখবে। আমাকে লাঞ্ছিত করবে না।

উস্তাদ রাগ করলে করণীয়
তালিবে ইলমদের জন্য উস্তাদদের সন্তান এবং তাদের সম্পৃক্তদেরও সম্মান করা উচিত। উস্তাদ যদি কোনো কারণে রাগ করেন, তাহলে মাফ চাওয়া এবং তাদেরকে খুশী করা আবশ্যক। কারো অবস্থা দেখে বা কোনো কথার কারণে যদি উস্তাদ রাগ করেন, তাহলে তালিবুল ইলম তা বরদান্ত করবে এবং নিজের ভুল স্বীকার করে নেবে। শাসন করার কারণে ভ্রু কুঞ্চিত করবে না ও মুখ কালো করে রাখবে না।

টিকাঃ
৫৭. সূরা হুজুরাত : ৪-৫।
৫৮. তাযকিরাতুস সামি ওয়াল মুতাকাল্লিম: পৃষ্ঠা-৮৮।
৫৯. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৩৯।
৬০. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৩৯।
৬১. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৩৯।
৬২. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: ৪০।
৬৩. আপবীতি: ৬/৮৬।
৬৪. তাহযীবুল আসমা: ২/২১৮।
৬৫. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ১/১৮৪।
৬৬. সুরা হুজুরাত, আয়াত: ০৫।
৬৭. মিসালী বাষ্পান: পৃষ্ঠা-১১৫।
৬৮. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ২/৫৫।
৬৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১০/৩২৬।
৭০. আদাবুল মুআশারাত: পৃষ্ঠা- ২৩৩।
৭১. আদাবুল মুতাআল্লিমীন: পৃষ্ঠা-৩১।
৭২. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-২১৭।
৭৩. মাজালিসে মুফতী আযম: পৃষ্ঠা-৬২৮।
৭৪. মাজালিসে মুফতীয়ে আযম: ৫৯৬, আদ-দাওলাতুল আব্বাসিয়া ফী আসরিল মুতাযিদ বিল্লাহ : ৪০৪, উয়ূনুল আন্না ফী তাবাকাতিল আতিব্বাহ, ইবনু আবী উসাইবিয়া কৃত: ২৯৬। মুতাযিদ বিল্লাহ এর নাম হচ্ছে, আবুল আব্বাস আহমাদ বিন মুহাম্মাদ আল মুতাযিদ বিল্লাহ ( ২৪২-২৮৯ হি.) আর সাবিত বিন কুরাহ (২২১-২৮৮ হি.) সমকালীন একজন দার্শনিক ও ডক্টর এবং 'সাবিয়ান' বা 'সাবি' ধর্মের অনুসারী। ইমাম যাহাবী রহ. বলেন, তারা ভ্রষ্টতার উপরই মারা গিয়েছে। (সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১৩/৪৮৫; ওফায়াতুল আয়ান: ১/৩১৩।
৭৫. মাজালিসে ইলম ও যিকর: ১/১৮৬।
৭৬. আদাবুল মুআশারাত কিছুটা পরিবর্তন সহ: পৃষ্ঠা-৩৩৩।

📘 তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার গল্প 📄 আসবাবে ইলমের ইহতিরাম ও সম্মান প্রদর্শন

📄 আসবাবে ইলমের ইহতিরাম ও সম্মান প্রদর্শন


উস্তাদের সাথে আদব বজায় রাখার সাথে সাথে আসবাবে ইলমের আদবও রক্ষা করবে। অনেক তালিবে ইলম যমীনে কিতাব বিছিয়ে অথবা যমীনে একটি কাপড় বিছিয়ে তাতে হাদীস ও তাফসীরের কিতাবাদী রেখে পড়া শুরু করে দেয়। অথচ কাপড়ও যমীনের হুকুমে। এসকল কাজ কিতাবের আদবের পরিপন্থী। আমাদের চিন্তা করা উচিত, আমাদের দৃষ্টিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মান-মর্যাদা কতটুকু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস অথবা তাঁর আলোচনা যখন আমাদের সামনে আসে তখন সেগুলোরও সে পরিমাণ আদব ও ইহতিরাম করা চাই। হাদীস ও ফিকহের কিতাবগুলো কোনো উঁচু জায়গায় রেখে পড়া উচিত। কিতাবের দিকে পা ছড়িয়ে বসা থেকেও আমাদের বিরত থাকা উচিত। কেননা, কিতাবের দিকে পা ছড়িয়ে বসা কিতাবের আদবের পরিপন্থী।

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. কর্তৃক কুরআনের ইহতিরাম
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ইমাম আবু হানীফা রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্রদের একজন। ফিকহ, বিচারকার্য এবং ফতোয়া প্রদানে তাঁর অভাবনীয় পাণ্ডিত্য ও অনুপম যোগ্যতা ছিলো। ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দরসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো, তিনি কুরআন হিফজ করা ব্যতীত কাউকে নিজের দরসে অংশগ্রহণের অনুমতি দিতেন না। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. -ও হাফেযে কুরআন ছিলেন।
ইমাম আবু ইউসুফ রহ. একবার কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে দুই ব্যক্তি ঝগড়ায়লিপ্ত ছিলো। তাদের একজন অপরজনকে উদ্দেশ্য করে বললো, তোমার আর আমার উদাহরণ তো কুরআনের এই আয়াতের মতো।
إِنَّ هَذَا أَخِي لَهُ تِسْعٌ وَتِسْعُونَ نَعْجَةً وَلِي نَعْجَةٌ وَاحِدَةٌ فَقَالَ أَخْفِلْنِيهَا
নিশ্চয় এ তো আমার ভাই। তার আছে ৯৯টি দুম্বা। আর আমার আছে (মাত্র) একটি দুম্বা। বাহ্,ও বলে, এই একটিও আমাকে দিয়ে দাও।
এ কথা শোনার সাথে সাথে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. রাগ আর অনুতাপে ফেটে পড়ছিলেন। তাঁর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি বেহুঁশ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়লেন। যখন তাঁর অবস্থা কিছুটা ভালো হলো, তিনি ওই ব্যক্তিকে রাগের সুরে বললেন, তুমি কি আল্লাহকে মোটেও ভয় পাওনা? তুমি কি আল্লাহর কালামকে সাধারণ কথা-বার্তা মনে করেছো? কুরআন পাঠকারীর জন্য খুশু-খুজুর সাথে, আল্লাহর ভয় ও ডর নিয়ে কুরআন পাঠ করা উচিত; এমন যেন না হয় যে, কুরআন পাঠ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমি তোমার মধ্যে এর বিন্দুমাত্র দেখছি না। তোমার কী বিবেক চলে গেছে যে, আল্লাহর কালামকে খেল-তামাশার বিষয় বানিয়ে নিলে?

কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে খেলতামাশা সূচনা করা চরম বেয়াদবী
কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের সময় কুরআনের এই আযমত ও বড়ত্ব অন্তরে রেখে তিলাওয়াত করবে যে, অনেক উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন এই কালাম, যেই মহান স্রষ্টার এই কালাম, তাঁর বড়ত্ব ও মহত্বও অন্তরে রাখবে। অর্থের প্রতি খেয়াল করে কুরআনে কারীম তিলাওয়াত করবে। কুরআন মাজীদ শিখে ভুলে যাওয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে বিভিন্ন খেল-তামাশার সূচনা করা সুমহান এই কালামের সাথে বে-আদবীর শামিল। আল্লাহ পাক আমাদের হিফাযত করুন।

আল্লামা কাশমিরী রহ. এত বড় আলেম হলেন কীভাবে?
একবার মুফতী কিফায়াতুল্লাহ সাহেব রহ. দরসে বললেন, একবার আল্লামা কাশমীরী রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনি কাশমীরী হলেন কীভাবে?
উত্তরে কাশমীরী রহ. বললেন, কিতাবের আদব রক্ষা করে। উপস্থিত লোকেরা বললো, কিতাবের আদব তো অনেকেই রক্ষা করে। কাশ্মীরী রহ. বললেন, আমি যতটা করি, তারা হয়তো ততটা করে না। উযু ব্যতীত কোনো দীনী কিতাব আমি কখনো মুতালাআ করিনি। মুতালাআ চলাকালীন কিতাবকে আমার অনুগামী বানাইনি, বরং আমি নিজেকে কিতাবের অনুসারী বানাই। যেমন, বুখারী শরীফ পড়ার সময় 'হাশিয়া' পড়তে হলে আমি কিতাব স্বীয় জায়গায় রেখে নিজের জায়গা পরিবর্তন করে ঘুরে ঘুরে চারপাশের 'হাশিয়া' পড়ে নিতাম। আমি টেবিলে বসেও কখনো কিতাবকে পায়ের দিকে রাখতাম না। বরং নিজের মাথা বরাবর রাখতাম। সবশেষে তিনি বললেন, কিতাবের আদব রক্ষা করা আমাকে আনোয়ার শাহ কাশমীরী বানিয়েছে।

দুটি আদব
তালিবে ইলমদের উচিত, নিজের ব্যবহারের কোনো কিছু কিতাবের উপর না রাখা। কিতাবের উপর দোয়াতকালি রাখা এক ব্যক্তির অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। উস্তাদ তাকে দেখে বললেন, তুমি নিজের ইলম দ্বারা কোনো উপকৃত হতে পারবে না। কিতাবের মধ্যে অনর্থক এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না লেখাও কিতাবের প্রতি আদব।

উযু ব্যতীত দরসে না বসা
হযরত মাওলানা সিরাজ আহমাদ সাহেব রহ. দারুল উলূম দেওবন্দে হাদীস পড়াতেন। দরস চলাকালীন একদিন কোনো জানাযা এসে গেলে মাওলানা নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন অনেক ছাত্র উযু করতে চলে গেলো। জানাযার নামায পড়ে এসে মানুষজন দেখলো, মাওলানা কাঁদছেন। একজন এর কারণ জিজ্ঞেস করলে হযরত বলেন, আমরা রশীদ আহমাদ গাংগুহী রহ. এর কাছে হাদীস ও তাফসীরের সবক উযু ব্যতীত কখনো পড়িনি। আজকালের তালিবে ইলমরা উযু ছাড়া এসব সবক পড়ছে, এই দুঃখে আমি কাঁদছি।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আদব
তালিবে ইলমদের উচিত, ধর্মীয় কিতাবের আদব ও ইহতিরাম করা। উযু ব্যতীত কোনো কিতাব স্পর্শ না করা। কিতাবের দিকে পা না ছড়ানো। তাফসীরের কিতাবের নিচে হাদীসের কিতাব, হাদীসের কিতাবের নিচে ফিকহের কিতাব এবং ফিকহের কিতাবের নিচে অন্যান্য শাস্ত্রের কিতাব রাখা। কিতাব উঠানোর সময় আদবের সাথে উঠানো। কাউকে কিতাব দেওয়ার প্রয়োজন হলে ছুড়ে না দেওয়া।

আল্লামা কাশমীরী রহ. এর সতর্কীকরণ
হযরত মাওলানা আযীযুর রহমান রহ. বলেন, ১৩৮১ হিজরীর যুলকাদা মাসের ৫ তারিখে আমি যখন মদীনা মুনাওরায় মাওলানা সাইয়িদ বদরে আলম মুহাজিরে মাদানী রহ. এর কাছে পৌঁছলাম, তখন আলোচনাসভা চলছিলো। তাতে তিনি বললেন, দেওবন্দে আমি একবার শুয়ে শুয়ে কিতাব মুতালাআ করছিলাম। আমার রুমের সামনে দিয়ে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমীরী রহ. যাচ্ছিলেন। আমাকে সে অবস্থায় দেখে খুব রাগ করলেন এবং অসন্তুষ্ট হয়ে শুধু এতটুকু বললেন, 'আমি সারাজীবন তেপায়া ব্যতীত কিতাব রাখিনি।' শেষ বয়সে অসুস্থতার সময় শাহ সাহেব রহ. একটি রুমাল বিছিয়ে তাতে কিতাব রাখতেন।

কিতাব কীভাবে রাখবেন
যেকোনো কাজে যখন আদব ও হুকুকের প্রতি লক্ষ রাখা হয়, তখন তাতে কল্যাণ ও বরকত হয়। বুযুর্গানে দীন লিখেছেন, যেমনিভাবে উস্তাদের ইহতিরাম, সম্মান ও আদব রক্ষা করা জরুরী, ঠিক তেমনিভাবে দীনী কিতাবের ইহতিরাম ও আদব রক্ষা করাও জরুরী। আদব ও ইহতিরামের কারণে ইলমী আলোচনা খুব বুঝে আসে এবং ইলমের কারণে আমলের তাওফীক হয়। যারা কিতাবের ইহতিরাম করে না, তারা ইলমের নূর ও আলো থেকে বঞ্চিত থাকে। বে-আদব রবের করুনা থেকে বঞ্চিত। প্রথমে দীনী কিতাবের বড়ত্ব নিজের অন্তরে রাখতে হবে। তারপর দীনী কিতাব আদব ও ইহতিরামের সাথে রাখবে ও উঠাবে। কিতাব জোরে রাখবে না বরং কাঁচের পেয়ালা যেভাবে রাখা হয়, সেভাবে যত্ন করে রাখবে। ডান হাতে কিতাব উঠাবে। ব্যাগের মতো কিতাব ঝুলিয়ে রাখবে না বরং সীনার সাথে লাগিয়ে রাখবে।

কিতাবের প্রতি আদব প্রদর্শনের কয়েকটি দিক
১. উযু ছাড়া স্পর্শ না করা।
ইলম শেখার যেসব উপকরণ রয়েছে, এর মধ্যে 'কিতাব' সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অতএব কিতাবের প্রতি যে পরিমাণ সম্মান প্রদর্শন করা হবে, ইলমের মধ্যে সেই পরিমাণ পূর্ণতা আসবে। ইমাম হালওয়ানী রহ. বলেন, আমরা এই ইলমকে আদবের মাধ্যমে শিখেছি। আমি উযু ছাড়া সাদা কাগজকেও স্পর্শ করতাম না।
তালিবুল ইলমদের উচিত, উযুসহ কিতাব স্পর্শ করা। হযরত কাতাদা রহ. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসসমূহকে উযুসহ বর্ণনা করা পছন্দ করতেন।
ইমাম মালিক রহ. এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসকে সম্মানের কারণে উযু ছাড়া বর্ণনা করতেন না।
শামসুল আইম্মা সারাখসী রহ. এর বাতাস বের হওয়ার রোগ থাকা সত্ত্বেও উযু ছাড়া তিনি কিতাব হাতে নিতেন না। একবার মুতালাআর মাঝে তাকে সত্তর বার উযু করতে হয়েছে। তার যুক্তি ছিলো, ইলম হচ্ছে নূর এবং উযুও নূর। এজন্য ইলমের নূর উযুর নূরের কারণে বৃদ্ধি পাবে।
হযরত ইসহাক রহ. বলেন, আমি ইমাম আমাশ রহ.-কে দেখেছি, যখনই তিনি হাদীস বর্ণনা করতেন, উযু করে নিতেন। উযু করা সম্ভব না হলে তায়াম্মুম করে নিতেন।
২. কিতাবের দিকে পা না দেওয়া।
৩. তাফসীর, হাদীস ও ফিকহের কিতাবাদীকে অন্যান্য বিষয়ের কিতাবাদীর উপর রাখা।
৪. কিতাবকে আদবের সাথে উঠানো। কাউকে কোনো কিতাব দেওয়ার সময় ছুড়ে না মারা। এটা বেয়াদবী।
৫. কিতাবের উপর কোনো কিছু না রাখা। শাইখুল ইসলাম রহ. বলতেন, এক ছাত্র কিতাবের উপর দোয়াত রাখতো। আমাদের উস্তাদ তাকে বললেন, তুমি স্বীয় ইলম দিয়ে উপকৃত হতে পারবে না।
৬. কিতাব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
৭. অনেক ছাত্র বাঁ হাতে কিতাব আর ডান হাতে জুতা নিয়ে চলে। এ কাজটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। বড় বেয়াদবী। এ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে জুতাকে দীনী কিতাবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়।
হিশাম ইবনে উরওয়াহ রহ. স্বীয় বাবা 'উরওয়াহ' এর সকল কিতাব আগুনে জ্বলে গিয়েছিলো। এতে তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, হায়! কিতাবের পরিবর্তে যদি আমার পরিবার জ্বলে যেতো!

টিকাঃ
৭৭. সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৩।
৭৮. মানাকিবুল ইমাম আবু হানীফা, মুওয়াফ্ফাক মাক্কী: ২/২৪৪।
৭৯. বা আদাব বা নসীব : পৃষ্ঠা-৭২,৭৪।
৮০. বা আদাব বা নসীব : পৃষ্ঠা-১२०।
৮১. হিকায়াতুল আসলাফ আন রিওয়াতিল আখলাফ: পৃষ্ঠা-১১৫।
৮২. বা আদাব বা নসীব : পৃষ্ঠা-১১৯।
৮৩. নাসাইহে আযীযিয়্যাহ : পৃষ্ঠা-৯০।
৮৪. তুহফাতুত তলাবা ওয়াল উলামা: পৃষ্ঠা-২৬৭।
৮৫. তালীমুল মুতাআল্লিম: পৃষ্ঠা-২৪।
৮৬. জামিউ বায়ানিল ইলম: ২/২৪৩।
৮۷. জামিউ বায়ানিল ইলম: ২/২৪৩।
৮৮. তালীমুল মুতাআল্লিম: ২৫।
৮৯. জামিউ বায়ানিল ইলম : ২/২৪৩।
৯০. তালীমুল মুতাআল্লিম : ২৫।
৯১. জামিউ বায়ানিল ইলম: ১/৯০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px