📘 তালিবানে ইলম পথ ও পাথেয় 📄 ইলমের পরিপক্কতা ও ‘তাফাক্কুহ ফিদ্দীন’ অর্জন

📄 ইলমের পরিপক্কতা ও ‘তাফাক্কুহ ফিদ্দীন’ অর্জন


ইলমের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হল 'অল্পেতুষ্টি' এবং 'আছা' ও 'ছাওফা' (পরে করব)-এর প্রবণতা। এর চেয়েও বড় প্রতিবন্ধক হল ইলমের স্বরূপ তথা এর বিস্তৃতি ও গভীরতা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের মানসিকতা না থাকা。

আরেকটি বড় ব্যাধি হল, তাহকীক ও মুতালাআর জন্য প্রস্তুত না হওয়া। আবার শুধু প্রয়োজনের সময়ে প্রয়োজন পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। এটি ইলমের দৃঢ়তা ও তাফাক্কুহ পয়দা হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয়ে যত্নবান হওয়া অতি জরুরি:

১. শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)-এর 'ছাফাহাতুম মিন ছাবরিল উলামা', 'কিমাতুয যামান ইনদাল উলামা', মাওলানা হাবীবুর রহমান খান শিবওয়ানী (রহ.)-এর 'না-বীনা উলামা' ইত্যাদি রচনায় উল্লেখিত ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে ইলমের অনুরাগ ও ইলমের জন্য জ্বালা পয়দা করা উচিত। এসব কিতাব থেকে সময়ের মূল্যায়নের শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের শিক্ষাও গ্রহণ করা উচিত। এতে উল্লেখিত কিছু ঘটনা মানসপটে খোদাই করে নেওয়া উচিত। তাহলে যেমন সময় নষ্ট করার দুঃসাহস হবে না অদ্রূপ (যদি আল্লাহ তাআলা আকলে সালীম ও লজ্জাবোধ দান করে থাকেন) উপকরণের অপ্রতুলতা এবং বিভিন্ন অসুবিধা ও পেরেশানী ইলমের পথে বড় বাধা মনে হবে না।

২. 'মুতালাআ' শুধু দরস ও প্রয়োজনের মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মুতালাআর সকল প্রকারের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। যথা- (ক) দরসের জন্য মুতালাআ, (খ) সাময়িক প্রয়োজনের জন্য মুতালাআ, (গ) মওসুমী মুতালাআ, (ঘ) নিয়মিত মুতালাআ। এই মুতালাআর উদ্দেশ্য হবে ইলম তাজা রাখা ও তাফাক্কুহ ফিদ্দীন অর্জন করা এবং রূহের খোরাক যোগানো। (কুরআন, হাদীস, অতপর নির্বাচিত রচনাবলী, রাসাইল, মালফুযাত ও মাকতুবাতে আকাবির থেকে এ মুতালাআ অব্যাহত থাকবে) (ঙ) প্রচলিত ও সম্ভাব্য ফিতনাসমূহ মুকাবিলার জন্য মুতালাআ, নিজের ও সাধারণ মুসলমানের ঈমান-আকীদা সংরক্ষণের জন্য; অন্য ভাষায়:

يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ، وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ.

যারা এই দ্বীন থেকে প্রতিহত করবে চরমপন্থীদের হ্রাস-বৃদ্ধি, মূর্খ লোকের অপব্যাখ্যা ও বাতিলপন্থীদের অন্যায় হস্তক্ষেপ। এর দায়িত্ব পালনের জন্য। (চ) বিষয়ভিত্তিক মুতালাআ (অজানা বিষয়াবলি বা একজন আলেমের জন্য যে সব বিষয় জানা অপরিহার্য তার তালিকা প্রস্তুত করে মুতালা'আ)।

এ সবের মধ্যে আসল প্রকার হল, 'নিয়মিত মুতালাআ' ও 'ফিতনাসমূহের মুকাবিলার জন্য মুতালাআ'। এর জন্য যতটুকু সময় হোক না কেন নির্ধারণ করতে হবে। এরপর অবস্থা ও ব্যস্ততার ভিত্তিতে যে দিন যে পরিমাণ সময় যোগ করা যায় আলহামদুলিল্লাহ।

মুতালাআর সর্বশেষ প্রকার অর্থাৎ অজানা ও অপরিহার্য বিষয়াদির তালিকা তৈরি করে সে অনুযায়ী মুতালাআ আরম্ভ করা খুব দরকার। চিন্তা করলে দেখা যাবে অনেক প্রয়োজনীয় ইলম ও ফনের ব্যাপারে (যার কিছু বিষয়ের অল্প কিছু কিতাব আমরা দরসে নেযামীর নির্ধারিত নেসাবে 'চেখেও' দেখেছি) বর্ণমালা পর্যায়ের প্রাথমিক জ্ঞানও আমাদের নেই। তদ্রূপ যে কোনো জরুরি ফনের অধ্যায় ও পরিচ্ছেদসমূহ এবং অন্যান্য বিষয়ের হিসাব করা হলে দেখা যাবে আমাদের অর্জিত জ্ঞানের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।

অজানা বিষয়াদির এক বিশাল অংশ বর্তমান যুগের প্রয়োজনীয় মাসায়েল ও বিষয়াদির সাথে সম্পৃক্ত যা থেকে অজ্ঞ থাকা সমাজে অবস্থানকারী একজন আলেমের জন্য কখনই শোভনীয় নয়। কেননা- مَنْ لَمْ يَعْرِفْ أَهْلَ زَمَانِهِ فَهُوَ جَاهِلٌ.

যে তার সমকালীন লোকদেরকে জানে না (তাদের কথা-কাজ বোঝে ঘন) সে অজ্ঞ।

এসব বিষয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে উল্লেখ করার পরিবর্তে এ বিষয়টি আপনাদের দায়িত্বে সোপর্দ করছি। একজন আলেমের জন্য অপরিহার্য বিষয়াদির একটি তালিকা এবং সেসব বিষয়ে জ্ঞান লাভের প্রয়োজনীয় উৎস সম্বলিত একটি প্রবন্ধ প্রস্তুত করে পাঠাবেন। এরপর প্রয়োজন হলে তালিকাটি পূর্ণ করে অধ্যয়নের ক্রম ও ধারাবাহিকতা আপনাদের উস্তাদগণ নির্ণয় করে দেবেন ইনশাআল্লাহ। গত কয়েক বছর যাবত 'আল মাওয়াদ্দুল ইযাফিয়া' শিরোনামে এ জাতীয় একটি তালিকা শিক্ষার্থীদেরকে প্রদান করা হয়। এ থেকেও কিছুটা সাহায্য নেয়া যেতে পারে।

ইমাম শা'বীর কথা স্মরণ করুন: الْعِلْمُ ثَلَاثَةُ أَشْبَارٍ ، فَمَنْ نَالَ مِنْهُ شِبْرًا شَمَّخَ بِأَنْفِهِ وَظَنَّ أَنَّهُ نَالَهُ، وَمَنْ نَالَ الشَّبْرَ الثَّانِيَ صَغُرَتْ إِلَيْهِ نَفْسُهُ وَعَلِمَ أَنَّهُ لَمْ يَنَلْهُ، وَأَمَّا الشَّبْرَ الثَّالِثَ فَهَيْهَاتَ، لَا يَنَالُهُ أَحَدٌ أَبَداً. (أدب الدنيا والدين ص ٨١)

ইলম হলো মোট তিন বিঘা। যে তার এক বিঘত লাভ করে তার নাক ফুলে ওঠে। সে ভাবে, ইলম হাছিল করে ফেলেছে! আর যে দ্বিতীয় বিঘতও লাভ করে- নিজিকে তার ছোট মনে হয়। সে বুঝতে পারে, ইলমের কিছুই অর্জিত হয়নি! আর তৃতীয় বিঘত, সে বহুত দূরের ব্যাপার। কোন দিনই কেউ নাগাল পাবে না তার!

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাযি.)-এর বাণী এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যার মর্ম হল, 'ইলম যত বাড়বে বিনয় ততই বৃদ্ধি পাবে। আর জাহালত যত বেশি হবে অহংকারও তত বাড়বে'। তাঁর এ বাণী থেকেও আমরা আমাদের ভয়ঙ্কর পর্যায়ের জ্ঞানহীনতা সম্পর্কে অনুমান করতে পারি।

৩. সাধ্যমত তাসনীফ, দরসে হাদীস, দরসে তাফসীর, সাপ্তাহিক দরস ও মাসিক মুহাযারার ব্যবস্থা করা এবং এ ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। কেননা এতে বাধ্য হয়েই মুতালাআ ও তাহকীকের পরিধি বৃদ্ধি পেতে পারে।

৪. মারকাযের বা আপনার নিকটবর্তী কোনো মুহাক্কিক আলেমের সাথে পরামর্শ করে তাহকীকযোগ্য বিষয়াদির একটি তালিকা তৈরি করে বিশেষত সম-সাময়িক বিষয়াদির একটি তালিকা প্রস্তুত করে গুরুত্ব অনুপাতে ক্রমিক নম্বর দিয়ে এর উপর তথ্য সংগ্রহ ও সংগৃহীত তথ্যের আলোকে তাহকীক ও তানকীহের কাজ আরম্ভ করা উচিত। কেননা এতে অপরিহার্যভাবে অধ্যয়নের প্রয়োজন দেখা দেবে।

৫. দরসী কিতাবসমূহের কঠিন স্থানগুলো যা প্রতি বছর অস্পষ্ট রেখেই সামনে অগ্রসর হতে আমরা অভ্যস্ত, এক এক করে সেসব স্থান হল করার মানসিকতা তৈরি করা উচিত। এভাবেও বাধ্য হয়েই মুতালাআর ব্যাপারে যত্নবান হওয়া যাবে।

৬. মুতালাআ, তাহকীক, তাসনীফ ও তালীফের ব্যাপারে কিতাবের অপর্যাপ্ততা বা কিতাব না থাকার অভিযোগ- কাজে প্রতিবন্ধক না হওয়া উচিত।

প্রথমত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বশীলগণকে আদবের সাথে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে আস্তে আস্তে কিতাব সংগ্রহ করতে থাকা। দ্বিতীয়ত প্রত্যেক আলেমেরই একটি ছোটখাটো কুতুবখানা থাকা। এ উদ্দেশ্যে দুটি একটি করে কিতাব খরিদ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত আশপাশের লোকদের নিকটে বিদ্যমান বিক্ষিপ্ত কিতাবসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত উপরোক্ত কোনোটাই সম্ভব না হলে যে দু'একটি কিতাব আছে তা সম্বল করেই কাজ আরম্ভ করতে হবে। এটা শুধু সম্ভব তাই নয়; বরং অতি সহজ। শুধু আকলে সালীম ও চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন।

হযরত হাকীমুল উম্মত-এর শত শত রচনা রয়েছে অথচ তাঁর কুতুবখানায় বিদ্যমান কিতাবের সংখ্যা হয়তো তাঁর রচনাবলির চেয়েও কম হবে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px