📄 আদাবে মুয়াশারা ও আখলাকে জাহেরার সংশোধন
আখলাকে জাহেরার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যবানের হেফাযত। যবানের গুনাহসমূহ, যার বিস্তারিত বিবরণ 'ইহইয়াউ উলুমিদ দ্বীন' বা 'তাবলীগে দ্বীন' প্রভৃতি কিতাবে উল্লেখিত আছে তা থেকে পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা অতি জরুরি। বিশেষত গীবত থেকে বেঁচে থাকা খুবই জরুরি, যা আজকাল ব্যাপক রোগে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন যুক্তি ও কৌশলে আলিম, তালিবে ইলম, এমনকি পীর-মাশায়েখের হালকাতেও একে বৈধতার সনদ দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ তাআলাই হেফাজতের মালিক।
আলেমগণ বলেছেন, 'আদাবুল মুআশারা'র সারনির্যাস- الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ.
মুসলিম সেই মুসলমান যার হাত ও যবান থেকে নিরাপদ।
হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। এর বিস্তারিত জ্ঞান লাভের জন্য আবুল হাসান মাওয়ারদী (রহ.)-এর 'আদাবুদ দুনয়া ওয়াদ দ্বীন', ইবনে মুফলিহ-এর 'আল আদাবুশ শরইয়্যা', হাকীমুল উম্মত (রহ.)-এর এই বিষয়ক রাসাইল, মাওয়ায়েজ ও মালফুযাত অধ্যয়ন করা উচিত। বুখারী (রহ.)-এর 'আল আদাবুল মুফরাদ' ও মাওলানা ইউসুফ কান্দলভী (রহ.)-এর 'হায়াতুস সাহাবা'ও (বিশেষভাবে আল বাবুল আশির) মৌলিক অধ্যয়নের অন্তর্ভুক্ত রাখা উচিত।
মাদারিস ও মাসাজিদের দায়িত্বশীলদের জন্য আদাবে মুআশারা সম্পর্কে প্রখর ও বিস্তৃত জ্ঞান অর্জন করা এবং কার্যক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা অতি প্রয়োজন।
আসাতিযা, তালাবা এবং সঙ্গী-সাথীদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, কার কী হক রয়েছে, তদ্রূপ সাধারণ মানুষ ও সাধারণ শিক্ষিত মানুষের সাথে মেলামেশার আদব ও রীতি কেমন হবে, তাদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্য সংশ্লিষ্ট কিতাবাদি অধ্যয়নের পাশাপাশি আকাবির ও মুসলিহীনে উম্মতের এই বাক্য থেকে নির্দেশনা গ্রহণ করা যেতে পারে-
السعيد من وعظ بغيره
ভাগ্যবান সেই যে অন্যের থেকে শিক্ষা নেয়।
কেননা, অন্যের যে কথা, কাজ ও আচরণ আমার জন্য কষ্টদায়ক হয়; আমার এ জাতীয় কথা, কাজ ও আচরণও অন্যের জন্য কষ্টদায়ক হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় হল, শান্তিপূর্ণ ইজতিমায়ী জীবন যাপনের জন্য তিনটি জিনিসের কোনো বিকল্প নেই। উদাসীনতা পরিত্যাগ করা, তাওয়াজু' বিনয় অবলম্বন করা এবং আকলে সালীম ব্যবহার করা। এছাড়া অনর্থক কাজকর্ম পরিত্যাগ করা, দায়িত্ব বহির্ভূত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কাজকর্মে হস্তক্ষেপ না করা, যে বিষয়ের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নেই- তা থেকে দূরে থাকা। দায়িত্বশীলদের প্রতি অনুগত থাকা, তাঁদেরকে সম্মান করা এবং না-হক, অনর্থক বা উল্লেখযোগ্য ফায়েদা ছাড়া তাদের সাথে বিতর্কে না জড়ানো, ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকা, বড়ত্ব ও উন্নাসিকতা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি সবগুলোই হল 'আদাবুল মুআশারা'র অপরিহার্য বিষয়। অথচ দুঃখজনক সত্য এই যে, এসব বিষয়ে চরম অবহেলা প্রদর্শন করা হয়। আপনাদের কর্তব্য হল আপনারা এই প্রচলিত ধারার অনুগামী হবেন না।
জনসাধারণের সাথে আপনাদের আচরণ কেমন হবে তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়া শুধু তালিকা আকারে নিম্নে উল্লেখিত হল:
• আম মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা যাবে না। অনেক সময় তারাই অধিক উত্তম ও অধিক পরহেজগার হয়ে থাকেন। এছাড়া এমনিতেও কোনো মানুষকে তুচ্ছ মনে করা, সে যে ধরনের মানুষই হোক না কেন, অবশ্যই নিন্দনীয়।
• কথা ও কাজে তাদের বিদ্যা-বুদ্ধি ও ধারণ ক্ষমতার দিকে লক্ষ্য রাখতে كَلِّمُوا النَّاسَ عَلَى قَدْرِ عُقَوْلِهِمْ মর্ম অনুধাবনের জন্য ইমাম গাযালী (রহ.)-এর ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন গ্রন্থের 'কিতাবুল ইলম' অধ্যয়ন করা যেতে পারে।
• তাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না।
• তাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না।
• সহজ, সুমধুর এবং শক্তিশালী বর্ণনার মাধ্যমে তাদের সংশয়-সন্দেহের অপনোদন করতে হবে।
কোনো বিষয়ে আলোচনার সময় খোঁচা দেওয়া, কটাক্ষ করা বা কষ্ট দেওয়ার পথ পরিহার করতে হবে। কেননা প্রত্যেক মুসলিমই ইজ্জত ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। তাছাড়া নসীহত ও উপদেশ দানের জন্য দয়া ও প্রজ্ঞা-এর ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত কোনো বৈধ পেশা বা বৈধ শিক্ষার নিন্দা করা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। বৈধ শিক্ষার ভুল ব্যবহার বা ভুল পদ্ধতি, তদ্রূপ বৈধ পেশায় অত্যধিক নিমগ্নতা, যার ফলে ফরয বিধানও ছুটতে থাকে- এটা অবশ্যই ভুল। তবে হেকমত ও কৌশলের সাথে সে ভুল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কোনো বৈধ পেশা বা বৈধ শিক্ষা সম্পর্কে যা পার্থিব জীবনের জন্য জরুরি এবং শরীয়তেও যার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত, নিন্দা সমালোচনা করা কোনো সচেতন আলেমের কাজ হতে পারে.না।
দ্বীন বোঝাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো অশালীন উপমা দেওয়া কিংবা কোনো মন্দ পদ্ধতি অনুসরণ করা মোটেই উচিত নয়। কেননা মন্দ ও অশালীনতার প্রচার-প্রসার ঘটানো আমানত ও দ্বীনদারী পরিপন্থী কাজ। আর সামান্য বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ শিক্ষিতদের বৈঠকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে। নতুবা খোদ আলেমেরই বুদ্ধিহীনতা ও রুচিহীনতা প্রকাশ পাবে এবং তার ভদ্রতা ও শালীনতাবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। মনে রাখতে হবে, আম মানুষের বিচার-বুদ্ধি সম্পর্কে নীচু ধারণা পোষণ করা আত্মঘাতি হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে গবেষক নামধারী প্রগতিবাদী ব্যক্তিদের সাথে উপযুক্ত পন্থায় আলোচনায় বসা যেতে পারে- যদি মনে হয় যে, তাদের মধ্যে শোনার ও বিবেচনা করার অভ্যাস আছে। অন্যথায় তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করাই বাঞ্ছনীয়। মূলত এ ধরনের লোকদের ক্ষেত্রে কুরআনে কারীমের নিম্নোক্ত বাণীই প্রযোজ্য:
وَاِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
বিশেষত যার সম্পর্কে বোঝা যায় যে, সে হটধর্মিতার বশবর্তী হয়েই প্রশ্ন করছে, তার পিছনে সময় ব্যয় না করা বাঞ্ছনীয়।
তাদের থেকে বে-নেয়াজ থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিম্নোক্ত বাণী সামনে রাখা জরুরি-
ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبَّكَ اللهُ، وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ يُحِبَّكَ النَّاسُ.
দুনিয়া থেকে মুখ ফেরাও আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন, আর মানুষের কাছ থেকে নির্মুখাপেক্ষী হও মানুষ তোমাকে ভালোবাসবে।
তাদের সমস্যা ও দুর্বলতা এবং ভাষা ও পরিভাষা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারা আমাদের দয়া ও অনুকম্পার পাত্র, ঈর্ষার পাত্র নয়।
ইলমের মর্যাদা এবং এর হুকুক ও আদাব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। এ বিষয়টাই সাধারণ মানুষের অন্তরে আলেমদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা বিদ্যমান থাকার (যা শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও কাম্য) অন্যতম উপায়।
তাদের সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে রাখতে হবে। হাকীমুল উম্মত (রহ.)-এর 'আশরাফুল জাওয়াব' এ প্রসঙ্গে অধ্যয়ন করা যেতে পারে।
উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও সাধারণ শিক্ষিতদের মাঝে বহু ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে। তাছাড়া উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে তাদের অভিযোগ ও আপত্তির কোনো শেষ নেই। এর মধ্যে কিছু তো হল ভিত্তিহীন, যা বেদ্বীনী ও বদ-দ্বীনীর কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আর কিছু পয়দা হয়েছে মূর্খতার কারণে। কিন্তু এমন কিছু অভিযোগও রয়েছে যেগুলো যথার্থ; এগুলো এমন কিছু আলেমেরই ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে সৃষ্টি হয়েছে যারা ইলমের দাবি ও মর্যাদা এবং ইলমের আদব ও শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখে না এবং নিজেদের আখলাক-চরিত্রের উন্নতির দিকেও মনোযোগ দেয় না।
সাধারণ মানুষ ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের সাথে এ সম্পর্কে আলোচনা উঠলে হক্কানী উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে সঠিক ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করা দ্বীনী দায়িত্ব। তবে এক্ষেত্রেও বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। তেমনিভাবে ধৈর্য ও প্রজ্ঞারও পরিচয় দিতে হবে। এই ব্যাখ্যা যেন এমন না হয় যে, কতক আলেমের সুস্পষ্ট বিচ্যুতিরও পক্ষাবলম্বন করা হল। কিংবা ব্যাখ্যার ভিত্তিটি খুবই দুর্বল বা বাস্তবতা বিরোধী হল যে, খোদ শ্রোতারাও এর দুর্বলতার দিক ধরতে পারে।
এসব বিষয়ের জন্য বিচক্ষণ আহলে ইলম এবং প্রজ্ঞাবান অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত এবং হযরত থানভী (রহ.) ও অন্যান্য আকাবিরের মালফুযাত ও মাওয়ায়েজ পড়া কর্তব্য।
📄 ইলমের পরিপক্কতা ও ‘তাফাক্কুহ ফিদ্দীন’ অর্জন
ইলমের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হল 'অল্পেতুষ্টি' এবং 'আছা' ও 'ছাওফা' (পরে করব)-এর প্রবণতা। এর চেয়েও বড় প্রতিবন্ধক হল ইলমের স্বরূপ তথা এর বিস্তৃতি ও গভীরতা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের মানসিকতা না থাকা。
আরেকটি বড় ব্যাধি হল, তাহকীক ও মুতালাআর জন্য প্রস্তুত না হওয়া। আবার শুধু প্রয়োজনের সময়ে প্রয়োজন পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। এটি ইলমের দৃঢ়তা ও তাফাক্কুহ পয়দা হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। এ ব্যাপারে কয়েকটি বিষয়ে যত্নবান হওয়া অতি জরুরি:
১. শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)-এর 'ছাফাহাতুম মিন ছাবরিল উলামা', 'কিমাতুয যামান ইনদাল উলামা', মাওলানা হাবীবুর রহমান খান শিবওয়ানী (রহ.)-এর 'না-বীনা উলামা' ইত্যাদি রচনায় উল্লেখিত ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে ইলমের অনুরাগ ও ইলমের জন্য জ্বালা পয়দা করা উচিত। এসব কিতাব থেকে সময়ের মূল্যায়নের শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি ধৈর্য ও অধ্যাবসায়ের শিক্ষাও গ্রহণ করা উচিত। এতে উল্লেখিত কিছু ঘটনা মানসপটে খোদাই করে নেওয়া উচিত। তাহলে যেমন সময় নষ্ট করার দুঃসাহস হবে না অদ্রূপ (যদি আল্লাহ তাআলা আকলে সালীম ও লজ্জাবোধ দান করে থাকেন) উপকরণের অপ্রতুলতা এবং বিভিন্ন অসুবিধা ও পেরেশানী ইলমের পথে বড় বাধা মনে হবে না।
২. 'মুতালাআ' শুধু দরস ও প্রয়োজনের মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মুতালাআর সকল প্রকারের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। যথা- (ক) দরসের জন্য মুতালাআ, (খ) সাময়িক প্রয়োজনের জন্য মুতালাআ, (গ) মওসুমী মুতালাআ, (ঘ) নিয়মিত মুতালাআ। এই মুতালাআর উদ্দেশ্য হবে ইলম তাজা রাখা ও তাফাক্কুহ ফিদ্দীন অর্জন করা এবং রূহের খোরাক যোগানো। (কুরআন, হাদীস, অতপর নির্বাচিত রচনাবলী, রাসাইল, মালফুযাত ও মাকতুবাতে আকাবির থেকে এ মুতালাআ অব্যাহত থাকবে) (ঙ) প্রচলিত ও সম্ভাব্য ফিতনাসমূহ মুকাবিলার জন্য মুতালাআ, নিজের ও সাধারণ মুসলমানের ঈমান-আকীদা সংরক্ষণের জন্য; অন্য ভাষায়:
يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ، وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ.
যারা এই দ্বীন থেকে প্রতিহত করবে চরমপন্থীদের হ্রাস-বৃদ্ধি, মূর্খ লোকের অপব্যাখ্যা ও বাতিলপন্থীদের অন্যায় হস্তক্ষেপ। এর দায়িত্ব পালনের জন্য। (চ) বিষয়ভিত্তিক মুতালাআ (অজানা বিষয়াবলি বা একজন আলেমের জন্য যে সব বিষয় জানা অপরিহার্য তার তালিকা প্রস্তুত করে মুতালা'আ)।
এ সবের মধ্যে আসল প্রকার হল, 'নিয়মিত মুতালাআ' ও 'ফিতনাসমূহের মুকাবিলার জন্য মুতালাআ'। এর জন্য যতটুকু সময় হোক না কেন নির্ধারণ করতে হবে। এরপর অবস্থা ও ব্যস্ততার ভিত্তিতে যে দিন যে পরিমাণ সময় যোগ করা যায় আলহামদুলিল্লাহ।
মুতালাআর সর্বশেষ প্রকার অর্থাৎ অজানা ও অপরিহার্য বিষয়াদির তালিকা তৈরি করে সে অনুযায়ী মুতালাআ আরম্ভ করা খুব দরকার। চিন্তা করলে দেখা যাবে অনেক প্রয়োজনীয় ইলম ও ফনের ব্যাপারে (যার কিছু বিষয়ের অল্প কিছু কিতাব আমরা দরসে নেযামীর নির্ধারিত নেসাবে 'চেখেও' দেখেছি) বর্ণমালা পর্যায়ের প্রাথমিক জ্ঞানও আমাদের নেই। তদ্রূপ যে কোনো জরুরি ফনের অধ্যায় ও পরিচ্ছেদসমূহ এবং অন্যান্য বিষয়ের হিসাব করা হলে দেখা যাবে আমাদের অর্জিত জ্ঞানের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
অজানা বিষয়াদির এক বিশাল অংশ বর্তমান যুগের প্রয়োজনীয় মাসায়েল ও বিষয়াদির সাথে সম্পৃক্ত যা থেকে অজ্ঞ থাকা সমাজে অবস্থানকারী একজন আলেমের জন্য কখনই শোভনীয় নয়। কেননা- مَنْ لَمْ يَعْرِفْ أَهْلَ زَمَانِهِ فَهُوَ جَاهِلٌ.
যে তার সমকালীন লোকদেরকে জানে না (তাদের কথা-কাজ বোঝে ঘন) সে অজ্ঞ।
এসব বিষয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে উল্লেখ করার পরিবর্তে এ বিষয়টি আপনাদের দায়িত্বে সোপর্দ করছি। একজন আলেমের জন্য অপরিহার্য বিষয়াদির একটি তালিকা এবং সেসব বিষয়ে জ্ঞান লাভের প্রয়োজনীয় উৎস সম্বলিত একটি প্রবন্ধ প্রস্তুত করে পাঠাবেন। এরপর প্রয়োজন হলে তালিকাটি পূর্ণ করে অধ্যয়নের ক্রম ও ধারাবাহিকতা আপনাদের উস্তাদগণ নির্ণয় করে দেবেন ইনশাআল্লাহ। গত কয়েক বছর যাবত 'আল মাওয়াদ্দুল ইযাফিয়া' শিরোনামে এ জাতীয় একটি তালিকা শিক্ষার্থীদেরকে প্রদান করা হয়। এ থেকেও কিছুটা সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
ইমাম শা'বীর কথা স্মরণ করুন: الْعِلْمُ ثَلَاثَةُ أَشْبَارٍ ، فَمَنْ نَالَ مِنْهُ شِبْرًا شَمَّخَ بِأَنْفِهِ وَظَنَّ أَنَّهُ نَالَهُ، وَمَنْ نَالَ الشَّبْرَ الثَّانِيَ صَغُرَتْ إِلَيْهِ نَفْسُهُ وَعَلِمَ أَنَّهُ لَمْ يَنَلْهُ، وَأَمَّا الشَّبْرَ الثَّالِثَ فَهَيْهَاتَ، لَا يَنَالُهُ أَحَدٌ أَبَداً. (أدب الدنيا والدين ص ٨١)
ইলম হলো মোট তিন বিঘা। যে তার এক বিঘত লাভ করে তার নাক ফুলে ওঠে। সে ভাবে, ইলম হাছিল করে ফেলেছে! আর যে দ্বিতীয় বিঘতও লাভ করে- নিজিকে তার ছোট মনে হয়। সে বুঝতে পারে, ইলমের কিছুই অর্জিত হয়নি! আর তৃতীয় বিঘত, সে বহুত দূরের ব্যাপার। কোন দিনই কেউ নাগাল পাবে না তার!
হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাযি.)-এর বাণী এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যার মর্ম হল, 'ইলম যত বাড়বে বিনয় ততই বৃদ্ধি পাবে। আর জাহালত যত বেশি হবে অহংকারও তত বাড়বে'। তাঁর এ বাণী থেকেও আমরা আমাদের ভয়ঙ্কর পর্যায়ের জ্ঞানহীনতা সম্পর্কে অনুমান করতে পারি।
৩. সাধ্যমত তাসনীফ, দরসে হাদীস, দরসে তাফসীর, সাপ্তাহিক দরস ও মাসিক মুহাযারার ব্যবস্থা করা এবং এ ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। কেননা এতে বাধ্য হয়েই মুতালাআ ও তাহকীকের পরিধি বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. মারকাযের বা আপনার নিকটবর্তী কোনো মুহাক্কিক আলেমের সাথে পরামর্শ করে তাহকীকযোগ্য বিষয়াদির একটি তালিকা তৈরি করে বিশেষত সম-সাময়িক বিষয়াদির একটি তালিকা প্রস্তুত করে গুরুত্ব অনুপাতে ক্রমিক নম্বর দিয়ে এর উপর তথ্য সংগ্রহ ও সংগৃহীত তথ্যের আলোকে তাহকীক ও তানকীহের কাজ আরম্ভ করা উচিত। কেননা এতে অপরিহার্যভাবে অধ্যয়নের প্রয়োজন দেখা দেবে।
৫. দরসী কিতাবসমূহের কঠিন স্থানগুলো যা প্রতি বছর অস্পষ্ট রেখেই সামনে অগ্রসর হতে আমরা অভ্যস্ত, এক এক করে সেসব স্থান হল করার মানসিকতা তৈরি করা উচিত। এভাবেও বাধ্য হয়েই মুতালাআর ব্যাপারে যত্নবান হওয়া যাবে।
৬. মুতালাআ, তাহকীক, তাসনীফ ও তালীফের ব্যাপারে কিতাবের অপর্যাপ্ততা বা কিতাব না থাকার অভিযোগ- কাজে প্রতিবন্ধক না হওয়া উচিত।
প্রথমত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বশীলগণকে আদবের সাথে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে আস্তে আস্তে কিতাব সংগ্রহ করতে থাকা। দ্বিতীয়ত প্রত্যেক আলেমেরই একটি ছোটখাটো কুতুবখানা থাকা। এ উদ্দেশ্যে দুটি একটি করে কিতাব খরিদ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত আশপাশের লোকদের নিকটে বিদ্যমান বিক্ষিপ্ত কিতাবসমূহ থেকে উপকৃত হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত উপরোক্ত কোনোটাই সম্ভব না হলে যে দু'একটি কিতাব আছে তা সম্বল করেই কাজ আরম্ভ করতে হবে। এটা শুধু সম্ভব তাই নয়; বরং অতি সহজ। শুধু আকলে সালীম ও চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন।
হযরত হাকীমুল উম্মত-এর শত শত রচনা রয়েছে অথচ তাঁর কুতুবখানায় বিদ্যমান কিতাবের সংখ্যা হয়তো তাঁর রচনাবলির চেয়েও কম হবে।