📘 তালিবানে ইলম পথ ও পাথেয় 📄 দক্ষ ও কাজের লোক হতে চাইলে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হবে

📄 দক্ষ ও কাজের লোক হতে চাইলে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হবে


বিশিষ্ট ফকীহ আল্লামা শাতেবী (রহ.) তাঁর 'আল-মুয়াফাকাত' কিতাবে লেখেন-
وَقَدْ قَالُوا : إِنَّ الْعِلْمَ كَانَ فِي صُدُورِ الرِّجَالِ، ثُمَّ انْتَقَلَ إِلَى الْكُتُبِ وَصَارَتْ مَفَاتِحُهُ بِأَيْدِيُّ الرِّجَالِ.
আহলে ইলম বলেছেন, ইলম (প্রথমে) সংরক্ষিত ছিলো মনীষীদের বুকে, পরে তা চলে এসেছে পুস্তকে, তবে চাবি রয়ে গেছে তাদেরই হাতে।
সালাফে-সালেহীনের এই অমর উক্তি থেকে 'রিজালে ইলম' তথা আহলে-ফন ও আহলে-দিল আলেম ও বুযুর্গদের সান্নিধ্য লাভের আবশ্যকতা যেমন সাব্যস্ত হয়, তেমনি কিতাব মুতালাআর বিশেষ গুরুত্বও প্রকাশ পায়।
এই প্রবন্ধে মুতালাআর গুরুত্ব এবং এক্ষেত্রে বিদগ্ধ আকাবিরের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
মুতালাআর একটি সাধারণ স্তর বা প্রকার হল, দরসের কিতাবসমূহ এবং সেগুলোর নির্বাচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও টীকা-টিপ্পনী গভীরভাবে মুতালাআ করা। এই মুতালাআর উদ্দেশ্য, উস্তাদের দরস যথাযথভাবে বোঝা ও আত্মস্থ করা এবং 'কিতাবী ইসতেদাদ' অর্জন করা। এই স্তরের মুতালাআ তালিবানে ইলমের জন্য ফরয। একে নিয়মিত দরসের অংশ মনে করতে হবে। তবে মুতালাআ কখনো এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বর্তমানের তালেবে ইলম ভাইদের অবস্থা এই যে, তারা এই সামান্য মুতালাআকে যথেষ্ট মনে করে থাকে; বরং অনেকে মুতালাআ বলতে একেই বোঝে। অথচ আমাদের আকাবির কখনো মুতালাআকে এই প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করতেন না; বরং তাঁরা শিক্ষা-জীবনের শুরু থেকেই নিজ মুরুব্বীর পরামর্শ মোতাবেক প্রতি শিক্ষা-বছরের মান অনুযায়ী (নেসাবের কাজ পরিপূর্ণ করে) বিভিন্ন বিষয়ে অতিরিক্ত কিছু না কিছু কিতাব মুতালাআ করতেন。

সুতরাং এই ধারণা ঠিক নয় যে, মুতালাআ দ্বারা শুধু 'দরসী মুতালাআ' উদ্দেশ্য, অতিরিক্ত কোন মুতালাআর প্রয়োজন নেই। এই ধারণা সাধারণ নিয়মে এবং বাস্তবতার নিরিখে যেমন গলদ, তেমনি আকাবিরের সামগ্রিক কর্মপদ্ধতিরও পরিপন্থী। আর এ কথা স্বীকৃত যে, শুধু নেসাবভুক্ত কিতাবের মধ্যে মুতালাআ সীমিত রাখলে জীবনে কখনো 'আলেম' হওয়া যাবে না।
এই শ্রেণীর তালেবে ইলম ছাত্রজীবনে 'দরসী-কিতাব' এবং শিক্ষকতার জীবনে নেসাবী কিতাব ছাড়া আর কিছুই মুতালাআ করবে না। অথচ নেসাবের কিতাব তো কোন কোন ক্ষেত্রে 'জরুরিয়াতে দ্বীনে'র (দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়াদির) মুদাল্লাল ইলম দান করতেও অক্ষম। আর অন্যান্য জরুরি উলূম ও মাআরেফের কথা তো বাদই দিলাম।

📘 তালিবানে ইলম পথ ও পাথেয় 📄 ছাত্রজীবনে আকাবিরদের মুতালাআ

📄 ছাত্রজীবনে আকাবিরদের মুতালাআ


আমাদের নিকট-অতীতের কয়েকজন আকাবিরের কিছু প্রসিদ্ধ ঘটনা এখানে উল্লেখ করব, যাতে তাঁদের ছাত্রজীবনে (শিক্ষকতার জীবনে নয়) মুতালাআর পরিধি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

১. আমাদের সম্মানিত উস্তাদ শায়েখ মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রশীদ নুমানী (রহ.) [১৩৩৩ হি.-১৪২০ হি.] ষোল-সতের বছর বয়সেই দাওরার আগ পর্যন্ত দরসে নেযামীর পূর্ণ নেসাব সমাপ্ত করেন। সে সময় তাঁর মুতালাআর পরিধি এত সুবিস্তৃত ছিল যে, ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী (রহ.) [৭৪৮ হি.] প্রণীত 'মীযানুল ইতিদাল ফী নন্দির রিজাল'-যা বড় বড় চার খণ্ডে মুতাকাল্লাম ফী রাবীদের জীবনী সম্বলিত- আদ্যোপান্ত মুতালাআ করেছিলেন এবং আল্লামা আবদুল হাই লাখনোভী (রহ.)-এর রচনাসম্ভার থেকে 'আল আজবিবাতুল ফাযিলা লিল-আসয়িলাতিল আশারাতিল কামিলা' ও 'আররাফউ ওয়াত তাকমীল ফিল জারহি ওয়াত-তাদীল'সহ হাদীস ও ফিকহ বিষয়ক অনেক কিতাব মুতালাআ করেছেন। সাথে সাথে গায়রে মুকাল্লিদদের পক্ষ থেকে বিতর্কিত মাসআলা-মাসায়েলের দলীলাদি সম্পর্কে অনেক কিতাব নিমগ্নতার সাথে মুতালাআ করেছিলেন।

২. শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্দলোভী (রহ.) [১৩১৫ হি.- ১৪০২ হি.] তাঁর আত্মজীবনী 'আপ-বীতী'তে (যা মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ এবং ইলম ও উলামায়ে কেরামের উসূল ও আদাব সংক্রান্ত একটি মূল্যবান ভাণ্ডার। কিতাবটি উপদেশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে সকল ছাত্র-শিক্ষকের পড়া উচিত) নিজের ছাত্রজীবন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, "আমি মেশকাত শরীফ সবটুকু তরজমা ছাড়া পড়েছি। (অর্থাৎ উস্তাদের তরজমা করার কোন প্রয়োজন হয়নি। ইবারতের অর্থ ও মতলব নিজেই বুঝে নিয়েছেন) তবে এই অনুমতি ছিল যে, প্রয়োজনে কোন শব্দের তরজমা জিজ্ঞাসা করতে পারব। মুহতারাম পিতা কখনো কখনো পরীক্ষামূলক বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। মেশকাত শরীফের অনুবাদগ্রন্থ 'মাযাহেরে হক' দেখা তো ভীষণ অপরাধ ছিল। 'হেদায়া' ও 'তহাবী' কিতাব দুটি মুতালাআ করে আসা আবশ্যক ছিল এবং 'কুতুবে সিত্তাহ'র যে কিতাবের হাদীস আসত তা সে কিতাব থেকে বের করে তার হাশিয়া দেখার অনুমতি ছিল। ইখতেলাফী মাসায়েলের ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় নিয়ম ছিল, প্রত্যেক হাদীসের পরে বলতে হত, এটি ফিকহে হানাফীতে বর্ণিত বিধানের উৎস, নাকি অন্য কোন ফিকহের। যদি অন্য কোন ফিকহের উৎস হয়ে থাকে তাহলে ফিকহে হানাফীর মাসআলার উৎস কোন হাদীস? সাথে সাথে উল্লেখিত পরিচ্ছেদে বিদ্যমান অন্য হাদীসের কী ব্যাখ্যা হানাফী ইমামগণ দিয়েছেন? এসব কিছু হাদীস অধ্যয়নের অপরিহার্য অংশ রূপে আমার যিম্মায় ছিল। ফিকহে হানাফীর উৎস ও দলীল বলতে পারিনি এমন ঘটনা আমার মনে পড়ে না। কেননা হেদায়া ও তার ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহ এবং ফিকহ বিষয়ক অন্যান্য কিতাব বার বার পড়তাম। তবে কখনো কখনো অন্য ফিকহের উৎস যে হাদীস তার ব্যাখ্যা দিতে পারতামচ্ছ না, তখন আব্বাজান নিজেই সেগুলো বলে দিতেন।” (আপবীতী ১/৩০)

৩. ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) [১২৯৪ হি.-১৩৫২ হি.] বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) [৮৫৫ হি.]-এর বিখ্যাত গ্রন্থ 'উমদাতুল কারী শারহু সহীহিল বুখারী' কিতাবটি; যে শাওয়ালে তিনি দাওরায়ে হাদীস পড়বেন, তার আগের মাস তথা রমযানেই আগাগোড়া সবটুকু মুতালাআ করে নিয়েছিলেন। এরপর সহীহ বুখারীর সবক চলার সাথে সাথে 'ফাতহুল বারী'-এর মুতালাআ জারি রেখেছিলেন। সাধারণত সবকের চেয়ে ফাতহুল বারী-এর মুতাআলা এগিয়ে থাকত। একবার শারীরিক অসুস্থতার কারণে সতের দিন দরসগাহে উপস্থিত হতে পারেননি। সুস্থতার পরে এসে দেখেন ফাতহুল বারীর মুতালাআ এখনো আগে রয়েছে। অসুস্থতার আগে যে পর্যন্ত মুতালাআ করেছিলেন সে পর্যন্ত এখনও সবক পৌঁছেনি। (নাফহাতুল আম্বার ফী হায়াতি ইমামিল আসর আশ-শায়েখ আনওয়ার, মাওলানা সাইয়েদ ইউসুফ বানূরী রহ. [১৩৯৭ হি.] কৃত পৃ. ৪৮-৪৯)

ফন্ট সাইজ
15px
17px